আমার গত ৫ বছরের জীবনে ৩ জন সায়মাকেই আমি চিনতাম এদের একজন সহপাঠী, একজন শিক্ষিকা এবং আরেক জন বিভাগের বড় আপু। এই তিনজনের কারো সাথেই নৈকট্যমূলক সর্ম্পক বিদ্যমান ব্যবস্থার (শিক্ষক, সহপাঠী এবং আপু) বাইরে যায় নাই। তবুও সায়মা নামটা ভূতের মত একমাস ধরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইল। ক্যামনে বেড়াইল ইহাই বর্ননা করি এখন।
২রা জুলাই দুপুর ২টায় ভাত খাচ্ছি এমন সময় ফোন। একটি তরুন কন্ঠ আমার বড় নাম এবং পিতা মাতার সঠিক নাম উল্লেখ করিয়া জানাইলো, ”আপনি কি সায়মাকে বিয়ে করবেন? আমি বলিলাম কেন? সায়মা কে? তাকে বিয়া করবার কি আছে? সে বলিল না আপনাকে বলতেই হবে। আমি বলিলাম বাছা তোমার প্র্যাঙ্ক করিবার যে বাসনা জাগছে তা ঠিক আছে কিন্তু নাটক ভালোমত সাজাও। আর তোমাকে যে নারীকন্ঠ কথাবার্তা শিখাইয়া দিচ্ছে তাকে জিগ্গেস কর কেন সে একটা ভালো নাম উল্লেখ করতে পারে নাই। তাহলে আমি আগ্রহী হইতাম। বালকটি একটু হোঁচট খাইল, সে এবার সরাসরি ভাইয়া ডাকিয়া বলল, তার মানে আপনি সায়মাকে বিয়েই করবেন না? আমি বললাম, আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমার সাথে দেখা হবে, দেখি তুমি সে সময় পর্যন্ত টিকে থাকতে পার কিনা। বালকটি ভয় পাইয়া ফোন রাখিয়া দিল। আমি তাদের প্র্যাঙ্ক করিবার দূর্বলতা দেখিয়া মনে মনে হাসিলাম। নতুন পোলাপানরা বোকা হইয়া যাইতেছে, কোন ক্রিয়েটিভিটি নাই।
সেইদিন দিবাগত রাতে দুপুরের ঐ নাম্বার থেকে মেসেজ আসিল, “আপনার সায়মা এখন ফোনে কথা বলছে। এতো রাতে আপনি ছাড়া অন্য ছেলের সাথে কথা বলা কি উচিৎ? ১৫দিন পরপর দেখা করা রিকশায় ঘোরা এগুলা কি ঠিক? সায়মাকে উঠায়া নিয়া যান।“
আমি অত্যন্ত বিরক্ত হলাম। প্র্যাঙ্কের স্তর কি হারে নিম্নগামী হয়েছে এটা ভেবে এবং অত:পর নির্বোধের মত নক করার প্রচেষ্টা দেখে।
এই কাহিনী কয়েকজন বন্ধুর সাথে আলাপ করতেই তারাও বিরক্ত হইল, কয়েকজন জুনিয়ার ফাল দিয়া উঠিল। অনেক পীড়াপিড়ী করিয়া মহা উৎসাহে নাম্বার নিয়া তারা ৩ ঘন্টার মধ্যেই নাম্বারটি প্রায় বন্ধ করিয়া দিল। তাহারা তেমন কিছুই করে নাই কেবল কিছুক্ষণ পরপর ফোন করিয়া বলে, আজকে কি বার? এখন কয়টা বাজে? মজার বিষয় হইল এই সময়ে ফোন ধরছিল একটি নারী কন্ঠ। তিনি বেশিক্ষণ টিকতে না পারিয়া তাদের কাছে ক্ষমা চাইলেন এবং এটাও স্বীকার করিলেন যে মাঝে মাঝে এই নাম্বারটি তিনি বিশেষভাবে বিশেষ কাজে ব্যবহার করেন। পরদিন এই সংবাদ পাইয়া আমি ভাবিলাম যাক ঘটনার ফয়সালা হইয়া গেল।
কিন্তু না, ৫ই জুলাই সেই নারী আবার ফোন দিলেন এবং আমাকেই। তবে অন্য নাম্বার থেকে। আমি নিজের পরিচয় দিলাম, জানাইলাম থিসিস আর পরীক্ষা নিয়া ব্যস্ত আছি। একসময় তার পরিচয়ও জানতে চাইলাম। তিনি জানালেন তার নাম রীমা এবং তিনি ঢাবিতে কম্পিউটার সাইন্সে মাস্টার্স করছেন। এরপরই তিনি স্বীকারোক্তি করলেন দেখেন ভাইয়া আমি আপনাকে ডিস্টার্ব করতে চাইনা শুধু কয়েকটা তথ্য দিতে চাই। তবে তার আগে বলেন আপনি আরিফ ভাই তো? আমি মনে মনে বলিলাম মহামুসিবত তো, আমি যেখানে নিজের নাম আর কাজ বলিয়া দিলাম সেখানে তিনি আবার আরিফ ভাইয়ের কথা কয় ক্যান? এইবার আমি তাহার সূত্র অনুযায়ী ছোট্ট একটা প্র্যাঙ্ক করিবার প্রস্তুতি নিলাম। বলিলাম হ্যা আমিই আরিফ বলেন। তিনি বলিলেন, জানেন আপনার আর সায়মার সর্ম্পকের শত্রু কারা? আমি বললাম নাতো!!!! তিনি বয়ান করে চললেন। কিছুদূর পর্যন্ত শুনে আমি বললাম এখন রাখি। তিনি বললেন, আপনার সাথে আমার সরাসরি দেখা হওয়া দরকার আরো অনেক তথ্য আছে। আমি বললাম ক্যাম্পাসে গেলে দেখা হবেক্ষণ। প্রশ্ন এক ঢাবির মাইয়া জাবিতে কি করে? প্রশ্ন দুই আমার নাম জানার পরও তার আমারে আরিফ ভাই বানানের হাউস ক্যান?
আমার পরীক্ষার মাঝেই আবার সেই নারীকন্ঠ অর্থাৎ কথিত রীমার মেসেজ। “ভাইয়া আপনি কি জানেন সায়মার এক্সামের মাঝেই মানে এই মাসেই বিয়ে হবার ডিসিশন হচ্ছে? সায়মা ৬ ও ২০ শে জুন তার সাথে মিট করছে। নেক্সট কবে মিট করবে আমি তাও জানি। আপনি কি আজ ক্যাম্পাসে আসবেন?” আবারো ঢাবির মাইয়া জাবিতে কি করে? তার কি অন্য কোন কাম কাজ নাই?
এরমাঝে রীমা ভীষণ অস্থির হইয়া গেলেন এবং আমার তরফে কোন রেসপন্স নাই পাইয়া লিখিলেন, “ভাইয়া এই এক উইকে কি ১দিনও ক্যম্পাসে আসেননি? বিকজ আপনার জন্য অনেক ইনফো আসে প্লাস আই নিড ইয়োর এস বিগ ব্রাদার”
আজব! আমি তার বিগ ব্রাদার হইলাম কবে?
এরপর আবার ১৬ই জুলাই মেসেজ, “আপনি যদি সায়মাকে ভালোইবাসেন, তবে তাকে অন্য ছেলের সাথে কথা বলতে কেন দিচ্ছেন? কাল রাতে সায়মা রাত ২টা পর্যন্ত ঐ ছেলের সাথে কথা বলসে। ক্যামন ভালোবাসা আপনার?”
আরে আমি কবে কইলাম সায়মারে আমি চিনি তারে আমি ভালোবাসি?? আমার তখনি মনে হল তারে ঝাড়ি দিয়া বলি এইসব ফালতু আলাপ বন্ধ করেন। আবার মনে হইল শিশুদের একটু প্র্যাঙ্ক শেখানোও দরকার। আর তিনি যখন সব জেনে বুঝেই এসব করছেন।
এরপর ১৮ই জুলাই শুক্রবার সকালের মেসেজ, “ভাইয়া আপনাকে অনেকগুলো ইনফরমেশন দেবার দরকার। আমি যা বলছি তা ১০০% ট্রু। আমি এখন বিজি ঠিক ১০:৩০ এ আপনাকে ফোন দেব। প্লিজ রিসিভ করে আমার দেয়া ইমপ ইনফরমেশন গুলো শুনবেন।“
আমি তখন এসাইনমেন্ট নিয়া দৌড়ের উপর। এরপর তিনি ফোন করেই গেলেন, করেই গেলেন। কি অপরিসীম ধৈর্য্য। সোবহানাল্লাহ।
সেদিন রাতে পরপর চারটা মেসেজ,
“আপনি ফোন রিসিভ করলেন না তাই এসএমএস পাঠালাম। আমি সায়মার দেখা করার কথা বলছি তা আপনি ওকে বলছেন। সায়মা ওর মাকে বলছে। এখন ওর মা আপনাকে শায়েস্তা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বোকামী করছেন।“ উই মা!!
“শত্রুকে কখনো বুঝতে দেয়া উচিৎ না যে শত্রুর উপর নজর রাখছেন। তাহলে শত্রু সাবধান হয়ে যায়। সায়মা ঐ ছেলের সাথে দেখা করছে ২০শে জুন পিজা হাটে। ও আপনার কাছে অস্বীকার করছে তাই না?” কি জটিল মাইয়ারে বাবা!!!
“ও এখন ঐ ছেলের সাথে দেখা করতে পারছে না কারণ ঐ ছেলের যশোরে পোষ্টিং হইছে । ঐ ছেলের ফাদার আর সায়মার পেরেন্টস ওকে দিয়ে সারাদিক কথা বলায় যেন ঐ ছেলে সায়মার মায়ায় পড়ে যায়।“ কি বুদ্ধি?!!!
“সায়মার যদি ৪০% দোষ হয় ৬০% দোষ ঐ তিন জনের। আগস্ট মাসে এক্সাম শেষ হলেই বিয়ে। ছেলের বাবা বলছে সায়মা যদি ১০ বিয়েও করে তবু তার ছেলের সাথে বিয়ে দেবেনই দেবেন। সে ফরিদপুর থাকে।“ উরে উপকারী বন্ধুরে...আমি ভাইসে গেলাম।
কি মহাকাব্যরে বাবা। এরপর ২৪শে জুলাই মেসেজ, ”আপনার কাছে সায়মা কোনদিনও স্বীকার করবেনা ২টা পর্যন্ত কথা বলছে। সায়মার সাথে সাথে আমিও ঘুমাইনি। পার্থক্য এইটুকু যে ও কথা বলে সুখে ঘুমাতে পারেনি আর আমি দু:খে ঘুমাতে পারিনি।“ এখন তো দেখি সায়মার চেয়ে রীমাই কথিত আরিফের প্রতি বেশি টান। হা হা হা, নাকি আমার প্রতি?
এদিকে বন্ধু মহল ইতোমধ্যে আমারে সায়মার জামাই প্রেমিক বানাইয়া একাকার অবস্থা। যে যেভাবে পারে ভিন্ন ভিন্ন থিসিস দিচ্ছে। প্র্যাংকটা এখন এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে সত্যি মিথ্যা আলাদা করার কঠিন। আমি মোটামুটি তিতিবিরক্ত। এইটা নিয়ে প্রকাশ্যে ঝাড়ি দিলে মেয়েটার জন্য খুব ভালো ফলাফল আনবেনা দেখে চুপ মেরে আছি।
কিন্তু না...তিনি তো বল বীর চীর বন্ধুত্বে মমশির। ৩১শে জুলাই জ্বরের মধ্যে ফোন। ঘুম আসি আসি করছিল তার মাঝেই ফোন। রিসিভ করেই বুঝলাম সেই বান্দা। অন্য আরেকটা নাম্বার থেকে ফোন করছেন। কোন কথা না বলেই তিনি আমাকে মর্মদন্তু খবরটা দিলেন, “ভাইয়া জানেন গত পড়শু সায়মার বিয়ে হয়ে গেছে? এমনিতেই জ্বর তার উপর ইনি। আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, আচ্ছা বলেন তো আপনার বন্ধুর সাথে আরিফের (তার ভাষ্যমতে আমার) প্রেমটা টিকিয়ে রাখার জন্য আপনি এত উতলা ছিলেন কেন? আপনার উদ্দেশ্যটা কি? তখন তিনি বললেন, আগে আপনি বলেন আপনি সেই লোক কিনা আপনি আরিফ কিনা? আমার একবার মনে হল যে প্র্যাঙ্কটাকে আরো কিছুদূর পর্যন্ত নেই কিন্তু তারপর মনে হল যে যথেষ্ট বিরক্ত আমি। তাকে বললাম, আমি যে আরিফ না এইটা বুঝতে আপনার একমাস সময় লাগল? এবং এখনও আপনি আমার সাথে কথা বলছেন?
তিনি আর কথা বলতে পারলেন না....ফোনটা কেটে গেল। জনগণের জন্য একটা ছোট্ট কুইজ: বলেন তো আমার তরফে কোন যোগাযোগ বা খোঁচাখুঁচি না হইলে এই কাহিনী কি শেষ হয়ে গেল নাকি আরো আছে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

