নব্বই দশকের গোড়ার দিকে প্রথম বিলেত আসার পর আপনজনদের জন্য প্রায়ই মনটা ব্যাকুল থাকতো। নিজ জন্মভূমি ও প্রিয়জন ছেড়ে আসার বেদনা শুধু আমি নই, আমার মতো যারা স্বদেশ ছেড়ে প্রবাসী হয়েছেন, তারা সকলেই এই কষ্টের তীব্রতা কিছুটা হলেও অনুভব করেছেন। তারপরও বুকভরা বেদনা ও যন্ত্রণাকে সাথী করে ভিন দেশের সবকিছুর সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে বর্তমানে ইংল্যান্ডে বসবাস করছি প্রায় দেড় যুগের ওপর। যান্ত্রিক জীবনে প্রচন্ড ব্যস্ততা ,তবুও কাজের ফাঁকে ফাঁকে প্রায়ই মনে পড়ে প্রবাস জীবনের প্রথম দিনগুলির কথা, যা এখন কেবলই স্মৃতির তারা হয়ে মনের আকাশে জ্বল জ্বল করে প্রতিদিন। দেশ ছেড়ে সবে মাত্র এসেছি, নতুন পরিবেশ, সবসময়ই খুজঁতাম দেশের গন্ধ, আত্বীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীর খবরাখবর শুনার জন্য মনটা প্রায়ই উদ্বিগ্ন থাকতো।
বর্তমানে প্রযুক্তিগত কারণে যোগাযোগ মাধ্যেম অনেক উন্নত হয়েছে, কিন্তু নব্বই দশকে এখনকার মতো যোগাযোগ মাধ্যেম বিশেষ করে-ই-মেইল আদান প্রদান বা সস্তা কলিং কার্ডের ব্যবহার একেবারেই ছিল না বিধায় চিঠিপত্র এবং ল্যান্ডলাইন ছিল যোগাযোগের মাধ্যেম। তবে আকাশসম পয়সা খরচ করে ল্যান্ডলাইন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল নেহাতেই হাতেগোনা। তাছাড়া তৎকালীন সময়ে এখনকার মতো এতোগুলো বাংলা টিভি চ্যানেলও বিলেতে ছিল না, যার কারণে প্রতিদিন দেশের খবরাখবর জানাও সম্ভব হতো না । সে সময় বৃটেন থেকে প্রকাশিত হতো চার থেকে পাঁচটি সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, আর প্রকাশিত ঐ সাপ্তাহিক কাগজগুলোই ছিল বৃটেন প্রবাসীদের একমাত্র মাধ্যেম যা থেকে উনারা দেশের খবরাখবর পেতেন। বিলেতের মাটিতে বাংলা সাংবাদিকতার বয়স শত বছর পুরনো। আমাদের বাঙালি কমিউনিটির স্বার্থে মাননীয় সম্পাদক এবং প্রকাশকগণ অনেক কষ্ট এবং ত্যাগ স্বীকার করে যথেষ্ট শ্রম দিয়ে যে ভাবে প্রতি সপ্তাহে কাগজগুলো প্রকাশ করছেন তার জন্য অবশ্যই আমরা তাদের প্রতি কৃতঞ্জ, কারণ বাংলা প্রিন্ট মিডিয়ার অনেক অবদান রয়েছে আমাদের কমিউনিটিতে। বর্তমানে দশটা সাপ্তাহিক এবং মাসিক ও ত্রৈমাসিক অনেকগুলো কাগজই বিলেত থেকে প্রকাশিত হচ্ছে, তবে সাপ্তাহিক দশটি কাগজের মধ্যে প্রায় ছয়টি কাগজই পাঠকদের মধ্যে ফ্রি বিতরণ করা হয়। যা সত্যিই একটি প্রশংসামূলক এবং মহৎ কাজ।
আমরা অনেকেই জানি, প্রবাসের মাটিতে একটি কাগজ বের করা সত্যিই কষ্টের ব্যাপার, এরপরও অনেক ঝড় ঝাপ্টা সহ্য করে প্রকাশকরা কমিউনিটির সেবায় যে ভাবে ফ্রি কাগজ বিতরণ করে বিশ্বের খবরাখবর ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন তার জন্য তাদেরকে অবশ্যই ধন্যবাদ ঞ্জাপন করতে হয়। বৃটেন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাগজগুলোর মধ্যে অধিকাংশ কাগজ পড়ার সু-ভাগ্য মোটামোটি প্রতি সপ্তাহেই হয়, তবে ইদানিং কালে একটি ব্যাপার বার বার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেটা হলো- বিলেতের পত্রিকাগুলোতে বাংলাদেশের কলামিষ্টদের লেখা রাজনীতি বিষয়ক সেকেন্ড হেন্ড কলামগুলোর অতিরিক্ত ছড়াছড়ি। যা মাঝেমধ্যে সত্যিই ভাবনায় ফেলে দেয়। আমরা যারা বিলেতে বসবাস করছি, মূলধারার রাজনীতি বা আমাদের কমিউনিটিতে যে সব সমস্যা রয়েছে তা নিয়ে তেমন কোন বিশেষ প্রতিবেদন বা ধারাবাহিক ভাবে কোন কলাম এখানের পত্রপত্রিকায় লিখা হচ্ছে না, আর যতোটাই বা হচ্ছে তা পাঠকদের জন্য পর্যাপ্ত বলে মনে হয় না। বিলেতে মাত্র হাতেগুনা কয়েকজন কলামিষ্ট ও লেখক রয়েছেন, যারা কম বেশি লিখছেন, তবে তাদের অনেকেরই অধিকাংশ লেখাগুলো বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজনীতি এবং অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এখানের মূলধারার সাথে সম্পর্কিত কোন ধরণের লেখা অদ্য তাদের কাছ থেকেও পাঠকরা পাচ্ছেন না।
বর্তমানে বিলেতে প্রতিভাবান ব্যক্তিদের উপস্থিতি কম নয় , যারা লেখালেখি সম্পর্কে মোটামোটি ধারণা রাখেন। কিন্তু এরপর ও কেন জানি কোন এক অদৃশ্য কারণে বিলেতের পত্রপত্রিকায় আমরা নতুন কোন লেখকের লেখার সাথে পরিচিত হতে পাচ্ছি না, তাছাড়াও অধিকাংশ পত্রিকার পাতাগুলোতেও নতুনত্বের অভাব প্রকটভাবে চোখে ধরা পড়ে। ইদানিং বিলেত থেকে যে হারে খবরের কাগজ বের হচ্ছে, সেটা অবশ্যই একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ, কিন্তু এই কাগজের পাশাপাশি নতুন লেখকও সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরী। তা না হলে আমাদের এই কাগজগুলোর আগামী ভবিষ্যত হুমকির মুখে পতিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এখানের পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়াদী নিয়ে দু একটি কলামই পাঠকদের জন্য যতেষ্ট । কারণ বাংলাদেশর বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেল থেকে প্রতি ঘন্টায় টাটকা খবরাখবর এবং নিয়মিত টক শো দেখানো হয়। যা থেকে এখানকার পাঠকেরা অনেক জানা অজানা তথ্য পেয়ে থাকেন। বিশেষ করে বিলেতের পাঠকদের চাহিদার কথা স্বরণ রেখে এখানকার কাগজগুলোতে দেশের কলামিষ্টদের কলামের পাশাপাশি বিলেতের বিভিন্ন বিষয়ের উপর কলাম ছাপানো এবং নতুন লেখকরা যাতে তাদের প্রতিভা বিকাশ করতে পারে সে সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া অত্যন্ত জরুরী বলে মনে করি। এখানে বলা বাহল্য যে, বিলেতে আশির দশকের শেষের দিক এবং নব্বই দশকের শুরুর দিকে কিছু কিছু নতুন লেখক সৃষ্টি হয়েছিল, তারমধ্যে সুরমা ইয়ং রাইটারস, সংহতি, বাংলা সাহিত্য পরিষদ উল্লেখযোগ্য, তবে বর্তমানে বাংলা সাহিত্য পরিষদ (আধুনানিস্ক্রিয়)। নব্বই দশক এর পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে এখন আর তেমনভাবে কোন নতুন লেখক এর উপস্থিতি চোখে পড়ছে না, বিগত বিশ বছর ধরে আমরা মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন লেখক ও কলামিষ্টদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছি। তবে নতুন লেখক সৃষ্টির ব্যাপারে আমাদের মাননীয় সম্পাদক সাহেবদের আন্তরকিতা এবং সময়উপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অচিরেই হয়তো অনেক নতুন লেখকরা বেরিয়ে আসবে। কারণ বিলেত এখন আর আগের মতো নয়, এখানে অনেকেই রয়েছেন, যারা কমিউনিটির বিভিন্ন দিকগুলোর উপর গুরুত্ব আরোপ করে মানানসই কলাম লিখতে পারবেন, প্রয়োজন শুধু একটু সুযোগ ও সহযোগীতা।
আমরা জানি যে, বিলেতে বাংলা মিডিয়ার প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব বিগত কয়েক বৎসর যাবত তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং দু বছর অন্তর অন্তর নির্বাচনের মাধ্যেমে তাদের পরিচালনা কমিটি নির্বাচিত করে আসছে। আর এই ঝাঁকঝমকপূর্ন নির্বাচনকে ঘিরে প্রতিবারই এক ভিন্ন এবং উষ্ণ আমেজ সৃষ্টি হয় লন্ডনের বাংলা মিডিয়া পাড়াতে। তবে প্রেস ক্লাবের এই নির্বাচনের পরে বিভিন্ন সংগঠন আয়োজিত প্রেস কনফারেন্স ও দু একটি ভিন্নধর্মী কর্মসূচীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে দেখেছি। সাংবাদকর্মীদের মানোন্নয়ন কিংবা লেখালেখি সংক্রান্ত কর্মশালার মতো কোন জন্য কোন গুরুত্বপূর্ন কর্মসূচী আমাদের চোখে পড়েনি।যা প্রেসক্লাবের মতো একটি প্রতিষ্টিত প্রতিষ্ঠানের দ্বারা সম্ভব। আমারা মনে করি, কর্মরত সাংবাদিকদের পেশাগত মানবৃদ্ধি এবং নতুন লেখক সৃষ্টিতে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচী গ্রহণ করতে পারে।
একজন পাঠক যখন তার লেখা পত্রিকা অফিসে পাঠান, আর এই লেখাটি যদি সামান্য এডিট করে ছাপানো হয় তা হলে হয়তো ঐ পাঠক দিন দিন লেখালেখির ব্যাপারে আরো সরব হয়ে উঠবেন এবং সময়ের বাঁকে এক সময় হয়তো একজন ভালো লেখক হিসাবেও প্রতিষ্টা পেতে পারেন। আমার জানা মতে কিছ’ লোক আছেন, যারা পত্রিকায় লেখা পাঠিয়ে ফোন করেন, ই-মেইল করেন, অপেক্ষায় থাকেন কিন্তু দু তিন সপ্তাহ পরে যখন তাদের লেখা ছাপা
হয় না তখন আগামীতে লেখা পাঠানোর আগ্রহটুকু তাদের চলে যায় যোজন যোজন মাইল দূর। বৃটেনে বাংলা পত্রিকার পাঠকেরা যারা এখানে বসবাস করছেন, তারা অনেকেই এখানে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া অজানা ঘটনাগুলো এবং যে সব বিষয় নিয়ে কমিউনিটির মানুষেরা নিত্যদিন হোছট খাচ্ছে, সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে সে সব তথ্যমূলক খবরা খবর জানার আগ্রহ রাখেন বেশি। কারণ, দেশের অধিকাংশ খবরাখবর এবং কলাম বিলেতের পাঠকরা এখন ইন্টারনেটের মাধ্যেমে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলো থেকে প্রতিদিনই পড়ছেন। তাই আমরা আশা করব বিংশ শতাব্দির প্রযুক্তিরএই যুগে এখানকার পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের কলামিষ্টদের পাশাপাশি বিলেতের বিভিন্ন ইস্যুর উপর লেখা কলাম ও প্রতিবেদনসহ নতুন লেখক সৃষ্টির ব্যাপারে প্রকাশক ও সম্পাদকগন উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিলেতের শত বছরের সাংবাদিকতায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবেন।
বাংলা টাইমস ৩/১২/২০১০
লন্ডন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

