প্রথম মুসলিম ইমিগ্রেন্টদের মধ্যে টিনএজার আলী আবুছাদির গল্প কানাডার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্থান করে আছে। আলেক্সান্ডার হ্যামিলটন নামে সমধিক পরিচিত লেবানিজ এই যুবক সোনার খনি পাওয়ার আশায় লালা থেকে বৈরুত পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে মন্ট্রিয়েলের বোটে বোর্ড হয়েছিলেন ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে। সোনা তার ভাগ্যে না জুটলেও সফল ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন দ্বার উন্মোচন করেছিলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় একই শতকের প্রথম দশকে অন্টারিও ও কুইবেক এবং পরে আলবার্টা ও সাচকেচুয়ানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। যেখানে গড়ে ওঠে প্রথম মুসলিম বসতি।
এরপর থেকেই পটপরিবর্তনের নতুন দৃশ্যের সূচনা হয়। দক্ষ পেশাজীবী শিক্ষক, টেকনোক্র্যাট, ব্যবসায়ী, কারিগরি শিক্ষায় পারদর্শীদের বিপুল সমাগম ঘটে। ফলে কানাডার অর্থনীতির মূল কাঠামোয় পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলমানরা প্রথমবারের মতো নিজেদেরকে এ দেশের জন্য ‘প্রয়োজনীয়’ হিসেবে প্রমাণ করে তোলে। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫২ সালে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ উন্মোচিত হয় এবং এর এক দশক পরে ইউনিভার্সিটি অফ টরেন্টো বিদেশী মুসলিম ছাত্র ভেড়ানোর নতুন কৌশল হিসেবে মুসলিম স্কলারদের বিভিন্ন দেশ থেকে এনে বিভিন্ন বিভাগে নিয়োগ দেয়া শুরু করে।
কঠোর সংগ্রাম ও সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে নিজেদেরকে ফেলে দিলেও শিকড় ধরে রাখতে চেষ্টায় এক বিন্দুও কার্পণ্য করেনি এই জনগোষ্ঠী। তারই অনবদ্য স্বাক্ষর এডমন্টনের আল-রাশিদ মসজিদ। ১৯৩৮ সালের ১২ ডিসেম্বর উত্তর আমেরিকার প্রথম মসজিদ হিসেবে এটি আত্মপ্রকাশ করে। সিটির ততকালীন মেয়র ও পবিত্র কুরআনের বিখ্যাত ইংরেজি অনুবাদক আল্লামা ইউসুফ আলীর বিরল উপস্থিতি উদ্বোধন অনুষ্ঠানটিকে সত্যিকার অর্থেই ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। মূল অবয়বের খানিকটা পরিবর্তন করে মসজিদটিকে আজ ইসলামি শিল্পের জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে। দেড় শতকেরও বেশি পুরনো ও দ্রুত বিকাশমান কানাডার এই মুসলিম জনগোষ্ঠী দক্ষ, শিক্ষিত ও অতিগুরুত্বপূর্ণ জাতিতে পরিণত হয়েছে। মোট জনসংখ্যার হিসেবে শতকরা দুই ভাগের নিচে থাকলেও গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্বে অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চেয়ে ঈর্ষণীয় পর্যায়ে এগিয়ে রয়েছে। মসজিদের সংখ্যা আজ হাজার ছুঁই ছুঁই; যার সাথে শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশি মুসলমান নিয়মিত/অনিয়মিত পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকেন।
অন্যদিকে মূলধারার রাজনীতিতে যে একেবারে পিছিয়ে আছে তাও কিন্তু নয়। বেশ ক’জন মুসলিম এমপি ও অনেক কাউন্সিল নির্বাচিত হন প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে। এ দেশে মুসলমানদের পক্ষে কথা বলার জন্য অমুসলমানরাও এগিয়ে আসেন নিজ ইচ্ছায়। জাতীয় দৈনিক ও মিডিয়ায় বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলে মুসলমানদের উপস্থিতি খুব সরব না হলেও একেবারে যে নীরব তাও কিন্তু নয়। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৩৯ বছর বয়সী চিত্র নির্মাতা জারকা নওয়াজের রচিত ধারাবাহিক কমেডি সিরিজ ‘লিটল মস্ক অন দি প্রেইরি’ কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন-এর সর্বাধিক জনপ্রিয় কমেডি শোতে পরিণত হয়েছে সব সম্প্রদায়ের মধ্যে।
প্রায় প্রতিটি মসজিদে জুমা’র একাধিক জামাত অনুষ্ঠিত হয়। তবুও লোকে লোকারণ্য! কি পুরুষ, কি মহিলা, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার মহাসমাগম চোখে দেখার মতো! অথচ সপ্তাহের এ দিনটি সাপ্তাহিক ছুটির দিন না হলেও ঠিকই অফিস ম্যানেজ করে মুসলমানরা সরব উপস্থিতির মাধ্যমে জানান দিয়ে যায় তারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এক বিশ্বাসী জাতি।
অধিকাংশ মসজিদেই ইংরেজিতে খুতবা হয় বেশ আধুনিক ঢঙে। আধুনিক ও ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত প্রগতিমনা ব্যক্তিরাই সমকালীন বিভিন্ন বিষয়ে অত্যন্ত গোছালো আলোচনার মাধ্যমে খুতবার অপরিহার্যতা বাড়িয়ে দেন। বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের ইসলামি জাহানে পারদর্শী ব্যক্তিরাই ঘুরে ফিরে খুতবা দিয়ে থাকেন। তবে নও মুসলিম কৃষ্ণাঙ্গরাও এ ক্ষেত্রে খুব একটা পিছিয়ে নেই। তাদের কদাচিত উপস্থিতি ও ভিন্ন ধাঁচের উপস্থাপনা দর্শকদের নজর কাড়ে। এখানে রাজা বা একনায়ক শাসকদের মর্জিমাফিক খুতবা হয় না, উপমহাদেশের মতো বারচাঁদের খুতবা বই থেকে নিরস, একগুয়ে ও অবোধ্য খুতবা পাঠ করা হয় না। মহিলাদের প্রবেশে বিধিনিষেধেরও বালাই নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণীরা এ দেশে এসে ‘নতুন ইসলামের’ সন্ধান পান। বিভিন্ন সময়ে মহিলা ও শিশুদের জন্য আয়োজিত চমতকার ও আকর্ষণীয় প্রোগ্রাম মসজিদের সাথে তাদের সম্পর্ক অত্যাবশ্যকীয় করে তুলেছে। তাই তারা জুমা’র নামাজের ভিন্ন স্বাদ পরিবারসহ হারাতে চান না। কানাডার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইকনা, ইসনা এবং বাংলাদেশীদের মধ্যে এমসিসি’র নিয়মিত ও সহজবোধ্য প্রোগ্রাম তাদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলছে প্রতিনিয়ত।
ইমিগ্র্যান্ট বাবা-মায়েরা স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকলেও এ দেশে জন্মগ্রহণকারী ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে আদৌ তা নেই। উত্তর আমেরিকার ন্যাচার বা কালচার বিশেষ করে ‘স্বাধীন চিন্তা ও কর্ম’ পুরোটাই তারা রপ্ত করে নিয়েছে। যেখানে তাদের পিতৃ-মাতৃভূমিতে অনেকটা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্রতিটি প্রশ্নের তারা বাস্তবভিত্তিক উত্তর চায়। ফলে, পিতা-মাতাদের ‘হোমওয়ার্ক’ প্রস্তুত করতে হয় শিশুদের ধর্মীয় নসিহত করার আগেই। কারণ তারা সূত্র ও উতস জানতে চায়। আর সন্তোষজনক জবাব না পেলে মুখের ওপর কড়া মন্তব্য ছুড়তেও দ্বিধা করে না। সেজন্য কোনো কোনো খতিব এর নাম দিয়েছেন ‘ইসলাম কানাডা’ যাতে কোনো গোঁজা মিল বা ধর্মান্ধতার বালাই নেই। যেখানে সব ‘কেন’ এর যুতসই জবাব রয়েছে। এখানে পিতা-মাতারা নিজেরা ভালো মতো জেনে শুনে বাস্তবভিত্তিক উপায়ে শিশুদের উপদেশ দেন। সেজন্য যুগ যুগ ধরে আসা তাদের খারাপ অভ্যাসগুলোর কাটছাঁট করতেও কম কসুর করেন না তারা। এ মুহূর্তে এক পাকিস্তানি ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে যায়। স্বাধীন-পূর্ব বাংলাদেশে হাইকোর্টের সামনের কলোনিতে থাকতেন তিনি তার বাবা-মার সাথে। ইলিশ মাছের স্বাদ ও সাম্পানওয়ালার গান আমাকে দেখে মনে হলো নতুন করে তার ভেতর পুরনো স্মৃতি মোচড় দিয়ে উঠল। সারাক্ষণ সিনেমা ও গান মুখে লেগে থাকত। আজকের এ পঞ্চাশোধ্বê মানুষটির। আজ তিনি বেমালুম ভুলেই গেছেন কিভাবে তার ভিসিডি রেকর্ডারটা অপারেট করতে হয়। দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ মিসিসাগর জামেয়া মসজিদে নিয়মিত যাওয়ার ও তাদেরকে ভালো মানুষ ও মুসলমান বানানোর আকুতির গল্প আমি তন্ময় হয়ে শুনছিলাম।
তথ্য সুত্র:
1. Muslims and Islam in Canada-Ali Ketani and M. M'Bows
2. Muslims and Islam in the American Continent Vol. I of the Encyclopedia of Muslim Minorities in the World
3. Overview of Canadian Govt. Website
4. CBC's Website
নয়াদিগন্ত ২২ মে ও ২৪ আগষ্ট ২০০৭ এ ছেপেছে
যায়যায়দিন অক্টোবর ২৭, ২০০৭ ছেপেছে
আমার দেশ ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০০৮ এ ছেপেছে।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা এপ্রিল, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



