somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাঃ নির্বাচনের পাঁচমিশালি

০৫ ই আগস্ট, ২০০৭ সকাল ৮:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক সময়কার কৃষি প্রধান দেশ আমেরিকায় নভেম্বর মাসটি আসত নবান্ন উৎসবের সময়। সে সময়ের অপেক্ষাকৃত সহনীয় আবহাওয়ার এ মাসটিই কৃষক সমাজ নির্বাচনের জন্য বাইরে বেরুনোকে উপযুক্ত মনে করত। ভোটের জন্য তাদেরকে পায়ে হেঁটে যেতে হত দূর দূরান্তরে। কখনও বা এ দূরত্ব অতিক্রমে একদিনের পুরোটাই লেগে যেত। সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠি রোমান ক্যাথলিক হওয়ায় রবিবারকে রেখে দিতে হত উপসনালয়ে যাবার জন্য। পহেলা নভেম্বর আবার ‘অল সেইন্টস্‌ ডে (All Saints Day)’ ক্যাথলিকদের আরেকটি পবিত্র দিন। গ্রামীণ ব্যবসায়ীদের আবার হালখাতার দিনও ছিল এটি। আইন প্রণেতারা এসব বিবেচনা করেই নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারকে পোলিং স্টেশনে যাওয়ার প্রস্তুতি দিন ধরে তার পরদিন অর্থাৎ মঙ্গলবারকে নির্বাচনের দিন ধার্য করেছেন। ১৮৪৫ সাল থেকে প্রতি চতুর্থ বছরের এইদিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ১৮৭৫ ও ১৯১৪ সাল থেকে যথাক্রমে বিজোড় ও জোড় সালের এই দিনে হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং ৬ বছরে একবার সিনেটরদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। নিজস্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণে অত্যন্ত সতর্ক এ জাতি বর্তমানে প্রচন্ড বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও এ দিনটিকেই আজ পর্যন্ত ধরে রেখেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের দল কনজারভেটিব পার্টিও এরকম একটি দিন খুঁজে বের করার জন্য পার্লামেন্টে প্রস্তাব রেখেছেন।
সাংবিধানিকভাবে কানাডার নিরংকুশ ক্ষমতার অধিকারী বৃটেনের রানী তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে মেয়াদবিহীন গভর্ণর জেনারেল নিয়োগ দিয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশক্রমে। অরাজনৈতিক এই পদটি পালাক্রমে এ্যাংলোফোন (Anglophone; প্রথম ভাষা ইংলিশ) এবং (Francophone; প্রথম ভাষা ফ্রেন্‌চ) সমপ্রদায় থেকে মনোনীত করা হয়। হাইতির পোর্ট অ প্রিন্সে জন্মগ্রহণকারী মিশ্যাল জিয়েন (Michaelle Jean) হলেন বর্তমান ২৭তম গভর্ণর জেনারেল। সাংবাদিক, সিবিসি এবং রেডিও কানাডার এক সময়ের নিউজ ব্রড্‌কাষ্টার মিসেস জিয়েন হলেন তৃতীয় মহিলা, দ্বিতীয় ইমিগ্র্যান্ট এবং প্রথম আফ্রো-ক্যারিবিয়ান গভর্ণর জেনারেল। তিনি তাঁর পূর্বসূরীদের মতো এই বলে শপথ নিয়েছেন, ‘আমি এ মর্মে শপথ করছি যে, আইন অনুযায়ী মহামান্য রানী এলিজাবেথ দ্বিতীয়া, তাঁর বংশ এবং তাঁর উত্তরাধিকার এর প্রতি বিশ্বস্থ এবং একান্ত অনুগত থাকব। সুতরাং ঈশ্বর আমাকে সাহায্যে করুন।‘
তিন ধরনের ভোটার রেজিষ্ট্রেশন প্রথা চালু রয়েছে আমেরিকা ও কানাডায়।
১. মোটর ভোটার রেজিষ্ট্রেশন (Motor Voter Registration): যা ড্রাইভার লাইসেন্স দরখাস্ত বা নবায়নের সময় করা হয়ে থাকে।
২. এজেন্সি বেজ্‌ড ভোটার রেজিষ্ট্রেশন (Agency Based Voter Registration): অক্ষম বা অসামর্থ ব্যক্তিবর্গের জন্য সরকারী ফান্ডে পরিচালিত বিভিন্ন এজেন্সীসমূহ এ ধরনের সেবামূলক কাজ করে থাকে।
৩. মেইল-ইন-রেজিষ্ট্রেশন (Mail-In-Registration): প্রভিনশিয়াল বা ফেডারেল ইলেকশন কমিশন সমূহের নির্ধারিত ফরম পূরণ করে পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে নিবন্ধিকরণের ব্যবস্থা।
আইডেন্টি কার্ড বা ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং চাকরি-বাকরি, বাড়ী-গাড়ী, ব্যাংক ইত্যাদিতে লেনদেনের জন্য আরেকটি সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড বা সোশ্যাল ইন্সুরেন্স নাম্বার (SSN, SIN) সবার জন্য বাধ্যতামূলক। এসব কার্ডসমূহে প্রদেয় বারকোডের সাহায্যে কোন ব্যক্তির দৈনন্দিন কর্মপ্রণালী ট্র্যাক করা যায়। ভোট প্রদানের জন্য তাই নির্বাচন কমিশন আলাদা কার্ড ইস্যু করার প্রয়োজন মনে করে না। ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ বা ভোটের গুরুত্ব নাগরিকদের বুঝানোর জন্য সরকার খুব চেষ্টা করে। বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য উদাহরণ টেনে এনে বলা হয় মাত্র এক ভোটের জন্য এসব বিশিষ্ট ব্যক্তি জিতেছেন বা হেরেছেন। যেমন ১৯৯৭ সালে ভারমন্ট স্টেটের প্রতিনিধি সিডনি নিক্সন প্রতিদ্বন্দ্বী রবার্ট এডমন্ডের চেয়ে মাত্র ১ ভোট বেশী পেয়ে প্রথমে আসন দখল করলেও পরে ভোট পুন:গণনায় তাকে হারাতে হয়েছিল ওই এক ভোটেরই জন্য। এমনি করে অন্তত আরও তিনটি ভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করা হয়। তবুও আমাদের দেশের মত জমে না। সেন্টারসমূহের আশপাশে বেঞ্চ পেতে প্রার্থীদের নাম ও ছবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড ধরে শুস্ক মুখে সঙ্গীন এজেন্টদেরকে অপেক্ষা করতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা। কি লড়াইটা না হলো ২০০৪ সালের বুশ-কেরীর রিপাবলিকান আর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে। ভোট টার্ন আউট ষাট পার্সেন্টও ছুতে পারেনি। কানাডিয়ানদের অবস্থা কাজিন আমেরিকানদের চেয়ে একটু ভাল। গত বছরে পল মার্টিন আর স্টিফেন হারপারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে টার্ণ আউট পঁয়ষট্টি শতাংশ ছুই ছুই করেছিল যা আমাদের দেশের গত নির্বাচনের চেয়ে দশ শতাংশ কম। আর কানাডার ইতিহাসে এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। ধারণা করা হয়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইমিগ্র্যান্ট এবং ইউনাইটেড রিলেশন ফ্রন্ট এক সময়ের বিশ্বস্ত বন্ধু লিবারেল প্রধানমন্ত্রী পল মার্টিনকে ঠেকানোর জন্য মাঠে নেমেছিল বিয়ের সনাতনী সংগার পরিবর্তন ও সমকামী অধিকার রক্ষা আন্দোলনে নিজকে সম্পৃক্ত করার জন্য। নিজেকে প্র্যাকটিসিং খ্রিষ্টান দাবী করেও মিঃ মার্টিনকে মাশুল দিতে হয়েছিল দলের ভরাডুবি ও দলীয় প্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দানের মধ্য দিয়ে। প্রার্থীরা গীর্জা, সিনেগগসমুহকে নির্বাচনী প্রচারনার সবচেয়ে পছন্দীয় স্থান হিসেবে বেছে নেন। শনি, রবিবারের ছোট ছোট জমায়েত মিডিয়ার সুবাদে তারা তাদের অভিপ্রায়, প্রতিজ্ঞা ও পলিসি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাঝে পৌছে দেন। মুসলমানদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রার্থীদেরকে শুক্রবারের জুমআর নামাজে সামনের কাতারে বসে খুৎবা শুনতে এমনকি কাউকে নামাজের জন্য কাতারবন্দী হতেও দেখা যায়। বিভিন্নভাবে প্রমাণ দেয়ার চেষ্টা করেন তারাও কোন না কোনভাবে এদেশে ইমিগ্র্যান্ট, হোক না তা দু’একশো বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ কিংবা আফ্রিকা থেকে পূর্ব পুরুষদের দেশান্তরের মাধ্যমে। কেউ কেউ নিজেদেরকে ইব্রাহিমের ধর্ম (Religion of Abraham) বা এক ঈশ্বরের অনুসারী ঘোষণা দিয়ে সব বিশ্বাসীদের ঐক্যবদ্ধ ভোট প্রার্থনা বা দাবী করেন।
রাজনীতি এবং ভোট দুটোতেই উত্তর আমেরিকার ছাত্র/ছাত্রীদের প্রচন্ড অনীহা। রাজনীতির এসব উটকো ঝামেলা বাদ দিয়ে অধিকাংশই জৌলুস জীবন এবং বড়জোড় মানবাধিকার ইস্যু নিয়েই ভাবতে বেশী পছন্দ করে। নগন্য সংখ্যক (তাও শুধুমাত্র ল’ বিভাগের) ছাত্র-ছাত্রীরা রাজনীতিকে পেশা হিসেবে ধরে ক্যারিয়ার ডেভলপের জন্য অগ্রসর হয়। আফগানিস্তান দখলের সময় আমেরিকান ছাত্রদের মধ্যে একটা জরিপ চালানো হয়েছিল শক্র এদেশটির ভৌগোলিক অবস্থান জানার জন্য। শতকরা ষাট ভাগই সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। জবাবের মোটামুটি ধারনা ছিল, মহাশক্তিধর আফগানিস্তান নামক এদেশটি তাদের আশপাশের কোন প্রতিবেশী রাষ্ট্র হবে!

*লেখাটি দৈনিক নয়াদিগন্তে প্রকাশিত হয়েছে।
ক্লিক করুন
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে অক্টোবর, ২০০৭ সকাল ৭:৫১
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×