somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বোরো মওসুম শেষে হাওরের ন্যাড়াক্ষেতে এখন 'চেঙ্গিপোনা' ধরার ধুম পড়েছে

৩০ শে মে, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এখন 'চেঙ্গিপোনা' ধরার ধুম পড়েছে। বোরো ধানকাটার পর ন্যাড়া ক্ষেতে ঠেলা জাল নিয়ে হাওরপাড়ের চাষীরা নতুন ধানের ভাতের সঙ্গে আয়েশে রসনা তৃপ্তির জন্য শুধু এই মাছের পোনাই ধরছেন। বোরো মওসুমে ধান তোলার পর সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের কৃষকরা অল্পপানির ন্যাড়া ক্ষেতে যুগযুগ ধরে এভাবে টাকি মাছের পোনা ধরে আসছেন, যা স্থানীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছে। এক দশক আগেও ‘ কোরা অছু’ দিয়ে পোনা ধরা হলেও এখন কারেন্টের ঠেলাজাল দিয়ে পোনা ধরা হচ্ছে। যার ফলে কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার চিরায়ত লোক উপকরণ ঐতিহ্যবাহী 'অছু’।
আলাপকালে হাওরপাড়ের কৃষকরা জানান, এক দশক আগেও তারা ‘অছু’ (পোনা ধরার বাশবেতের তৈরী ত্রিকোণাকৃতির বস্তু) দিয়ে পোনা ধরতেন। কিন্তু এখন কৃষকের ঘরে আর অছু দেখা যায়না। কেউ আর নতুন করে বাঁশবেতের শৈল্পিক যন্ত্র ‘অছু’ তৈরী করেনা। অছুর বদলে কারেন্টের ঠেলা জাল শোভা পাচ্ছে তাদের ঘরে ছাঙ্গে (ছাদে)। অথচ এক সময় প্রত্যেক কৃষকের ঘরেই একটি অছু অনিবার্য ছিল। যা দিয়ে তারা পোনাসহ নির্দিষ্ট মাছ ধরতেন। পুরোপুরি বর্ষা না আসা পর্যন্ত পুরো বৈশাখ-জৈষ্ট মাস কৃষকরা জমিতে পোনা মাছ ধরেন। এ মওসুমে এখন পর্যন্ত বর্ষার পানির বিস্তৃতি না ঘটায় হাওরে তুলনামূলক পোনামাছ একটু বেশি ধরা হচ্ছে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। তবে টাকিমাছের পাশাপাশি শোল ও গজার মাছের পোনাও মাঝে মাঝে ধরতে দেখা যায়।
শেষ বিকেলে যখন হাওরে মৃদুমন্দ হাওয়া বয় তখন কৃষকরা কাধে জাল আর খলুই নিয়ে পোনা ধরতে বের হন। এই বাতাস তাদের কান ঘেষে শিষ কেটে হাওরের সোদাগন্ধময় পানিতে নামতে উদ্ধুদ্ধ করে। তখন বিভিন্ন বয়সের কৃষকসহ তাদের কিশোর যুবক সন্তানরাও পোনাধরা অভিযানের সঙ্গী হন। হাঁটুসমান পানিতে নেমে খুব ধীরে ধীরে চলে পোনার ‘পাল’ (দল) খুজেন। আর পাল খুজে পেলেই তারা খেউ (ঝাপ) দিয়ে এলোমনিয়ামের পাত্রে চরম তৃপ্ত নিয়ে পোনা তোলেন। এভাবে গ্রীষ্মের ভ্যাপসা গরমের বিকেলবেলা দলে দলে হাওরে পোনা ধরতে নামেন হাওরপাড়ের কৃষকরা। তারা তখন মনের আনন্দে গুনগুনিয়ে হাসন, করিম, রাধারমণসহ বাউল গান গেয়ে থাকেন। আগে কেবল কৃষকরা পোনা ধরলেও এখন তাদের পাশাপাশি নিন্ম আয়ের কিছু লোক বিক্রির জন্যও পোনামাছ ধরেন।
কৃষক যখন পোনা ধরতে বের হন তখন থেকেই রান্নার প্রস্তুতি শুরু করেন কৃষকঘরের বউঝি। তারা কাচামরিচ, রসুন, পিয়াজ বাটা করে রেখে ঝোলহীন রান্না করে নতুনচালের ধোয়া উঠা ভাত পরিবারের সাবার পাতে পরিবেশন করেন। পোনার তরকারিতে কাচা মরিছ বেশি না হলে খাওয়া জমেনা। কৃষক পরিবারের ছোটবড় সবাই তৃপ্তির ঢেকুর তোলে ভাত খেয়ে বোরো ধানের ভাড়ারঘেষা বিছানায় দেন তৃপ্তির ঘুম। এভাবেই যুগযুগ ধরে সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের কৃষকরা টাকিমাছের পোনা ধরে আয়েশে রসনা তৃপ্তি করে আসছেন। এই মওসুমে এই পদ্দতি পোনাধরা ও খাওয়া এই অঞ্চলের চিরায়ত সংস্কৃতিতে স্থান করে নিয়েছে। যা এই অঞ্চলের লোক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
সুনামগঞ্জ সদর থানার মোহনপুর গ্রামের প্রবীণ কৃষক মোঃ নছিব উল্লাহ বলেন, ‘ ১০ বছর আগেও হখলের ঘরে অছু থাকতো পনা ধরার লাগি। এখন ১০০ কৃষকের ঘরের মাঝে একজনরে কাছেও কোন অছু নাই। অছুর বদলে জাগা নিছে কারেন্টের জাল।’ তিনি বলেন অছুর পোনার স্বাদই আলাদা। একই গ্রামের কৃষক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘বেশি খুজাখুজি লাগেনা...জুইতমতো সকালে-বিকালে এক খেউ দিলেই অয়...! তার মতে ভাকেতর সঙ্গে পৃথিবীর শ্রেষ্ট মজাদার তরকারি হলো পনার সালুন...!
শাখাইতি গ্রামের কৃষক সমুজ আলী বলেন, ‘নতুন গরম বোরো ভাতের সঙ্গে পয়লা পয়লা পনা না অইলে খাওয়া জমেনা।’ তিনি জানান, সারা বছরটাই যেন এর জন্য তার ফাকা ফাকা লাগে! তাই নতুনভাতের সঙ্গে সপরিবারে ঝোলহীন কাচামরিছ বহুল পোনামাছের তরকারি দিয়ে এই সময়ে ভাত না খেলে ভাত হজম হয়না তার।

সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৪১
৬টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×