somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... উইকিলিকের চোখে মিডল ইস্টঃ “সাপের মাথা কেটে দাও” কেউই এগুলো অস্বীকার করছেন। বলছেও না যে, এসব আমরা বলি নাই অথবা করি নাই। বরঞ্চ বলছে এতে করে আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি হবে।
ওয়াইট হাউস বলছে “ইটস ডেঞ্জারাসএন্ড রেকলেস”। আমেরিকা সরাসরি উইকি বস জুলিয়ান এসেঞ্জকে বিচারের আওতায় আনার কথা ঘোষণা করেছে। অপরাধ হল, কেন সে এতসব তথ্য ফাঁস করে দিবে? ওসব একান্তই সিক্রেট ব্যাপার-স্যাপার। একটি লিখছে, কেন এখনো জুলিয়ান নিহত হয়নি (Why isn’t Julian Assange dead yet? টরন্টো সান, নভেম্বর ৩০), কিংবা উইকিলিক বস সময় ধার করে বেঁচে আছেন ইত্যাদি। দুইদিন আগে আমেরিকা ভিত্তিক হোস্টিং কোম্পানী উইকিলিকের সাইটটি বন্ধ করে দিয়েছে। অন্য নামে সাইটটি চালু রয়েছে এখন। আমেরিকার এটর্নী জেনারেল বলেছেন, “জুলিয়ানের বিরুদ্ধে ক্রিমিনিলাইজেশনের তদন্ত চলছে।” জুলিয়ান একরকম বৃটেনে আত্মগোপন করে এতদিন ছিলেন। একটি ধর্ষণ প্রচেষ্টা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে স্পেনের আদালত গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করে রেখেছিল। নিন্দুকেরা বলে আমেরিকার চাপেই বৃটেন তাঁকে আজ গ্রেফতার করেছে এবং জামিন না দিয়ে জেলে পুরেছে। সম্ভবত স্পেনে ফেরত পাঠানোও লাগতে পারে।
যদিও জুলিয়ান এই মামলাকে তাঁর বিরুদ্ধে বৃহৎ শক্তিদের ষড়যন্ত্র বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁর নিজ দেশ হল অস্ট্রেলিয়া। এক সাক্ষাৎকারে তিনি লিখেছেন, তাঁর দেশে ফেরা অসম্ভব হয়ে পড়েছে প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড এবং এটর্ণী জেনারেল রবার্ট ম্যাকলিল্যান্ডের ভুমিকায়। তাঁকে হত্যা করতে আমেরিকাকে সহযোগিতা করতে দুইজন সরাসরি কাজ করছেন বলে জুলিয়ান এসেঞ্জ অভিযোগ করছেন।

সে যাই হোক, ওসব গোপন নথিপত্র প্রকাশের ফলে আমেরিকার ডিপ্লোম্যাটিক কারসাজি সাধারণ মানূষজনের হাতে চলে এসছে। হিলারী ক্লিনটন এর দায় স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে। আর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন যারা এসব তথ্য ফাঁস করতে ব্যবহৃত হয়েছেন সেসব আমেরিকানদেরকে সাজা দেয়ার।

ইরান নেতা আহমেদিনেজাদ উইকিলিককে বলেছেন, ‘শয়তানের ষড়যন্ত্র (satanic conspiracy)।’ বলেছেন, “প্রতিবেশীদের সাথে আমাদের চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। মুসলিম নেতাদের মধ্যে বিভক্তির বীজ বপন করতে আমেরিকার হীন পরিকল্পনারই এটা একটা অংশ।” তূর্কী প্রধাণমন্ত্রী এরদোগান এগুলোকে ‘বাজে গপ্প’ আখ্যায়িত করে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি আরো সাহসী মন্তব্য করে বলেছেন, "The unserious cables of American diplomats, formed from gossip, magazines, allegations and slander are spreading worldwide via the Internet,"

কি ছিল উইকি ক্যাবলে?

আমরা মধ্যপ্রাচ্য নিয়েই আজকে কথা বলতে পারি।

মধ্যপ্রাচ্যে দুটি মাত্র দেশে একটা সময় পর পর সরকার পরিবর্তন হয় । ইরান ও ইসরাইল। আর বাকী সব দেশেই নেতাদের মৃত্যু পর্যন্ত জনগনদের অপেক্ষা করতে হয়। অবশ্য লেবানন সরকারে মাঝে মাঝে এদিক সেদিক হয়। জিমি কার্টার বলেছেন, এ অঞ্চলের একমাত্র দেশ ইসরাইলে ১৫০ টি নিউক্লিয়ার অস্ত্র বিদ্যমান (টাইমস্, মে২৬, ২০০৮ )। আর বর্তমানে পশ্চিমা দেশসমূহ বলছে, ইরান চেষ্টা চালাচ্ছে নিউক্লিয়ার শক্তি অর্জন করতে।
যাহোক, মধ্যপ্রাচ্যের সব মুসলিম নেতাদের চোখে বর্তমানের একমাত্র সমস্যা হলো ইরান, কোনমতেই ইসরাইল নয়। আমেরিকাকে সবাই অভিন্ন সুরে জোড়ালো আবদার জানিয়েছে ইরানকে দ্রুত শায়েস্তা করতে। সৌদি আরব আমেরিকাকে বলছে ‘সাপের মাথা কেটে দাও’ (cut the head of snake)। কিং আব্দুল্লাহ বলছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের সম্পর্ক পূনঃস্থাপিত হলেও আসল কথা হল, আমরা তাদেরকে বিশ্বাস করিনা। কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা তাদের সাথে মিথ্যা কথা বলি, তারাও আমাদের সাথে মিথ্যা কথা বলে (they lie to us, and we lie to them)। মিশর নেতার দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যে দুটি চ্যালেঞ্জ- ইরাকের স্থিতবস্থা অন্যটি ‘সর্বত্র’ই ইরানের বিস্তৃতি। প্রেসিডেন্ট হোসনী মোবারক তেহরানের সমঝোতার ব্যাপারে ওয়াশিংটনকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন এই বলে যে, তারা ‘বিগ, ফ্যাট লায়্যার’, ইরান এরকম করবেই কারণ, তারা মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করে বৃহত্তরউদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে চায়।
মিশরের এই জগদ্দল পাথর হোসনী মোবারক ইরাক আক্রমণ করতেও বুশকে উৎসাহিত করেছিলেন। বুশের স্মৃতিচারণমূলক বই ‘ডিসিশন পয়েন্ট’ এ অনেক কথা লিখেছেন। আরব নেতারা কিভাবে তাকে প্ররোচিত করেছেন তা তিনি অকপটে জানিয়েছেন। বুশ লিখেছেন, “President Hosni Mobarak of Egypt had told (general) Tommy Franks that Iraq had biological weapons and was certain to use them on our troops (অর্থাৎ মিশরের হোসনী মোবারক জেনারেল টমি ফ্রাংকে জানিয়েছেন, ইরাকে বায়োলজিক্যাল মারণাস্ত্র রয়েছে।আর সেগুলো নিশ্চিতভাবেই আমেরিকান সৈন্যদের মারতে ব্যবহৃত হবে)।” যদি কথাটি সত্যই হয়, তাহলে মোবারক এ অভিযোগটিকেন প্রকাশ্য জনসমুক্ষে তোলেননি? বিপরীতভাবে বলতে গেলে, কেন তিনি সাদ্দামের সাথে ভাব বজায় রেখে চলতেন? বুশ তার কারণ জানিয়েছেন এভাবে, আরবের রাস্তায় তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হবে বলে “Mubarak refused to make allegation in public for fear of inciting the Arab street”
সৌদি এম্ব্যাসাডরও ইরাক আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণভুমিকা রেখেছেন। বুশ ওই বইয়ে লিখেছেন, “Prince Bandar of Saudi Arabia, the kingdom’s longtime ambassador to Washington and a friend of mine since dad’s presidency, came to the Oval Office and told me our allies in the Middle East wanted a decision (অর্থাৎ ওয়াশিংটনে সৌদি আরবের রাস্ট্রদূত প্রিন্স বান্দর যিনি আমার পিতার শাসন আমল থেকেই আমার বন্ধু তিনি ওভাল অফিসে এসে আমাকে বললেন, আমাদের মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশসমূহ ‘সিদ্ধান্ত’ চায়)।”

যাহোক, আবার উইকিলিকে ফিরে আসি। টরন্টো স্টার (নভেম্বর৩০) মন্তব্য করেছে, রোববার (নভেম্বর২৮) দিনটি ছিল খুব সম্ভবত লেবানীজ প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে খারাপ দিন। কারণ এদিনই তিনি ইরানে তাঁর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর “ইরানের প্রতি লেবাননের সর্বাত্মক সমর্থন থাকবে” বলে সমাপ্তি টানছেন।আর এইদিনই কিনা নিউ ইয়র্ক টাইমস তাঁর ভিলেনের অভিনয়টা প্রকাশ করেছে। ক্যাবলের মাধ্যমে ২০০৬ সালে সা’দ হারিরীর সাথে ইউএস ডিপ্লোম্যাটের কথোপকথনের উদ্দৃতি দিয়ে টাইমস্ লিখেছে, সা’দ হারিরী (তখন তিনি পার্লামেন্টে সুন্নী মেজরিটি গ্রুপের নেতা ছিলেন) আমেরিকাকে জানিয়েছেন, দ্যা ইউএস “এটাক অন ইরাক আননেসিসারি” ওয়াইল এন এটাক অন “ইরান ইজ নেসিসারি” (অর্থাৎ ইরাকের উপর আমেরিকার আক্রমণ অপ্রয়োজনীয় ছিল অথচ ইরান আক্রমণ জরুরী)। উইকিলিকের শত শত ডকুমেন্ট প্রমাণ করেছে এসব নেতাদের পাবলিক কথার সাথে প্রাইভেট কথার কোনই মিল নেই।

ইসরাইল-প্যালেস্টাইন কনফ্লিক্টের চেয়ে তাঁদের কাছে ইরানই বড় সমস্যা। ইউএস সেন্ট্রাল কম্যান্ডার জেনারেল জন আবিজিয়াদের সাথে মিটিং-এ আরব আমিরাতের মিলিটারী কম্যান্ডাররা ইরানের নেতা মাহমুদ আহমেদিনেজাদকে, ‘এগ্রেসিভ’ ‘ক্রেজি’ বলেছেন। আবুধাবির যুবরাজ প্রিন্স মুহাম্মদ বিন যায়েদ আমেরিকার নিকট দাবী জানিয়েছেন, “ট্যাক একশন এগেইন্সট ইরান উইথিন এ ইয়্যার এট মোস্ট(সর্বোচ্চএক বছরের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাও)।” চীফ অব স্টাফ জেনারেল মাইকেল মোসলিকে বিন যায়েদ বলেছেন, ইরানকে কখনোই নিউক্লিয়্যার প্রোগ্রামের অনুমতি দেয়া যায়না। এই লোকটি আমদেরকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বাহরাইনের রাজা হামিদ বিন ইসাও সবার সাথে যোগ দিয়েছেন। তিনি আমেরিকানদের বলেছেন, the danger of letting it go on is greater than the danger of stopping it (এটাকে এভাবে ছেড়ে দিলে বিপদ বাড়বে। তারচেয়ে ওদেরকে এটা অর্থাৎ নিউক্লিয়্যার প্রোগ্রাম বন্ধ করাতে হবে)।”

গোপন ইউএস ডিপ্লোম্যাটিক ক্যাবল আরো জানিয়েছে, সৌদির দৃষ্টিতে ইয়েমেন একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহ একজন অথর্ব যার কোনই নিয়ন্ত্রণ নাই দেশের উপর। লিবিয়ান লিডার গাদ্দাফী পানিপথে চলাফেরা করতে ভয় পান, স্থলপথে ভ্রমণ করতেই তিনি পছন্দ করেন। গাদ্দাফী তার ইউক্রেনিয়ান নার্স ছাড়া চলাচল করেন না। উইকিলিক প্রকাশ করেছে, পাকিস্তান প্রধাণ আসিফ আলী জারদারী আমেরিকার কাছে নালিশ করেছেন, যে কোন সময় তাঁর আইএসআই প্রধান পাশা এবং সেনাপ্রধান কিয়ানী মিলে ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারেন। বাংলাদেশ বিষয়েও উইকিলিক ২১৮২টি নথি প্রকাশ করেছে। ইসলামাবাদের আমেরিকান এম্বেসি থেকে ধারনা দেয়া হয়েছে বাংলাদেশে লস্কর-ই-তৈয়বার আস্তানা থাকতে পারে বলে। প্যারিসের দূতাবাস জানিয়েছে, আলজেরিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মরক্কো থেকে আসা কমপক্ষে ২০ জন ইমামকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা এতে মদদ দেওয়ার অভিযোগে ২০০৬ সালে ফ্রান্স থেকে বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
উইকিলিক প্রাচ্য, প্রতীচ্য, পাশ্চাত্যের প্রায় সব দেশ নিয়েই ইউএস ডিপ্লোম্যাটিক ক্যাবলেরবিশ্বজোড়াকারসাজি উন্মোচন করে দিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে একমাত্র দেশ ইসরাইল নিরাপদ অবস্থানে। উইকিলিক চীফ জুলিয়ান এসেঞ্জ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনভাবেই ইসরাইলকে রাগাতে চাননি। ইসরাইলের প্রধাণমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, “ইসরাইল হ্যাজ নট বিন ড্যামাজ্ড এট অল বাই দ্যা উইকিলিক পাবলিকেশন্স।” তিনি বলেছেন, “এই অঞ্চলে গত ৬০ বছর ধরে প্রপাগান্ডা চলছে ইসরাইল এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় হুমকি, কিন্তু আরব নেতাদের এই প্রথম উপলব্ধি তে এসেছে আমরা নয়, ইরানই একমাত্র হুমকি।”

উইকিলিকের উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন ওসব তথ্য প্রকাশের মধ্যদিয়ে মানুষজন জানতে পেরেছে মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা কতটা মেরুদন্ডহীন। আরো পরিষ্কারভাবে বলা যায়, সারা দুনিয়ার প্রায় এক বিলিয়ন মুসলিম জাতি ও বিশ্বের সিংহভাগ সম্পদ এসব অযোগ্য ও ঘরের শত্রু বিভীষণ নেতাদের হাতেই জিম্মি। যাদের না আছে না সাহস, না আছে দুনিয়ার জ্ঞান আর নাই বা আছে কোন ধর্মের প্রতিই দৃঢ বিশ্বাস। এসব পদলেহী নেতাদের হাত থেকে মুসলিম বিশ্ব কবে মুক্তি পাবে?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/29285679 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/29285679 2010-12-08 09:25:48
জীবনের প্রথম বই! ডাকে পোস্ট করে দিতে বলেছি। হয়তো দেখবো শীঘ্রই।

বইটি মূলতঃ পত্রিকায় প্রকাশিত আমার পূর্বের লেখাসমূহের সংকলন যা আপনাদের কেউ কেউ পড়ে ফেলেছেন।

মুক্তচিন্তা প্রকাশনী, একুশে মেলার স্টল নাম্বারঃ ৪১১।
পাঠশালা প্রকাশনী (ইনফরমেশন বোর্ডের পাশে)তেও পাওয়া যাচ্ছে।

বইয়ের নামঃ
কানাডার চিঠি
একজন প্রেসিডেন্টের ইমেইল এবং ... .

আমার নামে রয়েছে 'শাহীন সিদ্দিকী'।

[আপনাদেরকে প্রচ্ছদটিও দেখাতে পারছিনা, সরি! কোন ইমেজ এখনো হাতে পাইনি!]

বাংলাদেশ (১৫টি আর্টিকেল), আন্তর্জাতিক (৯টি), কানাডা (৫টি) নামে তিনটি অধ্যায় এবং ইংলিশ সেকশন নামে আলাদা আরেকটি অধ্যায়, যাতে রয়েছে আরো ৪টি আর্টিকেল।

মোট ২১৬ পৃষ্ঠা, দাম ২২০ টাকা (সম্ভবত কমিশনে পাওয়া যাবে) ।

আশা করি আপনারা অন্তত উল্টিয়ে পালটিয়ে হলেও দেখবেন।

আর হ্যাঁ, মতামত জানাতে কার্পণ্য করবেন না কিন্তু!

খুব বেশী ভাল থাকুন সবাই।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28914508 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28914508 2009-02-22 00:55:04
‘শান্তির স্বপ্নে’ও প্রেতাত্মার থাবা
আমেরিকা, বৃটেন কিংবা উন্নতবিশ্বে সেনাপ্রধান কে বা তিনি কিইবা বললেন তা নিয়ে দুনিয়ার মানুষ খুব বেশী মাথা ঘামায় না।কারন তাঁরা সরকারী চাকুরিজীবি, অর্পিত দায়িত্ব পালন করাই তাঁদের কাজ।কিন্তু আমাদের মত দেশগুলো বিশেষ করে পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, ফিজি ইত্যাদির পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উলটা। কারণ ইনারা সরকারী চাকুরির পাশাপাশি ‘উপরি’ কিছু দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এই 'উপরি'ই তাঁদের অতিরিক্ত পরিচয় বাড়াতে সাহায্য করে।

প্রজাতন্ত্রের এমন গুরুত্বপূর্ণ আসনে আসীন ব্যক্তিবর্গ সাধারনত চাকরি থেকে অবসরে গিয়ে আত্মজীবনীমূলক বই লিখে থাকেন। কখনো তাঁরা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অনেক অপ্রিয় সত্য কথা সারা জীবনের জন্য চেপেও যান।যেমন, বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমেদ।একটি দলের উপর তিনি এতই মনক্ষুন্ন যে, আত্মজীবনীমূলক বই লেখার ইচ্ছা এখন আর করেন না।উল্লেখ্য, সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়েছে আগেই।তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালে আরো এক বছর বাড়িয়ে দিয়েছেন।তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেছিলেন, ‘মেয়াদ আর কত বাড়বে? সবকিছুর একটা শেষ আছে।’

যাহোক, সেনাপ্রধান জেনারেল মইনের আত্মজীবনীমুলক বই ‘শান্তির স্বপ্নে সময়ের স্মৃতিচারণ’ বেরিয়েছে।জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্লেষকেরাই বিচার করবেন গুরুত্বপূর্ণ কোন গোপন তথ্য জেনারেল তিনি জনগনকে জানিয়েছেন কি না অথবা সেগুলো বাইরে জানানোর আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কিনা।আমরা সেদিকে না গিয়ে বইয়ে বর্ণিত বহুলখ্যাত ‘ওয়ান-ইলেভেন’-এর অজানা রহস্য ও সেসময়ে প্রকাশিত জনপ্রিয় দেশী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়া বিবেচনা করে আলোচনা করব।আর শেষে তৃতীয় বিশ্বের অনেক সেনাপতির ঘনিষ্ঠ বন্ধু বুশকে নিয়ে একটি গল্প দিয়ে আজকের নিরস আলোচনাটির সমাপ্তি টানবো।

জরুরী অবস্থা না এলে হয়তো আমরা জানতেই পারতাম না জেনারেল মইনের রয়েছে অসাধারন লেখনী ক্ষমতা। সুন্দর ভাষা ও শব্দ চয়নে ইতিবাচক কলাম লিখে তিনি ইতোমধ্যে পরিচিতি লাভ করেছেন।বাংলা নববর্ষ ১৪১৫ (১৪ এপ্রিল ২০০৮) নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর একসাথে প্রকাশিত অসাধারন লেখাটি পজেটিভ বাংলাদেশ গড়তে বেশ সাহায্য করবে।তিনি আশাবাদী ও স্বপ্নবিলাসী মানুষ যা নিজেই বলে থাকেন।সেজন্যই হয়তোবা ওয়ান-ইলেভেন আনতে সহায়তা করেছেন।সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ বা মন জয় করতে নিজস্ব ব্র্যান্ডের গনতন্ত্র, ২৮শে অক্টোবর, জাতির জনক, স্বাধীনতার ঘোষক ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে জনপ্রিয় কথাও বলেছেন।যেরকম আমরা এরশাদের মুখ থেকে ক্ষমতা দখল করে নেয়ার পরে দূর্নীতি ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে প্রায়শই শুনতাম।এমনকি দূর্নীতির এই বরপুত্র কৃচ্ছতা সাধনের নিমিত্তে মিডিয়াকে খবর দিয়ে সাইকেল চালিয়েও একসময় অফিস করতেন। আর অশ্লীলতার বিরুদ্ধে তার জেহাদের কথা নাইবা বললাম।

এক-এগারোর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নায়কদের মুখ থেকে আমরা এর অন্তর্নিহিত রহস্য আগে জানতে পারিনি। শুধু জেনেছিলাম এটি পূর্বপরিকল্পিত।জেনারেল মইন বইতে এর বিস্তারিত বিবরন দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘১১ জানুয়ারি খুব ভোরে উঠে ফজরের নামায পড়ে কায়মনে আল্লাহর কাছে হাত তুলে বললাম, হে আল্লাহ, জীবনে আমি অনেক ভুল করেছি………....... মোনাজাত শেষ করে আমি অফিসের সময় শুরু হওয়ার আগেই অফিসে চলে এলাম। প্রথমে খবর ও পরে জাতিসংঘ সদর দপ্তর থেকে টেলিফোন পেলাম। আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মিঃ গুইহিনো কোনোরকম ভনিতা না করেই জানালো, সব দলের অংশগ্রহণ ব্যতীত নির্বাচন তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এরকম একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যদি ভূমিকা রাখে তাহলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে। অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের ব্যাপারে জাতিসংঘের এরূপ কঠোর হুঁশিয়ারির পর আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, এমন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তিকে বিতর্কিত করে তুলবে।’

তাহলে বোঝা যায়, জাতিসংঘের কঠোর হুঁশিয়ারীই তাঁকে ১-১১ আনতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। আসলে সত্যি কি এরূপ ঘটেছিল? কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীন ইস্যুতে জাতিসংঘ কি এমন অশোভন হুমকি দিতে পারে? ইকোনোমিস্ট ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৭-এ এক মন্তব্য প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘They must have known that the United Nation’s threat was almost certainly hollow. After all, Pakistan and Fiji didn’t lose their peacekeeping contract after coups in their countries (অর্থাত বাংলাদেশের জেনারেলরা অবশ্যই নিশ্চিত ছিলেন যে, ইউএনের এই থ্রেটটা ছিল একটা ফাঁকা বুলি। কারন পাকিস্তান ও ফিজিতে জেনারেলরা ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার পরেও তাদের সাথে ইউএন’র পিসকিপিং কন্ট্রাক্ট কিন্তু বাতিল হয়ে যায়নি।)’

আমেরিকা অঞ্চলের মানবাধিকার আইনজীবীদের সংগঠন ‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব জুরিস্ট’র কানাডা চ্যাপ্টারের সভাপতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নিয়ে কর্মরত ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্র্যাটিক ল’ ইয়ার্সের কর্মকর্তা অ্যাটর্নি উইলিয়াম স্লোন ২০০৮ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্ক ভিত্তিক ‘ফেডারেশন অব অর্গানাইজেশন্স এগেইনস্ট বাংলাদেশ ওয়ার ক্রিমিনালস’ নামক একটি সংগঠন কর্তৃক আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানি স্টাইলে বাংলাদেশে মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হঠাত করে আসেনি। ১-১১-এর পরিস্থিতিও পূর্বপরিকল্পিত।নির্বাচনের ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকায় প্রকাশ্যে পিটিয়ে মানুষ হত্যার নীলনকশাও পুরনো।‘পিলে চমকানোর মতো এসব তথ্য ফাঁস করে জ্যাকসন হাইটসে উইলিয়াম আরো জানিয়েছিলেন, ‘খালেদা জিয়ার সরকার পদত্যাগের সাথে সাথে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচনের ইস্যুতে কী ধরনের আন্দোলন হবে এবং নির্বাচন বানচালের জন্য কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির অবতারণা করা হবে, এরপর জরুরী আইন হতে পারে, জরুরী আইনের সময় সামরিক বাহিনীকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেয়া হবে, এমনি অবস্থায় চালানো হবে দুর্নীতি দমন অভিযান এবং সে অভিযানের টার্গেট হবেন দুই নেত্রী, সংস্কারের নামে প্রধান দু’টি দলকে ভেঙে চুরমার করার পর আমেরিকার পছন্দের লোকদের নেতৃত্বে গঠন করা হবে নতুন রাজনৈতিক ফ্রন্ট এবং নির্বাচনের মাধ্যমে সেই ফ্রন্টের লোকজনের সমন্বয়ে সরকার গঠন করা হবে।’ তিনি দাবী করেন এসব অনেক আগেই এক ডেইলির সম্পাদক ও এক এমপির মাধ্যমে তিনি জেনেছিলেন । (সূত্রঃ নয়াদিগন্ত মার্চ১০, ২০০৮)

ডঃ কামাল হোসেনও বলেছিলেন, ‘এক-এগারো আমরাই এনেছি।’ সেসময়ে কারাধীন শেখ হাসিনার এক অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডঃ কামাল হোসেন আরো বলেছিলেন, ‘দেশ গোল্লায় যাক। তাই বলে দুই নেত্রীকে পূজা করতে হবে নাকি? (আমারদেশ, মে১, ২০০৮)’

তাহলে আমরা কি করে বিশ্বাস করবো সব বাহিনীর প্রধান জেনারেল মইন এসবের কিছুই কি অগ্রিম জানতেন না বা এর সাথে নিজেকে কখনো অন্তর্ভূক্ত করেননি? না কি ধরে নিব অদৃশ্য কোনো প্রেতাত্মার থাবা আমাদের সাহসী সেনাপতিকেও নির্মম সত্য প্রকাশে টুটি চেপে ধরেছে?

আমরা ১-১১ পূর্ব-প্রেক্ষাপটটি বিবেচনায় আনলে সহজেই বুঝতে পারি শক্তিধর রাষ্ট্রদূতদের সাথে সবচেয়ে বেশী সাহায্য করেছেন জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি রেনাটা লক ডেসালিয়ান। তিনিই জাতিসংঘের পক্ষে একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষনা দিয়েছিলেন।সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘২২ জানুয়ারীর ঘোষিত নির্বাচনে সেনাবাহিনী সহায়তা দিলে আগামী দিনে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে আদৌ যোগ দিতে ও বেতন ভাতা কমাতে পারবে কিনা সেটি বিবেচনা করা হবে। অবশ্যি পরে এই ধমকা-ধমকি পরে ভূয়া বলে ধরা পড়েছে। জাতিসংঘ সদর দপ্তর থেকে যে বিবৃতি পাঠানো হয়েছিল সেখানে বাংলাদেশ সম্পর্কে উতকন্ঠা ছিল, কিন্তু এ ধরনের কথা ছিল না। রেনেটা বিবৃতিতে নিজ দায়িত্বে এই কথাগুলো ঢুকিয়ে ছিলেন।’ (সূত্রঃ আমারদেশ, ১২ অক্টোবর, ২০০৮)

ইকোনোমিস্টও লিখেছে, ‘বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি যা করেছে জাতিসংঘের গত ষাট বছরের ইউএনের ইতিহাসে তা নেই। এই হুমকির পরেই জেনারেল মইন বাংলাদেশের রাস্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের অফিস বরাবর মার্চ করে ইমার্জেন্সী জারী, ইলেকশন বাতিল এবং মিলিটারী ব্যাকড্ কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠা করতে ‘আদেশ’ দেন। (ফেব্রুয়ারী ২১, ২০০৭)’

সেসময় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব এবং পরবর্তীতে উপদেষ্টা মোখলেসুর রহমান চৌধুরীও প্রেসিডেন্টের নিকট মইনের ‘বিনয়াবনত হয়ে অনুরোধের’ দাবীকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ, জরুরি অবস্থা জারির কাগজপত্র এবং প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র ইত্যাদি কাগজপত্র সেনাপ্রধান আগেই তৈরি করে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। রাষ্ট্রপতিকে জোর করে এসব কাগজপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি এ বিষয়টি নিয়ে তার পত্নী ও আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। আমাকে তিনি তাদের উপস্থিতিতে ডেকেছিলেন। কিন্তু আমাকে সেখানে যেতে দেয়া হয়নি। (আমাদের সময়, ফেব্রুয়ারী ২, ২০০৯)

সেসময়ে নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি, ওয়ান ইলেভেনের অন্যতম রূপকার ও বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদউদ্দিন চৌধুরী পরোক্ষভাবে জেনারেল মইনকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের প্রেক্ষাপট নিয়ে আজ বিভিন্ন জন বিভিন্ন মত প্রকাশ করছেন। প্রত্যেকেই সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে নিজের মতো করে বলার চেষ্টা করছেন। আমি নিজেও ওয়ান ইলেভেনের ঘটনাবলির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। ওইদিন অন্যদের সঙ্গে আমিও উপস্থিত ছিলাম বঙ্গভবনে। ১১ জানুয়ারি সারারাত বঙ্গভবনেই ছিলাম। আমি সকল ঘটনার সাক্ষী। তিনি বলেন, ইতিহাসই বিচার করবে ওয়ান ইলেভেনের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল তারা নায়ক না খলনায়ক। আমরা কেন নিজেরা নিজেদের নায়ক বানাতে যাব? জেনারেল মাসুদ বলেন, ওয়ান ইলেভেন নিয়ে আমারও অনেক কিছু বলার আছে। অনেক অজানা তথ্য আমি জানি। একদিন সেসব অবশ্যই বলব। আজ দেখছি, অনেকেই সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে অনেক কথা বলছেন। এসবের জবাবও একদিন আমি দেব। এখন নয়। এখন আমি সরকারি কর্মচারী। এখন কিছু বললে নিজের অবস্থানের কথা মাথায় রেখে বলতে হবে। সব কিছু বলাও সম্ভব হবে না। ওয়ান ইলেভেনের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে ইতিহাসের কাছে আমি দায়বদ্ধ। সেই দায় আমাকে একদিন মেটাতেই হবে। (আমাদের সময়, ফেব্রুয়ারী৪, ২০০৯)’

মইনের উক্ত বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রধান অতিথি টিআইবি প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ ‘১/১১-এ প্রেসিডেন্টের কাছে বিনয়াবনত হয়ে দেশের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেয়ার অনুরোধ জানান’-এর বিপরীতে সেনাপ্রধানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনি যদি বাইরে কান পাতেন তাহলে মানুষের কাছে অন্য কাহিনী শুনতে পাবেন।’ উল্লেখ্য, উক্ত অনুষ্ঠানে জেনারেল মইন এমনসব বুদ্ধিজীবি ডেকে এনেছিলেন যাঁরা বাংলাদেশে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তায় বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্ধ নিয়ে ফিবছর কথা বলে থাকেন। এমনকি ওই অনুষ্ঠানেও অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ বলেছেন, ‘জেনারেল মইন অন্যত্র স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করেছেন কিন্তু সেনাবাহিনীর (সশস্ত্রবাহিনী) কর্মের স্বচ্ছতা নেই (নয়াদিগন্ত জানুয়ারী৩০, ২০০৯)।’ অথচ প্রবীন এই অধ্যাপক ভাল করেই জানেন কোন দেশেরই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী বাহিনীর আভ্যন্তরীন কর্মকান্ড জনসমক্ষে উন্মোচন বা সরকার ছাড়া কাউকে স্বচ্ছতা প্রমাণ করতে দেয়ার সুযোগ নেই।মইন কিন্তু এর ন্যুনতম প্রতিবাদও করেননি।

প্রেসিডেন্টের ভাবার জন্য কিছু সময় চাওয়া নিয়ে মইন অন্যত্র লিখেছেন, ‘আমি জানতাম ইতোপূর্বে উপদেষ্টা পরিষদে অনেক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত অজানা কারন ও প্রভাবে পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। যার কারনে আমরা কোনো দুষ্টচক্রকে আবার নতুন কোনো খেলা শুরু করার সুযোগ দিতে চাচ্ছিলাম না।’ ‘দুষ্টচক্র’ বলতে তিনি কাদের বুঝিয়েছেন তা সচেতন পাঠকদের বুঝতে আশা করি কষ্ট হবেনা। বর্তমান সরকারে অন্য জোট ক্ষমতায় থাকলে জেনারেল মইন এমন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান করতেন কিনা তা নিয়ে যেকোনো পাঠকই সন্দেহ করতে পারেন।কারন এক সময় সব জোটই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরোধিতা করলেও বর্তমান পরিস্থিতি অনেকের জন্যই শাপে বর হয়েছে। বুদ্ধিজীবিদের সুরও পাল্টেছে, পত্র-পত্রিকাগুলোও হয়তো জরুরী অবস্থা নিয়ে আর মাথা ঘামাতে রাজী নয়। অথচ ২২শে অক্টোবর, ২০০৭ এ জেএফকে স্কুল অফ গভর্ণমেন্ট একই গোত্রীয়ভুক্ত বুদ্ধিজীবিরা প্রতিষ্ঠানটির ডীন ডঃ ডেভিড এলউড বরাবর ইমেইলে অনুরোধ জানিয়ে ইন্টারনেটে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানে নেমে পড়ে সেনাপ্রধাণকে এক অনুষ্ঠান থেকে দূরে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন।

ওয়ান-ইলেভেনের এক বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে ১১ জানুয়ারী ২০০৮-এ দৈনিক প্রথম আলো ‘বঙ্গভবনে সেই সময়ে যা ঘটেছিল’ শিরোনামে যা লিখেছে তার সাথে মইনের বর্ণনার মূল পার্থক্য তেমনটি নেই। মইন শুধু প্রেসিডেন্টের সাথে তাঁর আচরনগত ‘পার্থক্য’ দেখিয়েছেন যা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের বুদ্ধিজীবিরাও বিশ্বাস করেননি।পাঠকেরা প্রথম আলোর ওই তারিখের আর্কাইভে গিয়ে দেখে নিতে পারেন।একটি পত্রিকা কি করে সেনাবাহিনী সংশ্লিষ্ট আভ্যন্তরীন ব্যাপারাদি এমন খুঁটিনাটিভাবে জানতে পারে তা ভাবতেই অবাক লাগে।একটা সময় ছিল যখন সেনাবাহিনী ও বিচারপতিদের নিয়ে লেখার আগে সাত-পাঁচ ভাবতে হতো, আজ উলটো সংশ্লিষ্ট বিভাগের স্বয়ং মহারথীরাই নয়-ছয় লিখে উদ্ভট জটলা সৃষ্টিতে সাহায্য করছেন।

একটি গল্প দিয়ে আজকের আলোচনা শেষ করতে চেয়েছিলাম।


২০০৯ সালের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে পেনসেলভেনিয়া এভিনিউ ধরে একজন বৃদ্ধ লোক হোয়াইট হাউসের সামনে পাতা একটি বেঞ্চে এসে বসলেন।

প্রহরারত এক মেরিন গার্ডের কাছে জানতে চাইলেন, ‘আমি একটু ভিতরে যেতে চাই। প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে দেখা করব।’

মেরিন ভ্রুঁকুঁচকে লোকটির দিকে তাকালেন। বিনয়ের সাথে বললেন, ‘স্যার, বুশ এখন আর প্রেসিডেন্ট নন এবং এখানে তিনি আর থাকেন না।’

লোকটি ‘ওকে’ বলে চলে গেলেন।


পরদিন লোকটি আবারো হোয়াইট হাউসে এসে মেরিন গার্ডকে একইভাবে ভিতরে ঢুকে প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে দেখা করার আগ্রহ ব্যক্ত করলেন।

মেরিন উত্তরে বললেন, ‘স্যার, গতকাল আপনাকে যা জবাব দিয়েছি আজো তাই দিচ্ছি। বুশ ইজ নো লংগার প্রেসিডেন্ট এন্ড নো লংগার রিসাইড হিয়ার।’

লোকটি এবারো আগের মত মেরিনকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিলেন।

তৃতীয় দিনেও ব্যক্তিটি আগের মতই হোয়াইট হাউসে এসে ওই মেরিনকেই বললেন, ‘আই উড লাইক টু গো ইন এন্ড মিট উইথ প্রেসিডেন্ট বুশ (I would like to go in and meet with president Bush)।’

সংগতকারনেই মেরিন আর রাগ থামাতে পারলেন না। অগ্নিমূর্তি ধারন করে লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘স্যার, আজ দিয়ে তিনদিন আপনি একাধারে মিঃ বুশের সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন। আর আমি আপনাকে বারে বারে একই কথা বলে যাচ্ছি মিঃ বুশ ইজ নো লংগার প্রেসিডেন্ট এন্ড নো লংগার রিসাইড হিয়ার। আপনি কি আমার কথা বুঝতে পারছেন?’

বৃদ্ধ লোকটি এবার সহজভাবে মেরিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওহ্, আই আন্ডারস্ট্যান্ড। বুশ যে ‘নো লংগার আওয়ার প্রেসিডেন্ট’ কথাটি আমার ভারী পছন্দের। আই জাস্ট লাভ হিয়্যারিং ইট।’

মেরিনগার্ড মূহুর্তেই লোকটির দিকে আকর্ষন বাড়িয়ে একটি স্যালুট দিয়ে বললেন, ‘সি ইউ টুমোরো ,স্যার।’

২০১০ সালের কোনো একদিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেড কোয়ার্টারে সামনে কোনো এক বাংলাদেশীর এমন প্রশ্নের জবাবে হয়তো তখনকার সেনাপ্রধান গার্ড লোকটিকে স্যালুট দিয়ে বলবে ‘সি ইউ টুমোরো, স্যার’।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28907611 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28907611 2009-02-06 20:10:26
ওবামা কি সত্যি পারবেন পৃথিবাটাকে 'চেঞ্জ' করে ফেলতে?
সবাই মোটামুটি আশা করছেন, ওবামা তাঁর স্ব-জাতির এই ক্রান্তিকালে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আনতে পারেন অথবা ভিন্নভাবে বললে বলতে হবে, পরিবর্তন তাঁকে আনতে হবেই। কিন্তু ওয়াশিংটনের ওভাল অফিসে বসে পেন্টাগনের আগ্রাসী ভূমিকা থেকে হাত গুটিয়ে পুরো পৃথিবীটাকে আফ্রিকান-আমেরিকান ব্যারাক ওবামা কিভাবে বদলাতে পারবেন সেইটার এখন দেখার বিষয়।

বুশের বিদায় ঘন্টা উতসবের প্রস্তুতি অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল আমেরিকানদের মধ্যে। একাধিক কুটির শিল্প বিভিন্ন চমতকৃত দ্রব্যাদি যেমন, ক্যালেন্ডার, ম্যাগ্নেট, টি-শার্ট ইত্যাদি নিয়ে আগ্রহভরে প্রস্তুত হয়েছিল বুশ আমলের দ্রুত সমাপ্তির এই প্রতীক্ষিত মূহুর্তের আশায়। কিন্তু প্রতীক্ষিত দিনটি যখন এসেই যাবে অর্থাত বুশ ওভাল অফিস ছেড়েই যাবেন অথবা সবচেয়ে ব্যয়বহুল চাকরিটি যখন ওবামা করা শুরু করবেন, তখন তিনি বুঝবেন বুশ তার উত্তরাধিকার রত্নের জন্য এমন এক উইল রেখে গিয়েছেন যা বাস্তবায়ন করতে গেলে পৃথিবীর নাড়ি-ভুড়ি সব ছিঁড়ে খেতে হবে।

মে ৩১, ২০০৮ এ সাউথ এশিয়া টাইমস্‌ ‘ওয়ার্ল্ড পলিসি ইন্সটিউটের আর্মস ট্রেড রিসোর্স সেন্টার’-এর সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট ফ্রিডা বেরিগ্যান (Frida Berrigan) এর একটি বিশাল গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ ‘পেন্টাগন কিভাবে দুনিয়াটাকে সাজাচ্ছে (How the Pentagon Shapes the world)’ প্রকাশ করেছে। আজকের নিবন্ধে আমরা উক্ত আর্টিকেলের বিভিন্ন দিক নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করব। প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ১৯ জানুয়ারী ২০০৯ এ যেই প্রেসিডেন্টের আসনে বসুন, তিনি আর পেন্টাগনকে পঞ্চভূজ দালান হিসেবে বিবেচনা করতে পারবেন না। আমেরিকান সেনাবাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ‘কোল্ড ওয়্যার’ শেষে যেভাবে দুনিয়াটাকে ‘ইউনিপোলার ওয়ার্ল্ড’ বানিয়েছে তা থেকে তিনি নিজেকে দূরে রাখতে পারবেন না। অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপাত্য, শান্তি শান্তি বলে বিভক্তির বীজ বোনা, হাতেম তাঈ-র মত দয়ালু সেজে দেশে দেশে নাক গলানো, মিলিটারীকে এমন উচ্চ প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত করা যে এর সমকক্ষ দুনিয়াতে যাতে আর কেউ না থাকে। সরকারী কর্মকর্তারা ২০০১-এর সেপ্টেম্বরের একেবারে শুরুতে বুশ প্রশাসনের আরো ৬০ টি জাতির উপর টার্গেট নেয়ার ফুটপ্রিন্টও প্রকাশ করে ফেলেছিল। উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা পেন্টাগণকে এমনভাবে প্রস্তুত করেছেন যেন, আমেরিকার সেনাবাহিনী পৃথিবীর যেকোন প্রান্তেই সংশ্লিষ্ট দেশ বা আন্তর্জাতিক আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ ‘যৌক্তিক’ ভাবেই আঘাত হানতে পারে। ২০০২ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড প্রতিরক্ষা কৌশলের ক্লাসিক শর্টহ্যান্ড ১-৪-২-১ প্রকাশ করেন। এর ব্যাখ্যা এরূপ, আমেরিকা তার নাগরিকদের রক্ষার কথা বলে প্রথমেই চারটি সংবেদনশীল অঞ্চল (ইউরোপ, উত্তর-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য)-এ আগ্রাসন চালাবে। এদের মধ্যে দুই অঞ্চলকে এক সাথে পরাস্ত করতে সক্ষম এবং অন্য আরেকটি অঞ্চলে সময়ের ব্যবধানে এমনিতেই পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিজিত হয়ে যাবে।

১) পেন্টাগণের আকাশচুম্বী বাজেটঃ
বুশ প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসেই এই বিভাগে বাজেট দ্বিগুণ করে ৩০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে ফেলেন। ২০০৯ অর্থবছরে শুধুমাত্র নিয়মিত বাজেট বেড়ে দাঁড়াবে এরও প্রায় দ্বিগুণ (৫৪১ বিলিয়ন ডলার)। কারণ তহবিল সরবরাহ করতে হবে ‘যুদ্ধব্যয়ে (war spending)’ ও ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (war on terror)’-সহ নিজেদের অতিরিক্ত প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার জন্য। ফেব্রুয়ারি ২০০৮ পর্যন্ত কংগ্রেসের বাজেট অফিসের সূত্র ধরে বলা হয়েছে, আইন প্রণেতারা ৭৫২ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্ধ করেছেন আফগানিস্তান, ইরাকসহ অন্যান্য স্থানে চলমান যুদ্ধ খরচের জন্য। ২০০৯ অর্থবছরের জন্য যে আরো ১৭০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন পড়বে তাও পেন্টাগণ আগেভাগে বলে রেখেছে। অর্থাত সামনের বছরে ডলারের পরিমান আর বিলিয়নে থাকবে না চলে যাবে ট্রিলিয়নের ঘরে। নিউইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট বব হারবার্ট (Bob Herbert) লিখেছেন, একশো ডলারের নোট যদি একত্রে সাজানো হয় ছয় ইঞ্চি উঁচু বানাতে এক বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন পড়বে। এক বিলিয়ন ডলার ওইভাবে স্তরে স্তরে সাজালে এর উচ্চতা হবে ঠিক ওয়াশিংটনের দূর্গ পর্যন্ত, আর এক ট্রিলিয়ন ডলারের উচ্চতা হবে ১৬০ কিমি যা কিনা আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ শৃংগ হিন্দু কুশের চেয়েও বিশ গুণ বেশী উঁচু।

ফেডারেল গভর্ণমেন্টের এই ‘বিবেচনামূলক প্রোগ্রাম (discretionary program)’-এর জন্য শুধুমাত্র সামরিক খাতেই সমগ্র বাজেটের প্রতি ডলারের ৫৮ সেন্টই ব্যয় হচ্ছে। অর্থাত পেন্টাগণের সর্বমোট বাজেট আমেরিকার শিক্ষা, পরিবেশ রক্ষা, বিচার বিভাগ, সাবেক সৈন্যদের সুযোগ সুবিধা, আবাসন সহযোগিতা, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ, কৃষি, জ্বালানী এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্পখাতসমূহ মিলে সর্বমোট বরাদ্ধেরও বেশী।

২) কূটনৈতিকের ভূমিকায় পেন্টাগণঃ
আঠার শতক থেকে আমেরিকান রাস্ট্রদূতেরা সেদেশের প্রেসিডেন্টেরই প্রতিনিধিত্বই করতেন। তারা আমেরিকার পররাস্ট্রনীতি সংশ্লিষ্ট দেশসমূহ মানছে কিনা তা নিশ্চিত করত অথবা সেসব দেশকে মেনে চলতে বুঝাতো। একজন রাস্ট্রদূত তাদের কাজের ধরণ এভাবে বুঝিয়েছিলেনঃ “The rule is: if you’re in Country, you work for the ambassador. If you don’t work for the ambassador, you don’t get country’s clearance” কিন্তু দিন পাল্টেছে। বুশীয় আমলে পেন্টাগণ এই মডেলটি উল্টিয়ে দিয়েছে। সিনেটর রিচার্ড লুগার (Richard Lugar) এর ২০০৬ সালের কংগ্রেসের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাস্ট্রদূতেরা এখন অনুভব করেন তাদেরকে মিলিটারী অফিসারদের অনুগত হতে হবে। সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় তারা নিজেদেরকে দুই নম্বর টীম মনে করেন।

নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস (Robert Gates) -ও এই সমস্যা সম্পর্কে অনবহিত নন। তিনি এর জন্য সামনের বছরে অতিরিক্ত আরো অর্থ বরাদ্ধের আহবান জানিয়ে বলেছেন, আমাদের মাত্র ৬৬০০ ফরেন সার্ভিস কর্মকর্তা রয়েছে, যার জন্যই মূলতঃ সেনাদের সাহায্য নিতে হচ্ছে। এ সংখ্যা বাড়াতে আরো টাকার প্রয়োজন। এই প্রেক্ষিতে একজন রাস্ট্রদূত ক্ষোভের সাথে বলেছেন, ওই অতিরিক্ত অর্থও সামরিক খাতেই ব্যয়িত হবে।

কূটনৈতিক চাল দিতে গিয়ে আমেরিকান রাস্ট্রদূতেরা যে শব্দসমূহ ব্যবহার করেন তাহলো, ইন্টারএজেন্সি, কো-অপারেশন, সিকিউরিটি প্রবলেম, রিজিওনাল প্রবলেম ইত্যাদি। নাইন ইলেভেনের পর সংশ্লিষ্ট দেশসমূহ মেনে না চললে, ‘সহযোগিতা (co-operation)’এর সংজ্ঞা পালটে ‘হুমকি (Threat)’-তে রূপ নেয়।

৩) অস্ত্রডিলারের ভূমিকায় পেন্টাগণঃ
আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগ সম্মন্ধে মানুষের ধারণা একেবারেই ধোঁয়াটে। এর জন্য বরাদ্ধ হয় ‘কালো টাকা (Black Budget)’। গোয়েন্দা বিশারদরা বলেছেন, এই এক দশক আগেও এর পরিমাণ ছিল ২৬ বিলিয়নে। ৯/১১এর পর (২০০৩ সালে) তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ বিলিয়ন ডলারে। ‘স্পাইস্‌ ফর হায়ার (Spies for Hire)’ গ্রন্থের লেখক অনুসন্ধিতসু সাংবাদিক টিম শোরোক (Tim Shorrok) এর মতানুযায়ী, পেন্টাগণ বর্তমানে ইউএস ইন্টেলিজিন্সের আশি ভাগই নিয়ন্ত্রণ করছে যার পরিমাণ গত বছরে ছিল ৬০ বিলিয়ন ডলার। প্রাক্তণ সিআইএর কর্মকর্তা ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’-র বিশেষজ্ঞ মেল গূডম্যান (Mel Goodman) এর দৃষ্টিতেঃ The Pentagon has been the big bureaucratic winner in all of this”

২০০৬ সালে আমেরিকা একাই অস্ত্র বেচেছে সারা পৃথিবীর অর্ধেক (১৪ বিলিয়ন ডলার) পরিমান। এর মধ্যে পাঁচ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে পাকিস্তানের কাছ থেকে এফ-১৬ এর জন্য এবং সৌদী আরবের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পূনর্বিন্যাসের জন্য চুক্তি হয়েছে ৫.৮ বিলিয়ন ডলারের। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া (৫.৮ বিলিয়ন ডলার), ৩য় অবস্থানে বৃটেন (৩.৩ বিলিয়ন ডলার)। মজার ব্যাপার হল, ৭০ ভাগেরও বেশী অস্ত্র বিক্রি হয়েছে উন্নয়নশীল দেশসমূহ যারাই মূলতঃ আমেরিকার ওয়ার্ল্ড পার্টনারের গিনিপিগ।

৪) গ্লোবাল ভাইসরয় এবং ‘স্বর্গ নিয়ন্ত্রণকারী দেবতার’ ভূমিকায় পেন্টাগনঃ
বুশামলে পেন্টাগন ভাইসরয়সূল্ভ সামরিক প্রত্যাদেশের মাধ্যমে বিশ্ব সমাজকে সুস্পষ্টভাবে বিভক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। সত্যি বলতে কি, ৯/১১-এর আগ পর্যন্ত আফ্রিকা মহাদেশ ছাড়া পৃথিবীর এমন কোন দেশ ছিল না, যেখানে আমেরিকা সেনাবাহিনীর প্রভাব কোন না কোনভাবে পড়েনি। এ বছর ‘ইউএস আফ্রিকা কমান্ড (আফ্রিকম-Africom)’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানচিত্রের সেই শূন্যতাও পূরণ করা হল। মিসর বাদে এ অঞ্চলের সব দেশকে এই কমান্ডের অধীনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। মিসরকে বিশেষভাবে রাখা হয়েছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনে। নব্য ঔপনিবেশকতা বিস্তৃত করার এই ধারাকে বুশ এভাবে ব্যাখ্যা করেছেনঃ “enhance our efforts to bring peace and security to the People of Africa and promote our common goals of development, health, education, democracy and economic growth in Africa”.

আফ্রিকান এফেয়ার্সের সহকারী প্রতিরক্ষা সেক্রেটারী তেরেসা উইল্যান (Theresa Whelan) মন্তব্য করেছেন, It is about increasing the global reach of the Pentagon.

ভূ-পৃষ্ঠের উপরিভাগ দখলই যথেষ্ঠ নয়, চাই নভোমন্ডলও। মনে হয় কিছু স্বর্গের নিয়ন্ত্রনও পেন্টাগন চাইছে। জাতীয় মহাকাশ নীতি (National Space Policy) ‘ইউএস স্পেস কমান্ড ভিশন ২০২০’ প্রকাশ করে বুশ প্রশাসন বলেছে, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও তাদের অধিকার রয়েছে ‘মহাকাশ প্রতিরোধের’ অর্থাত মহাকাশে বাঁধা-বন্ধনহীনভাবে তারা যা চাইবে তাই প্রতিস্থাপন করতে পারবে। সেই সাথে থাকবে প্রতিরক্ষার দায়িত্বও তাদের উপরই।

সম্প্রতি আরো খবর বেরিয়েছে ইউরোপ, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকায় ‘ভালো সাফল্য’ অর্জনের পর মার্কিন ন্যাশনাল গার্ডের স্টেট পার্টনারশিপ প্রোগ্রাম (এসপিপি) এখন সম্প্রসারিত হচ্ছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। হনহুহু থেকে মার্কিন ন্যাশনাল গার্ড ব্যুরোর একজন স্টাফ সার্জেন্টের প্রণীত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকার কোনো অঙ্গরাজ্যের পার্টনার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের অনুরোধটি অনুমোদন করেছেন ইউএস প্যাসিফিক কমান্ডের অধিনায়ক অ্যাডমিরাল টিমোসি কিটিং। তিনি বাংলাদেশের পার্টনার হিসেবে আমেরিকার কোনো একটি অঙ্গরাজ্য খুঁজে দেয়ার জন্য ন্যাশনাল গার্ড প্রধান লে. জেনারেল স্টিভেন ব্লামকে দায়িত্ব দিয়েছেন। এ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ হবে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর সাথে জোটবাঁধা ৫৯তম রাষ্ট্র। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের এই স্টেট পার্টনারশিপ প্রোগ্রাম চালু করা হয় ১৯৯৩ সালে-সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সদ্য স্বাধীন দেশগুলোকে ন্যাটো আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য বানানোর আশা দিয়ে আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের পার্টনার করা হয় তাদেরকে। পরে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা হয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এই পার্টনারশিপের জাল। (সূত্রঃ নয়াদিগন্ত ৩ নভেম্বর, ২০০৮)

উপরোক্ত পর্যালোচনার প্রেক্ষিতে উপসংহারে বলা যায়, বুশ সরকারের আট বছরের এতসব কূটকৌশল ও অশুভ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রভাব সামনের সব বাজেটেই পড়বে। সরকারে যেই আসুক না কেন পেন্টাগনের এই রাক্ষুসী ভূমিকা থেকে কেউই বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে না। ফলত. নানান ভিশন দাঁড় করিয়ে আমেরিকার নাগরিকদের ট্যাক্স গুণতে হবে চক্রবৃদ্ধি হারে। যেমন হতে পারে, কমপ্লেক্স ২০৩০ ভিশন, ইউএভি রোডম্যাপ ২০৩০, আর্মির ভবিষ্যত যুদ্ধ পন্থা, যোগাযোগ বিভাগের ভিশন ২০৫০, পরিবেশ সুরক্ষা ভিশন ২০৫০ ইত্যাদি যার তালিকা কখনো শেষ হবার নয়। আর এই ব্যয়বহুল খরচের মাশুল দিতে হবে অন্ততঃ তৃতীয় বিশ্বকে অস্ত্র বিক্রি, তেল কব্জা, মানুষহত্যাসহ অজস্র কূটচক্রান্তের মাধ্যমে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28866525 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28866525 2008-11-09 00:18:07
ফিনিক্স পাখি এবং দুই নেত্রী
প্রবীন রাস্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামান দুই নেত্রীকে কাল্পনিক অসাধারন ক্ষমতাধর এই পাখির সাথে তুলনা করেছেন। তাঁর কাছে নিশ্চয়ই যুক্তি রয়েছে। এই উপমহাদেশের কথাই ধরুন। ইন্দিরা গান্ধীর ভস্ম থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন ফিনিক্স রাজীবের। রাজীবের পালক থেকে সোনিয়া, ‘অগ্নিমুখ’ থেকে এল রাহুল। জুলফিকার ভুট্টোর ‘গলার রশি’ ধরে থেকে জন্ম হলো ফিনিক্স পাখি বেনজীরের। তাঁর রক্ত ডিঙিয়ে চলে এল আসিফ জারদারী। জন্ম হল নতুন ফিনিক্স বিলাওয়ালের। বাপের সাথে মিলিয়ে নাম ছিল ‘বিলাওয়াল জারদারী’। কিন্তু ফিনিক্স পাকাপোক্ত করে নামও পালটে রাখা হল ‘বিলাওয়াল ভুট্টো’। শ্রীলংকার ফিনিক্সজনক হলেন সলোমন বন্দরনায়েকে। শত্রুর আঘাতে তাঁর ‘পবিত্রাগ্নি’ থেকে চলে এলেন একসাথে স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে এবং মেয়ে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গে। বাংলাদেশের অতীত ও ভবিষ্যত ফিনিক্স পাখিদের কথা সবার সামনে পরিস্কার থাকায় আলোচনা নাইবা করলাম।

ইতিহাসে সূত্র ধরে আপনাদের উপরো আঘাত এল । দুই দলেই জন্ম নিল কিছু ইঁদুরের। কেঁপে ঊঠছিলেন আপনারা। ভাবতেও পারেননি এত্থেকে আবার জেগে উঠবেন। কিন্তু ওই যে ফিনিক্স পাখি, আঘাত এলে আবার নতুন করে গজায়! আপনাদেরকে নিঃশেষ করতে পারেনি। তরবারীর নীচে মাথা রেখে কলমযোদ্ধারা জনতাকে জাগিয়ে দিয়ে জিতিয়ে দিল। বাংলার মানুষেরা প্রানভরে ভালবাসল। কিন্তু আপনারা কি নতুন করে জন্ম নিয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নিতে পারবেন? সমগ্র দেশের নেত্রী হয়েও বিদেশে এসে সারাক্ষন যখন ‘দল’, ‘দল’ করেন, যারা বিদেশে বসে ‘দেশ’,’দেশ’ করে তাঁরা বড্ড অসহায় হয়ে পড়ে। আর ফখরুদ্দিন সাহেব তো আপনাদের দুইজনকে পেঁচিয়ে জাতিসংঘের সাধারন সভায় ২৬ সেপ্টেম্বরে গর্বের সাথে স্বদেশ সম্মন্ধে বললেন, ‘দশকের পর দশক ধরে চলে আসা দুর্নীতি দেশের গনতন্ত্র ও অর্থনীতিকে গ্রাস করেছিল’। গতবছর বলেছিলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে দুর্নীতির দুষ্টচক্রে গণতন্ত্রের উপাদানগুলো আবদ্ধ ছিল’। নিজের দেশ সম্মন্ধে সেই দেশেরই শীর্ষনেতৃবৃন্দের এরকম ‘নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মার্কা’ টাইপের কথাবার্তা পত্রিকায় প্রকাশ হয়ে পড়ায় বিদেশীদের নিকট থেকে মুখ লুকাবার জায়গা খুঁজি আমরা। ‘কার আমলে বেশী দূর্নীতি’ এ নিয়ে ঝগড়া বানরের তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে এক লাফ উপরে আর দুই লাফ নীচে নামাতেই জনম শেষ হয়ে যাবে, সমাধান মিলবেনা। যাহোক, পারবেন কি দলীয় গন্ডীর উর্ধ্বে উঠে মনটাকে আকাশের মত উদার করে সব মানুষকে ভালবাসতে? দলতো অনেক করলেন, দেখলেনও অনেক।জেনে গেলেন দৃশ্য-অদৃশ্য শক্তির নানান খেলা। আরো জানলেন, কারা আপনাদের সত্যি সত্যি ভালবাসে আর কারা আপনাদেরকে ভালবেসে চালাকি করে। জনতার কাতাড়ে না গিয়ে কোন্ শেকড়হীনেরা নিজেদের অস্তিত্ব বা গুরুত্ব বাড়াতে আপনাদের ব্যবহার করে? ঘৃণা ও বিভক্তির রাজনীতি করে। তাই বলে বলছিনা দল ছেড়ে দিতে। দলই আপনাদের পরিচয় বাড়িয়ে দিয়েছে, সত্য। বলছি মনটাকে অনেক বড় করতে।

ধরুন, আপনি ঢাকা থেকে বিমানে চড়ে বিদেশ যাত্রা করছেন। জিয়া থেকে একটু উপরে ঊঠেই হয়তো আপনি খোঁজার চেষ্টা করেন আপনার প্রাণপ্রিয় রাজনৈতিক দলের নয়াপল্টন বা বঙ্গবন্ধু এভিনিঊয়ের হেড অফিস। আর একটু উপরে উঠে দেখতে চান ঢাকা শহর, পরে খুঁজে ফেরেন বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষা আপনার প্রিয় মেগাসিটিকে। এক সময় হয়তো হাতড়ে খোঁজার চেষ্টা করেন সমগ্র বাংলাদেশটাকেই। সেটিও একসময় দৃষ্টির সীমানায় হারিয়ে যায়। এবার খোঁজেন উপমহাদেশ, তারপর এশিয়া। পার হয়ে যান একসময় প্রশান্ত মহাসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর ইত্যাদি। এই আপনাকেই যদি মহাকাশের অভিযাত্রী বানিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় মহাশুন্যের কোন গ্যালাক্সিতে, এবার আপনি দেশ মহাদেশের ঊর্ধ্বে উঠে খুঁজতে চাইবেন সমগ্র পৃথিবীটাকে।

ওবামা ও ম্যাককেইনের নির্বাচনী প্রচারনায় সারা আমেরিকানদের সাথে নিয়ে একসাথে কাজ করবার অভিপ্রায়ের কথা মনে পড়ছে। তাঁদের কথা আপনাদের মুখ দিয়ে বলায়েই না হয় আজকের আলোচনা শেষ করব।

কেন এমন হলো?

অন্তর্নিহিত রহস্য পূর্বে আঁচ করতে না পারলেও এটি ছিল গতানুগতিক হেঁয়ালী, একরোখা, পশ্চাদমূখী ও স্মরণশক্তিহীন বা ‘পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় অপরিবর্তনশীল’ রাজনীতির লৌহ কপাটে আত্ম-উপলদ্ধির করাঘাত। সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন ও মেরুদন্ডহীন মনোবৃত্তির প্রতি প্রচন্ড বিদ্রোহ। দলীয় শৃংখলে আবদ্ধ হিংস্র ও বর্বর মানুষ পেটানো রাজনীতির বিপরীতে অমিয় সুবাতাসে দেশটাকে শান্তি ও উন্নয়নের মরু উদ্যানে পরিনত করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। স্তাবকদের শঠতা, মিথ্যা কুহেলিকা ছিন্ন করে প্রখর দৃষ্টি নিয়ে শত্রুকে চিনে সম্মুখপানে চলার প্রতিযোগিতা। মোদ্দাকথা, ব্যারিস্টার রফিকের ভাষায় ‘চোর-বাটপারদের’ চিরতরে কবর দেয়ার সাহসী চেতনাই যেন হয় ওয়ান ইলেভেনের শিক্ষা।

দেশের মানুষই এত্থেকে কিন্তু আপনাদেরকে উদ্ধার করল, দল করেনি। সাধারন মানুষ নামের অজেয় শক্তি এই মূহুর্তে অনেককেই মাইনাস করে দিল, আপনাদেরকে করেনি। সাথে আরো একটা বিষয় পরিস্কার হয়ে গেছে। সেটা হলো প্রতিটা রাজনৈতিক দলই এদেশের মাটি থেকেই উতসরিত। প্রতিপক্ষ দলসমূকে কথায় কথায় ‘অমুক দেশের দালাল’, ‘তমুক দেশের আলাল’ বলে যে গালমন্দ করেন, কই তাঁরা তো কেউই আপনাদের উদ্ধার করতে এল না! বরঞ্চ দৃশ্য-অদৃশ্য বিনি সূতোর মালায় তাঁরা কি করেছে তা তো সাব-জেলে বসেই জেনেছেন নিশ্চয়ই। এদেশের সাধারন জনতাই আপনাদের উদ্ধার করেছে। দয়া করে তাদের ভালবাসাকে আর ফিরাবেন না।

দুই নেত্রীর মুখ চাওয়া-চাওয়ির কথা বলতেই ‘অসভ্য’ কথা বলার মহড়া আবার শুরু হয়ে গেছে। সংসদের বাইরে ‘পলিসি সামিট’ এই মূহুর্তে প্রয়োজন রয়েছে কিনা সে প্রসংগ বাদ দিয়েই বলতে পারি যে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গলদঘর্ম হয়ে যাবেন কিন্তু এরকম কোন সুশীল দেশ খুঁজে পাবেন না যেদেশে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মধ্যে ‘হ্যান্ডশ্যাক’ পর্যন্ত হারাম। কংগ্রেস-বিজেপি, পিপিপি-পিএমএল, মালয়েশিয়ায় বিএন-কাআদিলান রাকায়েতসহ দুনিয়ার সাপে নেউলে সম্পর্ক অন্যান্য দলের দিকে তাকালেও হিসাব মেলেনা। কানাডার কনজারভেটিভ-লিবারেলদের মধ্যকার উত্তপ্ত বাক্যবান দেখলে বাংলাদেশের সংসদের দৃশ্য সহজেই চোখে ভাসে। অথচ, পার্লামেন্ট ভাঙার আগে প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের বাসভবনে আলোচনা করতে এসে বিরোধী দল নেতা স্টিফেন ডিওনের হাস্যরসাত্মক ছবি আমাদের জন্মভূমিতে কল্পনায়ও কেন পাইনা?

এমন তো হওয়ার কথা ছিলনা!

অতিথি আপ্যায়ন, এমনকি শত্রুকেও পাশে স্থান দেওয়ার হাজার বছরের সমৃদ্ধ কালচারের দেশে কোন্ স্তাবকেরা আপনাদেরকে মাটি নয় যেন ‘ধাতব পদার্থের তৈরী’ অতি দানবীয় রূপে রুপান্তরিত করে দিলো? অথচ, বার বার প্রধানমন্ত্রী ও মানুষের দৃষ্টিতে লৌহ মানবী হয়েও চল্লিশোর্ধ ছেলেকে জড়িয়ে পাগলের মত চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেন, নবজাতক নাতী-নাতনীদের দেখার জন্য বা সদ্য প্রসূতা মেয়েকে অপত্য স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য পাগল হয়ে যান! এর উত্তর আগে জানলেও এখন বোধ করি আর অজানা নেই। আব্দুলদের মাইনাস করার মত আপনাদেরকে এই বন্দনা সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। লন্ড্রী করা সাদা জামা-কাপড় পড়ে এসব মিডিয়া বাঘদের সুফী সুফী কথাবার্তা জাতি অনেক শুনেছে। এবার লুটেরা বা ‘মোর ক্যাথলিক দ্যান পোপ’ নয়, ইতিবাচক মনোবৃত্তির সত্যিকার দেশপ্রেমিকদের জাতি দেখতে চায়। প্রতিদ্বন্দ্বীতার চরম মূহুর্তে মাত্র চার হাজার মানুষের প্রানহানি নাইন ইলেভেনের সাত বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজনীতি বাইরে রেখে ওবামা ম্যাককেইন এক মঞ্চে উঠতে পারলেও, লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের দিনটিতেও আপনারা এক হতে পারেন না।

আপনারা কি পারবেন না ভবিষ্যত প্রজন্মের দিকে চেয়ে শুধু সামনের দিকের কথাই বলতে? অনেকযুগ তো পেরিয়ে এলেন। শুধু পেছনের দিনের কথা বলে জাতি কি কিছু পেয়েছে? চিরদিন বিভক্তি আর ঘৃণা নিয়ে কোন জাতি বাঁচতে পারে? কোন দেশের রাজনীতিই ‘অতীত’ নামক কুপমুন্ডকতা এভাবে জগদ্দল পাথরের মত ঘাড়ে চেপে বসে জাতিকে যুগের পর যুগ উস্কে দেয়না। আমেরিকায় ডেমোক্রেট রিপাবলিকান মোটামুটি সব প্রেসিডেন্টের ঝুলিতেই একাধিক কেলেংকারীর কলংক থাকলেও সমালোচনার তীর ঠিক আগেরজনের বেশী অতিক্রম করেনা। আর আমাদের দেশে আগেরজন তো দূরে থাক অশ্রাব্য বাক্যবানের শূল কারো জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে নিয়েও চলে। পুরাতন ফিনিক্সদের স্ব-স্ব অবস্থানে রেখে দিন, তাঁদের নিয়ে আর রাজনীতি করবেন না। এ বছর ৪ এপ্রিল আমেরিকার কালোদের প্রবাদপুরুষ মার্টিন লুথার কিং-এর ৪০ তম হত্যা দিবস উপলক্ষ্যে প্রার্থনা সভায় নিজের বাবার নির্মম হত্যাকান্ড স্মরন করে তার ছেলে চল্লিশ বছর পিছনে ফিরিয়ে না তাকিয়ে চল্লিশ বছর সামনের দিকে তাকাতে আমেরিকাবাসীদের আহবান জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘পুরোন কথা তুলে এনে কি লাভ, চল্লিশ বছর পর আমরা দুনিয়াতে কি দিব তাই নিয়েই ভাবুন।‘

কি চাই এবার?

তাই বলছিলাম, আশার কথা শোনান। জাতিকে ভিশন ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা দেখান। রূপকথার গল্পের ফুলঝড়ি বা দুয়োরানী-সুয়োরানীর শোকগাঁথা কল্পকাহিনী নয়। সশ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আপনাদের কেউ বলছেন ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বে একটি মধ্যআয়ের দেশে পরিনত করবেন, অত সালের মধ্যে নিরক্ষতামুক্ত দেশ উপহার দিবেন, ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়াবেন ইত্যাদি।কিন্তু কিভাবে? সেটি নিয়ে ন্যুনতম কোন গবেষনা তো আপনাদের দলের ওয়েবসাইট বা কোথাও চোখে পড়ল না!

সবার আগে ঠিক করুন ‘স্ট্র্যাটেজিস্ট’ বা ‘কৌশলী’। বাংলার মানুষদের মনন , ঐতিহ্য ও মাটির গন্ধে মিশে আছে এবং গ্লোবাল পলিটিক্সের বর্তমান ধারা নখদর্পনে এমন আধুনিক এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানুষদের নিয়ে গড়ে তুলুন ‘থিংক ট্যাংক’। আগে থেকে আপনাদের সেসব আছে কিনা জানিনা। থাকলে তা পালটিয়ে ফেলুন। কারন, তাঁরা যা দেবার, জাতিকে তা দিয়ে ফেলেছেন। রাস্তায় শবের উপর বিভীৎস নৃত্য ও ওয়ান ইলেভেনের ধারনা কয়েক বছর আগে কানাডিয়ান আইনজীবি উইলিয়াম স্লোন জানলেও আপনারা কিন্তু তা জানেননি। দেশজ থিংক ট্যাংক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ডালপালা আপনার পাশে থাকলে আগে থেকেই ইংগিত পেতেন। ইউএস ডিপার্টমেন্ট স্টেটের পলিসি ও প্ল্যানিং ডিরেক্টর রিচার্ড হায়াস এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বলেন, ‘Of many influenc on US foreign policy formation, the role of think tank is among the most important and least appreciated’।

ম্যাককেইনের দলীয় সম্মেলনে দেয়া ভাষন দিয়ে আজকের আলোচনা শেষ করার ওয়াদা প্রথমেই আপনাদেরকে দিয়েছিলাম। ওবামার কথাটাও এমনি ছিল। এবার সেটি কল্পনায় আপনাদের দুজনের স্ব স্ব মুখ থেকে পৃথকভাবে না হয় শুনে নেই! ‘বাংলাদেশীরা এক দল অন্য দলের বিরুদ্ধে আর বিষোদগার দেখতে চায় না। দেশের দুই দলের সদস্যদের সাথেই কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। আমাদের মূল সমস্যাটা কোথায় তা আমি জানি। আর এও জানি নিরপেক্ষভাবে দলের উর্ধ্বে ঊঠে কিভাবে এর সমাধান করতে হয়। আসুন, আমরা সব দলের মধ্যকার ভাল ভাল ধারনাগুলো কাজে লাগাই। আমরা সবাই এক স্রষ্টার বান্দা, সবাই বাংগালী।এই বাংলাদেশের জন্যই আমি যুদ্ধ করেছি। আর এবার আমি ঠিক আপনার (অর্থাত দেশের মানুষের) জন্যই লড়ব’।

দৈনিক নয়াদিগন্ত লেখাটা ছেপেছে ১০ই অক্টোবর, ২০০৮।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28853062 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28853062 2008-10-10 16:12:52
শুরু হলো পথ চলা
হাঁটি হাঁটি পা পা করে সামারাহ্ বেড়ে উঠছে। আজ ওর জীবনের প্রথম শিক্ষালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু। সপ্তাহ খানেক ধরে উত্তেজনায় ছটফট করছে সে। যেদিন স্কুলব্যাগ কিনে দিলাম এক মূহুর্তের জন্যও কাঁধ থেকে সরেনি। আয়নার সামনে গিয়ে বারেবারে দাঁড়ায়। এপাশ ওপাশ ঘুরে ফিরে দেখে। অনাবিল আনন্দ ও উদ্দীপনায় রাতে ঘুমাতেও পারেনি। ব্যাগের ভিতর কি কি ভরবে, পানির বোতলটা কোন পাশে থাকবে, খাবারইবা কিভাবে রাখবে, এই ব্যাগের সাথে ক্লাসমেটের আর কারো ব্যাগ যদি মিলে যায় তবে চিনবে কেমনে, টিচারইবা ব্যাগটি দেখে কি বলবে, এরকম কত যে নিষ্পাপ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছি আমি! বিরক্ত হইনা। আমার অফিস-ব্যাগ যেইখানে রাখি ঠিক তার পাশেই ওর স্কুল-ব্যাগটা রেখে স্থির নয়নে অবলোকন করে বারবার।

ক’দিন আগে বাবা ও ছেলেকে নিয়ে চমতকার একটা এটাচমেন্ট ই-মেইলে কে যেন পাঠিয়েছে।

বারান্দার রেলিং-এর উপরে একটি কাককে দেখিয়ে বাবা তাঁর তরুন ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘মাই ডিয়ার সান, বলতো ওটা কি?’
ছেলের সহজ উত্তর, ‘কাক, বাবা’
একই প্রশ্ন আবারো, ‘প্রিয় বত্‌স, ওইটার নাম কি?’
‘বললাম তো কাক, বাবা।‘
বাবা আবার জিজ্ঞেস করেন, ‘কি নাম পাখিটার?’
‘তুমি কি শুনছো না? বললাম তো কাক’
আবারো, ‘পাখিটার নাম কি যেন?’
পিতার প্রতি ছেলের এবার বিরুক্তি চরমে। বলে, ‘তোমাকে আমি আর কতবার বলব, এটা কাক, এটা কাক, কাক, কাক, কাক, কা...ক, কা....ক, কা........’

বাবা এবার ছেলেকে ডাকেন। বেডরুমে আদরের ছেলেকে নিয়ে গিয়ে তাঁর পুরোনো দিনের ডায়েরীর পাতা উল্টিয়ে দেখান। ওর বয়স যখন তিন বছর, বারান্দার ঠিক সেই স্থানটিতেই একটি কাক বসেছিল।

ছেলে আজকের মতই পিতার কাছে জানতে চেয়েছিল ‘ওইটা কি, বাবা?’
‘কাক, মাই ডিয়ার সান’, বাবার উত্তর।
ছেলে বাবাকে বারবার একই প্রশ্ন করে চলে। একবার, দুইবার, তিনবার নয়, ছাব্বিশ বার। বিরুক্তিহীনভাবে বাবা
প্রতিবারই ছেলের প্রশ্নের উত্তর অবলীলায় সঠিকটাই দিয়েছেন। শুধু তাই নয় প্রতিবারই ছেলেকে কোলে তুলে গালে একটি করে চুমোও।
বাবা আজ ডায়েরীতে লাল কালি দিয়ে বড় বড় করে লিখলেন, ‘এই রিটায়ার্ড বয়সে বিশ বছরের ছেলে তাঁর সেই প্রশ্নের উত্তর তিনবারও দিতে পারল না’।

আমি সামারাহ্‌র দিকে তাকিয়ে ওর মত করে ভাবার চেষ্টা করি। চুপচাপ ওর কান্ডগুলো পরখ করি।
‘বাবা, আমি কিন্তু অনেক বড় হয়ে গেছি’।
জিজ্ঞেস করি, ‘কত বড় হয়েছো, মা? আমার সমান?’
‘না, তোমার চেয়ে একটু ছোট। আমি তো আর বেবি না, আমি হলাম বিগ গার্ল, সাওদা হল বেবি’। ঈশারা করে ওর এক বছর বয়সের বোন সাওদাকে দেখায়।

স্কুল বাসে চড়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কল্পনা করছে কার্টুন বোঝার পর থেকেই। ‘আমি কিন্তু তোমার গাড়ীতে চড়ে যাব না। বাসার সামনে যে স্কুলবাসটা আসে, ওইটাতেই যাব। আর হ্যাঁ, বাসের ভিতর থেকে তোমাদেরকে ‘বাই’ দিব। তোমরা কিন্তু আমার সাথে আসবা না। ঠিক আছে।‘
আমি বলি, ‘ঠিক আছে। তুমি তো আমার বড় মেয়ে!’
‘আর শোনো, তোমরা আমার জন্য ওয়েট করবা। স্কুল থেকে যখন ফিরব, তখনি একসাথে বাসায় আসব, তার আগে না কিন্তু, ও.কে? আচ্ছা, আমার জন্য তোমাদের মন খারাপ হবে না? সাওদা তো আমাকে মিস করবে’।পাকামো করে আরো বলে, ‘কিন্তু কি আর করা! আমাকে তো স্কুলে যেতেই হবে। তাই না?’

এদেশে চার বছর বয়স থেকে জুনিয়র কিন্ডার গার্টেন স্কুলে যাওয়ার নিয়ম। বছরে মোট দুইটি স্কুল সেশন। শরত (Fall) শুরু হয় সেপ্টেম্বর থেকে আর শীতেরটা (Winter) শুরু জানুয়ারী । গ্রীষ্মে (Summer) না গেলেও চলে। জুনিয়র কিন্ডার গার্টেনে নতুনদের ভর্তি হয় সেপ্টেম্বরের শুরুতে। জন্ম তারিখ যদি সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের শেষদিনেরও কোন এক দিনের মধ্যে পরে, তবুও সে ওই সেশন ধরতে পারবে, যদিও তার বয়স চার বছরের কম। মাত্র ছয়দিনের জন্য সামারাহ্কে পরের সেশন থেকে যেতে হচ্ছে। অবশ্যি পাশের ইসলামিক সেন্টারে আমরা ওকে আগেই দিয়েছি। আছর থেকে মাগরিব পর্যন্ত প্রায় দুই ঘন্টা করে সপ্তাহে চারদিন আরবী শেখে। বাংলাদেশী একজন ছাত্রও নাই, উপমহাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের শিশুরাই ওর ফ্রেন্ড। প্রথম দিকে আশপাশে থাকতে চাইতাম।‘পার্সোনালিটি’তে সম্ভবত খুব আঘাত লাগত। ‘বড়’ দাবী করে আমার প্রস্থান নিশ্চিত হয়ে তবেই ও ওস্তাদের কাছে ফিরত।

আমি আমার শৈশবে সাড়ে চার বছর বয়সের জীবনের স্মৃতি হাতড়াতে থাকি। এমন অনুভূতি কি হয়েছিল? ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডের সিটিজেন মেয়ের তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক বাবার জীবনে এরকম অনুভূতি কি হয়েছিল? না হয়নি। গ্রামে আমাদের বাড়ীর গা লাগানো মাদ্রাসা। মামা-খালাদের সাথে কবে যে খেজুর পাতার উপর বসে ছাত্রজীবন শুরু হয়ে গিয়েছিল মনেই নেই। মাদ্রাসা থেকে চার বছর পর পালিয়ে গেলাম প্রাইমারী স্কুলে। উদ্দেশ্য প্রাইমারী স্কুলের ফার্স্ট বয়কে টপকানো। সহপাঠিদের টিটকারী ‘মাদ্রাসায় ফার্স্ট হওয়া খুবই সহজ, প্রাইমারীতে গেলে পারবা না’! সেই যে শুরু হয়ে গেল আর থামেনি পথ চলা। ব্যাক-প্যাক, বাথরুম ট্রেইনিং, লাঞ্চ-ব্যাগ, হাইজেনিং ট্রেইনিং সেগুলো স্বপ্নেও ছিলনা।

স্কুল অফিসিয়ালি শুরুর আগে কর্তৃপক্ষ ছাত্র/ছাত্রী সবাইদের একদিন ডেমো দেন।আমরা প্যারেন্টরা ক্লাস রুমে বসে দেখলাম ক্লাস টিচার কিভাবে পড়াচ্ছেন। কাঁচি দিয়ে পেপার কাটা, ক্রেইয়ন দিয়ে ছবি আঁকা, গ্লু দিয়ে কাগজ লাগানো, টবে সানফ্লাওয়ারের বীজ রোপন ইত্যাদি। কার্টুন ও গানের তালে তালে বর্ণমালার পরিচয় দিতে গিয়ে দেখলাম ভীষন মনোযোগী তরুনী টিচার যেন স্টুডেন্টদের চেয়েই বেশী নাচছেন।

আরেকদিন ছিল ‘প্যারেন্ট-টিচার-স্টুডেন্ট’ সিটিং। এটা ঠিক ক্লাস শুরুর এক সপ্তাহ আগে। মেয়েকে নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন ও পরামর্শগুলোই মূলতঃ টিচারের সাথে শেয়ার করা।তিনি আমাদেরকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘সিনিয়র স্টুডেন্টরা ভেরী কো-অপারেটিভ। তারা ওদের খুব হেল্প করবে। এক একজনকে বাস থেকে সোজা নিয়ে আসবে ক্লাস রুমে। এভাবেই তাদের কাজ ভাগ করে দেয়া হয়েছে। চিন্তা করোনা’। সামারাহ্র ক্লাস টিচার মিস পিকুলা লাঞ্চ ব্যাগ, ব্যাক-প্যাক, এক্সট্রা প্যান্ট-শার্ট, জুতা (দূর্ঘটনা সামাল দেয়ার জন্য স্কুল থেকে পরামর্শ দেয়া হয় কাছে রাখতে) ইত্যাদি রাখার জন্য প্রত্যেক ছাত্রদের জন্য বরাদ্ধকৃত ক্যাবি আমাদের দেখালেন । তিনি একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে লিখতে বললেন মেয়ের যেসব দিকটা আমাদের ভাল লাগে সেসব। কাগজটা হাতে নিয়ে একটু ভাবি। এমন লোককেও জানি প্রথমদিনেই হেড টিচারের কঞ্চির কষাঘাত আমাদের গ্রামের অনেককে আর স্কুলমূখী করতে পারেনি। সকাল ৯ টা থেকে একটানা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত ভিন্ন দেশের সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশে সামারাহর প্রথম জীবনে ছন্দময়তা আসবে তো? অস্থির হয়ে যাই।

কানাডার স্কুলিং সিস্টেম বিভিন্ন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রত্যেক বোর্ড যে একই নিয়ম মেনে চলবে তা কিন্তু নয়। অনেক জায়গায় জে.কে হাফ-ডে’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে। কিন্তু আমাদের অঞ্চলে ফুল-ডে। পার্থক্য হল প্রত্যেক দিনের বদলে ফুল ডে ওয়ালাদের ক্লাস হয় সপ্তাহে মাত্র দুইদিন প্লাস দুই সপ্তাহে এক শুক্রবার।

আজ ৯ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮। সামারাহ্‌র স্কুলের যাওয়ার চুড়ান্ত দিন। আগের রাতেই ওর মা যত্নসহকারে মোটামুটি প্রস্তুতিপর্ব সেরে রেখেছে। এখন শুধু স্যান্ডউইচ বানানো বাকি। খুব ভোরে ঘুম থেকে ডেকে উঠালাম। মনে হয় রেডী হয়েই ছিল। ধরমর করে উঠে বলে ‘আজ আমার স্কুল?’ বলি, ‘হ্যাঁ, আজ তোমার স্কুল’। ‘আমি বাসে করে যাব না?’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ। তুমি বাসেই যাবা, মা।‘

আজ সামারাহ্ স্কুলে যাবে।
মনে পড়ছে ২০০৪ সালের জানুয়ারির ৫ তারিখ। প্রচন্ড শীত, হিমাঙ্কের নীচে তাপমাত্রা। মিশিগানের আকাশ পরিস্কার। আগের রাতে মুষলধারায় বরফ পড়েছে। ফজরের নামাজ শেষে বাম দিকে সালাম ফেরাতেই ফোন রিং। এমন অসময়ে ফোন? ধরতেই ওপার থেকে হেনরীফোর্ড ক্লিনিকের মিডওয়াইফ রোস্কির কন্ঠ। ‘তোমার স্ত্রীকে এখনই নিয়ে আসো। আজকেই বেবি আউট করব আমরা।‘

ডিঊ ডেট পার হওয়ার তিনদিন পরও পেইন না উঠায় অনাগত বেবির কোন ক্ষতি যাতে না হয় সেজন্যই তাদের এই পরিকল্পনা।ওর মা তখনো নামাজ পড়েনি।ওজু করছে। ফোনের কথা কিছুই বলিনা। চুপচাপ বসে থাকি। মিডওয়াইফের পরামর্শ অনুযায়ী আগেই একটা ব্যাগ মোটামুটি গোছানো আছে। নামাজ শেষে বললাম, ‘ব্যাগটা নাও, হাসপাতালে যেতে হবে’। ও চমকে উঠে ভয়ার্ত কন্ঠে বলে, ‘কেন?’

গাড়ীর ইমার্জেন্সী লাইট অন করে ফ্রি ওয়ের পাশ ঘেঁষে বিকল্প পথ ধরে ধীরে ধীরে ড্রাইভ করি। তুষারপাতের দরুন রাস্তাটি বেশ পিচ্ছিল। ছেলেপুলেরা থোকা থোকা সাদা বরফ দিয়ে রাস্তার দু’পাশে কৌতুক করে ‘পোলার বিয়ার’ বানিয়ে রেখেছে। সূর্যের নিস্তেজ ও মায়াবী রোদ বরফকণার উপর আছড়ে পড়ে সকালটাকে বেশ মনোরম সাজে সাজিয়েছে। আর আমি ড্রাইভ করছি নতুন জীবনের সন্ধানে। এক মায়ের পেটফুঁড়ে উতসরিত হবে আরো একটি তাজা প্রাণ! কল্পনার রাজ্যে যেন সাঁতার কাটছি আমি!

প্রায় পনের মিনিট পর ডেট্রোয়েট হেনরীফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হলাম। বাচচা-কাচচা হওয়ার সময় বা পরবর্তী সবচেয়ে দূর্দান্ত নিদ্রাহীন দিন-রাতগুলোতে দেশে যেখানে পুরুষ মানুষদের খবরই থাকেনা, সেখানে পরবাসী মানুষগুলোর প্রতিটা মূহুর্তই যেন কাটে চরম ব্যস্ততা, শঙ্কা ও উদ্বিগ্নতায়।চাইল্ড বার্থ ক্লাসে তাই ইনস্ট্রাক্টররা বলেন, 'প্রেগন্যান্ট শুধু মাম্মি নন, ড্যাড্ডিও'। ‘মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত কথাটা’ কেন যে বলা হয়েছে তার প্রমাণও সহজেই মেলে। সন্তান প্রসববেদনার সাথে দুনিয়ার কোন কষ্টেরই বুঝি তুলনা নেই! আমাদের অনুরোধেই হাসপাতালের ডেলিভারী রুমে সাঁটানো ছিল ‘শুধুমাত্র মেয়েরাই ঢুকতে করতে পারবে’ এই ধরনের একটা সাইনবোর্ড। বয়স্ক এক অভিজ্ঞ সাদা মহিলা ছিলেন ধাত্রী। বললেন এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার বাচচা তাঁর হাত দিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়েছে। সাথে ছিলেন এক নার্স। ভয়ংকর এই কষ্টের মুহুর্তে বললাম, ‘এই জন্যই মনে হয় আমাদের নবী বলেছেন, জননীর পায়ের তলায় সন্তানের বেহেশত’। কথাটা শুনে দুইজনই চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘Who is your Prophet?’ নাম বলতেই মিডওয়াইফ বললেন, ‘হি মাস্ট বি এ ওয়াইজ ম্যান’। বিরতিহীন টানা নয় ঘন্টা কষ্ট শেষে ৭ পাউন্ড ৭ আউন্স এবং একুশ ইঞ্চি উচ্চতার সামারাহকে পেলাম বুধবার ৬ই জানুয়ারীর বিকাল চারটা চৌদ্দ মিনিটে।

চোখের সামনে বড় হয়ে স্কুলে যাওয়ার বয়স ওর হয়ে গেল! আজকে অফিসে যাওয়া পিছিয়ে দেই। গতকাল অফিসের সবাই কংগ্রাচুলেশন দিয়েছে। ওর দিকে তাকিয়ে থাকি, মারাত্মক প্যাকড্ সে। পিঠে ‘ব্যাক-প্যাক’, এক হাতে ‘লাঞ্চ ব্যাগ’, অন্য হাতে ইমার্জেন্সী কাপড়চোপড় ও স্কেটস্সহ আরো একটি। সামারাহকে নিয়ে হলুদ রঙের স্কুলবাসের কাছে আসি। কানাডা আসা চার বছর হয়ে গেলেও কোন ধরনের বাস বা ট্রেনে উঠার অভিজ্ঞতা এখনো হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ও অভিজ্ঞের মত নিশ্চিন্তে অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সাথে বাসের কোথায় গিয়ে যেন বসল! দেখতে পাচ্ছিলাম না। উলটো দিকে গিয়ে দেখি জানালার পাশে বসে হাসছে। আমি হাত উঁচু করে উড়ন্ত আদর জানিয়ে দিয়ে বলি‘আল্লাহ হাফেয’। আমাকে 'বা....ই (b....y....e)’ বলে ফেরত দেয়, যার জন্যই মূলতঃ অপেক্ষা করেছিল প্রায় ছয়মাস!

একসময় ২২১ নাম্বারের স্কুলবাসটি ছেড়ে দেয়।ওর অন্তবিহীন পথের এই মুহুর্তটা সূচনা ভেবে কিছু সময়ের জন্য কেন যেন আনমনা হয়ে যাই! দৃষ্টির সীমানার বাইরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি কটকটে হলুদ রঙের চলন্ত বাসটির দিকে তাকিয়ে থাকি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28851071 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28851071 2008-10-05 05:09:48
অগ্নি পরীক্ষায় ওবামার ‘চেঞ্জ’ (শেষ পর্ব) অগ্নি পরীক্ষায় ওবামার ‘চেঞ্জ’-আগের পর্ব পড়ুন

ম্যাককেইনের ‘ভেরী এগ্রেসিভ’ প্রচারনার বিপরীতে ওবামাও খুব খাটছেন ক্যাথলিকদের মন পাওয়ার। ম্যাককেইনের সমর্থকরা ওবামাকে দোষছেন ‘দি এবোরশেন প্রেসিডেন্ট’ বলে। কারন ওবামা গর্ভপাত ও সমকামী অধিকার আন্দোলনের পক্ষে। অবশ্য ওবামাশিবির যুক্তি দেখাচ্ছে, অর্থনীতি, পরিবেশ ও দারিদ্র্য মোকাবেলায় তারা যে নীতি গ্রহন করেছে তা বাস্তবায়িত হলে ক্যাথলিকদের দাবী অনুযায়ী রিপাবলিকানদের চেয়েও গর্ভপাত হ্রাস পাবে।

ওবামার প্রচারণা-গোষ্ঠী ক্যাথলিকদের বিশেষ টার্গেট নিয়ে ‘ইয়ং ক্যাথলিক’, ‘সোশ্যাল জাস্টিস ক্যাথলিক’ ও ‘উইমেন রিলিজেয়াস কমিউনিটি’ ভাগ করে তাদের পেছনে কাজ করছে। রিগ্যান প্রশাসনের সাবেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ ডগলাস কমিকের ওবামাকে নিয়ে লেখা সাম্প্রতিক “Can a Catholic Support Him” বইটিকে তারা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করছে।

যাহোক, ওবামার সাড়া জাগানো ভাবমূর্তি মোকাবেলায় জেন্টেলম্যান ম্যাককেইন বেশ সংযত, মিতব্যয়ী। বেশ সম্মানজনক পথ তিনি বেছে নিয়েছেন। এ পর্যন্ত মাত্র ছয়বার সরাসরি ‘ওবামা’ নাম ধরে কথা বলেছেন। তিনি ওবামাকে ‘অপরিপক্ক’ ও ‘দেশের চেয়ে নিজের ক্যারিয়ার নিয়েই ব্যস্ত’ বলে মনে করেন। ওবামা কিন্তু এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছেন। তিনি তাঁর নাম অসংখ্যবার উচ্চারন করছেন। বলছেন, ‘I’ve got news for you, John McCain. We all put our country first.’ এই “Country First” ই হল এবারের জন ম্যাককেইনের মূল শ্লোগান। ওদিকে ম্যাককেইন শিবিরও ‘Change’ শব্দ ব্যবহার করে মুখে ফেনা তুলছে। ওবামার জনপ্রিয় শ্লোগান ‘চেঞ্জ’-র সার্থক রূপায়ক একমাত্র ম্যাককেইনই অভিহিত করে রিপাবলিকান কৌশলী স্টিভ শমিড (Steve Schmidt) বলেছেন, ‘John McCain has a record of fighting to change.’ ওবামার শ্লোগানটি এভাবে চুরি হয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু না। কারন ভোটের শেষ মুহুর্তে রিপাবলিকানদের ‘ডার্টি গেম’-র নজির আমেরিকানদের কাছে আছে। গেল বারের নির্বাচনে জন কেরীর স্বাস্থ্য ও ইরাক ইস্যু বেশ জনপ্রিয় লাভ করায় বুশ দেশের ‘নিরাপত্তা’কেই মূল ইস্যু বলে আমেরিকানদের উত্তেজিত করে ফলাফল পালটে দেন।

পলিনের বাকপটুতা ও জেদী ইমেজ এখন আমেরিকার রাজনীতিতে আলোচ্য বিষয়। মাত্র দশ হাজার লোকের শহর ওয়াসিলার একসময়ের মেয়র এই পলিনকে আগে মূল রাজনীতিতে পরিচিতি না থাকায় সাংবাদিকরা জ্বালায়নি। এখন চটকদার নিউজ পরিবেশন করতে মিডিয়াকর্মীরা তাঁর নথিপত্র ঘাঁটা শুরু করে দিয়েছে। নিজের বোনকে তালাক দেয়ার অপরাধে পলিন তাঁর পুলিশ অফিসার সাবেক বোনজামাইকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করার অনুরোধ করেছিলেন পুলিশের উর্ধতন এক কর্মকর্তাকে। তাঁর অন্যায় এই অনুরোধ আমলে না দেয়ায় খোদ ওই পুলিশ কর্মকর্তাকেই পলিন ডিসমিস করেছিলেন বলে খবর বেরিয়েছে। সরকারী কোষাগার তছরুপের অভিযোগও চলে এসেছে তাঁর বিরুদ্ধে। ‘সরকারী সফর’ দেখিয়ে ৪৩,৮৯০ ডলারের ট্যাক্স রিসিট জমা দিয়েছেন। অথচ পলিনের এই সফরসমূহ ছিল স্বামী ও সন্তানসহ তাঁর ওয়াসিলার নিজ বাড়ীতে ৩১২ রাত কাটানো। মাত্র ঊনিশ মাসের গভর্ণরশীপে ১৭ হাজার ডলার নিয়েছেন ৬০০ মাইল দূরে ‘ডিউটি স্টেশন’ দেখিয়ে সরকারী অফিস করার। পলিন অবশ্য এর উত্তরে বলেছেন, আগের গভর্ণর ফ্র্যাঙ্ক মুরকাওস্কির চেয়ে তিনি অনেক কম খরচ করেছেন। তাঁর মুখপাত্র বলেছেন, ‘এটা তো চাকরিরই অংশ। ভ্রমনের জন্য তিনি এসব করতেই পারেন’।

সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ওবামা পলিনের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে নাক গলাতে মোটেই পছন্দ করছেন না। তিনি বলছেন, ‘আমরা কারো পরিবারের পিছনে লাগি না। তাদেরকে নিয়ে রাজনীতিও করতে চাইনা। এটা সঠিক ও প্রাসঙ্গিকও নয়। আমার লোকজনের কেউ এতে জড়াচ্ছে না, জড়ালে অবশ্যই ফায়ার করব’। তিনি বলেন, ‘এগুলোকে আমাদের রাজনীতির অংশ বানানো উচিৎ নয়। পলিনের গভর্ণরের দায়িত্বপালনে এবং আগামীতে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মদক্ষতা প্রদর্শনে যোগ্যতার মাপকাঠি এসব হতে পারেনা। সবাইকে অনুরোধ করব এই ধরনের গল্প ফাঁদা থেকে দূরে থাকতে’। ম্যাককেইন দল কিন্তু ওবামাকে অগ্রিম দূষছেন পলিনের দূর্বল দিকগুলোতে ঘায়েল করার অভিযোগে।
রিপাবলিকানদের নিন্দনীয় প্রচারণা ওবামা-বাইডেনকে সার্বক্ষনিক তটস্থ করে রেখেছে। ইন্টারনেটে পলিনের লোকজন সম্প্রতি একটা এড ছড়িয়েছে। এডটা হল এরকম, পলিনকে নিয়ে ওবামা কথা বলছেন। এমন সময় তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আপনি কি নেতৃত্বের আসনে বসতে প্রস্তুত’? ওবামা বলছেন, ‘না’। আবার প্রশ্ন করা হলো, ‘বাজে কথা ছড়াতে কি আপনি রেডী’? ওবামার উত্তরঃ ‘হ্যাঁ’। বিভিন্ন রাজ্যে ছড়ানো আরো একটা ক্যাম্পেইনিং হল, ‘হোয়াইট হাউস’ মানেই হল ‘সাদাদের স্থান’, সুতরাং সেখানেই কৃষ্ণাঙ্গের না যাওয়াই হল আমেরিকান ট্র্যাডিশন।

ওবামাকে সারাক্ষণই চতুর্মূখী এরকম আক্রমন মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে রিপাবলিকানদের আরো একটি নোংরামী ‘লিপস্টিক অন অ্যা পিগ’ ক্যাম্পেইন বন্ধ করার দাবী জানিয়েছেন। তিনি বলছেন, ‘আমাকে যা খুশী বল তাতে আমার মাথা-ব্যাথা নাই, কিন্তু তাই বলে কাউকে নোংরা ও ব্যক্তিগত আক্রমন করতে পারবা না’। ‘লিপস্টিক অন অ্যা পিগ’ হল, পিগ (শুয়োর)-এর শরীর রং দিয়ে ভরে দিলেও সে পিগই। পলিন কৌতুক করে বলেছিলেন, আমেরিকান ষাঁড়ের সাথে ‘হকি মাতার’ অর্থাৎ তাঁর পার্থক্যটা হল ‘লিপস্টিক’। ওবামাকে বিদ্রুপ করে বুশ বলেছেন, ‘একটা পুরোন মরা মাছকে যদি তুমি ‘চেঞ্জ’ নামের কাগজ দিয়ে পেঁচিয়ে রাখো, আট বছর পর এথেকে দূর্গন্ধই ছড়াবে’।

গত ২৮ আগস্ট ডেনভারে ওবামা ঐতিহাসিক ভাষন দেয়ার পর তাঁর জনপ্রিয়তা ম্যাককেইনের চেয়ে আট পয়েন্টে এগিয়ে ছিল। শুরুতে ওবামার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় ডেমোক্রেটরা মোটামুটিভাবে এবার নিশ্চিত বিজয় ধরেই নিয়েছিল। কিন্তু পলিন মনোনয়নের পর এখন ওবামা কৌশলীদের আগের সব হিসাব-নিকাশ পালটে গেছে। বাগ্মী সারাহ পলিনের প্রথম আক্রমনেই ম্যাককেইন ৪ পয়েন্টে এগিয়ে ওবামা ক্যাম্পেইনে বাজীমাত করে দেন। জো বাইডেন এখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন সামনের দিনগুলোতে সামনা-সামনি ডিবেটে কিভাবে এই বিদূষী মহিলাকে রুখা যায়। ‘ওয়ান অন ওয়ান’ ডিবেটে ম্যাককেইনকে মোকাবেলায় ওবামা খুব সহজে পার পেয়ে যাবার আশা করা গেলেও বাইডেনের ক্ষেত্রে তা নাও হতে পারে। আর সেখানেই হয়ে যেতে পারে নাটকীয় কোন কিছু, যদিও সারা দুনিয়ার শান্তিকামী মানুষেরা বুশের আদর্শের বিপরীত মেরুর ওবামার দিকে তাকিয়ে আছে আমেরিকায় ‘পরিবর্তন’-এর সত্যিকার দৃশ্য দেখার।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28845388 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28845388 2008-09-19 21:20:32
অগ্নি পরীক্ষায় ওবামার ‘চেঞ্জ’
যাহোক, আমরা আজকে আমেরিকার সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়ানো নিয়েই আমাদের আলোচনা বৃত্তাবদ্ধ করে রাখব।

বিশ্বব্যাপী বর্তমান ভাঙা ভাবমূর্তি মেরামতে নিজেকেই সবচেয়ে বেশী যোগ্য কারিগর প্রমান করতে ওবামা-ম্যাককেইন বাগযুদ্ধ এখন তুঙ্গে। জন ম্যাককেইন রিপাবলিকান দলের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন লাভের পর অর্থ যোগানদাতাদের নিকট ই-মেইলে জানিয়ে দেন তিনি সারাহ পলিনকে ‘ওয়াশিংটন সংস্কার’-র জন্য রানিংমেট হিসেবে বাছাই করেছেন। অর্থাত এর মাধ্যমে তিনিও স্বীকার করে নিলেন আট বছর বুশ অফিস করায় ‘ওভাল অফিস’কে এখন ‘রিফর্ম’ করতে হবে। তিনি তাঁর নিজ দলের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘কিছু রিপাবলিকানরা দূর্নীতি উতসাহিত করায় আজ আমরা আমেরিকানদের বিশ্বাস নষ্ট করেছি।’ আমেরিকার অংগরাজ্য মিনোসোটার সেন্ট পল এনার্জি সেন্টারে দলের কনভেনশনে ম্যাককেইন আলাস্কার গভর্ণর ১৯৮৪ সালের সাবেক রানারস্ আপ মিস আলাস্কা সারাহ পলিনের (৪৪) নাম ঘোষনা করেন। সারাহ তাঁর দীর্ঘ অনলবর্ষী বক্তৃতায় নিজের পরিচয় ‘হকি মাতা’ বলে ওবামার বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী ভাষন দিয়ে রিপাবলিকানদের ভীষন উত্তেজিত ও উতফুল্লিত করেছেন। ডায়াসে তিনি স্বামী টড পলিন ও পাঁচ সন্তান নিয়ে হাজির হন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সন্তান ডাউন সিনড্রোম ছেলে ট্রিডের বয়স মাত্র পাঁচ মাস। সাধারনভাবে আমেরিকায় পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত নাজুক হলেও শাসকদের ক্ষেত্রে আমেরিকানরা উলটো দেখতে চায়। প্রার্থীরা তাই পরিবার-পরিজনদের সাথে করে স্টেজে উঠে শক্ত পারিবারিক বন্ধন প্রদর্শনের প্রথম অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ন হতে হয়। সারাহ বললেন, ‘তাদের সংসার দু’যুগের বেশী সময় ধরে আজো অভঙ্গুর’। সন্তানদের মধ্যে ১৭ বছর বয়স্কা ব্রিস্টল পাঁচ মাসের অন্তঃস্বত্বা। বন্ধু ও হবু স্বামী সমবয়সের লেভী জনস্টনও উপস্থিত ছিল। গর্ভপাতবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী সারাহ তার কুমারী মেয়ের পেটের বাচ্চা নষ্ট না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই আন্দোলনকে আরো বেগবান করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। রিলেজিয়াস কমিউনিটির ব্যক্তিত্বরা এতে বাহ্বা দিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে পলিন এতগুলো সন্তান লালন-পালন ও সংসার সামলানোকে তাঁরা ‘অসাধারন’ বলে অভিহিত করেছেন।

সবাইকে চমকে দিলেও রিপাবলিকানরা মনে করছেন, ম্যাককেইন রানিং মেট নির্বাচনে ভুল করেননি। পলিনকে মনোনয়ন করার মূল কারনসমূহের একটি হল ‘জেন্ডার কার্ড’। হিলারীর ১৮ মিলিয়ন ভোট বাগানোর মোক্ষম হাতিয়ার একমাত্র সারাহ্ই। বাছাই পর্বে ওবামাকে হারাতে হিলারী খুব নোংরা ও ব্যক্তিগত আক্রমন করে এড দিয়েছিলেন। হিলারী সর্বশক্তি দিয়ে ওবামাকে এখন সমর্থন করলেও তাঁর ব্যবহৃত পূর্বের কৌশলগুলো বুমেরাং হয়ে ওবামাকে বারে বারে আঘাত করছে। হিলারীর পূর্বের ওই টেপ বাজিয়ে নেপথ্যের কন্ঠ বলছে, ‘হ্যাঁ, হিলারী সঠিকই বলেছেন’। হিলারীর ওই বিজ্ঞাপনটির সারমর্ম ছিল এরূপ, ভোর তিনটায় ওয়াশিংটন হাউসে ফোন এলে ওবামার সাহস নেই ফোন ধরার। কারন তিনি ‘অপরিপক্ক’, একমাত্র হিলারীই পারবেন অসময়ে উদ্ভূত যেকোন পরিস্থিতি সামাল দিতে। স্বামী বিল ক্লিনটনসহ তিনি তাঁদের গোঁড়া সমর্থক বিশেষকরে মহিলা ভোটারদের ওবামার পক্ষে ভোট দেয়ার প্রানান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। হিলারী বলছেন, ‘এই ২০০৮ সালেও ম্যাককেইন মনে করেন না যে, পুরুষ ও মহিলাদের বেতনে বৈষম্য থাকা বাঞ্চনীয় নয়’।

প্রতিপক্ষের এরকম অপবাদ আগেভাগে আঁচ করেই ওবামা তাঁর রানিংমেট হিসেবে ৬৬ বছর বয়স্ক জো বাইডেনকে পছন্দ করেছিলেন। বাইডেন ৬ মেয়াদ ধরে সিনেটর নির্বাচিত হয়ে আসছেন। মাত্র ৩০ বছর বয়সে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হয়ে রেকর্ড গড়েছেন তিনি। আমেরিকার ‘ফরেন রিলেশন কমিটির’ চেয়ারম্যান ছাড়া ‘ইয়ুগোশ্লাভ যুদ্ধ’, ‘ইরাক যুদ্ধ’-র রেজুলেশন তৈরীতেও তাঁর প্রধান ভূমিকা রয়েছে। ‘সিনেট জুডিসিয়ারী কমিটি’, ‘ড্রাগ পলিসি’, ‘অপরাধ প্রতিরোধ’, ‘নাগরিক অধিকার আন্দোলন’, ‘ভায়োল্যান্টক্রাইম কন্ট্রোল এন্ড ল এনফোর্সমেন্ট অ্যাক্ট’, ‘ভায়োলেন্ট এগেইনস্ট উইমেন অ্যাক্ট’ ইত্যাদির সাথে তাঁর জড়িত থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

জো বাইডেনের বিপরীতে পলিনকে রক্ষনশীল দল রিপাবলিকান-কৌশলীদের পছন্দ করার আরো একটি কারন রয়েছে। সেটি হল সারাহ্র কট্টর ধার্মিক ইমেজ। যিনি ইরাক যুদ্ধকে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ মনে করেন, এতে করে আনূমানিক ৮৭ মিলিয়ন ক্যাথলিকদের ‘সুইং ভোট’ ঝুঁকে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা। গত জুনে পলিন তাঁর সাবেক গীর্জার বাইবেল ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতায় ইরাকে আমেরিকান সৈন্য মোতায়েন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘Our national leaders are sending them out on a task that is from God (অর্থাত আমাদের নেতৃবৃন্দ ঈশ্বর অর্পিত কর্ম সম্পন্ন করতেই ইরাকে সৈন্য পাঠিয়েছেন।‘) তিনি আরো বলেছেন, ‘That’s what we have to make sure that we’re praying for , that there is plan and that plan is God’s plan (অর্থাত এই কারনেই আমাদেরকে অবশ্যই তাদের জন্য প্রার্থনা করতে হবে। আর সেখানে একটা পরিকল্পনাও রয়েছে এবং সেই পরিকল্পনাটা হল ঈশ্বরের পরিকল্পনা।‘) পলিনের বিশেষ এই ভাষনটি তাঁর নিজ শহর ওয়াসিলার ‘ওয়াসিলা এসেম্বলী অব গড’ সাইটে দেখানো হয়। তিনি ছাত্রদেরকে নিজেকে ‘বাইবেল বিলিভিং’ পরিচয় দিয়ে আরো বলেছেন, ‘আমি তোমাদেরকে এই বুঝাতে চাই যে, তোমরা যীশুর ভালবাসা আলাস্কার সর্বত্র ছড়িয়ে দাও। আমি গভর্ণর অফিসে বসে যীশুর ইচ্ছারই বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে চেষ্টিত। রাজ্যের ৩০ বিলিয়ন ডলারের প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপ লাইনের প্রজেক্ট বাস্তবায়নের চেষ্টাও ঈশ্বরের ইচ্ছায়। আমার স্টাফরা কখনো কোন ভাল কাজ করতে পারত না যদি না আলাস্কাবাসীদের হৃদয়-মন ঈশ্বরের সাথে মিশে না থাকত’। তিনি আরো বলেন, ‘I think God’s will has to be done in unifying people and companies to get that gas line built.’

(চলবে)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28842739 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28842739 2008-09-13 22:30:33
পুলিশ তুমি কার
নামকরা একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির বিবিএ ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র সে। মায়ের সাথে ক’টা দিন কাটাবে বলে গ্রামীন টেলিকমে ইন্টার্ণশীপ শেষ করে থিসিস জমা দিয়েই গ্রামের বাড়ীতে ছুটে গেছে ছেলেটি ।সাথে নিয়েছে এক বন্ধুকে, যাকে সে নিজেদের ছায়াঘেরা সুনিবিড় গ্রাম দেখাবে। এরপর ঢাকা ফিরেই পূর্নোদ্যমে শুরু করবে নতুন ও উদ্দীপ্ত জীবন গড়ার পথ চলা। স্নেহময়ী মা তার নানান ব্যধিতে আক্রান্ত । কি নেই? ডায়াবেটিক, হাই ব্লাড প্রেসার, হার্টের রোগ সবই আছে। ছেলেমেয়েরা কাছে না থাকার বাড়তি শোকের কথা না হয় বাদই দিলাম। ঔষধপথ্য নিয়মিত সেবন করলেও মাঝে মাঝেই অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে যান । বাড়ীতে এসে তূর্য শোনে ক’দিন আগেও তার মায়ের এমনটি হয়েছিল। তখন ওকে জানায়নি। লেখাপড়ায় ক্ষতি হবে যে! তূর্য তাই বন্ধুসহ মাকে শহরে বড় বোনের বাড়ীতে নিয়ে যায় ডাক্তার দিয়ে আরেকবার চেক আপ করাতে। কিন্তু কে জানে এখানেই তূর্যের জন্য অপেক্ষা করছিল ভীতিকর ও দুঃসহ জীবনের নতুন এক অধ্যায়!

পরদিন সবাই বোনের বাড়িতে দুপুরে খাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল । এমন সময় টুং টাং কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুলে হতভম্ব হয়ে যায় তূর্য। দুজন পুলিশ দাড়িয়ে, সাথে তাদের এক আত্মীয়ের আত্মীয় (যাকে সে নানা ডাকে এবং যিনিও কিনা প্রাক্তণ পুলিশের এস আই)। লোকটি ওকে দেখিয়ে দিয়ে পুলিশকে বলে, এরই নাম তূর্য। কিছু বুঝে উঠার আগেই পুলিশের হুকুম, ‘প্যান্টটা পড়ে নিন, আমাদের সাথে একটু যেতে হবে।‘ ভয় পেয়ে পাছে মায়ের কোন অঘটন ঘটে বসে ভেবে দ্রুত পুলিশের সাথে সে পথ চলে। পুলিশ ওকে তাদের গাড়ীতে বসায়। আর ওই লোকটি কাজ সমাধা হয়েছে বিধায় সটকে যাওয়ার পথ খোজে।তূর্যের ভাবলেশহীন নীরিহ চেহারা দেখে পুলিশ হয়তো খানিকটা বুঝতে পারে লোকটি ওকে অযথা ফাসাতে যাচ্ছে।তাই তাকেও ধমকিয়ে গাড়ীতে উঠায়।

এদিকে অন্য একজন পুলিশ তূর্যকে একের পর এক হুমকি দেয়। হাত-পা ভেঙ্গে গুড়া করে দিব, তোর সাথে আর কে কে আছে বল ইত্যাদি । প্রাথমিক তদন্তেরও তোয়াক্কা না করে এস আই আব্দুর রাজ্জাক মাথা, কান ও বুক বরাবর প্রচন্ড বেগে তিন চারটি ঘুষি মারে। প্রচন্ড ব্যাথায় কুকড়ে উঠে তূর্য। আকাশ ভেঙ্গে মাথায় পড়ে তার। কি বলবে সে? ভদ্রবেশী ওই অমানুষটাকে সে জিজ্ঞেস করে, নানা আমি কি করেছি? নানা উত্তরে জানায় গত রাতে সে ৫০ হাজার টাকা নিয়েছে। অবাক হয়ে তূর্য জানতে চায় টাকা নিব কেন, সে টাকাই বা কোথায় রেখেছি, কোথা থেকে নিলাম, আমার বাবার কি সামান্য এই টাকা নাই, এসব কি বলছেন? লোকটি এবার এলোমেলো ভাবে পুলিশকে জানায়, রাতে নিয়েছিল, আজ সকালে ফেরৎও দিয়েছে।পুলিশ লোকটিকে হুমকি দিয়ে জিজ্ঞেস করে, টাকা যদি ফেরৎ পেয়েই থাকেন তবে আসছেন কেন, আপনাকেও ছাড়ছি না, ইত্যাদি। কিন্তু থানায় আসার পর অজানা অথবা জানা কারনে তাকে ছেড়ে দেয়া হয় আর তূর্যকে ভরা হয় লক আপে ।

মামলা সাজানো হয় সম্পূর্ণ উল্টাভাবে। জেলা পুলিশ লাইন থেকে তূর্যকে ধরা হয়েছে, টাকা সহ! মানে ‘পুলিশে সে লোক নিয়োগ দিবে’ কথা বলে মানুষজনের কাছ থেকে টাকা নিতে সে ঢাকা থেকে এসেছে বন্ধুবান্ধবসহ। আর আমাদের চৌকষ পুলিশবাহিনী তাকে ধরে ফেলেছে টাকা লেনদেনরত অবস্থায়! কি অদ্ভূত, পৃথিবী!

ওদিকে উৎকন্ঠিত অসুস্থা মা, ছেলে এখনো ফেরে না কেন? ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ায়ে তাকে রাখতে হয় দিনের পর দিন।বাবা স্কুল শিক্ষক, সজ্জন ও নীরিহ হিসেবে এলাকায় সমধিক পরিচিত। কয়েকমাস পরেই রিটায়ার্ড হবেন। পাগলের মত এদিক ওদিক ফোন করেন। খবর চলে যায় তূর্যের পারিবারিক বন্ধু এক এএসপির কাছে। তিনি ফোন করেন সংশ্লিষ্ট জেলার এসপি বরাবর। ভাল মানুষ হিসাবে জেলায় এসপির নামডাক আছে। তিনি তূর্যের পারিবারিক খবর নিতে শুরু করেন। কোন খারাপ রিপোর্ট পান না। কষ্টেসৃষ্টে তূর্যের বাবা-মা দেখাও করেন এসপির সাথে। জানতে চান তাদের ছেলে কি অপরাধ করেছে? ইউনিভার্সিটিতে কি সে কোন আইনবিরোধী কাজের সাথে জড়িত? পুলিশ সব কিছু এবার বুঝতে পারে। সম্পূর্ন ঈর্ষাপরায়ন বশত সম্ভাবনাময় তরুন ছেলেটাকে ফাসিয়ে দিয়েছে আত্মীয়রুপী ওই অমানুষটি। এসপি, এএসপি সহমর্মিতা দেখালেও থানার ওসি তূর্যকে ছাড়ে না। থানার ব্যাপার স্যাপার যারা বোঝে তাদের সাথে যোগাযোগ করে তূর্যের আত্মীয় সজন। ওসিকে বখশিস দেয়া হয়। ইতিমধ্যে ওসি বেচারা নাকি বেশ খ্যাতি অর্জন করেছেন ওসিগিরী করে রাজশাহীতে সম্পদের পাহাড় গড়ে।

দেশের মাটিতে কামড়ে পড়ে থাকবে বলে যে প্রতিজ্ঞা করেছিল, সম্পূর্ন বিনা কারনে শুরু হল তার নতুন জীবন। এই কচি বয়সে সমাজের প্রভাবশালি ও উচচ শিক্ষিত তথাকথিত ভদ্রমানুষদের সুফী চেহারার আড়ালে ঘৃন্যরুপের কিয়দংশ এক এক করে দেখতে শুরু করল সে। তার বাবার ছাত্র ও পারিবারিকভাবে শুভাকাংখী যাকে কিনা সারাজীবন আপনজন বলে জেনেছে, ফোনে পুলিশকে বলছে, পিটিয়ে কথা বের করতে। এত কড়াকড়ি অবস্থার মধ্যেও চোখের সামনে সে দেখল সামান্য একশো টাকার বিনিময়ে এক খুনীকে কিভাবে পুলিশ ছেড়ে দিল।এক এস আই এসে ওকে বলল, আপনার আপাকে আমার সাথে দেখা করতে বলুন, তবে এটি ভাববেন না যে আমি ঘুষ চাচ্ছি। আকাশের দিকে চেয়ে থাকে তূর্য, বোঝে না কি করবে সে। যে ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা সাজানো হচ্ছে, তাতে নাকি তার সাত বছরের জেল হবে। তার মত অনেক নিরপরাধ ছাত্র, কিশোর, যুবার সাথে পরিচয় হয় জেলের ভিতর। নিজের ভবিষ্যৎ ভেবে আৎকে উঠে তূর্য। বাইরের পরিচিত মানুষজন তাকে নিয়ে কি ভাবছে? তারা তাকে ভুল বুঝছেনা তো? কিভাবে তাদের সামনে সে মুখ দেখাবে? ছাড়া পেয়ে কয়জনকে সে বুঝাবে?

যাহোক, এসপি ও এএসপির বদান্যতায় শেষমেশ জেল খেটে তূর্য ছাড়া পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ভয় ও অজানা আশংকা তার পিছু ছাড়েনি। আগেরমত তার প্রত্যয় নেই, দেশের থাকার অদম্য বাসনাও নেই। প্রতিশোধের স্পৃহা সারাক্ষন তাকে তাড়া করে বেড়ায়। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেদে বলছিল আমাকে কোন কিছু না লিখতে। না জানি কখন আবার পুলিশ এসে তাকে কোন ধারার সীমাহীন ক্ষমতা বলে ধরে নিয়ে যায়!

তূর্যের সম্ভাবনাময় জীবনে আর নতুন কোন অঘটনা ঘটুক, তা অবশ্যই চাইনা বরং তার চলার পথ আবার শুভ হোক, আশা ভঙ্গের আর কোন অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সম্মুখীন না হোক, তাই-ই কামনা করি। কিন্তু একদম নিরবতাকে নিজের বিবেকের কাছে কোনমতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। পত্র পত্রিকায় টুকটাক লেখালেখির সুবাদে অনেকেই
ই-মেইল করে, ফোন করে তাদের জীবন ঘনিষ্ঠ অনেক সমস্যার কথা বলেন। মানুষের কাছে তাদের মনের আকুতি তুলে ধরতে বলেন। ভাবলাম এসব নিয়ে আমি কিভাবে কলাম লিখব? আমার প্রিয় যেদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীরা সরাসরি আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসীদের সাথে জড়িত কিংবা বিচারপতিদের শায়েস্তা করতে লাঠি মিছিলের নেতৃত্ব দেন, খোদ প্রধানমন্ত্রী যেদেশে এক লাশের বদলে দশ লাশ ফেলে দেয়ার হুকুম দেন, ওসির নির্দেশে প্রতিবেশীর জমি-বাড়ী ভোগ দখলের খায়েশে কলেজ ছাত্রকে হত্যা করা হয় কিংবা দিন দুপুরে পুলিশের সামনে সাপের মত পিটিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়, যৌতুকলোভী শয়তান স্বামীদের নির্যাতনের শিকার হয়েও নারীরা পুলিশকে কাছে পায় না, যেদেশে ইয়াসমীন, রাহেলা, নূরজাহান আর কত নাম না জানা কৈশোরী, তরুনীর অকাল জীবনের করুন পরিসমাপ্তি ঘটে সেদেশে আমি কত জনের কথা লিখব? সর্ষের মধ্যেই যদি ভুত থাকে, সে ভুত তাড়াবে কে? তাও আবার পুলিশের বিরুদ্ধে যে বিভাগে কিনা আমার আত্মীয় সজনদের বিরাট অংশই বিভিন্ন পদে কর্মরত? তবুও অজস্র মজলুম হতভাগাদের মধ্য থেকে তূর্যের কথা লিখছি, কারন তার কান্না আমাকে সরাসরি শুনতে হয়েছে। প্রায় সপ্তাহ খানিক ধরে ভেবেছি আমি কি সত্যি কিছু লিখব না? কেমন করে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকি যেখানে আমার কিনা মুক্ত অস্ত্র (কলম)কে কেউ লাগাম টেনে ধরতে পারবেনা। যে লেখায় প্রানের স্পন্দন থাকে না, মাটি ও মানুষের চাপা কান্না থাকে না, জীবনবোধের দোলা থাকে না, হৃদয়ের স্খরন থাকে না, তা আবার কিসের লেখা?

মুঞ্জুরুল করিমের ক্রাইম ওয়াচে কয়দিন আগে দেখলাম দক্ষিনাঞ্চলের এক জেলার গোটা পরিবারের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার করুন কাহিনী। শুরু হয় কলেজ পড়ুয়া মেয়ের মুখের উপর এসিড নিক্ষেপের মাধ্যমে। তারপর একে একে হত্যা করা হয় পরিবারের কয়জন সদস্যকে। এবার তাদের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে জমি জমার উপর। সাথে রয়েছে পুলিশের উপরি চাহিদা। সইতে না পেরে পরিবারের জীবিত একমাত্র পুরুষ সদস্য বাবা (যিনিও সারা শরীরে জখমের চিহ্ন বয়ে বেরাচ্ছেন) মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে উঠেছেন। বেদনাদায়ক ব্যাপার হল, সেখানেও বেপরোয়া সন্ত্রাসীদের হুমকি ধমকি থেকে নিস্তার পাচ্ছেন না নিঃস্ব ওই পরিবারটি। পুলিশের চেয়েও বহুগুন উন্নত ও আধুনিক অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত সন্ত্রাসীদের নিকট আমাদের পুলিশবাহিনী যেন নির্জীব এক অপদার্থের নাম।

অথচ, অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে পুলিশ ঠিকই লিখে রেখেছে তাদের ভিশন হল, প্রতিটি নাগরিককে সেবা প্রদান করে বসবাস ও কাজের জন্য সুন্দর ও নিরাপদ বাংলাদেশ বাস গড়ে তোলা (To provide service to all citizens and make Bangladesh a better and safer place to live and work) এবং তাদের মিশন হল, আইনের শাসন সমুন্নত রাখা, নাগরিকদের সেফটি ও সিকিউরিটি নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন ও তা নির্ণয় করা, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা, এবং শান্তি ও শৃংখলা বজায় রাখা (To ensure safety and security of citizens, To prevent and detect crime, To bring offenders to justice, To maintain peace and public order) ।

একটা সুস্থ ,সুন্দর ও সভ্য সমাজ বিনির্মানের প্রধান সোপান হল আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সবার প্রতি মানসম্মত আচরন। কোন সমাজ থেকেই মিথ্যার বেসাতি ও অপরাধ সমূলে নির্বংশ করা আকাশ কুসুম কল্পনা বৈ কিছু নয়। কিন্তু সেসব নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে নিয়ন্ত্রকরাই যদি সমান বা তার চেয়েও বেশী অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে অসহায় মানুষরা যাবে কোথায়? পুলিশের কোন্ আইজি যেন একদিন বলেছিলেন, যদি সামগ্রিকভাবে এই বাহিনীর সব সদস্য কোন অপরাধের সাথেই জড়িত না হতেন, তবে সারাদেশের অপরাধ আপনা আপনিই কমে যেত।

এনটিভিতে এই তো কিছুদিন আগে কয়েকটা এনজিও প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময়কালে পুলিশের আইজির বক্তব্য মনযোগের সাথে দেখছিলাম। তিনি পুলিশদের একটু ধাক্কা দিতে অনুরোধ করছিলেন যাতে করে তারা অল্প বেশী নড়ে চড়ে ওঠে, অচলায়তনের শক্ত খুঠি ভেঙ্গে একটু হলেও সচল হয়। বৃটিশদের পৌণে দুইশো বছর শাসনের ধারাবাহিকতার ফসল পুলিশের এই সেবাহীন মনোভাবের বর্তমান ধারা আগামী একশো বছরেও পরিবর্তন হবে কিনা তা নিয়ে খোদ পুলিশের আইজিই সন্দেহ প্রকাশ করছিলেন। একথা বলতে আজ দ্বিধা নেই যে, উপমহাদেশে বৃটিশদের দীর্ঘদিনের দস্যুপনার শিকার হতে হয়েছে সরকারী ,বেসরকারী সহ প্রতিটা বিভাগ ও ক্ষেত্র। জনগনকে সরকার ও তাদের বিভাগসমূহ থেকে দূরে রাখার প্রবণতা নিয়েই তাদের মত করে গড়ে তুলেছিল বিভিন্ন ইনস্টিটিউশন। তৈরি করেছিলে একদল এলিট শাসক শ্রেনী যারা কিনা আম জনতার ধরাছোয়ার বাইরে থাকবে। আদালতকে ‘লর্ড’ বলা তারাই শিখেয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘একান্ত ও বাধ্য অনুগত ছাত্র’ তৈরির কারিকুলাম তারাই সাজিয়েছে। পাকিস্তানীরা ২৩ বছরের শাসনের জন্য যদি একবার ক্ষমা চায় তবে বৃটিশদের ভদ্রবেশী দস্যুবৃত্তির জন্য আমাদের নিকট কমপক্ষে সাতবার ক্ষমা চাওয়া উচিৎ। প্রথম স্বাধীনতা প্রাপ্তিরও তো ষাট বছর পার হতে চলল, আমরা কি ওই গোলামী মনোবৃত্তির জিঞ্জিরতা থেকে আমাদেরকে টেনে বের করতে পারব না?

সাধারন মানুষের মনের ভিতর থেকে না বলা কথা টেনে এনে পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদ বলেছিলেন, ‘এই বিভাগটি মূলত রক্ষক না হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায়ই বেশী পরিমানে চালিত হয়। তা পরিবর্তন করতে হবে।‘ সত্যিকার সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এটিকে পরিনত করার কঠিন চ্যালেঞ্জ তিনি হাতে নিয়েছেন। কতটুকু সফল হবেন জানিনা, তবে একথা সত্যি যে মুষ্টিমেয় কিছু অসৎ পুলিশ সদস্যদের কারনে আজ গুরুত্বপূর্ন ও অপরাধ দমনে প্রথম পদক্ষেপ নেয়া এই আইন শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর পচন কেউ ঠেকাতে পারছেনা। এরশাদের বেপরোয়া পুলিশ, খালেদা ও হাসিনার গনতান্ত্রিক পুলিশ, ফখরুদ্দীনের জরুরী অবস্থার পুলিশ-জনগন সবই দেখেছে। কিন্তু মানুষ ভালবাসার পুলিশ বাহিনী কোথায়?

এক একজন বঞ্চিত মানুষের বিন্দু বিন্দু ক্ষোভ জমা হতে হতে আগ্নেয়গিরির লাভা হয়ে যখন পুরা বাহিনীকে খেয়ে ফেলবে তখন আর করার কিছুই থাকবেনা। গুরুত্বপূর্ণ এই বাহিনীর অকর্মন্যতার ফলে দেশটার রসাতলে যাওয়া থেকে কেউ বাচাতে পারবেনা। আমেরিকা ও কানাডায় পুলিশ বিভাগে রিক্রটিং শুরুই হয় পদের নাম ‘পুলিশ অফিসার’ এবং অন্যান্য চাকরির সমান্তরালে সম্মানজনক বেতন ভাতাসহ উন্নত সুযোগ সুবিধার মাধ্যমে। অবৈধ পথে টাকা রোজগার না করলেও তাদের সংসার সুন্দরভাবে চালাতে কোন কষ্ট করতে হয় না। যদিও উন্নত দেশসমূহের সাথে তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশের তুলনা করা বাস্তবসম্মত নয়, তবুও মনে হয় খুব জরুরী ভিত্তিতে পেটোয়া বাহিনী থেকে মানুষের কল্যানের বাহিনীতে রুপান্তরিত করার জন্য বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ‘ত্রি টি (ট্রেনিং, টেকনোলজি ও টাকা বা উন্নত পারিতোষিক)’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ দ্রুত নেয়া উচিৎ। দেশ বিদেশ থেকে উন্নত প্রশিক্ষক এনে বছরব্যাপী সেবামূলক নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, বিশ্বমানের উন্নত প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ রপ্ত ও সর্বোপরি উন্নত বেতন ভাতার পাশাপাশি কড়া জবাবদিহী মূলক সিস্টেমের ব্যবস্থা থাকা উচিৎ। উচচপদে সঠিক অফিসার বাছাইয়ের জন্য পুলিশের আইজি ম্যানেজমেন্টের জনপ্রিয় PAQ থিউরি বাস্তবায়ন করতে পারেন, যার অর্থ পারফরমেন্স, এক্সেপ্টেন্স ও কোয়ালিফিকেশন। অর্থাৎ কর্মদক্ষতার মাধ্যমে যেসব পুলিশ অফিসারেরা সর্বক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে সবার মাঝে গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করেছেন শুধু তাদেরকেই সঠিকভাবে প্রশাসন তদারকীর জন্য লোভনীয় ও অধিক দায়িত্বশীল পদে বসানো হবে। যাতে করে পুলিশকে দেখে সাধারন মানুষ ভয়ে আতকে উঠবেনা, ‘ঘুষ ও পুলিশ একই সমান্তরালে চলে’ এই অপবাদকে উল্টিয়ে দিয়ে মানুষের মনে গেথে যাবে ‘সেবাদানই হল পুলিশের একমাত্র ব্রত’। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28791660 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28791660 2008-04-27 10:53:01
পহেলা এপ্রিল বা এপ্রিল ফুলের ইতিবৃত্ত
ইউরোপে সম্ভবত এপ্রিল ফুলের বিস্তৃতি ঘটে প্রথমে ফ্রেঞ্চ জাতির মধ্যে। ফ্রেঞ্চরা ১৫০৮ সাল এবং ডাচরা ১৫৩৯ সাল থেকে এপ্রিল মাসের প্রথম দিনকে কৌতুকের দিন বা বছরের সবচেয়ে হালকা দিন হিসেবে পালন করা শুরু করে। ফ্রান্সই হলো প্রথম দেশ যেদেশে সরকারীভাবে নবম চার্লস (Charles IX) ১৫৬৪ সালে এক ফরমানের মাধ্যমে ১ জানুয়ারীকে নববর্ষ হিসেবে ঘোষনা করেছিলেন । অর্থাৎ তিনি এটি করেন ১৫৮২ সালে ইতালীয়ান পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী (Pope Gregory XII) প্রবর্তিত গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার (যেটিকে আমরা বর্তমানে ভুল করে ইংলিশ ক্যালেন্ডার বলি) হিসেবে প্রচলন হওয়ারও আগে। এরই সাথে ১ এপ্রিলে বন্ধু-বান্ধবদের উপহার দেয়া নেয়ার প্রথাটি বদল হয়ে চলে যায় ১ জানুয়ারী বা নিউ ইয়ার উদযাপনের প্রাক্কালে। কারন তখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে জুলিয়ীও ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নিউ ইয়ার পালিত হত ১ এপ্রিলে। অনেকেই এই পরিবর্তনকে মেনে নিতে না পেরে এদিনই অর্থাৎ ১ এপ্রিলেই তাদের পুরোনো প্রথাসমূহ চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু বিপরীত ১ জানুয়ারীর পক্ষের লোকজন এদেরকে ফাকি দিতে ১ এপ্রিলে ভূয়া উপহার পাঠানোর কালচারটি চালু করে দেয়।

ফ্রান্সে কাউকে বোকা বানালে বলা হত এপ্রিল মাছ (April fish), ফ্রেঞ্চ ভাষায় poisson d’avril । এরকম অদ্ভূত নামকরনের ব্যাখায় বলা হয়, রাশিচক্র অনুযায়ী স্বর্গের কাল্পিক রেখা অতিক্রম করাকালে এপ্রিলে সূর্যকে মাছের মত দেখায়। এইদিনে তারা ছুটি কাটাত এবং মরা মাছ এনে তাদের বন্ধুদের পেছনে সেটে দিয়ে মজা করত। এখন মরা মাছের বদলে ছোটরা আসল মাছের স্টিকি কাগজ বন্ধুদের শার্টের পেছনে গেথে দেয়। ক্যান্ডি শপ ও বেকারীগুলোও মাছ আকৃতির মিষ্টি পরিবেশন করে এইদিন স্মরন করে।

ডাচদের পহেলা এপ্রিল পালন করার আরো কিছু কারন আছে। স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ (King Philip II) ১৫৭২ সালে নেদারল্যান্ড শাসন করতেন। যারা তার শাসন অমান্য করেছিল তারা নিজেদেরকে গুইযেন (ডাচে Geuzen ও ফ্রেঞ্চে gueux বলা হয়, যার অর্থ ভিখারী) বলে পরিচয় দিত । ১৫৭২ সালের এপ্রিলের ১ তারিখে গুইযেন বা বিদ্রোহীরা উপকূলীয় ছোট শহর ডেন ব্রিয়েল (Den Briel) করায়ত্ব করে ফেলে। তাদের এই সফলতায় বিদ্রোহের দাবানল দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। শেষমেষ স্প্যানিশ সেনাপ্রধান বা দ্যা ডিউক অব অ্যালবা (the Duke of Alba) প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হন। ‘ব্রিয়েল’ হল ডাচ শব্দ, যার অর্থ কাঁচ। ১৯৭২ সালের ১ এপ্রিল স্মরনে ডাচরা বিদ্রুপ করে স্প্যানিশদের ‘অ্যালবা কাঁচ হারিয়েছে (Alba lost glasses)’ বলে পূরোনো স্মৃতি রোমন্থন করে থাকে। উল্লেখ্য, অ্যালবা হল স্পেনের শহরের নাম যেখানে দ্যা ডিউক অব অ্যালবার সদর দপ্তর ছিল।

এপ্রিল ফুলের আরেকটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রফেসর জোসেফ বসকিন (Joseph Boskin)। তিনি বলেছেন এই প্রথাটির শুরু হয় রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের (২৮৮-৩৩৭ খ্রীঃ) শাসনামলে। হাসি-ঠাট্টা নিয়ে মেতে থাকে এমন একদল বোকা গোপাল ভাঁড়েরা সম্রাটকে কৌতুক করে বলে, তারা রাজার চেয়ে ভালভাবে দেশ চালাতে পারবে। রাজা মহোদয় বেশ পুলকিত হলেন। রাজা গোপাল ভাড়দের সর্দার কুগেল (Kugel)কে একদিনের জন্য বাদশাহ বানিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন। আর কুগেল সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে রাজ্যময় আইন জারি করে দিল, প্রতিবছরের এইদিনে সবাই মিলে তামাশা করবে। প্রফেসর বসকিন আরো বলেন, প্রাচীন ওই সময়ের মারাত্মক দিনগুলোতে রাজাদের দরবারে কিন্তু বোকারুপীরাই ছিল প্রকৃত জ্ঞানী। তারা মজা বা হাসি-ঠাট্টার মাধ্যমে অনেক কাজ কৌশলে হাসিল করে নিত বা জ্ঞানের কথা রসালোভাবে চারদিকে ছড়িয়ে দিত।

১৯৮৩ সালে বার্তা সংস্থা এপি পরিবেশিত বসকিনের এই ব্যাখ্যাটি অনেক কাগজে নিবন্ধাকারে প্রকাশিত হয়। বসকিন মূলত. আগের সব ব্যাখ্যাকে উড়িয়ে দিয়েছেন। আর্টিকেলটি ছাপানোর আগে এপি দুই সপ্তাহ ধরে ভেবেছে তারা নিজেরাই এপ্রিল ফুল বোকামীর শিকার হচ্ছে না তো!

পাশ্চাত্যের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে কাউকে বিভিন্নভাবে বোকা বানানোর প্রথা চালু রয়েছে। রোমানদের হিলারিয়া (Hilaria) উৎসব এর মধ্যে অন্যতম। তারা মার্চের ২৫ তারিখে আট্টিসের (Attis) পূনরুত্থান নিয়ে এইদিনে হালকামি করত, ইহুদীরা করত পুরিম (Purim) উপলক্ষ্যে। হিন্দুরাও হোলি (Holi) উৎসব এইদিনের আশেপাশে করে থাকে। ইসলামে মিথ্যা কথা বলে ঠকানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যেমন, নবী (সঃ)বলেছেন, "যারা ধোঁকাবাজি করে তারা আমাদের দলভুক্ত নয়।" তবে ইসলামে সত্য কথা বলেও হাস্যরস করা বা বিভিন্ন রকমের জ্ঞানোদ্দীপক কৌতুকের প্রচলন রয়েছে। মুহম্মদ (সাঃ) এবং তার সংগীসহ ইসলামী ব্যক্তিত্বের অনেকের জীবনীতেই প্রচুর রসালো গল্পের উদাহরন ইতিহাসে পাওয়া যায়।

অন্যান্য দিবসের মত এই দিবসটিরও উৎপত্তি প্রাশ্চাত্যে শুরু হলেও এর বিস্তৃতি এখন দেশে দেশে। শুধুমাত্র বাংলাদেশে (বৃহৎ অর্থে, উপমহাদেশে) কিছু মুসলমানদের মধ্যে এপ্রিল ফুলের ব্যাখ্যায় নতুন মাত্রা লাভ করেছে। তা হলো, গ্রানাডার বেদনাদায়ক ঘটনার সংযোজন। সুদীর্ঘ আটশো বছরের ইসলামের গৌরবময় শাসন শেষে স্পেন মুসলমানদের হাতছাড়া হয় ১৪৯২ সালে। বলা হয়, পরাজিত হাজার হাজার মুসলমান নারী, পুরুষ, শিশুদেরকে মসজিদের মধ্যে কৌশলে ঢুকিয়ে রাজা ফার্দিনান্দ ও পর্তুগীজ রানী ইসাবেলার নির্দেশে পুড়িয়ে মেরে জঘন্যতম এই কান্ডটি করা হয় ইতিহাসের এই দিনে।

ইতিহাসবিদরাই ভাল বলতে পারবেন কোনটি সঠিক। গ্রানাডার সর্বশেষ মূরিশ কিং (Moorsih king) হলেন নাসরিদ বংশীয় আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ (Abu Abdullah Muhammad XII), যাকে স্প্যানিশরা ‘বোয়াবদিল’ নাম দিয়েছে। বিলাস-ব্যসনে মত্ত ও উচ্ছন্নে যাওয়া আবু আব্দুল্লাহ হলেন গ্রানাডার তাইফার সুলতান আবুল হাসানের ছেলে। ছেলের ষড়যন্ত্র ও কুচক্রের কারনেই অনেকটা সিরাজুদ্দৌলার মতই বাবা আবুল হাসান পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। মীরজাফরের মত আবু আব্দুল্লাহকে বানানো হয় নামকাওয়াস্তে সুলতান। এই পুতুল সুলতানের কাছেও ১৪৮৯ সালে ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার নিকট থেকে চুড়ান্তরুপে নিঃশর্ত ভাবে আত্মসমর্পনের নির্দেশনা আসে এবং স্মরন করিয়ে দেয়া হয় অস্বীকারের ভয়াবহ পরিনতির কথাও। বিভিন্ন এনসাইক্লোপেডিয়া অনুযায়ী আবু আব্দুল্লাহ উপায়ান্তর না দেখে গ্রানাডা সম্পূর্নভানে হস্তান্তর করতে বাধ্য হন ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারীতে, ১লা এপ্রিলে নয়। একটি উদাহরন পাওয়া যেতে পারে এম বি সিঞ্জ (M B Synge) তার দ্যা বাল্ডউইন্স প্রজেক্ট (The Baldwin’s Project) প্রকাশিত ‘সাহসী মানুষদের সাহসী কান্ড (Brave Men and Brave Deeds)’নামক আর্টিকেলে। তিনি লিখেছেন, "December had nearly passed away. The famine became extreme, and Boabdil determined to surrender the city on the second of January (ডিসেম্বর শেষ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। দূর্ভিক্ষ চরম আকার ধারন করেছে। আর বোয়াব্দিল গ্রানাডা আত্মসমর্পনের সিদ্ধান্ত নিলেন ২ জানুয়ারী)"। স্পেন থেকে মুসলমানদেরকে ১৪৯২ সালেই বের করে দেয়া হয়নি। আমীর আবূ-আব্দুল্লাহ্‌র সাথে ইসাবেলা আর ফার্দিনান্দের যে চুক্তি হয়েছিল তাতে গ্রানাডার মুসলমানদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী কালে (১৫০৮ সালে) ইনকুইজিশন চালু করা হলে মুসলমানদের হয় ক্যাথলিক নয়তো স্পেন ছাড়ার পছন্দ দেয়া হয়েছিল। যারা স্পেন ছাড়েনি তারা ক্যাথলিক ছদ্মবেশে মুসলিমই থেকে যান। খৃষ্টানরাও জানত তারা মুসলমান। আর এদেরকেই তারা মরিস্কো উপাধি দেয়। মরিস্কোদের পুরোপুরি স্পেন থেকে বহিষ্কার করা হয় ১৬০৯ থকে ১৬১৪ সালের মধ্যে। এটাও করা হয়েছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা হারানো মরিস্কোদের অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য বিদ্রোহ করার পর। সে সময়ে এপ্রিল ফুলের ঘটানার মত কোন ঘটনা ঘটেছে কিনা ইঊরোপীয় ঐতিহাসিকরা তা উল্লেখ করেননি।

আত্মসমর্পন ঘটনার তিনমাস পরে স্পেনের বিপর্দস্ত মুসলমানদেরকে মসজিদের মধ্যে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, নাকি ইতিহাসের অলীক মারপ্যাচে বাংলাদেশের মুসলমানদেরকেই এপ্রিল ফুলের বোকা বানানো হয়েছে তা নির্নয়ের দায়িত্ব ইতিহাসবেত্তাদের নিকটই ছেড়ে দিলাম।

(ঈষৎ সংযোজিত, এপ্রিল৯, ২০০৮)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28785276 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28785276 2008-04-04 21:41:07
কানাডিয়ান আদিবাসী এবং আমেরিকা আবিষ্কারের অজানা কাহিনী
কানাডার প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল ঘেঁষে বারোটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ফার্স্ট নেশন, ইনোয় (Inuit) ও মেটিই (Metis) প্রায় পঞ্চাশটি দূর্বোধ্য ভাষা বহন করে চলেছে। সাগর ও নদীতে মাছ এবং বনাঞ্চলে প্রাণী শিকার এদের প্রিয় নেশা। হিমাংকের চল্লিশ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার নিচে প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যেও বরফের উপর পুরোটা দিন দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দিতে পারে একটি মাত্র স্যামন মাছ শিকারের আশায়।

গুচ্ছ গুচ্ছভাবে বিভক্ত হয়ে এসব আদি বাসীরা নদী বা সাগরের উপকূলে বসবাস করতে পছন্দ করে। জীবনের সমস্ত ঘটনা প্রবাহ এরা প্রকৃতির গাছ-পালা, জীবজন্তু ও শক্তির সাথে একীভূত করে ফেলে। কাক, পেঁচা, গরু, বাছুর, রক্ত, লতা-গুল্ম, গাছ পালা ইত্যাদি নিয়ে পৌরোনিক কাহিনীই তাদের বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। আর এটি চলে আসছে বংশ পরম্পরায় মৌখিক গল্পের মাধ্যমে হাজার বছর ধরে। এদেশের প্রতিটি সরকারই এই জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় আনতে চেষ্টা ও প্রচুর অর্থকড়ি ব্যয় করলেও ফলাফল খুব বেশী যে সন্তোষজনক তা কিন্ত নয়।

কানাডার নতুন প্রদেশ পৃথিবীর উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত নুনাভাত (Nunavut) এর পঁচাশি শতাংশেরও বেশী মানুষ ফার্স্ট নেশন বা আদি মানুষ। সরকার এদের আহার, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সিংহভাগ বহন করলেও এরা হীম-শীতল ওই প্রদেশে শিকার ও নেশা নিয়েই ব্যস্ত। মিশে যেতে চায় না সভ্য মানুষ বা তাদের ভাষায় ‘দখলকারীদের’ সাথে। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরা এদের সাথে তাদের রক্তের সম্পর্ক দাবী করে। আফ্রো-এশীয় ইতিহাসবিদরাও বলে থাকেন পৃথিবীর বর্তমান ভৌগোলিক বিবর্তনের আগে আমেরিকার সাথে জলাশয়ের উপর ছোট্ট একটি সেতু দ্বারা আফ্রিকীয় ও এশীয়দের মধ্যে ব্যাপক যোগাযোগ ছিল। ফার্স্ট নেশন বা জনপ্রিয় অথচ বিতর্কিত শব্দ ‘রেড ইন্ডিয়ান’ কিন্তু তাদের সব দাবীই অস্বীকার করে বলে, ঈশ্বরের এই ‘পবিত্র’ ভূমিতেই তাদের উৎপত্তি। আর এটিই আজ দখলীকৃত হয়েছে ইউরোপীয় অনুপ্রবেশকারীদের দ্বারা।

পৃথিবী এ জাতি সমন্ধে প্রথমে কবে জানতে পেরেছে তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ। আমেরিকা ও কানাডার টেক্সট বইয়ে কলম্বাস পূর্ব যুগ নিয়ে ছাত্রদের মোটেই পড়ানো হয় না। কলম্বাসের কথিত আমেরিকা আবিস্কারের বছর ১৪৯২ সালের পূর্বের সত্যিকার ইতিহাস ধামাচাপা দিতেই পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকদের এই অপকৌশল। কলম্বাসের দল কর্তৃক নেটিভদের পাইকারী গণহত্যা ও ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের দ্বারা নির্বিচারে মুসলিম নিধনযজ্ঞের নির্মম সত্য ইতিহাস থেকে ছাত্রদের ভুলিয়ে রাখতেই ইতিহাসবিদরা এসময়কে আখ্যায়িত করেছেন প্রি-কলম্বিয়ান যুগ হিসেবে। ঐতিহাসিকদের এই চৌর্যবৃত্তির গোড়া পত্তন হয় মূলত রাজা ফার্দিনান্ড এবং রানী ইসাবেলার নেতৃত্বে পনের শতকে মুসলিম ধ্বংসযজ্ঞের অব্যবহিত পরই।

কলম্বাসের পাঁচশ বছর আগে নবম শতাব্দীতে এ অঞ্চলের সন্ধানে প্রথম একদল ভ্রমণ বিলাসী মানুষ আসেন স্পেনের তৎকালীন খলিফা আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ (৮৮৮ - ৯১২) এর শাসনামলে। ‘দি মেডোস অব গোল্ড এন্ড কোয়ারিস অব জুয়েল্‌স (The Meadows of Gold and Queries of Jewels)’ গ্রন্থের লেখক আল মাসুদি (৮৭১ - ৯৫৭) লিখেছেন, কর্ডোভার মুসলিম নাবিক খাস্‌খাস্‌ ইবনে সাঈদ ইবনে আসওয়াদ ৮৮৯ সালে স্পেনের ডেলবা (Delba) বা বর্তমানের প্যালস (Palos) থেকে জাহাজে পাল তুলে আটলান্টিক পার হয়ে ‘আরদ্‌ মাজহুলা’ (Ard Majhoola) বা ‘অজানা দুনিয়া’ (অর্থাৎ বর্তমানের আমেরিকা)-য় এসে পৌঁছেন এবং ফিরে যান ‘চমকপ্রদ ধনরত্নরাজি (Fabulous Treasures)’ নিয়ে। দশম শতাব্দীতে আব্দুর রহমান দ্বিতীয় (৯২৯- ৯৬১) এর শাসনামলে দ্বিতীয়বারের মত একদল আফ্রিকীয় মুসলিম আবারও ‘কুয়াশায়ভরা অন্ধকার মহাসাগর’ এ পাল তোলেন স্পেনের এই ডেল্‌বা বন্দর থেকেই। দীর্ঘ সময় অবস্থান করে তারা স্পেনে ফিরে যান ‘অদ্ভুত ও রহস্যময় দুনিয়া’ আবিস্কারের অজানা কাহিনী নিয়ে।

আমেরিকা আবিস্কারের কথিত জনক কলম্বাস ১৪৯২ সালের ৩রা আগষ্ট মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সদ্য বিজিত ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার সহযোগীতায় সারা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ব্বব্যপ্তির অংশ হিসেবে জাহাজে পাল তোলেন কিন্তু দুর্ঘটনাবশত, নতুন দুনিয়া বা আজকের আমেরিকায় তাঁর জাহাজ নোঙ্গর করে। মজার ব্যাপার হল, তিনি পাল তুলেছিলেন স্পেনের ওই একই বন্দর ডেলবা থেকেই। যার সাথে কিনা ভালভাবে পূর্ব থেকেই আমেরিকার সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। পূর্বসুরী মুসলিম নাবিকদের উদ্ভাবিত একই মানচিত্র এবং আপন নাবিক ভাইয়ের সাহয্যের ফলে কলম্বাসের যাত্রা পথটি সহজসাধ্যও হয়। পাল উড়ান ক্যানারী আইল্যান্ড এবং গোমেরা মুখী। ‘গোমেরা’ শব্দটি আরবী থেকে নেয়া যার অর্থ ‘ক্ষুদ্র জলন্ত কাষ্ঠখন্ড’। সেখানে পৌঁছে কলম্বাস প্রেমে পড়েন আইল্যান্ডের প্রথম ক্যাপ্টেন জেনারেলের কন্যা বিয়াট্রিয বোবাদিল্লার (Beartriz Bobadilla) সাথে। পারিবারিক নাম ‘বোবাদিল্লা’ আরবী ইসলামী নাম ‘আবু আব্‌দিল্লাহ’ থেকে উদ্ভূত, যার সূত্র আব্বাসীয় (১০৩১ - ১০৯১) শাসনকর্তার পরিবার পর্যন্ত। ফ্রান্সিস্‌কো বোবাদিল্লা পরে কলম্বাসকে শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলেন এবং স্পেনের সান্তো ডোমিনগো (Santo Domingo) তে ফেরত পাঠান ১৫০১ সালের নভেম্বর মাসে।

১৪৯২ সালের ১২ই অক্টোবর কলম্বাস বাহামার যে ছোট ভূ-খন্ডটিতে নেমেছিলেন তা আদিবাসীদের নিকট ‘গুয়ানহানি (Guanhani)’ নামে পরিচিত ছিল। এ শব্দটি মানডিন্‌কা (Mandinka) এবং আরবীর অপভ্রংশ। ‘গুয়ানা’ (মুল ইখ্‌ওয়ানা)- র অর্থ ‘ভাই’ এবং ‘হানি’ হল একটি আরবী নাম। আইল্যান্ডটির মুলনাম ‘হানিভ্রাতা (Hanibrother)’ পরিবর্তন করে কলম্বাস এর পূণঃনামকরন করেন ‘সান সাল্ভাদর (San Salvador)’। কলম্বাস এই গোষ্ঠী বা নেটিভদের সম্মন্ধে লিখেছেন, তাদের কোন জাত ধর্ম নেই। শান্তি প্রিয় এ জাতিকে খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করতে হলে অবশ্যই শক্তির বদলে ভালবাসার মাধ্যমে করতে হবে। ইতিহাসের সম্ভবত সবচে’ কপটতর কাজটি তিনি এভাবেই সুচতুরতার সাথে সমাধা করেন। অথচ ওই একই সময়ে ঐ অঞ্চলে আরো একটি উপদল ‘আলমামী (Almamy)’ নামে মুসলিম আদিবাসী বসত করে আসছিল। ‘আলমামী’ শব্দটিও মানডিন্‌কা এবং আরবী শব্দের সংমিশ্রন যার মুল ‘ইমাম’ বা ‘আল ইমামু’। উল্লেখ্য, মুসলমানদের অন্যতম প্রধাণ উপাসনা নামাজ পরিচালনাকারীকে অথবা গোত্রের প্রধানদেরকে ‘ইমাম’ বলা হয়।

প্রখ্যাত আমেরিকান ঐতিহাসিক হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের লিও উয়েনার (Leo Weiner) ১৯২০ সালের প্রকাশিত ‘আফ্রিকা এন্ড দি ডিসকোভারী অব আমেরিকা’ গ্রন্থে লিখেছেন, কলম্বাস ভালভাবেই অবহিত ছিলেন ‘নতুন দুনিয়া (New World)’-য় মানডিন্‌কাদের উপস্থিতি। তিনি এও জানতেন উক্ত ভূ-খন্ডে বহু পূর্ব থেকেই পশ্চিম আফ্রিকীয় মুসলিমরা ব্যবসা বাণিজ্য এবং ইরোকয় (Iroquois) ও আলগোনকোয়িন (Algonquin) আদি গোত্রদ্বয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে ক্যারিবীয়, কেন্দ্রীয়, দক্ষিণ এবং উত্তর আমেরিকায় কানাডাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়ে আছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় আজও তাদের পাথরে খোদাই করা শিলালিপি বিদ্যমান যাতে ‘ইয়াসুস ইবনে মারিয়া (Yasus Ibn Maria)’ অর্থাৎ ‘Jesus (Son) of Mary’ লেখা রয়েছে যেটি পবিত্র কুরআন থেকে নেয়া ‘ইসা (আ<img src=" style="border:0;" /> মরিয়মের পুত্র’।

সত্যের অনুসন্ধানে ব্রতী ইতিহাস পিপাসুরা আজ ইতিহাসের অজানা বা মিথ্যার কালো প্রলেপে আচ্ছাদিত অধ্যায়কে মানুষের সামনে নতুন করে উন্মোচন করছেন। সাম্প্রতিক কালের সাড়া জাগানো চিন্তাবিদ আফ্রো-ক্যারিবীয় আদি বংশোদ্ভূত ড. আবদুল্লাহ্‌ হাকিম কুইকের ‘ডিপার রুটস ( Deeper Roots)’ গ্রন্থ এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

এসব সত্ত্বেও, গেভিন মেনযিস (Gavin Manzies) এর মত ব্রিটিশ ইতিহাসবিদগণ ইতিহাসের সত্য প্রবাহের উৎস বন্ধ করার জন্য বলে থাকেন, হাঁ আমেরিকা ঠিকই কলম্বাসের পূর্বে আবিষ্কৃত হয়ে থাকতেও পারে, তবে তা নির্ঘাত হয়েছে কেবলমাত্র চীনা জাতির দ্বারা!

[লেখাটি মাসিক পত্রিকা 'অন্য দিগন্ত' এপ্রিল ২০০৮ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে]
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28779949 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28779949 2008-03-17 19:30:32
অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের দ্বৈত নীতিঃ ব্রাকেটবন্দী মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের শান্তির নিভু প্রদীপ বেশ পুলকিত হয়েছিলাম সিলেটের ছেলে ঢাকায় বৃটিশ হাইকমিশনার হয়ে আসায়। কিন্তু কেন যেন এসব আমাদের কপালে সয় না। আমাদের উদার ও নির্যাস ভালবাসার পাপড়িতে না বসে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ব্রাকেট বন্দী করে ফেলেন। ছোট বেলায় আম্মার নানীর মুখে শুনতাম, ‘সব ভাতের দোষ! যাদেরকে খাওয়ায়ে পড়িয়ে চোখ ফোটায়ে দেই, বছর না ঘুরতেই তারা অন্যের কীর্তন গায়!’ ইউরোপের সবচেয়ে ভোকাল আমাদের এমবেসিডড়কে গোল টেবিলের বাইরে কয়জন ভালবাসে তা বোধ করি এখন খুজতে হবে।
আমরা কেউ শ্বেত ভালুকের মুলক থেকে ঘুরে এসে চেনা লোকদের নিয়ে পুরোনো কথা নতুন করে আহামরি করে বলি, কেউবা শ্বেতী সেজে ঘরের মধ্যে ঢুকে ইদুরের মত ধানের বস্তার কোনা থেকে খেয়ে খেয়ে সাবাড় করে দেই। কারন প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সৌকর্যহীন বিড়াল তো আর জেগে নেই! সে তো এখন অযোগ্য ও বিশ্বাসহীনতার অপবাদ নিয়ে লম্বা ঘুম আর পালানোর পথ নিয়েই ব্যস্ত! গত এক বছরের পলিটিক্যাল সিডরে বিপর্যদস্ত এক ক্লান্ত সৈনিক সে!
আমাদের মত গরীবদেশের সমস্যা হল বাইরের বড়লোক ও বড়মাথাওয়ালাদের ছবককে আমরা বড্ড পাত্তা দেই, আবার পল্টন ময়দানে গর্ব করে বলি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী আমরাই! অন্য কথায়, তাদেরকে বেশ সুযোগও করে দেই আমাদের নাড়ি নক্ষত্রের মধ্যে সুবিধামত সময়ে ঢুকে পড়ে তা কেটে ছেটে ফেলার। আবার নিজেরাও সবার জন্য সমান আচরণ না করে অপরিপক্কতার পরিচয় দেই প্রায়শ।
এই যেমন, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে বসে প্রেসিডেন্ট সাহেব সোজা পথে না গিয়ে চায়ের দাওয়াতের নতুন লজ্জাজনক কালচার স্থাপন করে যে খারাপ রেওয়াজটি চালু করেছিলেন, তার আজ শেষ দেখালেন জাতির বিবেকদের ক্ষমা করার মধ্য দিয়ে।ক্ষমা করা মহৎগুন, ক্ষমাতে বা ক্ষমা নেয়াতে দুটোতেই লজ্জা নেই। আবার, ক্ষমা না নিয়ে অন্যায়ভাবে আটকের প্রতিবাদে মানবাধিকার লংঘনের জন্য কেয়ারটেকার চীফের বিরুদ্ধে মামলা করাও তো জাতির বিবেকদের নাগরিক অধিকার। এভাবে মামলা-ধামলা চলতে থাকলে সাধারন মানুষের চ্যাপ্টা হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না বৈ কি (আর বাকীই বা আছে কি?)! তাছাড়া , জাতির বিবেকদের বিবেক যে দুইজনের হাতে বন্দী তাদের কি হবে? আধুনিক সভ্য সমাজে এমন সুব্যবস্থা চালু থাকলে এত আইনজীবি, বিচারকদের রাতদিন খেটে, রাষ্ট্রের এত টাকা খরচ করে মামলা চালানোর দরকারই বা কি? বৃটিশরা যদি বাংলাদেশের আইন ঢাকা ইউনিভার্সিটিরপ্রফেসর ও সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবিদের বাইরে রেখে শুধুমাত্র অশিক্ষিত, দিন-মজুর ও রিক্সাওয়ালাদের জন্যই করে থাকে সে আইন তো মনে হয় বদলানো দরকার!
সনাতনী সত্য কথাটা কি রপ্ত করা যায় না, অপরাধী যেই হোক তার সাজা ভোগ করতে হবে, আর নির্দোষী বা নিতান্তই সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কাউকেই হয়রানী করা যাবে না বা তাদেরকে ছেড়ে দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিতে হবে? জরুরী আইন মানা সবার জন্যই জরুরী করতে হবে, নইলে এর গুরুত্ব হারানো আগেই উঠিয়ে নিতে হবে। এভাবে একের পর এক দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব ইনস্টিটিউশনগুলো কার স্বার্থে ভেঙে ফেলা বা বিতর্কিত করা হচ্ছে? যাহোক, ওসব রেখে আর বিরুক্তি না বাড়িয়ে চলুন মূল আলোচনায় আসি।

আমাদের আজকের আলোচনা অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের অবিচার নিয়ে।

নর্দান আয়ারল্যান্ডের এক স্কুলে পড়াশুনা করতে টিন এজেই দেশ ছেড়েছিলেন বাংলাদেশের মেয়ে আইরিন খান । তারপর ইংল্যান্ড, আমেরিকায় পড়াশুনা শেষ করে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিষ্টসে মানবাধিকার কর্মী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন ১৯৭৮ সালে। অনেক ক্ষেত্রেই তিনি যে প্রথম হওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা জনাব শফিক রেহমান ৮ই জানুয়ারীতে লিখেছেন। গত বছরের নিরুত্তাপ রাজনীতি ও উত্তপ্ত পেট নিয়ে মাত্র ৩০টি বাক্যে তিনি দেশের মানুষের মনের সব কথাগুলো সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। মিসেস খানের প্রাক্তণ দেশে এবারের সফর নিয়ে এই কলামে মেসবাহ উদ্দিন শাকিল খোলাখুলিভাবে চমৎকার একটি আর্টিকেল লিখে কা কা না করার অনুরোধও করেছেন। এই অসামান্য মেধাবী সিলেটি মেয়ের এবারের ভ্রমণটি সরকারীভাবে না হলেও তার বর্তমান সম্মানজনক পদে আসীন থাকায় মিডিয়াতে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। উল্লেখ্য, তিনি একটি রাজনৈতিক দলের অর্থনীতি বিষয়ক সম্পাদক ডঃ আতিউর রহমানের গড়া এনজিও ‘মানুষের জন্য’-র আমন্ত্রণে এসেছিলেন । যাহোক, আমরা সেদিকে নজর না দিয়ে এবার দেখি বাংলাদেশের প্রতি এই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানটি সময়ে সময়ে কেমন ব্যবহার করে।
১৯৭১-র মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবাধিকারের ঝান্ডাবহনকারী অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের বয়স ছিল দশ বছরেরও বেশী। পাক বাহিনীর বর্বরতায় প্রকাশ্য সমর্থনদানকারী আমেরিকা ও বৃটেনের পদলেহী হয়ে একটি বিবৃতিও দিতে তাদের গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। দালাল আইনের দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য কি এ.আই মুজিব সরকারকে চাপ দেয়নি? পুরোনো দিনের কথা না হয় বাদ দিলাম, যদিও পত্রিকায় পড়ে মনে হয় তিনি এগুলো নিয়ে বেশী ব্যস্ত ছিলেন।

‘অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্ট ২০০৭’, যেখানে ২০০৬ সালের ঘটনাসমূহ প্রতিফলিত হয়েছে, তাতেও বাংলাদেশের গোটা চিত্র তুলতে প্রকারান্তরে অবজ্ঞাই করা হয়েছে। রিপোর্টে ৩১ অক্টোবর রাজশাহীতে গণফোরামের সমাবেশে চারদলকে দায়ী করে হামলা, ১৫ নভেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যালয়র সামনে ছোট ছোট সিরিজ বোমা বর্ষনে ৮ জন আহত, এমপি আসাদুজ্জামান নূর ও সাবের হোসেন চৌধুরীর উপর হামলার কথা উল্লেখ করে দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় না আনার কথা বলা হয়েছে। অথচ এই অল্প সময় (মাত্র ১৬ দিন)-র মধ্যে, আরেকটি মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-র রিপোর্ট অনুযায়ী ৫০ জন (যাদের মধ্যে ৩৯ জনই ৪ দলীয় জোটের)-র মৃত্যু ও ২৫০ জনের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে এবং সর্বোপরি মানবেতিহাসে সবচেয়ে অসভ্য, হিংস্র ঘটনা ২৮ অক্টোবর (যা বিবিসি ও সিএনএন সহ সব আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম খুনীদের ছবিসহ লাইভ সম্প্রচার করেছ) সৃষ্টি করা হয়, একই বছরের রিপোর্টে আশ্চর্যজনকভাবে এসবের উপস্থিতি দারুনভাবে উপেক্ষীত হয়েছে।
এ বছর ২৮ জানুয়ারী একটি পত্রিকায় মিসেস খান তার খুব নিকটের পত্রিকায় ‘বাংলাদেশে অধঃপতনের চক্র’ নামক একটি আর্টিকেলে জরুরী অবস্থাকালীন বছর ২০০৭ সাল নিয়ে লিখেছেন ‘অবশ্যই শারিরীক নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার লংঘনের পরিস্থিতি আগের তুলনায় নাটকীয়ভাবে উন্নত হয়েছে।‘ অথচ, ১ জানুয়ারী দেশের একটি মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’- উল্লেখ করেছে, ‘..... ২০০৭ সালের ১২ মাসে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ১৮৪ জন নিহত হয়েছে। জেলহাজতে মারা গেছে ৮৭ জন। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৫৯ জন, এর মধ্যে ২৪৬ জনই শিশু। অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে ১৬১টি। ইন্ডিয়ার সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফ ১২০ জন বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করেছে। অপহরণ করেছে ৯৮ জনকে, ৩ জন বাংলাদেশী নারী বিএসএফ’র হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ১৯৮ জন বাংলাভাষী নাগরিককে পুশইন করা হয়েছে। ........... আমরা আরো লক্ষ করছি, বাংলাদেশ সীমান্তে ইন্ডিয়ান বাহিনী নির্বিচারে বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা করলেও এ ব্যাপারে অ্যামনেস্টি বা সুশীল সমাজের দাবিদাররা নিশ্চুপ। অধিকার-এর দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৭ সালে ১২০ জন বাংলাদেশী নাগরিক বিএসএফ’র হাতে নিহত হয়েছে অর্থাৎ মাসে ১০ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়েছে। প্রতি বছর এ হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েই চলছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ৩৯১ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে বিএসএফ। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে গড়ে ৭৮ জনকে হত্যা করা হলেও ২০০৭ সালে তা ১২০ জনে দাঁড়িয়েছে।‘ পুলিশ বলেছে সামগ্রিকভাবে অপরাধ আগের বছরের চেয়ে বিশ শতাংশ নাকি বেড়েছে।

উল্লেখ্য, চায়নার সাথে সীমান্তরেখা থাকলেও বিএসএফ-র গুলি ওদিকে কিন্তু ফোটে না, শুধু হতভাগা বাংলাদেশীদের ধরে ধরে গুলি করতেই তারা ব্যস্ত! অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল এসব নিয়ে কথা বলেনা, ২৮ অক্টোবর টাইপের দিনগুলো নিয়ে দেশী মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামালরা পর্যন্ত কথা বলেন না (যদিও আর্মি চীফ সুযোগ পেলেই এর বীভিৎসতা নিয়ে কথা বলেন, কিন্তু খুনীদের ধরার ব্যাপারে রহস্যজনকভাবে একদম চুপ!)। কারন, এর মাঝে কেমন যেন অন্য রকম ফোবিয়া আছে, মৌলবাদীর তাড়ি মেশানো আছে। তাছাড়া দুই কুকুরের লড়াই বলে যারা আমাদের স্বাধীনতাকে অপমান করেছিল শুধু তাদের নিয়ে ব্যস্ত থাকার মধ্যে আলাদা মজাও হয়তোবা রয়েছে। আইরিন খান কথা বললেন পুলিশ হেফাজতে আদিবাসী একজন চলেশ রিছিলের মৃত্যু ও কার্টুনিষ্ট আরিফের মুক্তি নিয়ে, লিখলেন স্থানীয় পুলিশ ও র‌্যাব কর্তৃক একজন সাংবাদিকের নির্যাতনের কথা। এসব অবশ্যই নিন্দনীয়, সন্দেহ নাই।কিন্তু কেন যেন মিসেস খান নিজেকে ব্রাকেট বন্দী করে ফেলছেন, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পদের সম্মান রাখতে নিজের আগের একচোখা নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারছেন না, অন্য কথায় মৌলবাদীর ভূত বা বিষাক্ত কালনাগিনীর থাবা হয়তোবা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সারাক্ষণ। অধঃপতনের চক্রে নিজেই পা দিয়েছেন। তিনি হয়তো পালটা প্রশ্ন ছুড়ে বলবেন এত অল্প সময়ে একসাথে অত মানুষের লাশ ও অধিকার নিয়ে কথা বলা যায়? তাছাড়া আশপাশের মানুষজন যারা কিনা দাওয়াত করে নিয়ে এল তাদের জন্যও বা বলি কিভাবে? আমরা তাকে অনুরোধ করব, ঠিক আছে সময় করে পরে বলবেন।সাথে এও অনুরোধ করবো, শুধু দূর থেকে না বলে ঢাকায় এসে যেভাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে ঝেড়ে দিয়ে গেলেন, ঠিক সেভাবে না হলেও অন্তত মাঝারি সারির দু’একজন সাংবাদিক ডেকে ওয়াশিংটন বা লন্ডনে গিয়ে মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় লংঘনকারীদেরকে দুই কথা শুনিয়ে আসেন। আমরা আপনাকে নিয়ে আরো গর্ব করব।

এবার একটু ধারনা নেয়ার চেষ্টা করে দেখি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে জন্ম থেকেই অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের আচরন কেমন।


ইংলিশ আইনজীবি পিটার বেনেনসন (Peter Benenson) ১৯৬১ সালের জুলাইতে লন্ডনে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের জন্ম দেন। বর্তমানের কাজের সাথে আকাশ পাতালের ফারাক থাকলেও প্রতিষ্ঠালগ্নে এটির উদ্দেশ্য ছিল মোটামুটি এরূপ, ‘আমরা হলাম পৃথিবীর চারদিককার সাধারন মানুষ যারা মানবতা ও মানুষের অধিকার রক্ষায় বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। যেকোন ব্যক্তির প্রতি ন্যায়বিচার, সুষম আচরন, বাক-স্বাধীনতা ও সত্য যেখানে প্রত্যাখাত আমরা সেখানে তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে তৎপর।‘ এর বর্তমান লোগোটি হল, মোমবাতির আলো বা শান্তির দ্যুতি ছড়াতে একটি কাটাতার বা অন্যায় অবিচার বাধা দিচ্ছে। পিটারকে প্রতিষ্ঠানটি গড়তে ১৯৬০ সালের ১৯শে নভেম্বরে তার ঐতিহাসিক লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড ভ্রমণই ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করে। পর্তুগীজ দুই ছাত্রের মাতাল হওয়াকে কেন্দ্র করে সাত বছরের সাজা দিয়েছিলেন তৎকালীন আদালত। সেই ঘটনাটিই তিনি পত্রিকাতে পড়ছিলেন ভ্রমণরত অবস্থায় এবং ভাবছিলেন সহায়-সম্বলহীন মানুষদের জন্য কিছু একটা করবার। সমাজের নিগৃহীত, উপেক্ষিত মানুষদের নিয়ে বিখ্যাত আর্টিকেল লিখলেন ‘দি ফরগোটেন প্রিজনার্স (The Forgotten Prisoners)’ এবং এর এক বছরের কম সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করলেন অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল, সংক্ষেপে এ.আই। শুরুটাই ছিল বিতর্কের। উপরোক্ত ভ্রমণটি নিজের পকেটের টাকায় করেছিলেন বলে পিটার যে দাবীটা করেছিলেন তা নিয়ে তার কাছের লোকেরাই প্রশ্ন তুলেছেন। আর বর্তমানে তাদের নানা কর্মকান্ডে বিতর্ক ও দ্বৈত নীতির প্রতিবাদে এর প্রতি নিন্দা, শাখা-প্রশাখা গজিয়ে মারাত্মক আকার ধারন করে এ.আইয়ের ললাটে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ২৭ বছরের মাথায় কালিমা একে দিয়েছে অথবা দিচ্ছে প্রতিদিন।
বলে রাখা ভাল, পাশ্চাত্যের অবিচারের কদাচিৎ প্রতিবাদ করলে এমনেষ্টিকে বলা হয় ‘এন্টি ওয়েষ্টার্ণ’ আর পৃথিবীর বেশীরভাগ মানুষই বিশ্বাস করে এটিকে ‘প্রো ওয়েষ্টার্ণ’ বলে। এই প্রতিষ্ঠানটির আচরনগত পার্থক্য খোলামেলাভাবে চোখে পড়ে যখন কোন এক পক্ষের নামের সাথে ‘মুসলিম’ শব্দটি সংযুক্ত থাকে। ইরাক, আফগানিস্তান দখল, কাশ্মিরী ও প্যালেষ্টাইনীদের ষাট বছরের স্বাধিকার আন্দোলন, চেচেন, বলকানদের মুক্তি আন্দোলন, সুদানের ডারফুর সমস্যা, মরোদের আন্দোলন ইত্যাদিতে এ.আইয়ের জনপ্রিয় শ্লোগান ‘হিউম্যান রাইট নাউ (Human Right Now)’ কেন যেন থেমে যায়।

এই দু’মুখো নীতির বিরুদ্ধে সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী আর্টিকেল লেখেন এবং কথা বলেন লন্ডনের ইকোনোমিষ্ট, আগ্রাসীবিরোধী, অ্যামনেষ্টির একসময়ের কট্টর সমর্থক, লেখক পল দ্যা রোইজ (Paul De Rooij)। অনলাইন ম্যাগাজিন কাউন্টার পানচ (আলেক্সান্ডার ককবার্ন ও জেফ্রি সেন্ট ক্লেয়ার সম্পাদিত)-এ একাধিক আর্টিকেল লিখে এ.আইয়ের রিপোর্টে ব্যবহৃত চতুর শব্দাবলীর চুলচেরা বিশ্লেষণের পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদী ধনিক শ্রেণী ও মজলুম মুসলিম জাতির প্রতি আচরনের তুলনামূলক চিত্র পরিস্কারভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ২০০২ সালের ২রা অক্টোবরে ইসরাইলী ট্যাংক প্যালেষ্টাইনের খান ইউনুস থেকে প্রত্যাহারের পর পরই রাস্তায় প্রচন্ড ভীড়ের মধ্যে বোমাবর্ষণ করে ইসরাইলী হেলিকপ্টার। এমনকি আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে সাথে একটি মিসাইল ছুড়ে দেয় হসপিটালেও। মুহুর্তেই প্রাণ যায় ১৪ জনের, আহত হন ৮০ জন প্যালেষ্টাইনী। ‘মহা সাফল্য (গ্রেট সাকসেস্)’ বলে আখ্যায়িত করলেন শ্যারন। কেউ হয়তো সংগত কারনেই আশা করছিল এ. আই কিছু বলবে। কিন্তু এ.আইর সমস্যা হল এরকম সময়ে ইচ্ছাকৃতভাবে বেমালুম চেপে যাওয়া- ভূখন্ডের উপর ঘটে যাওয়া নিদারুন বড় বড় ঘটনাসমূহ না বুঝার ভান করা।

পল দ্যা রোইজ তার বিখ্যাত দুটি প্রবন্ধ (Amnesty International & Israel: Say it isn’t so এবং Amnesty International: A False Beacon?)-এ আরো লিখেছেন, এ.আইয়ের রিপোর্টিং-র ভাষা পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। দ্বিতীয় ইন্তেফাদার শুরু থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি খুব কমবারই ইসরাইলী সহিংসতার বেলায় ‘নিন্দা (Condemn)’ শব্দটি পর্যন্ত উচচারিত করেছে। অথচ প্যালেষ্টাইনীদের স্বাধীকার আন্দোলনের লড়াকুদের প্রতি এটির ব্যবহারে এ.আই কখনো কার্পন্য করেনি বা করছেও না। ভীতপ্রদ (horrific), বীভিৎস (shocking), ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা (deliberately killed) ইত্যাদি পরিভাষাসমূহ প্যালেষ্টাইনীদের জন্য স্থায়ীভাবে বরাদ্ধ করে রেখেছে অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল। এমনকি তাদের দিকে তাক করে এক রিপোর্টে মাত্র এক প্যারায় তিনবার ‘যুদ্ধ অপরাধ’ শব্দ ব্যবহারের নজিরও স্থাপন করেছে এ.আই। পল প্রশ্ন করে লিখেছেন, যারা শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে নীরিহ মানুষদের হত্যা, ধর্ষণ, অপহরন এমন কোন কুকর্ম নাই যা করেনা, সেই ইসরাইলীদের প্রতি আমাদের মানবাধিকার সংগঠনের আচরন এমন কেন? দখলদারদের প্রতি এ.আইয়ের অনুযোগের সাথে আহ্বানগুলো থাকে এমন, ইসরাইল নিয়ম কানুন মানছে না, তাদেরকে ভাল আচরন করতে হবে, মানবাধিকারের প্রতি তাদের সম্মান দেখানো উচিৎ (to breach legal provisions, to breach standards, to be disproportionate or elicit calls to respect human rights) ইত্যাদি। এসব দেখে মনে হয় বিশ্বব্যাপী এই.আইয়ের মোমবাতির শান্তির আলো ছড়াতে শুধু মুসলমানেরাই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

এভাবে, কোন একটি জাতিকে টাগেট করে সেই জাতির ভেতর থেকেই দেশে দেশে মেকী অতি গনতন্ত্রী ও অনুগত কিছু পুতুল নিয়ে মানব বিধ্বংসী খেলায় মেতে উঠলে মোমবাতির আলোয় বিশ্বে কখনো শান্তির দ্যুতি ছড়াবে না। কিছু বিকৃত চিন্তার মানুষদের কর্মকান্ডের দায়ভার গোটা গুষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দিলে নিজের সংঘঠনের উদ্দেশ্যের সাথেই প্রতারণা করা হবে। আর সার্বজনীনতার কথা বলে মূলত জনগনের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি ও নিরপেক্ষতার ভান করে বিশ্বের সচেতন সম্প্রদায়কে বোকা বানানো কষ্মিনকালেও সম্ভব হবে না, বরং বিভেদ-বিভক্তি এতে করে বাড়তেই থাকবে।

যায়যায়দিনে পড়ুন ৫ই ফেব্রুয়ারী ২০০৮

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28766309 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28766309 2008-02-02 09:36:01
দুই মহৎপ্রাণ, দুই পয়সার ঝুলন্ত লাশ এবং নতুন বছরের প্রত্যাশা গতবছরে ‘মুখের ভিতর পা (Foot in Mouth)’ পুরস্কারপ্রাপ্ত পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষটির মধ্যপ্রাচ্যের ছেড়া ম্যাপের নিউ ভার্সন ও দক্ষিণ এশিয়ার ফাপা মানচিত্রটাকে ফুটো করার কোশেশ নিয়ে লিখব। অদ্ভূত ও মাথামোটা কথা বলার জন্য প্রতিবছর প্লেইন ইংলিশ ক্যাম্পেইন (Plain English Campaign) নামক একটি সংস্থা এই পুরস্কারের ব্যবস্থা করে থাকে। আমেরিকার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামস্‌ফেল্ড পেয়েছিলেন ২০০৩ সালে। বর্তমানের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন অর্জন করেছিলেন ১৯৯৪ সালে। বুশের আজব কথাবার্তা নিয়ে উক্ত সংস্থাটির মুখপাত্র বেন বিয়ার (Ben Beer) বলেন, তারা নিশ্চিত ধরেই নিয়েছিলেন এই পুরস্কারটি গেল বছরে তিনিই পেতে যাচ্ছেন, কারন প্রতিটা দিনই উনি এসব ওজনহীন কথাবার্তা নিয়েই বাস করেন।‘ ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের অধিবেশনে খুব সাধারন কিছু ইংরেজী শব্দের উচচারন (যেমন, Nuclear) নিয়ে জটিলতা তাকে বেশ বেকায়দায় এবং বিশেষকরে আমেরিকানদের লজ্জায় ফেলে দেয়। ওই মাসের শুরুতে একদিনতো বলেই ফেলেছিলেন, ‘প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলা’, অথচ তিনি কিনা এখনো জীবিত। ২০০৪ সালের অগাষ্টে একটি টেলিভাইজড মিটিংয়ে তার আলোচিত আরেকটি উক্তি হলো , Our enemies are innovative and resourceful- and so are we. They never stop thinking about new ways to harm our country and our people- and neither do we (আমাদের শত্রুরা নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনে সক্ষম ও উপকরন সমৃদ্ধ এবং আমরাও এমনই। তারা যেমন আমাদের দেশ ও জনগনকে ধ্বংস করার জন্য নতুন পন্থা উদ্ভাবন খোজা বন্ধ করেনা এবং আমরাও তা করিনা)। ক্যালিফোর্নিয়ায় ভয়ংকর অগ্নিতে ক্ষতিগ্রস্থদের দেখতে এসে এবছর তিনি বলেছিলেন, “All I can tell you is that when the governor calls, I answer his phone (আপনাদেরকে এই বলতে চাই যে, যখন গভর্নর ফোন করেন আমি তার উত্তর দেই)”। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এমন অপ্রাসংগিক কথা বলার মানুষ দুনিয়াতে আর দুইটি পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে ঢের সন্দেহ!

কিন্তু ঘটনাবহুল গত বছরের দুইটি মানবিক ঘটনা আজকের আলোচনার প্রসংগ ঘুরিয়ে দিল।

সাত বছরের ছোট্ট পরীর মত ইরাকী মেয়ে যাহ্‌রার দৃষ্টি ফিরে পাবার কাহিনী

আমেরিকান আর্মি সার্জেন্ট জনি কেম্পেন (Johnny Kempen) ইরাকের কোন এক গ্রামে নিয়মিত টহল দিচ্ছিলেন।
প্রতিদিনের মত আজও শিশুরা দৌড়ে আসছিল ক্যান্ডি ও চকোলেট নেয়ার জন্য। আর সব শিশুর মত দৌড়ে না এসে দূর
থেকে দাঁড়িয়ে থেকে যাহ্‌রার চোখ পিট পিট করা, মহৎ হৃদয়ের এই সার্জন্টের নজর এড়ায়নি। ঘুমানো বাদে সারাক্ষনই
যাহ্‌রার মনে হত চোখের মধ্যে বালুর কণা নড়াচড়া করে। কি ভয়ংকর অবস্থা!

পরস্পরের ভিন ও শ্ত্রুদেশী এই সৈন্য এবং প্রায় অন্ধ এই শিশুটির মধ্যে দুর্বোধ্য ভাষার বাইরে মনোজগতে ভালবাসার একটি সেতু তৈরি হয়ে গেল। মেডিকেল ট্রান্সক্রিপশনিষ্ট মা ও লায়ন ক্লাবে জড়িত বোনের সাথে ইমেইল চালাচালি করলেন জনি। নিজের সদিচ্ছার কথা জানালেন। বললেন, To relieve that pain would be the icing on the cake (তার দূঃসহ সেই বেদনা দূর করাই হবে চূড়ান্ত কাজ)। সবাই এগিয়ে এল। যাহ্‌রা ও তার দাদীকে আমেরিকায় পাঠিয়ে চিকিৎসাসহ যাবতীয় দেনা বহন করল একটি সংস্থা। দুইবার বড় অপারেশন শেষে প্রায় ৬ মাস পর মেয়েটি ফিরে এল পূর্ণ উজ্জ্বল দুটি চোখ নিয়ে। বাড়িতে এসে এবার সে সবার সাথে দৌড়াচ্ছে। মাকে, বাবাকে জড়িয়ে ধরছে, ছোট ভাইটির সাথে সে খেলছে, টেডি বিয়ার নিয়ে ছোটাছুটি করছে, স্কুলে যাবে, আরো কত কথা। মা, বাবা, দাদী সবাই আনন্দে কাদছে। সে এক আনন্দঘন দৃশ্য!

রমিজ উদ্দিনের জীবন ফিরে পাবার কাহিনী

গত বুদ্ধিজীবি হত্যা দিবসে পুলিশের আইজি নুর মোহাম্মদের এক মহানুভবতারও খবর ঢাকা থেকে প্রকাশিত সব দৈনিক ছাপে। সোনার হরিনের নাগাল পাওয়ার আশায় বিয়ানী বাজারের রমিজ উদ্দিনের নিশ্চিত মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফেরত আসার কাহিনী। পনেরো দিন মরু প্রান্তরে অর্ধাহারে, অনাহারে কাটানো, কৃষ্ণাঙ্গদের দ্বারা হামলা এবং শেষে তার ভাষার ‘এই স্যার (আইজিপি) না থাকলে আমি মনে হয় জীবনে দেশে আসতাম পারতাম না। বউ পোলাপানের মুখও দেখতে পারতাম না। নির্যাতনের কারনে আমার হার্ট দুর্বল হয়ে গেছে।‘ জমিজমা বিষয় আসয় বিক্রয় করে প্রতারণার শিকার হয়ে আমাদের দেশের মানুষজনের বিদেশ বিভূইয়ে জংগলে পালিয়ে বেড়ানো, মরুভূমির মধ্যে মৃত্যু, অনাহারে জাহাজে চড়ে অজানার উদ্দেশ্যে নিরন্তর যাত্রা ইত্যাদি নতুন নয়। তবে রাষ্ট্রের উঁচু পর্যায়ের মানুষজনের দ্বারা এমন মহানুভবতার ঘটনার বহিঃপ্রকাশ সত্যি নতুন! সেজন্য সবাইকে ডেকে এনে বলতে হয়। ঘটা করে সাংবাদিক সম্মেলন করে বলতে হলেও বলা উচিত, বেশী মানুষদেরকে জানানোও উচিত। কারন, এমন কিছু ভালো কাজ যদি উপরতলা থেকে করা হয় তবে এর প্রভাব অবশ্যই নিচের দিকে গড়ায়। এই যে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রহস্যজনকভাবে খোয়া যাওয়ায় সংগত কারনেই এর দায়ভার নিয়ে আমাদের এক উপদেষ্টা চলে গেলেন, ধরা ছোয়ার বাইরে থাকা একাদশমন্ডলীর ভেতর থেকে আরো চার নক্ষত্র খসে পড়ল, মানুষজন গতানুগতিকভাবে কিছুদিন পর ভুলে গেলেও এর প্রভাব নিহারিকাপুঞ্জের উপর কিন্তু অবশ্যই পড়বে।

দূর্নীতির প্রতীক সুরম্যপ্রাসাদ র‌্যাংগস ভবন রাজধানীর বুকে গড়ে উঠেছিল সর্বোচচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে, আর তা ভাংতে গিয়ে আদিম প্রযুক্তি হাতুড়ি, শাবল ব্যবহার করে কতজন মানুষের জীবন যে চলে গেল তার দায় কি কারো উপরই পড়ে না? পদত্যাগ তো দূরের কথা, কেউ দেখতে যাওয়ার সময়ও পাননি! কোন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে যে কি হত, তা সহজেই অনুমেয়! বেচারাগুলো লোহাবিদ্ধ হয়ে মরেও শাস্তি থেকে রক্ষা পাননি। সপ্তাহের বেশী দিন ধরেও গন্ধ ছড়াতে হয়েছে, সে গন্ধে অনতিদূরেই বিজয় দিবসের মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে আসা উদ্যম, কর্মচঞ্চল অফিসারদের না হলেও তাদের সহধর্মিনীদের নাকে হয়তো বারে বারে রুমাল দিতে হয়েছে। গাড়ীর জানালার গ্লাস বন্ধ করে উপদেষ্টাদের হয়তো কয়দিন কষ্টকরে যাতায়াত অথবা চৌকষ বাহিনীর বদৌলতে রাস্তা বদল করতেও হয়ে থাকতে পারে। ঝুলে থাকা পায়ের দিকে তাকিয়ে প্রিয়জনদের লাশ নিতে আসা অসহায় আলাউদ্দিনদের কান্না চট্টগ্রামে তো আর পৌছতে পারেনা! সেদিন সেখানে চলছিল নতুন অফিসারদের ব্যাজ প্রদান অনুষ্ঠান, প্রধান উপদেষ্টা অত্যন্ত ব্যস্ত দিন অতিবাহিত করছিলেন। বঙ্গভবন, গণভবন, সেনাভবন, নামকরা সব ইত্যাদি ভবনের সন্নিকটে মরেও নন-হালাল লাশদের থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন। হারানো অমুল্য পুরাকীর্তি, বিষ্ণুমূর্তির মৃত নিঃশ্বাসে সারা দেশের বাতাস ভারী হয়ে যায়, সীমান্তে রেড এলার্ট জারি করা হয়, দুইদিন দু’জন করে গ্রেফতার করে করে রিমান্ডে নেয়া হয়, মানব দরদী (ব্যঙ্গ করে কেউ বলেন, শুধুই মূর্তি দরদী)-রা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখেন, কিন্তু জীবন্ত মুল্যহীন লাশদের নিয়ে মানবতাবাদীদের মহানুভবতা বা কিঞ্চিত ভালবাসা উতরে উঠতে দেখলাম না। একটা অখ্যাত হিউম্যান রাইট্‌স অর্গানাইজেশন ছাড়া কেউই টু শব্দটি পর্যন্ত উচচারন করলেন না। যাহোক, এগুলো এখন পুরোন দিনের গল্প।

এই গল্প নিয়েই অবাধ্য একজন তরুন কার্টুনিষ্ট বিখ্যাত হওয়ার জন্য তুলি নিয়ে বসল। ১৯৪০ সালের মম্বন্তরের লাশ নিয়ে মানুষের সাথে কাক শকুনের কাড়াকাড়ির সেই দৃশ্যের বাস্তব সদৃশ ছবি একে জয়নুল আবেদীন শিল্পাচার্য ও বিখ্যাত হয়েছিলেন। সেও চাইলো এমন কিছু একটা করতে। উজীর, নাজীর ও সিপাহসালার নিয়ে রাজা বেড়াতে গেছেন রাজধানীর সবচেয়ে উঁচু প্রাসাদে। মজা করে সবাই এ তলা ও তলা ঘুরে ফিরে দেখছেন। মুহুর্তেই অঘটনটি ঘটে গেল। হঠাৎ পা ফসকে রাজা চৌদ্দ তলা থেকে পড়ে আটকে রইলেন ছয় তলায়, হতোদ্যম উজীর তাই দেখে কোন দিশা না পেয়ে লাফ দিলেন নীচে। আর নীচেই চলছিল আরেকটি দালান নির্মানের কাজ। বীমের ধারালো লোহাগুলো তাক করাই ছিলো। তিনিও আটকে গেলেন তাতে। অপর দুই বুদ্ধিমান সঙ্গী আর ভুল করলেন না। নীচে নেমে এলেন। তারপর কি করলেন? কিভাবে উপসংহার টানবে তা আর মেলাতে পারছে না ওই কার্টুনিষ্ট। জনগনকে সাথে নিয়ে ঝুলে থাকা অতি দামী লাশ দুটির দৃশ্য উপভোগ করলেন, নাকি ঝুকির মুখে কাউকে না ফেলে নগরের সব নির্মান শ্রমিক, ফায়ার সার্ভিস, ইঞ্জিনিয়ারদের ছুটি দিয়ে বললেন, এগুলো উদ্ধার করা আর সম্ভব নয়। পচতে দিন, কিছুদিন পর এমনিতেই সব ঠিক হয়ে যাবে, চলুন সবাই কুচকাওয়াজে যোগ দেই, নতুন অফিসারদের সার্টিফিকেট দেই- আর ভাবতে পারল না তরুন শিল্পীটি। বিখ্যাত হওয়ার শেষ আশাটুকু সে ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র মনযোগ দিল।

আসুন, আমরা এবার অল্প একটু মনযোগ দিই বিবেকের কাছে। বিবেকের নিকট দায়বদ্ধতা না থাকলেও দূর্নিতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়লেও পলিটিশিয়ানদের তো জনগনের নিকট বাধ্য হয়ে একসময় হিসাব দিতে হয়। একটা সময় পর পর তাদের নিকট কাচুমাচু হয়ে ফিরে যেতে হয়। কিন্তু জনগনের নিকট যাদের কোন দায়বদ্ধতাই নাই তারা কি করবেন? বিবেক ও মুল্যবোধ দ্বারাও কি তারা তাড়িত হবেন না? যাদের মহৎ প্রানের প্রচেষ্টায় যাহ্‌রা ও রমিজ উদ্দিনের জীবন নিশ্চিত ধ্বংসের কিনারা থেকে পরশ পাথরের ছোয়ায় বাচিয়ে রেখেছে, সেরকম হওয়া কি খুবই অসম্ভব? নতুন বছরে না হয় এমন অসম্ভব আশাটুকুই করি, এমন মহতপ্রাণ মানুষদের পদচারনা দেশময় ভরে যাক, সাথে সুস্থির গনতন্ত্র ফিরে আসুক বিবেক ও জনগনের কাছে দায়বদ্ধতা নিয়ে এবং ফিরে যাক সবাই স্ব স্ব কর্মস্থলে দানব অসুরের পরিবর্তে মুল্যবোধের প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে।

* লেখাটি দৈনিক যায়যায়দিন ১১ই জানুয়ারী ছেপেছে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28759977 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28759977 2008-01-11 07:54:40
কানাডার আকসা পারভেজের মৃত্যুঃ একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
পুলিশের ভাষানুযায়ী এটি ছিল একটি নিছক ‘গলা টিপে হত্যা (Neck Compression)’ ;এর বাইরে তারা আর কিছুই বলছে না। এসব দেশে যে কোন ব্যক্তি (শিশু থেকে মৃত লাশ পর্যন্ত সবার আস্তিক, নাস্তিক, সংশয়বাদী)-র নাগরিক অধিকার কঠোর আইন দ্বারা সংরক্ষিত। আদালতে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে এরা সাধারনত উলটাপালটা কথাও বেশী বলেন না। কিন্তু মিডিয়া ছাড়ছে না। ভাবখানা দেখে মনে হয়, এরকম একটা ঘটনার জন্যই বুঝি পাপারাজ্জিরা প্রস্তুত হয়েছিল। সাথে যুক্ত হয়েছি আমরা, যারা কিনা ওয়েষ্টার্নদের চেয়েও বেশী ওয়েষ্টার্ন হয়ে গেছি। অসত্য প্রবাদবাক্যের মত, ব্রাক্ষ্মন মুসলমান হলে নাকি বেশী গরু খায়।

মেয়েটির করুন মৃত্যু, হত্যার অভিযোগে স্বামী জেলে, পুলিশের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে অপর ছেলেটিও গ্রেফতার, মিডিয়ার অত্যাচার, মাতম করা তো দূরে থাক সব মিলিয়ে কোনদিকে যাবেন কূলকিনারা পাচ্ছেন না পরিবারের বর্তমান কর্ণধার মুমূর্ষ মা মিসেস পারভেজ। নতুন জীবন গড়তে এসে জন্মভূমি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এমন এক দুর্যোগ দূর্বিপাকের সম্মুখীন হবেন তা কি কখনো কেউ ভেবেছেন? হতভাগা মেয়েটির জানাযাও শেষ মুহুর্তে বৃহৎ ইসনা মসজিদ থেকে সরিয়ে অন্যত্র সারতে হয়েছে ঘরোয়া পরিবেশে, অত্যন্ত চুপিসারে। যে কোন ঘটনার সাথে আরবী নাম, হিজাব টাইপের কথাবার্তা থাকলে জমে ভাল। মাত্র দশ মিনিটের জন্য সপ্তাহে একদিন মসজিদে গেলেও অথবা মৌসুমী মুসল্লী হলেও ‘ডিভোটেড মুসলিম’ বানিয়ে মোটামুটি একটা হিংস্র বা বর্বরতার রূপ দিয়ে সংশ্লিষ্ট ধর্মের সাথে যোগসূত্র স্থাপন করা যায়। আকসার বন্ধু-বান্ধবদের উদ্ধৃতি দিয়ে ব্যাপকভাবে ভার্চুয়াল ও স্ক্রিন মিডিয়াতে প্রচারিত হচ্ছে, মাথা ঢাকতে অস্বীকার করে স্কুলে যাওয়া ও এই বয়সে বাড়ি থেকে বের হয়ে বন্ধুর সাথে থাকাতেই পাষন্ড বাবার এই কান্ড-‘অনার কিলিং (Honor killing)’; যা আকসার বাবার নিজ ধর্মেও গর্হিত চরমতম শাস্তিযোগ্য অপরাধ! ১৭ই ডিসেম্বরে বহুল প্রকাশিত ডেইলী টরোন্টো স্টার ঘটনাটির পিছনে অন্য কারনসমূহ বের করার ইঙ্গিত দিয়ে মন্তব্য প্রকাশ করেছে, ‘যে বাড়ির কোন মহিলা সদস্যাই হিজাব পড়েন না, সে বাড়িতে কি করে তা-ই না পড়ার অজুহাতে একটি মেয়ে খুন হতে পারে?’ মাথা না ঢাকার অপরাধে বাবা কর্তৃক আদরের মেয়েকে একেবারে খুনই করতে পারে কিনা, না কি এটা সচরাচর আরেকটি এংগার ম্যানেজমেন্টের করুন পরিনতি, তার রহস্য উদ্ঘাটনের দায়িত্ব আমরা আপাতত পুলিশ ও আদালতের উপর ছেড়ে দিয়ে আসুন একটু ভিন্ন আঙ্গিকে আলোচনা করি।

এর মাস তিনেক আগে (২রা অক্টোবর) একই শহরে কানাডিয়ান ইমিগ্র্যান্ট এক মহিলার রক্তাক্ত লাশ নিজের বাড়ী থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। দেশে ফিঁয়েন্সকে ফেলে ফিলিপিনো মহিলা মিসেস ডুলনুয়ান এখানে এসে বিয়ে করেছিলেন। সন্দেহভাজন আহত স্বামীসহ আরও একজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এই ঘটনার দুই মাস (২৯শে নভেম্বর) পার হতে না হতেই নাম ও বয়স না প্রকাশ করে পুলিশ আরো এক অক্ষত কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে মৃত মহিলার লাশ পেয়েছে তার নিজ কন্ডো থেকে। বছর দেড়েক আগে একজন বাংলাদেশী তার স্ত্রীকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে টরন্টোতে। বুয়েটের মেয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ফারজানা আপাকে মেরে মিশিগানে স্বামী জেল খাটছে প্রায় পাচ বছর ধরে। গত ২১শে ডিসেম্বরে জ্যামাইকায় স্বামীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হলো গৃহবধু শাহিদা সুলতানা লাভলী। আমাদের এক প্রাক্তন প্রতিবেশী সিঙ্গেল মাদার শেরী বলত, তার মেয়ে সারাহ্‌র বয়স যখন দুই বছর, তখনই তার বাবা ‘জাস্ট ওয়াক্‌ড আউট (বাড়ি থেকে চলে গেছে)’। মেয়েটির বর্তমান বয়স বারো বছর, বাবা এখনো ফেরেননি। শেরী বলত, সেজন্যই সারাহ্‌ বেশী বেশী আমাদের বাসায় এসে পারিবারিক বন্ধন উপভোগ করতে নাকি পছন্দ করত।

মহিলাদের উপর অত্যাচার, নির্যাতনের হরদম কাহিনী বলতে গেলে এসব দেশে নিয়মিতই হয়ে গেছে। এক নারী অধিকার সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে তো দেখলাম, প্রতি সাত সেকেন্ডে আমেরিকায় কোন না কোনভাবে মেয়েরা তাদের আপনজনদের হাতে নিগৃহীত হচ্ছে। আবার এর বাইরে, নিজের সন্তানকে গাড়ির মধ্যে রেখে বিউটি পার্লারে যাওয়া এবং ফিরে এসে মৃত পাওয়া, গার্লফ্রেন্ডের সহায়তায় পানিতে আপন সন্তানদেরকে চুবিয়ে মারা, শুট করা ইত্যাদির ঘটনাও নতুন নয়। হোমিসাইডের এমনসব ঘটনা এসব দেশে ঘটে যা আমাদের দেশে বসে চিন্তাও করা যায় না, আর আমাদের দেশে মাঝে মধ্যে এমনসব ঘটনা ঘটে, যা এসব দেশের মানুষ ভাবতেও পারেনা।

কোন পরিবারের জন্য তরুন ছেলেমেয়েদের বিগড়ে যাওয়া নতুন কোন অভিজ্ঞতা নয়। কিভাবে এদের মনমানসিকতার সাথে খাপ খাওয়ায়ে একটি সেতু বন্ধন সৃষ্টি করা যায় সেটিই বিবেচ্য বিষয়। প্রায় অপ্রতিরোধ্য এই সামাজিক, পারিবারিক সমস্যা ও এংগার ম্যানেজমেন্ট (Anger Management)-কে কিভাবে নিয়ন্ত্রন করা যায় তা নিয়ে সমাজ বিজ্ঞানীরা ভাবতে বসেছেন। কড়া আইনেও এদের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছেনা কেন তা নিয়ে তারা প্রচুর গবেষনা করছেন। মূল সমস্যার অন্তর্মূলে গিয়ে সমাধানের পথে না যেয়ে ‘কালচারাল ক্ল্যাশ’, ‘নো টু হিজাব’, ‘নো টু ইসলামিক স্কুল’, ‘পলিটিক্যাল কাঠমোল্লাদের বানানো ইসলামে এটি নতুন সংযোজন’ ইত্যাদি জাতীয় সস্তা কথাবার্তা বলে, একদল লোককে ক্ষেপিয়ে তুলে সহজে স্কলার হয়ে গেলেও, অশান্ত এই পৃথিবীতে আর যাই হোক শান্তি আসবে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোন সদস্য কর্তৃক বিচার বহির্ভূতভাবে কোন হত্যার জন্য সংশ্লিষ্ট অপরাধীর পরিবর্তে কেউ কি খোদ উক্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেই নিষিদ্ধের দাবী তোলে? মানূষের দৃঢ বিশ্বাসে হাত না দিয়ে বা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনাকে পুঁজি না করে তা থেকে কিভাবে অশিক্ষা-কুশিক্ষা, গোঁড়ামী ও ধর্মান্ধতা দূর করা যায়, সেদিকে নজর দেয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

উদার মন থাকলে মানুষের বিশ্বাস, কৃষ্টি, ঐতিহ্যের ভিন্নতা ও বৈচিত্রতা একটি দারুন সৌন্দর্য ও উপভোগের বিষয়। মাল্টিকালচারিজমের কথা বলা হবে, জুইস স্কুল, ক্যাথলিক স্কুলের চরম নিয়ন্ত্রিত ও সংরক্ষিত শিক্ষাব্যবস্থাকে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার পাদপীঠ বলা হবে, আর ইসলামোফোবিয়া আতঙ্কে মুসলিমদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নিজ্বস্ব দৈনন্দিন কর্মকান্ডের সমালোচনা করে প্রমান করার চেষ্টা করা হবে যে ‘ইসলাম মানেই সন্ত্রাস’-এর মানে তো সবার জন্য সমান আচরন নয়। আমেরিকার টক শো’গুলো এই দ্বৈত নীতির পক্ষে সাফাই গেয়ে অদ্ভূত যুক্তি দিয়ে বলছে, ‘আমাদের সমাজে বহুমাত্রিক কালচারালের মোজাইক থাকবে ঠিকই, তবে সেখানে মেয়েরা হেড স্কার্ফ পড়তে পারবে না’!

ডেট্রোয়েটে কালো আমেরিকান মেয়েদেরকে আমাদের দেশের ঠিক হাফেয সাহেবদের মত মাথায় সাদা গোল টুপি পড়তে দেখতাম। আমি তো অবাক হয়ে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট ছাড়া এগুলো তোমরা কোথায় পেলে? আর ছেলেরা পিছনে ঝুলানো মাথায় কালো একটি পট্টি (ঠিক RAB-র মত) বেধে সারাদিন দিব্যি চষে বেড়ায়। আফ্রিকীয়দের ঐতিহ্যবাহী ঢিলেঢালা সাত রঙের অদ্ভূত পোশাক, চাইনিজ পুরুষদের ট্র্যাডিশনাল জমকালো জি পাও ও মহিলাদের চাং সান, মালয় মহিলাদের বাহারি পোশাক বাজু কোরোং ও পুরুষদের সারুন (লুঙ্গি)-র উপর দিয়ে আলাদা এক ফালি কাপড় পেচানো, খ্রীস্টান পুরুষ পাদ্রীদের মাথায় এক ধরনের টুপিসহ আজানুলম্বিত গাউন ক্যাসোক (cassock) ও নানদের হেড স্কার্ফ, জুইশ পুরুষদের পোশাক সাদা হাটু পর্যন্ত লম্বা কিটেল (kittel) ও পীর সাহেবদের মত বুক পর্যন্ত লম্বা দাড়িসহ মাথার ঠিক মাঝখানে ছোট্ট টুপি ইয়ামাকা (yamaka) বা কিপ্‌পাহ (kippah) আর মহিলাদের পেচিয়ে মাথা ঢাকা কাপড় কিপ্পট (kippot), শিখ পুরুষদের দেওবন্দ হুজুরদের চেয়েও বড় পাগড়ী (যা কানাডাতে এমনকি মোটর সাইকেল চালাতে হেলমেটের বদলে পর্যন্ত পড়ার অনুমুতি রয়েছে) ও মহিলাদের শাড়ীর ঘোমটা, উপমহাদেশের পাজামা-পাঞ্জাবী, সালোয়ার-কামিজ, শেরওয়ানি, ঊড়না, কিস্তি টুপি ও শাড়ি ইত্যাদি এসেছেই তাদের কোন না কোন বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে।

নিজে মানুন বা না মানুন, কানাডিয়ান ভ্যালুই হলো এগুলোকে সমীহের চোখে দেখা, কটাক্ষ না করা; আর সহনীয় ও সাধারন মানুষেরা কিন্তু তাই ই করে। ভিন্ন কালচার সম্মন্ধে জানতে মুক্ত চিন্তার এদেশের মানুষজনের প্রচন্ড আগ্রহ দেখেছি। গত বছর আমার অফিসের (যাদের মধ্যে আমিই একমাত্র মুসলমান) সবাই জড়ো হয়ে অবাক ও মনোযোগ সহকারে শুনছিল ঈদুল আযহার ইতিহাস। আকসার মৃত্যুর দুইদিন পর ১২ই ডিসেম্বরে সিবিসি টেলিভিশন সাবেক জুইশ হেড স্কার্ফ পড়া সাদা মহিলা সান্ড্রা নওয়ি’র দীর্ঘ সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করে। পপ স্টার ক্যাট স্টিভেন (ইউসুফ ইসলাম)-র এক সময়ের অন্ধভক্ত সান্ড্রা খোলামেলাভাবে তার অনুভূতি প্রকাশ করছিলেন। বলছিলেন, সতেরো বছর বয়স থেকে বিদ্রোহী ও আনহ্যাপি যুবতী হিসেবে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়া, মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে অল্পের জন্য জীবন রক্ষা পাওয়া, গান বাজনা, ড্রিংক্স ইত্যাদি নিয়ে অতৃপ্ত জীবন বাহিত করার কথা। বর্তমানে নিজে নিজেই হিজাব পছন্দ করে তা পড়ে অফিস করার সুখানুভূতি প্রকাশ করছিলেন তিনি কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনে। তাই বলছিলাম, যারা এটি পরিধান করেন তারা যদি একে বাধা মনে না করেন, তবে আপনি বা আমি বলার কে? এসব পড়তে গিয়ে কেউ যদি মারাই যায় অথবা না পড়ার জন্য যদি কাউকে মেরে ফেলা হয় তার দায়-দায়িত্ব তো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই নিতে হবে, বেচারা পোশাকের ঘাড়ে সব দায় চাপিয়ে আমরা সমাজ ও পরিবারকে তো পরিশুদ্ধ করতে পারি না।

সাত লাখেরও বেশী মানুষের শহরটি হল মিসিসাগা। বহু জাত, ধর্ম ও বর্নের সংমিশ্রনে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসরত এই শহরে শতকরা ৪৫ ভাগেরও বেশী মানুষ ইংরেজীর বাইরে অন্য ভাষায় কথা বলে প্রমান করছে ইমিগ্র্যান্টদের (৪০.২০%) ব্যাপক পদচারনা। ১৯৭৮ সালের পূর্বে আপেল বাগান ও আদিবাসীদের আবাসস্থল মিসিসাগাকে উন্নত, নিরাপদ ও আধুনিক বিশ্বমানের সিটিতে পরিনত করতে শতকরা প্রায় সাত ভাগ মুসলিম পুরুষ ও মহিলা যাদের মধ্যে অগনিত পেশাজীবি ইঞ্জিনিয়ার‌, ডাক্তার, প্রফেসর, ফার্মাসিস্ট, ব্যাংকার, একাউন্ট্যান্ট, দক্ষ শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য্য। অসংখ্য ব্যবসায়ী ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও উদ্যোক্তা তারাই। রাজনীতিতেও তারা পিছিয়ে নেই। আকসাদের এলাকার এমপিই হলেন পাকিস্তানী ইমিগ্র্যান্ট ওয়াজিদ খান, তার পাশের এলাকার তরুন এমপি হলেন সউদী বংশোদ্ভূত ইঞ্জিনিয়ার ও এমবিএ ওমর আলগাবরা।

ছিয়াশি বছর বয়স্কা সিটির মেয়র হ্যাযেল ম্যাকক্যালিয়ন (Hazel McCallion) যিনি নিরুংকুশভাবে (৯১% ভোটে) জয়ী হয়ে ত্রিশ বছর ধরে অফিস করছেন এবং ননসেন্স পলিটিক্সের বিরুদ্ধে সোচচার হওয়ায় সবাই যাকে আদর করে ‘হারিকেন হ্যাযেল’ নামে ডাকেন; সুযোগ পেলেই মুসলিম নারী ও পুরুষদের ভূয়সী প্রসংশা করে বলেন ‘আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সুশৃংখল এক পরিশ্রমী কমিউনিটি’। ভিন্ন ধর্ম ও পোশাকের প্রসংশা করে এংলিকান (Anglican) চার্চের সদস্যা ও এখনো হকি খেলোয়ার হ্যাযেল এই বয়সেও তার নিজের নৈতিক দৃঢতা ও সক্ষমতার সাথে কাজ করাকে ‘ক্যাথলিক পাওয়ার’ বলে গর্ব করেন।

পরিশেষে, ইমিগ্র্যান্টদের উদ্দেশ্যেও বলতে চাই, জোর জবরদস্তি করে কোন কিছু করার সুযোগ স্বদেশে থাকলেও তাদের নতুন এদেশে নেই। বড়দের সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বললে যেসব দেশে বেয়াদব বলে গন্য করা হয়, আর এখানে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা না বললে অপরপক্ষ অপমানিত ও উপেক্ষিত হয়। নিজ জন্মভূমির রপ্ত করা শিক্ষা ও মূল্যবোধের সাথে আসমান জমিন ফারাক এসব অজানা অচেনা পরিমন্ডলে মডার্ন ম্যানেজমেন্ট বুঝে অত্যন্ত সতর্কতা ও বুদ্ধিমানের সাথে পথ চলতে হয়। সন্তাদেরকে শুধু শিক্ষা প্রদান নয়, গুরুত্ব দিয়ে তাদের কাছ থেকে শিখতেও হয়। আর তা না করলে অনিশ্চিত গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে মহাসমুদ্রের এ যাত্রায় নাবিকের হাতের রশি যেকোন মুহুর্তে ছিড়ে জাহাজ ভর্তি যাত্রীসহ অতল সমুদ্রের অচিন ও চাকচিক্যময় জগতে তার সযত্নে লালিত প্রিয় জাহাজটি চিরদিনের মত হারিয়ে যেতে পারে।
লেখাটি দৈনিক আমারদেশ ১৫ নয়াদিগন্ত ১৬ ই জানু'০৭ এ ছেপেছে

Plz. click here to read it in English from the daily Financial Express on Jan14'07
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28756879 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28756879 2008-01-05 09:15:54
একজন প্রেসিডেন্টের ইমেইল এবং আমাদের নেগেটিভ মনোভাব গুরুজনেরা, পন্ডিতমানুষেরা মাথার উপরে থাকলে অনেক উপকারে আসে। মনের ভিতর থেকে কথা বলে চমৎকার অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারেন। কর্মক্ষমতা সীমিত থাকলেও বিশাল ব্যক্তিত্বের প্রভাবে সুন্দর একটা আবহ তৈরিতে সাহায্য করেন। সেজন্যই আমরা দীর্ঘদিন ধরে শয্যাসায়ী বাবা-মাকেও পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে দিতে চাইনা। আর প্রকৃতির অমোঘ বিধানে তারা চলে গেলেও বলি বটবৃক্ষের ছায়া থেকে বঞ্চিত হলাম। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশকে একসাথে এত পন্ডিত কখনো শাসন করেন নাই। এদিক থেকে আমরা বেশ ভাগ্যবানই বলতে হবে। আইএ, বিএ, এমএ থেকে শুরু করে অনেক ব্যরিস্টারদেরকে একসাথে দেখলেও, আমরা এত ডক্টরকে শাসন ক্ষমতায় বা গুরুত্বপূর্ন পদে কখনো দেখিনি। তুলিতে আকা আলপিনের বিড়ালের অমুসলমানিত্ব সম্পন্ন করার পর, হিজাব পড়া মেয়েদের ভোটের জন্য কানের রিং ও মাথার চুলের একাংশ দেখানোর আজব নিয়ম বহাল রেখে আবার কোন পন্ডিত ডক্টরকে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা অনুষ্ঠানে দেখলে জাত যাবে।
উপমহাদেশের পার্লামেন্টারী গনতন্ত্রের তিনটি প্রতিবেশী দেশেরই প্রেসিডেন্টদের ক্ষমতা মোটামুটি একই রকম। পন্ডিত হলেও নির্জীব, নির্লীপ্ত থাকা, বটবৃক্ষের মত শুধু ছায়া প্রদান করা। ফোস করে না উঠলে বোঝাই যায় না সাংবিধানিক এসব বটবৃক্ষের শিকর কত গভীরে প্রোথিত! ফারুক লেঘারী ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে পর পর দু’বার ফুসে উঠে দুটি পার্লামেন্ট ভেঙ্গেছিলেন। গনতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দুই প্রধানমন্ত্রী যথাক্রমে বেনজীর ও নওয়াজ শরীফকে রাস্তায় পাঠিয়েছিলেন। নিরীহ, মিতভাষী মানুষ আমাদের আব্দুর রহমান বিশ্বাসও কিন্তু ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রেগেমেগে একজন সেনাপ্রধানকে নিজ বাড়িতে চলে যেতে বলেছিলেন। সিংহাসনে উপবিষ্ট রাষ্ট্রের সবচেয়ে দামী ও গম্ভীর মানুষগুলো কেতাদুরুস্ত পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করে ফিতা কাটা, সার্টিফিকেট বিতরন, মোনাজাত, মাজার জিয়ারত বা পুস্পমাল্য অর্পনের পাশাপাশি মাঝে মাঝে নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগের সাথে জনগনের দায়িত্বানুভূতিও সৃষ্টি করে থাকেন। আমেরিকা বা পশ্চিমের প্রেসিডেন্ট ও প্রফেসররা যেখানে টি শার্ট বা জগিং করে হেলেদুলে কথা বলে কাউবয় হওয়ার জন্য ব্যস্ত, উপমহাদেশ বা এশিয়ার মান্যবররা মুখ বন্ধ করে কে কত বেশী গম্ভীর অন্যভাবে বললে কে কত বড় ব্যক্তিত্বশীল, তা প্রমানের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ঢাকার শপিং মলে হঠাৎ দেখা পাওয়া ক্লাশের কোন টিচারকে যদি কেউ বলে উঠে ‘হেই মাই টিচার ইজ হিয়ার’, ‘আর ইউ ক্রেজি’ ইত্যাদি; পরদিনের ক্লাশ রুমে তার পরিনতির কথা ভাবতেই ভয় লাগে।
আমেরিকার সামনে বছরের প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে ফ্রন্ট রানারদের অভিজ্ঞতা নিয়ে মজার মজার কথা বাজারে আসছে, যারা কিনা বর্তমানে কেউ গভর্ণর, সিনেটর, মেয়র, কংগ্রেস সদস্য ইত্যাদি। মাইক হোকাবি (Mike Huckabee) আজো কোন স্টোরে ঢুকতে গিয়ে দরজা খুলতে গ্লাসে হাত দেন না। কারন টিনএজ বয়সের পেনিতে কাচে আঙ্গুলের দাগ মোছার কষ্টকর চাকরির কথা এখনো ভুলেননি। মিট রোমনি (Mitt Romney) স্যুয়েজ পাইপের ফ্লো বন্ধ করতে রেন্‌চ নিয়ে কাজ করতেন। হিলারী ক্লিনটন চামচ দিয়ে মাছের নাড়িভুরি আলাদা করতেন। রিপাবলিকান ফ্রেড থমসন (Fred Thomson) জুতার ফ্যাক্টরীতে কাজ করতেন। ডেমোক্র্যাট বারাক ওবামার (Barack Obama) সবচেয়ে অড জব হলো বাসকিন-রবিন্সে আইসক্রীম তোলা, কারন তিনি তুলতে গিয়ে খেতেন বেশী। রিপাবলিকান রুডি গিলিয়ানি (Rudy Giuliani) ল’ পড়তে যাওয়ার আগে যাজক ছিলেন আর ঔষধ বেচতেন। আমাদের দেশের মান্যবরদের নিয়ে বাজারে এসব কথা বেরুলে তা লজ্জার সীমা থাকবে না বৈকি! আবশ্যি দিন এখন অনেক বদলেছে।
যাহোক, আমরা ইন্ডিয়ার এইতো গেল প্রেসিডেন্ট চপ্পল পড়া, পরমানুবিজ্ঞানী ডঃ এ.পি.জে. আব্দুল কালামের কথা বলছিলাম। মেয়াদ শেষ হওয়ার কিছুদিন আগে হায়দারাবাদে একটা বক্তৃতা দেন এবং নিজেই ইমেইলে সেটি বিশ্বব্যাপী ইন্ডিয়ানদের মাঝে ছড়িয়েও দেন। বর্তমানে হাইস্কুলের ছেলেপুলেরা ইমেইল আর চ্যাট নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বাংলাদেশের বড় বড় কর্তাব্যক্তিরা নাকি এর প্র্যাক্টিস তেমনটি করেন না। কথাচ্ছলে দূর্মুখেরা একটি কৌতুক ছড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের দেশের কোন একজন দামী মানুষ অষ্ট্রেলিয়ায় বা কোন এক দেশে নাকি গিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে। ব্রেক টাইমে কফির ফাকে অন্যান্য দেশের ডেলিগেটরা জানতে চেয়েছিলেন আমাদের দেশের মাননীয় প্রতিনিধির ইমেইল এড্রেস। উত্তরে তিনি নাকি বলেছিলেন, আমি এটি এখনো পাইনি। সেক্রেটারীর কাছ থেকে জেনে নিয়ে পরে আপনাদেরকে দিব। সব কৌতুকেই যেমন শেষের উত্তরটি জানা যায়না। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। উত্তর শুনে ভিন্ন দেশের ডেলিগেটরা কি মন্তব্য করেছিলেন সেটি আর কৌতুকে নেই। নিন্দুকদের স্বভাবই তো নিন্দা করা, আমরা না হয় তাদের কথা বিশ্বাস নাই বা করলাম।
ডঃ এ.পি.জে. আব্দুল কালামের ইমেইলের বিষয়বস্তুর সাথে বাংলাদেশের প্রেক্ষিত প্রায় মিলে যায় হেতু আমরা একটু আলোচনা করতেই পারি। তিনি ফেলো ইন্ডিয়ানদের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলেন, আমাদের মিডিয়া এত নেগেটিভ কেন? আমরা কেন আমাদের নিজস্ব শক্তি, অর্জনকে স্বীকৃতি দিতে লজ্জা পাই? তারপর তিনি বলে গেলেন, আমরা এক মহান জাতি। আমাদের রয়েছে অনেক অভাবনীয় ও চমৎকৃত করা সাফল্যের কাহিনী। কিন্তু আমরা নিজেরাই এর স্বীকৃতি দিতে প্রত্যাখান করি। কেন?? দুধ উৎপাদনে আমরাই প্রথম। রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইটে আমরাই নাম্বার ওয়ান। গম উৎপাদনে দ্বিতীয়, চাল উৎপাদনেও তাই। ডঃ সূদর্শনের দিকে তাকান, যিনি এক অজপল্লীকে স্বনির্ভর ও স্ব-চালিত গ্রামে রূপান্তরিত করেছেন। এরকম উদাহরন লাখ ছাড়িয়ে যাবে, কিন্তু আমাদের মিডিয়া কেবলই ব্যস্ত খারাপ খবর নিয়ে, ব্যর্থতা আর দূর্দশার করুন চিত্র নিয়ে। তিনি বলেন, আমি তেল আবিবে বসে একদিন নিউজপেপার পড়ছিলাম। দিনটি ছিল, হামাস কর্তৃক মূহুর্মুহ বোমা আক্রমন ও অগনিত হত্যাযজ্ঞের পরেরদিন। কিন্তু নিউজপেপারের প্রথম পুরো পাতা জুড়ে ছিল এক জুইশ ভদ্রলোকের সাফল্যের কাহিনী। যিনি কিনা পাচ বছরের মাথায় তার নিজের মরু জমিকে পরিনত করেছেন দর্শনীয় ফুল আর বৃহত ভূট্টা খামারে। এ এমনই এক চিত্র যা প্রত্যেককে জাগাতে পারে। রক্তাক্ত ঘটনাসমূহ যেমন, হত্যা, খুন, বোমা বর্ষন ইত্যাদির খবরগুলো ছিল ভিতরের পাতায় অন্যান্য খবরের সাথে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, আর ইন্ডিয়ায়? প্রতিদিনই আমরা পড়ি মৃত্যুর খবর, রোগ-শোক, অপরাধ আর সন্ত্রাসের খবর। কেন আমরা এত নেগেটিভ? আরো একটি প্রশ্ন, কেন আমরা জাতিগতভাবে বিদেশী জিনিসের প্রতি মোহগ্রস্ত? চাই বিদেশী জামা, প্যান্ট, বিদেশী টেকনোলোজী, বিদেশী সবকিছু।
তিনি জনগনের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, আমরা কি এটা বুঝিনা যে, আত্ম-সম্মান আসেই আত্ম-নির্ভরতা থেকে? হায়দরাবাদের যখন আমি এই বক্তৃতাটি দিচ্ছিলাম, একটি চৌদ্দ বছরের মেয়ে এসে আমার অটোগ্রাফ চাইল। জিজ্ঞেস করলাম, তোমার জীবনের লক্ষ্য কি? মেয়েটি জবাব দিল, উন্নত ইন্ডিয়ায় বাস করতে চাই। মেয়েটির জন্য, আপনার জন্য এবং আমার জন্যই উন্নত, ধনী ইন্ডিয়া বানাতে হবে।
তিনি দেশের মানুষের কাছে দশমিনিট সময় চেয়ে নিয়ে বলেন, আপনি বলছেন ইন্ডিয়া উন্নয়নশীল গরীব দেশ। আসুন দেখি এটি উন্নত দেশ কিনা। যদি মিনিট দশেক সময় আপনার থাকে তাহলে তো আমার সাথে থাকুন, আর না থাকলে আপনার ইচ্ছা।
আপনি বলছেন, আমাদের গভর্ণমেন্ট অদক্ষ।
আপনি বলছেন, আমাদের আইনগুলো সেকেলে।
আপনি বলছেন, আমাদের মিউনিসিপ্যালিটি ময়লা পরিষ্কার করেনা।
আপনি বলছেন, আমাদের ফোনগুলো কাজ করেনা, আর রেইলওয়ে তো হল মস্তবড় জোক। এয়ারলাইন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে জিনিস, ডাকবিভাগের চিঠি তো কখনো গন্তব্যেই পৌছেনা।
আপনি বলছেন, আমাদের দেশটাই হলো কুকুরদের খাবারের জন্য, চারিদিকে নোংরা যত সব আবর্জনা!
আরও আরও অনেক...............।
এবার তিনি জনতার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখেন, এবার দেখুন আপনি নিজে কি করছেন?
ধরুন, একজন লোক সিংগাপুরে যাচ্ছেন। লোকটির নাম দিন। আপনার নামটাই দিন। একটি চেহারাও দিন। সেটিও আপনার। আপনার সাধের দেশের বাইরের এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে আপনি এবার হাটছেন। আপনি সিংগাপুরে সিগারেটের বাট এখন রাস্তায় ফেলছেন না, স্টোরে কিছু খাচ্ছেনও না। আপনি তাদের পাতাল ট্রেন লাইন নিয়ে গর্ব করছেন। আপনি সিংগাপুরে কিন্তু বলছেন না ‘আপনি কে’। আপনার সাহস নাই রোযার মাসে দুবাইতে জনসম্মুখে দিনের বেলায় আহার করা। আপনি জেদ্দায় হেড স্কার্ফ ছাড়া বাইরে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না। লন্ডনে আপনার সাধ্য নাই টেলিফোন এক্সচেঞ্জের কোন কর্মচারীকে ৬৫০ রুপি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবেন যে, লোকাল ও আইএসডি বিলটি অন্য জনের নামে চালিয়ে দাও। আপনি সাহস পাবেন না ওয়াশিংটনের রাস্তায় ঘন্টায় ৫৫ মাইল বেগে গাড়ি চালাতে। আর যদি পুলিশ ধরেই ফেলে, বলতে পারবেন না , ‘জান্তা হেই মে কৌন হু (তুমি কি জানো আমি কে?)। আমি অমুক, অমুকের ছেলে।
আপনি অস্ট্রেলিয়া, নিউ জিল্যান্ডের বীচে গিয়ে নির্ধারিত জায়গার বাইরে ময়লা ফেলেন না। আপনি কেন টোকিওর রাস্তায় পানের পিচকি ফেলেন না? আপনি কেন বোস্টনে নিজের বদলে অন্যজনকে পরীক্ষার হলে পাঠান না বা ভূয়া সার্টিফিকেট কেনেন না? আমরা কিন্তু এখনো একজনকে নিয়েই কথা বলছি, ‘আপনি’। আপনি বিদেশী সিস্টেমকে সম্মান ও মেনে চলতে পারেন, নিজের দেশেরটা পারেন না। ইন্ডিয়ার মাটিতে পা পড়া মাত্রই আপনিই, হ্যা আপনিই, কাগজ,সিগারেট রাস্তায় ছুড়ে ফেলেন। আপনি বন্ধুদেশে গিয়ে যা করেন, যেভাবে সেদেশের নাগরিকদের এপ্রেশিয়েট করেন, ইন্ডিয়াতে তা করেন না। কেন?
এক ইন্টারভিউতে বোম্বের সাবেক নামকরা মিউনিসিপ্যাল কমিশনার মিঃ টিনাইকার বলেছিলেন, ধনী মানুষেরা রাস্তায় কুকুর নিয়ে হাটেন, আর কুকুরের বিষ্ঠা যত্রতত্র ছড়িয়ে এক নোংরা অবস্থার সৃষ্টি করেন। সেই একই মানুষেরা কর্তৃপক্ষকে দোষেন নোংরা রাস্তা সাফ না করার জন্য, সমালোচনা করেন সরকারের অদক্ষতার। অফিসারদের কাছে তারা কি আশা করবেন? একটা ঝাড়ু আর পটি নিয়ে কুকুরদের পিছনে ছুটবেন আর নজর রাখবেন তাদের কুকুরের কখন বাউল মুভমেন্ট হয়?
আমেরিকায় ডগ বা জীবজন্তুদের মালিকেরাই তাদের ময়লা সাফ করেন। জাপানেও তাই। ইন্ডিয়ার সিটিজিনরা কি এটা করবেন? আপনি ঠিকই বলছেন। আমরা নির্বাচনে ভোট দিয়ে পছন্দের সরকার নির্বাচিত করি এবং সব দায়িত্ব বেচারা সরকারকেই দিয়ে দেই। আমরা কোন অবদানে শরীক না হয়ে ইজি চেয়ারে বসে আরাম করে আশা করি সরকারই আমাদের জন্য সব করে দিবে। আমাদের গভর্ণমেন্ট সব আবর্জনা পরিস্কার করবে, কিন্তু আমরা যেখানে সেখানে কাগজের টুকরা, ময়লা ফেলানো বন্ধ করব না। আমরা রেইলওয়ের বাথরুমগুলো ক্লিন চাইবো, কিন্তু শিখতে চাইবো না কিভাবে তা ক্লিন রাখতে হয়। আমরা ইন্ডিয়া এয়ারলাইন্স ও এয়ার ইন্ডিয়াতে ভাল খাবার ও প্রসাধনীতে ভরপুর চাইব, কিন্তু ভ্রমনের ক্ষেত্রে পছন্দের তালিকায় ওই এয়ারলাইন্সগুলো থাকবে সবার নীচে। সমাজ দরূদী সেজে নারীর অধিকার, যৌতুক প্রথা বিলোপ, কন্যা সন্তান ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে উচচস্বরে কথা বলি। কিন্তু নিজ ঘরে তার উল্টোটা। আমাদের অজুহাত? বলি, পুরা সমাজ ব্যবস্থাই বদলাতে হবে, আমি একা আমার ছেলের জন্য যৌতুক না নিলে কি হবে? কিন্তু আপনি বলুন, কে এই সিস্টেমটাকে বদলাবে?
দেড় পাতা জুড়ে জনগুরুত্বসম্পূর্ণ আরো অনেক কথা তিনি লিখেছেন। বলেছেন, নিউইয়র্ক যখন আপনার জন্য অনিরাপদ, আপনি দৌড়ান ইংল্যান্ডের দিকে। ইংল্যান্ড যখন আপনাকে চাকরি দেয় না, আপনি দৌড়ান মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে যখন আপনি আটকা পড়েন, আপনি চান নিরাপত্তা, এবার আপনি চান ইন্ডিয়ান গভর্ণমেন্ট আপনাকে বাড়ীতে নিয়ে আসুক। বাইরে সবাই আমরা দেশটার মর্যাদাহানিতে লিপ্ত, কেউ এগিয়ে আসি না কিভাবে সিস্টেমটাকে রপ্ত করা যায়। আমাদের চেতনা শুধুমাত্র অর্থের নিকট বন্ধক।
ডঃ আব্দুল কালাম বক্তৃতা শেষ করেছেন আমেরিকার জনগনের প্রতি জন এফ. কেনেডির বিখ্যাত উক্তিটিকে ইন্ডিয়ানদের উপলক্ষ্য করে নিজের মত করে বলে। আমরা না হয় সেভাবেই আজকের এই আলোচনাটিও শেষ করব। তার আগে উপরুক্ত আলোচনার বাইরে অল্প আরো একটু নজর দিই আমরাই বা কেমন?
বুয়েটের তিন কৃতি সন্তানের বুড়িগঙ্গায় মর্মান্তিক মৃত্যুর ছবি পত্রিকার প্রথম পাতায় বড় করে লীড নিউজ করা হয়, কিন্তু তাদের কৃতিত্বের কথা ফলাও করে প্রচার করা হয়না। একবিংশ শতাব্দীতে হেলিকপ্টার দিয়ে ত্রাণ ছিটিয়ে সিডরের প্রলয়ংকরী আঘাতে বিপর্যস্ত বনি আদমের খাবার নিয়ে কবুতরের মত কাড়াকাড়ি, হুড়াহুড়ির দৃশ্য তৈরি করা হয়, তাদের ঘুরে দাড়ানোর জন্য প্রাণশক্তি সঞ্চারনে তেমন ভূমিকা রাখা হয়না। যে বাঘা মানুষগুলো আপনজনদের ছিন্নভিন্ন লাশগুলো গাছের উপর থকে নামিয়ে, ক্ষেতের ভিতর থেকে কুড়িয়ে এনে দাফন সেরে আবারো ছেড়া জাল নিয়ে মাছ ধরতে নতুন ভাগ্য গড়তে নদীতে নামেন, তাদের খবর আমরা ফলাও করে প্রচার করিনা। শতাব্দীর নামকরা তান্ডবে দশ হাজারেরও কম মানুষের প্রানহানীতে গোটা বিশ্ব যেখানে দূর্যোগ মোকাবেলায় অভিজ্ঞ বাংলাদেশকে ‘সাবাশ বাংলাদেশ’ বলে বাহ্‌বা দেয়, স্থানীয় প্রশাসন লোক সামলাতে হিমশিম খায়, আমরা সেখানে কোন কাজে অংশগ্রহন না করে শুধু সমালোচনাই করি।
ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল এক্সামিনেশন্সের (সিআইই) জুন ২০০৭-এর ‘ও’ লেভেল পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে তিন সাবজেক্টে বিশ্বের শীর্ষ স্থান অর্জনকারী বাংলাদেশের সেরা তিন সন্তান ইব্রাহীম মোহাম্মদ জুনাইদুর রহমান, নাবিল তারিক হোসেন এবং সাজ্জাদ খান মৌসুমকে নিয়ে গর্ব করেন সিআইইর ডিরেক্টর গাই লেন। যাযাদি ছাড়া ‘তিন কৃতী ছাত্রকে অভিনন্দন’ জানিয়ে এডিটোরিয়াল লিখতে আমাদের হাত কেউ যেন জাপটে ধরে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত আমেরিকান আরেক ছাত্র হলেন মোহাম্মদ রহমান। আমেরিকার টেক্সাস ইউনিভার্সিটি ও ইন্ডিয়ার টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালের একটি যৌথ আন্তর্জাতিক প্রজেক্টে বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিএইচডি করছেন। আবিস্কার করলেন অভাবনীয় প্যাটেন্ট, 'ওরাল ক্যান্সারের স্ক্রিনিং ডিভাইস' -এর উপর গবেষণা কাজে the portable screening system (PS2) নামক একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যা কম খরচের ও ব্যাটারি চালিত। এটি মুখের নরম্যাল ও প্রি-ক্যান্সার টিস্যুর মধ্যে পার্থক্য ধরার মাধ্যমে ক্যান্সার নির্ণয় করতে সক্ষম। তাকে নিয়ে ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস এম. ডি’র প্রফেসররা গর্ব করছেন। ইয়াবা সুন্দরী নিকিতা নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে লিড নিউজ হয়, অথচ মোহাম্মদ রহমানদের খবর খুব বেশী নিউজপেপারের শীর্ষে আসেনা। কৃতিত্বের, সফলতার এরকম হাজারো উদাহরন আমাদেরও আছে। আমরা শুধু ব্যস্ত আছি পচে ফুলে উঠা গবাদিপশুর সাথে হতভাগা মানুষের লাশের ভেসে যাওয়া চিত্র, আর রোগ-শোক ও সন্ত্রাস নিয়ে।
এবার আসুন উপরের ইমেইলটিতে আমরা কল্পনায় তিনটি কাজ করি। ডঃ আব্দুল কালামের নামে বসাই ডঃ ইয়াজ উদ্দিনের নাম, ইন্ডিয়ার জায়গায় বসাই বাংলাদেশ। আর ফেলো আমেরিকানদের প্রতি জন. এফ. কেনেডির মহামুল্যবান বাক্যটি যেভাবে ডঃ আব্দুল কালাম ইন্ডিয়ানদের উপলক্ষ্য করে বলেছিলেন, আমরাও কল্পনায় ডঃ ইয়াজ উদ্দিনের মুখ থেকে সেভাবে শুনিঃ
Ask what we can do for Bangladesh and do what has to be done to make Bangladesh what America and other western countries are today (বলুন তাই-ই যা আমরা বাংলাদেশের জন্য করতে পারি এবং করুনও তাই যা করা দরকার বাংলাদেশকে আজকের আমেরিকা ও পাশ্চাত্যের দেশগুলোর পর্যায়ে নিতে)।

* লেখাটি যায়যায়দিন ২০শে ডিসেম্বর, ২০০৭ এ ছেপেছে।

[কৌতুহলী পাঠকদের জন্য ইংরেজীতে পড়তে নিউ নেশনের এড্রসেটা দিলাম। লিংক দিতে গিয়ে এরর মেসেজ আসছে।
Click This Link
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28752817 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28752817 2007-12-20 09:03:32
জবাব
এ বিষয় নিয়ে আরো একটা লেখা লিখতে চাইনি। কারন মনে হয় না এ ধরনের ইসু নিয়ে সাধারণ মানুষের কোনো মাথা ব্যথা আছে। এতে করে দেশে বিতর্ক আরো বাড়াবে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকা দরকার। বিতর্ক হয় এমন ইসু এভোয়েড করাই ভালো। বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়েই মানুষ ভাবতে আগ্রহী। তবুও সম্মানিত পাঠকদের ইমেইলে আদেশ নির্দেশ উপেক্ষা করতে পারলাম না। তাছাড়া ব্লগেও তুষারের পোষ্টটিকে একজন কাট পেষ্ট করেছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও যাযাদি’র এই পাঠকও ব্যক্তিগত কৈফিয়তের দুই কলম উত্তর লিখত বসল। প্রতিটি বাক্যের দিকে গিয়ে পাঠকদের বিরুক্তি না বাড়িয়ে যেখানে জবাব না দিলেই নয় সেখানেই আমরা আলোচনাকে বৃত্তাবদ্ধ করে রাখব।
তুষার সাহেবের প্রাক্তন কলেজ ও আমার প্রাক্তন ইউনিভার্সিটির ব্যবধান ছিল একটি মাত্র অনুচচ দেয়াল। রাতে ইলেক্ট্রেসিটির অফ আওয়ারে বুয়েটের নজরুল ইসলাম হল ও উনাদের ডিএমসি’র ফজলে রাব্বী হলের মধ্যকার তুমুল মিষ্টি বাকযুদ্ধ এখনো মনে করে বন্ধুবান্ধব মিলে আনন্দ করি। তখন থেকে আজ পর্যন্ত (তাও তো প্রায় দশ বছর পার হতে চলল) তার বিতর্ক ও উপস্থাপনা উপভোগ করে আসছি। একজন নামকরা বিতার্কিকের কাছে যুক্তিভিত্তিক ও সুন্দর ভাষায় আলোচনা বা প্রতিক্রিয়া অথবা উভয়টিই আশা করা অবশ্যই দোষের নয়। এ ধরনের আলোচনায় দু’পক্ষ তো থাকবেই। কোন এক পক্ষকে আগেভাগেই অযোগ্য, চতুর, বর্বর, মূর্খশিরোমনি মূর্খাচার্য অপশব্দ প্রয়োগে পটুর মত বলে দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুললে তো আলোচনা সেখানেই থমকে যায়।
তিনি বলেছেন, পুরো লেখাতে আমি মুহিনের বিষয়টিকে আবেগের মসলা হিসেবে নিয়ে এসেছি। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে অজস্র মানুষের মত জনাব তুষার সাহেবও হয়তো কোনো আপনজনকে হারিয়েও থাকতে পারেন। তার ভাষায় কোন বুড়ো খোকাকে জিজ্ঞেস না করে মন্তব্যও করতে চাই না যে, কথাগুলো তার ফুসফুস ও ধমনীর গভীরতা থেকে উতসরিত নয়। আমি শুধু বলতে চাই, আমি আমার নানাকে হারিয়েছে, যার স্নেহ থেকে আজন্ম বঞ্চিত হয়েছি। দেখেছি নানী, মা-মামা-খালাদের কষ্ট, দুঃখ, যাতনা! আর আমাদের গ্রামে এমন কোন পরিবারও নেই যারা কোন না কোনভাবে মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তাদের কষ্ট কিছুটা হলেও কাছে থেকে শুনেছি, বুঝেছি। নিজের নানা যার বাড়িতেই আমার জন্ম এবং যিনি কিনা আমার নামটি রেখেই যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছেন তার জান কুরবানীকে আমি আবেগের মসলা হিসেবে ব্যবহার করব, এমন হতভাগার জন্ম বোধ হয় বাংলাদেশে একটিও হয়নি! হাজার হাজার শহীদ পরিবারের আবেগকে পুঁজি করে যারা সস্তা ব্যবসা করে ফায়দা লুটছে তাদের দ্বারা জনগনকে প্রতারিত হওয়াকেই আমি বুঝাতে চেয়েছি। দেশপ্রেম যাদের দুই ঠোটের মাঝখান থেকে নেমে গলা বেয়ে হৃদয়ে প্রবেশ করেনা তাদের কপটতাকেই আমি কটাক্ষ করেছি। আপনাকে এদের বাইরেই দেখতে চেয়েছিলাম!
উইকিপিডিয়াকে আমি বাইবেল হিসেবে ধরিনি, আর তা ধরার প্রয়োজনও আমার পড়েনি। চলুন না বাইবেলকে বাইবেলের অবস্থানেই রেখে দেই! অন্য আরো অনেক রেফারেন্সের মত উইকিপিডিয়াকেও জাস্ট এ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছি। এর বাইরে নয়। আমি আপনাকে আপনার ভাষায় জিজ্ঞেসও করতে চাই না বাজারের বই (এটি কিন্তু আপনিই বলেছেন) ‘একাত্তরের ঘাতক দালালেরা কে কোথায়’ অথবা কুখ্যাত রাও ফরমান আলীদের ডায়েরীকে আপনি বাইবেল হিসেবে ধরছেন কিনা। যে বইটির খোদ এডিটর নিজেই কি না রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় বর্তমানে জামিনে আছেন! বইটি প্রকাশের বোধ হয় দুই দশক পার হতে চলল। কেঁচো খুড়তে যদি সাপ বের হয়ে যায় সেই ভয়েই কি ওই এডিটর সাহেবের প্রিয় নেত্রী ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তিনিও উচচবাচ্য করেননি? এত ভুল কেন? সব শোধরাতে চান এই স্বল্পকালীন সময়ে, যা ৩৬ বছরেও সম্ভব হয়নি? নির্বাচনের পরে কাউকে তো দেখি না এ নিয়ে কোন কথা বলতে? হানাদার পাকিস্তানীদের ডায়েরীর রেফারেন্স দেন কেন, দেশীয় ইতিহাসবেত্তা বুদ্ধিজীবিদের রেফারেন্স কেন নজরে আসেনা? রাজনৈতিক গন্ডির বাইরে এসে পূর্ব প্রতিষ্ঠিত বদ্ধমূল ধারনার বিপরীতে উদারভাবে একটু রেশনাল চিন্তা করলে সমস্যা কোথায়?
আমি বলেছি সুখী, সমৃদ্ধ, দূর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে বিভেদ ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে, বলতে চেয়েছি এই সরকারের উপর আর বোঝা না বাড়াতে। আর আপনি চেয়েছেন পেছনে ফিরে যেতে, এখনই সব ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে। চীফ এডভাইজারের মত আমিও বলব, সংক্ষুব্ধ যে কেউ চাইলে আদালতে যেতে পারেন। নিজেরা তালিকা প্রস্তুত না করে নিয়মাতান্ত্রিকভাবে চলুন মহামান্য আদালতকেই এই দায়িত্বটা দিই। টিভির সামনে সূফী সূফী ভাব নিয়ে কিংবা রাস্তা-ঘাঠে বাগাড়াম্বর করে বাজার গরম করার মানে কি? আমার সাত বছর আমেরিকা ও কানাডায় থাকাকালীন সময়ে রাজাকারদের গাড়ীতে পতাকা উড়তে দেখেছেন। তার আগে কি রাজাকার প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, বিচারপতি ও ক্যাবিনেট মন্ত্রী, এমপিদের গাড়িতে পতাকা উড়তে দেখেন নি? দেখেননি তাদের সাথেই আত্বীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নিজেদের সম্পর্ককে অটুট রেখে জনগনকে নিয়ে মাঠে খেলতে? আপনি চাতুরতার আশ্রয় নিয়ে না জানার ভান করেছেন কিনা জানিনা, সাধারন মানুষেরা কিন্তু এর উত্তর নিশ্চয়ই জানে। এই সরকারের সফলতা আমি কিন্তু মনে প্রাণে চাই। কাউকে হাসানোর জন্য কিন্তু আর্টিকেলটি আমি লিখিনি। অবশ্য লেখাটা পড়ে মনে হয়না আপনি হেসেছেন, বরং ক্রুদ্ধ রাগান্বিত হয়ে মনের ঝাল মিটিয়েছেন। কেয়ারটেকার সরকারের সম্মানজনক এক্সিটের মাধ্যমে গনতন্ত্রকে ফিরে পেতে চাই, কোন কিছুকে ‘অল ওভার স্টার্ট এগেইন’ করে সময় ক্ষেপন করতে চাইনি। সাথে কেবলই প্রাণ পাওয়া ডেমোক্রেসির পথটিও যেকোন প্রকারে বাধাগ্রস্থ হোক তাও চাইনি।
আমি গনতন্ত্রে বিশ্বাস করি কি না তা নিয়ে তুষার সাহেবের বিস্তর সন্দেহ। আবার সাথে সাথে এও বলেছেন, ধর্মীয় রাজনীতি বন্ধ করতে সরকারের সিদ্ধান্ত হলে তা হবে রাষ্ট্রের গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। কথাটা কেমন স্ববিরোধী হয়ে গেল না? এটিকেই আমি বলতে চেয়েছি টেষ্টটিউব গনতন্ত্র অথবা আপনি নাম দিতে পারেন হাতুড়ি কাস্তে মার্কা বলশেভিক গনতন্ত্র। রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে গায়ের জোরে দাবিয়ে দেয়ার নামে নতুন এক গনতন্ত্র। তাও আবার কেয়ারটেকার সরকারের সময়! বাংলাদেশী যে কাউকেই সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে জাতিয়তা, ধর্মীয়, ধর্মনিরপেক্ষ ইত্যাদি নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ দিন, নাগরিক অধিকার চর্চা করতে দিন, জনগনের মতামতকে শ্রদ্ধা করুন, ইট্‌স এ বিউটি অফ ডেমোক্রেসি। আর এটির নামই হল বহুদলীয় গনতন্ত্র। বলতে দ্বিধা নাই যে, যেটি কিনা আমাদের দেশে উন্মুক্তই করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। গনতন্ত্রকে এভাবে দড়ি দিয়ে বেধে না ফেলে বাড়তে দিন, কচি থেকে পুষ্ট হতে দিন। কাউকে যদি নিষিদ্ধ করতেই হয় পরবর্তী পার্লামেন্ট পর্যন্ত নির্বাচিত সদস্যদের জন্য আর কয়টা মাস অপেক্ষা করতে আপত্তি কোথায়? গনতন্ত্র মানি কিন্তু নির্বাচিত সদস্যদের রায় মানতে চাই না -এটি কেমন যেন প্রবাদবাক্যের মত হয়ে গেল না? বিচার চাইব না কেন? আমি কি বলিনি, ‘যারা খুন, হত্যা, নারী নির্যাতন, বাড়ী-ঘর পোড়ানো থেকে শুরু করে হাজারো অপরাধের সাথে জড়িত তাদের বিচার কে না চায়?’ কিন্তু কথা হলো, বিচার চাওয়ার আগেই কি অভিযুক্ত করে ফাঁসি চাওয়া হচ্ছে না? সবাই মিলে সংবিধানটাকে মানার প্র্যাকটিস করলে তো সমস্যা হওয়ার কথা না।
আমি আর্টিকেলের কোথাও বলেনি যে, বাংলাদেশে ধর্মহীন রাজনীতি প্রচলিত আছে। বাক্যটি ছিল এরকম ‘জাতির কপাল ভালো যে, মাওলানা সাহেবরা পাল্টাপাল্টিভাবে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের কথা বলে এদেশে ধর্মহীন রাজনীতি নিষিদ্ধের জোরালো দাবী এখন পর্যন্ত উঠাননি’। আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে, আমাদের দেশে কারা ধর্মীয় রাজনীতি করে আর কারা ধর্মহীন রাজনীতি করে, আর কারাইবা নির্বাচনের আগে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করে? এত খোলাসা করে বলে একে অপরের প্রতিপক্ষ বানিয়ে জনগনকে উত্তেজিত করার দরকার কি? আপনি পান কি না জানিনা, আমি কিন্তু ২১ আগষ্ট, ২৮ অক্টোবরকে ভীষণ ভয় পাই।
কানাডা, আমেরিকা ও ইউরোপে ধর্মভিত্তিক দল এমনকি ক্রিশ্চিয়ান দল, মুসলিম দল, হিন্দু দল নামে কোন দল আছে কিনা, রাজনীতিতে নির্বাচনের আগে ধর্মের ব্যবহার কেমন হয়, ইলেকশনের আগে ক্যান্ডিডেটরা নিজেদেরকে জনগনের মাঝে কে কত বড় প্র্যাকটিসিং ক্রীশ্চিয়ান প্রমান করার জন্য ব্যস্ত হন অথবা চার্চ থেকে মিছিল বের হয় কিনা তা জানার জন্য আরো একটু পড়াশোনা করার জন্য অনুরোধ করছি। দেখবেন কারা নিজেদেরকে ঈশ্বরের প্রতিভূ ও অনর্গল গড ব্লেশ ইউ, গড ব্লেশ ইউ বলে মিডল ইস্টের ছেড়া মানচিত্রের দিকে রাক্ষসের মত কটমটিয়ে চায়? আর সাউথ এশিয়ার ফাপা মানচিত্রটাকে ফুটো করার প্রক্রিয়া প্রায় চুড়ান্তের দিকে কারাইবা ‘শান্তি’ ‘শান্তি’ বলে নিয়ে যাচ্ছে?
এই তো কিছুদিন আগেই সমকামী আইনের প্রতিবাদে কানাডার ক্রিশ্চিয়ান, জুইশ, মুসলিম, হিন্দু ও শিখদের আমব্রেলা সংগঠন ইউনাইটেড রিলেজন্‌স ফ্রন্ট চার্চ, সিনেগগ, মসজিদ, মন্দির ও গুরুদুয়ারা থেকে আন্দোলন পরিচালিত করল। তবে হ্যা, ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে এসব দেশে গ্রেনেড মারা হয় না, লগি বৈঠা দিয়ে জনগনকে প্ররোচিত করে সাপের মত পিটিয়ে গর্ব করা হয়না, প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্র উঁচিয়ে মানুষ হত্যা করাও হয় না। এসব দেশে ধর্মভিত্তিক দল নেই বলেছেন। আপনি কি জানেন না আমেরিকা, কানাডা, বৃটেনে বর্তমানে কোন দল ক্ষমতায়? কনজারভেটিব, রিপাব্লিকান পার্টি বলতে কাদের বুঝানো হয়? ইন্টারনেটে এই পার্টি সমূহের সংবিধানগুলো একটু পড়ে দেখেন না এরা কারা? ইউরোপের সভ্যতার সূতিকাগার বলে ক্ষ্যাত জার্মানীতে কি ক্রিশ্চিয়ান সোস্যালিষ্ট ইউনিয়ন (CSU) ও ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (CDU)-র জোট ক্ষমতায় নয় যারা কিনা দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দলে ছিল? ফ্রান্সে এবার কারা এল? নেদারল্যান্ডের এই কিছুদিন আগের ইলেকশনে কারা জিতল? মুক্ত চিন্তার আরেকটি দেশ টার্কিতে জনগন কাদের বিজয়ী করল? ইজিপ্ট, মালয়েশিয়া ও বিশ্বের সর্ববৃহত গনতান্ত্রিক দেশ কাছের ইন্ডিয়ার প্রধান বিরোধী দলটির নাম কি? তাই বলছি আগে ঠিক করুন কি চান? যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না কি ধর্মভিত্তিক দলসমূহের নিষিদ্ধ? সব কিছু এক করে তালগোল পাকিয়ে ফেলা কি জনগনকে প্রতারিত করা নয়?
আপনার নিশ্চয়ই অজানা নয় যে, এসব দেশেও পলিটিশিয়ানরা হত্যাকান্ডের শিকার হন। আজ পর্যন্ত যাকে একমাত্র প্র্যাকটিসিং রোমান ক্যাথলিক প্রেসিডেন্ট বলে গন্য করা হয়, আমেরিকার সেই ৩৫তম প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। লি হারভী অযওয়াল্ড (Lee Harvey Oswald) যাকে হত্যাকারী হিসেবে সনাক্ত করা হয় তাকেও ঠিক জিয়ার হত্যাকারীর কায়দায় জ্যাক রুবি (Jack Ruby) খুন করে পুরো বিষয়টিকে আজ পর্যন্ত আমেরিকার ইতিহাসে রহস্যাবৃত ও ডজন ডজন কন্সপিরেসি থিওরীর জন্ম দিয়ে চলেছে।
সুপার ডুপার ইনফরমেশন হাইওয়ের যুগে একজন তাত্ত্বিকের এমন অজ্ঞতাকে বিশ্বাস করতে চাইনা। জেনে না জানার ভান করে বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে পাঠককে প্রতারিত না করলে খুশী হব। বেশী দূর যেতে হবে না, হাতের কাছে ইন্টারনেটে গুগলে আপনার কোয়্যারি টাইপ করে সার্চ দিলেই অনেক কিছু পেয়ে যেতেন। আপনার ভাষার মত করে ‘বিকৃত বর্বর মর্ষকামী ভাবনার ফসল’ বা ‘মূর্খশিরোমনি মূর্খাচার্য’ বলে গালি দিয়ে আপনার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আমি অপমান করতে চাই না। শুধু বলতে চাই একজন স্বাধীনতা পরবর্তী আশাবাদী প্রজন্মের মনে আসা প্রশ্নগুলোর উত্তর সুগভীর চিন্তা ভাবনার ফসল দিয়ে ও শিক্ষিতশিরোমনি শিক্ষাচার্য হয়ে আর্টিকেল লিখলেই পারতেন। এসব অশ্লীল শব্দচয়নের প্রয়োজন ছিল না। লেখার পিঠে লেখা বা কারো পেছনে লাগা কঠিন কিছু নয়, যে কেউই তা পারে। এতে সস্তা বাহ্‌বাও মেলে। এই আমি যে এই লেখাটা লিখছি তার বিপরীতে আরো একটা লেখা একজন হাইস্কুল পাশ শিক্ষার্থীও কিন্তু লিখে ফেলতে পারে। আমার যোগ্যতা ও সদিচ্ছা না থাকলেও আপনার কিন্তু আছে নতুন নতুন আইডিয়া বের করে নিজের ক্রিয়েটিভিটির স্বাক্ষর রাখতে। তাই করলে পাঠকেরা উপকৃত হত। দুঃখ হলো যুক্তি যেখানে হারিয়ে যায়, অসভ্যতা সেখানে দৌড়ে এসে বাসা বেধে নেয়। দুর্ভাগ্য, আজ অন্য এক তুষারের সাথে পরিচয় হল!
‘ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে কাঊকে ব্যবহৃত করতে না পারলেই বারে বারে বোকা জনগনকে স্যান্ডউইচ বানানো হয়’ আর এরের পরের বাক্যটি ছিল এরূপ, ‘যাদের দিকে চোখ রাঙিয়ে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলা হচ্ছে তারা জোট পরিবর্তন করলেই এসব কপট দাবীর অসারতার প্রমান আবারো মিলত’-কথাগুলোকে কি আমি বাড়িয়ে বলেছি? ভুলে গেছেন যাদেরকে গালি দিয়ে এখন মুখে ফেনা উঠানো হচ্ছে সেই ফতোয়াধারীদের সাথে এই কয়দিন আগেই সেই চুক্তিটির কথা? ‘বোকা’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে এনাটমি করেছেন। যারে দেখতে নারি তার চলন বাকা! কথার মারপ্যাচ না দিয়ে সহজভাবে মনের ভাষায় এটিকে নিলেই পারতেন। যেকোন লেখায় প্রতিটি শব্দের আকাবাকা ব্যবচ্ছেদ করে যেকোন লেখকের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করা যায়। মুল থিম ঠিক করে নিয়ে আর্টিকেলটি লিখলে খুশী হতাম। আলোচনায় সঠিকভাবে ভাব প্রকাশে যুতসই শব্দ ব্যবহার না করাকে আমার দীনতা হিসেবে নিতে পারতেন। পাঠকেরা বোধ হয় সেভাবে নেননি। নিলে এত এপ্রিসিয়েশন মেইল পেতাম না। জনগন বোকা নয়, বলব বোকা বানানো হয়। নিজেকে তো তাদের অংশই মনে করি। কারন তাদের মধ্যে থেকে গ্রামেই বড় হয়েছি। আমাদের সরলতা, অশিক্ষা ও কমশিক্ষার সুযোগ নিয়ে সুবিধাবাদী ও দূর্ণীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত পলিটিশিয়ানরা কি আমাদেরকে বার বার প্রতারিত করছেন না?
আমি কানাডায় বসে জোতিষ চর্চা করিনা। কারন, জোতিষবিদ্যা রপ্ত করে টিয়া পাখির মত করে ভাগ্য গননা করা বিদ্যা অর্জনের সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমার নিজের ফিল্ড নিয়েই আমি চর্চা করি। অনেকেরই স্বপ্নের দেশ থেকে হায়্যার স্টাডি করে শত শত বন্ধু-সহপাঠীদের মত আমিও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিকভাবে নিজের যোগ্যতা প্রমানের কিনচিত চেষ্টা করি। এগুলো ভদ্রলোকদের কাছে কোন আহামরি নিউজও নয়, বলে বেড়ানোও ঠিক নয়। এগুলো তাদের জন্যই বলছি যারা না জেনে কারো অযোগ্যতার সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়। সাথে প্রিয় মাতৃভূমিটাকে আপনার মত প্রচন্ড ভালবাসি বলেই দেশ ও গ্লোবাল পলিটিক্স নিয়ে একটু ভাবি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘঠনাবলীকে এর বাইরে ভাবার অবকাশও আছে বলে মনে করিনা। একমাত্র পরাশক্তির নিয়ন্ত্রনে গ্লোবাল পলিটিক্সের বর্তমান ধারা যে কত ভয়ংকর তা জানতে আগ্রহী হই এবং উপলব্ধি করে শিঊরে উঠি। থিংকট্যাঙ্কগুলোর ওয়েবসাইটগুলোতে একটু ব্রাউজ করলে আপনিও তা পেয়ে যাবেন। আর তাই একটু আধটু হলেও লিখে মানুষকে জানানোর চেষ্টা করি। যায়যায়দিনের আর্কাইভ (Oct 29 ও 27, Sept 20, Aug 19, Jul 15, Jun 18)-এ আমার আগের লেখাগুলো পড়ে নিতে পারেন। এগুলো যদি অপরাধ কিংবা জোতিষচর্চা হয় তাহলে কি আর করা? বলতে পারেন, তাই ই করি!
বিদেশে থাকা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন, পরদেশে পরজীবি, সুবিধাবাদী ইত্যাদি বলেছেন! দেশপ্রেমের ফ্যাক্টরগুলোকে কনস্ট্যান্ট ধরে পারিপার্শ্বিক ভ্যারিয়েবলসমূহ কন্সিডার করে সত্যিকারের প্যারাসাইট নিয়ে রিসার্চ করুন। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28748781 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28748781 2007-12-01 18:01:22
মুহিনের গান, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং প্রতারিত জনগন
স্বাধীকারের আবেগমাখা আন্দোলন বিধ্বস্ত ও ক্লান্ত জাতিকে নতুন দ্যোতনায় ও নতুন ব্যঞ্জনায় উজ্জীবিত করে দেশকে সামনে এগিয়ে চলার পথ দেখায়। আত্মহনন ও জিঘাংসার বদলে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার প্রেরণা যোগায়, মেরুদন্ডকে সোজা করে শির উঁচু করতে শিখায়। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষিত কি বলে? হোমোযেনিয়াস (Homogenous) একটা জাতির মধ্যে যে এত বিভক্তি তা জাতি বিশারদরাও বোধ হয় কখনো দেখেননি।

যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধাপরাধী

ছোট বেলা থেকেই ঘুরে ফিরে একদল পরিচিত মানুষের মুখে অহরহ শুনে আসছি দুটি শব্দ-যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধাপরাধী। ‘জরুরী অধ্যাদেশ ২০০৭’ -এর সময় উক্ত যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার অরাজনৈতিক (?) ও জরুরী আব্দারে ইস্যুটি নতুন করে আবার আন্দোলিত হচ্ছে। বিভিন্নভাবে তালিকা তৈরি হচ্ছে। কারো তালিকায় তো প্রফেসর গোলাম আযম থেকে শুরু করে সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনার বেয়াইয়ের নামে এসে ঠেকেছে। যারা খুন, হত্যা, নারী নির্যাতন, বাড়ী-ঘর পোড়ানো থেকে শুরু করে হাজারো অপরাধের সাথে জড়িত তাদের বিচার কে না চায়? কিন্তু তারা কারা আর কেন এবং কিভাবেইবা তাদের বিচারের পথ রুদ্ধ হয়ে গেল?
যুদ্ধাপরাধ কি এ ব্যাপারে এনসাইক্লোপেডিয়া লিখেছে, যে কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমূহ (তা সামরিক হোক বা বেসামরিক) কতৃক যুদ্ধ আইন বা যুদ্ধের নীতিমালা ভংগই হল যুদ্ধ অপরাধ। আন্তর্জাতিক আইনে এটি চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আন্তঃরাষ্ট্রীয় দ্বন্ধে যুদ্ধ আইনের প্রতিটি ভায়োলেশনই হলো দন্ডযোগ্য ক্রাইম। তবে আভ্যন্তরীণ বিরোধসমূহ স্থানীয় আইন দ্বারা বিচার করা যেতে পারে। সংক্ষেপে, যুদ্ধের নীতিমালা হল যুদ্ধ সংক্রান্ত ঐ সমস্ত আন্তর্জাতিক আইন যা জেনেভা কনভেনশন সমুহের মাধ্যমে বিশ্বের জাতিসমূহ গ্রহন করতে সম্মত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হল যুদ্ধবন্দী হত্যা, বেসামরিক জনগন হত্যা, ধর্ষণ, আত্মসমর্পনকারী শত্রু সৈন্য হত্যা, জেনোসাইড বা গণহত্যা, ইত্যাদি।

যুদ্ধাপরাধী হল তারাই যারা (হোক না তারা পাক বাহিনী, রাজাকার, রক্ষী বা লাল বাহিনী) যুদ্ধের উক্ত নীতিমালাসমূহ ভংগ করে মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডে নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেলে। উইকিপিডিয়া ১৯০৭ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত সব যুদ্ধের সর্বমোট ৩১০ জনের নামের তালিকা দিয়েছে। তন্ন তন্ন করে খোঁজ করেও বাংলাদেশী কোন অভিযুক্তের নাম পেলাম না। ১৯৭১ এ অভিযুক্তদের স্থানে ‘পাকিস্তানী আর্মি এবং এর সহযোগী’ লেখা রয়েছে। ন্যাশনালিটি ধরে এগিয়ে ভূতপূর্ব অটোমান সরকারের বাম ৩ জন মন্ত্রী আহমেদ জিমেল পাশা, আনোয়ার পাশা ও তালাত পাশার নাম পেলাম। বাংলাদেশের কারো নাম প্রস্তুত করতে বোধ হয় আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। সম্ভবত এটি উম্মুক্ত করে রাখা হয়েছে সংবিধানের বিভিন্ন দূর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা উদ্ধারের জন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে মীমাংসা করার মত। তথাকথিত সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায় কিংবা গোল টেবিল আলোচনার মাধ্যমে এটি প্রণয়ন করা হবে। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সময়ের সাথে সাথে রাষ্ট্রের শান্তি, শৃংখলা, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার কথা বলে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা অসম্ভব বিপরীত মতাদর্শের ব্যক্তিদের নিয়ে এ তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে পারে। সাবেক সেনাপ্রধান ও মেজর জেনারেলরাও এক্ষেত্রে হয়তোবা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবেন।

সিমলা চুক্তি ও প্যাকেজ ডিল

শ্যামলী দেবীর নামানুসারে ভারতের হিমাচল প্রদেশের মাঝারী সাইজের পর্যটন শহরটি হল সিমলা। এনসাইক্লোপেডিয়া বাংলাদেশ ও এনসাইক্লোপেডিয়া পাকিস্তান ঘেটেঘুটে যা পেলাম তার সার কথা হল, পাক-ভারত সম্পর্ককে সহনীয় ও বন্ধুত্বপূর্ন পর্যায়ে ফেরত নিয়ে আসার জন্য এখানেই বহুল আলোচিত কনফারেন্সটি শুরু হয় ১৯৭২ সালের ২৮শে জুন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভূট্টো চুক্তিতে সই করেন। মেজর জলিলের মত সেই একই দীর্ঘশ্বাস বাংলাদেশকে আবারো অপমান অবহেলা। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত সদ্য স্বাধীন দেশের প্রতিনিধি কারো স্বাক্ষরের প্রয়োজন পড়ল না। একই বছরের ২৮শে জুলাই চুক্তিটি বৈধতা পেল। আর এটি আইনে পরিনত হল আগষ্টের ৪ তারিখে। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত ৯৩ হাজার পাকিস্তানী আর্মিকে চুক্তিতে অনুল্লেখ্য বাংলাপিডিয়ার আশা ইসলামের ভাষায় প্যাকেজ ডিলের আওতায় স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়। প্যাকেজ ডিলটি যে কি বস্তু তা জাতি কোনদিনও জানতে পারবে না এবং এটি নিয়ে কেঊ কোন উচচবাচ্যও করবে না। মুজিব সরকার এক লক্ষ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করলেও দালাল আইনে অভিযোগ আনা হয় ৩৭ হাজার ৪শত ৭১জনের বিরুদ্ধে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের অভাবে তেমন কাউকে শাস্তি দিতে পারেননি তত্‌কালীন আদালত। আর সুস্পষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত বাকী ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর জন্য নয়াদিল্লীতে আরেকটি বোঝাপড়া চুক্তি (মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং) করা হয় পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের মাস দেড়েক পর ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে। ত্রিদেশীয় তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়গণ ডঃ কামাল হোসেন, সোয়ারান সিং ও আজিজ আহমেদ স্বাক্ষর করে আসল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টিকেও চিরতরে মিটিয়ে দেন।
নিউইয়র্ক থেকে সাপ্তাহিক বাংলাদেশের সম্পাদক ডাঃ ওয়াজদ এ. খান ইত্তেফাকে ১৪ই নভেম্বরে লিখেছেন, “বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের প্রথম হাইকমিশনার জে এন দীড়্গিত তার “লিবারেশন এন্ড বিয়ন্ড” গ্রন্থে লিখেছেন, শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের জুন মাসেই ভারতের তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পিএন হাকসারের সাথে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতি অনাগ্রহ প্রকাশ করেন এবং পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ইচ্ছে ব্যক্ত করেন। ’৭২ সালে সিমলা শান্তি চুক্তির পূর্বে ভারত পাকিস্তানকে এই মর্মে আশ্বস্ত করে যে, বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে না। ইন্দিরা গান্ধী এবং তার সিনিয়র উপদেষ্টা ডিপি ধর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে প্রথমদিকে নমনীয় থাকলেও ভারতীয় পেশাদার সেনাবাহিনী কোনভাবেই রাজী ছিলো না পাকিস্তানী পেশাদার সেনা অফিসারদের বিচার হোক। ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি এভাবেই নিষ্পত্তি হয়ে যায়। যার জন্য পরবর্তীতে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি করেননি শেখ মুজিব সরকার।“
ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, ইনডিয়াকে সাথে করে বাংলাদেশের সমস্যা নিয়ে পাকিস্তানের সাথে চুক্তি করতে গিয়ে খোদ বাংলাদেশের প্রসংগটিই ব্যাপকভাবে বারে বারে উপেক্ষিত হয়েছে! পাক-ভারতের মধ্যকার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সব রকমের দ্বন্দ্বের অবসান এবং সর্বোপরি কাশ্মিরকে ভারতের প্রদেয় বিশেষ মর্যাদায় পাকিস্তানকে সন্তুষ্ট থাকার মত ইস্যুগুলোকে সামনে এনে মূলত বাংলাদেশকেই বঞ্চিত করা হয়েছে। পাক-ভারতের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ঠিকই শেষের পর্যায়ে, কিন্তু নির্মম সত্য কথা হল আমরা আমাদের থেকেই বেরুতে পারিনি।
ইস্যুটিকে নিজেরাই পাকাপোক্তভাবে মিটিয়ে দিয়ে প্রতিবারই শুধুমাত্র নির্বাচনের আগে (নির্বাচনের পরে কিন্তু নয়) যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলে গণতান্ত্রিক দেশে অগণতান্ত্রিকভাবে ধর্মীয় রাজনীতি অন্য কথায় শুধুমাত্র ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করার (যা কোন গণতান্ত্রিক দেশ এমন কি পাশের দেশেও নেই) যে দাবী তোলা হয় তার কারন কি? আমাদের কি জন্মই হয়েছে শুধু ২৮শে অক্টোবর আর ২১ শে আগষ্টের দিকে বারে বারে ফিরে যাওয়ার? জাতির কপাল ভালো যে, মাওলানা সাহেবরা পাল্টাপাল্টিভাবে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের কথা বলে এদেশে ধর্মহীন রাজনীতি নিষিদ্ধের জোরালো দাবী এখন পর্যন্ত উঠাননি। যুক্তির খাতিরে যদি ধরেই নেই, সব ইসলামী সংগঠনকে এবার নিষিদ্ধ করা হল। তারপর কি হবে? কে কার বিচার করবে? স্পেশাল ট্রাইবুনাল গঠন করা হবে? সব নেতাদের ধরে ধরে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে? আর তাদের লক্ষ লক্ষ অনুসারীরা এসব দৃশ্য চেয়ে চেয়ে দেখবে? না জানি তাদেরকেও তুলে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেয়া হবে? না জেলে ভরা হবে অথবা ঝেটিয়ে দেশছাড়া করা হবে? কোনো সত্যিকারের দেশপ্রেমিকরা এসব চিন্তা করতে পারেন? জনগনের উল্লেখযোগ্য একটি অংশকে জোর করে জঙ্গীবাদের দিকে ঠেলে দিয়ে জনগনের সাথে একেবারেই সম্পর্কহীন এসব মিডিয়া-বাঘ ব্যক্তিত্বরা সমগোত্রীয় একটা সহনশীল জাতির মধ্যে ঘৃণা ছড়িয়ে প্রকারান্তরে কার স্বার্থ্য চরিতার্থ করতে চান? যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কি আমরা এতই অন্ধ, বধির হয়ে যেতে পারি? সুবিধাবাদী পলিটিশিয়ানদের নিকট এ এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন যার কোনোই উত্তর নেই!

প্রতারিত জনগণ ও গনতন্ত্রের নতুন ডেফিনেশন

আসল কথা হল, ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে কাঊকে ব্যবহৃত করতে না পারলেই বারে বারে বোকা জনগনকে স্যান্ডউইচ বানানো হয়। যাদের দিকে চোখ রাঙিয়ে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলা হচ্ছে তারা জোট পরিবর্তন করলেই এসব কপট দাবীর অসারতার প্রমান আবারো মিলত। স্বাধীনতার সুফল তিন যুগ পরেও জনগনের দোরগোড়ায় আমরা পৌঁছে দিতে পারিনি বলেই আজো গ্রামের মানুষেরা ৭১ সালকে ‘গন্ডগোলের বছর’ বলে অভিহিত করে। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে আপামর জনতার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য কি আমাদের পূর্বসূরীদের কি কোন দায়ভারই নেই?
যেদেশে ভোজ্য তেল, চালসহ অতি প্রয়োজনীয় আহার্যপন্যের দাম এক বছরের মাথায় বেড়ে দ্বিগুন তিনগুন হয়, হালুয়া রুটিও আজ যেদেশে প্রশস্ত দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ, পূর্ণিমা চাঁদকে যেদেশে ঝলসানো রুটি বলে মনে হয়, সেদেশে বারে বারে একই ‘৭১-র ডোজ দিয়ে দোষারোপের খেলা কি বেঁচে থাকার তাগিদে নিরন্তর সংগ্রামে ব্যস্ত মুটেমুজুরদের নিকট বিলাসীতা নয়? আস্বাভাবিক মুল্যবৃদ্ধিকে এখন মিডিয়া সিন্ডিকেট বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারকে দোষছেন আমাদের দেশের প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও বিজ্ঞ ব্যবসায়ী সম্প্রদায়েরা। কারন মাফিয়াকে দোষলে তো আবার জানের পরীক্ষা দিতে হয়। অর্থনীতির ডিমান্ড সাপ্লাইয়ের জটিল তত্ত্ব কিংবা ভোক্তাদের নিয়ে আর্থ-ব্যাংগাত্বক লুকোচুরি খেলা বুঝি না , সাদামাটা ভাবে শুধু আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের ব্যপ্তি নিয়ে চিন্তা করি। যদি এর পরিধি শুধু প্রায় ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গোটা দুনিয়াব্যাপী হয় তাহলে দু’কথা বলার আছে। প্রায় সাত বছর হতে চলল আমেরিকা ও কানাডায় থাকা। জ্বালানী তেলের দাম বেড়ে দ্বিগুন হলেও খাবার জিনিসের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়া চোখে পড়ল না। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব কি এসব দেশে পড়ে না?
আহা, কতই না মানানসই হত, কোন নেতার কথার চেয়ে ভারী হয়ে সাধারন মানুষদের প্রতিদিনকার রোনাজারি সেক্টর কমান্ডারদের কর্ণকূহরে প্রবেশ করে এটিকে বার্নিং ইস্যু বানাত! কতই না ভাল হত, যদি রক্তের বিনিময়ে পাওয়া দেশটিতে দু’মুঠো ভাত খেয়ে শান্তিতে ঘুমোনোর জন্য যেন আর রক্ত ঝরাতে না হয় তার জন্য প্রাক্তন এই লড়াকুরা অন্তত একবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াইয়ের ডাক দিতেন! জাতি কি বিশ্বাস করতে পারে তাদেরকে, যাদের যুদ্ধ ছাড়া সমস্ত অতীতই বিরাট এক প্রশ্নোবোধক চিহ্ন দ্বারা বিদ্ধ? কি করেননি তারা? স্বৈরাচারের লুটের সহযোগী থেকে শুরু করে বারে বারে ভোল পালটিয়ে এদল ওদল বদল করে নিজেদের কোন ইস্পাতদৃঢ আদর্শের প্রমান রাখতে পেরেছেন?
বর্তমানে হঠাত্‌ গণতান্ত্রিক হয়ে যাওয়া কিছু বুদ্ধিজীবি ও পত্রিকা সম্পাদকদের সৌজন্যে রং বেরংয়ের দৃশ্য-অদৃশ্যমান অনুঘটক দিয়ে নতুন নতুন তত্ত্ব, তথ্য ও আবদার ভিন্ন স্বাদে আমরা গলধঃকরণ করছি। সময় যে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে! সব কিছুই করার যে এখনই সময়! কারন, যেকোন গনতান্ত্রিক সরকার এমনকি কোন বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত কোন তত্ত্বাবধায়ক সরকারই যে এধরনের হঠকারি সিদ্ধান্তে পা বাড়াবে না এটাতো সবার নিকট পরিষ্কার। হয়তো গনতন্ত্রের সংজ্ঞা এবং ভবিষ্যতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল কনসেপ্টই পালটে যেতে পারে। জনগণকে বোকা বানিয়ে পাক তুর্কীর মিশ্রনে দ্রবীভূত এমন এক আপডেটেড ভার্সনের সিভিল-মিলিটারী টেষ্টটিউব গনতন্ত্র আমাদের দেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের জন্য মুরব্বীদের প্রেসক্রিপশনে রয়েছে সেটি হল ‘ডায়ালগ ও ডিবেট ওরিয়েন্টেড ডেমোক্রেসি’। এ ডেমোক্রেসিতে আইন প্রনয়ন করবে ঘুরে ফিরে এলিট শ্রেণীর দন্ডমুন্ডের মাথারা। গোল টেবিলের আইওয়াশ বাগযুদ্ধ বৈঠকেই সুশীল সমাজের রহস্যময় ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে আইনের বৈধতার কাজটিও সমাধা করা হবে। জনগনের সরাসরি অংশগ্রহনের প্রয়োজন পড়বে না। বাংলাদেশকে এই মূহুর্তে টেষ্ট কেইস হিসেবে ব্যবহৃত করা হচ্ছে কি না তা দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায়ের ভেবে দেখার সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন স্পর্শকাতর ইস্যুসমূহকে পুঁজি করে আবেগের উন্মাদনায় জনগনের দৃষ্টি উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে সরিয়ে দূর্নীতিমুক্ত, আধুনিক, সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার বর্তমানে আসা অপার সুযোগটিও হাতছাড়া হওয়ার অশুভ পাঁয়তারা লক্ষ্য করছি।
লেখাটা যায়যায়দিন ২১শে নভেম্বর ২০০৭ ছেপেছে]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28746274 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28746274 2007-11-19 00:49:09
বাংলাদেশী ‘ডিয়াসপোরা’ ও জাতিসংঘে আমাদের পরিচয় উপস্থাপনা আমেরিকার ম্যাসাচুসেট্‌সের বোস্টন ভিত্তিক একটি কাগুজে সংগঠন জেএফকে স্কুল অফ গভর্ণমেন্টে ২২শে অক্টোবরের জেনারেল মইন উ আহ্‌মেদের উপস্থিতি ঠেকানোর জন্য প্রতিষ্ঠানটির ডীন ডঃ ডেভিড এলউড বরাবর ইমেইলে অনুরোধ জানিয়ে ইন্টারনেটে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানে নেমে পড়ে। বর্তমান সেনাপ্রধাণকে ‘জেনারেল পিনোশেট অফ বাংলাদেশ’,র‌্যাবকে কুখ্যাত গেস্টাপো সদৃশ নিরাপত্তা বাহিনী আখ্যায়িত করে হত্যা, গুম, নির্যাতন, বাকস্বাধীনতা হরণ, গণতন্ত্র হত্যাসহ দু’পাতা ধরে এন্তার অভিযোগ করে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের পদাংক অনুসরন করতে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। অং সুচীর মত গণতন্ত্রের প্রতীক শেখ হাসিনাকে সামরিক জান্তারা ডিটেনশনে রেখেছে, ইন্টারনেট মনিটরিংসহ মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে, ডিজিএফ ও এনএসআইয়ের সহায়তায় প্রতিপক্ষের বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিবিদ, ছাত্রদের বিরুদ্ধে রাস্ট্রীয়ভাবে সন্ত্রাস চালিয়ে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা, অপহরণ করছে অথবা গাদা করে ধরে ধরে জেল ভরছে ইত্যাদি। বাংলাদেশী ডিয়াসপোরা (Diaspora) ও ফ্রি ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশের জয়েন্ট সেক্রেটারী পরিচয় দিয়ে বিপুল কমল তার নিজের কথিত মাতৃভূমিকে বুশের নানা অপকর্মের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাঁদরেল জেনারেল মোশাররফের বর্তমান পাকিস্তানের সাথে বরাবরের মত তুলনা না করে কেন আমেরিকা বিরোধী মিয়ানমারের সাথে করলেন তা সচেতন পাঠকদের বুঝতে হয়তো এখন আর কষ্ট করতে হবে না।
অভিনব পরিভাষা ‘বাংলাদেশী ডিয়াসপোরা’ বলে পরিচয় দিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসমূহের সহানুভূতি ও মহাশক্তিধর সম্প্রদায়ের নজর কাড়ার কৌশলটির মধ্যেও একটি ঐতিহাসিক তাত্পর্য রয়েছে। অত্যাচারী ও সাম্রাজ্য বিস্তৃতকারী লোভী রাজা বাদশাহদের দ্বারা দখলীকৃত দেশের বৈধ নাগরিকদের বিশেষ কোন গোষ্ঠী নিধনে ভিটে মাটি থেকে বিতাড়িত হওয়া জাতিকে প্রাচীন গ্রীকরা এই ডিয়াসপোরা শব্দটি দ্বারা বুঝাত। ওল্ড টেস্টামেন্ট গ্রীক ভাষায় অনূদিত হওয়ার সময় ৫৮৬ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে বেবিলয়ীনদের দ্বারা জুডিয়া থেকে এবং রোমানদের দ্বারা ১৩৬ খ্রীষ্টাব্দে জেরুযালেম থেকে বিতাড়িত ও জাতি নিধনযজ্ঞের শিকার হওয়া ইহুদী সম্প্রদায়কে বুঝানোর জন্য এই শব্দটি ব্যবহ্নত হয়েছে। বর্তমানে ইহুদী ছাড়া তেমন আর কেউই এমনকি খোদ গ্রীকরাও এ শব্দটি আর ব্যবহার করে না। বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে রাস্ট্রীয়ভাবে কোন জাতিকে নিঃশেষ করার প্রক্রিয়ার কথা কখনো শোনা যায়নি। বিচারের ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো দুস্কৃতিকারীদেরকে অথবা মিথ্যা তথ্য প্রদর্শন করে স্বপ্নের দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদেরকে তো আমরা সংজ্ঞাগত কারনেই ডিয়াসপোরা বলে অভিহিত করতেও পারিনা।
নিজের অজান্তে হয়তোবা আমরা অনেকেই নিজের পায়ে প্রতিযোগিতা করে কুড়াল মারছি। শাস্ত্রে আছে, গুরুজনে কর নতি, সেবা কর কায়মনে। বাবা-মা অবিবেচনাসুলভ আচরন করলেও পারতপক্ষে তাদের আদেশ নিষেধ অমান্য করতে নেই, তবে সদ্ভাব জাগ্রত করতে নিস্পাপ প্রার্থণা করায় তো কোন দোষও দেখিনা।
গত ২৭শে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬২তম অধিবেশনে পরিবেশ বিষয়ক সাধারণ বিতর্কে অংশ নিতে গিয়ে প্রদত্ত ভাষণে নিজের প্রিয় মাতৃভূমিকে বিশ্বের সর্বোচচ ফোরামে ড. ফখরুদ্দীন আহ্‌মদ তুলে ধরলেন এভাবে, ‘বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে দুর্নীতির দুষ্টচক্রে গণতন্ত্রের উপাদানগুলো আবদ্ধ ছিল। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সৃষ্ট প্রবল হতাশার পরিণতিতে রাজনৈতিক সন্ত্রাস ব্যাপক আকার ধারণ করে। এর ফলে জনজীবন বিঘ্নিত হয় এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনার প্রতি মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলে। পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন সন্ত্রাস চক্রের অবসান করবে তেমন আশা ছিল ক্ষীণ। ফলে সেই গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে নতুন করে সূচনার উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ বছর ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।’
জনাব ফখরুদ্দীন আরও বলেন, ‘গত দু’দশকে বাংলাদেশে তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে গণতন্ত্রকে নির্মমভাবে প্রতিহত করা হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার অভাব দুর্নীতিকে আরও লাগামহীন করে তোলে। নির্বাচনে জয়লাভের সুবিধা বৃদ্ধির ফলে বেশি মূল্য দিতে হওয়ার পরিণতিতে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছিল, যার কেন্দ্রে ছিল দুর্নীতি। দুর্নীতি যে কোনো মূল্যে নির্বাচনে বিজয়ের কলকাঠিতে পরিণত হয়। এই নেতিবাচক প্রবণতার কবল থেকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে রক্ষা করার লক্ষ্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচন করতে হলে অবশ্যই প্রথমে রাজনীতিকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির কবল থেকে মুক্ত করতে হবে।’
গ্লোবাল ওয়ার্মিং বিষয়ক একটি মাত্র অনুচ্ছেদ ব্যতীত সজ্জন খ্যাত মেধাবী এই আশাবাদী মানুষটির নয় পৃষ্টাব্যাপী দীর্ঘ বক্তব্য পড়ে মনে হচ্ছিল বিরোধীদল থেকে কেবল নির্বাচিত হয়ে এসে সদ্য প্রধাণমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের পার্লামেন্টে সাবেক সরকারকে তুলোধুনো করছেন। সংগতকারনেই পাঠকদের সামনে পুরো ভাষনটি উদ্ধৃত করলাম না। যাহোক, স্বদেশবিনাশী এমন সর্বনাশা বক্তব্য আমাদের প্রেস সেক্রেটারী বা অভিজ্ঞ আমলারা কিভাবে তৈরি করে দিলেন তার প্রবাহ তালাশ করার জন্য জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে অন্যান্য দেশের সরকার প্রধাণদের বক্তব্য পড়া ও তার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করলাম।
দূর্ণীতিতে সবসময়ই যে দেশটি আমাদের সাথে প্রতিযোগিতা করে সমগোত্রীয় পর্যায়ে এসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে সেই হাইতির প্রেসিডেন্ট রিনে প্রিভেলও তার বক্তৃতায় নিজ দেশের বিরুদ্ধে আপত্তিকর কিছু বলেননি। যুগ যুগ ধরে গৃহযুদ্ধে বিপর্যদস্থ শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট আলোচনা শুরুই করেছেন তার দেশের প্রাচীন সভ্যতাকে গ্রীক সভ্যতার সাথে তুলনা করে এবং সিংহলী ও তামিল ভাষার গুণকীর্তনের মধ্য দিয়ে। সিংহলীকে ‘জীবন্ত ভাষা’ আখ্যায়িত করে তিনি নিজের দায়বদ্ধতা মনে করে এই ভাষাকেই অধিবেশনে বক্তৃতা দেয়ার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। মাহিন্দা রাজাপাক্সার পুরো গোছালো ও সাবলীল বক্তৃতাটি পড়ে মনে হয়েছে এমন উচচমার্গের মানুষ রাষ্ট্র ক্ষমতায় খুব বেশী আসীন হওয়ার সুযোগ পান না। তিনি নিঊটনের বিখ্যাত উক্তি ‘We build too many walls and not enough bridges (আমরা শুধু দেয়ালই বানাই, যথেষ্ঠ পরিমান সেতু বানাইনা)’ সহ অনেক উদাহরন এমনকি ফিলিস্তিন প্রসংগ টেনে এনে তাঁর নিজ দেশের হাজারো সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে বলেছেন, কিভাবে যুদ্ধবিগ্রহ থেকে ফিরে এসে শান্তির সাথে পৃথিবীতে একত্রে বসবাস করা যায়। শেষ করেছেন ‘ট্রিপল গেম (তিন দেবতা বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘ) আপনাদের আশীর্বাদ করুন’ বলে।
ভেবেছিলাম, গণতান্ত্রিক সরকারকে হঠিয়ে ক্ষমতায় আসা থাইল্যান্ডের সামরিক শাসক বোধ হয় পূর্বসুরী থাকসিনকে দু’কথা শুনিয়ে দিবেন। তাও তেমনটি তিনি করেননি, প্রথানুযায়ী রাজাকে ভুয়শী প্রশংসা করে শুধু সামনের দিকের কথাই বলেছেন, পেছনের কথা দুয়েকটি বাক্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখে অল্প কথায় তিনি বক্তব্য শেষ করেছেন।
মালয়েশিয়া ও ইরানের প্রসংগ না আনলে বোধ হয় আজকের আলোচনা অসম্পূর্ন থেকে যাবে। বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও দেশপ্রেম মানুষকে যে কত দৃঢ ও উচচকিত করে তার প্রকৃষ্ট উদাহরন এই দুই দেশের সরকার প্রধানের বক্তৃতায় প্রমাণ মিলেছে।
ডঃ ফখরুদ্দিনের চেয়ে পরিমানে মাত্র অর্ধেক বক্তৃতায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আব্দুল্লাহ বাদাউয়ী মোট একুশটি পয়েন্টের প্রথম আটটিই আলোচনা করেছেন ক্লাইমেট চেঞ্জ বা পরিবেশ পরিবর্তন নিয়ে, যেটিই ছিল মুলত আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয়। বাকীটুকুতে তিনি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন ইসলামের সাথে পাশ্চাত্যের বর্তমানের বৈরীতা নিয়ে। সভ্যতা ও মানবতার বিপর্যয় থেকে শুরু করে আফগানিস্তান, ইরাক, লেবানন, গোলান হাইট্‌স, ফিলিস্তিন এমন কোন ইস্যুই বাদ রাখেননি তাঁর পরিমিত বক্তৃতায়। বুদ্ধিমত্তার সাথে মূল সমস্যা চিহ্নিত করে ও ইগোইজম পরিত্যাগ করে দায়িত্বশীলতার সাথে কিভাবে পৃথিবীতে বাস করা যায় তার কারন অনুসন্ধানের আহ্‌বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, একে অপরকে দোষারোপের প্রবনতা ইতিহাসে বিদ্যমান, কিন্ত ইতিহাসে এমন প্রমান মেলে না যে সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যকার দ্বন্দ্বে কোন নির্দিষ্ট ধর্মকে মূল কারণ হিসেবে অভিহিত করে তার বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা সহকারে ঝাপিয়ে পড়ার। তিনি এলায়েন্স অফ সিভিলাইজেশনের ২০০৬ সালের ১৩ই নভেম্বরের উচচ পর্যায়ের প্রকাশিত রিপোর্ট উল্লখ করে বলেছেন, ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যায় সন্দেহের দাবানলে কখনো সহিষ্ণুতা উবে গেলেও বিশ্বব্যাপী পরিচালিত বর্তমানের ‘ওয়্যার অফ রিলিজিয়েন্স’ এর মূল কারণ শুধুই রাজনৈতিক, ধর্মীয় নয়।
যাঁর শানিত যুক্তি ও যে কোন বিষয়ে খোলামেলা বিতর্কের ওপেন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় বুশ ও তার মানুষখেকো সহযোগীরা শুধুমাত্র ‘বিপজ্জনক ব্যক্তি’ বলে অন্য প্রসংগে চলে যান, সেই মাহমুদ আহ্‌মেদিনেজাদের বক্তব্যে বিশ্বনেতৃবৃন্দ নিশ্চয় নতুন কিছু পেয়েছেন। বয়সে ডঃ ফখরুদ্দিনের চেয়ে ষোল বছরের জুনিয়র সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই সাবেক প্রফেসর ডঃ আহ্‌মেদিনেজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ভর্তি পরীক্ষায় চার লক্ষ ছাত্রদের মধ্যে ১৩২তম স্থান অধিকার করেই শুধু মেধার স্বাক্ষর রাখেননি, বিশ্বমোড়লদের চোখ রাঙানোর উত্তর কিভাবে দিতে হয় তাও শিখেছেন। দশ পৃষ্ঠাব্যাপী দীর্ঘ আলোচনায় তিনি দুনিয়াজোড়া মানবতা বিপর্যয়ের নিখুঁত বিবরণের পাশাপাশি তা উত্তরণের সুনির্দিষ্ট উপায় পয়েন্টাকারে অধিবেশনে প্রস্তাবনা হিসাবে পেশ করেছেন। সম্মিলিতভাবে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ধ্বংস ও নারীর অবমূল্যায়ন; মানবাধিকার লংঘন, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্ব; প্রচীন সভ্যতা ও জাতীয় মূল্যবোধের বিরুদ্ধে আগ্রাসন; দারিদ্র্য, অশিক্ষা, চিকিতসা ও ধনী দরিদ্রের বৈষম্য; শিষ্টের দমন এবং মিথ্যা ও প্রতারণার লালন; আন্তর্জাতিক আইন অমান্য ও প্রতিশ্রুতি ভংগ; অযথা গগনবিদারী হুমকি ও অস্ত্রের যাচ্ছেতাই প্রতিযোগিতা ইত্যাদি প্রসংগ উদাহরণসহ টেনে এনে এসবের মূল কারন বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে অনুসন্ধানের আহবান জানিয়েছেন। পবিত্র কুর’আনের অন্তত তিনটি বানী উদ্ধৃত করে বলেছেন নৈতিকতার সুকুমার বৃত্তিসমূহের পরিস্ফূটনের জন্য টেকসই ইনস্টিটিউশন গঠনের পাশাপাশি সবক্ষেত্রে সুবিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া শান্তির প্রত্যাশা আকাশ কুসুম বৈ কিছু নয়। আর এটিই হল আদম থেকে নূহ, ইব্রাহীম, মুসা, ইসা ও মুহাম্মদ (সাঃ) সহ সব নবী রাসুলদের মাধ্যমে খোদার স্বর্গীয় আহবান। আপাদমস্তক ধার্মিক ব্লাকস্মিথের ছেলে ডঃ আহ্‌মেদিনেজাদ প্রেসিডেন্ট হয়েও অত্যন্ত সাদাসিধে মানুষ, সাধারণ এপার্টমেন্টে বাস করেন এবং বাসা থেকে সরবরাহকৃত খাবারই অফিসে বসে খান।
দুনিয়াতে আরো বহু দেশের গণতন্ত্র দুষ্ট চক্রের অজস্র বাঁকে আবদ্ধ থাকলেও আমাদের দেশের পাশাপাশি একমাত্র ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নূরী আল মালিকী ছাড়া সবাই নিজ দেশের নেগেটিভ ইমেজ দেশের বাইরে সোচচার কন্ঠে প্রচার করতে বোধকরি লজ্জা পেয়েছিলেন। তবুও মালিকী তার দেশের বিখ্যাত দুই নদীর তীরে গড়ে উঠা পৃথিবীর সবচে’ প্রাচীন সভ্যতার কথা প্রথমেই নিয়ে আসতে ভুল করেননি। তারপর থেকেই সাদ্দাম আমলের বর্বরতার কাহিনী ও আমেরিকার আশীর্বাদে ইরাকে গণতন্ত্র জন্ম দেয়ার স্তুতিতে ভরা তার পুরো ভাষনটি। মালিকীকে তো এসব কথা বলতে হবেই। কেন বলতে হবে সেটি যে তার শুধু শত্রু নয় সুহৃদ বন্ধুটিও ভাল করেই জানে।
তাই বলছিলাম, আমাদের কি এমন কোন গৌরবের কাহিনীই নেই যা এই সুযোগে দুনিয়ার মানুষকে অল্প সময়ের জন্য হলেও শোনানো যেত? প্রাচীন আর্য সভ্যতা, ইশা খাঁর সোনারগাঁ, লালবাগের কেল্লা, শায়েস্তা খানদের কথা, দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তীতুমীরদের কাহিনী, ভাষার জন্য পৃথিবীর ইতিহাসে অদ্বিতীয় আন্দোলন, সর্বোপরি আস্ত একটি দেশ পাবার বীরগাঁথা কাহিনীও কি ঝানু ও সফল অর্থনীতিবিদ শোনাতে পারতেন না? ভুলে গেলে তো চলবে না যে, প্রাত্যাহিক জীবনের জনপ্রিয় পরিভাষাসমূহ (যেমনঃ সালাম, বিসমিল্লাহ, আল্লাহ সর্বশক্তিমান, খোদা বা আল্লাহ হাফেয) কোন দলের নিজস্ব সম্পত্তি নয়, এসব মাটির ডাক ও নাড়ির স্পন্দন বলেই রাজনীতিবিদরা সম্মান প্রদর্শন করতে বাধ্য হন।
আমরা কিন্তু জোড় করে হলেও বিশ্বাস করতে চাই পেছনের প্রবল শক্তির চাপে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন নয় আমাদের প্রেসিডেন্ট ডঃ ইয়াজুদ্দিন আহমদই আমাদের ডঃ ফখরুদ্দিন আহমদকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। তাই ইরাক ও বাংলাদেশ অথবা মালিকী ও ফখরুদ্দিনকে আমরা কখনো এক করে দেশপ্রেমের পরীক্ষা নিতে চাইনা। বিশ্ববিখ্যাত নোবেল প্রাপ্তির পরদিনই আমরা যেমন আনন্দ ও আবেগের আতিশয্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে না বুঝেই উন্মুক্ত করার কথা বলে ফেলি, আবার অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিশ্বাস দেদীপ্যমান করতে কৃপণতাবোধ করি। ইরান ও মালয়েশিয়ার মত ‘ভগবান বুকে এঁকে দিব পদচিহ্ন’-র ন্যায় দুঃসাহসিকতা দেখাতে না পারলেও শ্রীলংকার মত ‘শির নিহারী আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রীর’ প্রমাণ দিলেও অন্তত যারা বিদেশ বিভূইয়ে ডিয়াসপোরাদের মোকাবেলায় হতভাগা প্রিয় মাতৃভূমিকে সুঊচচ আসনে বসানোর জন্য যতকিঞ্চিত চেষ্টা করেন তাদের জন্য নিশ্চিত তা হত সোনায় সোহাগা।
যায়যায়দিনে পড়ুন
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28740060 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28740060 2007-10-26 21:48:21
বাংলাদেশবিরোধী নানামুখী অপপ্রচার
বিগত জোট সরকারের শাসনামলে আমেরিকায় সফররত একজন জার্নালিষ্ট কাম পলিটিশিয়ানকে তৃতীয় বিশ্বের দায়িত্বে থাকা স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক সেক্রেটারী বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবস্থান প্রসঙ্গে বলেছিলেন, তোমাদের দেশের গণতন্ত্র হল ‘ভেরী পুওর ডেমোক্রেসি’। মানসম্মানে সচেতন জার্নালিষ্ট উত্তরে বলেছিলেন ‘পুওর ডেমোক্রেসি ইজ বেটার দ্যান নো ডেমোক্রেসি’। প্রকারান্তরে সেক্রেটারীকে এর মাধ্যমে তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, নো ডেমোক্রেসির দেশগুলোর সাথে তো তোমাদের দহরম বেশ, তবে আমাদের দেশের পুওর ডেমোক্রেসিতে ক্রমান্বয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে দিতে তোমাদের এত মাথা ব্যথা কেন?

যাহোক, ঘরোয়া রাজনীতি তো বাংলাদেশে কারো কারো জন্য নিষিদ্ধ (তাও শুধুমাত্র ভূ-মন্ডলে) ছিল, কিন্ত নভোমন্ডলের রাজনীতি ঠেকানোর সাধ্য কার? উপরে গড্‌ কিংবা নীচে বুশ এখনো এ পথে অন্তরায় হয়ে দাড়াননি। গত একুশে আগষ্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভূত ও পরবর্তীতে সব অনাকাংখিত ও রহস্যজনকভাবে বিস্তৃত পরিস্থিতির সূত্র ধরে এক সপ্তাহ পর (২৮শে আগষ্ট) মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে বিবিসি বিশ্বময় ছড়িয়ে দিল ভীত ও পলায়নরত এক সেনা সদস্যের পিছনে স্যান্ডেল পরিহিত এক যুবকের সর্বশক্তি দিয়ে ফ্লাইং কিকের ছবি। গত বছরের ২৮শে অক্টোবরের বীভৎস ও কুৎসিত দৃশ্যের পর সারা বিশ্বের খবর পিপাসু ও উৎসুক পাঠকদের সাথে প্রবাসী বাংলাদশীরাও উন্মুখ হয়ে আবারো পড়ল প্রিয় মাতৃভূমির নতুন আরেক কাহিনীর কদাংশ যা শুধুমাত্র টালমাটাল দেশেই হয়ে থাকে। সেইসাথে বরাবরের মত এবারো পক্ষ, বিপক্ষ বিভিন্ন বিভাগে ভাগ হয়ে নিজেরাও সরস ও নিরস আলোচনায় মেতে উঠল।

বিবিসি ছবিটির প্রচ্ছদে নিউজের একদম শিরোভাগে লিখেছিল, If a single image can sum up the thorny mess into which Bangladesh has once again stumbled, then this perhaps it is (অর্থাৎ যদি একটি মাত্র ছবিই পুরো দেশের অরাজকতা ও পুনরায় অস্থিতিশীলতার ইমেজ ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয় তবে সম্ভবত এটি সেটিই)।

তারও একদিন আগে অর্থাত্‌ ২৭শে আগষ্ট নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক "বাংলা পত্রিকা”য় খবর বেরুলো নিউ ইয়র্ক সিটির এস্টোরিয়াতে অবস্থিত পি.এস. ১১২-তে অনুষ্ঠিত উদীচী যুক্তরাষ্ট্র শাখা আয়োজিত রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তী ও দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষনে বিখ্যাত কলামিস্ট ও লেখক আব্দুল গাফফার চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের সকল সমস্যার উত্‌স হচ্ছে সেনাবাহিনী। বঙ্গবন্ধু, চার নেতা সহ দেশের সেরা সন্তানদের হত্যা করেছে ওরাই। এরাই এখন চক্রান্ত করছে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে শেষ করার। এজন্য বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া মুক্তির পথ নেই। এগারো জানুয়ারীর পর থেকে শেখ হাসিনার আমেরিকা সফরের আগ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর প্রতিটি কর্মকান্ডের ভূয়শী প্রশংসাকারী আগাচৌ আরো বলেন, বর্তমান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের নয়। ওরা ভাড়াটে পাকিস্তানী। ৭১ সালে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে। আর এবার যুদ্ধ করতে হবে পাকিস্তানী দাসদের বিরুদ্ধে। তিনি জোড় দিয়ে আরো বলেন, এই সেনাবাহিনীই প্রতিটি হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী। বাংলাদেশের জাতীয় নেতা ছাড়াও উদীচী ও রমনা বটমূল বোমা হামলার নেপথ্য নায়ক হচ্ছে তারাই। সেজন্য এদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া জাতি মুক্তি পাবেনা।

এরও একদিন আগে (অর্থাত্‌ ২৬শে আগষ্ট) ভারতের হায়দারাবাদে মক্কা মসজিদে বোমা বিস্ফোরিত হয়ে নৃশংসভাবে বহু লোক হতাহত হওয়ার পরপরই তদন্তের জন্য অপেক্ষা না করেই স্থানীয় পুলিশ তাত্‌ক্ষণিকভাবে ঘটনার মূল হোতার নাম ‘বিলাল’ দিয়ে এই বলে প্রচারণা চালালো যে, এই ঘৃণ্য হত্যাযজ্ঞ বাংলাদেশ থেকেই পরিচালিত হয়েছে। টাইমস্‌ অফ ইন্ডিয়া ৫ই সেপ্টেম্বরে কথিত বিলালের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারী স্কুল শিক্ষক আব্দুল ওয়াহেদের সুত্র ধরে লিখেছে, আমার ছেলের নাম মোহাম্মদ শহীদ। আমরা পরিবারের কেউই এমনকি তার বন্ধুরাও তাকে বিলাল নামে ডাকে না। এ নামটি পুলিশই তাকে দিয়েছে। স্ন্রাসের সাথে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আমার ছেলেকে না জড়িয়ে পুলিশের উচিত হবে সে যেখানে আছে বলে দাবী করছে (অর্থাত্‌ বাংলাদেশে) সেখান থেকে খুঁজে বের করে নিয়ে আসা। মিশ্র বর্ণের অধিবাসীদের গ্রাম মোজারামবাগের এই পরিবারে ওয়াহেদের রয়েছে ৭ পুত্র ও ৪ কন্যা সন্তান। দুই পুত্র শহীদ ও জাহেদকে কয়েক বছর আগ থেকে হায়দারাবাদের পুলিশ সময়ে অসময়ে তুলে নিয়ে যায়। কতবার যে হবে তা স্কুল শিক্ষক বাবা আর গুণতে পারছেন না। তিনি মিডিয়াকে জানান, আমি জানি না কেন তারা আমার দু’ছেলের পেছনে লেগেছে। প্রতিবেশীদের বরাত দিয়ে টাইম্‌স বিস্তারিতভাবে আরো লিখেছে, এই লাজুক প্রকৃতির টিন এজার ছেলেদের দিয়ে ২০০৪ সাল থেকে পুলিশের অজানা প্রকল্প বাস্তবায়নের কাহিনী। বিশ্বব্যাপী প্রফেশনাল টেররিষ্টদের নামের তালিকার সাথে মিলিয়ে সর্বশেষে মোহাম্মদ শহীদের নাম দেয়া হয়েছে মক্কা মসজিদে বোমা বিস্ফোরণের নায়ক, মোষ্ট ওয়ান্টেড, জংগী দল হুজি (হরকাতুল জিহাদ) নেতা আব্দুল শহীদ মোহাম্মদ বিলাল, যে কিনা বাংলাদেশে বসে ৯/১১ এর আদলে ইন্ডিয়ায় সুইসাইড স্কোয়াড চালনার পরিকল্পনা করছে। তাই স্বাভাবিক কারনেই ক্লাশ টেনে পড়া সর্বশেষ সন্তান মজিদকে নিয়ে শহীদ, জাহেদদের দুখী বাবা আব্দুল ওয়াহেদ গ্রাম ছেড়েছেন। উল্লেখ্য, এর আগে মজিদকেও পুলিশ দু’বার ধরেছিল।

৪ঠা সেপ্টেম্বরে দি হিন্দু লিখেছে, বাংলাদেশের পুলিশ মোহাম্মদ শরিফুদ্দিন ওরফে আবু হামযাকে ধরে নিয়ে হায়দারাবাদের বোমা বিস্ফোরণের ব্যাপারে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই শরিফুদ্দিনের সাথে উক্ত হুজি কমান্ডার বিলালের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। ওই দিনের ইন্ডিয়ান টাইম্‌স যোগ করে আরো লিখেছে, একই অভিযোগে ২৮ বছরের যুবতী আফসানাকে বাংগালোরের বানের ঘাট থেকে ধরা হয়েছে, তার আরেক আত্মীয়া শাফিরা রুস্তমযাহ্‌কেও ধরা হয়েছে চার দিন আগে। শাফিরার ভাই রিজভানকেও পুলিশ হন্য হয়ে খুঁজছে।

এদের পরিচয় হিসেবে পুলিশ সবাইকে মেয়াদোত্তীর্ণ বাংলাদেশী ছাত্র বলে চালিয়ে দিচ্ছে। তাড়াহুড়া করার জন্য ভারতের পুলিশ একটু ভুল করেছে বলে মনে হয়। কারণ, সবাই জানেন রুস্তমযাহ্‌, রিজভান টাইপের নাম বাংলাদেশে এখনও আমদানী হয়নি। এগুলো উত্তর ইন্ডিয়ার মুসলমানদের প্রচলিত নাম।

জংগী দমনে বাংলাদেশের বিরল ভূমিকার প্রশংসা না করে সাউথ এশিয়ান এনালাইসিস গ্রুপ বা সায়াগের (SAAG) অতিথি লেখক ডঃ আনন্দ কুমার তার জংগী সম্পর্কিত সাম্প্রতিক (৩০শে আগষ্ট) আর্টিকেলে লিখেছেন কিভাবে এই তথাকথিত মহাশক্তি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা দমনে সেনাবাহিনী, RAB, পুলিশ, প্রশাসন সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থতার আষাড়ে গল্প।

আজকের আলোচনায় তারিখসহ ‘কাকতালীয়ভাবে’ ঘটে যাওয়া এতগুলো ঘটনার উল্লেখ করার অর্থ বুঝতে আমাদেরকে হয়তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। কেন যেন মনে হয় জাতিসংঘের সহায়তায় প্রতিবেশী দেশ ও বিশ্বমোড়লদের স্বার্থ মিলে যাওয়ায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে রহস্যময় পুরুষের স্বপ্নানুযায়ী উপমহাদেশের সীমানা পরিবর্তনের কিংবা মানচিত্র বদলানোর পুরনো ফন্দি বাস্তবায়নের আর তর সইছে না। সাময়িক সময়ের জন্য জাতিসংঘের অধীনে সারা বিশ্বে সফলভাবে শান্তি মিশনে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জোয়ানদের জন্য দেশের তুলনায় বিপুল অংকের অর্থের বেতন ও ভূয়শী প্রশংসা আধিপাত্যবাদীদের টোপ হিসেবে ব্যবহ্নত হচ্ছে কিনা তা ভেবে দেখতে হবে। একটু সময়ের তরেও যেন অলক্ষ্যে তারা মহাশক্তি পরাশক্তি কারো আজ্ঞাবহ না হয়ে সর্বনাশ ডেকে না আনেন সেটাই আমরা আশা করব।

দেশটাকে জংগী ও অকার্যকর রাষ্ট্র বানানোর বহুদিনের সাধটাকে কার্যকর করতে বাংলাদেশকে সেকেন্ড পাকিস্তান বানানোর ও আমেরিকার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ব্যস্তসমস্ত সায়াগের সাম্প্রতিক সামগ্রিক কর্মকান্ড চোখের পড়ার মত। পাঠকেরা নিশ্চয়ই অবগত আছেন সামনের ইলেকশনে জেতার জন্যে ডেমোক্রেট, রিপাবলিকানের বাছাই পর্বের সব প্রার্থীই পাকিস্থানের উপর দ্রুত হামলার বিষয়টাকে আর ধামাচাপা দিচ্ছেন না। ইতিমধ্যে হোয়াইট হাউসের শনিবারের সাপ্তাহিক ব্রিফিং-এ আমেরিকার নেতৃত্বে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী চলমান যুদ্ধের নানা আপডেটের সাথে বাংলাদেশের জরুরী অবস্থা, গণতন্ত্র, সেনা শাসন নানা বিষয়ের প্রসংগও নতুন করে স্থান পেয়েছে।
চট্টগ্রামের বন্দরটাকে আল ক্বায়েদার এশিয়ায় প্রবেশ দ্বারের ঘাঁটি বানানোর বিশ্বব্যাপী নতুনভাবে প্রচারনা চালনার রহস্য উদ্‌ঘাটনের এবং তা মোকাবেলায় কার্যকারী পদক্ষেপ না নিয়ে বিদেশ মিশনসমুহের বোবা পররাষ্ট্রনীতি অব্যাহত থাকলে ভয়ংকর ভবিষ্যত আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। বছর পাঁচেক আগ থেকে পশ্চিমবঙ্গে গজিয়ে উঠা বিপুল সংখ্যক এখনো অজনপ্রিয় ভারতের গার্মেন্ট্‌স ইন্ডাস্ট্রিসমূহকে পাশ্চাত্যের বাজারে আমাদের দেশের তুলনায় কোয়ালিটি প্রোডাক্ট হিসেবে টিকিয়ে রাখার জন্য বাংলাদেশকে অকার্যকর ও জংগী দেশ বানানোর ফর্মূলাটি পুড়িয়ে ধ্বংস করার চেয়ে অত্যন্ত সহজ ও স্থায়ী সমাধান। সেই সাথে আমেরিকার আশীর্বাদ এবং কাশ্মিরী বা প্রতিবেশী মুসলিম সন্ত্রাসী দমনের নামে ইসরাইলের সাথে সেদেশের সামরিক বাহিনীর নতুন ডিল যদি যোগ হয় তাহলে তো আর কথাই নেই। বিভিন্ন নাজুক পরিস্থিতিতে বিন লাদেনের এক একটা টেপ ইথারে ভেসে এসে বুশকে যেমন বাঁচিয়ে রাখছে, বেঁটে খাটো পাজামা, পাঞ্জাবী পরিহিত আরেকটা কল্পিত বিন লাদেন এ অঞ্চলে সৃষ্টি করে অবাধ্য ও অচ্ছুত প্রতিবেশীদের শায়েস্তা করার সুবর্ণ সুযোগ ভারত আর হাতছাড়া করতে চাইছে না। কারণ, ইতিমধ্যে আমরা জেনে ফেলেছি দেশের পর দেশ, সভ্যতার পর সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে কিন্ত বিদেহী বা অশরিরী বিন লাদেনদের টিকিটিও শক্তিধরেরা কখনো ছুঁতে পারবে না।

সব সরকারের সাথে সুসম্পর্ক এবং জনগণের সাথে সম্পর্কহীন সুশীল সমাজের আয়তাকার বৈঠকের গোল টেবিল আলোচনায় অসাড় তত্ত্বের মায়াভোলানো উপস্থাপনা ও সেনাপ্রধাণকে অযাযিত তোষণ নীতি নিয়ে আমাদের দেশের বিভিন্ন ধরনের বুদ্ধিজীবির সাথে সুবিধাবাদী রাজনীতিকরা তো সবসময়ই প্রস্তুত।

ক্ষুদ্র এই ব-দ্বীপটুকুর বিরুদ্ধে সামরিক ও মূল রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধানোর জন্য গুটিকতেক দেশীয় এজেন্টদের সহযোগীতায় দুনিয়ার চতুর্দিক থেকে একসাথে বুদ্ধিবৃত্তিক সাঁড়াশি আক্রমণের বিপরীতে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি যদি ‘অতিকায় হস্তি লোপ পাইয়াছে কিন্ত ক্ষুদ্র পিপীলিকা টিকিয়া রহিয়াছে’ ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন তাহলে তো বলার কিছুই নাই, তবে সামরিক শক্তির নিকট বিনীত অনুরোধ থাকবে বনিক মারাঠা, বর্গীরা ক্ষণিকের জন্য ধণিক বানানোর ফাঁদে ফেলে ঘুম পাড়ানোর গান গেয়ে যেন ক্ষেতের সব ধান খেয়ে না ফেলে!

* আমার এই লেখাটি যায়যায়দিন ২০শে সেপ্টেম্বরে ও নয়াদিগন্ত ৪ই অক্টোবরে ২০০৭ ছেপেছে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28732537 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28732537 2007-09-20 20:25:22
কানাডায় মুসলিম জীবন ধারার বিকাশ প্রথম মুসলিম ইমিগ্রেন্টদের মধ্যে টিনএজার আলী আবুছাদির গল্প কানাডার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্থান করে আছে। আলেক্সান্ডার হ্যামিলটন নামে সমধিক পরিচিত লেবানিজ এই যুবক সোনার খনি পাওয়ার আশায় লালা থেকে বৈরুত পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে মন্ট্রিয়েলের বোটে বোর্ড হয়েছিলেন ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে। সোনা তার ভাগ্যে না জুটলেও সফল ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন দ্বার উন্মোচন করেছিলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় একই শতকের প্রথম দশকে অন্টারিও ও কুইবেক এবং পরে আলবার্টা ও সাচকেচুয়ানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। যেখানে গড়ে ওঠে প্রথম মুসলিম বসতি।
এরপর থেকেই পটপরিবর্তনের নতুন দৃশ্যের সূচনা হয়। দক্ষ পেশাজীবী শিক্ষক, টেকনোক্র্যাট, ব্যবসায়ী, কারিগরি শিক্ষায় পারদর্শীদের বিপুল সমাগম ঘটে। ফলে কানাডার অর্থনীতির মূল কাঠামোয় পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলমানরা প্রথমবারের মতো নিজেদেরকে এ দেশের জন্য ‘প্রয়োজনীয়’ হিসেবে প্রমাণ করে তোলে। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫২ সালে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ উন্মোচিত হয় এবং এর এক দশক পরে ইউনিভার্সিটি অফ টরেন্টো বিদেশী মুসলিম ছাত্র ভেড়ানোর নতুন কৌশল হিসেবে মুসলিম স্কলারদের বিভিন্ন দেশ থেকে এনে বিভিন্ন বিভাগে নিয়োগ দেয়া শুরু করে।
কঠোর সংগ্রাম ও সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে নিজেদেরকে ফেলে দিলেও শিকড় ধরে রাখতে চেষ্টায় এক বিন্দুও কার্পণ্য করেনি এই জনগোষ্ঠী। তারই অনবদ্য স্বাক্ষর এডমন্টনের আল-রাশিদ মসজিদ। ১৯৩৮ সালের ১২ ডিসেম্বর উত্তর আমেরিকার প্রথম মসজিদ হিসেবে এটি আত্মপ্রকাশ করে। সিটির ততকালীন মেয়র ও পবিত্র কুরআনের বিখ্যাত ইংরেজি অনুবাদক আল্লামা ইউসুফ আলীর বিরল উপস্থিতি উদ্বোধন অনুষ্ঠানটিকে সত্যিকার অর্থেই ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। মূল অবয়বের খানিকটা পরিবর্তন করে মসজিদটিকে আজ ইসলামি শিল্পের জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে। দেড় শতকেরও বেশি পুরনো ও দ্রুত বিকাশমান কানাডার এই মুসলিম জনগোষ্ঠী দক্ষ, শিক্ষিত ও অতিগুরুত্বপূর্ণ জাতিতে পরিণত হয়েছে। মোট জনসংখ্যার হিসেবে শতকরা দুই ভাগের নিচে থাকলেও গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্বে অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চেয়ে ঈর্ষণীয় পর্যায়ে এগিয়ে রয়েছে। মসজিদের সংখ্যা আজ হাজার ছুঁই ছুঁই; যার সাথে শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশি মুসলমান নিয়মিত/অনিয়মিত পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকেন।
অন্যদিকে মূলধারার রাজনীতিতে যে একেবারে পিছিয়ে আছে তাও কিন্তু নয়। বেশ ক’জন মুসলিম এমপি ও অনেক কাউন্সিল নির্বাচিত হন প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে। এ দেশে মুসলমানদের পক্ষে কথা বলার জন্য অমুসলমানরাও এগিয়ে আসেন নিজ ইচ্ছায়। জাতীয় দৈনিক ও মিডিয়ায় বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলে মুসলমানদের উপস্থিতি খুব সরব না হলেও একেবারে যে নীরব তাও কিন্তু নয়। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৩৯ বছর বয়সী চিত্র নির্মাতা জারকা নওয়াজের রচিত ধারাবাহিক কমেডি সিরিজ ‘লিটল মস্ক অন দি প্রেইরি’ কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন-এর সর্বাধিক জনপ্রিয় কমেডি শোতে পরিণত হয়েছে সব সম্প্রদায়ের মধ্যে।
প্রায় প্রতিটি মসজিদে জুমা’র একাধিক জামাত অনুষ্ঠিত হয়। তবুও লোকে লোকারণ্য! কি পুরুষ, কি মহিলা, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার মহাসমাগম চোখে দেখার মতো! অথচ সপ্তাহের এ দিনটি সাপ্তাহিক ছুটির দিন না হলেও ঠিকই অফিস ম্যানেজ করে মুসলমানরা সরব উপস্থিতির মাধ্যমে জানান দিয়ে যায় তারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এক বিশ্বাসী জাতি।
অধিকাংশ মসজিদেই ইংরেজিতে খুতবা হয় বেশ আধুনিক ঢঙে। আধুনিক ও ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত প্রগতিমনা ব্যক্তিরাই সমকালীন বিভিন্ন বিষয়ে অত্যন্ত গোছালো আলোচনার মাধ্যমে খুতবার অপরিহার্যতা বাড়িয়ে দেন। বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের ইসলামি জাহানে পারদর্শী ব্যক্তিরাই ঘুরে ফিরে খুতবা দিয়ে থাকেন। তবে নও মুসলিম কৃষ্ণাঙ্গরাও এ ক্ষেত্রে খুব একটা পিছিয়ে নেই। তাদের কদাচিত উপস্থিতি ও ভিন্ন ধাঁচের উপস্থাপনা দর্শকদের নজর কাড়ে। এখানে রাজা বা একনায়ক শাসকদের মর্জিমাফিক খুতবা হয় না, উপমহাদেশের মতো বারচাঁদের খুতবা বই থেকে নিরস, একগুয়ে ও অবোধ্য খুতবা পাঠ করা হয় না। মহিলাদের প্রবেশে বিধিনিষেধেরও বালাই নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণীরা এ দেশে এসে ‘নতুন ইসলামের’ সন্ধান পান। বিভিন্ন সময়ে মহিলা ও শিশুদের জন্য আয়োজিত চমতকার ও আকর্ষণীয় প্রোগ্রাম মসজিদের সাথে তাদের সম্পর্ক অত্যাবশ্যকীয় করে তুলেছে। তাই তারা জুমা’র নামাজের ভিন্ন স্বাদ পরিবারসহ হারাতে চান না। কানাডার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইকনা, ইসনা এবং বাংলাদেশীদের মধ্যে এমসিসি’র নিয়মিত ও সহজবোধ্য প্রোগ্রাম তাদের ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলছে প্রতিনিয়ত।
ইমিগ্র্যান্ট বাবা-মায়েরা স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকলেও এ দেশে জন্মগ্রহণকারী ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে আদৌ তা নেই। উত্তর আমেরিকার ন্যাচার বা কালচার বিশেষ করে ‘স্বাধীন চিন্তা ও কর্ম’ পুরোটাই তারা রপ্ত করে নিয়েছে। যেখানে তাদের পিতৃ-মাতৃভূমিতে অনেকটা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্রতিটি প্রশ্নের তারা বাস্তবভিত্তিক উত্তর চায়। ফলে, পিতা-মাতাদের ‘হোমওয়ার্ক’ প্রস্তুত করতে হয় শিশুদের ধর্মীয় নসিহত করার আগেই। কারণ তারা সূত্র ও উতস জানতে চায়। আর সন্তোষজনক জবাব না পেলে মুখের ওপর কড়া মন্তব্য ছুড়তেও দ্বিধা করে না। সেজন্য কোনো কোনো খতিব এর নাম দিয়েছেন ‘ইসলাম কানাডা’ যাতে কোনো গোঁজা মিল বা ধর্মান্ধতার বালাই নেই। যেখানে সব ‘কেন’ এর যুতসই জবাব রয়েছে। এখানে পিতা-মাতারা নিজেরা ভালো মতো জেনে শুনে বাস্তবভিত্তিক উপায়ে শিশুদের উপদেশ দেন। সেজন্য যুগ যুগ ধরে আসা তাদের খারাপ অভ্যাসগুলোর কাটছাঁট করতেও কম কসুর করেন না তারা। এ মুহূর্তে এক পাকিস্তানি ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে যায়। স্বাধীন-পূর্ব বাংলাদেশে হাইকোর্টের সামনের কলোনিতে থাকতেন তিনি তার বাবা-মার সাথে। ইলিশ মাছের স্বাদ ও সাম্পানওয়ালার গান আমাকে দেখে মনে হলো নতুন করে তার ভেতর পুরনো স্মৃতি মোচড় দিয়ে উঠল। সারাক্ষণ সিনেমা ও গান মুখে লেগে থাকত। আজকের এ পঞ্চাশোধ্বê মানুষটির। আজ তিনি বেমালুম ভুলেই গেছেন কিভাবে তার ভিসিডি রেকর্ডারটা অপারেট করতে হয়। দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ মিসিসাগর জামেয়া মসজিদে নিয়মিত যাওয়ার ও তাদেরকে ভালো মানুষ ও মুসলমান বানানোর আকুতির গল্প আমি তন্ময় হয়ে শুনছিলাম।
তথ্য সুত্র:
1. Muslims and Islam in Canada-Ali Ketani and M. M'Bows
2. Muslims and Islam in the American Continent Vol. I of the Encyclopedia of Muslim Minorities in the World
3. Overview of Canadian Govt. Website
4. CBC's Website


নয়াদিগন্ত ২২ মে ও ২৪ আগষ্ট ২০০৭ এ ছেপেছে
যায়যায়দিন অক্টোবর ২৭, ২০০৭ ছেপেছে

আমার দেশ ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০০৮ এ ছেপেছে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28730470 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28730470 2007-09-10 19:54:35
দেশ বিদেশে সংস্কার, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব এবং আজরাইলী প্রতারণা-১ পরিসমাপ্তি সবসময় সুখকর হয় না। বরং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও দিক নির্দেশনা ব্যতিরেকে এটিকে চলতে দেয়া হলে অধিকাংশ লোকের প্রারম্ভিক স্বতঃস্ফূর্ততা, উৎসাহ ও ঊদ্দীপনা কিছুদিন পরেই তিতিয়ে যায়, অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছে না। আর সংস্কারের প্রতিপক্ষ অধিকাংশ সময়েই শাসকশ্রেণীর কাছাকাছি থাকা মানুষগুলোর হাসি ক্ষণিকের জন্য উবে গেলেও পরে ঠিকই পূর্ববত যথাস্থানে দ্রুত ফেরত চলে আসে। শারিরীকভাবে সংস্কার বিরোধীদের উপর নাজেহাল করা থেকে শুরু করে কখনো কখনো এমনকি তাদের অসহায় মুর্তির উপরও সংক্ষুব্ধ জনতার আছড়ে পড়তে দেখা যায়।
প্রতি শতকেই এই জনপ্রিয় শব্দটি নিয়ে পৃথিবীতে অসংখ্য মহামানব-মানবীর আবির্ভাব ঘঠেছে। কেউ শির ঊঁচু করে শত বছর ধরে বেঁচে আছেন মানুষের মনের মুকুরে, কেউবা অন্ধ্বকারের অতল গহ্‌বরে ঘৃণাভরে নিপতিত হয়েছেন। কিন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা হচ্ছে, খুব কম লোকই হতভাগা এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়। তাই স্বভাবতই অভিন্ন ইতিহাসের পূনরাবৃত্তি হয়েছে এবং হচ্ছে, ভবিষ্যতে আরও হবে।
বিশ্বব্যাপী সংস্কারের ব্যাপকতা
বড় ধরণের ঝাঁকুনি দিয়ে মেহনতী মানুষের মুক্তির সনদ ‘রেড বুক্‌স’ খ্যাত দি কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো ও ডাস ক্যাপিটল নিয়ে এসেছিল কমিউনিজম। মোটামুটি সম্মানজনক একটি সময় পার করে বিদেয় নিলেও সংস্কারের মাধ্যমে স্বগর্বে টিকে থাকা চীনের প্রাচীরের বর্ধিষ্ণু অর্থনৈতিক প্রসারতা ও কম্যুনিষ্ট ফিডেল ক্যাষ্ট্রোর অট্টহাসি নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ঊদ্ধত হাতের প্রদীপে কাঁপন ধরিয়ে দেয়।
হাল আমলে এশিয়ার সংস্কারের স্বপ্ন দেখেছিলেন মাহাথিরের এক সময়ের সবচে’ কাছের মানুষ আনোয়ার ইব্রাহিম। বিধ্বস্ত অর্থনীতি ও জাতিগত দ্বন্দ্বে লিপ্ত দুর্বল দেশটিকে একের পর এক সংস্কারের মাধ্যমে স্বপ্নের দেশে পরিণত করলেন এই জুটি। মাহাথিরের সাথে তিক্ত সম্পর্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত অত্যন্ত জনপ্রিয় উপপ্রধাণ ও অর্থমন্ত্রী ১৯৯৬ সালে এশিয়ার পূণর্জাগরণ নিয়ে লিখলেন ‘দি এশিয়ান রেনেসান্স্‌ (The Asian Renaissance)’। মোট নয়টি অধ্যায়ে তিনি সুনিপূণভাবে তাঁর সুনির্দিষ্ট ভিশন তুলে ধরলেন কিভাবে এশিয়ার অগ্রগতি ও উন্নয়নের প্রক্রিয়া নিজস্ব কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের সাথে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক নৈতিকতার (Socio-ethical) মধ্যে জৈবিক সম্পর্কের মাধ্যমে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। এর যে সফল বাস্তবায়নও সম্ভব তা বাহ্যিকভাবে হলেও ইমার্জিং টাইগারের টুইন টাওয়ার, মিনারা কুয়ালালামপুর, কেএল এয়ারপোর্ট, গেন্টিং হাইল্যান্ড ইত্যাদি দেখলে যে কারও আঁচ করতে কষ্ট হয় না। পরস্পরের প্রতি চরম বৈরী ভাবাপন্ন তিন জাতি (মালয়, চীনা ও তামিল) কিভাবে এক ঘাটে পানি পান করে তা তিনি চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন ‘মালয়েশিয়া বোলেহ্‌ (Malaysia Boleh)’ অর্থাৎ মালয়েশিয়া পারে।
কর্ণেল গাদ্দাফীর ‘দি গ্রীণ বুক” লিবিয়ানদের ৩২ বছর আগে ঊল্লসিত করলেও এখন আর করে না। আপসরফা আর সমঝোতার পথ ধরে চলতে চলতে আলহামরা সদৃশ দূর্ণীতির প্রতীক তাবুতে থাকা ক্লান্ত এক সময়ের প্রিয় বিপ্লবী, অথচ
বর্তমানের জগদ্দল পাথর দেশটির স্বঘোষিত এই ‘লিডার’। আমাদের মোয়াম্মার এখন ‘তুয আমেরিকা’ বলে গালি দেয়া একদম ভুলেই গেছেন!
অন্যের প্রেসক্রিপশন ধরে চললে যে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে তা পাক প্রধাণ জেনারেল মুশাররফের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। সংস্কারের রাজনীতি করতে গিয়ে একের পর এক ভুল পদক্ষেপ মানুষটিকে হিংস্র ও বর্বর বানিয়ে দিয়েছে। সম্পূর্ণ সরকার নিয়ন্ত্রিত খোদ রাজধানীর বুকে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের অনতিদূরে লাল মসজিদে আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত জংগীবাদের রহস্যজনক ঊথ্যান এবং তা দমনের কালো অধ্যায় হয়তোবা শেষ নয়। বরঞ্চ বলা যেতে পারে এটি রুগ্ন পাকিস্তানের অতি করূণ অধ্যায়ের পূর্বের ক্ষেত্র প্রস্ততি, অন্য কথায় দেশটিকে না জানি শেষতক শুধুমাত্র অখন্ডত্ব রক্ষা করাতেই ব্যতিব্যস্ত রাখবে সর্বক্ষণ।

প্রতি শতকেই আধুনিকতার সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারে এমন ধারণা ও গবেষণা নিয়ে অনেক ইসলামী সংস্কারকদের আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁদের অনেকেই শাসকদের কোপানলে পড়ে আজীবন জেল খেটেছেন, ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলেছেন, আগুনে পুড়েছেন, হত্যা নির্যাতন এমন কি বিষপানেরও শিকার হয়েছেন।
গেল শতাব্দীতে এঁদের মধ্যে সাইয়েদ কুতুব ও মাওলানা মওদূদী এবং ভিন্ন মেরুর মাওলানা মোহাম্মদ ইলিয়াসের প্রভাব বর্তমানেও লক্ষ্যণীয়।
প্রথম দু’জনের লিখিত বিশাল সাহিত্য ভান্ডার থাকায় তাঁদের অনুসারীদের মধ্যে বিভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানে থেকেও সংস্কারের সুর্নিদিষ্টিতা ও অভিন্নতা রপ্ত করতে দেখা যায়। বিশ্বব্যাপী আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও প্রগতিমণাদের একদল সুসংগঠিত ও দূর্ণীতিমুক্ত অনুসারী সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে তা জিদ না ধরে কঠিন সত্যটি সহজ ভাবে না হলেও স্বীকার করে নেয়াই বোধ হয় এ মুহুর্তে সমীচিন হবে। ইসলামপন্থী হয়েও জাতির বিভক্তি ঠেকাতে এঁদের অনুসারী জনপ্রিয় বর্তমান তুর্কী নেতৃবৃন্দ দেশটিকে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের মডেল বানাতে চরম বৈরী মতাদর্শ সেক্যুলারিজমের পক্ষে কথা বলতেও কার্পণ্য করেন না। সাম্প্রতিক হয়ে যাওয়া ব্যাপক আলোচিত ও শিক্ষণীয় নির্বাচন সম্পর্কে মুল্যায়ন করতে গিয়ে সেদেশের নির্বাচক বিশ্লেষকেরা লিখেছেন, হেডস্কার্ফ পরিহিতা মহিলা ও উৎসর্গীকৃত লম্বা দাড়ি-মোচ ওয়ালারাই শুধু নয় সেক্যুলার ব্যাকগ্রাউন্ডের অর্ধেকেরও বেশী ভোটার তাদের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর শ্ত্রু শাসক দল জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে ভোট দিয়েছেন বর্তমান সরকারের বিদ্যমান সংস্কার, বিজনেস-ফ্রেন্ডলি এবং ইউরোপের প্রতি উদার কর্মসূচীর ধারাকে অব্যাহত রাখতে, যা কি না তাদের নিজ দলসমূহ ১৯৫০ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত পারেনি।
মুসলমানদের সবচে’স্পর্শকাতর ইস্যু হিজাব নিয়ে তারা সস্তা, বোগাস ও সেকেলে আন্দোলনের ডাক দেয়ার পরিবর্তে বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে সহজ সমাধানের পথ খোজেন। সংবিধানে বাধা থাকায় স্বচ্ছ ইমেজের এই ক্যারিশ্‌ম্যাটিক লিডাররা হিজাব পরিহিতা আপন স্ত্রীদেরকে সরকারী তাবৎ অনুষ্ঠানাদি এমনকি মন্ত্রীদের জন্য বরাদ্দকৃত প্রাপ্য সরকারী বাসভবন থেকে নিরাপদ দুরুত্বে রেখে, অন্য কথায় অতি মাত্রায় বিপ্লবী না হয়ে অথবা জেনারেলদের পাতানো ফাঁদে পা না দিয়ে তুর্কী জনগণকে আশংকামুক্ত করেছেন যে মুক্তবুদ্দির ঐতিহাসিক এই দেশটিকে তারা বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত ‘সেকেন্ড ইরান’ বানাবেন না।
শেষেরজন মাওলানা ইলিয়াসের অনুসারীদের মধ্যে সংস্কারের উপস্থিতি তেমনভাবে দেখা না গেলেও ‘দি ব্লু বুক’ খ্যাত ফাজায়েলে আমলের প্রভাবে পরমতসহিষ্ণুতা ও নিজ বিশ্বাসে একনিষ্ঠতার কারণে চরম প্রতিকূলতাকেও তারা বাধা মনে করেন না।
প্রেক্ষিতঃ বাস্তবতায় বাংলাদেশ
রাজনীতিতে সংস্কারের হাওয়া বাংলাদেশে অনেকবার এলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাগ্য পরির্তন করতে এটি কতটুকু সক্ষম হয়েছে তা আজ মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এক ডজনেরও বেশী পরিবারের মধ্যে সংস্কারকে সর্বজনগ্রাহ্য ও স্থায়ী অবকাঠামোতে রুপ দেওয়ার অপার সম্ভাবনা এলেও একদল দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বা ভিশনারী লিডারশীপের অভাব আজও দারুণভাবে প্রকট। অজপাড়া গাঁয়ের চা-ষ্টলের আধা শিক্ষিত একজন কৃষক চায়ের চুমুকের সাথে সাথে পেন্টাগনের ভবিষ্যত পরিকল্পনা গলা না খাকিয়ে বলে দিতে পারলেও আমাদের দেশের তিনযুগেরও বেশী সময় সক্রিয় থাকা পোড় খাওয়া ফুলটাইম পলিটিশিয়ানরা বলতে পারেননা ক্ষাণিক পরেই তাদের নিজ দেশে এমনকি খোদ তার নিজ ললাটে কি ঘটতে যাচ্ছে। তৎকালীন আমেরিকার ঢাকাস্থ রাস্ট্রদূত এবং বর্তমানে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের দায়িত্বে থাকা আমেরিকার সিনিয়র পলিসি স্কলার ঊইলিয়াম বি. মাইলাম আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে যখন তৃতীয় শক্তির ক্ষমতায় আসার আশংকা করেছিলেন তখন আমাদের দেশের দেশপ্রেমিক (!) পলিটিশিয়ানরা তাকে সস্তা গালি না দিয়ে আত্মসমালোচনায় ব্রত হলে আজ তাদেরকে হয়তো প্রতিদিন জেল আর হাসপাতালে যাওয়া আসা করতে হত না কিংবা দোয়া দরুদের বই, তসবিহ ও জায়নামাজে বসে সারাদিন কাটাতে হত না।
সময়ের পরীক্ষায় ঊত্তীর্ণ বন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভাব বাংলাদেশের জন্য যেমন সত্য, সস্তা বিরোধীতা করে কারও যে অকল্যাণ বৃদ্দি করা যায় না সেটিও সমানভাবে সত্য। ইন্ডিয়া যেখানে আগামী শতকে এশিয়ার নতুন পরাশক্তি হওয়ার বাস্তবভিত্তিক টার্গেট নিয়ে নিরলসভাবে সব সেক্টরে প্রাণান্ত পরিশ্রমে ব্যস্ত, আমরা সেখানে পল্টন ময়দানে লাখো লোক জড়ো করে অচল ধারার রাজনীতি আঁকড়ে ধরে রাজপথ প্রকম্পিত করি। পদার্থ বিজ্ঞানের একটি সহজ সমীকরণ হলো, কাজ=বল x সরণ। অর্থাৎ কোন বস্তর উপর বল বা শক্তি প্রয়োগের ফলে যদি এর সত্যিকারের সরণ না হয় বিজ্ঞান তাকে কাজ বলে স্বীকৃতি দেয় না। মাঝি তার নৌকা ঘাটে বেধে সারাদিন বয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘেমে গেলেও এর ফলপ্রসু সরণ না হওয়ায় বিজ্ঞান একে কাজ বলে না।
মেধা, মনন ও গবেষণা বিকাশের জন্য কোন টেকসই (Viable)ইনস্টিটিউশন করতে আধিপাত্যবাদী ভারত কিংবা সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা আমাদের হাত জাপটে ধরে না। পাশ্চাত্য যেখানে রিসার্চের জন্য কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে আমরা সেখানে এর মূল ঊপকরণ কম্পিউটারের দাম বাড়ায়ে দিয়ে এর পথ রুদ্ধ করি।
ইন্ডিয়া ও চায়না আজ আমেরিকার চাকরির বাজারে ‘সেকেন্ড হোম্‌স’ হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছে। বিগ ত্রি অটোমোবাইল কোম্পানী (Ford, Chrysler, GM) থেকে শুরু করে ইঞ্জিনিয়ারিং ও আইটির সিংহভাগ প্রজেক্ট আমেরিকার তুলনায় সস্তা দামে ওইসব দেশে দেদারছে চলে যাচ্ছে। ইন্ডিয়ার হাজার হাজার ছাত্র/ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩য় বা ৪র্থ বর্ষে পড়াকালীন অবস্থায় সহজেই চাকরির বাজারে প্রবেশ করে আমেরিকার সাথে দিন-রাত্রির ব্যবধান ব্যাপক হওয়ায় কাজের সাথে সাথে তারা পড়ালেখার পাঠটিও অনায়াসে পুষিয়ে নিতে পারছে। গত পাঁচ বছরে দেশটিতে যুবকদের বিদেশমুখী প্রবণতার সূচক নাটকীয়ভাবে নিম্নগামী। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রবাসী ছেলেরা দেশে বিয়ে করতে গিয়ে পাত্রীদের নিকট থেকে অভিনব শর্তের সম্মুখীন হচ্ছে। ‘দেশে একেবারে ফেরত আসতে হবে’ এরকম মুচলেকা না দিলে বিয়ে করবে না বলে বেকে বসছে দেশটির একবিংশ শতাব্দীর পাত্রীরা। অতি নিকটতম প্রতিবেশী দেশ হয়েও আমরা বর্তমান যুগের ফাস্ট কমিউনিকেশেনের একমাত্র মাধ্যম ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সার্ভিসকে আজও আমদের ছাত্রদের দোড়গোড়ায় পৌছে দিতে পারিনি কিংবা কারও কোন পরিকল্পনার কথাও শুনিনি।
অদূরদর্শী ও বায়বীয় নেতৃবৃন্দ এবং আমাদের চাওয়া
গ্লোবাল ভিলেজের এই যুগে দুনিয়ার অগ্রগতি সম্মন্ধে বোধহীন এরকম নেতৃত্ব বেশীদিন টিকতে পারে না। বর্তমানের
জরুরী অবস্থা যে তারই অনিবার্য পরিণতি তা আমরা ছয় মাস আগে না হলেও এখন খুব সহজেই বুঝি। কিন্ত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ধ্বংসের পরিণতি যে কি ভয়াবহ হতে পারে তা আমরা এখনো বুঝিনা অথবা বেশী বুঝি বলেই করছি। সোমালিয়া কিংবা রূয়ান্ডা (ইরাক, আফগানিস্থানের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম) হওয়া ঠেকানোর জন্য সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, পরিপক্ক ও দূরদর্শীসম্পন্ন রাজনীতিবিদদের যথেষ্ঠ দরকার। কারণ অরাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, আরও খোলাসা করে বললে হঠাৎ করে রাজনীতিক বনে যাওয়া জেনারেলরা (দু’একজন বাদে) দুনিয়ার কোথাও ভাল কোন উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেননি। আর পারার কথাও না। কারণ, তেতুঁল গাছ থেকে তো ফজলী আমের আশা করা অরণ্যে রোদন মাত্র!

কেউ যদি বর্তমান অবস্থাকে দেড়শ বছর আগের পলাশী যুদ্ধের পূর্বের অবস্থানের সাথে তুলনা করেন তাকে আমরা দোষ দিতে পারিনা। কারণ একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধের ধরণ শুধু কামান, গোলা বারুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্রের নতুন নতুন সংগা খুঁজে বের করার ও মুসলিম বিশ্বকে ‘নির্দোষভাবে’ ওয়াচ্‌ করার জন্য ‘সিনিয়র পলিসি স্কলাররা’ রিসার্চের ‘কেইস স্টাডি’ হিসাবে যে নতুন নতুন ‘গিনিপিগসমূহের’ সন্ধানে ব্যস্ত, তা বোধ করি আজ আর গোপন নয়। দৃশ্যমান জগতের বাইরেও চরমভাবে সক্রিয় থাকা অদৃশ্য জগতের বিনিসূতোর মালার যে কি প্রভাব তা আমরা নিশ্চয়ই গত বছরের শেষ কোয়ার্টারে ভাইসরয়দের নির্ঘুম মুভমেন্টে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি!
নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিসমূহ (যারা রাজনীতির প্রতি চরমভাবে বীতশ্রদ্ধ, আর তা হওয়ার যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণও রয়েছে, বিশেষ করে আমাদের দেশে) জটিল ও কূটিল রাজনৈতিক বিষয়সমূহের সমাধান বা তা মোকাবেলায় হাইজেনবার্গের নিগুঢ় রহস্য ল’ অফ আনসার্টেনিটি (Law of Uncertainty)-র মত মাইনাস প্লাস ফর্মুলার দিকে না গিয়ে যদি সমস্ত সেক্টরে শক্ত প্রশাসনিক অবকাঠামো তৈরি, সত্যিকারের সেবা ও জবাবদিহীমূলক আইনের শাসন এবং সর্বোপরি নৈতিকতার সুকুমার বৃত্তসমূহের পরিস্ফূটনের জন্য টেকসই ইনস্টিটিউশন গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন তা জাতির জন্য অনেক বড় পাওনা হবে বৈকি। এক হিসেবে দেখা গেছে, কোন দেশের শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ অনিয়ম হয় মানবীয় দোষত্রুটির কারণে আর বাকী ৮৫ ভাগই হয় ভাল সিস্টেমের অভাবে। আমরা জানি, উন্নত দেশসমূহে নেতৃবৃন্দের পরিবর্তনের সাথে সাথে আভ্যন্তরীন প্রশাসনিক অবকাঠামোর কোন পরিবর্তন সাধিত হয়না। বরং নেতৃবৃন্দদেরকেই বিদ্যমান পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে চলতে দেখা যায়। ফলতঃ দুর্ণীতি, অনিয়ম, অবিচার যাই বলি না কেন তা রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করতে পারে না। তাই বলা যায়, সংস্কারের নামে বড় বড় দলসমূহ ভেঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল ও অপরিপক্ক নেতৃবৃন্দের উদ্ভব ঘঠানো এবং তাদের দিয়ে পরবর্তী পার্লামেন্টে নিজেদের রেটিফাই করার বা দূর্বল ও ভংগুর কোয়ালিশন সরকার বানানোর প্রচেষ্টা খুব যে একটা স্থায়ী সমাধাণ নয় তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ দ্রুত বুঝলে তা হবে দেশের জন্য অতি মংগলজনক। আর না বুঝলে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে স্থায়ী অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে সবার প্রিয় এই দেশটিকে এবং আধুনিক মীরজাফররুপে আমাদের সবাইকে অরক্ষিত স্বাধীনতার পাহাড়াদার হিসেবে হয়তো ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়ে জায়গা করে নিতে হবে।
আজরাইলী প্রতারণা
পরিশেষে বন্ধুপ্রবর সিরাজের নিজস্ব ব্লগে মিশরীয় এক বন্ধুর সত্য ঘটনা ‘আজরাইলী প্রতারণা’র বর্ণনা দিয়েই আজকের আলোচনার সমাপ্তি টানবো।
কায়রোর রাস্তায় এক ট্যাক্সি চালক যাত্রী খুঁজছিলেন। এক জায়গায় অপেক্ষমান একজন যাত্রী দেখে তিনি তাকে তুলে নিলেন। একটু সামনে এগিয়েই চালক দেখতে পেলেন ধবধবে সাদা আলখেল্লা পরিহিত অন্য আরেকজন সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক ক্যাবের অপেক্ষায় হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছুটা আবেগাপ্লুত হয়ে ট্যাক্সি চালক ভদ্রলোকের পাশে গিয়ে গাড়ী থামালেন। ভাবলেন, গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে একজন ভালো মানুষের উপকার করি ।
এদিকে হঠাৎ গাড়ী থামানোতে ভেতরের আসল যাত্রীর ভীষণ রাগ হলো, ট্যাক্সি থামানোর কারন জানতে চাইলেন। অবশ্য ইতোমধ্যেই সাদা-পোষাকধারী আগন্তক সামনে চালকের পাশের আসনে আরাম করে উঠে বসে পড়েছেন।
ট্যাক্সি চালক আসল যাত্রীকে বললেন, আমি এই যে এ ভাইটিকেও নামিয়ে দিয়ে আসি।
পরের অংশটুকুর জন্য এখানে ক্লিক করুন ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28726589 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28726589 2007-08-19 15:37:35
দেশ বিদেশে সংস্কার, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব এবং আজরাইলী প্রতারণা-২ তবে তার ভাব দেখে মনে হলো না যে তিনি নতূন কোন যাত্রী গাড়ীতে উঠতে দেখ্‌ছেন। কিছু না বলে যাত্রী বেচারা চুপ করে রইলেন।
সামনের আগন্তক যাত্রী নিঃসংকোচে চালককে বলতে লাগলেন, "আমি আজরাইল - মউতের ফিরিশতা, যমদূত! তুমি ছাড়া ঐলোক আমাকে দেখতে পাচ্ছেনা। সুতরাং তার কথা গায়ে না মেখে চলতে থাকো।"
এবার কম্পিত ট্যাক্সি চালক পেছনে যাত্রীর দিকে একনজর তাকিয়ে দেখলেন এবং তাঁর মনে হলো সত্যিই ঐলোক তার পাশে বসা আজরাইলকে দেখতে পাচ্ছেনা। কারন সে তাদের দুজনের আজরাইলী কথাবার্তার মাঝেও নির্বিকার ভংগিতে বসে আছে; মনে হয় কোন কথাই তিনি শোনেননি। এতে করে চালকের মাঝে দৃঢ প্রত্যয় জন্মাল যে ইনি নিশ্চয়ই আজরাইল!
এদিকে ট্যাক্সি চালককে আজরাইল রাখঢাক না করে সরাসরি বলে ফেললেন, আজই তাঁর মউত। সময় নেই, একটু পরেই তাঁর প্রিয় জানটিকে কবচ্‌ করে নেয়া হবে।
ক্ষণিক পর পথে তাদের সামনে পড়লো এক মসজিদ। আজরাইল তখন বললেন, "দেখ, একটু পরেই তো তোমার মউত, তাই তার আগেই আসরের নামাজটা সেরে নাও।" উল্লেখ্য তখন ছিল আসরের সময়।
বেচারা ক্যাবী নিশ্চিত মউতের আগে খোদার বন্দেগীর এ সুযোগ হাত ছাড়া করতে চাইলেন না। পেছনের যাত্রীকে কোনমতে রাজী করিয়ে তিনি গাড়ী পার্ক করে মসজিদে গেলেন ।
মিনিট দশেক পর ট্যাক্সি চালক ফিরে এসে দেখেন আজরাইলরুপী চোরটি তাঁর জান নিয়ে নয় বরং অন্য যাত্রীসহ তাঁর অতি
কষ্টের টাকায় কেনা পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস প্রিয় গাড়ীটি নিয়েই কেটে পড়েছে।
যমদূত আজরাইলের মুখোশ ধারণ করে ছিচ্‌কে চোর একটি ট্যাক্সি ক্যাব নিয়েই হয়তো সন্তুষ্ট ছিল, কিন্ত সত্যিকারের আজরাইল যদি কারজাইয়ের বেশে উড়ে এসে গোটা দেশটাকে নিয়ে কেটে পড়ে, এবার পলিটিশিয়ানরা শুধু নয় গোটা জাতিকে সাথে করে আমাদের সবারই জায়নামাযে বসে তসবীহ জপা ছাড়া করার কিছুই আর থাকবে না
*আমার এ লেখাটি দৈনিক যায়যায়দিন ছেপেছে

ক্লিক করুন ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28726588 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28726588 2007-08-19 15:34:25
কানাডায় ইমিগ্রেশন ও নতুন জীবন সূচনার চ্যালেঞ্জ প্রায় ১ কোটি ব.কি.মি’র বিশাল দেশ কানাডা। জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটিরও নীচে, বৃদ্ধির হার অত্যন্ত কম (০.৯%), পাশে আবার আমেরিকার বিশাল বাজার। সব মিলিয়ে দেশটিতে মানুষজনের সংকট সব সময় লেগেই থাকে। সুন্দর ও সহজ ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে সারা বিশ্ব থেকে বিভিন্ন জাত, ধর্ম, বর্ণ, মত ও পথের মানুষদের এদেশটি যেন এক মিলনমেলা! হাইওয়ের দু’পাশে হাজার হাজার মাইল খোদার বিস্তীর্ণ অনাবাদী ও উদার জমিন দেখে মনে হয় দেশটি যেন চায়না, ভারত ও বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী জনবহুল দেশ সমূহের মানুষদের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে পৃথিবীর জনসংখ্যার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্যে। সবার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সরকারের সদয় আচরণ ও সহযোগিতা অভিবাসী হওয়ার জন্য দেশটি তাই বাড়তি মনোযোগ কাড়তেও সক্ষম হয়েছে।

কানাডায় ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা
বাংলাদেশ থেকে বেশীর ভাগ মানুষই এদেশে আসে দক্ষ শ্রমিক ও পেশাজীবি (skilled workers and professionals) শ্রেণীভুক্ত হয়ে। স্বামী, স্ত্রী উভয়েই শিক্ষিত পরিবারের জন্য আলাদা কিছু সুবিধা রয়েছে। আবেদন
করার জন্য আবেদনকারী নিজেই যথেষ্ট। কোন কন্সালটেন্টকে জিজ্ঞেস করার চেয়ে প্রয়োজনীয় যে কোন তথ্যাদির জন্য
সরকার নিয়ন্ত্রিত অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (http://www.cic.gc.ca/english/index.asp) এ ব্রাউজ করা ও বুঝাই বেশী নিরাপদ। কারণ, সরকার আবেদনের শর্তাবলী মাঝে মধ্যেই পরিবর্তন করে এবং সেসব ওয়েবসাইটে আপডেট করতে এক মূহুর্তও বিলম্ব করেনা। অবশ্য বৈধ রিপ্রেজেন্টেটিভের মাধ্যমে আবেদন করার ব্যবস্থাও বিদ্যমান।

বর্তমানে প্রার্থীকে যোগ্য হওয়ার জন্য সর্বমোট ন্যূনতম ৬৭ নম্বর পেতে হবে। এই নম্বর নিরুপণের জন্য আবেনকারীকে নিজের এসেস্‌মেন্ট করা অত্যন্ত জরুরী। সংক্ষেপে নম্বরগুলো মোটামুটি এরকম, শিক্ষায় সর্বোচচ ২৫ (মাস্টার্সসহ মোট ১৭ বছরের লেখাপড়া থাকলে ২৫, ১৬ বছরের শিক্ষাসহ মাস্টার্স থাকলে ২২), প্রথম রক্তের সম্পর্কীয় কোন আত্মীয় কানাডায় থাকলে অতিরিক্ত ৫, আবেদনকারী স্বামী বা স্ত্রীর শিক্ষায় সর্বোচচ ৫ (মাস্টার্সসহ মোট ১৭ বছরের লেখাপড়া থাকলে ৫, শুধুমাত্র অনার্স বা স্নাতক থাকলে ৪, এবং ১৩ বছরের শিক্ষার জন্য ৩), আইএলটিএস (ILTS) এর ৪টি ব্যান্ড (স্পিকিং, লিসেনিং, রিডিং ও রাইটিং) এর প্রত্যেকটির জন্য আলাদা করে নম্বর (একটি ব্যান্ডে ৭ থেকে ৯ এর মধ্যে পেলে ইমিগ্রেশন পয়েন্ট ৪, ৫ থেকে ৬.৯ এর মধ্যে পেলে ২ এবং ৪ থেকে ৪.৯ এর মধ্যে পেলে ১), বয়সের জন্য সর্বোচচ ১০ (২১-৪৯ বছরের মধ্যে নিজের বয়স হলে) নম্বর, এনওসি (National Occupation Classification)-ভূক্ত চাকরির অভিজ্ঞতার জন্য বছর ভেদে সর্বোচচ ২১ (১,২,৩,৪ বছরের জন্য যথাক্রমে ইমিগ্রেশন পয়েন্ট ১৫,১৭,১৯,২১) নম্বরের ব্যবস্থা রয়েছে ।
স্মর্তব্য, অনেকেই কানাডায় থাকা পরিচিতজনদেরকে রক্তের সম্পর্কীয় আত্মীয় হওয়ার ও চাকরির অফার লেটার যে কোনভাবে ম্যানেজ করার জন্য অনুরোধ করে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দেন। কারণ প্রথমটি অসম্ভব এবং দ্বিতীয়টি শুধুমাত্র তাদের জন্যই সুবিধা যাদের নিজস্ব ব্যবসা বা কোম্পানী রয়েছে।
রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হয়ে রাজনীতিবিদের সাথে আমাদের দেশের অনেক স্বনামধন্য ছড়াকার, নারী নেত্রী, লেখক, কবি-সাহিত্যিক এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেকেই সরকার ও পুলিশ কর্তৃক ভিন্নমতাবলম্বীদের উপর দমননীতির দৃশ্য প্রদর্শন করে এবং টুরিস্ট ভিসায় এসে সর্বস্ব ‘হারিয়ে’ রিফিউজি শ্রেণীতে এদেশে এসে ইমিগ্র্যান্ট হওয়ার চেষ্টা করেন।

দক্ষ শ্রমিক ও পেশাজীবি এবং রিফিউজি শ্রেণীতে গত দশ বছরে এদেশে বার্ষিক ২২ লক্ষেরও বেশী মানুষ অভিবাসী হয়েছে। এ শ্রেণী ছাড়াও ব্যবসায়ী, ঊদ্যোক্তা ও বিনিয়োগী প্রোগ্রামের আওতায় অনেক মানুষজন এসে থাকেন। কোন অভিজ্ঞ দুর্ণীতিমুক্ত ব্যবসায়ী সাড়ে তিন লক্ষ কানাডিয়ান ডলারের সমপরিমাণ সম্পত্তির অধিকারী তিনি ‘ব্যবসায়ী’ (Business) কোটায় এবং যিনি কানাডাতে এসে নিজে কোন একটি ফার্ম কিনে তা চালানোর ক্ষমতা রাখেন তিনি ‘সেলফ্‌ এম্পলয়েড’ শ্রেণীতে আবেদন করতে পারেন।
আট লক্ষ কানাডিয়ান ডলারের সম পরিমাণ সম্পত্তি অথবা কানাডা সরকারের নিকট পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য সূদবিহীন ভাবে ৪ লক্ষ ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে ইনভেস্টর প্রোগ্রামে কোন ব্যবসায়ী আবেদন করতে পারেন। দু’ধরণের ইনভেস্টর প্রোগ্রাম চালু রয়েছে ফেডারেল ইনভেস্টর ও কিউবেক ইনভেস্টর।

অন্য আরেকটি জনপ্রিয় ও সহজ পদ্ধতি হলো ‘ছাত্র ভিসা’র মাধ্যমে এসে ইমিগ্র্যান্ট হওয়া। প্রতি বছর এদেশে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার বিদেশী ছাত্র/ছাত্রী আসে পড়াশোনা করতে। উন্নতমানের শিক্ষাব্যবস্থা ও ইমিগ্র্যান্ট ছাত্রদের জন্য সূদমুক্ত ঋণ (যা ধীরে ধীরে দীর্ঘ দিন ধরে পরিশোধ করা যায়) প্রদানের ফলে ছাত্র/ছাত্রীরা খুব বেশী কষ্টের সম্মুখীন হয় না। অধিকন্ত, সাচকেচুয়ানে ইমিগ্র্যান্ট (http://www.aee.gov.sk.ca ) হওয়ার অপেক্ষাকৃত সহজ নিয়ম কানুন ছাত্রদের ওই প্রদেশে যেতে উতসাহী করে। এদেশে বাংলাদেশী ছাত্র/ছাত্রীরা পড়ালেখা করে এরকম ঊল্লেখযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে টরন্টো (Toronto), রায়েরসন (Ryerson), ম্যাকমাস্টার (McMaster), ওয়াটারলু (Waterloo), ওয়েস্টার্ণ অন্টারিও (Western Ontario), উইন্ডসোর (Windsor), ম্যানিটোবা (Manitoba), আলবার্টা (Alberta), কনকোর্ডিয়া (Concordia), কার্লটন (Carleton), ম্যাকগিল (McGill), ইয়র্ক (York), কেপ ব্রেটন (Cape Breton) এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিগুলো অন্যতম। গুগল বা ইয়াহু সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম টাইপ করে যে কেউই ব্রাঊজ করে সমস্ত তথ্যাদি ভালমত অবহিত হতে পারে। কোন প্রশ্ন থাকলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কন্টাক্ট মেইলে সরাসরি ইমেইল পাঠিয়ে আবেদনকারী সহজেই উত্তর পেতে পারে।

ধার্য কৃত প্রসেসিং ফি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদনপত্র জমা দিলে আবেদনকারীকে একটি ফাইল নাম্বার দেয়া হয়। অসস্মপূর্ণ আবেদনপত্র প্রত্যাখাত হয় না। আবেদনকারীকে জানানো হয় কোন কোন কাগজপত্রের ঘাটতি রয়েছে। সেজন্য, প্রক্রিয়া দ্রত সম্পন্ন করতে চাইলে উচিত কোন একটি ডকুমেন্টের জন্য অপেক্ষা না করে তাড়াতাড়ি দরখাস্ত জমা দিয়ে ফাইল নাম্বারটি নিয়ে নেয়া। উল্লেখ্য, প্রার্থী তার আবেদনপত্রের স্ট্যাটাসও জেনে নিতে পারেন উপরোক্ত অফিসিয়াল বা সরকার নিয়ন্ত্রিত ওয়েব সাইটের মাধ্যমে ।

নির্মম বাস্তবতা
নতুনকে অভিবাসী হিসাবে কানাডা যেভাবে স্বাগত জানায়, বেশীরভাগ ক্ষেত্রে নিজ পেশায় চাকুরির বাজার ঠিক সেভাবেই তাকে ফিরিয়ে দেয়। দেশটি ‘ট্রু কানাডিয়ান’ অর্থাৎ আপনার পরবর্তী প্রজন্মদের নিয়েই ভাবতে বেশী পছন্দ করে। ‘নিছক কানাডায় অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রত্যাশিত চাকুরি নাই, আবার চাকুরি ছাড়া এদেশের অভিজ্ঞতা অর্জনই বা সম্ভব কিভাবে’ এই দ্বন্দ্বে নতুন ইমিগ্র্যান্টদের অনেকেই প্রত্যাশিত চাকুরি খোঁজার শেষ আশাটুকুও পরিত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরকম হাজারো ভাগ্য বিড়ম্বিত অভিবাসী বনি আদমের মর্মস্পর্শী করুণ কাহিনী নিয়ে তৈরি হয়েছে নটকানাডা ডট কম (http://www.notcanada.com) । আদিম মানুষদের মত হাত-পা রশি দ্বারা আবদ্ধ কাষ্ঠ কাঁধে মানুষদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বনান্‌চঞলে সারিবদ্ধভাবে যাত্রার সাথে কানাডার নতুন জীবনের তুলনামূলক প্রচ্ছদ ও একজন ‘ব্যাক হোম’ পিএইচডি ডিগ্রীধারী ট্যাক্সিক্যাব চালকের পরিচয়পত্রের সচিত্র প্রতিবেদন নতুন আবেদনকারীদের ভীতবিহবল করে তোলে। সবার জন্য এসব সমানভাবে সত্য না হলেও ইমিগ্র্যান্ট অভিলাসীকে অবশ্যই নিজের বয়স ও অনাগত জীবনের জন্য প্রাণান্ত সংগ্রামকে মনে রাখতে হবে। প্রত্যাশিত চাকুরির বাজারে নিজেকে যোগ্য করে তোলার জন্য দীর্ঘ ও নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তত থাকতে হবে।
উত্তর আমেরিকার অন্তত একটি ডিগ্রী, নিজের পেশায় লেটেস্ট সফট্‌ওয়্যারে পারদর্শী অথবা ডিপ্লোমা অর্জন, ইংরেজীতে কথাবার্তা বলা , ড্রাইভিং ও পাশ্চাত্যের ইন্টারভিও স্কিল (এর জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বইয়ের নাম হল Knock’em Dead, লেখক হলেন Martin Yate) রপ্ত করা প্রার্থীরা শতভাগ সফল হন। নিজ পেশায় সম্মানজনক চাকুরি নামক সোনার হরিণটি পেয়ে তাঁরা তর তর করে উপরে উঠে যান, পরিবার-পরিজনদের মুখে হাসি ফুটান এবং সেই সাথে স্বদেশের সম্মানও বয়ে আনেন।

কিছু প্রতিবন্ধকতা
বিভিন্ন বিভাগের প্রফেশনাল চাকুরি স্ব স্ব বিভাগের বিভিন্ন এ্যাক্ট (যেমনঃ ইঞ্জিনিয়ার্‌স এ্যাক্ট, মেডিকেল এ্যাক্ট, এডুকেশন এ্যাক্ট ইত্যাদি) দ্বারা রেগুলেটোরি বডি (Regulatory body) কর্তৃক লাইসেন্সিং ও সার্টিফিকেশন প্রদানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। যেমন, একজন প্রকৌশলী নিজের পেশায় প্র্যাকটিস করতে হলে অবশ্যই তাকে প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার বা পি, ইঞ্জ (http://www.peo.on.ca) অর্থাৎ লাইসেন্স নিতে হবে, ডাক্তারদের জন্য মেডিকেল অফ কানাডার কোয়ালিফায়িংয়ের জন্য দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পরীক্ষা (http://www.mcc.ca), একাউন্টেন্টদের জন্য সিএমএ (http://www.cma-ontario.ca), মাধ্যমিক ও উচচ মাধ্যমিক শিক্ষকদের জন্য টিসার্চ সার্টিফেকেট (http://www.oct.ca), আইটি প্রফেশনালদের বিভিন্ন শাখা বা মডিউল ভিত্তিক বিভিন্ন সার্টিফিকেট (http://www.sap.com), ফার্মাসিস্টদের জন্য ফার্মাসিস্ট সার্টিফিকশন (http://www.pebc.ca) ইত্যাদি। এসব প্রক্রিয়া পাড়ি দিতে বেশ দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন পড়ায় অনেকে বীতশ্রদ্ধ হয়ে সহজল্ভ্য নিজের পেশার বাইরের ‘অড জব্‌’ বা কষ্টকর চাকরি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন। অনিশ্চিত ও উট্‌কো ঝামেলার মধ্যে পা না বাড়িয়ে তারা নিজ সন্তানদেরকে যোগ্য করে গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করেন। অনেকে আবার মেনে নিতে পারেন না, বড় অংকের অর্থকড়ি খুইয়ে ফিরে যান আগের ঠিকানায়। তিন বছর আগে বাংলাদেশী এক পরিবার এসেছিলেন টরোন্টোতে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে শুধুই হতাশার কাহিনী শুনে ল্যান্ড করার তিনদিনের মাথায় তরুণ এই দম্পতি ফিরে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় তাঁদের পুরোনো চাকরিতে।

এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, এদেশে প্রায় পঁচাশি ভাগ চাকুরিই পরিচিতদের মধ্য থেকে হয় এবং বাকী মাত্র পনেরো ভাগ হয় ইন্টারনেট বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। তাই পরিচিতজনের পরিধি বাড়ানোর সমস্ত উপায়ই বিশেষ করে বিভিন্ন ইয়াহু গ্রুপ (যেমনঃ ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য bena, আইটি’র জন্য bdcan, মুসলিম প্রফেশনালদের জন্য http://www.mapcanada.com, বৃহত্তর পরিসরে প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিভিন্ন গ্রুপ dahuk, alochona, sonarbangladesh, eshomabesh, shetubondhon ইত্যাদি) ছাড়াও স্থানীয় পেশাভিত্তিক বিভিন্ন এসোসিয়েশনের বিভিন্ন প্রোগ্রামে মাঝে মাঝে অংশগ্রহন করা যেতে পারে। কোন মাধ্যমেই কাজ না হলে বিকল্প পথ হিসাবে কানাডার নাগরিকত্ব গ্রহণ করে অনেকে আবার আমেরিকার প্রফেশনাল চাকুরির বিশাল বাজারে সহজেই প্রবেশ করেন।

বসবাসের জন্য পছন্দনীয় স্থান
দেশী কমিউনিটি, দেশী গ্রোসারী ও হালাল দোকান, মসজিদ, ইসলামিক স্কুল, সহজসাধ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা ও চাকুরির মোটামুটি নিশ্চয়তার ভিত্তিতে বিভিন্ন রাজ্যের বড় বড় শহরে ইমিগ্র্যান্টদের বসতি গড়ে উঠেছে। অন্টারিও’র টরোন্টো, হ্যামিল্টন, লন্ডন, ঊইন্ডসোর ও অটোয়া, কিউবেকের মন্ট্রিয়েল ও কিউবেক সিটি, আলবার্টার ক্যালগেরী ও এডমন্টন, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভ্যানকোভার এবং ম্যানিটোবার উইনিপেগ বৃহত্তর ও জনবহুল শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। এগুলোর মধ্যে টরোন্টো মেগাসিটির সহস্র বাংলাদেশীর পদভারে প্রকম্পিত। বহুমাত্রিক ও বহুজাতিক মানুষের শহর বৃহত্তর টরোন্টোর জনসংখ্যা আধা কোটিরও উপরে যাদের মধ্যে ইমিগ্র্যান্ট ৪৯% এবং দক্ষিণ এশীয় ১০.৩% (অর্থাৎ আড়াই লাখেরও বেশী)। গত ৫ বছরে এই শহরটি একাই সারা দেশের দুই তৃতীয়াংশ (৬৯,০০০) নতুন ইমিগ্র্যান্টদের স্বাগত জানিয়েছে। প্রতিটি শহরেই ফ্রি ইংরেজী শিক্ষার ও নিজ পেশার দক্ষতা বাড়ানোর বিভিন্ন সুযোগও সরকার বিভিন্নভাবে দিয়ে থাকে। যেমন, স্কিল ফর চেঞ্জ, এডাল্ট লার্ণিং সেন্টার ইত্যাদি। পাশাপাশি কেউ উচচ শিক্ষা গ্রহণ করতে চাইলে উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়সমুহ তার হাতের নাগালের মধ্যে পেয়ে যাবে।
তেল ও খনিজ সম্মৃদ্ধ শহর ক্যালগেরীর চাকুরির সাম্প্রতিক ঈর্ষ ণীয় বাজার এবং সব শাখায়ই লোকবলের চরম ঘাটতি ইঞ্জিনিয়ার ছাড়াও নতুন/পুরাতন সব অভিবাসীদের নিকট বসবাসের জন্য শহরটির কদর বর্তমানে অনেকগুণ বেড়ে গেছে।
যথাযথ ও সঠিকভাবে প্রসেসিং করা হলে বাংলাদেশের দক্ষ জনগোষ্ঠী ও ঊল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্রদের কানাডায় ইমিগ্রেশন হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রালয়সমূহ এক্ষেত্রে সহযোগীতার হাত প্রসারিত করতে পারে

*আমার এ লেখাটি দৈনিক যায়যায়দিন ও কানাডার স্থানীয় সাপ্তাহিকী থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
এখানে ক্লিক করুন]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28724248 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28724248 2007-08-05 08:45:00
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাঃ নির্বাচনের পাঁচমিশালি সাংবিধানিকভাবে কানাডার নিরংকুশ ক্ষমতার অধিকারী বৃটেনের রানী তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে মেয়াদবিহীন গভর্ণর জেনারেল নিয়োগ দিয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশক্রমে। অরাজনৈতিক এই পদটি পালাক্রমে এ্যাংলোফোন (Anglophone; প্রথম ভাষা ইংলিশ) এবং (Francophone; প্রথম ভাষা ফ্রেন্‌চ) সমপ্রদায় থেকে মনোনীত করা হয়। হাইতির পোর্ট অ প্রিন্সে জন্মগ্রহণকারী মিশ্যাল জিয়েন (Michaelle Jean) হলেন বর্তমান ২৭তম গভর্ণর জেনারেল। সাংবাদিক, সিবিসি এবং রেডিও কানাডার এক সময়ের নিউজ ব্রড্‌কাষ্টার মিসেস জিয়েন হলেন তৃতীয় মহিলা, দ্বিতীয় ইমিগ্র্যান্ট এবং প্রথম আফ্রো-ক্যারিবিয়ান গভর্ণর জেনারেল। তিনি তাঁর পূর্বসূরীদের মতো এই বলে শপথ নিয়েছেন, ‘আমি এ মর্মে শপথ করছি যে, আইন অনুযায়ী মহামান্য রানী এলিজাবেথ দ্বিতীয়া, তাঁর বংশ এবং তাঁর উত্তরাধিকার এর প্রতি বিশ্বস্থ এবং একান্ত অনুগত থাকব। সুতরাং ঈশ্বর আমাকে সাহায্যে করুন।‘
তিন ধরনের ভোটার রেজিষ্ট্রেশন প্রথা চালু রয়েছে আমেরিকা ও কানাডায়।
১. মোটর ভোটার রেজিষ্ট্রেশন (Motor Voter Registration): যা ড্রাইভার লাইসেন্স দরখাস্ত বা নবায়নের সময় করা হয়ে থাকে।
২. এজেন্সি বেজ্‌ড ভোটার রেজিষ্ট্রেশন (Agency Based Voter Registration): অক্ষম বা অসামর্থ ব্যক্তিবর্গের জন্য সরকারী ফান্ডে পরিচালিত বিভিন্ন এজেন্সীসমূহ এ ধরনের সেবামূলক কাজ করে থাকে।
৩. মেইল-ইন-রেজিষ্ট্রেশন (Mail-In-Registration): প্রভিনশিয়াল বা ফেডারেল ইলেকশন কমিশন সমূহের নির্ধারিত ফরম পূরণ করে পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে নিবন্ধিকরণের ব্যবস্থা।
আইডেন্টি কার্ড বা ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং চাকরি-বাকরি, বাড়ী-গাড়ী, ব্যাংক ইত্যাদিতে লেনদেনের জন্য আরেকটি সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড বা সোশ্যাল ইন্সুরেন্স নাম্বার (SSN, SIN) সবার জন্য বাধ্যতামূলক। এসব কার্ডসমূহে প্রদেয় বারকোডের সাহায্যে কোন ব্যক্তির দৈনন্দিন কর্মপ্রণালী ট্র্যাক করা যায়। ভোট প্রদানের জন্য তাই নির্বাচন কমিশন আলাদা কার্ড ইস্যু করার প্রয়োজন মনে করে না। ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ বা ভোটের গুরুত্ব নাগরিকদের বুঝানোর জন্য সরকার খুব চেষ্টা করে। বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য উদাহরণ টেনে এনে বলা হয় মাত্র এক ভোটের জন্য এসব বিশিষ্ট ব্যক্তি জিতেছেন বা হেরেছেন। যেমন ১৯৯৭ সালে ভারমন্ট স্টেটের প্রতিনিধি সিডনি নিক্সন প্রতিদ্বন্দ্বী রবার্ট এডমন্ডের চেয়ে মাত্র ১ ভোট বেশী পেয়ে প্রথমে আসন দখল করলেও পরে ভোট পুন:গণনায় তাকে হারাতে হয়েছিল ওই এক ভোটেরই জন্য। এমনি করে অন্তত আরও তিনটি ভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করা হয়। তবুও আমাদের দেশের মত জমে না। সেন্টারসমূহের আশপাশে বেঞ্চ পেতে প্রার্থীদের নাম ও ছবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড ধরে শুস্ক মুখে সঙ্গীন এজেন্টদেরকে অপেক্ষা করতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা। কি লড়াইটা না হলো ২০০৪ সালের বুশ-কেরীর রিপাবলিকান আর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে। ভোট টার্ন আউট ষাট পার্সেন্টও ছুতে পারেনি। কানাডিয়ানদের অবস্থা কাজিন আমেরিকানদের চেয়ে একটু ভাল। গত বছরে পল মার্টিন আর স্টিফেন হারপারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে টার্ণ আউট পঁয়ষট্টি শতাংশ ছুই ছুই করেছিল যা আমাদের দেশের গত নির্বাচনের চেয়ে দশ শতাংশ কম। আর কানাডার ইতিহাসে এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। ধারণা করা হয়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইমিগ্র্যান্ট এবং ইউনাইটেড রিলেশন ফ্রন্ট এক সময়ের বিশ্বস্ত বন্ধু লিবারেল প্রধানমন্ত্রী পল মার্টিনকে ঠেকানোর জন্য মাঠে নেমেছিল বিয়ের সনাতনী সংগার পরিবর্তন ও সমকামী অধিকার রক্ষা আন্দোলনে নিজকে সম্পৃক্ত করার জন্য। নিজেকে প্র্যাকটিসিং খ্রিষ্টান দাবী করেও মিঃ মার্টিনকে মাশুল দিতে হয়েছিল দলের ভরাডুবি ও দলীয় প্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দানের মধ্য দিয়ে। প্রার্থীরা গীর্জা, সিনেগগসমুহকে নির্বাচনী প্রচারনার সবচেয়ে পছন্দীয় স্থান হিসেবে বেছে নেন। শনি, রবিবারের ছোট ছোট জমায়েত মিডিয়ার সুবাদে তারা তাদের অভিপ্রায়, প্রতিজ্ঞা ও পলিসি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাঝে পৌছে দেন। মুসলমানদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রার্থীদেরকে শুক্রবারের জুমআর নামাজে সামনের কাতারে বসে খুৎবা শুনতে এমনকি কাউকে নামাজের জন্য কাতারবন্দী হতেও দেখা যায়। বিভিন্নভাবে প্রমাণ দেয়ার চেষ্টা করেন তারাও কোন না কোনভাবে এদেশে ইমিগ্র্যান্ট, হোক না তা দু’একশো বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ কিংবা আফ্রিকা থেকে পূর্ব পুরুষদের দেশান্তরের মাধ্যমে। কেউ কেউ নিজেদেরকে ইব্রাহিমের ধর্ম (Religion of Abraham) বা এক ঈশ্বরের অনুসারী ঘোষণা দিয়ে সব বিশ্বাসীদের ঐক্যবদ্ধ ভোট প্রার্থনা বা দাবী করেন।
রাজনীতি এবং ভোট দুটোতেই উত্তর আমেরিকার ছাত্র/ছাত্রীদের প্রচন্ড অনীহা। রাজনীতির এসব উটকো ঝামেলা বাদ দিয়ে অধিকাংশই জৌলুস জীবন এবং বড়জোড় মানবাধিকার ইস্যু নিয়েই ভাবতে বেশী পছন্দ করে। নগন্য সংখ্যক (তাও শুধুমাত্র ল’ বিভাগের) ছাত্র-ছাত্রীরা রাজনীতিকে পেশা হিসেবে ধরে ক্যারিয়ার ডেভলপের জন্য অগ্রসর হয়। আফগানিস্তান দখলের সময় আমেরিকান ছাত্রদের মধ্যে একটা জরিপ চালানো হয়েছিল শক্র এদেশটির ভৌগোলিক অবস্থান জানার জন্য। শতকরা ষাট ভাগই সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। জবাবের মোটামুটি ধারনা ছিল, মহাশক্তিধর আফগানিস্তান নামক এদেশটি তাদের আশপাশের কোন প্রতিবেশী রাষ্ট্র হবে!

*লেখাটি দৈনিক নয়াদিগন্তে প্রকাশিত হয়েছে।
ক্লিক করুন]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28724247 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28724247 2007-08-05 08:41:01
বিভেদ ও লেজুড়বৃত্তির কবলে প্রবাসের রাজনীতি
হাজার মাইল দূরে এসেও আমরা আমাদের ভেতরের পূর্বের খারাপ স্বভাবের তেমন পরিবর্তন করতে পারছি না। ২০০১ সালে একটি দলের অন্যতম একজন শীর্ষ নেতা মিশিগানের একটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে এসে অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন। বিক্ষোভ মিছিল, কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয় প্রতিষ্ঠানের সামনেই। তবে আশপাশে টহলরত দীর্ঘদেহী কালো আমেরিকান পুলিশের ভয়ে মিছিলকারীরা দেশীয় স্টাইলে হামলা চালানোর সাহস পায়নি। বিভিন্ন নামে-বেনামে সভা সেমিনার করে দেশের ভিতরকার একান্তই নিজস্ব সমস্যাকে এর আন্তর্জাতিক রূপ দিয়ে ‘বিশ্ব মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ নামে আখ্যায়িত করে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ভিন্ন দেশের কংগ্রেসম্যানদের সামনে বিকৃতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে অহরহ। দলের একান্ত অনুগত প্রমাণ করতে গিয়ে নিজেদের আত্ন-মর্যাদাবোধ ভুলে যাই, স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে জন্মগ্রহণ করেও পরাধীন মনোভাবের আবর্তে নিজেদের জড়িয়ে ফেলি।
বড় দুটি প্রধান দলেরই নিজস্ব নামে বিদেশসমূহে শাখা রয়েছে। এসবের অস্তিত্বের আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কি না তা প্রশ্নসাপেক্ষ হলেও কোনটিতেই আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা হয়না, নিয়মিত কাউন্সিলও হয়না। যদিও মাঝে মাধ্যে করার চেষ্টা করা হয়, তাও পূর্ব থেকেই নেতৃবৃন্দের নিরাপত্তার জন্য দেশের মতই পুলিশ প্রস্তুত রাখতে হয়, নিজ দলীয় ক্ষুদ্ধ কর্মীদের হাত থেকে বাঁচাতে।
স্থানীয় পুলিশ এসবের মর্ম বুঝতে পারে না। অনিচ্ছাসত্বেও কাউকে তৃতীয় বিশ্বের, বিশেষ করে বাংলাদেশের, বিভেদের রাজনীতি বুঝাতে হয়। এভাবে দেশের মান-সম্মান জলাঞ্জলি দিই বিদেশের মাটিতেও। স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার সুযোগ থাকা সত্বেও নিজেদেরকে সম্পৃক্ত না করে, প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট বা কমিউনিটির উন্নয়নের প্রতি অধিকতর মনোযোগ না দিয়ে আত্মবিভেদ-বিসম্বাদে জড়িয়ে পড়ি। একে অপরকে ভালবাসার বা কাছে টানার পরিবর্তে হিংসা-বিদ্বেষের বিষ-বাষ্প ছড়িয়ে দিই পরবর্তী প্রজন্মের মাঝেও। মজার ব্যাপার হলো, ইসলামী দলসমূহ এক্ষেত্রে অধিকতর নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। লজিস্টিক সাপোর্ট দিলেও প্রবাসে কোন দলের সাথে তাদের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নাই। প্রত্যেক দেশেই ভিন্ন নামে স্ব স্ব দেশের নিয়ম কানুন মেনে সরকারীভাবে নথিভূক্ত হয়েই উক্ত সংগঠনসমূহের কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। দেশের বিভেদের রাজনীতি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে এরা স্থানীয় ধর্মীয় সংগঠনসমূহের সাথে মিলে মিশে কাজ করে চলছে।
সামাজিক সংগঠনসমূহের অবস্থানও তথৈবচ। অসাম্প্রদায়িক ও অরাজনৈতিক শ্লোগান দিয়ে ফোবানা (FOBANA) নামে উত্তর আমেরিকায় একটি ছত্রী-সংগঠন (umbrella organization) এর আত্নপ্রকাশ ঘটে ১৯৮৭ সালে। বহু স্থানীয় সংগঠন উদ্যোক্তাদের মধুর আহ্বানে সাড়াও দেয়। কিন্তু এদের কর্মপরিধি বছরে একটি কনভেনশন আয়োজনের মাধ্যমে ছায়ানট, উদীচী আর চলচিত্র তারকাদের এনে শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বৃত্তে আটকে আছে। সেটিও রাজনৈতিক দূরভিসন্ধির কারণে ভেঙ্গে সর্বমোট তিন খন্ড হল এবছর। মোটামুটি একই নামে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তিনটি গ্রুপই প্রায় একই সময়ে কানসাস, ভার্জিনিয়া ও নিউইয়র্কে কনভেনশন করতে যাচ্ছে এ বছরের লেবার ডে’র লং হলিডেতে।
বৃহত্তর পরিমন্ডলে ঐক্যবদ্ধভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকলেও নিজেদেরকে আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গন্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলেছি। নিউইয়র্কের ‘সন্দ্বীপ সমিতি’, বেগমগঞ্জ সমিতি, ডেট্রয়েটের ‘জালালাবাদ সমিতি’, ‘ছাতক সমিতি’, মন্ট্রিয়েলের ‘মৌলভীবাজার সমিতি’ এরকম অসংখ্য ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর সমিতির নামে একই দেশের একই ভাষাভাষী মানুষজন বিভাজিত হয়ে আছে যা অন্যান্য দেশসমূহের প্রবাসী জনগোষ্ঠী থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। দেশের পলাতক, ফেরারী আসামী, স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের গোষ্ঠীগত দলীয় হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্য এসবে ইন্ধন যোগান দিয়ে আসছে।
কিছুদিন আগে প্রবাসীদের ভোটাধিকার সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের বৈপ্লবিক ঘোষণায় ওই একই গ্রুপটি নড়ে চড়ে বসেছিল। কারণ, জ্বাজ্বল্যমান মিথ্যা প্রমাণ দেখিয়ে দেশের মুখে চুনকাম দিয়ে আসা এ গোষ্ঠির অধিকাংশই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত (পলিটিক্যাল এ্যাসাইলাম) সরকারী ভাতার উপর নির্ভরশীল। এ মহলটির জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্যদের মত হাঁড়ভাঙ্গা খাটুনি করতে হয় না। সরকারী সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করে তারা তাদের পুরনো পেশায় ‘ফুল টাইম’ ব্যস্ত থেকে প্রবাসীদেরকে বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত রাখতে সক্ষম হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের উক্ত পদক্ষেপের ফলে বিভেদ বিভাজনের পথ এ মুহুর্তে আরো সহজ হত নি:সন্দেহে।
মনে হয় পরিচ্ছন্ন চিন্তা, সুস্থ্যধারার গণতন্ত্র ও নিজ দেশের মান সম্মান সবার উপরে তুলে ধরার জন্য সাধারণভাবে আমরা এখনও প্রস্তুত হইনি। বরং প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নির্বাচন কমিশন বিদেশসমূহে দেশীয় রাজনৈতিক দলসমূহের লেজুড়বৃত্তি বন্ধের উদ্যোগকে সরকার আইনের শক্ত কাঠামোতে রূপ দিতে পারে। এতে করে, প্রবাসের মাটিতে দেশের নোংরা রাজনীতির চর্চা বন্ধ হবে। দেশের ভাবমূর্তি যারা উচ্চে তুলে ধরতে চান, তাদের জন্য এটি যে বড় সহায়ক হবে তা অবলীলায় বলা যেতে পারে।

* দৈনিক যায়যায়দিন, নয়াদিগন্ত, যুগান্তর, প্রথম আলোসহ আমেরিকা ও কানাডার কয়েকটি স্থানীয় সাপ্তাহিকী এ লেখাটি প্রকাশ করেছিল। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28723998 http://www.somewhereinblog.net/blog/shahin72blog/28723998 2007-08-03 08:48:01