এমনি এক উন্মাদনায় কাটলো গতরাত। অফিস থেকে বেরিয়ে সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে দেখা হল শাহবাগ মোড়ে। সেখান থেকে সূর্যসেন হলের ক্যান্টিনে গিয়ে রাতের খাবার সেরে বসলাম আড্ডায়। হলের মাঝখানকার এক চিলতে মাঠের ঘাসের চাদরে। আড্ডা চলছিল মাঝি ছাড়া নৌকার মতন। কখনও মাইকেল জ্যাকসন, আবার কখনও নেত্রীদের বিষ খেয়েও বেঁচে থাকাসহ নানা বিষয়ে। হঠাৎ করেই নেমে এল বৃষ্টি, টিপ টিপ করে। আমাদের চারপাশে আরো অনেকেই বসে আড্ডা দিচ্ছিলো। মূহুর্তেই তারা ছুট লাগালো হলের দিকে। আর তখনই জেগে উঠলো মাথার কোন কুঠুরিতে ঘুমিয়ে থাকা সে উন্মাদ। যার উষ্কানিতে আমরা মেতে উঠি উন্মাদনায়। বৃষ্টিকে তুচ্ছজ্ঞান করেই বসে রইলাম মাঠে। সঙ্গে আমার রাতজাগা সঙ্গীরা- পিয়াস মজিদ ( ইনি একজন কবি। অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ! শুরু থেকে প্রাণবন্ত থাকলেও শেষে এসে ঝিমিয়ে পরে প্রতিনিয়তই আড্ডার আমেজ দেন ধ্বংস করে।), মাহফুজ রণী ( ইনি মূলত লেখক, ভূলত কার্টুনিষ্ট। প্রথমে শুরু করেছিলেন লেখালেখি কিন্তু পরে কোন এক অজানা কারণে শুরু করেছেন আঁকাআঁকি। খুবই ভদ্র মানুষ। তবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্তই থাকে তার সরব অংশগ্রহণ।), আপেল মাহমুদ ( ইনি সাংবাদিকতার ছাত্র এবং সাংবাদিক। তবে দুনিয়াতে সাংবাদিকতার জন্য নয়, তার আগমন ঘটেছে বোধহয় খাওয়ার জন্য। সকল ধরণের আড্ডায় তার উপস্থিতি থাকে খুব ভালভাবেই। তবে কোন না কোনভাবে তার অধিকাংশ আলোচনাই মোচড় নেয় খাওয়ার বিষয়ে!)। আর সম্প্রতি আমাদের আড্ডায় এসে যুক্ত হয়েছেন আরো একজন, আবদুল্লাহ আল ইমরান (ইনি বহুমুখি প্রতিভাধারী। গল্প- ছড়া- প্রবন্ধ- পত্র- কবিতা থেকে শুরু করে সাহিত্যের প্রায় সকল গলিতেই তার আনাগোনা। ঢাকায় এসেছেন নতুন। পড়াশোনার জন্য। তার মাঝে রয়েছে ব্যাপক কৌতুহল। সেই কৌতুহলও আবার বিচিত্র সব বিষয়ে। এই হয়তো তার আগ্রহ গাছ বিষয়ে, পরক্ষনেই আবার তা চলে গেল মাছে! মাঝে মাঝে তার কৌতুহল আবার বিরক্তির চূড়ান্ত সীমা ছাড়িয়ে যায় আমাদের। তবে তিনি তা বোঝেন না, তাকে মৃদু ধমক দিয়ে তা বোঝাতে হয়। )।
যাই হোক এদের নিয়ে বসে থাকতে গল্প করতে করতে, টিপ টিপ বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সময়ের কাঁটা চলে গেল রাত একটার ঘরে (নতুন সময় অনুযায়ী।)। এই সময় হঠাৎ করে বললাম, এই সময়ে যদি একটা ধুম বৃষ্টি নামতো। আর বৃষ্টিতে ভেজা যেত বুড়িগঙ্গা নদীর মাঝখানে কোনো ছইছাড়া নৌকায় বসে! তাহলে চমৎকার লাগত। বলা মাত্রই দেখা গেল এ ব্যাপারে সবাই আমার চেয়েও বেশী উৎসাহী। একমাত্র আপেল মাহমুদ বাদে। তিনি বৃষ্টিতে নৌকা ভ্রমণের চেয়ে হলে গিয়ে তার রুমে শুয়ে ঘুমানোর ব্যাপারে বেশী আগ্রহী। অবশ্য এ জন্য তাকে দোষ দেয়া যায়না। একটু আগে যে পরিমানে খেয়েছেন তাতে না ঘুমিয়ে উপায় নেই। সেহেতু তাকে বিদায় জানিয়ে আমরা বাকিরা রওনা দিলাম সদরঘাটের দিকে। বাহন সবার দুইটি করে পা। পায়ের গাড়িতে করে টিপ টিপ বৃষ্টি মাথায় আমরা শুরু করলাম যাত্রা। সূর্যসেন হল থেকে বেরিয়ে বক্সীবাজার দিয়ে নাজিমউদ্দীন রোড হয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌছে গেলাম ইমামগঞ্জ। এই হাঁটাহাঁটির মধ্যেই চলছে আমাদের গালগপ্প। মিডফোর্ড হাসপাতালের সামনে দিয়ে কাঁদাভর্তি রাস্তা পাড়ি দিতে গিয়ে ঘোর লাগা চোখে দেখতে লাগলাম পুরনো ঢাকার সরু রাস্তাগুলোতে মূমুর্ষ রোড লাইটের আলোয় শ্রমজীবি মানুষের ব্যস্ত পদচারণা। রাস্তার এলোপাথারি দাড়িয়ে থাকা ট্রাকের সারি। ওই মানুষদেরও মনে হল অন্যকোন জগতের বাসিন্দা। মরা জোসনায় মধ্যরাতে এই ব্যস্ত এলাকায় চারজন তরুণকে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ঘোরাঘুরি করতে দেখেও তাদের মাঝে কোন কৌতুহল দেখা গেলনা। তারা তাদের মত ব্যস্ত তাদের কাজে। তাদের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে সদরঘাট না গিয়ে ওয়াইজঘাটে চলে এলাম বুঝতে পারিনি। যখন বুঝলাম তখন আর করার কিছু নেই। অবশ্য তা নিয়ে কেউ তেমন একটা চিন্তিতও হলাম না। হোক না ওয়াইজ, না হোক সদর, কিন্তু তারপরও তো ঘাট। নদী তো আছে, আছে নৌকাও। তবে আর ভাবনা কী! দরাদরি করে চড়ে বসালাম একটা মাঝারি সাইজের নৌকায়।
নিচে টলটলে অন্ধকার পানি, মাথার ওপরে কালো মেঘের চাদর। মাঝেমাঝেই বিদ্যুতের ঝিলিক। উথাল বাতাসে ছল্ ছল্ ঢেউয়ে নৌকার দুলুনি। একপাশে ব্যস্ত ঢাকা। অন্যপাশে সারাদিনের কান্তিতে ঘুমে ডুবে থাকা জিঞ্জিরা। নৌকা চলে এল মাঝনদীতে। শুয়ে পড়লাম চিৎ হয়ে। চোখের ফ্রেমে শুধু মেঘলা আকাশ। গুনগুন করে কী নিয়ে যেন আলাপ করছেন রণী আর ইমরান। উদাস হয়ে বসে আছেন কবি, পিয়াস। তার মুঠোফোনে বাজছে গান, ‘শাওনও রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে.............’
আহা কী পরিবেশ! আহা কী শান্তি! বুড়িগঙ্গায় নৌকা। আমরা নৌকায়। রাত্রি নিঝুম। চোখে ঘুম নেই। আকাশ দেখছি। খোলা আকাশ। বহুদিন এমন আকাশ দেখি না। হঠাৎ করে মনে হল আকাশ থেকে দূর্গন্ধ বের হল! ব্যাপার কী! ঝট করে উঠে বসলাম, এখন পাওয়া যাচ্ছে গন্ধ। কিসের গন্ধ? আকাশ থেকে তো আর গন্ধ আসতে পারে না। হঠাৎ চোখ গেল পানির দিকে। বুঝলাম গন্ধের উৎস। কী? আমাদের নদী। আমাদের বুড়িগঙ্গা। ছোটবেলায় বইয়ে পড়েছি, ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত। বইয়ে বুড়িগঙ্গার ছবিও দেখেছি। টলটলে স্বচ্ছ পানির সে নদী। ছোটবেলা এ নদীর নামই জেনেছি প্রথম। তাই এর প্রতি একটা অন্য ধরণের ভালো লাগাও বহুদিনের। কিন্তু এখন এই বুড়িগঙ্গার সঙ্গে, আমার ছোটবেলার সেই বুড়িগঙ্গার কোন মিল খুঁজে পাইনা। এ নদীকে যেন মনে হয় বহু পুরনো। এখন এ নদী আর নদী নয়, ময়লা ডোবা। হঠাৎ মনে হল নদী যেন কাঁদছে। মানুষের নির্মমতায় আমাদের বুড়িগঙ্গা মরে গেছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমার এবং আমাদের। পিয়াস দুঃখ করে বললেন, ধুর নৌকায় বসে নদীর পানি ছোয়া না গেলে নৌভ্রমণের কোন মজা আছে নাকি! না নেই। সেহেতু বুড়িগঙ্গা ভ্রমণ স্থগিত। নেমে এলাম ঘাটে। তবে এবার আর ওয়াইজঘাটে না সদরঘাটে। ঘরির কাঁটা এখন প্রায় চারটার ঘর পেরিয়ে আরো কয়েক মিনিট এগিয়ে গেছে। রাত পোহাবার কত দেরী? আরো বেশ কিছুক্ষণ তাহলে কী করা যায়? আবার হাঁটা। আবার পথে। আবার পুরনো ঢাকার গলিতে। এবার হেঁটে হেঁটে চলে এলাম ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কাছে। পুরনো ঢাকার ব্যস্ত মানুষ মাথা না ঘামালেও এখানকার পুলিশ ঘামালো। আমাদের দেখে এগিয়ে এল কাছে জানতে চাইল গন্তব্য। ভাবলাম বলি জানি না। পরক্ষণেই মনে পড়লো বাঘে ছুলে আঠারো ঘা আর পুলিশ ছুলে ছত্রিশ ঘা। সেহেতু ভদ্রভাবে জানালাম গন্তব্য ঘর। শুনে এক পুলিশ খুব রসিকতা করে বললেন, এত তাড়াতাড়ি? এবার আরো বিনয়ে গদ গদ হয়ে জানালাম, এই আর কী!
পুলিশ হেসে বললেন, যান। সাবধানে যাইয়েন।
পুলিশের এমন সহানুভূতি দেখে খুবই আপ্লুত হলাম। তারপর আবার হন্টন। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম দোয়েল চত্বর। এখন কী করা যায়? হঠাৎ মাথায় এল শহীদুল্লাহ হলের পুকুর ঘাটে গিয়ে বসে থাকি। দাবি উথ্বাপন করলাম। আবারও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহিত হল। সোজা ভেতরে ঢুকে এসে বসে পড়লাম ঘাটে। নীরব এলাকা। সামনে টলটলে পানি। টিপ টিপ বৃষ্টি। চারিদিকে ঝিঝি আর ব্যাঙের ডাকাডাকি। আবার শুরু হল গল্প। তবে এবার আর তেমন জমল না। কারণ আড্ডার চেয়ে আমরা তখন বেশী মগ্ন হয়ে পড়েছি পুকুরে সাতার কাটতে থাকা ধোড়াসাপ দেখতে। ছোট মাঝারি বড় কত সাইজের সাপ। সাপে সাপে একেবারে সাপারণ্য। সাপ সাতার কাটছে হঠাৎ করেই টুপ করে ডুব দিয়ে মাছ ধরছে। এসব দেখতে দেখতে বিচ্ছিন্নভাবে আড্ডা চলছে, এরমধ্যেই ভেসে এল আজান। ঘড়িতে সময় পৌণে পাঁচটা। সবাই হঠাৎ চুপ করে গেল। কিছুক্ষণ পর চেয়ে দেখি ঘাটের সিড়িতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন কৌতুহলী ইমরান। তারপাশে শুয়ে ঘুমিয়ে আছেন সংবেদনশীল কবি পিয়াস। জেগে আছি আমি। আর আমার পাশে ভদ্র রণী। ঘুম নেই আমাদের দুজনের চোখে। তাই এবার শুরু হল আমাদের আড্ডা। ভদ্র রণী আপ্লুত গলায় বলতে শুরু করলেন সামান্য ভূল বোঝাবুঝিতে ভেঙে যাওয়া তার দীর্ঘদিনের প্রেমের গল্প। সে গল্পে মিশে আছে কষ্ট। মিশে আছে হতাশা। আমি সেই গল্প শুনছি চুপ করে। আমি ব্যাক্তিগতভাবে হাতাশাবাদী মানুষ। তার গল্প শুনে আমার হতাশা আরো বাড়তে লাগল। কিন্তু তারপরও আমি রণীকে স্বান্তনা দিতে লাগলাম। আমার স্বান্তনায় হয়তো রণী নির্ভরতা খুঁজলেন। কিন্তু আমি মনে মনে হাসলাম। হায়! মানুষ কী বিচিত্র। আমি নিজেই যেখানে হতাশ। সেখানে আমি অন্যকে শোনাচ্ছি আশার বাণী। যাকে শোনাচ্ছি সেও জানে আমার হতাশার কথা, তারপরও সে এতেই খোঁজে নির্ভরতা। এই অভিনয়ের মানে কী? এইসব মুখোশ পরে কেন ঘুরে বেড়াচ্ছি আমরা, মানুষেরা? জানি না। শেষ রাতে এসে আরো হতাশা ঘিরে ধরলো আমাকে। নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলাম আকাশের দিকে। রণী তার পুরনো দিনের কথা ভেবে ভেবে হয়তো একটু সুখানুভূতি লাভের আশায় চুপ করে গেলেন। পিয়াস ইমরান ঘুমে। একটু আগে শিকারে মত্ত সাপগুলো দেখলাম পুকুর পাড়ের ঝোপগুলোর দিকে চলে যাচ্ছে। এক দুজন মানুষকে দেখা গেল আশেপাশে। জেগে উঠছে পৃথিবী। রাতের শাষণ আমল শেষ। আবারো পৃথিবী পা রাখছে একটা নতুন দিনের দরজায়। আমি আর রণী বসে আছি পাশাপাশি। দুজনেই যেন মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে কিসের খোঁজ করছি। দিনের আলো ফুটছে.........
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০০৯ বিকাল ৪:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



