আমরা যখন যৌন নিপীড়নের কথা বলি বা ভাবি তখন সংবেদনশীল আধুনিক মানুষও ধর্ষণ ছাড়া অন্য কোন ঘটনাকে বিবেচনায় আনতে বা অপরাধ বলে মানতে কেমন যেন ইতস্তত করে। মনে হয় আইনী বা তথাকথিত নৈতিকতায় সুপ্রমাণিত ধর্ষণ, ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত দেহ এবং প্রায়শই মৃত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নারীর বিরুদ্ধে তেমন কোন অপরাধ সংঘটিত হয়নি। যা হয়েছে তা হল একটু ঠাট্টা একটু মজাক বা চেতনার গোপন প্রকোষ্ঠে ”এইটাতো হইবই মাইয়ারা কি কম রং ঢং করে, হেরাই জাগাইয়া তোলে”। অথবা অন্যদিকে ইভ টিজিং, অসম্মত স্পর্শ ইত্যাদি নিয়ে কথা বললে, এইটাকে প্রেমের বা যৌনাকাঙ্খা প্রকাশের বৈধ অথবা খুব বেশি সংবেদী হলে একটু মাত্রারিক্ত পন্থা হিসেবেই গণ্য করে। যা অন্যকিছু হলেও অপরাধ নয় (গণ্য তাকে করতেই হয় কেননা নারী নিয়ে তার কল্পনায় এর সবগুলোই আসলে বৈধ)। আর এই সমস্ত চিন্তা স্রোত একজন পুরুষের। আর সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র নানাভাবে এই চিন্তাকে হাওয়া দেয়, জিইয়ে রাখে। কেননা রাষ্ট্র ও তার ব্যবস্থাপনা মূলত পুং-বাদী, যৌণবাদী।
জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়েই নারীর প্রতি নিপীড়ন ও সহিংসতা হর হামেশাই ঘটে চলেছে। এইটাকে মাত্রা বা প্রকাশিত তথ্যের মধ্য দিয়ে বিচার করার কোন অর্থ নাই। কিংবা এই সুখ পাবারও কোন সুযোগ নাই যে আমাদের এখানে এসব ঘটেনা, এগুলা “ঐ-খানে” হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ, সত্যাসত্য কমিটি ধানাই-পানাইয়ের পুরাতন রাস্তাতেই হেঁটে চলেছে। তারা কাল-ক্ষেপণের মধ্য দিয়ে নিজেদের শিশ্নবাদীতাকে নানা মোড়কে টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। পুরো বিষয়টাকে “পাকাপোক্ত প্রমাণ” আর “দূর্বল প্রমাণের” এমন একটা রাস্তায় চালিত করতে চাইছে যা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। আলোচনায় এসেছে যে অভিযুক্ত শিক্ষক, শিক্ষক রাজনীতির শিকার হতে পারে তাই আরো খতিয়ে দেখা দরকার। বাহ! কি চমৎকার , উভয় দিক দিয়েই প্রতিবাদকারী আক্রান্ত নারীদের অবস্থান হয়ে গেল শিক্ষক রাজনীতির পুতুলের আর কোন কিছুর নয়। ফলে মুখ্য বিষয় আর এখন নারীর নিপীড়নের নয় তাকে বিদ্বত পুংবাদী শিক্ষক সমাজ কীভাবে ব্যবহার করছে সেটির যেন। আর এই প্রক্রিয়ায় বাদ পড়ে যাচ্ছে নিপীড়নের বহুল উদযাপিত সংস্কৃতি এবং চর্চা। অর্থাৎ সমাধান হল এবার বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থার কাছে প্রমাণের জন্য নারীদের রক্তাক্ত এবং ক্ষতবিক্ষত হয়ে ধর্ষিতই হতে হবে ও ধর্ষণের চিহ্ন আইনী ব্যাবস্থার কাছে প্রমাণের জন্য বহন করে বেড়াতে হবে। সঠিক সময়ে দেখাতে না পারলে আবার আক্রান্ত হয়ে আসতে হবে।
পুং ও যৌনবাদী শিক্ষক সমাজের কেউ কেউ আবার বলছেন যে নিপীড়ন বিরোধী নীতিমালা হলে এখন থেকে দুইজন নারী আর একজন পুরুষ মিলে শিক্ষকের চাকুরী বাতিল করে দিতে পারবে। আহা শিক্ষার্থীদের কতই না ক্ষমতা, নারীর কতই না স্বাধীনতা। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঁঠাল গাছের ইজারা নিয়ে শিক্ষকরা মারামারি করেন, নিজ স্বার্থবিরোধী আন্দোলনকে নস্যাত করার জন্য ক্যাডারদের ব্যবহার করেন। প্রথম বর্ষ থেকেই অনুগত দলবাজ তৈরী করার জন্য বিদ্যায়াতনিক রাজনীতিতে প্রাণপাত করেন। তারা নিজ দলের বিরুদ্ধ স্বরকে কতই না জায়গা দেবেন। এসব হাস্যকর বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কিছুই শোনায় না। বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষমতা কাঠামোয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ক্ষমতা বৈষম্য ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত এবং বৈধ।
যদি আদর্শ অবস্থার কথা কল্পনা করি (যদিও এই কল্পনা এখন দূরুহু) তাতেও শিক্ষক শিক্ষার্থীর যোগাযোগ হবার কথা সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও সততাপূর্ণ, ম্যানিপুলেটিভ নয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার প্রেম ও যৌণ সর্ম্পকের প্রসঙ্গ উঠলেই যেসব মোল্লাপন্থীদের চেতনা ভীষণভাবে নাড়া খেয়ে ওঠে তারা এক কথায় বলে দেন যে এইসব জিনাহর ফলেই আজকের এই বিশৃঙ্খলা। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হবে দূরত্বমূলক এবং অস্পর্শী। যেন অস্পর্শেই নিপীড়ন বন্ধ হয়ে যায়। পুং দৃষ্টির নিরন্তর লেহন প্রক্রিয়ায় নারী আক্রান্ত হতেই পারে না। এরপর আসে খুবই জনপ্রিয় পুংবাদী থিসিস যে নারীরাই নিজেদের ক্যারিয়ারের জন্য নিরন্তর নিজেদের শরীর ব্যবহার করেন। যেগুলি আবার সামষ্টিক আন্দোলনকে থিতিয়ে বা থমকে দেবার জন্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রশ্নটা উল্টে দিলেই অবশ্য ঘটনা পরিষ্কার হয়ে যায়, অর্থাৎ পুরুষ শিক্ষকেরা ভালো ফলাফল করিয়ে দেবার বাসনা দেখিয়ে এখন নারী শিক্ষার্থীর শরীরকেও বাদ দেন না, এবং শিক্ষার্থী বিশেষত নারী শিক্ষার্থী এতটা ক্ষমতাহীন যে শিক্ষকের প্রভুত্বমূলক ইচ্ছার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার কোন জো থাকেনা? ফলে নারী শিক্ষার্থীদের নিপীড়নের বিষয়টিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর প্রেম ভালোবাসার সর্ম্পকের প্রথাগত গল্পে (যেটা আবার খুবই পুংবাদী) পাঠ করা আরও বিপদজনক। দুজনের অবস্থানগত ক্ষমতা বৈষম্য বিস্তর।
নিপীড়ন বিরোধী আইন নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ আন্দোলন কম হয়নি। যদিও ব্যবস্থা সেটি নিয়ে টালবাহানা অব্যাহত রেখেছে। এটি হল সেই ব্যবস্থা যা মূলত পূংবাদী ও যৌণবাদী, এর টালবাহানাও অনুরূপ। বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থী আক্রান্ত হতে পারেন সকল ক্ষেত্র হতেই যেমন সহপাঠীর কাছ থেকে, শিক্ষকের কাছ থেকে, দারোয়ানের কাছ থেকে, প্রেমিকের কাছ থেকে এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছ থেকেও। নিপীড়ন বিরোধী নীতিমালা ও আইন হলেই যে সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে তেমনটা হয়ত আক্রান্তরা কল্পনা করেন না। কিন্তু প্রতিরোধের রসদের জন্য একটা শক্ত পাটাতন তৈরী হবে। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হল সেই চেতনা, যেটার কারণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জেগে উঠেছেন। বন্ধুর প্রতি সহপাঠীর প্রতি সংঘটিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন, গর্জে উঠেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি নিপীড়নের অভিযোগ উত্থাপন যেকোন শিক্ষকের জন্য সবচেয়ে ন্যাক্যারজনক ঘটনা। কিন্তু লজ্জা বা মনোবেদনার মিহি পথটার চাইতে আমি এর ব্যবস্থাপনাগত রাজনীতিটাকে খোলাসা করতে আগ্রহী। বিদ্যমান আন্দোলন সিদ্ধান্ত দেবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ৫ই আগষ্ট পর্যন্ত সময় দিয়েছে। নানা টালবাহানায় প্রশাসন আরো দুই মাস সময় চেয়েছে এবং শাস্তি প্রদান প্রক্রিয়াকে প্রলম্বিত করছে। এটা আসলে পরিণামে নিপীড়ক ব্যবস্থার জন্য সহায়ক হয়ে উঠছে।
আর একই সাথে আক্রান্ত ও প্রতিবাদরত শিক্ষার্থীদের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠছে। নিপীড়ক ব্যবস্থাপনা পরিশেষে যে গল্পটাই প্রতিষ্ঠা করতে চাক না কেন, মনে রাখা দরকার যে এতে প্রতিবাদকারী নারীদের অবস্থার বাস্তব পরিবর্তন ছাড়া এর কোন মানে নাই। আমি প্রত্যাশা করি নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের পাশে সকল সচেতন মানুষজন এসে দাঁড়াবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

