১৪ই জুন মাগুরছড়া দিবস
মাগুরছড়া ব্লো-আউটের ১১ বছর পূর্ণ
ক্ষতিপূরণ আদায়ে কিছু সুপারিশ
(ধারাবাহিক-৫)
---সৈয়দ আমিরুজ্জামান
শেভরনের জাতীয় গ্রীডে গ্যাস সরবরাহ, বছরে ভর্তুকী ৫,১৫৬ কোটি টাকাঃ
মাগুরছড়া মৌলভীবাজার জেলার অন্তর্গত শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের একটি জায়গার নাম। ১৯৯৭ সালের জুন মাসে স্থানটি রাতারাতি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামে পরিণত হয়। এখনো প্রতি বছর 'মাগুরছড়া দিবস'- ছাড়াও মাঝে মাঝে সংবাদ শিরোনামে মাগুরছড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে জনগণের সামনে আবির্ভূত হয়। বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানীর সাথে হিসেব-নিকেশ শেষে উৎপাদন অংশীদারী চুক্তি বা Production Sharing Contract-'পিএসসি' চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ পাচ্ছে তেল-গ্যাস সম্পদের ২১ ভাগ ( অবশ্য কষ্ট রিকোভারি হিসেব করলে আমাদের ২১ ভাগও থাকে না), আর বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানী লুটে নিয়ে যাবে গ্যাস-তেল সম্পদের ৭৯ ভাগ। আর বাপেক্স উত্তোলন করলে পুরোটার মালিক হতো দেশ। বিদেশী কোম্পানী গ্যাস অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে তারা আবার বড় বড় বিপর্যয় ঘটাতে পারে, যা ইতিমধ্যেই মাগুরছড়া ও টেংরাটিলা (ছাতক) গ্যাসকূপ সমূহের দুর্ঘটনায় প্রমাণিত। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, এক হাজার ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনে বাংলাদেশের উৎপাদন খরচ হয় ৫৮ টাকা, যা জনগণ কেনে ৬২ টাকায়। এক্ষেত্রে প্রতি হাজার সিএফটিতে ৪ টাকা লাভ থাকার কথা। কিন্তু সেই গ্যাস বিদেশী কোম্পানীর কাছ থেকে কিনতে হচ্ছে ৮ ডলারে অর্থাৎ ৫৮৪ টাকায় এবং সেটা কিনতে হবে বিদেশী মুদ্রায় বা ডলারে। সরকার ভর্তুকী দিয়ে কেনার ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে চলে যাচ্ছে এবং এরই বিষময় ফল হচ্ছে জনগণকে বেশী দামে গ্যাস ও বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের দেশের মাটির তলার সেই গ্যাস শেভরন কোম্পানীর কাছ থেকে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস ৫৮৪ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। এতে দেশ অচিরেই বিরাট বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। শেভরন এমবি-২ ও এমবি-৩ কূপ থেকে ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দৈনিক জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করছে। প্রতিদিনের উত্তোলন খরচ ৩২ লক্ষ ৭ হাজার টাকা। বাপে উত্তোলন করলে তা জনগণ কিনতে পারতো ৪৩ লক্ষ ২৮ হাজার টাকায়। কিন্তু জাতীয় গ্রীডে সরবরাহকৃত দৈনিক ৭০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে তাদের ৭৯ ভাগ অর্থাৎ ৫৫.৩ মিলিয়ন গ্যাস শেভরন কোম্পানীর কাছ থেকে ৩,২২,৯৫২০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে এবং বছরে তা দাঁড়াচ্ছে ১,১৭৮ কোটি টাকা। এতে বাংলাদেশকে শেভরন কোম্পানীর স্বার্থে মুনাফা যোগান দিতে গিয়ে প্রতিদিন ভর্তুকী দিতে হচ্ছে ২ কোটি ৯০ লক্ষ ৮৮ হাজার টাকা এবং বছরে ভর্তুকী ১,০৬১ কোটি ৭১ লক্ষ টাকা। এমবি-২, এমবি-৩, এমবি-৪ ও এমবি-৫ কূপগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলন করে জাতীয় গ্রীডে দৈনিক ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তাতে জাতীয় গ্রীডে সরবরাহের জন্য দৈনিক ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে তাদের অংশ ৭৯ ভাগ অর্থাৎ ১১০.৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস শেভরন কোম্পানীর কাছ থেকে ৬ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকায় কিনতে হচ্ছে এবং বছরে তা দাঁড়াচ্ছে ২,৩৫৭ কোটি টাকা। এতে বাংলাদেশকে শেভরন কোম্পানীর স্বার্থে মুনাফা যোগান দিতে গিয়ে প্রতিদিন ভর্তুকী দিতে হচ্ছে ৫ কোটি ৮১ লক্ষ ৭৬ হাজার টাকা এবং বছরে ভর্তুকি ২,১২৩ কোটি ৪৩ লক্ষ টাকা। এ ছাড়া হবিগঞ্জের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করে জাতীয় গ্রীডে দৈনিক ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশকে শেভরন কোম্পানীর স্বার্থে মুনাফা যোগান দিতে গিয়ে প্রতিদিন ভর্তুকী দিতে হচ্ছে ৮ কোটি ৩১ লক্ষ ৯ হাজার টাকা এবং বছরে ভর্তুকি ৩,০৩৩ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকা। তাতে বাংলাদেশের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হলে সরকারকে জনগণের জ্বালানী গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের দাম দ্বিগুণ বৃদ্ধি করতে হবে। এর ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দামও চক্রবৃদ্ধিহারে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। তেল-গ্যাস উত্তোলনের জন্য বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান রয়েছে বাপেক্স। বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিষ্ঠান তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কয়েকগুণ বেশী সাফল্য দেখিয়েছে। বিদেশী কোম্পানীর কাছে তেল-গ্যাসক্ষেত্র ইজারা দেয়ায় বাপেক্সের ৩০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ছে, ১৩০০ দক্ষ কর্মকর্তা বেকার হচ্ছে ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হচ্ছে। বিদেশী কোম্পানীকে ইজারা দেয়ায় গ্যাস আবিষ্কারের খরচ দিতে হচ্ছে আমাদের। অথচ তেল-গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলনে বাপেক্সের খরচ বিদেশী কোম্পানীর চেয়ে অনেক অনেক কম। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের সকল গ্যাসক্ষেত্র দেশীয় কোম্পানী বাপেক্স দিয়েই কূপ খনন-উত্তোলন-বিপণন করা যেত। এজন্য বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানীকে শেয়ার দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আর্থিক অনটনের প্রশ্ন অবান্তর। হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস উত্তোলনের জন্য মাত্র ৪০ কোটি টাকা দিয়ে কূপ খনন করা যায়। দেশের বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী প্রতিবছর মাত্র ৪ টি কূপ খননের জন্য ১৬০ কোটি টাকা করা দরকার হয়। এছাড়া প্রতিবছর পেট্রোবাংলা ২,০০০ কোটি টাকার উপরে সরকারকে প্রদান করে, এর শতকরা ১০ ভাগ অর্থাৎ ২০০ কোটি টাকা অন্তত গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নে ব্যয় করা হলে তেল-গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন খাতে বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় না। কারিগরি দক্ষতার প্রশ্নও অবান্তর। ইতিমধ্যে বাপে ফেঞ্চুগঞ্জ, সালদা নদী ইত্যাদি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে উৎপাদন চালু রেখেছে। তাহলে মাগুরছড়া, ছাতক-টেংরাটিলাসহ সকল গ্যাসক্ষেত্রে কূপ খনন করতে বাপেক্সের পক্ষে কোনো অসুবিধা ছিল না। সরকার যদি শেভরন কোম্পানীর স্বার্থে মুনাফা যোগান দিতে গিয়ে মৌলভীবাজারের ২টি কূপের গ্যাস ক্রয় বাবদ ১,০৬১ কোটি ৭১ লক্ষ টাকা অথবা ৪টি কূপের গ্যাস ক্রয় বাবদ ২,১২৩ কোটি ৪৩ লক্ষ টাকা অথবা হবিগঞ্জের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাসক্রয় বাবদ ৩,০৩৩ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকা বছরে ভর্তুকি দিতে পারে। তাহলে প্রতিবছর পেট্রোবাংলা যে উদ্বৃত্ত ফান্ড সরকারকে প্রদান করে, এর শতকরা ১০ ভাগ তেল-গ্যাস উত্তোলনকারী জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের মাধ্যমে গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ দেয়া সম্ভব নয় কেন ? গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের নামে এ কোন শুভঙ্করের ফাঁকি! শেভরনের কাছ থেকে ২টি কূপের গ্যাস ক্রয় বাবদ ১,০৬১ কোটি ৭১ লক্ষ টাকার ভর্তুকী দিয়ে বাপেক্স ২৬টি অথবা ৪টি কূপের গ্যাস ক্রয় বাবদ ২,১২৩ কোটি ৪৩ লক্ষ টাকার ভর্তুকী দিয়ে ৫৩টি গ্যাসকূপ অথবা হবিগঞ্জের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাসক্রয় বাবদ ৩,০৩৩ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকা বছরে ভর্তুকি দিয়ে ৭৫টি গ্যাসকূপ প্রতি বছরে উন্নয়ন ও উত্তোলন করতে পারতো। তাহলে গ্যাসক্ষেত্রগুলো শেভরনসহ অন্যান্য বিদেশী কোম্পানীকে দেওয়া হলো কেন?
শেভরনের জাতীয় গ্রীডে গ্যাস সরবরাহ, বছরে ভর্তুকী ৫,১৫৬ কোটি টাকা
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।