দেশবিদেশে হাওরবাওর-আউলবাউলের দেশ হিসেবে সুনামগঞ্জের সুনাম রয়েছে। এই ব-দ্বীপের অন্য অঞ্চলের সঙ্গে যাপিত জীবনে এই অঞ্চলের লোকদের তাই স্বাভাবিক পার্থক্য লণীয়। এই অঞ্চল অভিভক্ত ভারতের সময় ছিল ভারতের আসাম রাজ্যের অধীন। তারপর দেশ বিভাগের পর রেফারেন্ডামের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে তার গৌরবময় সাংস্কৃতিক অধিকারের দাবিতে তার হারানো স্থান খুজে পায়। এসব কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে সংস্কৃতিতেও এই পার্থক্য লণীয়।
সমৃদ্ধ এই অঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতি। উত্তরাধুনিক সময়ে এসে গ্লোবালাইজেশনের কারণে পূজি ও সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনে নিজস্ব সংস্কৃতিকে সংগ্রাম করে তার অস্তিত্ব টিকেয়ে রাখতে হচ্ছে। মানব সভ্যতা উত্তরাধুনিকতার শীর্ষে অবস্থান করায় প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বিষয় আবিষ্কার ও উদ্ভাবন হচ্ছে। আর এসব জিনিষ পূজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র গ্লোবালাইজেশনের দোহাই দিয়ে উন্নয়নশীল বিশ্বের নিজস্বতাকে হঠিয়ে স্থান করে নিচ্ছে। বিশ্ব মানচিত্রের এই ছোট্র ভুখন্ডও আজ এই আগ্রাসনের শিকার। যার ফলে প্রতিনিয়ত অপসংস্কৃতি ঝেকে বসছে আর ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নিজস্বতা। তারপরও প্রাচীন যুগ ও মধ্যযুগের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেন পাল মোঘলদের শাসনামল থেকেই এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট টিকিয়ে রেখেছে।
সুনামগঞ্জ জেলা মূলত জলপ্রধান। প্রায় দেড় হাজার জলাশয়ের সমন্বয়ে প্রায় অর্ধ শতাধিক ছোট বড় হাওর রয়েছে। ছোট বড়ো নদী রয়েছে ২৫ টি। ঝড়, আফাল, পাহাড়ি ঢলসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বৈরীতার সঙ্গে যুদ্ধ করে এই এলাকার সংগ্রামী জনগোষ্টী তাদের জীবনঘনিষ্ট বিষয়াবলী বুকে ধরে আজো সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর সমন্বিত এই চলাই সংস্কৃতিতে স্থান করে নিচ্ছে।
জলসমৃদ্ধ এলাকা বলে এই অঞ্চলে আবহমান কাল থেকে লোকজনের কৃষিই প্রধান পেশা। পাশাপাশি হাওর এলাকার কৃষকরাই আবার কৃষিকাজের পাশাপাশি মাছ ধরার সাথে জড়িত। প্রান্তিকজনদের বিভিন্ন পদ্ধতি বিশিষ্ট এই মাছ ধরা লোকাল সংস্কৃতিতে শক্ত স্থান করে নিয়েছে। তবে প্রযুক্তির আগ্রাসনে নিজস্বতা এখন হুমকির সম্মুখিন। এই নিবন্ধে হাওরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব তৈরী যন্ত্র দিয়ে নিজস্ব পদ্ধতিতে মাছ ধরার বিষয় নিয়েই যতসামান্য আলোকপাত করা হয়েছে।
বাঁশের কুছা লোহার ফলার তুরি
৬-১০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট বাঁশের ফলার সমন্বয়ে তৈরী একটি মাছমারার যন্ত্র‘র নাম ‘কুছা’। খুব নিখুতভাবে বাশের ফলা কেটে এর অগ্রভাগকে ধারালো করা হয়। তারপর লোহার ফলার (কুতি) মাথায় গাম লাগিয়ে দেওয়া হয়। কুতি লাগানো অংশ কিছুটা বড় থাকে। এভাবে একটি কুছায় ৮-১২ টি ফলা থাকে। বেতের ছোট ছোট বেল্ট দিয়ে খুব নিখুতভাবে বাধা হয় কুছার ফলা। আর বাশের ফলা এত নিখুতভাবে লাগানো হয় যা দেখতে শিল্পকর্মের মতো আকর্ষণীয়। মাছ মারার পাশাপাশি এগুলো বিষাক্ত প্রাণী মারার কাজেও ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে বর্ষায় থমধরা মুহুর্তে হাওরপাড়ের সৌখিন কৃষকরা ছোট নৌকা দিয়ে মাছের খাউরি ( মাছের ভাসমান খেলা) খুজতে বের হন। অন্যজন ধীরে ধীরে নিশব্দে নৌকাকে বৈঠার টানে সামনে এগিয়ে নেন। একজন নৌকার অগ্রভাগে হাতিয়ার নিয়ে বনের দিকে মাছ ভেসে ভেসে বনের সঙ্গে ঠোকরাঠুকরি খুজে আর দেখলেই ছুড়ে মারে কুছা। খুব কম সংখ্যক নিশানাই ব্যর্থ হয়। বিভিন্ন কারণে এই পদ্দতিতে মাছধরা এখন আর ল্য করা যায়না। কারণ কারেন্ট জালের আগ্রাসনে মাছ গুলো আগের মতো আর ভেসে থাকেনা হাওড়ে। তবে কুছা তৈরী বন্ধ হয়নি। এখনো বিভিন্ন গ্রামের কৃষকের ঘরে যতেœর সঙ্গে তা সংরণের চেষ্টা ল্যণীয়।
আর তুরি তৈরী করা হয় ছাতার ফলা দিয়ে। ছাতার ফলাকে কেটে এক ফুট লম্বা রেখে অগ্রভাগ ধারালো করে ১২-১৬ ফলার তুরি তৈরী করা হয়। এটি দিয়ে রাতে আলোরা দিয়ে মাছ ধরা হয়।
অছু
একটি গোলাকৃতির কৌণিক মাছধরার বস্তু। বাশের বেত দিয়ে তৈরী করা হয়। ফালগুন-চৈত্রের বৃষ্টিমুখর দিনে উজাই ( হঠাৎ পানির স্পর্শ পেয়ে জলাশয় থেকে বেরিয়ে আসা মাছ) ধরা হয় এই বস্তু দিয়ে। স্রোতের মুখে তা পুতে রাখা হয়। তাছাড়া এমনিতে পানিতে খেউ (ফেলে) দিয়েও মাছ মারা হয়। জৈষ্টমাসে চিংড়ি মাছের পোনা মারার উত্তম এই বস্তুটিই অছু। তবে কারেন্টের ছোট ঠেলা কারণে এই অছুর কদর কিছুটা কমেছে। তবে বর্ষায় হাওর এলাকায় দড়াটানার সময় অছুই উত্তম বস্তু হিসেবে এখনো সমাদৃত।
পানিটান
পৌষ-মাঘে হাওর এলাকায় পানি কমে এলে হাওরের জমি তৈরী করা কালীন সময়ে কৃষকরা কাজ শেষে সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে হাত দিয়ে পানিতে টান দেয়। পায়ের নিছে গর্ত করে দুইহাত দিয়ে সারিবদ্ধভাবে পানি টানতে থাকেন কয়েক মিনিট। আর পানির প্রবল টানে পুটিমাছসহ ভাসা মাছগুলো গর্তে চলে আসে। এভাবেই মাছ ধরা হয় পানিটান পদ্ধতিতে।
দড়াটানা
লন্ডনে বাঙ্গালি বিশেষ করে সিলেটি হোটেলে রীতিমতো সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হয় ‘এখানে দড়াটানার মাছ পাওয়া যায়।’ বুক সমান পানিতে প্রায় দুই তিনশ হাত লম্বা মোটা রশি দিয়ে রশির/লোহার তৈরী জিঞ্জির দিয়ে অছুর মুখে টেনে টেনে আগানো হয়। কয়েকজন লোক এভাবে ডেকে আনেন মাছকে। একিদিকে অছু পাতানো থাকে। দড়াটানার মাছ খুব স্বাদের হয়।
রুঙ্গা, গুই ও ছাই, মাছমারার ছোট যন্ত্র
বাশের বেত দিয়ে খুব যতেœর সঙ্গে এসব যন্ত্র বানানো হয়। কৌনিক নলাকৃতির গুই আর রুঙ্গার উচ্চতা ১-২ ফুট। এতে থাকে মাছ প্রবেশের ছোট পথ যা দিয়ে মাছ প্রবেশ করতে পারলেও বেরোনোর কোনো উপায় থাকেনা। আর ছাইয়ের উচ্চতা ২-৪ ফুট। দৈর্ঘে ২-৫ ফুট পর্যন্ত হয়। ছাইয়ের আকৃতি অনেকটা বর্গাকৃতির। এসব বস্তু দেখতে খুব আকর্ষণীয়। গুই বর্ষায় হাওরের কান্দায় শামুক ভেঙ্গে পানির নিচে পুতে রাখা হয়। রুঙ্গা ১-২ ফুট পানিসমান জমিতে চারদিকে বাধ দিয়ে কয়েক স্থানে রুঙ্গা পুতে রাখা হয়। পানি নামার সাথে রুঙ্গায় মাছ আসতে থাকে। রুঙ্গা দিয়ে মাছ মারার পদ্দতিকে ‘ডাকবান্দ’ বলা হয়। সুনামগঞ্জের কয়েকটি গ্রামের এসব তৈরী বারোমাসী পেশা।
ডাইট্রা ও লাড়
এক দেড়হাত সুতায় বড়শি বেধে নল এর সাথে বা জারমুনির সঙ্গে বেধে পানিতে ফেলে রাখা হয়। আধার হিসেবে দেওয়া হয় কেচো, চিংড়ি বা ছোট মাছ। আর লাড় হলো হাজার ফুট লম্বা সুতোয় ৮-১০ হাত দূর বড়শি বাধা হয় আলাদা সুতো দিয়ে। এই লাড় কখনো পানির উপড়ে শুধু বড়শি পানিতে রেখে বেধে রাখা হয়। কখনো আবার পানির নিচে পুতে রাখা হয়।
বাশের ছুঙ্গা
একটি বাশকে প্রায় ৬-৭ ফুট লম্বা করে কেটে এক হাত অন্তর অন্তর ছোট ফুটো করা হয। তারপর বুক সমান পানিতে কয়েকদিন ফেলে রাখা হয়। কয়েকদিন পরে অতি সন্তর্পনে তোলা হয়। বাশের ভেতরের ফুটো দিয়ে মাছ ঢুকে আটকে থাকায় শুকনোয় তুলে মাছ বের করা হয়।
পলো
বাশের ফলার তৈরী খুব সুন্দর মাছ মারার বস্তু। গ্রীষ্মকালে খালের বিলের পানি শুকিয়ে এলে গ্রামের লোকজন দল বেধে এই পলো নিয়ে পানিতে নামেন। লাফিয়ে লাফিয়ে পানিতে পলো দিয়ে ঝাপিয় ঝাপিয়ে সারিবদ্ধভাবে এগোতে থাকেন। পালাতে বড় মাছ ধরা পড়ে। এই ফলো আবার মাছ ধরার পাশাপাশি হাসমুরিগ আটকিয়ে রাখার কাজেও লাগে। আবার কখনো রোগী বহন করতেও এই যন্ত্রটিকে কাজে লাগানো হয়।
ফগরা
বাশের মোটা বেত বা নলের বেতের তৈরী ত্রিভুজ আকৃতির একটি বস্তু। শীতকালে নদীপাড়ের লোকজন এটি তৈরী করে একটি লম্বা বাশের মাথায় বেধে পানিতে ফেলে রাখেন। হিজলকড়চসহ বিভিন্ন গাছের সরু ডাল বেধে দেওয়া হয় ফগরার সাথে। কখনো শামুকও ভেঙ্গে দেওয়া হয় মাছের আধার হিসেবে।
লেওয়া জাল
এই জালের আকৃতি ১০/১০ ফুট। এক ইঞ্চি পুরুর এই জালের দুই মাথায় বাশের বড়ো চটি বেধে দিয়ে নিচের চটির সঙ্গে ছোট পাথর ও ইটের ঠোকরা বেধে ছোট নৌকার আগায় বসে জাল ফেলে দেওয়া হয়। তারপর স্রোতের সঙ্গে ধীরে ধীরে বৈঠ টানা হয়। জালে মাছের টান পড়লে উপরের চটি ঠিক রেখে দ্রুত গতিতে নিচের পাটির চটি টেনে তুলে এনে আটকে পড়া মাছ ধরা হয়।
বিল্লিকাটা
বৈশাখে ধানকাটার পর ন্যাড়া জমিনে পানি জমে পচা গন্ধের কারণে হাওরের ছোট মাছ আশ্রয় নেয়। জমিনে নেমে কয়েক ফুট দূরত্ব নিয়ে গোলাকার হয়ে চক্কর দিয়ে ধীরে ধীরে এক দেড় ফুট উচ্চতার বৃত্ত তৈরী করে অছু দিয়ে খেউ (ঝাঁপ) দিয়ে মাছ মারা হয় ঘুর্নন পদ্দতিতে। এ পদ্দতিতে ছোট কৈ, খইয়া মাছ ধরা হয়।
আল্লোরা
বর্ষা মওসুমে হাওরপাড়ের গ্রাম গুলোতে স্বচ্ছ ১ ফুট উচ্চতার পানিতে রাতে হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে তুরি ও কুছা দিয়ে খুজে মাছ মারা হয়। কৃষ্ণপরে নিশুতি রাতের মাছ ধরার এই পদ্দতিকে আল্লোরা বলা হয়। মাটির তৈরী মোটা ল্যাম্প ব্যবহার করা হয় এভাবে মাছ ধরতে। এক-দুই জন লোক লাগে এভাবে মাছ ধরতে। আগে হ্যাজাক লাইট ও মাটির ল্যাম্প ব্যবহার করা হলেও এখন উচ্চ ভল্টের চার্জ লাইট ব্যবহার করা হয় এখন।
এভাবে নিজস্ব পদ্দতি নিজস্ব তৈরী বস্তু দিয়ে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার লোকজন মাছ ধরে থাকেন। তবে স্থান ভেদে এই পদ্দতি ও বস্তুর ভিন্ন ভিন্ন নাম শোনা যায়। যারা এসব যন্ত্র তৈরীর সঙ্গে জড়িত তাদের আর্থিক দৈন্যতার কারণে সুনামগঞ্জের লোকসংস্কৃতি এখন হুমকির সম্মুখিন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

