একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউল শিল্পী শাহ আবদুল করিম দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ থাকায় লোপ পেয়েছে তার স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই কিংবদন্তি লোকশিল্পীর জীবনগাড়ি আজ প্রায় অচল। মধ্যপথে না ঠেকে বেলাশেষে ধুকে ধুকে চলছে এই গাড়ি। অন্যের কাধে ভর দিয়ে আর একমাত্র ছেলের ২০ মাস বয়েসী নাতির হাত ধরে জীবন শেষের খেয়া অতিক্রম করলেও আগামী প্রজন্ম হিসেবে তার এই ছোট্র নাতিকেই পথ দেখিয়ে যেতে চান তিনি। তাই শেষ বয়সে তার সময় কাটছে বিছানায় গড়াগরি করে আর একমাত্র নাতির সাথে খেলা করে। তার পরিবারের লোকজন জানান, তিনি সারারাত নির্ঘুম থেকে কি যেন ভাবেন আর বিড় বিড় করে আওড়ান। সৃষ্টির নিশাচরের মতো নয়, জীবন সায়াহ্নে তার প্রতিটি রাত এখন ঘুমহীন কাটে এলোমেলো বিছানায়।
কালনী নদীর পশ্চিম তীরের উজানধলের বাড়িটিতে আগের তোলনায় কিছুটা আভিজাত্যের ছাপ ল্য করা গেলেও শাহ আবদুল করিম এখন বেলা শেষের যাত্রী। যে নদীকে ঘিরে তার বাউল হয়ে ওঠা সেই ীন যৌবনানদীতে জলথৈথৈ করছে। কিন্তু শৈশবের সেই ছলাত ছলাত নদীটি নিরবে বয়ে যায় ধলগ্রামের বাউল সম্রাট এর বুকের উপর দিয়ে তার শেষ নিঃশ্বাস গুণে গুণে...। তার বিপরিতে তাকে দেখতে আসা সুধীজনের কোলাহলে বাউলের বাড়িটি প্রায়ই মুখরিত থাকলেও অতিথির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে থাকানো ছাড়া তার কিছু করার নেই তার। তবে তাকে দেখতে যাওয়া অথিতিদেও আসার পথে প্যারালাইজ্ড’’ হাতে বিদায় জানাতে তিনি ভুল করেন না।
বাউল সম্রাটের ছেলে শাহ নুর জালালও একজন বাউল। তার বাড়ির চারপাশে তিনি লাগিয়েছেন বিভিন্ন প্রজাতির বৃ। ফলজ ও বনজ বৃরে নিচে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম ফ্যাল ফ্যাল থাকিয়ে দেখেন শৈশবের কালনী নদীটিকে। নদীর বুকে হাসের দুরন্ত চলা দেখে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করেন কৃষ্ণচুড়া গাছের নিচে বসে। শোনেন পাখির কিচির মিচির গান। যখন ভালো লাগে না তখন আবার অন্যদের সহায়তায় একচিলতে উঠোনে হাটাচলা নয়তো দিনরাতের সঙ্গী কেবল বিছানা...
শাহ নুর জালাল জানান, তার পিতার প্রতিটি রাত এখন নির্ঘুম কাটে। দিনে একটু ঘুমান। খাওয়াধাওয়ায়ও রুচি নেই। তবে তরল জাতীয় খাবার একটু একটু খান। মাঝে মধ্যে অষ্পষ্ট কথা বলেন। ইশারায় ২০ মাস বয়েসী নাতি শাহ নূর করিম ঝলককে ডাকেন। একটু হাসেন। এভাবেই কাটছে তার দিনকাল। তবে মাঝেমধ্যে কথা বলার জন্য রাগিয়ে তুললে হয়তো কিছু অষ্পষ্ট কথা শোনতে পাওয়া যায়।
এই বয়সে তার কেমন লাগছে, চাওয়া পাওয়া, পরিচিত বন্ধুবান্ধব আতœীয় স্বজন, নিজের রচিত গান ও সহশিল্পীদের নিয়ে কথা বলতে চাইলে দেখা যায় ঠোট নড়ানোর চেষ্টা করলেও কথা বলতে পারছেন না। একটু আধটু বললেও তা অষ্পষ্ট। কালজয়ী আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম গানের এই শিল্পিকে আগের মানুষ আর এখনের মানুষের সম্পর্কে জানতে চাইলে ধরা গলায় বলেন, ‘‘সব আমলেই মানুষ ভালাবুড়া আছিল। তবে আগের মানুষ আছিল খুব সরল ।’’ শৈশবের কোনো বন্ধু বান্ধব, তাদের মুখ মনে পড়ে কি না জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘‘আগের অনেকই আর দুনিয়াত নাই। যারা বাইচ্যা আছে তাদের দেখাও মিলে না।’’ তবে শৈশবের বন্ধুদের জন্য তার মন আনচান করে। দিরাই উপজেলার জগদল গ্রামের আরেক সহশিল্পী বাউল শিল্পি মরহুম শফিকুন নূর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আমতা আমতা করে বলতে চাইলেও মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল চেয়ে থাকেন। কোনো মতে বলতে পারলেন ‘‘সে বড়ো ভাল মানুষ ছিল । বড়ো জাত বাউল ছিল। তার কথা মনে হলে খুব খারাপ লাগে।’’
যৌবনে যে স্বপ্ন লালন করতেন শেষ বয়সে এসেও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতিধ্বনি হচ্ছে তার কালনীনদীর বাড়িটিকে ঘিরে। তার সেই স্বপ্নটির নাম ‘‘শাহ আবদুল করিম সংগীত বিদ্যালয়।’’ তার সেই স্বপ্নটি প্রশাসন ও বিভিন্নজনের সহানূভূতির পরও তার মনের মতো হচ্ছে না। তার যৌবনের এই স্বপ্ন সম্পর্কে বলেন, এই বিদ্যালয়টি ভক্ত বাউল শিষ্যদের জন্যই । তারা আসবে গান করবে, থাকবে ঘুমুবে। তার গান নিয়ে ভাববে। তার চর্চা ও লালন করবে। বাউল ও লোক জীবনের চেতনা ছড়িয়ে দিবে প্রজন্মের মধ্যে। এইটাই তার সংগীত বিদ্যালয়ের একমাত্র ল্য। তবে কিভাবে চলবে তা তিনি জানেন না। হাল ছাড়েন নি, আশাবাদী কেউ না কেউ এই বিদ্যালয়ের হাল ধরবে। তার সৃষ্টিকে লালন করবে।
বাউল সম্রাটের বাড়িতে গেলে সব সময়ই ভক্ত শিষ্যদের দেখা মিলে। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিনই কোন না কোন লোক আসছেন বাউল স¤প্রাট কেমন আছেন দেখতে। তার স্মুৃতিকে ছুতে। তার সৃষ্টির স্বাদ নিতে। মিডিয়ার লোকদেরও ভিড় থাকে প্রায় সময়।
বাউল সম্রাটের ছেলে শাহ নুর জালাল জানান, তার পিতা গানের পাশাপাশি প্রাচীন মিথ ও ইতিহাস ও মধ্যযুগের কাহিনী নিয়ে কয়েকটি কেচ্ছা রচনা করেছেন। এর মধ্যে একটি তার সংগ্রহে আছে। তিনি বলেন, তার প্রথম গানের বই ‘আফতাব সঙ্গীত’টি হারিয়ে গেছে। তিনি চেষ্ঠা করে এই বইয়ের প্রায় চল্লিশটি গান খুঁজে পেয়েছেন। জালাল বলেন, তার সংগ্রহে যে কয়টি গানের বই ও অগ্রন্থিত গান আছে সেগুলোকে সমগ্ররূপে গ্রন্থস্থ করতে চান। আর এই সমগ্রে কেচ্ছাটিও থাকবে। তার পিতার জীবদ্দশায়ই তিনি চেষ্ঠা করছেন এই রচনা সমগ্রকে মলাটবন্ধী করতে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



