সামহোয়্যারইন ব্লগ(বাঁধ ভাঙার আওয়াজ)-এর ব্লগারদের একটা বিরাট অংশ দেশের বাইরে থাকেন। তারা জীবিকার প্রয়োজনে কঠোর পরিশ্রমের মাঝেও ব্লগে আসেন তাদের মতামত প্রকাশ করেন। বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। অনেক ভাল লাগার মতো একটি ব্যাপার। তাদের বঞ্চনা আর কষ্টের কিছুটা হলেও আমরা জানতে পারি। আমি চাই প্রবাসীদের কথা আরো বেশী করে ব্লগে আসুক।
বাংলাদেশের প্রায় ৭০ লাখ মানুষ পেটের দায়ে হোক আর জীবন-জীবিকার প্রয়োজনেই হোক দেশের বাইরে কাজ করছেন এটাই এখন বাস্তবতা। তারা তাদের আয়ের বেশীর ভাগই দেশে পাঠিয়ে দিয়ে থাকেন। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ করণে তাদের ভূমিকা অস্বীকার করার আর কোন উপায় নাই।
কিন্তু বিদেশে যারা আছেন তারা কি আর স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন। খাওয়া-দাওয়া, থাকা সব কিছুতে কষ্ট। ছোট্ট একটা রুমের ভেতর গাদাগাদি করে থাকতে হয়। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম। কোন আরাম আয়েস নেই। নেই বিনোদন।
দেশ থেকে জমি-জমা, ভিটে-মাটি, ঘর-বাড়ি বিক্রি করে যারা বিদেশে আছেন তাদের প্রকৃত অবস্থা অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিকটা জনেরাও জানতে পারেন না। পরিবারের সবাই জানে ভাল আয় করে টাকা পাঠায় মন্দ কি। কিন্তু আমরা কি কেউ জানি যে, ৭০ লাখ বাংলাদেশী যারা বিদেশে আছেন তাদের প্রায় ৮০% এর মাসিক আয় ১৫/২০ হাজার টাকার অধিক নয়। কেউ কেউ আছে যাদের ইনকাম এর চেয়েও কম। কিন্তু এ জন্য তাদেরকে প্রাথমিক বিনিয়োগ করতে হয়েছে অনেক। দেখা গেছে ২ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গেছে এক লোক । কিন্তু তার মাসিক বেতন ১৫ হাজার টাকা। এখন সে যদি ১৫ হাজার টাকা থেকে ১ টাকাও খরচ না করে তাহলেও তার মূলধন ফেরত পেতে ১৩ মাসেরও বেশী সময় লেগে যাবে। আর ১৫ হাজার টাকা থেকে যে যদি অর্ধেক খরচ করে ফেলে তাহলে তো আর কথাই নাই। আর বলাই বাহুল্য পৃথিবীর যে কোন দেশে জীবন যাত্রার ব্যয় বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশী।
অনেকই আছে যারা ২০ হাজার টাকা বেতন পান তারা কোন পরিচিত জনের কাছ থেকে টাকা ধার করেন। তারপর বড় একটা পরিমাণ টাকা দেশে পরিবারের কাছে পাঠান। পরবর্তী মাসগুলোতে কেবল সেই টাকা শোধ করতে থাকেন। এটা অনেকেই করে থাকেন। কারণ ১৫/২০ হাজার টাকা বেতন পেয়ে দেশে নিয়মিত টাকা পাঠানো অনেক কঠিন। ফলে তারা নিজেরা যেমন কষ্ট করে চলে তেমনি দেশে তাদের পরিবারও খুব একটা সুখে থাকে না। কোন রকমে খেয়ে পরে বেঁচে থাকা আর কি।
আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের বেশীর ভাগই পড়াশোনা জানে না। নেই কোন ভাল কাজের প্রশিক্ষণ। ফলে বেশীর ভাগ লোকই কোন ভাল কাজ পায় না যাতে বেশী বেতন পাওয়া যেতে পারে। ফলে সব চেয়ে কম বেতনের কঠিন কাজটিই তাদের জন্য নির্ধারিত থাকে। এছাড়া রয়েছে ভাষার সমস্যা। তারা জানে না ইংরেজি। আর যেহেতু ইংরেজি জানে না তাই অন্য ভাষা শিখতেও তাদের সমস্যা হয়। যাদের কাজ করছে তাদের কাছে নিজের চাহিদা কিংবা সমস্যা তুলে ধরার মতো কোন সুযোগও তাদের থাকে না।
মোদ্দাকথা, আমরা দেশ থেকে কেবল টাকাটাই দেখতে পাই। কিন্তু যারা এই টাকা পাঠায় আমরা জানি না তাদের জীবন যাত্রা কেমন। আমরা জানি না যে তারা কেমন আছে। তারা যে ভাল নেই এটা আমাদেরকে জানতে হবে। আমাদের ভাগ্য বিধাতারা হয়তো গর্ব করেন ওয়েজআর্নাররা প্রচুর রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। কিন্তু সেই রেমিট্যান্সের ভেতর কত ঘাম, কত কষ্ট আর কত হাহাকার সেই খবর কয় জনে রাখে?
ইদানিং একটা কথা অনেককেই বলতে শুনিঃ বিদেশে থাকার দরকার নাই, দেশেই একটা কিছু কর। অনেক সুন্দ পরামর্শ। সবাই চায় দেশে একটা কিছু করতে। কিন্তু কি করবে? দেশে কোন কাজটা আছে? কোন কাজটা করবে মানুষ? কে দেবে কাজ?
বেশীর ভাগ প্রবাসীর নিজের জমিজমা বলতে তেমন কিছু নেই। শিক্ষা নেই। দেশে কোন কাজটা তারা পাবে? ধরে নিলাম, তারা গামেন্টেসে কাজ পাবে? অর্ধকোটি লোককে কাজ দেবার মতো শিল্পকারখানা কি দেশে আছে? আমি একটা কথা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, দেশে যদি নুনতম ৮/১০ হাজার টাকা কামাই করার সুযোগ থাকত তাহলে প্রবাসে যারা আছে তাদের বেশীর ভাগই দেশে চলে আসত। দেশে গার্মেন্টস এর বেতন ধরা হয়েছে মাত্র ৩ হাজার টাকা। কে পারবে এই টাকায় সংসার চালাতে? স্ত্রী-পরিবার, ঘর-সংসার দেশে ফেলে কে বিদেশে থাকতে চায়? দেশে ব্যবসা করবেন? কোন ব্যবসাটা করবেন? সর্বত্র মাস্তানী, চাঁদাবাজি, ছিনতাই। বাসে চাঁদা, ট্রাকে চাঁদা , হাটে চাদা, ঘাটে চাদা, মাঠে চাঁদা। এমন কোন জায়গা নাই যেখানে নোংরা রাজনীতির ছোবল নেই। কোন জায়গায় কাজের আর ব্যবসার পরিবেশ আছে?
সহজ সরল ভাল মানুষের মতো একটা মুদির দোকান দিবেন। সেখানে আপনাকে ৩ লাখ টাকার মাল সব সময়ই বাকির খাতায় রাখতে হবে। কিছু কিছু আবার যাবে চির বাকির খাতায়। যে বাকী আর ইহজীবনেও আদায় হবে না। রোজ কম করে হলেও ১ প্যাকেট সিগারেট যাবে পাড়ার উঠতি মাস্তানদের পেটে। তাদের কাছে টাকা চাইলে তারা ছুরি কিংবা কাটা রাইফেল কিছু একটা প্রদর্শন করবে। খুব দ্রুত দোকান লাটে উঠবে। তার চেয়ে ঢের ভাল বিদেশে পড়ে থাকা। এই সব ঝামেলা তো আর নেই সেখানে।
এবার বিদেশে থাকার কতিপয় বিড়ম্বনা তুলে ধরছি। বেশ কিছু প্রবাসী বন্ধুর মতামত ও আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে:
১। দেশে যারা আত্নীয় স্বজন আছে তারা মনে করে বিদেশে অনেক ভালই তো আছে। মাঝে মাঝে মোটা অংকের টাকা পাঠাচ্ছে।
২। প্রবাস থেকেই দেশে নিয়মিত মোবাইলে কল দিতে হবে। দেশ থেকে পারত পক্ষে কোন কল আসে না। এসএমএস অনেক সস্তা হলেও বাংলাদেশ থেকে কেউ একটা এসএমএসও পাঠায় না। মাঝে মাঝে কল দেবার তাগিদ দিয়ে আসে মিসডকল। তখন আবার কল ব্যাক করতে হয়।
৩। এক সময় মোবাইল ছিল না। তখন চিঠিই ছিল বেশীর ভাগ প্রবাসীর স্বদেশে যোগাযোগের এক মাত্র মাধ্যম। মাঝে মাঝে ক্যাসেট প্লেয়ারে কথা রেকর্ড করে সেই অডিওর ফিতাটি ডাকযোগে পাঠিয়ে দেয়া হত। দেশের পরিবারের সবাই তা শুনত। তারাও আবার ফিরতি অডিও ফিতা পাঠাতো। ফলে খরচ কম হত। এখন বিরাট একটা খরচ হয় কথা বলতে। তারপরও প্রবাসীরা অনেক খুশী। কারণ প্রিয়জনের সাথে কথা বলতে তো পারল।
৪। আমার এক জন খুব পরিচিত এলাকাবাসী যিনি ইটালীতে থাকেন তিনি বললেন, বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে নিজেরা নিজেরা ঝগড়া করে। মারামারি করে। ফালতু রাজনীতিও করে কেউ কেউ। কিন্তু ঘরের বাইরে গেলে বিরাট ভোদাই। তিনি বললেন, পারলে মার তো কোন আফ্রিকানকে! নিজেরা নিজেরা মারামরি করে কোন লাভ?
৫। টাকা পাঠানোর অনেক ভাল পদ্ধতি থাকলেও এখনো কম আয়ের কারণে বাংলাদেশীরা কোন ব্যক্তি দেশে গেলে তার হাতে টাকা পাঠাতে পছন্দ করে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে টাকা মার যাবার রেকর্ড তেমন নাই। কম আয়ের মানুষদের টাকা পাঠাতে আসলেই কষ্ট। কারণ ফি তো লাগে ।
নিজের দেশ সবারই প্রিয়। জন্ম ভূমির মাটি সবাইকেই টানে। কিন্তু প্রবাসী বাংলাদেশীদের কপাল এমনই খারাপ যে বাংলাদেশ তাদেরকে কাছে টানলেও এই সব বহুবিধ কারণে দেশ তাদের কাছে চিরদিনই ধরা-ছোয়ার বাইরে থাকে । শেষ জীবনে যখন আর কাজ কর্ম করার মতো শক্তি অবশিষ্ট থাকে না তখন দেশে ফিরে আসতে হয়।
প্রিয়জনদের কেউ কেউ হয়তো তারপরো বলেন: বিদেশে থাকার দরকার নাই, দেশে একটা কিছু কর। কে বিদেশে পরে থাকতে চায়? সবাই চায় নিজের দেশে থাকতে। ভাল ভাবে বেঁচে থাকতে। কিন্তু কেন মানুষ তা পারে না?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


