বাংলাদেশের চা শিল্প ও চা শ্রমিকরা হুমকীর মুখে। প্রতিকার কী?
( ধারাবাহিক-১৩ )
-সৈয়দ আমিরুজ্জামান
চা শ্রমিকদের ভোটাধিকার ও নাগরিকত্বঃ
বর্তমান বাংলাদেশের চা শ্রমিকরা অবিভক্ত ভারতবর্ষেরই আদি বাসিন্দা। বৃটিশ কোম্পানীগুলো বিহার, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, উড়িষ্যা, মাদ্রাজসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চা শ্রমিকদের নিয়ে এসে আসাম ও বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন চা বাগানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে বাধ্য করে। চা শ্রমিকরা চা বাগানের স্থায়ী বাসিন্দা হলেও বসত ভিটার স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয় নি। তাদের জীবন প্রবাহ আবর্তিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে চা কোম্পানীগুলোর চাপিয়ে দেয়া নিয়ম কানুনের অধীনে। অনেকেই বলে থাকেন চা বাগানগুলো হচ্ছে states within state. ফলে চা শ্রমিকরা বাগানে এসে সবকিছু হারানোর সঙ্গে সঙ্গে মানবিক ও নাগরিক অধিকারটুকুও হারিয়ে ফেলে। যুগ যুগব্যাপী শোষিত-বঞ্চিত চা শ্রমিকরা সুদীর্ঘ সময় পর ১৯৩৫ সালে ইন্ডিয়ান এ্যাক্টের আওতায় আসাম অ্যাসেম্বলিতে ভোটাধিকার অর্জন করে। এই এ্যাক্ট অনুযায়ী তাদের জন্য আসাম অ্যাসেম্বলীতে ২টি সংরক্ষিত আসনও রাখা হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে প্রথম দু'জন চা শ্রমিক সর্দার জীবন সাওতাল ও ধীরেন মাঝি এমএলএ নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর চা শ্রমিকদেরকে ভাসমান জনগোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের ভোটাধিকার রহিত করা হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে চা শ্রমিকরা পুনরায় ভোটাধিকার পায়। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে চা শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও অবদান অনস্বীকার্য। মুক্তিযুদ্ধে চা শ্রমিকরা লড়াই করেছে, জীবন দিয়েছে, অবর্ণনীয় লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে। কিন্তু যুগযুগব্যাপী চা শ্রমিক জনগোষ্ঠী শ্রেণী শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির যে আকাংখাকে বুকে নিয়ে লড়াই চালিয়ে এসেছে, সেই আকাংখা আজও পূর্ণ হয় নি। '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর গত ৩৭ বছরে কয়েক দফায় সরকারের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর জীবনে উন্নতি ঘটেনি। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের স্বাদ জনগণ পায় নি। জাতীয় ও গণস্বার্থ বিরোধী শোষক শ্রেণীর নিষ্ঠুর শোষণে চা শ্রমিকদের জীবনে আজ নাভিঃশ্বাস উঠেছে। বেকার সংখ্যা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের চা শ্রমিকরা সারাদিন পরিশ্রম করেও দু‘বেলা পেটপুরে খেতে পারে না। ক্ষুধা-দারিদ্র্য নিত্য সাথী। বর্তমান প্রজন্মের চা শ্রমিকরা জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক, ভোট দেয়, দেশের প্রচলিত নিয়ম মেনে চলে, নাগরিক কর্তব্য পালন করে কিন্তু তারা মানবিক ও নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত। এই অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। এই দুঃসহনীয় অবস্থা থেকে চা শ্রমিকরা মুক্তি চায়। চা শ্রমিক জনগোষ্ঠী আজ শোষণ অত্যাচারের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির সুতীব্র আকাংখায় ছটফট করছে। চা শ্রমিকরা চায় পরিবর্তন। গোটা সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

