somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শরীফ এ. কাফী : যে কথা জানা দরকার

১১ ই আগস্ট, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যে কথা জানা দরকার
শরীফ এ. কাফী
১০.০৮.২০১০

বাংলাদেশে মঙ্গোলীয় নৃ-প্রজাতির পাহাড়ী আদিবাসীদের আগমন, অবস্থান ও বিকাশ সমতলের আদিবাসীদের থেকে ভিন্ন। প্রকৃত অর্থে বাঙ্গালী জাতি ও ভাষার উদ্ভবে সমতলের আদিবাসীদের ভূমিকা প্রনিধানযোগ্য। এমন কি সমতলের আদিবাসী ও পাহাড়ীরা একে অন্যকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছে। চট্টগ্রামের ভাষা ও চাকমাদের ভাষার যোগসূত্র তার বড় প্রমাণ।

যাক সে কথা, প্রথমে বুঝতে হবে বাংলাদেশের ভূগোল সম্পর্কে। বাংলা বলে পরিচিত যে ভূখন্ড বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত ও বার্মার মধ্যে বিভাজিত হয়েছে তার আকার ও গঠন অতীতে বর্তমানের মত ছিল না। সমূদ্রের তটরেখা, সুন্দরবন এসব আগে অনেক উত্তরে ছিল। বঙ্গোপসাগরের অনেক দ্বীপের তখন কোন অস্তিত্ব ছিল না।

সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে সাঁওতালদের সরেন, কিস্কু, টুডু, হেম্ব্রম, হাজদা, মারান্ডী, প্রভৃতি ১২টি উপগোত্র ছিল। এর মধ্যে "বিদিয়া" নামে একটি গোত্র এখন সাঁওতালদের মধ্যে বিলুপ্ত। সাঁওতালদের বসবাস বাংলাদেশের বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া এবং রাজশাহী থেকে শুরু করে পশ্চিম বাংলার বর্ধমান অতিক্রম করে বিহারের সাঁওতাল পরগণা, ধনবাদ পার হয়ে তার পরও উত্তর পশ্চিমে বিস্তৃত ছিল।

সাঁওতালদের কাছাকছি অন্যান্য গোত্রের মধ্যে ধাঙ্গড়, ওড়াঔ, মুন্ডা, কোচ, পাহাড়ী, বুনো, বাগ্দী, প্রভৃতি গোষ্ঠী ছিল। এদের বাইরে নদী ও জলাভূমি ভিত্তিক যারা ছিল তাদের মধ্যে রাজবংশী, কৈবর্ত, জলদাস, মালো, বর্মণ প্রভৃতি সমতলের আদিবাসী ছিল। বর্মণরা অবশ্য কৃষিতেও ছিল। তবে কৃষিতে প্রাধান্য ছিল, শূদ্রদের। তাদের প্রতিচ্ছবি পাবেন এস এম সুলতানের চিত্রকর্মে।

বেদেরাও বাংলাদেশের সবতলের যাযাবর আদিবাসী। কেউ কেউ (যুক্তিযুক্ত ভাবে) দাবী করেন, বেদেরাই সাঁওতালদের হারিয়ে যাওয়া "বিদিয়া" উপগোত্র। তারা যাযাবর হবার কারনে ঘুরতে ঘুরতে ভাষা ও নৃতাত্বিক সংকরায়নের ফলে, তাদের ভাষা ও গোত্র পরিচয় অপভ্রুংশে বর্তমান "বেদে" জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

এছাড়া দক্ষিনে, পশ্চিম বাংলার মেদিনীপুর অতিক্রম করে উড়িষ্যা পর্যন্ত সাঁওতালদের পূর্ব-সগোত্রীয় দ্রাবিড়দের বসবাস বিস্তৃত ছিল, যা এখনও আছে।

ভারতবর্ষের সকল আদি ভাষা, বিশেষ করে বৃহত্তর দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর বহুল প্রচলিত প্রধান ভাষা, আর্য, শক, হুণ, মোগল, আরব, তুর্কী, পার্শিক এবং ইংরেজদের দ্বারা দারুণ ভাবে পরিবৃত্ত হয়ে তার আদি রূপ বঞ্চিত হয়েছে। তারপরও সাহিত্যে ও কথ্য বংলায় প্রচুর শব্দ এখনও ব্যবহার হয় যা বহিরাগত কোন ভাষারই অংশ বা উপজাত নয়। এই মাটির আদি ভাষা, যা কোচ, সাঁওতালদেরও ভাষা। আমরা ভুলে যাচ্ছি কেন যে, এক সময় নেপাল ও বিহারে (দেহাত অঞ্চলে) শুধু বাংলায় কথা বলা হতো না, লেখালেখির কাজ বাংলা হরফে করা হত। মধ্যবর্তী সংকরায়িত উপজাত ভাষা, যা এক সময় বৃহত্তর বাংলা ও আশপাশের অঞ্চলে প্রধান ভাষায় রূপ নিয়েছিল, সেই পালি ও প্রাকৃত ভাষা থেকেও তার প্রমাণ পাওয়া যায।

হিন্দু মাইথোলজী বা পূরাণের রেফারেন্স দিয়ে যারা বলতে চান যে, ভারতবর্ষ আর্যদের আদি বাসভূমি ছিল, তাদের এই চিন্তার সাথে ধর্মীয় আবেগ থাকলেও, আর্যরা কখনো এই ভূখন্ডের আদিবাসী নয়। সাঁওতালদেরকে যারা বাঙ্গালীদের আদি গোত্র হিসেবে স্বীকার করতে চান না, তারা সচেতন বা অবচেতন ভাবে এখনো হিন্দু মাইথোলজীর বিভ্রান্তিতে আছেন।

এদশের আদিবাসীদের প্রায় সবাই দ্রাবিড়-- (পরে আগত মঙ্গলগণ ব্যাতীত), তারাই ভারতবর্ষের আদি বাসিন্দা। আর্যরা তাদের আগে নয়। আর্যদের ইতিহাস টেনে এনে আগে বসিয়েছে হিন্দু পন্ডিতরা, আর ইতিহাস বিকৃতকারী শশাঙ্ক। আমরা বুঝি না কেন যে, পুরাণের ভাষ্য মতে, রামচন্দ্র আসার আগেই রাবন এখানে ছিল। আর রাবন যে অর্য বা আরিয়ান নয় সে কথা তো পুরাণেই বলেছে, সবাই জানে!

শ্রীলংকা থেকে হিমালয় পর্যন্ত, নদীর দুপাশ বরাবর মাছ-ভাত খাওয়া যে আদিবাসীদের পদচারণায় এই জনপদ একদিন মুখরিত ছিল, সাঁওতালরা যে তাদেরই একটি প্রধনি গোত্র, এ বিষয়ে কারো সন্দেহ থাকা উচিৎ নয়। যদি কেউ বাঙ্গালী বলে দাবী করতে চান, তাকে মানতেই হবে যে, সাঁওতালরা তাদের পুর্ব পূরুষ, বাঙ্গালীরা সাঁওতালদের অধঃস্তন প্রজন্ম। যারা নিজেদের আর্য, শেখ, আরব, পাঠান---- ভাবতে চান, নৃতাত্ত্বিক ভাবে আদিবাসীদের বংশধর বলতে লজ্জা পান, ক্ষতি নেই, তবে দয়া করে তারা খাটিঁ বাঙ্গালী বলে দাবী না করাটাই ভাল।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:০৯
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×