সন্ধ্যার আঁধারে আমি যদি হারিয়ে যাই বন্ধু, আমাকে মনে রেখো তোমার ঘরের ধূপ-আগরের সুবাসে- তোমার ঘরের প্রদীপের আলোয়, আমাকে ফেলে দিও না বাসি ফুলের মত। মনের ঘরেই রেখো বন্ধু পথের ধারের ফুলটি ভেবে। আমি যে জলসাঘরে ...www.jolsaghor.com/author/sharmabangla

অত:পর দ্বিজহরিদাস......
০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:০২
রাত্রির প্রথম প্রহর চলিতেছে। একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার- অমাবস্যার রজনী বলিয়া কথা। দ্বিজহরিদাস হাঁট হইতে জল বেগুণ আর সাধু গুটা কিনিয়া লইয়া আশ্রমে ফিরিতেছে। নিকটবর্তী হাঁট হইতে কিনিয়া লইতে গেলে দুর্নাম রটিবার সম্ভাবনা থাকিতে পারে ভাবিয়া দ্বিজহরিদাস প্রতি অমাবস্যায় দূরবর্তী নিতাই গঞ্জে গমন করে। রাত্রির অন্ধকারে দেশী আলু আর সাধু গুটা মিশ্রিত করিয়া জল বেগুণ রাঁধিলেও ব্যঞ্জনের সুঘ্রাণ বায়ুর সহিত মিতালী গড়িয়া আশেপাশের সকলের নাসিকারন্ধ্রে প্রবেশ করিয়াছে। দ্বিজহরিদাস না জানিলেও সবাই জানিয়া গিয়াছে শৌখিন এই সন্ন্যাসীর গৃহে রাত্রির অন্ধকারে কোন সে মহিমান্বিত ব্যঞ্জনে সাধু সেবা হয়।
দ্বিজহরিদাস আপন মনে হাঁটিয়া চলিতেছে। মনে মনে ষোল নাম বত্রিশ অক্ষরের হরিনাম কীর্তন করিয়া যাইতেছে। হঠাৎ করিয়া নির্জন একটি স্থানে কাহারও অস্ফুট রোদন শুনিতে পাইয়া সে থমকিয়া দাঁড়াইলো। শব্দের উৎপত্তিস্থল অনুসরণ করিয়া দ্বিজহরিদাস দেখিতে পাইলো এক যুবক মদিরার পাত্র হস্তে লইয়া ভূমিতে লুটাইয়া পড়িয়াছে। সেই অপরিচিত যুবকের মুখ হইতেই- পারু পারু বলিয়া রোদন ঝরিয়া পড়িতেছে বিজন রাত্রির লগনে। দ্বিজহরিদাস যুবককে ধরিয়া উঠাইলো। নাম জিজ্ঞেস করিলেও যুবক আবোল-তাবোল বকিয়া যাইতেছিল মদিরার আবেশে। এত রাত্তিরে চেতনাহীনজনে একাকী ফেলিয়া যাওয়া নীতিজ্ঞান বিরুদ্ধ। তাহার উপর সন্ন্যাসীদের কাজই হইলো জীবরূপী ঈশ্বরের সেবা। সকল শাস্ত্রজ্ঞান ভাবিয়া লইয়া দ্বিজহরিদাস যুবককে সাথে লইয়া চলিল। আশ্রমে ফিরিয়া যুবককে সযত্নে শয্যায় শায়িত করিয়া সে রন্ধন প্রকৌশলে নিযুক্ত হইলো। চক্ষুর সিন্ধুতে অশ্রুর ঊর্মিমালা জাগাইয়া- ব্যথা-বারি-পারাবার হইয়া সন্ন্যাসী দ্বিজহরিদাস সাধু গুটার সহিত জল বেগুণ রন্ধন করিতে লাগিল। এইদিকে সে চিন্তা করিতে লাগিল অপরিচিত যুবককে সন্ন্যাসীর গৃহে সাধু গুটা আর জল বেগুণের ব্যঞ্জনে সেবা গ্রহন করাইলে যদি দুর্নাম রটিয়া যায়। অন্যদিকে সে ভাবিতে লাগিলো- 'অতিথি দেবভবো'- অতিথির সেবা তো করিতেই হইবে নারায়ন ভাবিয়া। তা না হইলে জনার্দন রুষ্ট হইবেন। যুবকের মদিরার আবেশ কিঞ্চিৎ উপশম হইয়াছে। সে শয্যা হইতে সন্ন্যাসী দ্বিজবরের রন্ধন লীলার সহিত ক্রন্দন লীলা অবলোকন করিয়া যাইতেছিল। রন্ধন সমাপ্ত হইলে সে জিজ্ঞাসা করিলো- হে দ্বিজবর, তুমি বিজন রাত্তিরে কেন এই বৃথা ক্রন্দন করিতেছ?- পারুর মত কেহ কি তোমার বুকে গরল ঢালিয়াছে? দ্বিজহরিদাস জবাব দিল- ব্যথা দিয়াছিল এক অষ্টাদশী নবোঢ়া তবে প্রেমের নহে- সাধু গুটাকে কেন্দ্র করিয়া তির্যক বাক্যবান হানিয়া ছিল বুকে। সবিস্তারে সন্ন্যাসীর কাহিনী শুনিয়া যুবক বলিতে লাগিলো- মার ঢালা, মার ঢালা; তোমাকে সাধু গুটা মারিলো আর আমাকে মারিলো পারু। এতকথা হইয়াছে কিন্তু এখনও যুবকের নাম জানা হইলো না। জিজ্ঞাসিলে যুবক উত্তর করিলো- দেবদাস আমার নাম, দেবদাস মুখার্জী। আরও কিছু গল্প-গুজব করিয়া দুই দ্বিজবর অন্ন উদরে অর্পণ করিতে লাগিল। অতি সুস্বাদু জল-বেগুণ-ব্যঞ্জন উদরে গমন করিয়া দুইজনেরই মুখ দিয়া তৃপ্তির ঢেকুর তুলিল।
পরদিন সায়াহ্নে দেবদাস প্রস্থান করিতে উদ্যত হইলে দ্বিজহরিদাস তাহাকে সম্মতি জ্ঞাপন করিল না। এই এক রাত্রির সহচর্যে কী জানি এক মায়া পড়িয়া গিয়াছে। দেবদাস বলিল- আমাকে যাইতে দাও দ্বিজবর। দ্বিজহরিদাস বলিল- কোথায় যাইবে তুমি? হাসিয়া দেবদাস উত্তর করিল- যেথা রাত্রি রঙ্গীন হইয়া জ্বলে, যেথা রমনীর কুন্তলে ঘনঘটা আসে- মুখমণ্ডলে উঠে চাঁদ- চক্ষুর মণিতে বিজলী ঝরিয়া পড়ে, যেথা মদিরার পাত্রে ব্যথা উপশম- মন জ্বালা নিবারণ, যেথা ছমছম-ঝনঝন লাস্যে নাচে অপ্সরা- রাগিনী্র স্রোতে করিয়া মন বিমোহন। -আমাকেও কি লইয়া যাইবে সেথা দেবদাস? -কেন নয়- ছম ছম ঝন ঝন- মার ঢালা।
তাহারপরে কি ঘটিলো তাহা আরেক মহাকাব্যের মত। কত কিছুই ঘটিয়া গেল নিমিষেই। মাত্র ছয় মাস অতিবাহিত হইলো। এরই মাঝে দেবদাস ইহধাম ত্যাগ করিয়া পরপারে চলিয়া গেল। চন্দ্রমুখী হইলো সন্ন্যাসিনী- দেবদাসী হইয়া বাটীকার শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরেই দিনাতিপাত করিতে লাগিলো। দ্বিজহরিদাসের এখন বেলা যায় নিজ আশ্রমে শাস্ত্রপাঠ করিয়া- হরিনাম কীর্তন করিয়া। আর রজনী ফুরাইয়া যায় কুমুদিনীর শয্যায়- কুমুদিনীর বাহুলতার বন্ধনে যাহাকে প্রথম দিন দেবদাসের সহিত আসিয়া দ্বিজহরিদাস ভালবাসিয়া ছিল। চিতপুরের কুমুদিনীও ভালবাসিয়াছিল। দ্বিজহরিদাস এখন মদিরার আবেশে আবিষ্ট হইয়া কুমুদিনীর নৃত্য-সংগীতে বিনোদিত হইয়া রাত্রির যাতনা উপশম করিয়া লয় রমনীর উষ্ণ পরশে। রাত্রির অবসানে গৃহে ফিরিয়া প্রাতঃস্নান সমাপন করিয়া সে করজোড়ে শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে নিবেদন করে- হে জনার্দন, অপরাধ লইওনা প্রভু এই মূড় দাসের, এই মদিরা তোমার সৃষ্টি- ইহা যদি অভিশাপ হইয়া থাকে তবুও আমি তাহা পান করিব তুমি স্রষ্টা বলিয়া। বৃষভানু নন্দিনী রাধা বিহনে তোমার নাম যেমনই আধা তেমনই কুমুদিনী বিহনে দ্বিজহরিদাসও আধা। তুমি মোরে রাখিবে না ছাড়িয়া যাইবে তাহা তুমিই জান জগতপালক। তবু দাসের এই কথা মনে রাখিও প্রভু- তুমি ছাড়িলে এই দাস তোমার পায়েই জীবন লুটাইবে- তখন তোমার নামে কলঙ্ক রটিলেও দ্বিজহরিদাস দায়ভার লইবে না। দ্বিজহরিদাসের অলক্ষে বসিয়া ঈশ্বর তখন কি করিয়াছে তাহা তো আর দেখি নাই। তবু ভক্তিতে যদি ভগবান ভক্তের দাস হইবেন বলিয়া কথা দিয়া থাকেন তাহলে ভগবান তাহাকে ছাড়িয়া যাইবেন না বলিয়া নিশ্চিত- অবশিষ্ট কিছু রহিলে তিনিই জ্ঞাত আছেন। এইভাবেই চলিত লাগিল রমনী সহচর্যে কাম-মদিরা সম্মোহিত দ্বিজহরিদাসের বৈষ্ণব সাধনা। সাধু গুটা যাহা শুরু করিয়াছিল তাহার সমাপ্তি কি আর সাধু গুটা জানে। বিধাতাই জ্ঞাত আছেন শুধু কোথাকার জল কোথায় গিয়া পড়িবে।
কিছুদিন পূর্বে শুনিয়াছি- কভু কভু মদিরার পাত্র হস্তে দ্বিজহরিদাসকে হরিনাম কীর্তন করিতে করিতে পথ চলিতে দেখা গিয়াছে। কেমন এই সন্ন্যাস আর কেমন এই বৈরাগ্য- তাহা জনার্দনই শুধু জানেন।
বিঃদ্রঃ 'সেই থেকে দ্বিজহরিদাস' এর পর মহতরমা হুমায়রা হারুনের অনুপ্রেরণায় কাহিনীকে দীর্ঘায়িত করা হলো। আশা করি- আপনাদের ভাল লাগবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:০৪ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
জামসেদ রেহমান চৌধুরী বলেছেন:
অমন ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত্তিরে দ্বিজহরিদাস বাবু একা পথ চলিতেছে, ভাবিয়া গা শিউরে উঠিল। তা তিনি সন্যাসব্রত গ্রহন করিবেন না তো কে করিবেন। উনার মঙ্গল হোক ... দুগ্গা.. দুগ্গা..
লেখক বলেছেন: মন্তব্য পাঠে বিনোদিত হইলাম। ধন্যবাদ আপনাকে।![]()
![]()
সায়েম মুন বলেছেন:
কিছুদিন পূর্বে শুনিয়াছি- কভু কভু মদিরার পাত্র হস্তে দ্বিজহরিদাসকে হরিনাম কীর্তন করিতে করিতে পথ চলিতে দেখা গিয়াছে। কেমন এই সন্ন্যাস আর কেমন এই বৈরাগ্য- তাহা জনার্দনই শুধু জানেন।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে। শুভেচ্ছা।
তমিজ উদ্দীন লোদী বলেছেন:
সাধু ভাষায় বহুদিন এরকম পাঠ করিনি।ভাষা ও আবহ নির্মাণে আপনার মুন্সিয়ানা মুগ্ধ করার মতো।শুভেচ্ছা আপনাকে।
লেখক বলেছেন: নিজেকে কৃতার্থ মনে হচ্ছে। আমি জানি- এই ব্লগে রাজনৈতিক ক্যাঁচাল ছাড়া, ধর্মীয় ক্যাঁচাল ছাড়া কেউ কোন কিছুতে আগ্রহ দেখায় না।
আপনারদের মত ব্লগারদের কারণেই বারবার লেখা- লেখে আনন্দ পাওয়া যায়। হোক না সংখ্যায় অতি নগন্য। শুভেচ্ছা রইলো। ভাল থাকুন।
সুমিন শাওন বলেছেন:
সজল'দার সব লেখাই প্রশংসা করার মতো, কিন্তু কিছু কিছু লেখায় সজল নিজেই নিজকে অতিক্রম করছেন, এটি তার ওরকমই একটি লেখা, এ ধারা অব্যাহত থাকুক!
লেখক বলেছেন: প্রশংসা কার না ভাল লাগে। শুনে প্রীত হলাম। যদি ভাল কিছু লিখে থাকি- সে পরমেশ্বরের করুণা আর গুণীজনদের নির্দেশিত পথ যারা পথিকৃত হয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে আছে এখনও- থাকবেন চিরদিন।
হুমায়রা হারুন বলেছেন:
পারফেক্ট!!
লেখক বলেছেন: শুকরিয়া মহতরমা।
রাজ মো, আশরাফুল হক বারামদী বলেছেন:
ভাইরে এইডা কি লেখলেন। সরাসরি প্রিয়তে। চরম! নাহ চরম বললে ভুল হবে পরম হইছে! আমার পড়াশুনায় শুধু এইটুকুই বলতে পারি সাহিত্যের উচ্চসীমায় আছে লেখাটা।
লেখক বলেছেন: অনেক অনেক ধন্যবাদ।
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...













