somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিভেদ ও লেজুড়বৃত্তির কবলে প্রবাসের রাজনীতি

০৩ রা আগস্ট, ২০০৭ সকাল ৮:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দেশের অসহিষ্ঞু অস্থির রাজনীতির উত্তাপ সুদূর প্রবাসে এসেও আমাদের বিভাজিত করে রেখেছে। প্রিয় দলটির আজ্ঞাবহ হতে গিয়ে আমরা অনেক নীচে নামতে পারি। ১৯৯৯ সালে বুয়েটের একজন প্রাক্তন ছাত্রের রিসার্চ এসিস্টেন্টশিপ বন্ধ করার জন্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে ৬০ জনেরও বেশী বাংলাদেশী ছাত্রের সম্মিলিত স্বাক্ষরযুক্ত একটি দরখাস্ত জমা দেয়া হয়েছিল ইউনিভার্সিটি পুত্র মালয়েশিয়া (UPM) এর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অফিসে। তাঁর অপরাধ(!) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল রিসার্চের পাশাপাশি তিনি তিন সদস্যের পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি ‘পার্ট টাইম’ বা ‘নিয়মবহির্ভূত’ চাকুরী করেন। বেচারার কপাল ভাল, গ্র্যাজুয়েট অফিস দরখাস্তের অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঠিকই আমাদের ভিতরকার অনৈক্য আঁচ করতে পেরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বিলম্ব করেনি; যদিও তা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশী ছাত্রদেরকে ভোগান্তিতে ফেলেছে। উল্লেখ্য, ওই সময় ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষার্থে স্কলারশিপ নিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে বাংলাদেশী ছাত্র যেতেন উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানকার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। জানা গেছে সব বিভাগ মিলে সর্বমোট ছাত্র সংখ্যা পূর্বের এক তৃতীয়াংশও নেই।

হাজার মাইল দূরে এসেও আমরা আমাদের ভেতরের পূর্বের খারাপ স্বভাবের তেমন পরিবর্তন করতে পারছি না। ২০০১ সালে একটি দলের অন্যতম একজন শীর্ষ নেতা মিশিগানের একটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে এসে অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন। বিক্ষোভ মিছিল, কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয় প্রতিষ্ঠানের সামনেই। তবে আশপাশে টহলরত দীর্ঘদেহী কালো আমেরিকান পুলিশের ভয়ে মিছিলকারীরা দেশীয় স্টাইলে হামলা চালানোর সাহস পায়নি। বিভিন্ন নামে-বেনামে সভা সেমিনার করে দেশের ভিতরকার একান্তই নিজস্ব সমস্যাকে এর আন্তর্জাতিক রূপ দিয়ে ‘বিশ্ব মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ নামে আখ্যায়িত করে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ভিন্ন দেশের কংগ্রেসম্যানদের সামনে বিকৃতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে অহরহ। দলের একান্ত অনুগত প্রমাণ করতে গিয়ে নিজেদের আত্ন-মর্যাদাবোধ ভুলে যাই, স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে জন্মগ্রহণ করেও পরাধীন মনোভাবের আবর্তে নিজেদের জড়িয়ে ফেলি।
বড় দুটি প্রধান দলেরই নিজস্ব নামে বিদেশসমূহে শাখা রয়েছে। এসবের অস্তিত্বের আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কি না তা প্রশ্নসাপেক্ষ হলেও কোনটিতেই আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা হয়না, নিয়মিত কাউন্সিলও হয়না। যদিও মাঝে মাধ্যে করার চেষ্টা করা হয়, তাও পূর্ব থেকেই নেতৃবৃন্দের নিরাপত্তার জন্য দেশের মতই পুলিশ প্রস্তুত রাখতে হয়, নিজ দলীয় ক্ষুদ্ধ কর্মীদের হাত থেকে বাঁচাতে।
স্থানীয় পুলিশ এসবের মর্ম বুঝতে পারে না। অনিচ্ছাসত্বেও কাউকে তৃতীয় বিশ্বের, বিশেষ করে বাংলাদেশের, বিভেদের রাজনীতি বুঝাতে হয়। এভাবে দেশের মান-সম্মান জলাঞ্জলি দিই বিদেশের মাটিতেও। স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার সুযোগ থাকা সত্বেও নিজেদেরকে সম্পৃক্ত না করে, প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট বা কমিউনিটির উন্নয়নের প্রতি অধিকতর মনোযোগ না দিয়ে আত্মবিভেদ-বিসম্বাদে জড়িয়ে পড়ি। একে অপরকে ভালবাসার বা কাছে টানার পরিবর্তে হিংসা-বিদ্বেষের বিষ-বাষ্প ছড়িয়ে দিই পরবর্তী প্রজন্মের মাঝেও। মজার ব্যাপার হলো, ইসলামী দলসমূহ এক্ষেত্রে অধিকতর নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। লজিস্টিক সাপোর্ট দিলেও প্রবাসে কোন দলের সাথে তাদের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নাই। প্রত্যেক দেশেই ভিন্ন নামে স্ব স্ব দেশের নিয়ম কানুন মেনে সরকারীভাবে নথিভূক্ত হয়েই উক্ত সংগঠনসমূহের কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। দেশের বিভেদের রাজনীতি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে এরা স্থানীয় ধর্মীয় সংগঠনসমূহের সাথে মিলে মিশে কাজ করে চলছে।
সামাজিক সংগঠনসমূহের অবস্থানও তথৈবচ। অসাম্প্রদায়িক ও অরাজনৈতিক শ্লোগান দিয়ে ফোবানা (FOBANA) নামে উত্তর আমেরিকায় একটি ছত্রী-সংগঠন (umbrella organization) এর আত্নপ্রকাশ ঘটে ১৯৮৭ সালে। বহু স্থানীয় সংগঠন উদ্যোক্তাদের মধুর আহ্বানে সাড়াও দেয়। কিন্তু এদের কর্মপরিধি বছরে একটি কনভেনশন আয়োজনের মাধ্যমে ছায়ানট, উদীচী আর চলচিত্র তারকাদের এনে শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বৃত্তে আটকে আছে। সেটিও রাজনৈতিক দূরভিসন্ধির কারণে ভেঙ্গে সর্বমোট তিন খন্ড হল এবছর। মোটামুটি একই নামে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তিনটি গ্রুপই প্রায় একই সময়ে কানসাস, ভার্জিনিয়া ও নিউইয়র্কে কনভেনশন করতে যাচ্ছে এ বছরের লেবার ডে’র লং হলিডেতে।
বৃহত্তর পরিমন্ডলে ঐক্যবদ্ধভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকলেও নিজেদেরকে আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গন্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলেছি। নিউইয়র্কের ‘সন্দ্বীপ সমিতি’, বেগমগঞ্জ সমিতি, ডেট্রয়েটের ‘জালালাবাদ সমিতি’, ‘ছাতক সমিতি’, মন্ট্রিয়েলের ‘মৌলভীবাজার সমিতি’ এরকম অসংখ্য ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর সমিতির নামে একই দেশের একই ভাষাভাষী মানুষজন বিভাজিত হয়ে আছে যা অন্যান্য দেশসমূহের প্রবাসী জনগোষ্ঠী থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। দেশের পলাতক, ফেরারী আসামী, স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের গোষ্ঠীগত দলীয় হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্য এসবে ইন্ধন যোগান দিয়ে আসছে।
কিছুদিন আগে প্রবাসীদের ভোটাধিকার সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের বৈপ্লবিক ঘোষণায় ওই একই গ্রুপটি নড়ে চড়ে বসেছিল। কারণ, জ্বাজ্বল্যমান মিথ্যা প্রমাণ দেখিয়ে দেশের মুখে চুনকাম দিয়ে আসা এ গোষ্ঠির অধিকাংশই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত (পলিটিক্যাল এ্যাসাইলাম) সরকারী ভাতার উপর নির্ভরশীল। এ মহলটির জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্যদের মত হাঁড়ভাঙ্গা খাটুনি করতে হয় না। সরকারী সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করে তারা তাদের পুরনো পেশায় ‘ফুল টাইম’ ব্যস্ত থেকে প্রবাসীদেরকে বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত রাখতে সক্ষম হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের উক্ত পদক্ষেপের ফলে বিভেদ বিভাজনের পথ এ মুহুর্তে আরো সহজ হত নি:সন্দেহে।
মনে হয় পরিচ্ছন্ন চিন্তা, সুস্থ্যধারার গণতন্ত্র ও নিজ দেশের মান সম্মান সবার উপরে তুলে ধরার জন্য সাধারণভাবে আমরা এখনও প্রস্তুত হইনি। বরং প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নির্বাচন কমিশন বিদেশসমূহে দেশীয় রাজনৈতিক দলসমূহের লেজুড়বৃত্তি বন্ধের উদ্যোগকে সরকার আইনের শক্ত কাঠামোতে রূপ দিতে পারে। এতে করে, প্রবাসের মাটিতে দেশের নোংরা রাজনীতির চর্চা বন্ধ হবে। দেশের ভাবমূর্তি যারা উচ্চে তুলে ধরতে চান, তাদের জন্য এটি যে বড় সহায়ক হবে তা অবলীলায় বলা যেতে পারে।

* দৈনিক যায়যায়দিন, নয়াদিগন্ত, যুগান্তর, প্রথম আলোসহ আমেরিকা ও কানাডার কয়েকটি স্থানীয় সাপ্তাহিকী এ লেখাটি প্রকাশ করেছিল।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে অক্টোবর, ২০০৭ সকাল ৭:৪৯
১২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×