তো, যা বলতে শুরু করেছিলাম; পাঠ্যের কেবলমাত্র যে অংশটুকু আমার মনে এখনো দাগ কেটে আছে তা হল আত্মজীবনীমূলক রচনা। খুব মনে পড়ে একটি নদীর/বটগাছের/পয়সার আত্মকাহিনী মন কেড়েছিল। মনে হয়েছিল অভিনব কিছু দেখছি, কোনকিছুর মধ্যে প্রবেশ করছি। যদিও প্রায়শই একঘেয়ে বিয়োগান্তক সুরের মধ্য দিয়ে এই রচনাগুলো শেষ হোত। একটা আবেগী চেষ্টা হিসেবেই পরিসমাপ্তি ঘটছে তবুও হয়ত কাঁচা মাথায় খানিকটা শিল্প এর মাঝে খুঁজে পাওয়া যেত। আজকের গল্প একজন রণ-পা শিল্পির, শিল্প আর ভিক্ষাবৃত্তির দূরত্ব সর্বকালেই সকল স্থানেই কম, আমাদের গল্পের ইনিও খেলা দেখিয়েই জীবিকা নির্বাহ করেন।
রণ-পা অর্থাৎ দুটো বাঁশের উপরে পা রেখে ভারসাম্য করে দাঁড়িয়ে থাকা বা এগিয়ে চলাকেই আমরা ঐতিহাসিকভাবে রণ-পা হিসেবে চিনি। একসময় যুদ্ধে এই পায়ের ব্যবহার হোত শত্রুকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে। তখন থেকেই এর নাম হয় রণ-পা। সময়ের সাথে সাথে রণ-পা ক্রমান্বয়ে বাজিকরের খেলায় রূপান্তরিত হল। আর সাম্প্রতিক সময়ে এই খেলাও বিলুপ্তির পথে। একবিংশ শতকের ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ীর দেখা মিললেও ধানমন্ডি লেকে রণ-পা আর তার বাজিকরের দেখা পাওয়া অনেকের জন্যই বেশ চমকের ছিল, আমার জন্যও। এক বিকেলে, রঙীন আর আকর্ষনীয় সাজে সজ্জিত একজন বয়ষ্ক মানুষ বেশ করে সিরামিকের ইটের রাস্তা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আর লোকজন তাকে দেখছে এই সমস্ত দৃশ্যটা একটা অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি করে।
তিনি কথা বলছেন উচ্চস্বরে, হাত-পা নেড়ে নেড়ে। এই কালে আমরা নানান বিষ্ময়ের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত, এমনকি প্রস্তুত যে, এটা না বুঝেই। বোকা বাক্স আমাদের প্রতিনিয়ত যেভাবে ফিয়ার ফেক্টর, এমেজিং রেইস, ম্যাজিকস সিক্রেট আরো নানান রিয়েলিটি শো দিয়ে বুঁদ করে রেখেছে তাতে আমার সন্দেহ হচ্ছিল রণ-পার বাজিকর এই চলমান দর্শকদের কীভাবে মুগ্ধ করবেন বা আদৌ মুগ্ধ করতে পারবেন কিনা, আজকের আয় প্রত্যাশামত হবে কিনা। বাজিকর অবশ্য আমার প্রাথমিক অনুমানকে ধুলিস্যাৎ করে দিয়ে বিপুল শক্তি আর উদ্যোমে নিজের কাজ করে চলছিলেন।
বাঙালী দর্শকদের অসামান্য কৌতুহল আর বিনোদন লিপ্সা। তারা পৃথিবীর প্রায় সবকিছুকেই গভীর মনোযোগ দিয়ে এবং কৌতুহলের সাথে গ্রহণ করতে পারেন। বক্তৃতায় নেতানেত্রীরা পরস্পরের কাপড় খুলে ফেললেও তারা মনোযোগ দিয়ে দেখেন শোনেন, সংসদে গণতন্ত্রের পর্ণও তারা সহ্য করেন, এমনকি নিজামী সাঈদীসহ সকল রাজাকারদের জনসমক্ষে হত্যা না করে তারা নতুন রাজনীতির খেলার জন্য অপেক্ষা করেন। আমাদের বাজিকরের তাই দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষনও আর অসম্ভব থাকে না। এছাড়া দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সাহস আর কারিশমার জোরে তিনিও খুব ভালো করেই জানেন কি করে কি করতে হয়। তিনি মনোযোগ আকর্ষন করে খানিক বিশ্রাম নেন।
তিনি ধনী এলাকার এইসব ধনী মানুষদের কাছে বেশি কিছু চান না তিনি কেবল দুই টাকা চান। এমনকি তিনি এই কাজও আর করতে চান না। আবেদন করেছিলেন বহু গণ্যমান্য মানুষের কাছে একটা আশ্রয় একখন্ড জমির জন্য। কিন্তু সবকিছুতেই ঘুষের প্রয়োজন। বিশেষ করে তিনি মনে করেন চাঁদপুরের মানুষ খারাপ তাদের চেয়ারম্যান এক বান্ডিল টিনের বরাদ্দের জন্যও ঘুষ চেয়েছিলেন, তার বয়ষ্ক ভাতার জন্যও কমিশন চেয়েছিলেন।
আমাদের মানুষজন বিনোদিত হন দয়ার্দ্র হন তারা বিনয়ের সাথে কিছু টাকা এগিয়ে দেন। একজন উঁচু মানুষকে টাকা দিতে কোথায় যেন সতর্ক হতে হয়, যাতে তার সম্ভ্রমে কোন আঘাত না লাগে।
বয়ষ্ক বাজিকর আবার বিশ্রাম নেন, তার অভিজ্ঞতা ক্রোধ আর ক্যারিশমা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন আর আয়ের রাস্তাকে আরো খানিকটা উন্মুক্ত করেন তেমনি গোপন কষ্টের কথাও বলে।
আমাদের সমাজে আমরা সাধারণত বয়ষ্ক শক্তিশালী মানুষ দেখিনা, হয়ত দেখতে চাইও না। আমাদের রাষ্ট্রপতি কথা জড়ানো বুড়ো, আমাদের বিরোধী দলের ভাষ্যকার মুখে থুথুওয়ালা দেলোয়ার। আমাদের নতুন প্রজন্ম শক্তিশালী মেধাবী বয়ষ্ক মানুষ দেখে হ্যারিপটারের শিক্ষক হিসেবে। আমি দেখতে পাই আমাদের বাজিকর তাদের সবার চেয়ে শক্তিশালী হয়ে হেঁটে চলেছেন, আর প্রতিটা পদক্ষেপে বলছেন ইয়া রহমতুল্লাহ! ইয়া রহমতুল্লাহ!
আমরা ভিড় করে থাকি, আমরা জড়ো হয়ে থাকি এই উঁচু মানুষটিকে ঘিরে। আমরা উঁচু যে কোনকিছুকে সম্মান করি, ভয় পাই কিন্তু নিজেরা উঁচু হতে চাই না। আমাদের শাসন করে কিছু মূর্খ মানুষ আর নির্বোধ নিয়ম।
বুজুর্গের মত তিনি হেঁটে চলেন নতুন দর্শকের খোঁজে। নতুন আয়ের উৎসের খোঁজে। আমার এও মনে হয় তিনি হেঁটে চলেছেন অভিজ্ঞতার অভিমানে।
তিনি নেমে পড়েন নিজের উঁচু পা দুটো থেকে। আর বলতে থাকেন আপনারা কি ভয় পান? আমি নীচ আইতাছি দেন না আমারে দুইটা টাকা দেন না।
মানুষজন বিনোদিত হয়, ভয় পায়, তাদের করুণা হয় তারা টাকা দেয়।
তার পরিশ্রমী হাতের গঠনে আমি চমকিত হই। দীর্ঘদিনের শ্রমে হাতের হাড়ের গঠন গেছে পাল্টে। এই পরিশ্রমী হাতে সুলতানের পেশীর চিহ্ন, মুক্তিযোদ্ধার দৃঢ়তার চিহ্ন। এই হাড়ে দারিদ্রেরও চিহ্ন, ভিক্ষারও চিহ্ন।
এরপর তিনি তার রুটিন পারফর্মমেন্সের বাইরের কেউ হয়ে ওঠেন, সাজানো গোছানো পেশাদারী চিৎকারের ভেতর থেকে কে যেন চিৎকার করে আমারে ট্যাকা দিবেন না?, দেন না দুইটা টাকা দেন না? আপনারা তো ১০ ট্যাকার নিচে পানিও খান না আমারে দেন না দুইটা টাকা দেন না? কি হয় আপনাদের? আমিতো আর এই কাজ করতে চাই না দেন না আমারে একটা ঘর দেন না। এই দৃশ্যটা বাজিকরের ঠিক হাঁটুর বয়সী একজন ছেলে দেখছিল।
পারফর্মমেন্সের একদম শেষদিকে তিনি কারো বা কোন কিছুর দিকে নির্দেশ করে কিছু বলছিলেন হয়ত আয়ের শেষ চেষ্টা বা শেষ এ্যাক্টটা। তবে এটাও কেবল এ্যাক্ট ছিল কিনা তা ঐ শিশুটার মতই আমিও বুঝিনি।
তো দেখা গেল পাঠক আমিও শেষ পর্যন্ত আত্মজীবনীর রচনা লিখতে গিয়ে কেমন যেন বিয়োগান্তক বিয়োগান্তক করে ফেললাম। বাজিকর অনেকক্ষণ ধরেই আমাকে খেয়াল করছিলেন, শেষের দিকে আমার কাছে এসে বললেন কোন পত্রিকায় আছি, আমি বললাম আমি ইন্টারেনেটে লিখি আর ছাপাই। তিনি একটু রুষ্ট হলেন বললেন নাহ!! আপনি পত্রিকার হইলে আরো কিছু বলতাম। যাই হোক আমার নাম নুরুল ইসলাম, থাকি মিরপুর, লোকে আমারে বাঁশ পাগলা হিসেবে চিনে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


