পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমি সবসময় কিছুটা কট্টর ধ্যান ধরনাই পোষন করতাম , কিছুটা না আসলেই বেশ কট্টর । সেনা বাহিনীর অবস্হান থেকে শুরু করে কিছুটা দমনেও যে আমার সায় ছিলনা তা নয় ।
তাদের স্বায়ত্বশাসনের অধিকার দাবীটাই আমাকে এতটা কট্টর হতে বাধ্য করেছিল । তার পিছনেও আমার যুক্তি ছিল। এতটুকু ছোট্ট একটা দেশ । একে যদি আবার ও টুকরা করার চেষ্টা শোনা যায় তাহলে আমার মাথা একটু বিগড়ানোটাকে আমি সাপোর্টই করেছিলাম। কারন এমনি করে এক এক সময় এক এক অযুহাতে নানা অংশে শুরু হবে স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলন, যেটা এই ছোট্ট দেশটাকে বারেবারে শুধু আগুনেই পোড়াবে আগানো আর হবেনা। আমি সবার শান্তিপূর্ণ সহাবস্হানেই বিশ্বাসী ।
আমরা বাঙ্গালীরা সহ নানা জাতি গোস্ঠীর সবাই মিলে এই বাংলাদেশ- দেশ মাতৃকার পরিচয়ে আমরা সবাই বাংলাদেশী । এটা আমাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে এবং এই বিশ্বাস নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
বিবদমান গোস্ঠী সব জায়গায় আছে থাকবে.....তারা নানা ভাবে তাদের শক্তি বাড়াতে চাইবে, রাষ্ট্রের কাজ তাদের দমন করা এবং বৃহৎ অংশটা দেশের সমর্থনে যাতে থাকে সে ব্যবস্হা করা এবং তাদেরকে সবসময় দেশের প্রতি মোটিভেট রাখা। তাদের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সব রকমের সহযোগীতার দায়িত্ব সরকারের।
পাহাড়ে আমি অনেকবার গিয়েছি। আমি আমার নিজের ভূমি ভেবেই গিয়েছি, নিজের অধিকার বোধ নিয়েই গিয়েছি । । তাদের সাথে খুব বেশী সংশ্লিস্ঠতা হয়ত আমার হয়নি। তবে যেটুকু হয়েছে তাতে আন্তরিকতার কোন কমতি দেখিনি। ২০০১ সালে প্রথম যখন বগা লেকে যায় আমার গাইড ছিল থাম নুয়াম বোম। বোম সম্প্রদায়ের অতি সাধারন এক ছেলে । আমাদের সে নানা পথে ঘুরিয়ে সব বর্ণনা করতে করতে নিয়ে গিয়েছিল গন্তব্যে । আমাদের গ্রাম বাংলার আট দশটি সাধারন ছেলের মতই সে। ও ই একমাত্র ছেলে যার সাথে সময় কাটিয়েছি।
সাধারন মানুষজনকে যতটুকু দেখেছি সাধারনই মনে হয়েছে । পানি চাইলে পানি দিয়েছে, ঘরের কোনে বসেছি, তাদের ছবি তুলেছি, চা বানিয়ে খাইয়েছে...নিতান্তই আমার গ্রামের অতি সাধারন মানুষটির মত, যে কখনো শহুরে মানুষ দেখেনি, শহুরে মানুষের সব কিছুতেই তার বিষ্ময় । অতি সাধারন জীবন তাদের। আলো এখন ও পৌঁছায়নি, কবে পৌঁছাবে সেটা যেমন আমিও জানিনা, সেও জানেনা, এ নিয়ে তার তেমন কোন মাথা ব্যাথাও নেই ।
আমাদের গ্রাম গুলোর কথায় ধরি। তাদের সহজ সরল জীবনে হয়ত হালকা দাঙ্গা হাঙ্গামা ছিলই, কিন্তু তাদেরকে শহুরে ছোঁয়ায় এনে তাদেরকে নষ্ট করেছিত আমরাই। অস্ত্রের ঝনঝনানি থেকে শুরু করে সব কিছু তাদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছি আমরাই।
তেমনি আমাদের সরকারের ভুল ডিসিশানে আজ এই সহজ সরল পাহাড়ীরাও দ্বিধাগ্রস্ত- নানা মতে তাদের পথ চলা।
আমি ইতিহাস বেত্তাও নই, সে সময়ের সাক্ষীও নই। যতটুকু পড়েছি বা জেনেছি তাতে দেখি বঙ্গবন্ধুর সময় থেকেই আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ভুল পথে হাঁটা শুরু । " তোরা সব বাঙ্গালী হয়ে যা " এ থেকেই তার সূত্রপাত কিনা আমি জানিনা, তবে কথাটি আমি মেনে নিতেও পারিনা। আমাকে কেউ আমার পরিচয় ভুলে যেতে বললে তা আমি কোন ভাবেই মেনে নিবনা, এটা মেনে নেয়া যায়না।
আমাদের বঙ্গীয় বদ্বীপ কখনোই শত্রুহীন ছিলনা । আমাদের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র সেই জন্মলগ্ন থেকেই । আপনি যখন আমাকে আমার পরিচয় ভুলে যেতে বলবেন , আর আমি তাতে সায় দিবনা, শত্রু কিন্তু চুপ থাকবেনা। এটাই তার জন্য মোক্ষম সুযোগ আমাকে বাগে আনার। আমার ধারনা পাহাড়ে হয়েছেও তাই । তারা হাতে পেয়ে গেল অস্ত্র , তাক করল আমার দিকেই ।
সংখ্যাগরিস্ঠ হিসাবে এটা আর যায় হউক কেউ মেনে নিতে পারেনা । আমরা বাঙ্গালীরাও পারিনি ।অস্ত্রের মোকাবিলায় আমিও অস্ত্র হাতে ঝাপিয়ে পড়লাম। পরবর্তীতে জেনারেল জিয়াউর রহমান ও এরশাদ এটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেলেন। সেনাবাহিনী থেকে ক্ষমতায় আসা শাসকদ্বয় সামরিক পন্হাকেই সর্বপ্রথম বিবেচনায় আনবেন এটাই স্বাভাবিক। হলও তাই। আগুনের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ল।
লাভ আমারও হলনা, আদিবাসীদের ও হলনা, দূরে বসে খলনায়করা মজা লুটে গেল , ইন্ধন দিয়ে গেল ।
এপ্রান্তে বসে আমি ভাবি আমার ভাই বন্ধু যারা সেনাবাহিনীতে আছে তারা বিনা কারনে মারা পড়ছে, আর ওরা ভাবে বাঙ্গালীরা তাদের নিশ্চিহ্ন করে চলেছে। বড় করুন এ বোঝাবুঝির খেলা। যারযার দৃস্টিকোন থেকে যারযার মত করে বুঝে নেয়া।
বঞ্চিতদের দলে টানা অনেক সোজা। পাহাড়ী বিপথগামীরা তাতে সফলও হল । জাগিয়ে তুলল স্বজাতিদের অধিকারের নেশায়- ভুলে গেল তারা আমরা একদেশের নাগরিক সকলেই বাংলাদেশী । এটাই স্বাভাবিক । একদিন আমরাও তাই ভেবেছিলাম -আমাদের স্বাধীনতায়, আমাদের বিজয়ে।
আমাদের পদধুলিকে তারা ধরে নিল সেটলারের পদধূলি । আমার সন্মানে আমার অস্তিত্বে এটা বিরাট আঘাত। বলে কি, আমার দেশে আমি সেটলার, আমি আগুন্তুক । সখ্যাগরিষ্ঠতার গরিমায় দমনই হল আমার হাতিয়ার। আদিম নেশায় এটাই স্বাভাবিক হয়ত। বীর বাংগালী ভুলে গেল তার বিজয়ের ইতিহাস, সে ও হয়ে গেল শোসক।
কেন ????????????
এমনটাত হবার কথা নয়, হওয়া উচিৎ ছিলনা । শুরু থেকেই ভুল নীতিতে পথ চলা বাঙ্গালী এখানেও ভুল করল। আমাদের ভুল তাদেরকেও জাগিয়ে তুলল অন্যভাবে,তারা বাংলাদেশের কথা ভুলে গেল । নিজেরমত করে ভাবা শুরু করল , ইন্ধন ওআসতে লাগল । আগুন আর লাশ - ত্রিশ লক্ষ্য শহীদের রক্ত দেখার পরও আমাদের রক্তের নেশা ঘুচলনা। তারা মরে-আমরা মরি-- ওপাড়ে বসে মজা লুটে অন্য কেউ, আমরা বুঝিনা আমরা পিছন দিকে হেঁটে চলেছি।
আমি অবাক হই আমাদের নীতি নির্ধারকদের নীতিবোধহীনতাই । সুচিন্তা তারা কখনোই করতে পারলনা। বোঝাতে পারলনা আদিবাসীদের এই বাংলাদেশের সর্বত্রই তাদের আছে অধিকার শুধু ঐ এক চিলতে রূপ লাবন্যে ঘেরা পাহাড়ে নয়, তাদেরকে বোঝাতে পারলনা সমতলের প্রতিটি মানুষের ও আছে পাহাড়ে অধিকার- বড় কস্ট করে পাওয়া এই অধিকার ভাইয়ের রক্তের লেলীহান আগুলে জ্বালিয়ে দিওনা। তোমার আমার সমান অধিকার । আমি না খেলে তুমি ও খাবেনা, তুমি না খেলে আমিও খাবনা ।
আমরা পারিনি- দমিয়ে রাখতে চেয়েছি, তাই সে ভেবে নিয়েছে তার মত করে , বুঝে নিয়েছে তার অধিকারহীনতা । আজ তাই আমি সেটলার, আমি বাঙ্গালী-সে পাহাড়ী - দুয়ে মিলে পারলামনা বাংলাদেশী হয়ে উঠতে । অথচ দুজনের পার্সপোর্টেই লেখা বাংলাদেশী, তা শুধু লেখাই রয়ে গেল। মননে , চিন্তায় কোন রুপ বদলালনা।
ইতিহাস আমরা সবাই জানি কম বেশী,সঠিক আর বেঠিক যায় হউক । আরও জানি ভাল লাগে ঘুরতে সে অপরুপ লাবন্যে ঘেরা পাহাড়ে।
আমরা কাছে টেনে নিতে পারলামনা তাদের, তারাও পারলনা................
তাই বারে বারে যখনই রক্ত ঝড়েছে , আমি গেছি আমার জাতিগত পরিচয়ের ভাবনা নিয়ে- ঐ বেটা পাহাড়ীর সাহস কত, মাথা উঁচু করতে চায়....।মেরে ফেল, দমিয়ে রাখ................। সত্যিবলছি আমার ভাবনা এই ক্ষেত্রে মৌলবাদীতায় রুপ নিয়েছিল, সেই রুপে আমি অনেকের সাথে তর্কবিতর্কও করেছি। আরে তোরা গুটিকয় লোক-সাহস কত তোদের- এই ভেবেছি সবসময়। গত কয়দিন ধরেও এই ছিল ভাবনায়। হারামজাদারা পেয়েছে কি !!!
প্রতিদিন রাতে বাসায় কথা বলা আমার নিয়মিত রুটিন। ওপ্রান্তে মা ই থাকেন। বাবা পাশে থাকলেও সবসময় তার সাথে কথা হয়না। তিন চারদিন পরপর কথা হয় তার সাথে । আজ ফোনই ধরলেন বাবা। কথা শুরু হল দেশের অবস্হা নিয়ে। খালেদার অফিসে বোমা হামলা থেকে শুরু করে রক্তাক্ত পাহাড় এ এসে থামল তা। স্বগোতোক্তিই করলেন তিনি কারা যে এই শান্ত জনপদকে বারেবারে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে। আমি ভাবি, আব্বু বলছেন কি ?? কারা মানে , ঐ পাহাড়ীরাইত সব নষ্টের গোড়া।
তিনি বলে চলেন ( বান্দরবান সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি সেখানে কাটিয়েছেন বেশ কিছু সময় ) অতি সাধারন জীবনাচার এই পাহাড়ীদের, অধিকাংশই লেখাপড়া জানেনা। সহজ সরল বেশীরভাগ লোকজনই । দু একটা যে ঘাড় ত্যাড়া নেই তা না। অলস সময়ে তিনি কলেজ ক্যাম্পাসের আশেপাশের অনেকের সাথেই সময় কাটিয়েছেন, গল্পকরার নেশা আমার মত তার ও আছে জানি । তাদের নিয়ে নানা কথা বলে চলেন। তার কথায় আমি ,আমার বোধ বদলে যেতে থাকে ................ ।
তিনি হিংস্রতা দেখেননি অধিকাংশের মাঝে, দেখেছেন ,আমাদেরই গ্রাম বাংলার সহজ সরল রূপ । বলতে বলতে এক সময় তিনি সারামর্মে পৌঁছান- আমাদের আরও গভীরভাবে মনোযোগ দিতে হবে। অন্যের অধিকার বোধের প্রতি সন্মান জানাতে হবে । তার মাঝে জাগিয়ে তুলতে হবে - আমি, আমরা , সে - সবাই মিলে বাংলাদেশী । সবটুকু ভূখন্ড মিলেই আমাদের বাংলাদেশ, আমাদের সবার সর্বত্র সমান অধিকার । আমাদের শত্রুর শেষ নেই, আমাদের সাবধান হতে হবে- নিজের অখন্ডতা বাঁচাতে হবে- আর এর একমাত্র উপায় অধিকারের নিশ্চয়তা।
ফোন শেষে আমি ভাবতে বসি- আসলেই তো তাই । অন্যরা আমাদের কাউকে কাউকে বিপথে নিয়ে আমাদের ক্ষতি করতে চাইবে । কেউ কেউ বিপথে গিয়ে অন্যকে দলে টানতে চাইবে। আমাদের তা রূখতে হবে। আর অধিকারের নিশ্চয়তায় তা রুখতে পাড়ে।
অধিকারের সীমা পরিসীমা নিয়ে বাকবিতন্ডা থাকবেই । তার সমাধান ও আমাদের কেই করতে হবে। শিক্ষার বিস্তার বড় প্রয়োজন । তার চিন্তার বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ । সেত ভাল করে বাংলায় জানেনা। আমার সব কথা সে বুঝতেও পারেনা আমি শিউর। ভাষার জন্য লড়াই করা বাঙ্গালী অন্যের ভাষা কেড়ে নিতে পারেনা। তার ভাষাকে সমুন্নত রেখেই তাকে সুযোগ দিতে হবে উঠে আসার , ভাবার পরিসর যাতে তার আরও বড় হয় সে সুযোগ আমাকেই করে দিতে হবে। বঞ্চনার স্বীকার হয়েই আমি স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলাম, সে আমি অন্যকে বঞ্চিত করতে পারিনা।
তার কাছে ঐ এক টুকরো পাহাড় ই স্বদেশ। তার এ ধারনা আমাকেই বদলে দিতে হবে।
শান্ত ঐ লাবন্যে হঠাৎ করে এই রক্ত ঝড়াকে সাদা চোখে দেখে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে আমাদের এড়িয়ে যাবার মনে হয় কোন সুযোগ নেই। শত্রুকে (দেশী হউক, বিদেশী হউক) সে সুযোগ দেয়া কাম্য হতে পারেনা। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে অধিকারের সমবন্টন- তার আমার সকলের । তাকেও দিতে হবে স্বপ্ন দেখার সুযোগ- তার ও অধিকার আছে এই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবার। বাংলার যেকোন স্হানে খুঁঠি গাঁড়ার তার ও রয়েছে অধিকার , যেমন আমার ও রয়েছে। সকলের অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে হবে দেশ চালানোর দায়িত্ব যারা নেন তাদেরকে। এখনই সময় ঠান্ডা মাথায় ভাবার- রাজনৈতিক গালগপ্পে ভরা বুলি নয়, সকলের বোধগম্য , সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য অধিকারের বাস্তবায়ন ।
রক্তের বিনময়ে অর্জিত এই দেশে আর রক্ত ঝড়তে দেয়া যায়না। আমি চাইনা আমার কোন ভাই সেখানে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরুক, তেমনি চাইনা সেখানে আগে থেকেই বসবাস করা (আদিবাসী) কোন বাংলাদেশী আমার হাতে প্রান হারাক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


