হাজার মাইল দূরে এসেও আমরা আমাদের ভেতরের পূর্বের খারাপ স্বভাবের তেমন পরিবর্তন করতে পারছি না। ২০০১ সালে একটি দলের অন্যতম একজন শীর্ষ নেতা মিশিগানের একটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে এসে অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন। বিক্ষোভ মিছিল, কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয় প্রতিষ্ঠানের সামনেই। তবে আশপাশে টহলরত দীর্ঘদেহী কালো আমেরিকান পুলিশের ভয়ে মিছিলকারীরা দেশীয় স্টাইলে হামলা চালানোর সাহস পায়নি। বিভিন্ন নামে-বেনামে সভা সেমিনার করে দেশের ভিতরকার একান্তই নিজস্ব সমস্যাকে এর আন্তর্জাতিক রূপ দিয়ে ‘বিশ্ব মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ নামে আখ্যায়িত করে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ভিন্ন দেশের কংগ্রেসম্যানদের সামনে বিকৃতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে অহরহ। দলের একান্ত অনুগত প্রমাণ করতে গিয়ে নিজেদের আত্ন-মর্যাদাবোধ ভুলে যাই, স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে জন্মগ্রহণ করেও পরাধীন মনোভাবের আবর্তে নিজেদের জড়িয়ে ফেলি।
বড় দুটি প্রধান দলেরই নিজস্ব নামে বিদেশসমূহে শাখা রয়েছে। এসবের অস্তিত্বের আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কি না তা প্রশ্নসাপেক্ষ হলেও কোনটিতেই আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা হয়না, নিয়মিত কাউন্সিলও হয়না। যদিও মাঝে মাধ্যে করার চেষ্টা করা হয়, তাও পূর্ব থেকেই নেতৃবৃন্দের নিরাপত্তার জন্য দেশের মতই পুলিশ প্রস্তুত রাখতে হয়, নিজ দলীয় ক্ষুদ্ধ কর্মীদের হাত থেকে বাঁচাতে।
স্থানীয় পুলিশ এসবের মর্ম বুঝতে পারে না। অনিচ্ছাসত্বেও কাউকে তৃতীয় বিশ্বের, বিশেষ করে বাংলাদেশের, বিভেদের রাজনীতি বুঝাতে হয়। এভাবে দেশের মান-সম্মান জলাঞ্জলি দিই বিদেশের মাটিতেও। স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার সুযোগ থাকা সত্বেও নিজেদেরকে সম্পৃক্ত না করে, প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট বা কমিউনিটির উন্নয়নের প্রতি অধিকতর মনোযোগ না দিয়ে আত্মবিভেদ-বিসম্বাদে জড়িয়ে পড়ি। একে অপরকে ভালবাসার বা কাছে টানার পরিবর্তে হিংসা-বিদ্বেষের বিষ-বাষ্প ছড়িয়ে দিই পরবর্তী প্রজন্মের মাঝেও। মজার ব্যাপার হলো, ইসলামী দলসমূহ এক্ষেত্রে অধিকতর নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। লজিস্টিক সাপোর্ট দিলেও প্রবাসে কোন দলের সাথে তাদের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নাই। প্রত্যেক দেশেই ভিন্ন নামে স্ব স্ব দেশের নিয়ম কানুন মেনে সরকারীভাবে নথিভূক্ত হয়েই উক্ত সংগঠনসমূহের কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। দেশের বিভেদের রাজনীতি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে এরা স্থানীয় ধর্মীয় সংগঠনসমূহের সাথে মিলে মিশে কাজ করে চলছে।
সামাজিক সংগঠনসমূহের অবস্থানও তথৈবচ। অসাম্প্রদায়িক ও অরাজনৈতিক শ্লোগান দিয়ে ফোবানা (FOBANA) নামে উত্তর আমেরিকায় একটি ছত্রী-সংগঠন (umbrella organization) এর আত্নপ্রকাশ ঘটে ১৯৮৭ সালে। বহু স্থানীয় সংগঠন উদ্যোক্তাদের মধুর আহ্বানে সাড়াও দেয়। কিন্তু এদের কর্মপরিধি বছরে একটি কনভেনশন আয়োজনের মাধ্যমে ছায়ানট, উদীচী আর চলচিত্র তারকাদের এনে শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বৃত্তে আটকে আছে। সেটিও রাজনৈতিক দূরভিসন্ধির কারণে ভেঙ্গে সর্বমোট তিন খন্ড হল এবছর। মোটামুটি একই নামে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তিনটি গ্রুপই প্রায় একই সময়ে কানসাস, ভার্জিনিয়া ও নিউইয়র্কে কনভেনশন করতে যাচ্ছে এ বছরের লেবার ডে’র লং হলিডেতে।
বৃহত্তর পরিমন্ডলে ঐক্যবদ্ধভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকলেও নিজেদেরকে আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গন্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলেছি। নিউইয়র্কের ‘সন্দ্বীপ সমিতি’, বেগমগঞ্জ সমিতি, ডেট্রয়েটের ‘জালালাবাদ সমিতি’, ‘ছাতক সমিতি’, মন্ট্রিয়েলের ‘মৌলভীবাজার সমিতি’ এরকম অসংখ্য ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর সমিতির নামে একই দেশের একই ভাষাভাষী মানুষজন বিভাজিত হয়ে আছে যা অন্যান্য দেশসমূহের প্রবাসী জনগোষ্ঠী থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। দেশের পলাতক, ফেরারী আসামী, স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের গোষ্ঠীগত দলীয় হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্য এসবে ইন্ধন যোগান দিয়ে আসছে।
কিছুদিন আগে প্রবাসীদের ভোটাধিকার সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের বৈপ্লবিক ঘোষণায় ওই একই গ্রুপটি নড়ে চড়ে বসেছিল। কারণ, জ্বাজ্বল্যমান মিথ্যা প্রমাণ দেখিয়ে দেশের মুখে চুনকাম দিয়ে আসা এ গোষ্ঠির অধিকাংশই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত (পলিটিক্যাল এ্যাসাইলাম) সরকারী ভাতার উপর নির্ভরশীল। এ মহলটির জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্যদের মত হাঁড়ভাঙ্গা খাটুনি করতে হয় না। সরকারী সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করে তারা তাদের পুরনো পেশায় ‘ফুল টাইম’ ব্যস্ত থেকে প্রবাসীদেরকে বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত রাখতে সক্ষম হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের উক্ত পদক্ষেপের ফলে বিভেদ বিভাজনের পথ এ মুহুর্তে আরো সহজ হত নি:সন্দেহে।
মনে হয় পরিচ্ছন্ন চিন্তা, সুস্থ্যধারার গণতন্ত্র ও নিজ দেশের মান সম্মান সবার উপরে তুলে ধরার জন্য সাধারণভাবে আমরা এখনও প্রস্তুত হইনি। বরং প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নির্বাচন কমিশন বিদেশসমূহে দেশীয় রাজনৈতিক দলসমূহের লেজুড়বৃত্তি বন্ধের উদ্যোগকে সরকার আইনের শক্ত কাঠামোতে রূপ দিতে পারে। এতে করে, প্রবাসের মাটিতে দেশের নোংরা রাজনীতির চর্চা বন্ধ হবে। দেশের ভাবমূর্তি যারা উচ্চে তুলে ধরতে চান, তাদের জন্য এটি যে বড় সহায়ক হবে তা অবলীলায় বলা যেতে পারে।
* দৈনিক যায়যায়দিন, নয়াদিগন্ত, যুগান্তর, প্রথম আলোসহ আমেরিকা ও কানাডার কয়েকটি স্থানীয় সাপ্তাহিকী এ লেখাটি প্রকাশ করেছিল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

