somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দাগ থেকে যায় ....।

০৩ রা জুন, ২০১০ সকাল ১১:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


রাইসা বার বার ফোন করে চলেছে ।কিন্তু ফোনটি কেউ ধরছেনা। ওয়েলকাম টিউনটি শুনে রাইসার হাসি পাচ্ছে - ভালবাস আর নাইবা বাস স্বপ্ন তোমায় নিয়ে প্রতিদিন । আর কতবার বলতে হবে ভালবাসি, ভালবাসি !!

আরশাদ এর সাথে তার শেষ কথা হয় ওরা জাফলং পৌঁছানোর পর। তাড়াহুড়ো করে ও জানিয়েছিল তারা পৌঁছে গেছে , এখন সবাই মিলে নৌকা করে নদীর ঐ পাড়ে যাবে। এই বলে রেখে দিয়েছিল, রাইসাও আর কিছু বলেনি। ফোনটা রেখে ড্রয়িং রুমে টিভি দেখতে যেতে যেতে তার হঠাৎ মনে পড়ল ওকে বলা দরকার যেন পানিতে না নামে, সাঁতার জানেনা, কিন্তু পানি দেখলে ওর মাথা ঠিক থাকেনা। সেই বার ভার্সিটি থেকে এসকারশানে সবাই মিলে যখন কক্সবাজার গিয়েছিল ওকে পানি থেকে তিন জনে চেপে ধরে তারপর তুলেছিল, জগতের সব আনন্দ যেন ঐ জলে অবগাহনে, রাইসার ওকে দেখে তাই মনে হয়েছিল।

ওকে নিষেধ আর করা হলনা, রাইসা শিউর এতক্ষনে ওরা পানিতে নেমে গেছে। না জানি কি করছে, কি পাগলামি শুরু করে দিয়েছে এতক্ষনে। অবশ্য ওর বন্ধুরা সবাই আছে, এটাই ভরসা। লম্বা ট্যুরে বেড়িয়েছে ওরা। গতকাল সারাদিন কাটিয়েছে শ্রীমঙ্গল, লাউয়াছড়া, মাধবকুন্ডে, আজ গিয়েছে জাফলং এ। রাইসার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল, ইস যদি ওদের সাথে যাওয়া যেত, কত মজা করে ওরা, সে উপায়ত আর নেই, তার জন্য আরও অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।

অনেকক্ষন ধরে কেউ কোন কথা বলছেনা, সবার চোখ মুখ বিধ্বস্ত, কি হয়ে গেছে কেউ আসলে বুঝে উঠতে পারছেনা, কি করে হল, এমনত হবার কথা ছিলনা, সবাই মাথা নীচু করে বসে আছে। প্রাইভেট কারের সামনের সিটে বসে আছে আসিফ। একটা সিগারেট ধরাল ও, এখনও মেনে নিতে পারছেনা ঘটে যাওয়া ঘটনা। ড্রাইভার সানী বারবার ওর দিকে তাকাচ্ছে। আসিফ এর কাজিন আরশাদ। খবরটা শোনার পর একদৌড়ে খালার বাসায় ছুটে গেছে সে। খালাকে কিছু জানায়নি, ওর মাকে বলেছে জানানোর জন্য। খালুকে বলে আরশাদের ভাই ওর সমবয়সী আনিস কে নিয়ে ওরা ছুটে এসেছে জাফলং এ। সিলেটের ডিসি পরিচিত হওয়ায় তেমন কোন ঝামেলা আর হয়নি। সামনের এ্যাম্বুলেন্সে কফিনটি নেয়া হয়েছে, সেখানে আছে আনিস আর আরশাদের ছয় বন্ধু। বাকিরা তার গাড়িতে।

পিছন ফিরে আসিফ হঠাৎ বলে উঠল , আচ্ছা ওর কি কোন গার্লফ্রেন্ড আছে। বন্ধুরা একে অন্যের দিকে তাকাল, কেউ কিছু বলছেনা। আসিফ বলে চলে, যদি থাকে ওকে তোমরা জানাও, সকালে একবার এসে শেষ দেখা দেখে যাক, না দেখতে পারলে ওর খারাপ লাগাটা আরও বেড়ে যাবে।

রাতে খাবর পর থেকে রাইসার মেজাজটা ভয়ংকর খারাপ হয়ে আছে আরশাদ এর উপর। সে মনে হয় শতাধিকবার ফোন দিয়েছে, ফোন ধরার কোন নাম নেই, কি এমন ব্যস্ত যে একবারের জন্যও ফোন ধরা যায়না, আসুক ঢাকায় , এই শাস্তি ও হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাবে। বন্ধুরাও কেউ ফোন ধরছেনা। নিশ্চিত ও বলে দিয়েছে, যাতে কেউ রাইসার ফোন না ধরে, এমনটা আগেও হয়েছে।

একটার দিকে নাইম যখন ফোন দিল, রাইসা শিউর ছিল এটা আরশাদ, রিসিভ করার আগ মুহুর্তে সে ঠিক করতে পারছিলনা কি করবে, রেগে কথা বলবে, নাকি নরমালি । উচ্ছাস নিয়ে হ্যালো বলেই ও প্রান্তের জবাবে রইসা বুঝল আরশাদ না নাইম ই ফোন করেছে।

আরশাদ কইরে !!!! রাইসা উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাই। নাইম কিছু বলেনা চুপ করে থাকে। চুপ করে আছিস কেন- এক কথা অনেকবার বলে চলে রাইসা। রাইসা প্রস্তুত ছিলনা- নাইম যে তাকে এমন কিছু শোনাবে।

একসাথেই দুপ্রান্তের দুটো ফোন হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল। পরার আগে নাইম বলেছিল "দোস্ত আরশাদ আর নাইরে", রাইসাও এইটুকুই শুনেছিল।

রাইসা একবার একজনকে ফোন দিল, কেউ ফোন ধরছেনা। কিছুক্ষন পরে একটা আননোন নাম্বার থেকে ফোন আসল। আমি আসিফ, আরশাদ এর কাজিন বলে পরিচয় দিল আসিফ। রাইসা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল, ভাইয়া ওর কি হয়েছে। আসিফ ঘটনা পুরোটা বলল। পানিতে হারিয়ে গিয়েছিল আরশাদ, জীবিত তাকে আর পাওয়া যায়নি।

রাতটা কিভাবে কেটেছে এ কথা কাওকে বোঝানো যাবেনা, কেউ বুঝবেনা, কোন দিনওনা । এ ঘোরের কোন বিবরন দেয়া সম্ভবনা, রাইসা বুঝতে পারছিলনা সে কি কোন ঘোরের মাঝে আছে, নাকি বাস্তবে।

হাউমাউ করে কাঁদছে একটা মেয়ে, আত্মীয় স্বজনের বাইরে অমন করে আর কেউ শোকাতুর নয়, দেখেই আসিফ বুঝল এটা রাইসা। কাছে গিয়ে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে কি বলবে বুঝতে না পেরে ও দূরে সরে গিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। মনে মনে ভাবছে এই কস্ট মেয়েটা সারাজীবন বয়ে বেড়াবে, এই হারানোর কোন ক্ষতিপূরন হবেনা কোন দিন, রিলেশন ভেঙ্গেগেলে ভোলা সহজ, কিন্তু এভাবে হারিয়ে গেলে !!!!

সারাদিন কাছের দুই বান্ধবী রাইসার সাথে ছিল, সন্ধ্যার পর তারা চলে গেল। রাইসার বাবা মা হতবিহবল অবস্হায় আছেন, কি বলবেন কি করবেন তারা আসলে বুঝতে পারছেননা।

ঘুম আসছেনা অনেক্ষন ধরে, রাইসার মা কিছুক্ষন পরপর এসে ঘুরে যাচ্ছেন, মেয়েকে জড়িয়ে ধরছেন। অনেকক্ষন চেস্টা করার পর রাইসা উঠে বসে কম্পিউটার অন করে ফেস বুকে ঢুকল।

"মাধবকুন্ডে ব্যাপক মজা করে এখন জাফলং এর পথে" - আরশাদ এর শেষবারের মত আপডেট করা স্ট্যাটাসটা জ্বলজ্বল করছে, নীচে কমেন্টের ঘরে বন্ধুরা রাজ্যের মন খারাপ করা সব কথা লিখে যাচ্ছে, উত্তর দেয়ার কেউ নেই, এই কথা ভেবে তার চোখ আরেকবার জলে ভিজে গেল। অথচ এমনও দিন গেছে আরশাদের ওয়ালে কেউ কিছু লিখেছে, সে তখন হয়ত অনলাইনে নাই, রাইসা তখন তাকে মেসেজ করে জানাত তোমার ওয়ালে এই লেখা হয়েছে জবাব দাও ।

নিজের ওয়ালে এসে রাইসা আর উচ্চস্বরে কান্না থামিয়ে রাখতে পারলনা। ক্যাম্পাসে ক্যান্টিনে বসে যখন ডিসিশান নিচ্ছিল সিলেটে যাবার রাইসা কেন জানি বারবার মানা করেছিল, বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল, রাইসা বলেছিল এখন না যেতে, শীতকালে যেও। ওরা যখন অনড়, রাইসা তখন রাগ করে চলে এসেছিল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে।

বাসায় এসে ফেসবুকে দেখে আরশাদ তার ওয়ালে জয় গোস্বামীর একটা কবিতা লিখে দিয়েছে-

যেভাবে বৃষ্টির জল তোড়ে বয়ে যায়
ঢালুদিকে
সেইভাবে, আমার জীবন
আজ অধোগামী ।

সালোয়ার একটু উঁচু করে
তুমি সেই জল ভেঙে ভেঙে রাস্তা পার হয়ে গেলে
এত যত্নে, সাবধানে, যেন বা জলের গায়ে
আঘাত না লাগে !

পড়ন্ত জীবন শুধু মনে রাখবে অপরূপ চলে যাওয়াটিকে !

৫০টি মন্তব্য ৫০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×