সমীর আহমেদ । আমার স্কুলের জীবনের বন্ধু। স্কুল জীবনের বন্ধুত্ব সাধারণ দীর্ঘ স্থায়ী হয়। এছাড়া আমি গ্রামের স্কুলের ছাত্র হওয়াতে এই বন্ধুত্ব চিরকালের।
সমীর আসত তাদের গ্রাম হরিচন্ডী থেকে। অনেক ভাল ছাত্র। অজপাড়াগাঁয়ের স্কুল থেকেও বৃত্তি পেয়েছে। বলতে গেলে, তাদের গ্রামের গর্ব সে। আমার বন্ধু ভাল ছাত্র হওয়াতে আমি নিজেও গর্বিত।
এসএসসি পাসের পর যা হয় আর কি। যে যার মতো বিভিন্ন কলেজে ভর্তি হয়ে চলে গেল। সমীর জয়পাড়া কলেজ থেকে ভাল রেজাল্ট করে ভর্তি হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে । আমি কোন রকমে ঢাকার একটি পচা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে চলে গেলাম শিক্ষিত কৃষক হবার জন্য ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে । তবে আমাদের মাঝে যোগাযোগ ছিল।
ঢাবি-তে পড়ার সময় সে জীবন সংগ্রামের পাশাপাশি লেখালেখি চালাতে থাকে। এ সময় অনেক গরীব ঢাবি-ছাত্রের উপকার করেছে নানা ভাবে। একদিন চিঠি পেলাম- সে নাকি একটা পুরস্কার পেয়েছে। সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠান হবে। প্রধান বিচারপতির কাছ পুরস্কার নিতে হবে। ভয়াবহ ব্যাপার। আমি দারুণ উত্তেজিতবোধ করলাম। কিন্তু বাকৃবি-তে সারা বছর পরীক্ষার উৎসব লেগে থাকায় আমার যাবার আর সুযোগ হল না। ৫ তারা হোটেলের কোন অনুষ্ঠানে থাকার সুযোগ জীবনে প্রথম বারের মতো পেয়েও হারাতে হল।
সেই সময়ের অন্যতম প্রধান দৈনিক আজকের কাগজ -এর তরুণ লেখক পুরস্কার বেশ ভাল একটি পুরস্কার ছিল। নগদ টাকা, সনদ তো আছেই । সেই সাথে বাড়তি প্রাপ্তি পুরস্কার প্রাপ্ত বইটি তারাই প্রকাশ করে দেবে। সেই থেকে থেকে সমীর আমার এক জন লেখক বন্ধু । এখন তার বেশ কয়েকটি বই আছে। পত্রিকাতে প্রায়ই তার লেখা ছাপা হয়। আমি প্রবাসে বসে তার লেখা পত্রিকাতে পড়ি। অনেক ভাল লাগার মতো একটি ব্যাপার।
ভার্সিটি ছাড়ার পর সে ঢাকার একটি পত্রিকা অফিসে কাজ নেয়। সেই পত্রিকাটি আমি পছন্দ না করলেও এক মাত্র সমীর ওখানে কাজ করে বলেই ওর সাথে দেখা করার জন্য আমি অনেক বার পত্রিকাটির অফিসে গিয়েছি। তবে বেশী দিন তাকে পত্রিকার চাকরি করতে হয়নি। সহসাই পর পর তার এক সাথে ২ টি সরকারী চাকরি হয়। একটি ব্যাংকে; অন্যটি সরকারী স্কুলের শিক্ষকতা। শেষ পর্যন্ত সে শিক্ষকতাকেই বেছে নেয়। যোগ দেয় কুমিল্লার একটি সরকারী স্কুলে। একটা মোবাইলও কিনে। মাঝে মাঝে কথা হয়। হঠাৎ একদিন কল করে দেখি রিং হয় না। বার বার চেষ্টা করি। তখন দেশে নেটওয়ার্ক এতো ভাল ছিলনা। ভাবলাম, হয় তো নেটওয়ার্কের বাইরে আছে। কিন্তু আসল ব্যাপারটি তা নয়। সে পড়েছিল ছিনতাইকারীদের কবলে।
এই দেশে যে কোন মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা চেয়ে নেবার এক মাত্র বৈধ অধিকার যেন ছিনতাইকারীদেরই আছে। এরা কাউকেই পরোয়া করে না। ইদানিং তারা আবার মানুষের বাসা বাড়িতেও ঢুকে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। আইন-শৃঙ্ক্ষলা রক্ষাকারীরা কিছুই বলে না। মনে তারাও ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে একটা অংশ শেয়ার পায়। কোন গোপন সমঝোতা হয়তো আছে। বাংলাদেশের পুলিশ বলে কথা।
সমীর যাচ্ছিল ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে। হঠাৎ তিনটি উসকোখুসকো চুলের রংচটা জিনসের প্যান্টপরা তরুণ তার পথ রোধ করে দাঁড়ায়।
ভাই সাহেব, সাথে যা আছে সব বের করে দেন। আমার হাতের যন্ত্রটি দেখছেন তো? আশা করি এটি ব্যবহার করতে হবে না।
সাথে তো কিছু নেই ভাই। সমীর যন্ত্রটি দেখেছে। অনেক ভয়ানক মেশিন ওটা।
মোবাইল আছে?
আছে। তবে বেশী দামী না। কম দামী। টাকা আছে মাত্র ১৫০ টি।
তারা পকেট হাতরে মোবাইল, টাকা সব বের করে নেয়। কম টাকা থাকাতে তাকে বকাঝাকা করে। এতো কম টাকা নিয়ে কোন বেকুব বাইরে বের হয়! এর পর যদি কম টাকা পয়সা নিয়ে বের হয় তাহলে নাকি তার খবর আছে।
মোবাইলটি খুলে এক পর্যায়ে সিমটা ফেরত দেয়। বলে- তোর সিমটা নিলাম না। নতুনিএকটা সেট কিনে নিস।
ক্যাশ টাকা থেকে সব রেখে ২০ টি টাকা দিয়ে বলে- এটা রাখ । বাস ভাড়া দিস। না জানি বাসা কত দূর। অত দূর কি কষ্ট করে হেঁটে যেতে পারবি? তাই এই ২০টি টাকা রাখ।
তারপর সে বিসিএস পরীক্ষায় ভাল ফল করে। যোগ দেয় একটি কলেজে। নারায়নগঞ্জের আড়াইহাজারের এক মাত্র সরকারী কলেজে তার পোস্টিং হয়। শিক্ষা ক্যাডার পেয়ে সে মহাখুশী। বলে – আমার জন্য শিক্ষা ক্যাডারই ভাল। কারণ দেশের রাজনীতির যা অবস্থা তাতে প্রশাসনে চাকরি করা কঠিন। এখন প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের অবস্থা খুবই খারাপ। ছোট ছোট পুলাপান টিএনও কে থাপর মারে। উপজেলায় প্রশাসনের চাকরির চেয়ে আমার মাস্টারীরর চাকরি অনেক ভাল।
আমি বললাম- ছাত্ররা তো এখন মাস্টারদেরকেও মারে। তাহলে মাস্টারীর চাকরি ভাল হল কি করে?
না, সব কিছুর পরও মাস্টারীর চাকরিই আমার কাছে ভাল। বিসিএস পরীক্ষা পাস করে সমীর শেষ পর্যন্ত আজীবনের জন্য মাস্টার হয়ে গেল ।
তারপর আবার চলতে থাকে তার লেখালেখি। আমি পেটের দায়ে দেশ ছাড়ি। যোগাযোগ আগের মতো হয় না। কারণ দেশ থেকে কে টাকা খরচ করে কে কাকে কল দেয়? তবু আমার ব্যক্তিগত কারণেই তার সাথে যোগাযোগ হয়। অনেক লেখা বের হয় পত্রিকায়। আমি জানতেও পারি না। বিদেশ বিভূইয়ে বাংলা বই কোথায় পাব যে কিনে পড়ব?
সম্প্রতি তার মোবাইল নম্বর হয়েছে ২টি। আমি বললাম- ২টি নম্বর এক সাথে রাখার কি দরকার?
: একটা দিয়ে কথা বলব আর অন্যটা দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করব।
তার আবার মেইল ঠিকানাও ২ টি। তাই মেইল করলে তার ২ টি ঠিকানায়ই পাঠাতে হয়।
মাঝে মাঝে সে মেইল করে। তবে সব চেয়ে বড় যে কাজটা করে তা হল তার বইয়ের পান্ডুলিপি আমাকে মেইল করে দেয়। ফলে তার লেখা প্রকাশিত হবার আগেই আমার পড়া শেষ।
কিছু দিন আগে আমার লেখক বন্ধুটি আড়াই হাজার কলেজ থেকে পাবনা শহীদ বুলবুল কলেজে বদলী হয়ে গেছে। তার আবার একটি প্রমোশনও হয়েছে। এখন থেকে সে আর প্রভাষক (প্রকৃষ্ট রূপে ভাষণ দেয় যে) নয়। তাকে এখন থেকে বলতে হবে সহকারী অধ্যাপক। এখন থেকে সে পাবনায়ই নাকি থাকবে। আমাকে বলেছে এখন থেকে নিয়মিত মেইল চেক করবে। কোন নতুন লেখা লিখলে সাথে সাথেই আমাকে মেইল করে দেবে।
আমি তাকে বলেছি- দোস্ত, তুই ব্লগে আয়। তাতে সবাই তোর লেখা পড়তে পারবে।
সে বলল: দেখি। আমি আসলে ইন্টারনেট অত বুঝি না। তবে দেখি চেষ্টা করে।
সমীর আহমেদ আমার এক জন লেখক বন্ধু। লেখক মানুষের বন্ধু হতে পারাও একটা ভাগ্যের ব্যাপার। তাই আমি অনেক ভাগ্যবান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা বইয়ে দেখলাম তার এক বন্ধুর সাথে তার ছবি। বইটা আবার তাকেই উৎসর্গ করা। কবিগুরুর বন্ধুটির নাম ছিল শ্রীযুক্ত প্রিয়নাথ সেন। বইটির নাম গোড়ায় গলদ। হাস্যরস সমৃদ্ধ বইটি আমি অনেক বার পড়েছি। রবীন্দ্রনাথের বন্ধু নিশ্চয়ই অনেক ভাগ্যবান ছিলেন। তবে আমি হয়তো অত ভাগ্যবান নই।
আমি অপেক্ষায় আছি কোন একদিন হয়তো সমীর তার কোন একটা বই আমাকে উৎসর্গ করবে। ছাপার অক্ষরে বইয়ের পাতায় আমার নিজের নাম দেখার শখ আমার অনেক দিনের। না জানি কেমন লাগে নিজের নাম দেখতে। ব্যাপারটা মনে হয় অনেক শরমের ব্যাপার।
সমীর আহমেদ ,
সহকারী অধ্যাপক,
ব্যবস্থাপনা বিভাগ,
শহীদ বুলবুল কলেজ,
পাবনা
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ সকাল ১০:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



