২০০৬ সালের ফেব্রুয়রী মাসে OECD (The Organization for Economic Cooperation and Development) এর সদস্য দেশগুলো মানব স্বাস্থ সুরক্ষায় জেনেটিক আবিষ্কারকে অণুমদন করেছে। কিন্তু তার পূর্বের সময়েও কিন্তু বায়োটেকনোলোজি থেমে ছিল না। তখনও বিভিন্ন কারণে হাইব্রিডাইজেশন বা সংকরায়ন করা হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে সংকরায়ন প্রায়ই ঘটে থাকে, কিন্তু এটি খুব ধীর প্রক্রিয়া; যা আমরা খুব সহজেই করে থাকি রিকম্বিনেন্ট উঘঅ টেকনোলোজির মাধ্যমে। এই কারণে কিছু কিছু পরিবেশবাদী বায়োটেকনোলোজির বিপক্ষে কথা বলেন। তাদের ধারণা এর ফলে পরিবেশের স্বকীয়তা নষ্ট হবে এবং পরিবেশ বিপর্যয় ঘটতে পারে। কিন্তু আসলেই কি তাই? পৃথিবী যেভাবে চলছে এভাবে চলতে থাকলে, রেডিয়েশনে এক সময় কিছু প্রজাতি বিলুপ্ত হবে, কিছু তাদের স্বকীয়তা হারাবে আর অল্প কিছু প্রজাতি টিকে যাবে। ফলাফল; খাদ্যসৃঙ্খলে ভাঙ্গন এবং আবারও কিছু প্রজাতির বিলুপ্তি। এভাবে পৃথিবী আবারও একটি মহা গণবিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাবে। পৃথিবীর পূর্ববতী পাঁচটি মহা গণবিলুপ্তির সময় কালকে পরিসংখ্যানের আলোয় ফেললে দেখা যায় পৃথিবীর আরও একটি মহা গণবিলুপ্তির সময় হয়ে আসছে। প্রায় ১০০ মিলিয়ন বছর পর পর মহা গণবিলুপ্তি ঘটেছে। আর সর্বশেষ মহা গণবিলুপ্তি হয়েছে আজ থেকে প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে।
নাম ও মহা গণবিলুপ্তির সময় - প্রজাতি বিলুপ্তির পরিমাণ - কারণ
১. প্রিকম্বিয়ান (৫৪৪ মিলিয়ন বছর) - ৭৯% (অধিকাংশ সামুদ্রিক অণুজীব) - অত্যধিক তুষারপাত
২. অরডোভিসিয়ান (৪৪০ মিলিয়ন বছর) - প্রায় ১০০ টি পরিবার - কারন অজানা
৩. ডেভোনিয়ান (৩৬০ মিলিয়ন বছর) - ৭০% প্রজাতি (অধিকাংশ সামুদ্রিক) - উল্কাপাত, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি
৪. পারমিয়ান ট্রায়াসিক (২৪৮ মিলিয়ন বছর) - ৯০-৯৫% প্রজাতি - গ্রহানুর আঘাত বা আগ্নেয়গিরি
৫. ক্রিট্যাসিয়াস টার্টিয়ারি (৬৫ মিলিয়ন বছর) - ৮৫ % প্রজাতি - গ্রহানুর আঘাত
যদি ষষ্ঠ মহাগণ বিলুপ্তি হয়, তবে এর কারণ হিসাবে যে সমস্ত সমস্যা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় তা হল -
১. খাদ্য সংকট
২. জ্বালানী সংকট
৩. সংক্রামক রোগ
৪. দূষণ ও পরিবেশ বিপর্যয়।
# বর্তমান পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদন ও চাহিদা হিসাব করলে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় ভবিষ্যৎ পৃথিবীর প্রধান সমস্যা হবে খাদ্য সংকট। কারণ যেভাবে পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ঠিক একইভাবে কমে যাচ্ছে আবাদি জমির পরিমান। এখন যদি মানুষের খাদ্যের চাহিদা ও উৎপাদনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় তবে দেখা যাবে খাদ্য সংকট প্রতিনিয়ত বাড়ছে। খাতা কলমে খাদ্য সংকটের যে চিত্রই আসুক না কেন, বাস্তবে তা খুবই কম। তার একমাত্র কারণ বায়োটেকনোলোজি। হাইব্রিডাইজেশন, প্লান্ট ব্রিডিং, পোলেন কালচার কিংবা এগ্রিকালচার যাই বলি না কেন তা বর্তমানে প্লান্ট বায়োটেকনোলোজির শাখা মাত্র। আবার এনিম্যাল হাজবেন্ড্রি, পোল্ট্রি ফার্মিং এগুলোও বিজ্ঞানের কোন মৌলিক শাখা নয়। এগুলোকে অতীতে বায়োলোজির ফলিত শাখা হিসাবে গননা করলেও বর্তমানে বায়োটেকনোলোজির বাইরে এদের ভাবাই যায় না। বর্তমানে বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় বায়োটেকনোলোজি ছড়িয়ে পড়েছে! ভবিষ্যৎ পৃথিবীর খাদ্য সংকট নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন; তা প্রকট হবে না কখনও। এর আভাস এখনই পাওয়া যায়। খাদ্য সংকট নিরসনে বায়োটেকনোলোজি কী করতে পারে তার উদাহরণে অনেকগুলো গল্প বলে দেয়া যায়। আর যদি এভাবে বাড়িয়ে বলি যে গ্রামীণী ফ্যামিলি একসময় তিনবার ফসল দেবে! মানে কৃষক একবার ধান চাষ করে তিনবার ফসল ঘরে তুলবে তবে ব্যাপারটা এখন হাস্যকর মনে হতে পারে; কিন্তু ভবিষ্যতে যে এমনটা ঘটবে না তা কেউই বলতে পারে না। কারণ আমরা যে বায়োটেকনোলোজিস্ট।
# বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের যে মজুদ আছে তাতে একটা প্রজন্মই ঠিকমত চলবে না। এই একই চিত্র পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে। খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের মজুদ। তাহলে চাহিদা মেটানোর জন্য কি এরপর বৃক্ষনিধন করে জ্বালানীর ব্যাবস্থা করা হবে? তাই যদি হয় তবে পৃথিবী মঙ্গলের মত লাল না হলেও বিরাণ হয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। সৌর বিদ্যুৎ ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জ্বালানী চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে পারবেনা; আর যদি ইউরোনিয়ামকে জ্বালানী হিসাবে ব্যাবহার করা হয় তবে আরও কিছু দিন পর তেজস্ক্রিয় বর্জ্যরে পরিমাণ এতটাই বৃদ্ধি পাবে যে; এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানির দাম এক গ্রাম ইউরোনিয়ামের চেয়ে বেশি হয়ে যাবে! কিন্তু জ্বালানী সমস্যাকেও বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে এগিয়ে আসছে বায়োটেকনোলোজি। ইতিমধ্যে জৈব জ্বালানী নিয়ে গবেষনায় ব্যাপক সফলতা এসেছে। উদাহরনে বলা যায় জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাথিয়াম হোমস্-এর নারিকেল তেল থেকে ডিজেল আবিষ্কার, যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী মাইকেল হাস-এর ভোজ্য তেল থেকে বায়োডিজেল তৈরির প্রকৃয়া। এমনকি পয়ঃবর্জ্য থেকে বায়ো ডিজেল আবিষ্কার করে দেখিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা। নিলশন মেটাবোলিক ইঞ্জিনিয়ারিং (যা মূলত জেনেটিক মডিফিকেশন) এর মাধ্যমে জ্বালানী তেল ও প্রয়োজনিয় রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরনের প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি এর কাঁচামাল হিসাবে গ্লুকোজ ব্যবহার করেন। সুতরাং বোঝাই যায় বিভিন্ন দেশে জৈব জ্বালানী ও বায়ো ডিজেল নিয়ে ব্যাপক গবেষনা হচ্ছে। আমরা জানি, সেই দিন খুব বেশি দূরে নেই যখন বাণিজ্যিক ভাবে জৈব জ্বালানীর উৎপাদন হবে।
# বর্তমানে পৃথিবীতে AIDS , বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু ইত্যাদি নতুন নতুন অসুখ দেখা দিচ্ছে। এর জন্য দায়ী বলা যেতে পারে দূষণ, ঘনবসতি সর্বোপরী পরিবেশ বিপর্যয়। কিন্তু এই সমস্ত অসুখ আবির্ভাবের সাথে সাথে ইমিউনোজেনেটিক্স ও ফার্মাসিটিক্যাল বায়োটেকনোলোজি তা প্রতিরোধ করতে উঠে পড়ে লাগছে। বায়োটেকনোলোজি ও রিকম্বিনেন্ট DNA টেকনোলোজির জন্য চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সাধন সম্ভব হয়েছে। বায়োটেকনোলোজি ও রিকম্বিনেন্ট DNA টেকনোলোজির প্রথম বাণিজ্যিক প্রডাক্ট ইনসুলিন হচ্ছে ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার। এরপর থেকে চিকিৎসা ক্ষেত্রে বায়োটেকনোলোজির আবিষ্কার বাড়তেই আছে। ত্বকের ক্যান্সার প্রতিরোধে MIR-24 নামক প্রোটিন ছাড়াও স্টেম সেল গবেষণায় অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে বায়োটেকনোলোজির কারণে। ট্রিহিন ও মির্কেল ২০০৪ সালে মাইক্রোইঞ্জেক্শন, ইলেকট্রোপোরেশন, ভাইরাল বা নন ভাইরাল ভেক্টর চিকিৎসার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন; যা ২০০৭ সালে সাকুরাই তার আরও উন্নতি সাধন করেন এবং আনঅন্টেড ইমিউনো রেসপন্স প্রতিরোধ করার কথা বলেন। বিভিন্ন হরমোন আবিষ্কার করে বায়োটেকনোলোজি এখন মানুষকে চির তরুণ থাকার স্বপ্ন দেখায়। বায়োমার্কার আবিষ্কার সম্ভব হলে রোগ নির্ণয় যেমন অব্যর্থ হবে ঠিক তেমনি বায়োমেডিসিন হবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী আবিষ্কার। ফার্মাকোজেনেটিক্স বর্তমানে গতানুগতিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ধারণাকেই পাল্টে দিতে চলেছে। বর্তমানে প্লান্ট বায়োটেকনোলোজির মাধ্যমে বিভিন্ন ফলের মাঝে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল দেয়া হচ্ছে যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেবে। এমনও হতে পারে কোন একটা ফল একটা নির্দিষ্ট রোগের ঔষধ হিসাবে কাজ করবে!
# বর্তমানে যে পরিবেশ নিয়ে এতো উদ্বেগ আর হাহাকার বায়োটেকনোলোজির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে তা হয়ে উঠতে পারে আরও নিরাপদ আর নির্মল। আমাদের পরিবেশ সবচেয়ে বেশি দূষিত হয় রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা। এসব পদার্থের পরিবেশবান্ধব বিকল্প বায়োটেকনোলোজির মাধ্যমে বিশেষভাবে উৎপন্ন করা যায়। যেমন ব্লিচিং পাউডার বা ফসফেট ডিটারজেন্টের বিকল্প হতে পারে বায়োব্লিচিং বা এনজাইমযুক্ত ডিটারজেন্ট। কিছু কিছু উন্নত দেশে এর ব্যবহার ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্বে বেশির ভাগ শিল্প কারখানাই তাদের বর্জ্যপদার্থ নিষ্কাশনে রাসায়নিক পদ্ধতি ব্যবহার করে অথবা পরিবেশে সরাসরি ফেলে দেয়। এর পুরো ব্যবস্থাটিই ঝুঁকিপূর্ণ এবং পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকর। বায়োটেকনোলোজিস্টরা নিরাপদ এবং লাভজনক উপায়ে এসব বর্জ্যপদার্থ নিষ্কাশনের পদ্ধতি আবিষ্কার করছেন। বর্তমানে বায়োটেকনোলোজির মাধ্যমে আধুনিক সার কারখানাগুলো তাদের বর্জ্যপদার্থ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে মাটিতে পরিণত করছে। ক্ষতিকর ভারী ধাতু, এসিড, পেট্রোলিয়াম বর্জ্য এবং ক্লোরিনযুক্ত যৌগ দ্বারা দূষিত এলাকাকে দূষনমুক্ত করা সম্ভব। আর পুরো ব্যাপারটি সম্ভব ব্যাক্টেরিয়া আর কিছু বিশেষ ধরনের ছত্রাক ব্যবহারের মাধ্যমে। কিছু উদ্ভিদ আছে যারা মাটি থেকে বিষাক্ত পদার্থ যেমন মার্কারি, সীসা, আর্সেনিক ইত্যাদি শোষণ করে। বিজ্ঞানিরা আশাবাদী যে, এই সমস্ত উদ্ভিদ ব্যবহার করে রাসায়নিক বর্জ্য পদার্থও নিষ্কাশন সম্ভব। বায়োটেকনোলোজির মাধ্যমে উৎপন্ন উদ্ভিদ বিভিন্ন পরিবেশে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে সম্ভব হবে। ফলে লবণাক্ত বা মরু পরিবেশেও বনায়ন সম্ভব হবে, যা পরিবেশ রক্ষা করবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০১০ রাত ১০:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


