somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুনামগঞ্জে ভাসান পানি আন্দোলন: যেভাবে একটি আন্দোলনের মৃত্যুঘন্টা বাজলো

০৬ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আশির দশকে উত্তাল ছিল হাওর রাজ্য সুনামগঞ্জ। হাওরের মৎস্যজীবিরা ভাসান পানিতে মাছ ধরার দাবিতে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন প্রথাগত মাছ ধরার এই আন্দোলনে। এ জন্য জেল জুলুম খেটেছেন অনেকে নেতাকর্মী। কিন্তু এক দশক যেতে না যেতেই অধিকার প্রতিষ্ঠার আগেই আন্দোলনটি ঝিমিয়ে পড়ে। নেতৃত্ব শুন্যতা ও নেতৃত্ব বিচ্যুতির কারণে একটি সম্ভাবনাময় আন্দোলনের মৃত্যু ঘটেছে। আর এই আন্দোলনের প্রথম সারির নেতারা এখন আভির্ভূত হয়েছেন নব্য ইজারাদার রূপে। তবে আশার কথা হচ্ছে স¤প্রতি মৎস্যজীবিরা আবার ভাসান পানিতে মাছ ধরার জন্য নানামুখি তৎপরতা শুরু করেছে। তারা ইতোমধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে এই অধিকার চেয়ে স্মারকলিপি দিয়েছে।
হাওর পাড়ের প্রবীন মৎস্যজীবি আন্দোলনকর্মী ও নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক সময় সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় মৎস্যজীবিরা প্রথাগত মাছধরার অধিকার হারিয়ে সরকারি-বেসরকারি বাহিনীর নির্যাতনের কবলে পড়েন। তাদের অনেকেই ইজারাদারদের ঝুলিয়ে দেয়া মিথ্যা মামলা গাইতে গাইতে ফতুর হয়ে যান। তাদের এই দুঃখ দুর্দশার কথা বিবেচনা করে স্থানীয় কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ কমড়েড বরুণ রায়ের নেতৃত্বে প্রথাগত অধিকারের দাবিতে ভাসান পানি আন্দোলনের ডাক দেন। তার ঢাকে জেলা ব্যাপী বিপুল সাড়া মিলে, শুধু মৎস্যজীবিরাই নয় দরিদ্র ভূমিহীন লোকজনও আন্দোলনে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন। পরে কমিউনিস্ট পার্টির শাখা সংগঠন তেমজুর সমিতির পরিচালনায় এই আন্দোলনটি সর্বব্যাপী হয়ে ওঠে। কমিউনিস্ট নেতারা আন্দোলনের রূপরেখা তৈরী করে দেন। দাবি আদায়ের ল্েয উদ্বেুদ্ধ করেন। তখন আন্দোলনটি অল্প সময়ে ব্যাপক সারা ফেলে জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে বিশেষ কওে বাংলাদেশের জলমগ্ন এলাকায়। শাসক মহলের ভিত কাঁপিয়ে দেয় এই আনেদালন। আন্দোলনের বিজয় যখন নিশ্চিত তখনই এর প্রধান নেতারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন ইজারাদারদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে। তাদের অনেকেই ইজারাদারদের সাথে ভাগবাটোয়ারার সঙ্গী হন। অনেকে জেল জুলমরে ভয়ে আন্দোলন থেকে সড়ে দাড়ান। কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েন। তারপর আর মাথা তুলে দাড়াতে পারেনি এই সম্বাবনাময় আন্দোলন।
আন্দোলনের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, ১৯৮৩ সালে এই আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এই আন্দোলনের প্রথম মিটিং হয় সদর উপজেলার গৌরারং এলাকায়। তৎকালীন সময়ের সুনামগঞ্জের কমিউনিস্ট নেতা ও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা নজির হোসেনের কাছে এর সকল নথিপত্র গচ্ছিত ছিল। তিনি নব্বই দশকে দল ছাড়ার পরে কাগজপত্র জমা দেননি। আরো কিছু কাগজপত্র ছিল তে মজুর সমিতির কেন্দ্রীয় অফিসে। জানা গেছে এ সংক্রান্ত কাগজপত্র অফিস থেকে হারিয়ে ফেলছেন তারা।
হাওর পাড়ের প্রবীন জেলেদের সঙ্গে কথা বললে এই আন্দোলন সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা যায়। এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বংশানুক্রমিক মৎস্যজীবিরা ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকার। এসব দাবির কারণে ইজারাদাররা মৎস্যজীবি ও আন্দোলনের নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতন চালায়। সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যার ফলে গ্রেফতার হন ভাসান পানি আন্দোলনের নেতা নজির হোসেন ,আবু সুফিয়ান ও মালু মিয়া। লালপুরের দরিদ্র মালু মিয়া এই আন্দোলনের জন্য জীবনটাই উৎসর্গ করেন তবুও আদর্শচ্যুত হননি। এছাড়া হুলিয়া জারি হয় অন্যন্য নেতাদের উপর। তৎকালীন এরশাদ সরকারের স্থানীয় এক মন্ত্রী নির্যাতন চালান তাদের উপর। কারণ তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জের প্রধান ইজারাদার। তবে তীব্র আন্দোলনের ফলে নজির হোসেন ও আবু সুফিযানকে মুক্তি দেয়া হয়। এই সময় তাদের মুক্তি ও ভাসান পানিতে মাছ ধরার দাবিতে সুনামগঞ্জের দিরাই, শাল্লা, জামালগঞ্জ, তাহেরপুর, ধরমপাশা. মধ্যনগর, বিশ্বম্বরপুর ও সমুনামগঞ্জ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মৎস্যজীবিদের পাশাপাশি ভুমহীনরাও এই আন্দোনে শরিক হন।
সুনামগঞ্জ জলাভূমি প্রধান এলাকা। যুগ যুগ ধরে তারা এই জলের উপর প্রথাগত মাছ ধরার অধিকার ভোগ করে আসছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই ইজারাদাররা তাদের রাজত্ব কায়েম করেন জলের উপর। যতদুর জল গড়ায় ততদূর তাদের রাজত্ব। তবে বৃটিশ আমল থেকেই তাদের দৌড়াতœৗ বাড়ে বলে প্রবীণ আইনজীবিরা জানান। ষাটের দশকে সরকার রেজিস্টিকৃত সমিতির মাধ্যমে জলায়শয় লীজ দিলেও এই সমিতি গুলো ইজারাদাররা লীজের জন্য গড়ে তুলেন। যার ফলে প্রকৃত মৎস্যজীবিরা অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। যা এখনো বিদ্যমান। এই আন্দোলনে বৈশাখ থেকে কার্তিক পর্যন্ত হাওর এলাকায় মাছ ধরার কথা বলা হয়। মৎস্যজীবিদের ভাসান পানিতে মাছ ধরার দাবিতেই সুনামগঞ্জের কমিউনিস্ট নেতা বরুণ রায় ও নজির হোসেন এই আন্দোলনের শুরু করনে। নজির হোসেন দল ছেড়ে বিএনপিতে গিয়ে এমপি-ইজারাদার হয়েছেন। বয়সের ভারে ন্যুজ বরুণ রায় একা হয়ে দল থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। অন্যান্যরাও দল ছেরেছেন। কেউ হয়েছেন এনজিও মালিক। কেউ ইজারাদার।
আন্দোলনের আইনগত স্বীকৃতি ছাড়াই সক্রিয় সক্রিয় গণসমর্থন থাকার পরও ঝিমিয়ে পড়ে এক সময় মারাই যায়। নেতৃত্ব শূন্যতা, মৎস্যজীবিদের ইজারাদার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সমর্থন, নেতাদের ইজারাদাররূপে আভির্ভাবসহ বিভিন্ন কারণেই আন্দোলটি বন্ধ হয়ে যায়। আর একজন বরুন রায় সবাইকে হারিয়ে একা হয়ে পড়েন।
৯০ দশকে কমিউনিস্ট নেতৃত্বের ভাঙ্গন ও নেতৃত্ব বিচ্যুতিও এই আন্দোলনের মৃত্যুঘন্টা বাজানোর অন্যতম কারন। তৎকালীন সময়ের ভাসান পানি আন্দোলন নেতা ও কমিউনিস্ট নেতা এডভোকেট জহির আলী সোনা মিয়া বলেন, এই আন্দোলনটি বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টি আন্দোলন শুরু করলেও আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন সংগঠন এই আন্দোলনে সম্মতি প্রদান করে। তাদের নিয়ে সর্বদলীয় মিটিংও হয় ১৯৮৬ সালে। তবে সাহসী ভূমিকা নিয়েছিলেন তখনকার ছাত্র ইউনিয়নের নের্তৃবৃন্দ। যার ফলে আন্দোলনটি প্রথম দিকে বেগবান ছিল। ভাসান পানি আন্দোলনের অন্যতম নেতা কবি ইকবাল কাগজী বলেন, যাদের নিয়ে এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলাম তারাই আজ ইজারাদার। এখন এসব নেতারাই জলমহালগুলোর লুটপাটের মহোৎসবে মেতেছে। নীতিকথা ভুলে গিয়ে সবাই আখের গোছানোয় ব্যস্থ। আর অনেকে এসব করে এখন কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক। আন্দোলনের অপর সক্রিয় কর্মী ও সাংবাদিক বিজন সেন রায় বলেন, সদর উপজেলার লালপুর গ্রাম থেকে এই আন্দোলনের শুরু। সারা জেলার নারী-পুরুষ স্বতস্ফুর্ত এই আন্দোলনে শরিক হয়েছিল। কিন্তু প্রধান নেতাদের অধপতনের কারণে মৃত্যুঘন্টা বেজেছে।
আন্দোলনের প্রধান নেতা কমড়েড বরুন রায় বলেন, আশির দশকে উত্তাল ছিল সুনামগঞ্জ। ইজারাদার ও শাসকগোষ্টির ভয়কে থোরাই কেয়ার করে নেতাকর্মীরা আন্দোলন করেছে। তারা অনেক সুফল পেয়েছে। যার প্রভাব আজও বিদ্যমান। তবে নেতৃত্বের বিচ্যুতিসহ নানা কারণে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রা করা যায়নি। যার ফলে আন্দোলন স্থিমিত হয়ে পড়ে। তবে এই আন্দোলনের কথা মনে করে দরিদ্র মৎস্যজীবিরা আজো বুকে বল পায়। মাঝে মধ্যে ইজারাদারদের রুখে দাড়ায়। তিনি বলেন, যাদের নিয়ে এই আন্দোলন করেছিলাম পরবর্তীতে তাদের কৃতকর্মে আমি হতাশ। অথচ তাদের নিয়ে আমি প্রচন্ড আশাবাদী ছিলাম।

৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×