(আমার বাবা শরীফ এ. কাফী আগামী কাল হাসপাতালে ভর্তি হবার আগে নেপাল সম্পর্কে আমার মাধ্যমে ব্লগে দুটি পোষ্ট দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এটি তার দ্বিতীয়---মাহজাবীন)
সার্কভূক্ত দেশ নেপাল। কাজেই তাদের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির প্রতি আমাদের একটি আগ্রহ থেকে যায়। ১৯৯৭ সাল থেকে দেশটিতে ১০ বৎসর ব্যাপী মাওবাদীদের জনযুদ্ধ এবং ২০০২ সালে রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহদেবকে সপরিবারে হত্যা দেশটির রাজনীতিতে আনেকগুলি মৌলিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে।
মাওবাদীদের ১০ বৎসর ব্যাপী জনযুদ্ধে সকল পক্ষে ৬০,০০০ লোক নিহত হয়েছিল। রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহদেবকে সপরিবারে হত্যা একটি ষড়যন্ত্র বলেই বেশীর ভাগ নেপালী মনে করে। ফলে তার ভাই জ্ঞানেন্দ্র রাজা হলেও জনগনের আস্থা অর্জনে সম্পূর্ণ ব্যার্থ হয়। জ্ঞানেন্দ্র তখন রাজা হিসেবে টিকে থাকার জন্য এবং রাজতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য নানা প্রকার ষড়যন্ত্র ও কুট-চালের আশ্রয় নেয়। কিন্তু নিহত রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম এর প্রতি মানুষের সহানুভূতি জ্ঞানেন্দ্রর প্রতি অনাস্থা এবং রাজতন্ত্র অবসানের দাবী জোরদার করে তোলে। এই সময় রাজতন্ত্রের শেষ দিনগুলিতে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল কমিউনিষ্ট পার্টি অফ নেপাল (ইউএমএল) নেপালী কংগ্রেসের সাথে রাজার অধীনে সরকারে যোগদান করে নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। আপরদিকে রাজতন্ত্রের আবসান এবং দরিদ্রদের জন্য জমি ও কমর্সংস্থানের দাবী জোরদার করে ইউনাইটেড কমিউনিষ্ট পার্টি অফ নেপাল (মাওবাদী) তাদের জনসমর্থন আরও সংহত করতে সক্ষম হয়। শেষ পর্যন্ত রাজতন্ত্রের পতনের মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালে গনতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে নেপাল প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়।
এর মধ্যে আর একটি দুর্ঘটনা ঘটে যায়। একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং থেকে ফেরার পথে কমিউনিষ্ট পার্টি অফ নেপাল (ইউএমএল) এর দুই প্রভাবশালী নেতা কথিত এক সড়ক দুর্ঘটনায় গাড়ীসহ ত্রিশলী নদীতে ডুবে নিহত হন। এদের দু্জনের সাথে ইউনাইটেড কমিউনিষ্ট পার্টি অফ নেপাল (মাওবাদী) নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক ছিল বলে সকলে এক বাক্যে স্বীকার করেন। সড়ক দুর্ঘটনাটি কথিত বল্লাম কারণ তাদের মৃত্যু এবং ড্রাইভারের বেচেঁ যাওয়ার ঘটনাকে নেপালীরা দুর্ঘটনা বলে মনে করে না। এটাকে তারা কমিউনিষ্ট পার্টি অফ নেপাল (ইউএমএল) এর অবিশ্বস্ত কিছু নেতার ষড়যন্ত্রে পরিকল্পিত হত্যাকান্ড বলে মনে করে। এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা এখনও আদালতে বিচারাধীন আছে।
এই সময় থেকে সাধারণ নেপালীরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, তাদের দেশের রাজনীতিতে বৃহত প্রতিবেশী, পশ্চিমা স্বার্থ ও পশ্চিমা মিত্রদের হস্তক্ষেপ ও ষড়যন্ত্র জোরদার হয়েছে।
এই রকম একটি অবস্থায় ২০০৮ সালের জুলাই মাসে নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নতুন প্রজাতান্ত্রিক সংবিধানে বর্নিত প্রতিনিধিত্বশীলতার হিসাব-নিকাশে
ইউনাইটেড কমিউনিষ্ট পার্টি অফ নেপাল (মাওবাদী) একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যার্থ হয়। প্রাক্তন রাজার অধীনে সরকারে যোগ দেয়ায় নির্বাচনে কমিউনিষ্ট পার্টি অফ নেপাল (ইউএমএল)এর ফল খারাপ হয়। নেপাল কংগ্রেসের ফলাফলও খারাপ হয় কারণ অনেক নেপালী ভোটার নানাবিধ কারণে তাদের উপর আস্থা রাখতে পারেনি। তারপরও মাওবাদীরা যাতে সরকার গঠন করতে না পারে সেই লক্ষ্যে ছোট ছোট দুএকটি গ্রুপ ছাড়া নেপালী কংগ্রেস ও কমিউনিষ্ট পার্টি অফ নেপাল(ইউএমএল)সহ সকল দল একাট্টা হয়ে বিরধীতা করতে শুরু করে।
মাওবাদীরা অথবা তাদের একটি বড় অংশ সংসদীয় পথ ছেড়ে আবার অস্ত্র হাতে জঙ্গলে আশ্রয় নিতে পারে এই রকম একটি চিন্তা থেকে শেষ পর্যন্ত কয়েকটি দল বাইরে থেকে সমর্থন দিয়ে মাওবাদীদেরকে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়। মাওবাদী নেতা প্রচন্ডের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। কিন্তু রষ্ট্রপতির পদটি ছেড়ে দিতে হয় অন্য দলকে।
সংসদে যখন কোন দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকে তখন নানামূখী ষড়যন্ত্র এবং হর্স ট্রেডিং চলতে থাকে। নেপালেও এর কোন ব্যাতিক্রম হয়নি। এই ষড়যন্ত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হয় অপসারিত রাজার লোকজন এবং রাজার অনুগত সামরিক জেনারেলরা।
এক পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ বাধা এবং ষড়যন্ত্র প্রশমনের জন্য মাওবাদী প্রধানমন্ত্রী প্রচন্ড সেনাবাহিনী প্রধানকে বরখাস্ত করার জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট সুপারিশ পেশ করেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি সেই সুপারিশ উপেক্ষা করে সেনা প্রধানকে চাকরীতে বহাল রাখেন। ফলে সরকারী কাজে বাধা প্রদান, ষড়যন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত সরকারের “সিভিলিয়ান সুপ্রিমেসী” লংঘনের প্রতিবাদে সরকার গঠনের মাত্র ১১ মাস পর মাওবাদী সরকার পদত্যাগ করে এবং রাজপথে আন্দোলনের ঘোষণা দেয়।
যে সুযোগের অপেক্ষায় সড়যন্ত্র, সেই সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় কমিউনিষ্ট পার্টি অফ নেপাল(ইউএমএল) এর নেতৃত্বে নেপাল কংগ্রেসের সহায়তায় এবং মাধেসিসহ অন্যান্য আঞ্চলিক ও ছোট ছোট দলের সমর্থনে নতুন একটি সরকার গঠিত হয় সেপ্টেম্বর ২০০৯ মাসে, যে সরকারের বয়স এখন ৩ মাস। প্রধানমন্ত্রী কমিউনিষ্ট পার্টি অফ নেপাল(ইউএমএল) এর মাধব কুমার নেপাল, একজন করে উপ-প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসের ও মাধেসি পার্টির।
মাওবাদীরা এখন রাজপথে এবং অনেকে মনে করেন তাদের জনপ্রিয়তা উর্দ্ধমূখী। নতুন নতুন অনেক পেশাজীবি গ্রুপ যারা আগে তাদের সমর্থন করতেন না, তারা এখন সমর্থন করছেন মাওবাদীদের।
এই রকম একটি অবস্থায় “মাধেসি জনাধিকার ফোরাম” এর প্রতিমন্ত্রী করিমা বেগম একজন জেলাধিকারিককে থাপ্পড় মেরে পরিস্থিতি জটিল করে ফেলেছেন। নেপালের বর্তমান কোয়ালিশন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হ’ল দক্ষিণ নেপালের তরাই অঞ্চলের মাধেসি রাজনৈতিক দলগুলি। মাধেসিদের অনেকগুলি দালের মধ্যে অন্যতম “মাধেসি জনাধিকার ফোরাম”। এই ফোরামের এমপি করিমা বেগম। করিমা বেগমের এই আমলা সাইজকরণ মাধেসি অঞ্চলে বীরোচিত কাজ বলে বিবেচিত হলেও বহুজাতিগোষ্ঠী ও বহুভাষী নেপালের অন্যান্য অঞ্চলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে।
ঘটনার প্রতিবাদে সরকারী কর্মকর্তারা সারা নেপালে একদিন কর্মবিরতি পালন করে মন্ত্রী পরিষদ থেকে করিমা বেগমের পদত্যাগ বা বহিস্কার দাবী করেছেন। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনার ঝড় বইছে নেপালে। তবে তার পদত্যাগ বা বহিস্কার যদি কার্যকর হয় তাহলে কোয়ালিশন সরকারের পতন ঘটাবে এতে কোন সন্দেহ নাই। কারণ কোয়ালিশন সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমানের জন্য মাধেসিদের ৯১ জন সাংসদের সমর্থন অত্যাবশ্যক।
অনেক সাধারণ মানুষ মনে করছেন মাধেসিদের সরকার থেকে বাদ দিয়ে মাওবাদী, ইউএমএল এবং নেপাল কংগ্রেসের সমন্বয়ে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠিত হলে সেটি একটি স্থায়ী সরকার হতে পারে এবং রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে বতর্মান পারস্পারিক অবিশ্বাস ও সঙ্কট দুর হতে পারে। কিন্তু অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও বিশ্লেষকরা বলছেন এই রকম কোন কোয়ালিশন গঠনের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
তাহলে বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণে নেপালের সামনে অপশানটা কি?
(লেখাটি একই সাথে আমার ব্লগ, সামহোয়ার এবং ফেস বুকে প্রকাশিত হ’ল)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

