চলছে....
আম্মার মন খারাপ, তাই কিছুদিন আম্মার বাসায় থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।
পরীক্ষার রেজাল্ট দিলো, পাশ করলাম। যেনো হাপ ছেড়ে বাঁচলাম। আমার ধারণা ছিলো এইচ, এস, সি পাশ করে গেলে বাকি টুকু হয়ে যাবে আর ঠেকাতে পারবে না কেউ। তাই খুব ভয় করতো যদি পড়াশোনাটা বন্ধ হয়ে যায়।
এবার আসলো ভর্তির চিন্তা।
চারুকলায় ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা আমার বিয়ের আগে থেকেই ছিলো। তখন এস এস সি পাশ করেই চারুকলায় ভর্তি হওয়া যেতো, অনেক জোর করেছিলাম ভর্তি হওয়ার জন্য এস এস সি পর কিন্তু আম্মা দিলো না ভর্তি হতে, আম্মার ইচ্ছা ছিলো ডাঃ বানাবে মেয়েকে। বাংলাদেশে চান্স না পেলে রাশিয়া পাঠাবে, আব্বা তখন কমিউনিস্ট পার্টি করতো সেই সুত্রে রাশিয়া পাঠানো নিশ্চিত। এইচ,এস,এস পাশ করলেই পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু সে সুযোগতো আম্মা পেলোই না। ফাঁকি দিলাম আম্মাকে, বিয়ে হয়ে গেলো। আম্মার স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। কিন্তু আমার স্বপ্নটা রয়ে গেলো।
চারুকলায় ভর্তি হবো জেদ ধরলাম কারোই তেমন মত ছিলো না, বাবু ছোট সবাই খুব রাগ করলো আমার উপর।
খুব মেনে নিতে পারি আমি সেটা ঠিক, খুব একটা জেদও করি না কোন কিছু নিয়ে কিন্তু চারুকলা ভর্তি নিয়ে কিছুটা জেদই করলাম । চারুকলায় ভর্তি হবার জন্য সবাইকে বোঝাবার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলাম, একেবারে হাল ছাড়লাম না শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত।
মাঝে মাঝে নিজেকে ভয় পাই আমি, ভয় পাই আমার আশক্তিকে, ভয় পাই আমার প্রচন্ড চাওয়াকে, আমার অধরা ভাবনাকে!
চারুকলার প্রতি আমি আসক্ত ছিলাম, ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার ঝোক ছিলো, খারাপ আঁকতাম না।
স্কুলে সবার প্র্যাকটিক্যাল খাতায় আমি ছবি এঁকে দিতাম, এমন কি বান্ধবীর বড় বোন টিচার্স ট্রেনিং কলেজের টিচার ছিলো তাঁর ইচ্ছায় টিচার্স ট্রেনিং কলেজের জন্য পোস্টার সাইজের ১০টা ছবিও এঁকে দিয়েছিলাম জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন কিছুর। রাতে দরজা বন্ধ করে চুপি চুপি আঁকতাম দেখলে আম্মা বকা দেবে তাই।
আমার স্বপ্ন পূরণ করতে প্রানপণ চেষ্টা চালিয়ে গেলাম অনেক রকমের শর্তে রানা রাজি হলো, রানা বললো পড়াশোনা করলেও বাসার কাজ রান্না সবই করতে হবে, আমি তাতেই রাজি হলাম। পড়াশোনা আমার করতেই হবে।
শেষ পর্যন্ত চারুকলায় কোচিং শুরু করলাম ভর্তির আগে ২০দিনের একটা কোচিং হয় শুধু ধারণা দেওয়ার জন্য।
ভর্তি পরীক্ষা দিলাম, ৬০০ পরীক্ষা দিয়েছে ৫০জন নিবে, ভয় করছে যদি না হয়। যেদিন রেজাল্ট দিবে সেদিন ভোর বেলা থেকে চারুকলায় যেয়ে বসে থাকলাম, এরই মধ্যে দু’একজন বন্ধু বান্ধবী হয়েছে, একটু পরে অনেকেই আসলো ওদের সাথে বসে থাকলাম একটু একটু গল্পও করছি।
রেজাল্ট টাঙালো সেই বিকাল বেলায় সারাদিন খাওয়া হয়নি, টাঙ্গানো লিস্টে, মনে ভয় নিয়ে নিজের রোল নং খুঁজতে থাকলাম নিচ থেকে খোঁজা শুরু করলাম পাচ্ছি না শেষ পর্যন্ত পেলাম, খুব খুশি হলাম।
সাথে সাথে Ÿাসায় গেলাম আব্বাকে খবর দিলাম। আব্বা খুশি হলো আর কেউ ছিলো না খুশি হওয়ার মত।
ভর্তি হলাম চারুকলায়।
মনে হয় হলো হাপ ছেড়ে বাঁচলাম, তাহলে শেষ পর্যন্ত পড়াটা ছাড়তে হলো না ভর্তি যখন হয়েছি পাশও নিশ্চয় করবো।
কেনো যেন খুব লজ্জা লাগতো আমি বিবাহিত এই কথাটা সবাইকে বলতে, কারো বিয়ে হয় নাই, এত ছোট বেলায় আমার বিয়ে হয়েছে হয়তো বললে সবাই হাসবে এই ভেবে কাউকে বললাম না কথাটা, যখন জানার তখন জানবে।
ক্লাস করে সোজা বাসায় চলে যেতাম, বাড়তি সময় কখোনোই থাকতাম না এমনিতেই বাবু ছোট তখনও ব্রেস্ট ফিডিং করে,
তারপর আবার দেরি হলে রানা বকা দিবে শর্ত অনুযায়ী।
বন্ধু বান্ধব সবসময় বলতো একটু থাকলে কি হয় তুই কেনো বাসায় যাওয়ার জন্য এমন তাড়াহুড়া করিস?
কি উত্তর দিবো বলতাম দেরি হলে বাসায় বকবে।
রানার বাসা ইন্দিরা রোড,ওখান থেকে তখন চারুকলার ভাড়া ছিলো ১০টাকা, রানা গুনে ২০টাকা দিতো আমার হাতে যাওয়া আসার জন্য। মনের ভিতর খুব কষ্ট হলেও কিছু বলতাম না, কারণ আমি যে পড়াশোনা করতে পারছি এই আমার পরম পাওয়া মনে হয়েছিলো।
রিক্শা মাঝে মাঝে ১০টাকায় আসতে চাইতো না, তখন অনেকক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে হতো তাতে বাসায় ফিরতে একটু দেরি হতো, সেটা রানা কখোনো বিশ্বাস করেনি তার ধারণা ছিলো আমি আড্ডা মারি সেজন্যও আমাকে বকা খেতে হতো।
আস্তে আস্তে কেমন যেন বাসার সবাইকে আরও বেশি ভয় পেতে শুরু করলাম, যে আমি একদিন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ ভেবেছিলাম সেই আমি কেমন যেনো সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকলাম।
কেমন যেনো একা একা লাগতে শুরু করলো। সেইতো ভাবনার শুরু এলোমেলো ভাবনা। কি হচ্ছে আর কি হতে পারতো অথবা কি হবে! এতো ভেবোও কূল কিনারা পাইনি। জীবনের গতিতে চললো ঘটণা প্রবাহ। যেমনি একদিন বুঝেছিলাম যা হবার তাই হয়েছে তেমনি আজও জানি যা হবার তাই হবে!
তবু কেনো ভাবি? কেনো? কেউ জানে না এই অজানা উত্তর।
চারুকলায় বন্ধু বান্ধব ছিলো অনেক তবে দুজন একটু বেশী ক্লোজ ছিলো, একজন নাসরিন অন্যজন কাওসার, তিনজন বেশিরভাগ সময় একসাথে থাকতাম।
কেনো যেনো হঠাৎ একদিন আমার মনে হলো আমি যে বিবাহিত কথাটা কাওসারকে জানানো উচিৎ। না জানালে কখন কি হবে, ছেলেটার মনেওতো কিছু আসতে পারে, দরকার কি? অযথা ঝামেলা বাড়ানোর। আর ক্লোজ বান্ধবীকে না বলেও কেমন অস্বস্তি লাগছে, সব মিলিয়ে ভাবলাম বলবো ওদের দুজনকে।
নাসরিন আর কাওসারকে বলে ফেললাম বিষয়টা, নাসরিনতো বিশ্বাসই করে না, প্রথমে ভেবেছে মিথ্যা বলেছি। আর কাওসাার অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো, কিছু বললো না।
কাওসারকে বললাম কি হলো চুপ করে আছো কেনো?
ও বলেছিলো জানি না কথা খুঁজে পাচ্ছি না।
চলবে.....

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



