বিবেকের কাছে প্রশ্ন করি
২৮ শে নভেম্বর, ২০০৭ রাত ১২:১৫
২০-২৫ জনের একটা দল স্পেনের মালাগারে যখন ছোট্ট একটা নৌকা নিয়ে ভিড়ল তখন বাজে রাত ২টা কয়েক মিনিট । তাপমাত্রা মাইনাস হলেও কারর গায়ে শীতের কোনো কাপড় নেই । তার মধ্যে কয়েকজন নদীতে সাঁতার কেটেছে নৌকা ডুবির ভয়ে । তাদের অবস্থা খুবই খারাপ । মূল দলের মধ্যের কয়েকজন তাদের পিঠে নিয়েছে । এবার তিন ঘন্টার মত হাঁটা বন-জঙ্গলের মধ্য দিয়ে । কারর মুখে কোনো কথা নেই । নিরবে হেঁটে পাড়ি দিতে হবে । আজ দুই-তিন দিন কারর মুখে এক দানা শুকনা খাবার মুখে পড়েনি । এতদিন এক খুবচির ভেতর ঘাপটি মেরে ছিল সবাই । আজ রাতেই দালালের অনুমতিতেই পাড়ি দেওয়া ইউরোপের উদ্দেশ্যে । জ্বল জ্বল চোখের স্বপ্নের পাশ্চাত্য । সবারই একটাই উদ্দেশ্য : খেটে খুটে দেশে টাকা পাঠানো, সেই টাকায় পরিবার চালানো ।
ভোর চারটার কিছু আগে ৪জন মারা গিয়েছে সয্যহীন ঠান্ডায় । ওখানেই ফেলে রাখতে হয়েছে লাশ । কিছুই করার নেই । যত দেরী তত বিপদ । পুলিশের ভয়, একবার জানতে পারলে সবারই বিপদ । কেও টু শব্দ করলো না । নীরবে চোখের পানি ফেলা ।
সামনে কাটাতারের বেড়া পড়েছে । অনেক উঁচু । পুলিশ পাহারারত,সুতরাং বুঝে শুনেই এগোতে হবে । কয়েকজনের কাছে কুকুর দেখা যাচ্ছে । চারদিক অন্ধকার । দালাল ৪-৫ জনের ৩টা গ্রুপ করে দিল । সবাই একসাথে একি রাস্তায় পার হওয়া বিপদজনক । সেজন্যই এই ব্যবস্থা ।
কাটা তারের বেড়া পার হওয়ার মুহুর্তে পুলিশের ধাওয়া খেল একটা গ্রুপ । তার মধ্যে ৩জন বাঙালী । দ্রুত পার হওয়ার সময় শরীর ছারখার হয়ে গেল । তারা ওখানেই পড়ে থাকল ।
আরেকটি দল দূর থেকে এটি দেখে জোরে দৌড় মেরে রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়ির চাপায় মারা গেল একজন । প্রচন্ড শীতে, না খাওয়া অবস্থায় সবাই খুবই কাহিল । কিন্তু তারপরও একটা স্বপ্ন : আর কিছুদূর, তারপরেই সব ঠিক হয়ে যাবে । আমি যেয়ে একটা কাজ জোগাড় করে নেব । সেই টাকা দেশে পাঠিয়ে অনতত কিছু খেয়ে পরে বেঁচে থাকবে ।
অবশেষে পা দেয় ইউরোপ নামক সুখপাখি খোঁজার দেশে । না নেই খাওয়া, না নেই গোছল, না নেই একটু সাহস যোগাবার কেও । উঠেপড়ে লেগে যায় নিজ দেশের কাউকে খুঁজে পেতে । নতুন পরিবেশে গড়ে তুলতেই চলে যায় বেশ কিছুদিন । তারপর থেকে শুরু হয় ব্যস্ত জীবন , অসহানীয় জীবন ব্যবস্থা । ছোট ছোট রেস্টুরেন্টের মধ্যে শুরু হয় কাজ । ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত না থামা খাটুনি খেটে মাস শেষে পায় ২০০-২৫০ ইউরো । এর মধ্যেই চালাতে হয় দেশের সম্পূর্ণ একটি যৌথ পরিবারকে, চলতে হয় নিজেকে । কয়েকমাস এভাবে অস্বাভাবিক খাটুনির পর সুখপাখি খুঁজতে আসা মানুষটি হয়ে পড়ে অসুস্থ । ইচ্ছা হয়ে ওঠেনা ডক্টর দেখানোর : ডক্টর দেখানোর টাকাটুকু পরিবারের কাছে পাঠালে অনতত খেয়ে পরে বাঁচতে পারবে সেই চিন্তায় থাকে মশগুল ।
ভালোভাবে খবরের কাগজের দিক তাকালে দেখা যাবে উপরের ঘটনা প্রায়ই ঘটে । বছরের পর বছর বেড়েই যাচ্ছে এই সংখ্যাটা । যেটার মধ্যে বাংলাদেশীদের সংখ্যাও কম নয় । কিন্তু কেন ? দেশে কি এতই অকাল পড়েছে যে দেশ ছাড়তে হবে ? যদি পড়েই থাকে তাহলে দোষটা কাদের ?
সোনার দেশটা ছেড়ে হাড় ভাঙা খেটে খুটে মাস শেষে পাওয়া টাকাটার সিংহ ভাগই পাঠায় দেশে পরিবারের কাছে । দেশের কেও জানতে পারে না উপরের ঐ ঘটনা । জানতে পারেনা বর্তমানে পরিবারের কর্তার পরিস্থিতি কি । দেখতে পারেনা বুক ভাঙা কান্না জমানো খেটে খাওয়া মানুষটার মুখ ।
দোষটা কাদের ? পত্রিকার পাতা উল্টালে দেখব শখের বসে করা পারিবারিক চিড়িয়াখানার দৃশ্য, আন্ডারগ্রাউন্ডে গড়ে ওঠা স্বর্ণ-কমলের চেহারা, হাজার কোটি টাকা পাচার করার সন্ধান । ধান, গম , টিনের চাল সহ ত্রান সামগ্রী লুকিয়ে রাখা গুদোম ঘর । আধুনিক বিশ্বের আধুনিক সারঞ্জামাদী । এম পি বা মন্ত্রীদের ছেলেদের ঘরে অযথা কেনা নতুন এম পি ফোর অথবা নতুন কেনা প্লে স্টেশন । টাকা অপচয় কারীর দিনে ২ প্যাকেট বেনসন বা মালবোরো শেষ করা । অশিক্ষিত কৃষকের কাছ থেকে টিপ সই দিয়ে মেরে নাওয়া জমিটা । আজ হাহাকার গ্রামাঞ্চলের প্রতিটা বাড়ীতে । ভৌগোলিক দিক থেকেও তেমন সুবিধার স্থানে পড়েনি বাংলাদেশ । সারা বছর সাইক্লোন , ঝড় , বন্যা লেগেই আছে । নদী ভাঙনের এক রাতেই তলিয়ে নিয়ে যায় ঘরের সব কিছু ।
দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বর্তমান অবস্থা দেখনীয় । সবার পেছনের মুখটা ফুটে উঠছে । বর্তমানে সরকারের যথাযজ্ঞ প্রচেষ্ঠায় এটা সম্ভব হলো । বড় বড় তিনটি রাজনৈতিক দলই কি খেলাটা না দেখালো ২৮ অক্টোবর ! রাস্তার ফুটপথের নিরহ মানুষ মারা গিয়েও শান্তি পেলনা । ৩টি দলই নিজেদের দিকে টানা হেচড়ায় ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল দেহটা । মন্ত্রি-মিনিষ্টারদের আনলিমিট অরাজকতা আর কতদিন দেখতে হবে ? আর কয়জন বিদেশে যেতে যেয়ে মারা পড়বে বনে জঙ্গলে ? মারা পড়বে কাটা তারের বেড়াতে বিচ্ছিন্ন হয়ে ? খেটে মরবে অন্য একটা দেশে ?
আমরা কি পারিনা সবাই এক হয়ে কাজ করতে ? পারিনা পাসের গরীব পরিবারগুলোর কিছু দিয়ে থাকতে । খোঁজ নিতে পারিনা কি তারা কয় বেলা না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে । কিভাবে চলছে জীবন সংগ্রাম । আমরা আর কতটা নিচুতে স্থান নিব ? আমাদের পূর্ব-পুরুষরা একটা বিবেক দিয়ে জয় করেছিলো এই দেশটাকে পাকিস্তানীদের অত্যাচার না সয্য করতে পেরে । বাংলা নামের সুন্দর একটা ভাষাকে উপহার দিয়ে গেল তাঁরা । উপহার দিক সুবাসময় এই দেশটাকে । কিন্তু সেই বিবেকটা আজ আমাদের এ প্রজন্মের মানুষদের নেই কেন ?
বর্তমানে দেশে চলছে এক ক্ষতি-পূরণের প্রচেষ্ঠা । সিডর আক্রান্ত মানুষের নির্বাসনের প্রচেষ্ঠা । এটা দিয়েই কি আমরা পারিনা সবসময় দেশের গরীব মানুষদের বাঁচাতে । হয়তবা এই সাইক্লোনে দেশের অনেকাংশ অসুবিধা হয়ে অনেক পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে । কিন্তু আমরা কি খোঁজ নিয়ে দেখেছি স্বাভাবিকভাবেই আসেপাসের কতটা মানুষ না খেয়ে রাত কাটাচ্ছে?? আসুন না আমরা এই ক্ষতিগ্রস্তের সাহায্যের মাধ্যমে শুরু করি সারা দেশের মানুষজনের খাওয়ার অধিকারটুকু ।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে অক্টোবর, ২০১০ রাত ৮:৪১ | বিষয়বস্তুর স্বত্ত্বাধীকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
শাওন বলেছেন:
মামু , অর্ধেক সত্য অর্ধেক মিথ্যা বলা মানুষ ভালই লাগে আমার ।
মাহবুব সুমন বলেছেন:
হৃদয় ছোঁয়া
শাওন বলেছেন:
মাহবুব ভাই , অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ ।
দ্বীপবালক বলেছেন:
মামু লিখিয়াছেন ৫/৫। কিন্তু আমি ৫ দিবার আগে রেটিং দেখিলাম ০। মামু কি শুধু লিখিয়ায় সারিয়াছেন।ভাল লিখা। ধন্যবাদ
অমি রহমান পিয়াল বলেছেন:
৫
অন্যরকম বলেছেন:
অসাধারণ.....৫
শাওন বলেছেন:
দ্বীপবালক , সেজন্যই বলেছিলাম অর্ধেক মিথ্যা , অর্ধেক সত্য মানুষকে লাইক করি আমি তবে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ।
অমি ভাই প্রথমে বিশ্বাস হয়নি । পরে বিশ্বাস করলাম নিজের চোখকে ।
অন্যরকম , থ্যাংকুশ
সামী ভাই , ভালা , আপনে কেমন ? শইলডা ভালা ? মনডা ?
ধন্যবাদ ভালো লাগার জন্য ।
মুনিয়া বলেছেন:
ভাল লিখেছো... মনটা খারাপ করে দিলে। মন ভাল করার মত একটা নিউজও পাই না...
যাক গে, তবু যদি কারো চৈতন্য হয়...
শাওন বলেছেন:
মুনিয়াপু , হু , তবুও কারো যদি চৈতন্য হয় । স্বপ্নময় , ধন্যবাদ ।
---(লেখাটা মডিফাই করলাম)--
শাওন বলেছেন:
মেহরাব ভাইজান , থ্যাংক্স ।
বিবেক সত্যি বলেছেন:
অমি রহমান পিয়াল ভাইকে ধন্যবাদ এই পোষ্টে ৫ দেয়ার জন্য 
"..আমরা কি পারিনা সবাই এক হয়ে কাজ করতে ?...... আমরা আর কতটা নিচুতে স্থান নিব ? আমাদের পূর্ব-পুরুষরা একটা বিবেক দিয়ে জয় করেছিলো এই দেশটাকে পাকিস্তানীদের অত্যাচার না সয্য করতে পেরে .....কিন্তু সেই বিবেকটা আজ আমাদের এ প্রজন্মের মানুষদের নেই কেন ?"
একা আকাশ বলেছেন:
এত কথা লেখেন ,মনে হয় এক মার্ত আপনারই ওইটা আছে ,ওইটা মানে বুঝে নেন,কারন আপনার তো ওইটা আছেই,ওকে কন্টিনিঊ করেন
শিলা সুলতানা বলেছেন:
অসাধারণ! জীবনে এমন বাস্তব চিত্র তুলে আনার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। ভাল থাকবেন।
লেখক বলেছেন: ২০০৭ এর জিনিস ২০১০ এ পড়লেন । আজ দেখলাম । ধন্যবাদ আপনাকে অনেক ।
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
















৫/৫