somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... শীতের শেষ আর বসন্তের শুরুর শুভেচ্ছা


দেখতে দেখতে শেষ হয়ে এল শীতকাল। সেই সাথে শেষ হয়ে গেল রকমারী পিঠাও। পিঠার ছবি দেখতে দেখতে শীতকে বিদায় দিই।

১. শুরু করি নকশী পিঠা দিয়ে।




২. লবঙ্গলতিকা পিঠা, যার রেসিপি নীলু দিয়েছিল।




৩. বিদিশি পিঠা, রিং কেক।




৪. ইলিশ পুলি।




৫. রঙ বেরঙ।




৬. পুলি পিঠা। আমার প্রিয়।




৭. আরেকটা প্রিয় পিঠা, পাটিসাপটা।




৮. বেণী পিঠা।




৯. এই পিঠার অনেক নাম। ঝগড়া পিঠা, পানচুরি পিঠা। আমি বানাই মাঝে মাঝে।




১০. চিরুনী পিঠা।




১১. এটা খেতে বেশ মজা। ক্ষীর পাকান।




১২. এটাও বেশ লোভনীয়।




১৩. এই পিঠা খেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ছবি তুলতে না তুলতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। <img src=" style="border:0;" />




১৪. এটাও প্রায় শেষ হয়েই যাচ্ছিল। শেষ মুহূর্তে নিয়ে খেতে পেরেছি। ভীষণ মজার।




১৫. এবার একটু ফল-ফলাদিতে আসি। কমলালেবু পিঠা।




১৬. কমলালেবু আরও আছে।




১৭. আনারস পিঠা দেখতে ভারী সুন্দর।




১৮. বসন্তের শুভেচ্ছা দিব আর ফুল থাকবে না, তাই কি হয়? এবার ফুলঝুরি।




১৯. পছন্দ হল না ফুল? তাহলে এই যে গোলাপ।




২০. রজনীগন্ধাও আছে।




২১. গোলাপ আরও আছে, সাথে ঝগড়াও।




২২. থাক আর ঝগড়া করে কাজ নেই, বরঙ রংবেরং-এর গোলাপ দেখি।




২৩. আরেকটু বেশি লাল গোলাপ।




২৪. সামনে তো ভালুবাসা দিবসও আছে। তারও শুভেচ্ছা রইল। এই পিঠারও অনেক নাম - লাভ লোকসান, হৃদয়হরণ।




২৫. আরেকখান ভালুবাসা ইশপিশাল। দাম আছে কিন্তু।




সবাইকে শীতের বিদায়ী, বসন্তের আগমনী আর একদিনের ভালুবাসা দিবসের শুভেচ্ছা।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29539979 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29539979 2012-02-13 01:03:21
কুয়াকাটায় সমুদ্র দর্শন " style="border:0;" />

অবশ্য বয়স তো আর কম হল না। ব্লগেই তো দেখতে দেখতে পুরো তিনটা বছর পার করে দিলাম। মানে আজ আমার তৃতীয় ব্লগীয় বর্ষপূর্তি আর কি। যাক, সমস্যা কী, ব্লগ যখন আছে তো পোস্ট দিতে কোন বাধা নেই। শুধু কুয়াকাটা ভ্রমণ নিয়েই একটা পোস্ট লিখে ফেলা যাবে।

এই ভ্রমণের শুরুর একটু অংশ আগেই বলে ফেলেছি। সেন্ট মার্টিনসে দ্বিতীয়বার সদলবলে ঘুরে আসার অল্প কিছু দিন পরেই কুয়াকাটা যাওয়ার পরিকল্পনা হল। এবার অবশ্য অত বড় দল না। টারজান ও তার দুই সহকর্মী মিলে সপরিবারে যাবে বলে ঠিক হল। শেষ মুহূর্তে এক পরিবার বাদ পড়ে গেল। তারা কুয়াকাটার বদলে সেন্ট মার্টিনসে যেতেই বেশি আগ্রহী। যা হোক, দুই পরিবারই যাব। এর মধ্যে এক পরিবার বরিশালে থাকে, তাদের আদিবাস সেখানেই। কাজেই ঠিক হল আমরা ঢাকা থেকে বরিশাল গিয়ে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে এরপর একসাথে কুয়াকাটা রওনা দিব।

আগের রাতে সদরঘাট থেকে বিশাল লঞ্চে উঠলাম। ভোরবেলা পৌঁছানোর কথা বরিশালে। কিন্তু ঘন কুয়াশার কবলে পড়ে কী অঘটনটা ঘটল সেটা নৌবিহারের পোস্টে বলেছি। এদিকে বারবার ঐ ভাইয়া ফোন দিচ্ছেন। তারা বাসে উঠে পড়েছেন। আমাদের আসতে আর কত দেরী। আমরা জানিয়ে দিলাম প্রথম বাসটা আমাদের পক্ষে ধরা সম্ভব হবে না। তারা যেন অপেক্ষা না করে চলে যায়। আমরা পরের বাসে আসব। তাই করল তারা। ওহ, ঐ ভাইয়া-ভাবীর সাথে তাদের পাঁচ বছরের একটা খুকীও ছিল।

যা হোক, অবশেষে আমরা প্রায় দুপুরবেলায় বরিশালে গিয়ে পৌঁছাতে পারলাম। মোটামুটি দৌড়ে গিয়ে কুয়াকাটাগামী বিআরটিসি বাসে গিয়ে উঠলাম। দেখলাম আমাদের টিকেট আগেই কেটে টিকেট চেকারের কাছে রেখে দিয়েছিলেন ভাইয়া। বাস রওনা দিল। ভাইয়ার কাছে ফোনে শুনলাম তাদের যেতে চার ঘন্টার মত লেগেছে। তাহলে খুব একটা দেরী হবে না। কিন্তু একটু পরেই অবস্থা যা দাঁড়াল তাতে সারাদিন লেগে যাবে বলে মনে হল। ভোরের বাসটা শুধু ফেরীঘাট ছাড়া আর কোথাও না দাঁড়িয়ে একটানে চলে যায়। দুপুরের বাস তো তেমন না। এটা লোকাল বাসের মত একটু পর পর দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠাচ্ছে, নামাচ্ছে। শুধু যাত্রীই না, যাত্রীর মালামাল ওঠানামাতেও যে সময় পার হচ্ছে তাতে মোটামুটি রাত কাবার হওয়ার দশা। শুধু এক জায়গাতেই বিশ ঝুড়ি পান ওঠানো হল বাসের ছাদে। আবার সেগুলো আরেক জায়গায় গিয়ে নামানোও হল। এক ঘন্টা তো শুধু এই পান ওঠা-নামাতেই গেল। আর ফেরী ঘাটের জ্যাম তো আছেই। তাও যদি একটা হত, চার চারটা ফেরী পার হতে হল। শুনলাম আগে না কি ছয়টা ছিল, এখন তো তবু দুইটা কমেছে।

যা হোক, বিকাল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যায় গিয়ে নামতে পারলাম কুয়াকাটায়। বাস থেকে নেমেই সার্কিট হাউসের দিকে এগিয়ে গেলাম। ওখানেই উঠছি আমরা। ভাইয়ার সাথে দেখা হয়ে গেল রাস্তায়ই। বললেন, এই তোমাদের আসা? আমরা তো দুইবার সাগরে চুবানি দিয়ে ফেললাম, মা মেয়ে এখন ক্লান্ত হয়ে ঘুম দিয়েছে। আমরা আমাদের রুম বুঝে নিলাম। রুমটা খুবই পছন্দ হল। বিশাল রুম, একটা বড়-সড় ডাবল বিছানা। এক পাশে সোফা সেট আর টেবিল। বাথরুম তো আছেই, এছাড়াও একটা বড় ড্রেসিং রুম আছে। সেখানে ফ্যান, লাইট, ড্রেসিং টেবিল, আলনা - সবই আছে। পরে শুনেছি, এটা ছিল ভিআইপি রুম।

আমরা তাড়াতাড়ি কাছের একটা হোটেল থেকে খেয়ে নিলাম। এরপর সবাই মিলে গেলাম সমুদ্রের পাড়ে। সূর্যাস্তের সময় হয়ে গিয়েছে তখন। কেউই পানিতে নামছিল না। আমি আবার সমুদ্র দেখলে নিজেকে সামলাতে পারি না। কিন্তু সাথের কেউ যেতে চায় না দেখে একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। অবশেষে পেলাম পিচ্চি খুকীকে। সে নামতে আগ্রহী। তার হাত ধরে, ( ভাব দেখাচ্ছি যেন সে পড়ে না যায় এই উদ্দেশ্যেই আমি নামছি) নেমে গেলাম পানিতে। আহ, সারারাত-সারাদিনের ক্লান্তি নিমেষে দূর। বেশিক্ষণ অবশ্য থাকা হল না। চলে এলাম হাঁটতে হাঁটতে।

সমুদ্রের পাড়েই একটা ছোট মার্কেট, অল্প কয়েকটা দোকান সেখানে। জিনিসপত্রও খুব বেশি না। যা আছে, তারও দাম অনেক বেশি। এগুলো ওরা নিয়ে আসে কক্সবাজার থেকে, তাই দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। পিচ্চি অবশ্য টুকটাক খেলনা ঠিকই বাগিয়ে নিচ্ছিল। আর ভাবী একটা ব্যাগ ভীষণ পছন্দ করলেও মুলামুলিতে সুবিধা করতে না পারার দুঃখে আর কিনলেনই না।

কিছু কিনতে না পারলেও গল্প করতে করতে হাঁটতে মজাই লাগছিল। ওখানে খাবারের দোকানগুলোও মজার। নাম্বার দেয়া হোটেল। খাবার ঘর-১ থেকে খাবার ঘর-৬ পর্যন্ত দেখলাম। ৫ আর ৬ নং-এর খাবারগুলো মোটামুটি ভালো মানের মনে হল।

সার্কিট হাউসে ফিরে ওখানকার কেয়ারটেকারের সাথে আলাপ করে জেনে নেয়া হল এখানে কোথায় কোথায় বেড়াতে যাওয়া যায়। শুটকী পাড়া আর লেবু বনের কথা শুনলাম। লেবু বনে আবার দুইভাবে যাওয়া যায়, ছোট লঞ্চ দিয়ে ঐপাড়ে, আর এই পাড়ে যেতে হলে তিন চাকার ভ্যানে। ঠিক হল আমরা ভ্যানে করেই যাব। লঞ্চের মধ্যে আর নেই। যদিও সারাদিন ধরে ওখানে লঞ্চে যাবার জন্য মাইকিং চলতে থাকে।

রাতে খুব ছোট একটা কারণে (সিগারেট সম্পর্কিত) একটা মোটামুটি বড়-সড় মান-অভিমান পর্ব হয়ে গেল আমার আর টারজানের মধ্যে। সকালে উঠেও তার রেশ ছিল। তাই মন ভালো করতে শাড়ি পরলাম, লাল শাড়ি। নাস্তা সেরে একটা ভ্যান ঠিক করা হল। কেয়ারটেকার মুলামুলি করে ভাড়া কমাতে চেয়েছিল, সে বারবার বলছিল আপনাদের ঠকানো হচ্ছে। কিন্তু খুব বেশি কমানো গেল না। আমরা রওনা দিলাম।

সমুদ্রের পাশ দিয়ে বাঁধের উপর দিয়ে পাকা রাস্তায় ভ্যান চলছে তো চলছেই। রাস্তা আর শেষ হয় না। এমনিতে ভালোই লাগছিল, শুধু কড়া রোদটা ছাড়া। আমি আর টারজান আগে থেকেই দুইটা ক্যাপ নিয়ে এসেছিলাম। কাজে দিচ্ছিল এগুলো। যদিও আমার নাকটা বাঁচাতে পারিনি। হোটেল থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই নাকটা রোদে পুড়ে প্রথমে লাল, তারপর কালো হয়ে গেল। টারজান দেখে অবাক হয়ে বলে, তোমার নাক এমন লাল হয়ে গেল কেন? আজব তো! আরে আজব সেটা তো আমিও জানি, তো কী করার আছে। পরে অবশ্য সমুদ্র স্নানের সময় পুরো মুখ পুড়ে কালো হয়ে নাকের সাথে একরকম হয়ে গিয়েছিল।

তো যা বলছিলাম, আমরা দুজন ক্যাপ পড়ে নিয়েছিলাম রোদ থেকে বাঁচতে। ভাবীও একটা ক্যাপ কিনেছিলেন সমুদ্রপাড়ের মার্কেট থেকে। কিন্তু সেটা ছিল স্বচ্ছ প্লাস্টিকের। যার উপর লেখা 'কুয়াকাটা সমুদ্র ভ্রমণ'। ভাবী এইবার গজগজ করতে থাকলেন, এইটা কেমন ক্যাপ, স্বচ্ছই যদি বানাবে তাহলে রোদ ঠেকাবে কিভাবে?

ভ্যানে যেতে যেতে হঠাৎ নাকে একটা উৎকট গন্ধ এসে লাগল। দূর থেকেই টের পেলাম শুটকী পাড়ার কাছাকাছি চলে এসেছি। কিন্তু গন্ধটা শুধু শুটকীর না। সাথে একটা বিশ্রী কেমিক্যালের গন্ধও ছিল। শুটকীর গন্ধ তবু একটু পর নাকে সয়ে যায়, এই কেমিক্যালের গন্ধ সহ্য করা অসম্ভব। নাকে শাড়ীর আঁচল চেপে গন্ধ পার হয়ে এলাম শুটকী পাড়ায়। কত রকমের শুটকী যে শুকাতে দিয়েছে। তবে আমাদের জন্য মূল আকর্ষণ ছিল হাঙড়ের শুটকী। ভ্যান থেকে নেমে কাছ থেকে দেখলাম। ওরা বলছিল আজকে অল্প কয়েকটা ছোট হাঙড় পেয়েছে, গতকাল নাকি আরও অনেক বড় বড় হাঙড় ধরেছিল, আমরা মিস করেছি।

আবার চড়ে বসলাম ভ্যানে। আবারও সেই যাত্রা যা শেষ হতেই চায় না। অবশেষে একটা বনের সামনে নিয়ে থামল। ভ্যানওয়ালা এইবার আমাদের গাইড। বনের ভিতর দিয়ে নিয়ে যাবে আমাদের। তার আগে একটা ছোট ছাপড়া দোকান থেকে সবাই কলা কিনে খেলাম। ছোট ছোট কলা, কিন্তু এত মিষ্টি! এর মধ্যে খুব সুন্দর কয়েকটা পাখি দেখলাম, নাম জানি না। ছবি তুলতে গেলেই ফুড়ুৎ করে পালিয়ে যায়।

ঢুকে পড়লাম এইবার লেবুবনে। এই নাম কেন তা জানি না। লেবু গাছ দেখেছি বলে মনে পড়ল না। তা দুই-একটা থাকলেও থাকতে পারে। বনের ভেতর দিয়ে নিয়ে ভ্যানওয়ালা আমাদের একেবারে সাগর পাড়ে নিয়ে গেল। শাড়ি পরে ছিলাম বলে, নইলে এখন আমার সাগরে নেমে পড়া কেউ আটকাতে পারত না। ভাবী বললেন, বিকালে জামা পরে এসো, আমরা সাগরে নামব। ঐ চিন্তা করেই নিজের আফসোস খাওয়াটা ঠেকালাম। আবার ঢুকে পড়লাম বনের ভিতর। নাম না জানা সব গাছ-গাছালীর ভিতর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে মনটা ভালো না হয়ে আর উপায় আছে? সব মান-অভিমান ভুলে গিয়ে একসাথে দুজন ছবি তুলতে থাকলাম। ওহ, এতক্ষণ বলিনি বুঝি, অভিমানে ওর সাথে কথাই বলছিলাম না তো। <img src=" style="border:0;" />

ফিরে আসতে মন চাইছিল না, কিন্তু ফিরতে তো হবেই। আবার সেই ভ্যানে করে যাত্রা, শুটকী পাড়ায় হাঙড় দেখা, কেমিক্যালের গন্ধময় এলাকা নাক চেপে পার হওয়া, আর এইবার টারজানের সাথে টুকটাক কথা বলা। :``>>

দুপুরের খাবার শেষে রুমে গিয়ে শাড়ি পাল্টে সালওয়ার-কামিজ পড়ে নিলাম। আজকে মন ভরে সাগরে ভিজব। তবে তার আগে আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম বৌদ্ধমন্দিরে। এখানে মন্দিরে একটা কুয়া আছে। নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। মন্দির আর কুয়া দেখে সাগরের দিকে রওনা দিলাম।

নেমে গেলাম সবাই সাগরে। ভাইয়া-ভাবীর পরিবার পিচ্চিকে নিয়েই অনেক দূর নেমে গেল। কিন্তু আমার টারজানকে নিয়ে কিছুতেই হাঁটুপানির চেয়ে আগাতে পারছি না। ওর ঐ এক কথা, ওরা তো সাঁতার জানে, আমরা জানি না। মুখ ভোঁতা করে সাগরপাড়ের ইজিচেয়ারে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। এর মধ্যে পিচ্চি একটু বেশি সাহস দেখাতে গিয়ে চুবানি খেয়ে ফেলেছে। যদিও ওর বাবা সাথেই ছিল বলে সমস্যা হয়নি, কিন্তু পিচ্চি দেখলাম একটু চুপসে গিয়েছে। সে পানিতে আর নামল না, চুপচাপ তীরে বসে বালির ঢিবি বানাতে ব্যস্ত হয়ে গেল।

ভাইয়া-ভাবীও উঠে এসে ইজিচেয়ারে বসলেন। ভাবী এবার আমাকে বললেন, এই যাবে না কি সাগরে? চল আমরা একটু ভালোমত ভিজি। আমি তো এমনটাই চাইছিলাম। লাফ দিয়ে উঠে বললাম, চলেন যাই। ভাবী সাঁতার জানেন, তাই ভয় নেই। ভাবীর হাত ধরে নেমে গেলাম সাগরে। কোমর পানিতে নেমে গিয়েছি, তখন সাগরের একেকটা বড় বড় ঢেউ এসে মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিল। ঢেউ আসার মুহূর্তে একটা লাফ দিতে হয়, তাহলে আর পানিটা মাথার উপর যেতে পারে না। এই ঢেউয়ের সাথে খেলা করার মজা যে কী, যে না করেছে বুঝবে না।

মাঝে মাঝে পেছন ফিরে দেখছিলাম টারজান আমার কান্ড দেখে রাগ করছে কি না। চশমা খুলে নিয়েছিলাম বলে চেহারা তো দেখতে পাচ্ছিলাম না। শুধু দেখলাম যে কোমরে দুই হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবীকে কয়েকবার বললাম, ভাবী উঠবেন নাকি এইবার। ভাবীর প্রতিবারই এক কথা, আরে রাখো তো, আরেকটু মজা করতে দাও, এই সুযোগ আবার কবে পাই ঠিক আছে? হক কথা। আমিও সায় দিয়ে লাফ-ঝাঁপ চালিয়ে যাই। একবার পেছন ফিরে দেখতে গিয়ে বড় একটা ঢেউয়ের আগমন টের পাইনি। যখন টের পেয়েছি তখন আর লাফ দেয়ার সময় নেই। ফলাফল আমি পানির তলায়, এদিকে আমার পায়ের তলায়ও তখন মাটি নেই।

ভাবী অবশ্য আমাকে সাথে সাথেই ধরে ফেলেছিলেন। কিন্তু আমাকে টেনে পানির ওপরে তুলতে তুলতে গাপুস গুপুস করে বেশ খানিকটা পানি খেয়ে ফেলেছি ততক্ষণে। আমার ভয় পাওয়ার কথা, কিন্তু উল্টো আমি সবগুলো দাঁত বের করে হাসছিলাম। আমার মজা লাগছিল এইজন্য যে ভাবী আমাকে দুই হাতে ধরে বারবার বলছিলেন দাঁড়াতে, আমি পারছিলামই না। আমার পা দুটো ঢেউয়ের তোড়ে সামনে ভেসে যাচ্ছিল। এমন অদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগে কখনও পড়িনি। অবশেষে চেষ্টা করে পা দুটো নিচের দিকে নামাতে পারলাম। আরও অনেকক্ষণ থাকার ইচ্ছা ছিল সাগরে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর কয়েকটা হুজুর পানিতে নেমে দাপাদাপি শুরু করল, আর তারা আমাদের সাথেও ভাব জমানোর চেষ্টা করছিল। ওদের যন্ত্রণায় আমরা উঠেই এলাম তীরে। আর সেই সাথে আমার পায়ের মাংসপেশীতেও টান লেগে গিয়েছিল। টারজানকে আস্তে করে বললাম, জানো, আমি না সাগরে চুবানি খেয়েছি, এত্তগুলো লবণ পানি খেয়ে ফেলেছি। টারজান দাঁত চিবিয়ে বলল, জ্বী, আমি সবই দেখেছি। আমি এরপর পায়ের ব্যথা কমাতে পিচ্চির সাথে বসে বসে বালির ঢিবি বানালাম।

আমাদের মনে হচ্ছিল যে ঘন্টাখানেকের মত সাগরে ভিজেছি। কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে টাশকি খেলাম। পুরো সাড়ে তিন ঘন্টা পার হয়ে গেল কোন দিক দিয়ে বুঝতেই পারলাম না। রুমে গিয়ে কাপড় পাল্টে সবাই আবার বের হলাম। মার্কেটটা আরেকবার চক্কর দিলাম। এরপর সাগর পাড়ের ইজিচেয়ারে গিয়ে বসলাম। ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। সাগরের ঢেউয়ের শব্দ শুনতে শুনতে আমাদের আড্ডা চলল। টারজান আর আমি কিছুক্ষণের জন্য ওদের কাছ থেকে আলাদা হয়েও হাঁটলাম। অবশ্য বেশিদূর হাঁটা গেল না। এটা তো কক্সবাজারের মত বড় সৈকত না, নিরাপত্তাও বেশিদূর নেই। একটু দূরে যেতেই একজন বলল, ভাই আর যাবেন না, ওদিকে এলাকা ভালো না। কী আর করা। অল্প জায়গাতেই হাঁটাহাঁটি করা লাগল। এইটুকুতেও শান্তি নেই। এখানে লোকজন মটরসাইকেল ভাড়া করে ভোঁ ভোঁ করে সাগরপাড় দিয়ে চালায়। অশান্তি!

ফেরার পথে সবাই মজা করে চটপটি খেলাম। ভাবী সবার চেয়ে বেশি খেলেন। এটাও বললেন যে তার পেটে এসব সহ্য হয় না, কিন্তু তিনি লোভও সামলাতে পারেন না। ঐ রাতে ভাবীর অবস্থা আসলেই খুব খারাপ হয়ে গেল। ভাইয়াকে অনেক রাতে ওষুধের দোকানে দৌড়াতে হয়েছিল। অত রাতে ওখানে কোন ওষুধের দোকান খোলা থাকে না। ভুল আমাদেরই, কিছু জরুরী ওষুধ ব্যাগে রাখা দরকার ছিল সবারই। আমার কাছে শুধু ব্যথানাশক আর অম্লনাশক ওষুধ ছিল, পেট খারাপের ওষুধ নেয়ার চিন্তা আমার মাথায়ও আসেনি। যা হোক, সকালবেলা ওষুধ পাওয়া গেল। কিন্তু সারারাত ভাইয়া-ভাবীর কেউই ঘুমাতে পারেন নি।

ভাবীর শরীরের এমন অবস্থাতেই আমরা ফেরার জন্য রওনা দিলাম। এমন ভয়াবহ বাস জার্নি যেন আর কোনদিন না করতে হয়। ফেরীর জ্যাম তো আছেই, এর মধ্যে দেখি রাস্তার একটা অংশ এমনভাবে ভেঙে গিয়েছে যে সেখান দিয়ে বাস চলাচল অসম্ভব। আমাদের নেমে যেতে হল। এদিকে ভাঙা রাস্তা হেঁটে পার হয়ে যাবার পর আর তো কোন ব্যবস্থা নেই। বসে রইলাম একটা দর্জির দোকানে। পিচ্চি তার মত আনন্দ খুঁজে নিল। ফুল, লতা-পাতা কুড়িয়ে জমাতে থাকল।

অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একটা টেম্পু পাওয়া গেল। সেটায় চড়ে কোমর ব্যথা বানিয়ে পটুয়াখালীর একটা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছালাম। এখানে একটা হোটেলে খাওয়া দাওয়া করে লক্কড়-ঝক্কর মার্কা বাসে উঠলাম। এই বাসে কোনমতে চাপাচাপি করে বসে রওনা দিলাম। ভাবীর তো শরীর খারাপ, তাই চুপচাপ ঘুমানোর চেষ্টা করলেন, আমারও তখন কথা বলার মত মানসিক বা শারীরিক অবস্থা নেই। পিচ্চিও ঘুম দিয়েছে আমাদের মাঝখানে বসে। বাকী দুইজন, কষ্ট ভুলে থাকতেই হয়তো বা, বিশাল গল্প জুড়ে দিল। রাজনীতি, খেলাধূলা, চাকরি-বাকরি এমন কোন বিষয় নেই যা নিয়ে দুজন গবেষণা করেনি। এক লোক তো অস্থির হয়ে ওদের বকাই দিয়ে দিল, ও ভাই এত কথা কন ক্যান আপনেরা, এত কথা কয় ক্যামনে মাইনষে? ভাইয়া বললেন, কেন ভাই, আমরা কথা বললে আপনার সমস্যা কী? যা হোক, কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবার শুরু হয়ে গেল তাদের গভীর গবেষণামূলক আলোচনা।

এইভাবে বাসের ঝাঁকুনি খেতে খেতে আর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনতে শুনতে সন্ধ্যার পর আমরা এসে পৌঁছালাম বরিশালে। ভাইয়া-ভাবীরা তাদের বাসায় চলে গেলেন। ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা রওনা দিলাম কীর্তনখোলার ঘাটে। লঞ্চে উঠে রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। এইবার কুয়াশা বাবাজী কোন ঝামেলা করল না। নির্বিঘ্নেই এসে নামতে পারলাম সদরঘাটে।

অনেক বড় পোস্ট হয়ে গেল দেখি। আমি মনে হয় ইদানিং অনেক বেশি কথা বলি। এটাও বুড়ো হওয়ারই লক্ষণ। ঐ যে, আবারও তো একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি। আমরা কুয়াকাটায় গিয়েছি ঠিকই, সূর্যাস্তও দেখেছি। কিন্তু কুয়াকাটা যে জন্য বিখ্যাত, সেই সূর্যোদয়ই দেখা হয়নি। হয় তো এই সূর্যোদয় দেখার উদ্দেশ্যে আবারও কোনদিন কুয়াকাটায় যাওয়ার চিন্তা করা যাবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29535683 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29535683 2012-02-05 23:03:28
সাগরের ডাক শুনি
অবশ্য সমুদ্র-বিহারের গল্প নতুন করে বলার মত কিছু নেই। যারা সেন্টমার্টিনস গিয়েছেন তাদের জন্য এগুলো সবই পরিচিত গল্প। তারপরও একটু আজাইরা বকবক করি।

প্রথমবার সমুদ্র দেখেছিলাম খুব বেশি ছোটবেলায়। দেড়-দুই বছর বয়সে। সেটা ছিল লোহিত সাগর। ছোটবেলার শোনা কথার গল্পে লিখেছিলাম সাগর দেখার জন্য কেমন পাগল ছিলাম আমি। যা হোক, ঐ স্মৃতি তো মনে নেই। মনে রাখার মত প্রথম সমুদ্র দেখতে যাওয়া হয়েছে এইচএসসি-র পর। সেই গল্পও আগেই করা হয়ে গিয়েছে।

এরপর আরও কয়েকবার সাগরপাড়ে গিয়েছি। বিয়ের ঠিক পরপর যাওয়ার কথা থাকলেও কিছু বড় ধরণের ঝামেলা এসে পড়ায় যাওয়া হয়ে ওঠেনি। বিয়ের পাঁচ মাস পর টারজানের সাথে গেলাম রওনা দিলাম সাগর দেখতে। সোহাগের ভলভো বাসে করে গেলাম। এমনিতে আমার বাসে শরীর খারাপ করে না, কিন্তু কেন যেন সেদিন বমি বন্ধের ওষুধ খেয়ে নেয়া সত্ত্বেও দিলাম হড়হড় করে রাতের খাবার সব বের করে। সারা রাত মোটামুটি এই কষ্টেই কাটল।

পিক সিজনে গিয়েছিলাম, এই সময় আগে থেকে বুকিং না দিয়ে রাখলে ভালো হোটেলে রুম পাওয়া মুশকিল। বাস থেকে নেমে আমরা সোহাগের সুপারভাইজারকেই ধরলাম ভালো হোটেলের খোঁজ দেয়ার জন্য যেখানে বুকিং ছাড়াও রুম পেতে পারি। সে আমাদের প্রাসাদ প্যারাডাইজের খোঁজ দিল, হোটেল সী-গালের পাশে। ২০০৪ সালের কথা, তখনও সী-ক্রাউন হোটেলটি হয়নি। সী-গাল আর প্রাসাদই তখন সমুদ্র থেকে সবচেয়ে কাছে।

প্রাসাদ প্যারাডাইজে গিয়ে মন ভালো হয়ে গেল। ছোট ছোট কটেজ। হোটেল হোটেল কোন ভাব নেই। যেন পাশাপাশি কয়েকটা বাড়ি। ভাগ্য ভালো একটা এসি রুমও পেয়ে গেলাম। যদিও এসির দরকার ছিল না। আসলে ননএসি রুমগুলোর একটাও খালি ছিল না। একটা ব্যাপারে খুব অবাক হয়েছি। আমার এই ব্যাপারটা আগে জানা ছিল না। পিক সিজনে কক্সবাজারের হোটেল রুমের ভাড়া অনেক বেশি থাকে, এই ভাড়া মুলামুলি করে কমানো যায়। টারজান ঠিকই মুলামুলি করে দেড় হাজার টাকার রুম বারোশ' টাকায় নিয়ে ফেলল।

সাগরের ডাক আর কতক্ষণ উপেক্ষা করব। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়েই নেমে পড়লাম সাগরে। এক ফটোগ্রাফার পেয়ে বসল। তা মন্দ কী? আমরা তো ক্যামেরা নিয়ে যাইনি। নানান ঢঙে ছবি তোলা হল। যদিও ফটোগ্রাফার আরও কিছু পোজ শিখিয়ে দিচ্ছিল, টাইটানিক পোজ, হেন পোজ, তেন পোজ। আমি কোনটাই পাত্তা দিলাম না। আমাদের মত আমরা পোজ দিচ্ছিলাম।

যা হোক, মন ভরে সমুদ্রস্নান করে নিলাম। পরদিন যাব সেন্ট মার্টিনস। হোটেলের ম্যানেজারের সাথে কথা বললাম কিভাবে যাওয়া যায়। ম্যানেজার জানালেন তাদেরই নিজস্ব প্যাকেজ আছে। আর সেন্ট মার্টিনস যাওয়ার প্রথম যে জাহাজটা নামানো হয়েছিল, সেই সী-ট্র্যাক এদেরই মালিকানাধীন। ওদের ছিল দুই ধরণের প্যাকেজ, একটায় সকালে গিয়ে বিকালে ফিরে আসার, আরেকটা রাতে থেকে পরদিন ফেরার। টারজান প্রথমটা পছন্দ করল। আমি কিছুতেই রাজী হলাম না। সেন্ট মার্টিনসের রাতের রূপ না দেখলে কী দেখলাম। অতএব দ্বিতীয় প্যাকেজটাই নিতে হল।

সেন্ট মার্টিনসেও প্যারাডাইজ হোটেলের একটা শাখা আছে, ওখানে রুম বুকিং দেয়া হল। আবার ফিরে এসে এই হোটেলেই এক রাত থাকব, তাই সেই অনুযায়ীও রুম বুক করা হল। এবার একটা নন-এসি রুম নেয়া হল, একটু কম ভাড়ায়। এক হাজার টাকা এক রাতের জন্য।

যা হোক, পরদিন খুব ভোরে হোটেলের নিজস্ব বাসে করে রওনা দিলাম টেকনাফের উদ্দেশ্যে। পুরোটা রাস্তা আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। সৌন্দর্য্যের বর্ণনা দিতে পারব না। শুধু বলতে পারি, মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করছিল নেমে জায়গাটা ভালো করে মন ভরে দেখি। কিন্তু সেটা সম্ভব না বলে আফসোস করছিলাম।

জাহাজের ঘাটে গিয়ে দেখি সী-ট্র্যাক রওনা দেয়ার জন্য প্রস্তুত। উঠে পড়লাম সবাই। পাশেই আরেকটা জাহাজ কেয়ারী সিন্দবাদ দেখে একটু আফসোস হল, ঐ জাহাজটা আরও বড়। পরে দেখলাম শুধু বড়ই না, ঐটা আরও জোরে চলে। আমাদের রওনা দেয়ার আরও আধা ঘন্টা পর রওনা দিয়েও আমাদের ছাড়িয়ে গিয়ে আমরা পৌঁছানোর প্রায় আধা ঘন্টা আগেই পৌঁছে গেল।

যা হোক, ধীরে ধীরে গেলে সৌন্দর্য্য বেশি করে দেখার সুযোগ হয়, এই বলে মনকে সান্ত্বনা দিলাম। অবশ্য কথাটা ভুলও না। নাফ নদীর সৌন্দর্য্য যে কী জিনিস, এটা না দেখলে বোঝানো সম্ভব না। ততক্ষণে রোদ মাথার উপর উঠে গিয়েছে। কিন্তু তার কোন তোয়াক্কা না করে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিলাম। একবার নাফ নদীর নীল পানি, একবার তীরের সবুজ গাছের সারি, আরেকবার ঐ তীরে মায়ানমারের পাহাড়। কোনটা রেখে কোনটা দেখি। আর সেই সাথে আছে গাঙচিলের খেলা। জাহাজের পেছন দিকে পানিতে ফেনিল ঢেউ উঠছে, সেই ঢেউয়ের সাথে উঠে আসছে মাছ। গাঙচিলদের ভিড় তাই সেখানেই। উড়তে উড়তে ছপাৎ করে সেই মাছ তুলে নিচ্ছে মুখে। কেউ কেউ ছবি তুলে রাখছে। কিন্তু ছবিতে কি আর পুরো দৃশ্য আসে? মনের ভিতরেই ধরে রাখলাম সবটুকু।

এক সময় নাফ নদী শেষ করে জাহাজ সমুদ্রে পড়ল। কেমন যেন একটা অনুভূতি। সাগরের উপর ভেসে চলছি এই প্রথম। যেদিকে তাকাই শুধু সাগর আর সাগর। অবশ্য একদিকে মায়ানমারের পাহাড় দেখা যায়। এবার তাকিয়ে রইলাম সামনের দিকে। কখন দেখব সেন্ট মার্টিনস। অবশেষে একটা দ্বীপের রেখা ফুটতে শুরু করল। ঐ তো আমাদের নারকেল জিনজিরা।

কী বলব, প্রকৃতির এত সৌন্দর্য্য আর কখনও দেখিনি। হোটেলের ঝামেলা চুকিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। আর বের হয়েই পিচ্চিদের খপ্পরে পড়লাম। এক দল পিচ্চি এসেই, গাইড লাগবে গাইড? স্মল গাইড? আমরা অনেক কিছু দেখাব, হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি, হোটেল অবকাশ, আরও কি কি সব বলতে বলতে আমাদের সাথে সাথে হাঁটা শুরু করল। কিন্তু বলতে বলতে ঐ সব জায়গায় আমরা নিজেরাই চলে এলাম। যদিও ওগুলো দেখার মত কিছু না।

এখানে দেখার একটাই জিনিস, তা হল সমুদ্র। এত নীল, এত স্বচ্ছ পানি, এত প্রবাল পাথর। হাঁটু পানিতে নামলেও নিজের পা পরিষ্কার দেখা যায়। মাঝে মাঝে ছোট ছোট মাছের ঝাঁকও দেখা যায় এদিক-ওদিক সাঁতরে যেতে। বাচ্চাদের মত শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে পকেটে ভরলাম। অনেকক্ষণ এমনিই বসে রইলাম সমুদ্রের পানিতে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে। লাঞ্চের জন্য ফেরার সময় ডাবের পানি খেলাম। এত মিষ্টি ডাবের পানি আর কোনদিন খাইনি।

লাঞ্চের পর বিকালটুকু বিশ্রাম নিতে হল। জার্নিটা খুব বেশি হয়ে যাচ্ছিল। সাগরের ঢেউয়ের শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমানো যে কী আরামের প্রথমবারের মত টের পেলাম। ওখানে হোটেলগুলো সব জেনারেটরে চলে। রাত নয়টা-দশটার পর সব জেনারেটর বন্ধ করে দেয়া হয়। তারপর হারিকেন দিয়ে কাজ চালাতে হয়। ডিনারের পর লাইট অফ হয়ে গেল। আমরা নেমে গেলাম সাগর পাড়ে। পূর্ণিমার রাত ছিল সেদিন। ভরা জোছনায় সমুদ্রের ফেনিল ঢেউ গুণতে গুণতে হাঁটছিলাম। টারজান হঠাৎ বলে বসল গান গাইতে। লজ্জা লাগছিল। তারপরও গুণগুণ করে শোনালাম কয়েকটা গান। থাক ঐ গল্পের এখানে কাজ নেই।

পরদিন সকালে আবারও বেড়িয়ে গেলাম। বাজারটা একটু ঘুরে দেখে আবার সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে বসে রইলাম। আমার খুব ইচ্ছা ছিল ছেঁড়াদ্বীপ ঘুরে আসার। কিন্তু টারজানকে কিছুতেই রাজী করাতে পারলাম না। হুম্প করে বসে বসে নীল সমুদ্রের ঢেউই গুণে গেলাম। এখানকার সমুদ্রটা আসলেই খুব অসহ্য রকমের নীল। কিছুতেই মন খারাপ ভাবটা ধরে রাখা যায় না। শুধু একটা জিনিস কেন যেন ভালো লাগাতে পারিনি। সেটা হল সমুদ্রের ঐ পাড়ে মায়ানমারের পাহাড়ের সারি দেখতে পাওয়া। এমন না যে দৃশ্যটা সুন্দর না। কিন্তু, আরে ভাই সমুদ্র দেখব দিগন্তসহ, যেখানে সমুদ্রের শেষ আর আকাশের শুরু, তা না, ইয়া বড় বড় পাহাড় বসে আছে মাঝখানে।

বিকালে রওনা দিলাম সেই সী-ট্র্যাকে করে টেকনাফের দিকে। সেখান থেকে বাসে করে কক্সবাজার, এইবার ঘুমিয়ে গিয়েছি। রাতের বেলা বাইরে কিছুই দেখা যায় না এই শোকে। কক্সবাজারে হোটেলে এসে দেখি আমাদের বুক করে রাখা নন-এসি রুমটা বেদখল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ম্যানেজার আমাদের কথা খেয়াল রেখে সেই আগের এসি রুমটাই আমাদের নামে রেখে দিয়েছেন। তবে ভাড়া কিন্তু নন-এসি রুমেরই দিয়েছি।

যা হোক, কক্সবাজার আসব আর শপিং করব না তা তো হয় না। রাতটা শপিং করেই কাটালাম। অবশ্য খুব বেশি কিছু কেনা হয়নি। সবার জন্য বেশি করে আচার কিনে নিয়েছিলাম। ঐ দিয়েই আমাদের ব্যাগ ভরে গিয়েছিল। ফেরার সময় আমি কিছুতেই এসি বাসের টিকেট কাটতে দিব না। আসার সময়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তখনও ভুলতে পারিনি। নন-এসি বাসে উঠে সারা রাস্তা আমাকে খ্যাত বলে বকতে বকতে নিয়ে এল টারজান।

পরের বছর আবারও গিয়েছিলাম সেন্ট মার্টিনস। এবার একটা বিশাল দল নিয়ে। ধরতে গেলে একটা বড় সড় পিকনিকই বলা যায়। এইবার গেলাম বড় জাহাজ কেয়ারী সিন্দবাদে। এবার দেখলাম সিন্দবাদের জন্য আলাদা ঘাটও করা হয়েছে, আগের বার দেখেছি এক ঘাট থেকে দুইটা জাহাজ ছাড়ত। যা হোক, এবার সেন্ট মার্টিনসে গিয়ে হোটেল অবকাশে উঠলাম। স্মল গাইডদের দৌরাত্ম এবার দেখলাম একেবারেই নেই। বুঝলাম তারা আর সুবিধা করতে পারেনি। তবে এইবার দেখলাম পিচ্চিরা কাঠবাদাম বিক্রি করছে দেদারসে। আমরাও খেলাম দেদারসে।

এইবার আমার ছেঁড়াদ্বীপ যাওয়ার শখ মিটল। একটা ট্রলার শুধু আমরাই ভাড়া করে উঠলাম। মাঝখানের খোলে একটা গ্রুপ বসে গেল তাস নিয়ে আমি বাকীদের সাথে খোলের চারপাশে পা ঝুলিয়ে বসে সমুদ্র দেখতে দেখতে গেলাম। দ্বীপটাও সাথে দেখে নিচ্ছিলাম। সেন্ট মার্টিনসের এই দিকটা আগে দেখা হয়নি। এদিকে নেভীর একটা ক্যাম্প আছে। সেখানে উইন্ডমিল দেখে খুব ভালো লাগল। মনে হচ্ছিল যেন ইউরোপের কোথাও চলে এসেছি।

দূর থেকে ছেঁড়া দ্বীপ নজরে এল। কাছাকাছি এসে ট্রলার দাঁড়িয়ে গেল, আর যাবে না। এখান থেকে কোশা নৌকা দিয়ে পার হতে হবে। এ এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। ট্রলার এত্ত উঁচু, এর থেকে লাফ দিয়ে নৌকায় নামতে হবে। ওদিকে সমুদ্রের স্বচ্ছ পানির নীচে দেখা যাচ্ছে বিশাল বিশাল প্রবাল, যতটা গভীর মনে হচ্ছে, বাস্তবে আরও বেশি। একবার পড়লে আর উঠতে পারব না। সাঁতার তো জানিই না।

একবার মনে হয়েছিল, আমি বুঝি কখনই সাহস করতে পারব না। কিন্তু অন্যদের নামতে দেখে আর কয়েকজনের সাহায্য নিয়ে অবশেষে নৌকায় নেমেই গেলাম। নৌকাটা ভয়ংকরভাবে দুলছিল। মনে হচ্ছিল এক্ষুণি উল্টে যাবে। ভয় কাটাতে মনোযোগ দিলাম সাগরের সৌন্দর্য্যে। পানির নীচের প্রবালগুলো যে কি অদ্ভূত সুন্দর। হঠাৎ দেখা গেল একটা স্বচ্ছ সাদা জেলিফিশ সাঁতরে যাচ্ছে। এসব দেখতে দেখতে ভয় পাব কি পাব না বোঝার আগেই পৌঁছে গেলাম ছেঁড়া দ্বীপে।

দ্বীপে নেমে সবাই প্রবাল পাথর দেখতে আর ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এক ভাইয়া জানালেন এখানে শুধু এইটুকুই না, একটা জায়গায় অনেক বিশাল বিশাল প্রবাল পাথর আছে, একেকটা বড় বড় গাড়ি বা বাসের সমান। আমরাও খোঁজ লাগালাম কোথায় সেই বিশাল প্রবাল। অবশেষে পেয়েও গেলাম। এত বড় প্রবাল পাথরও হয় কল্পনাও করতে পারিনি। ছোট ছোট প্রবাল কুড়িয়ে নেয়ারও ধুম চলল। এভাবেই সব প্রবাল শেষ করে দিবে সবাই। টারজান কুড়িয়ে পেল অদ্ভূত একটা মাছের কংকাল। ঐটাই সে জমিয়ে রাখল। একটা ময়লা কালো প্রবালও নিয়েছিল বাড়িতে গিয়ে প্রসেসিং করবে বলে। এক দোকানীর কাছ থেকে শিখেছিল ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ভিজিয়ে রাখলে এটা পরিষ্কার হয়ে একদম সাদা হয়ে যাবে। বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। ময়লা প্রবালটা সারাদিন ব্লিচিং পাউডারের পানিতে ভিজিয়ে রেখেও তার রঙ বদলায়নি একটুও।

এইবার সেন্ট মার্টিনস ভ্রমণে নতুন আরেকটা ব্যাপার আবিষ্কার করলাম। আগেরবার তো ভরা পূর্ণিমায় সমুদ্র দেখেছি। এইবার দেখলাম অমাবস্যায় সেন্ট মার্টিনসের রূপ। অসাধারণ। রাত দশটা বাজতেই সমস্ত দ্বীপ অন্ধকার। শুধু সাগরের গর্জন, আর উপরে কালো আকাশ। সেই আকাশে কোটি কোটি তারা। স্কুলে ভুগোল বইয়ে যখন পড়েছিলাম খালি চোখে প্রায় ১০০ মিলিয়ন তারা দেখা যায়, বিশ্বাস হত না। এইবার নিজের চোখে দেখলাম। এত তারাও থাকতে পারে আকাশে, আর তা খালি চোখে দেখাও যায়? দেখেও যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। সবাইকে এরপর থেকে পরামর্শ দিই, সেন্ট মার্টিনস যেতে হলে বেছে বেছে অমাবস্যার সময় যেতে হবে, আর রাতে অবশ্যই সেখানে থাকতে হবে শুধুমাত্র এই কোটি কোটি তারা ভরা আকাশ দেখার জন্য।

এই পিকনিকের মত সমুদ্র-ভ্রমণের ফেরার পথের যাত্রাটাও আমার জন্য খুব সুন্দর হয়েছিল। এ সময় বাসে লটারীর আয়োজন করা হয়েছিল যেখানে প্রথম আর দ্বিতীয় দুইটা পুরস্কারই আমি পেয়েছিলাম। কিভাবে সেটা আগেই বলে ফেলেছি। নতুন করে আর বললাম না।

এরপর অনেক দিন সাগরের ডাকে সাড়া দেয়া হয়নি। গত বছর একটা অফিসিয়াল ট্যুরে আবারও যাওয়া হয়েছিল সাগরের কাছাকাছি। সেই সমুদ্রের তীরের এক রাতের গল্প আর ইনানী সৈকতের সেই দুর্ঘটনার গল্পও আগেই করে ফেলেছি। আর এমনিতেও পোস্ট অনেক লম্বা করে ফেলেছি। অতএব আর না। এইবার থামি।



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29531686 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29531686 2012-01-29 23:17:15
এবার নৌবিহারের গল্প
প্রথম কবে নৌকায় বা লঞ্চে চড়েছি মনে নেই। ছোটবেলায় নানাবাড়ি যেতে লঞ্চে চড়া লাগত। মাঝে মাঝে ফেরীতেও উঠতাম। যেখানেই চড়ি, সারাক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকাটাকে পবিত্র দায়িত্ব বলে ধরে নিতাম। শুধু যখন আম্মা ঝালমুড়ি কিনে দিত, তখন মনোযোগটা ঝালমুড়ির দিকে নিয়ে আসতেই হত। এছাড়া বাকী সময়টুকু নদীতে শুশুকের লাফ খোঁজার জন্যই ব্যস্ত থাকতাম।

ফেরীতে উঠলেও বাসের মধ্যে বসে থাকাটা কাজের কাজ মনে করতাম না। নদীর দিকে তাকিয়ে না থাকলে নদী রাগ করবে না? একবার ফেরীতে আম্মার পরিচিত এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা হল। আম্মার কোন দূর সম্পর্কের চাচা হন। সেই সূত্রে আমার নানা। নানা আমার সাথে গল্প করার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু আমার এত সময় কই। সেদিন তো নদীর সাথে সাথে আকাশের তারাও দেখতে হচ্ছিল। আকাশে অনেক তারা ছিল সেদিন। আর যদ্দূর মনে পড়ে একটা ডিমের মত চাঁদও ছিল, যেটা সার্চলাইটের মত আলো জ্বালিয়ে আমাদের খুঁজছিল। ক্লাস ফোরে পড়ি মনে হয় তখন।

১৯৮৭-র বন্যায় আমাদের এলাকা পানিতে ডুবে গেলেও তেমন বেশি পানিও হয়নি যে নৌকা চলবে। কিন্তু ১৯৮৮-র বন্যায় পুরো এলাকা এমনভাবে পানির নীচে চলে গিয়েছিল যে নৌকা ছাড়া আর কিছুই চলার উপায় ছিল না। তখন কোথাও যেতে হলে বাধ্য হয়েই নৌকায় যাওয়া লাগত। অবশ্য স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তখন, তাই আমি একেবারেই ঘরবন্দি হয়ে পড়েছিলাম। ক্লাস থ্রিতে পড়ি তখন। ঘরে বসে বসে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলাম বলে আম্মা একদিন আমাদের পিচ্চিদের নিয়ে নৌবিহারে বের হলেন। বেছে বেছে একটা ছইওয়ালা বড় নৌকা ভাড়া করা হল এক ঘন্টার জন্য। শুধু বড়পা বাসায় রইল। বড় বড় দালান-কোঠার মাঝখান দিয়ে নৌকা দিয়ে চলছি, যেন ইতালির ভেনিসে বেড়াতে গিয়েছি। ছোট ভাইটা তখন মাত্র দুই বছর বয়সের। উত্তেজনায় সে বসতেই পারছিল না। ছই ধরে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। পরে একটু ক্লান্ত হয়ে গেলে ছইয়ে নিচে বিছানো পাটিতে উপুর হয়ে শুয়ে পড়ল। এইদিনই প্রথম শুধু নৌকায় ভ্রমণের জন্যই নৌকায় চড়া হয়েছিল।

১৯৯৮-র বন্যায়ও অবস্থা খুব বেশি খারাপ ছিল। তখনকার বন্যার পানিও ছিল খুব খারাপ। গন্ধে ঐ পানির কাছে যেতেই ইচ্ছা করত না। তবু ছোট ভাইকে নিয়ে একবার পাঁচ মিনিটের জন্য একটা মিনি নৌবিহার করে এসেছিলাম। এরপর তো বাধ্য হয়েই নৌকায় চড়তে হত। এইচএসসি-র পর ভর্তি কোচিং করছিলাম তখন। খুব বিরক্তিকর ছিল এই নৌকায় চড়া।

একবার আব্বাকে নিয়ে আমি আর ছোটবোন বের হলাম বুড়িগঙ্গা দেখব বলে। একটা ছোট্ট নৌকায় করে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করলাম। হতাশই হলাম নদীর চেহারা দেখে। তবে নৌকায় ভ্রমণের ব্যাপারটুকু ভালোই লেগেছে। সেদিন আহসান মঞ্জিলও দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জানতাম না সরকারী ছুটির দিন ওটা বন্ধ থাকে। নৌভ্রমণ শেষে টমটম গাড়িতে করে বাসায় রওনা করেছিলাম।

মেডিকেলে ভর্তি হবার পর একদিন সব বান্ধবী মিলে গেলাম স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ঘুরতে, ওখানে আমাদের বেশ কিছু বান্ধবী ছিল। ঐ মেডিকেল দেখতে যাওয়া মানেই হল সাথে বুড়িগঙ্গায় বেড়ানো ফ্রি। আবারও সবাই মিলে নৌকা ভাড়া করে নৌবিহার হয়ে গেল। এইদিন আহসান মঞ্জিলটাও ঘুরে দেখা হয়েছিল। আরেকদিন, তখন মেডিকেলে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি, এক বান্ধবী বলল একটা কাজে মিটফোর্ডে যাবে। আমরাও দল বেঁধে গেলাম ওর সাথে। ওখানে একটা ভাইয়ার কাছে ওর কাজ ছিল। ঐ ভাইয়াকে আমরা চেপে ধরলাম আমাদের নিয়ে বেড়াতে যেতে হবে। কি আর করা, ফেঁসে গিয়ে বেচারা আমাদের সবাইকে নিয়ে সেই বুড়িগঙ্গায় নৌবিহারে গেলেন। তবে অল্পের উপরেই তাকে ছাড় দেয়া হল। আরেকদিন এসে পুরো সিল মারা হবে বলে শাসিয়েও দিয়ে আসা হল। অবশ্য পরে কেন যেন আর সেটা হয়ে ওঠেনি।

চতুর্থ বর্ষে এসে একটা বড় ধরণের নৌবিহারের আয়োজন হল। একটা ছোটখাট লঞ্চ ভাড়া করে সদরঘাট থেকে চাঁদপুর ঘুরে আসার পরিকল্পনা হল। বলতে গেলে এটা একটা পিকনিকই ছিল, শুধু পিকনিকটা হয়েছে নদীর উপর। কেন যেন এখানে মেডিকেলের সব জুটিগুলোই শুধু জড়ো হল। আমার খুব যাওয়ার ইচ্ছা, কিন্তু দেখলাম একেবারেই একা পড়ে যাচ্ছি। আমাকে উদ্ধার করতে এল আমাদের এক সহপাঠী। সে পাকিস্তানী মেয়ে, কোনদিন এইভাবে নদীতে ভ্রমণ করেনি। ওদের দেশে এমন নদীও নেই, তাই তার বাংলাদেশের নদী দেখার খুব শখ। যাক আমরা দুজন একটা অন্যরকম জুটি হয়ে গেলাম আর কি। যদিও ওখানে গিয়ে আসলে সবাই একসাথেই বসে আড্ডা দিয়েছি।

চাঁদপুরে পৌঁছে লঞ্চটা একটা ঘাটে ভিড়লে সবাই নেমে একটু হাঁটাহাঁটি করে এলাম। এটা একটা ছোটখাট ঘাট ছিল, লঞ্চ থেকে নামার জন্য একটা বাঁশের সিঁড়ি হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। কষ্ট হলেও আস্তে আস্তে নেমে গেলাম সবাই। শুধু আমাদের এক বান্ধবী কিছুতেই সাহস করতে পারল না, এমনকি তার বিশেষ বন্ধু তাকে ধরে নামাতে চাইলেও। যতবারই ধরে নামাতে চায়, সে কেঁউ কেঁউ করে কেঁদে ওঠে। কি আর করা, জুটি বেঁধে ঐ ছেলেকেও লঞ্চেই বসে থাকতে হল।

গ্রামে নেমে আমরা দল বেঁধে ছবি তুলতে থাকলাম। এর মধ্যে দুই বন্ধুর মধ্যে কী নিয়ে যেন ঝগড়া বেঁধে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। এখন ছবিতে একজন থাকলে আরেকজন থাকে না। অথবা থাকলেও মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের ছেলেমানুষী দেখে আমরা মুখ টিপে হাসি। আরেক দল তো মাঠে চড়তে থাকা গরু-ছাগলের সাথে ছবি তুলতে খুবই ব্যস্ত হয়ে গেল। ওদের মধ্যে পরিচিত কাউকে খুঁজছিল মনে হয়। <img src=" style="border:0;" />

ফেরার পথে আবার সেই লটারী। এবার কিছুই পেলাম না। নিশ্চয়ই কোন কারচুপি হয়েছিল।

সদরঘাট-বরিশাল রুটের বড় বড় লঞ্চগুলোতে ভ্রমণ করা হয়েছে বেশ কয়েকবার। এর মধ্যে একবার একেবারে অন্যরকম একটা ভ্রমণ হয়েছিল। সেই রাতে এত কুয়াশা পড়েছিল যে লঞ্চ মাঝনদীতে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সারারাত, সকালেও কুয়াশার কারণে ছাড়তে পারেনি। প্রায় দুপুর হয়ে যাবে এমন বেলায় কুয়াশা একটু কাটলে লঞ্চ ছাড়ল। নদীতে তখন সব জেলেরা মাছ ধরতে ব্যস্ত। বেশির ভাগ নৌকায় বাবা-ছেলে মাছ ধরছে। তবে সবাই খুব বিরক্ত, এত বড় একটা লঞ্চ এই সময়ে যাওয়ার কারণে এর শব্দে তাদের মাছগুলো সব পালিয়ে যাচ্ছিল।



নৌবিহারের এত গল্প যে বলছি, আসল কথাটাই বলা হয়নি। কানে কানে বলি, আমি কিন্তু সাঁতার জানি না।



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29529076 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29529076 2012-01-25 16:40:46
আমারও পিকনিক নিয়ে লিখতে ইচ্ছা হল যে
একবার পিলো পাসিং-এ তৃতীয় হয়েছিলাম। ঐটা অবশ্য আসল পিলো মানে বালিশ ছিল না। বালিশ নেয়ার কথা মনেই ছিল না কারুর। তাই এক আংকেল তার সোয়েটার গুল্টি পাকিয়ে বেঁধে পিলো বানিয়ে দিলেন। ঐটার দফা রফা করে ছাড়লাম আমরা। আরেকবার তো একটা কি জানি জিনিস লুকিয়ে রেখে সব ভাবীদের খুঁজতে বলা হল। ঐটা লুকানোর দায়িত্ব ছিল আব্বার। আমরা লুকাতে দেখেছিও। আব্বাকে তখন জিজ্ঞেস করছিলাম, আব্বা ঐ ঝোপের মধ্যে কী করেন? আব্বা বললেন, পানের পিক ফেলি। আমাদের সন্দেহ ঠিকই ছিল, আব্বা একটা প্যাকেট লুকাচ্ছিলেন। আমরা দেখলেও আম্মা দেখেন নি সত্যি সত্যি। কিন্তু কিভাবে যেন আম্মাই প্যাকেটটা খুঁজে বের করে ফেললেন। আর সবাই নিশ্চিত হয়ে গেল এটা নিশ্চয়ই আব্বার ষড়যন্ত্র। একটা অ্যাশট্রে ছিল ঐ প্যাকেটে, যেটা আম্মা ফুলদানীর বেদী হিসেবে ব্যবহার করেছেন অনেক দিন।

পিচ্চিদের জন্যও একটা লুকোনো প্যাকেট ছিল। ওটায় ছিল বেলুন। ও হ্যাঁ, আমি যেবার পিলো পাসিং-এ তৃতীয় হলাম, পুরস্কার পেয়েছিলাম একটা লুডোর বোর্ড। একবার আমরা কয়েকজন মিলে অভিযানে বের হলাম। আশেপাশের গ্রামগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। একটা বাড়ির বাইরে দেখলাম এত্ত বিশাল বিশাল দুইটা মহিষ দাঁড়িয়ে আছে। এত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল যে মনে হচ্ছিল দুইটা মূর্তি। অনেকক্ষণ খেয়াল করে দেখলে অবশেষে চোখের পলক ফেলতে দেখা যায়। আমাদের অবাক হয়ে মহিষ দেখতে দেখে সেই বাড়ির এক লোক বলল, আপা ভিতরে আসেন, আরও বড় মহিষ আছে। আমরা ঢুকে আরও বড় মহিষ দেখলাম, বাড়ির ভিতরের উঠানে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে ছিল।

তবে আমরা গ্রামের দিকে যাচ্ছিলাম দূর থেকে শুনতে পাওয়া ঢেঁকির শব্দ অনুসরণ করে। সেটা ওদের বলতেই ওরা ঢেঁকির কাছে নিয়ে গেল। আমাদের মধ্যে অতি উৎসাহী একজন ঢেঁকি পাড়াও দিয়ে দিল। আমাদেরকেও করতে বলছিল, কিন্তু সবাই এমন করে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল যে লজ্জা পেয়ে গেল। এই পিকনিকটা কয়েক বছর পর কেন যেন বন্ধ হয়ে গেল। হয়তো সব বন্ধুরা আর একসাথে সময় করতে পারছিল না। আর কয়েকজন তো না ফেরার দেশেই চলে গিয়েছে।

পাড়ার ক্লাবের একটা পিকনিকেও গিয়েছিলাম ক্লাস সেভেনে কি এইটে থাকতে। গাজীপুরের শালবনে খুব সম্ভবত হয়েছিল। ঐবার খুব পচা একটা খেলা হয়েছিল আমাদের। এক পায়ে দৌড়। আমি জীবনে কোনদিন দুই পায়ের দৌড়ে কোন পুরস্কার পাইনি, সব সময় শেষের দিক থেকে প্রথম বা দ্বিতীয় হয়েছি। এই এক পায়ের দৌড়ে হয়ে গেলাম তৃতীয়, তাও আবার সামনের দিক থেকেই। পুরস্কার পেলাম একটা গোলাপী রঙের টিফিন বক্স।

মেডিকেলে প্রথম বর্ষে পিকনিক করেছিলাম ঐ গাজীপুরের শালবনেই, তবে অন্য একটা স্পটে। যাওয়ার পথে এক দোস্ত বাসের মধ্যে শুরু করল ভিক্ষা। অবিকল হাসানের গলা নকল করে ভিক্ষুকের গান গাইতে গাইতে তার ভিক্ষাকার্য চলল। সবাই এক টাকা দুই টাকা করে দিতে থাকল। একজন বান্ধবী দয়া পরবশ হয়ে পুরো দশ টাকার নোট দিয়ে দিল। আমার আবার বরাবরই দয়া মায়া কম। আমি আমার ব্যাগ হাতড়ে পেয়ে গেলাম একটা ২৫ পয়সার কয়েন। সর্বোচ্চ দশ টাকার চেয়ে এই সর্বনিম্ন চার আনাই বেশি হট্টগোলের সৃষ্টি করল। <img src=" style="border:0;" />

স্পটে পৌঁছে মেয়েরা ছোট বাচ্চাদের মত দাঁড়িয়াবান্ধা টাইপের কিছু একটা খেলা শুরু করে দিল। আমি আর আমার বান্ধবী, যারা মানিক-জোড় নামে পরিচিত ছিলাম, রওনা দিলাম আমাদের অভিযানে। যেদিকে দু'চোখ যায় হারিয়ে যাব এই হল মিশন। অবশেষে একটা খালের সন্ধান পেলাম। স্থানীয় লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম এটা একটা নদী থেকে এসেছে, যেটা শুধু বর্ষাকালেই থাকে। ওহ, আগের সব পিকনিক শীতকালে হলেও এই পিকনিকটা কিন্তু বর্ষাকালের শুরুতে হয়েছিল।

আমাদের অভিযানের এখানেই বিরতি দিয়ে আমরা দুজন খালের পানিতে দুই পা ডুবিয়ে আরামে শুয়ে পড়লাম। অনেকক্ষণ ঐভাবেই ছিলাম। তারপর আমাদের খোঁজে আসা আমাদের বন্ধুদের ডাকে উঠলাম। তারাও এত সুন্দর জায়গা পেয়ে কয়েকজন পা ডুবিয়ে বসে রইল খালের পাড়ে। ভোজনপর্বের পর শুরু হল লটারী। ওহ তার আগে একটা ভোটগ্রহণ হয়েছিল আমাদের ক্লাসের মিস্টার সুন্দর আর মিস সুন্দরী নির্বাচনের জন্য। সেটার ফলাফল ঘোষণা ও পুরস্কার বিতরণীর পর লটারীর পালা। প্রথম দুইজন সুন্দর মত পুরস্কার নিয়ে চলে এল। তৃতীয়বারেই আমার নাম্বার উঠল। এইবার থেকেই শুরু হল আরেক শাস্তি। এমনি এমনি পুরস্কার দেয়া হবে না, একটা কিছু করতে হবে। আমাকে করতে বলা হল ক্যাটওয়াক। একজন আবার দেখিয়েও দিল কিভাবে করতে হবে। আমি করব না বলে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিন্তু দোস্তরাও ছাড়বে না। অবশেষে স্যারদের হস্তক্ষেপে ছাড়া পেলাম। পুরস্কার পেলাম একটা পেপসোডেন্ট টুথপেস্ট আর একটা স্যাভলন। :-*

পরের বছর আবারও পিকনিকের আয়োজন হল, এবারের স্পট শেরপুরের গজনী। যাওয়া-আসায় অনেক সময় চলে গেলেও মজা কোন অংশে কম হয়নি। আর জায়গাটাই এত সুন্দর যে জার্নির কষ্ট সব ভুলে যেতেই হয়। আটতলা সিঁড়ি বেয়ে পা দুটো প্রায় ভেঙে-চুরে ওয়াচ টাওয়ারে ওঠার পর চারপাশের দৃশ্য দেখে আর মনেও থাকেনি যে একটু আগেই পা কেমন ভীষণ ব্যথা করছিল। এখানেও আমাদের হন্টন অভিযান জারি ছিল। তবে এইবার ভোজনপর্ব শেষে দুষ্টু পুলাপাইনের দুষ্টুমি এড়াতে লটারীর টিকিটটা জমাই দিইনি। <img src=" style="border:0;" />

এর বছর দুয়েক পর এক বান্ধবীর দাওয়াতে ঢাকা ইউনিভার্সিটির একটা পিকনিকে গেলাম, স্পট ছিল মানিকগঞ্জের নাহার গার্ডেন। এই স্পটটাও খুব পছন্দ হয়েছে। অল্প জায়গায় মোটামুটি সুন্দর করেই সাজিয়েছে ছয়টি স্পট, যার একেকটার একেক থিম। কোনটা টাইটানিক জাহাজ, কোনটা দ্বীপের মধ্যে ঘর, কোনটা বাংলো, কোনটা ফুলের বাগান। আমরা অফিস খোলা এমন দিনে যাওয়ায় সবগুলো স্পট ফাঁকা ছিল, তাই এক স্পটের ভাড়া দিয়ে ছয়টি স্পট দখল করে রাখতে পেরেছিলাম।

এর কয়েক বছর পর একটা ফ্যামিলি পিকনিকের দাওয়াত পেলাম। এক পরিচিত বড় ভাইয়ের নানাবাড়ি নবাবগঞ্জ। সেখানে তার পরিচিত সবাইকে নিয়ে পিকনিকের আয়োজন করেছেন। মনে করেছিলাম ছোটখাট ঘরোয়া আয়োজনের মত হবে। গিয়ে দেখি পুরাই এলাহী কান্ড। এমন জাঁকজমকপূর্ণ আর এত বিভিন্ন রকম আইটেমসহ পিকনিক আমি আর কখনই দেখিনি। ভাইয়ার নানাবাড়িটাই একটা বিশাল দেখার মত বাড়ি, ছোটখাট প্রাসাদ বলা যায়। বাড়ির ভিতরে একটা উঠান, বাইরে আরেকটা বড় বাগানের মত উঠান, পুকুরও আছে সেখানে। ঐখানেই পিকনিকের মূল আয়োজন। বাড়িতে ঢুকেই দেখি আমাদের স্বাগতম জানানোর জন্য অপেক্ষা করছে খেজুরের রস। তারপর বাড়ির ডাবগাছ থেকে সব ডাব পাড়া হল। একের পর এক ডাব কেটে চলল, আর ডাবের পানি দিয়ে তৃষ্ণা মেটানো চলল। চলে এল কামরাঙা ভর্তা। এর মধ্যেই চলছে খেলার আয়োজন। ছোটদের জন্য বিস্কুট দৌড়, বড়দের জন্য ডার্ট নিক্ষেপ। আমি পুরস্কার না পেলেও টারজানের চেয়ে বেশি নাম্বার পেয়েছিলাম। <img src=" style="border:0;" />

খেলার পাশাপাশি মনোরঞ্জনের জন্য রয়েছে আরও আয়োজন। এর মধ্যে আছে বানরের খেলা, টিয়াপাখি দিয়ে ভবিষ্যৎ দেখা। যেটা দেখে সবাই মজা করছিল। কারুর হয়ত বিয়ের যোগ আছে, অথচ সে এর মধ্যেই দুই বাচ্চার বাপ। <img src=" style="border:0;" />

আরও ছিল চাচা-ভাতিজার সার্কাস। ওদের অসাধারণ শারীরিক কসরত দেখে মুগ্ধ হতেই হল। বাড়ির ভিতরের উঠানে চলছিল মুড়ি ভাজার উৎসব। সেটাও ছিল দেখার মত। দুপুরে ভারী খানা-পিনার পর ভটভটি ট্রলারে করে ইছামতী নদীতে নৌবিহারে গেলাম। এরপর গেলাম জমিদারবাড়ি দেখতে। অনেকগুলো জমিদারবাড়ী আছে ওখানে। মঠবাড়ী, জজবাড়ী আর নতুনবাড়ী দেখা হল। নতুনবাড়ীতে লটারীর আয়োজন করা হয়েছিল। কিছুই পেলাম না। কপালে নাই। সাপের খেলার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল এখানে। কিন্তু শীতকাল বলে সাপগুলো শুধু ঘুমিয়ে পড়ছিল। সাপুড়ে গুঁতাগুঁতি করে ওদের জোর করে জাগানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। রাগের চোটে একটা সাপ হাগুই করে দিল।

সন্ধ্যায় আবার ফিরে এলাম ভাইয়ার নানাবাড়ি। এখানে সকালে ভাজা মুড়ি দিয়ে ছোলাভাজা আর লটপটি খাওয়া হল। আরেকবার লটারীর ব্যবস্থাও করা হল। এইবার আমি একটা ছোট্ট কাঁচবন্দী গুবরে পোকা আর টারজান একটা ডায়রী পেল। বাইরের উঠানে এরপর আয়োজন করা হল পটকা আর আতশবাজীর। একটা পটকা এতই বেতমিজ, সে দৌড়ে আমার কাছে চলে এল, আমি পালানোর সময়টাও পেলাম না। আমার জামার একটু অংশ পুড়ে গিয়েছিল। তারপর সবাই মিলে মিষ্টি কমলা খেতে খেতে রওনা দিলাম বাড়ির দিকে।

এরপর অনেক বছর কোন পিকনিকে যাওয়া হয়নি। একবার সীতাকুন্ডে যাওয়ার একটা পরিকল্পনা হলেও শেষ পর্যন্ত আর বাস্তবায়ন হয়নি। এত বছর পর এই গত শীতে এসে পিকনিকের সুযোগ পেলাম। এবারের ভেন্যু নড়াইলের পিকনিক স্পট। নামটা কেন ভুলে গেলাম নিজেও বুঝতে পারছি না। এই জায়গাটাও অনেক সুন্দর। এইখানেও ভোজনপর্ব শেষে পিচ্চিগুলোর দুষ্টুমি শুরু হয়ে গেল। আমি ভেবেছিলাম আমি পার পেয়ে যাব, কিন্তু পিচ্চিরা ছাড়ল না। এক ভাইয়াকে আমার পিছনে লেলিয়ে দিল আমাকে প্রোপোজের অভিনয় করার জন্য। আমি আর কী বলব, সেই ভাইয়াই লজ্জায় মরে যাচ্ছিল। কোনমতে একটা লাইন বলেই দৌড়ে পালিয়ে গেল। কিন্তু এই কাজটুকু করেই ভাইয়া একটা পুরস্কার পেয়ে গেল। তার সেই পুরস্কারপ্রাপ্ত লাইনটা ছিল, তোমার চোখ দুটো অনেক সুন্দর, চশমা পড়লে আরও সুন্দর লাগে। সিনিয়ররা অবশ্য এই পুরস্কারে ভেটো দিয়েছিলেন, যেহেতু তার এই প্রোপোজে আমি সাড়া দিইনি। কিন্তু তাদের প্রত্যেককেও যার যার পারফর্মেন্সের জন্য পুরস্কার দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ঘোর অন্যায়।

গত বছর আরেকটা পিকনিকে যাওয়া হয়েছিল, আবার সেই গরমের দিনে। এবার যাওয়া হয়েছিল মেহেরপুরের মুজিবনগরে । এই পিকনিকের ছবি আগেই দিয়েছি, তাই এইটার গল্প নতুন করে করার কিছু নেই। শুধু একটা কথা বলে দিই, এইবার কিন্তু লটারীতে আমি একটা সুন্দর কাঁচের সুগার বোল পেয়েছি। <img src=" style="border:0;" />

সবার পিকনিক পোস্ট দেখে দেখে আমারও একটু আহ্লাদ করে পিকনিকের গল্প করতে ইচ্ছা হল, তাই আহ্লাদী-মার্কা একটা পোস্ট দিয়েই দিলাম। যা থাকে কপালে।




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29527313 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29527313 2012-01-22 21:19:30
পিচ্চিদের ভালোবাসা " style="border:0;" />

আগে কোন এক চ্যানেলে একটা হিন্দী সিরিয়াল হত (আমি যেগুলো দুই চক্ষে দেখতে পারি না) যেখানে দুই সিয়ামিজ টুইনের কাহিনী ছিল, দুই বোন তাদের নাম আম্বার-ধারা, তাদের দুজন পেটের দিকে জোড়া লাগানো। ভাগ্নে নামটা ঠিকমত বুঝত না। সে আমার গায়ের সাথে সারাক্ষণ লেগে থাকত আর বলত, আমরা দুজন আন্দার-ধারা। এখন অবশ্য ঐ নামটা ভুলে গিয়েছে। এখন কেউ যদি আমাকে দেখে বলে, আরে আন্টিমনি আসছে নাকি? সে বলে, হ্যাঁ, আন্টিমনিও আসছে, সাথে তার লেজও আছে। লেজটা হল আন্টিমনির জানের জান ভাগ্নে। বিদায়ের সময় সে আমাকে আটকে রাখতে চায়। আগে দরজার সবগুলো ছিটকিনি আটকে রাখত, একবার তো কোত্থেকে একটা তালা জোগাড় করে আটকে দিয়েছিল। ইদানিং এরকম না করলেও বিদায়ের সময় মন খারাপ করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। কথা বলেও না, শুনতেও চায় না।

ছোট ভাগ্নে আবার আরেক পাগল। সে এমনিতে আমার কোলে আসে না। তবে দেখলে আন্তিমুনি আসসেএএএএএএএ বলে একটা চিৎকার দিবেই। তার চেয়েও বেশি চিৎকার করবে আমি যাওয়ার সময়। প্রতিবারই আমি চলে আসার সময় কান্নাকাটি করে এক গামলা চোখের পানি বিসর্জন দিয়ে ফেলবে। অথচ সারাদিনে হয়ত একবারও আমার কাছে ঘেঁষবে না। কাছে আসে তখন, যখন দেখে তার বড় ভাইয়া, মানে আমার বড় ভাগ্নে আন্টিমনির কোল দখল করে আছে। এই সময় সেও একটু আদর দখল করতে চায়।

একবার এমন হয়েছে যে ছোট ভাগ্নের মায়ের, মানে আমার মেজপাকে (যাকে শাহানা নামে চেনে সবাই) দেখে সবার পিচ্চি ভাগ্নীটা তার কোলে উঠতে চাইল। এই মেজ খালা হল ভাগ্নীর ঘুমের কোল। মেজ ওকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতে থাকল। এদিকে নিজের মায়ের কোলে আরেক পিচ্চিকে দেখে ভাগ্নের গেল মাথা খারাপ হয়ে। সেও মায়ের আরেক কোল দখল করল। এইবার বড় ভাগ্নে আমার কোলে চলে এল, আর ছোট ভাইকে ডেকে বলল, এই যে আন্টিমনির কোলে আমি। সেটা দেখে পিচ্চি ভাগ্নের মাথা আবার খারাপ। দৌড়ে মায়ের কোল ছেড়ে আমার কোল দখল করল। আবার ঐদিকে মায়ের কোলটাও দখল করে আছে আরেকজন, সেটাও তার সহ্য হচ্ছে না। একবার মায়ের কোল, আরেকবার আন্টিমনির কোল, এই দখলদারিই চলতে থাকল। শেষে ওর মা বলল, এক সাথে তো দুই কোল দখল করতে পারবা না, যে কোন একটা বেছে নাও। বেচারা মনের দুঃখে দুই কোলই বিসর্জন দিয়ে নিজের মনে খেলতে শুরু করল।

পিচ্চি ভাগ্নীটা আবার আন্টিমনির কোল দখল নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করে না। তবে একবার আসলে আর যেতেও চায় না। কোলে উঠেই সে আঙ্গুল তুলে নির্দেশ দেয়া শুরু করে কোথায় কোথায় যেতে হবে, কী কী ধরতে দিতে হবে। মুখের বোল তো এখনও পুরোপুরি ফোটেনি, দুই-একটা শব্দ দিয়েই সব কথা বলে ফেলতে চায়। তার মধ্যে একটা শব্দ হল, অ্যাইন। আগে অ্যাই বলত, এখন শেষে একটা 'ন' লাগিয়ে আরেকটু জোরদার করে বলে। এই অ্যাইন-এর অনেক অর্থ - কাছে আসো, কোলে নাও, হাঁটো, ঐদিকে যাও, ঐটা ধরতে দাও - সবই বুঝতে হবে এই এক শব্দে।

ভীষণ গানপাগল এই ভাগ্নী। গান শুনতে পেলেই তার নাচ শুরু হয়ে যায়। আর একটা গান শেষ হওয়া মাত্র দুঃখ করে বলতে থাকে, গান নাই, গান নাই, গান নাই। আরেকটা গান শুরু না হওয়া পর্যন্ত এই জিকির চলতে থাকে।

শুধু ভাগ্নে-ভাগ্নীদের কথা বলছি, আমাকে ভালোবাসার আরও অনেক পিচ্চি আছে। যে কোন বাড়িতে গেলেই পিচ্চিরা আমার ভক্ত হয়ে যায়, আর বিদায়ের সময় সেই কান্নাকাটি। এক বাড়িতে দেড় বছরের একটা পিচ্চির সাথে সারাদিন খেলার পর যখন চলে আসব, সে এতই মাইন্ড করল যে এরপর তার সাথে দেখা করার পর সে রাগ করে আমার দিকে তাকালোও না, মুখ ঘুরিয়ে রাখল। যা হোক, পরে তার মান ভাঙাতে পারলাম। সারাদিন আবারও আমার সাথে খেলল, এমন কি তার প্রতিদিনের খেলার সাথীদের কাছেও গেল না, যেখানে একদিনও তার না গেলে চলে না। কিন্তু আবারও সেই বিদায়ের সময় কান্নাকাটি করে হুলুস্থুল।

কলিগদের পিচ্চিদের সাথেও একই কাহিনী। এক পিচ্চি তার জন্মদিনের দাওয়াত দিতে সকালবেলাই মায়ের সাথে অফিসে এল। জন্মদিনে সে কী উপহার চায় এটা গোপনে জেনে নিয়ে বললাম, ঠিক আছে সন্ধ্যায় চলে আসব। সে এরপর হাসপাতালের সব রোগীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরে টানতে টানতে চিৎকার করে কান্না শুরু করল, আপু এক্ষুণি আমার বাসায় চল। (সে আবার আমাকে আন্টি ডাকতে রাজী না, আপু বলেই ডাকে।) যতই বোঝাই এখন আমার কাজ আছে, সন্ধ্যায় আসব, কে শোনে কার কথা। এমন কি উপহারের লোভও দেখালাম, সন্ধ্যায় নিয়ে আসব। তবু সে এখুনি আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যাবে, উপহারও দরকার নেই তার। তার কান্নাও থামে না, আমার হাতও ছাড়ে না। অনেক কষ্টে হাত ছাড়িয়ে নিতে হল। সন্ধ্যায় গিয়েও তার হাত থেকে আর ছাড়া পাওয়া যায় না। বাকী সবাই বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছে, সে আমার কোলে উঠে শক্ত করে ধরে রেখেছে, এইবার কিভাবে যাবা। আবারও তাকে কাঁদিয়েই চলে আসতে হল। এই কাহিনী অহরহই ঘটে। ওদের বাড়িতে যখনই যাই, বেচারীকে কাঁদিয়েই আসতে হয়।

সেদিন অফিসে আরেক কলিগের পিচ্চি এসেছে। তার আবার সবার সাথেই খুব খাতির। সবার সাথে গল্প আর খেলা করতে করতে হঠাৎ সে জানতে পারল আমার হাতে ব্যথা। সাথে সাথে অন্য সবার সাথে তার খেলা শেষ। আমার কাছে এসে আমার হাতে আদর করে দিল। এরপর আমার পাশে বসে আমাকে ওষুধও খাইয়ে দিল নিজের হাতে। বলতে থাকল, আন্টি শোনো, তুমি আমার বাসায় চল, চা খাও, পক্কন খাও, তাহলে দেখবা তোমার ভাল্লাগবে। এত আদরের ডাক কি আর না করা যায়? আর না করলে সে ছাড়তও না। এরপর সে দুই হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে গেল তার বাসায়। নিজে ধরে আমাকে বসাল, আমার গায়ে লেপ তুলে দিল। পরে আবার নাচ-গানও করে দেখাল। ফেরার সময় অবশ্য এই পিচ্চি খুব একটা ঝামেলা করেনি, তবে এরপর থেকে দেখা হলেই সে লাফ দিয়ে বলে ওঠে, আন্টি আজকেও চল আমার বাসায়, অনেক মজা হবে। বেচারীর মন খারাপ করিয়ে দিয়ে বলতে হয়, আজকে না রে আম্মু, আরেকদিন যাব।

পিচ্চিগুলো এত ভালোবাসে আমাকে, আর আমি শুধু তাদের কাঁদাই, মন খারাপ করে দিই। আন্টিমনিটা এত পচা!


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29523908 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29523908 2012-01-17 15:22:03
হাবি জাবি ছবি - ৫


হাতে ব্যথা। বেশি বেশি টাইপিং করতে পারব না। তাই কথা কম বলে ছবি দেখাই। এইবার গুগল মামুর কাছ থেকে কোন ছবি নিইনি। উপরেরটাও আমারই তোলা। এই ছোটখাট বড় বিলাইটার মালিক আমার প্রতিভাধর ভাগ্নী।

এইবার আমার প্রতিভা দেখাই। এই ছবিটা, আমার আঁকা না অবশ্য। আমি শুধু রঙ করেছি। <img src=" style="border:0;" />




যে কোন লিফটে উঠলে তার ছাদের দিকে তাকিয়ে দেখা আমার একটা বদভ্যাস। এইটা সেইরকমই একটা লিফটের ছাদ।




মোমবাতি দেখলে ক্যামেরা নিয়ে দুষ্টুমি করা আরেকটা বদভ্যাস। এইবার তার কিছু নমুনা।












এইটা ভালুবাসা দিবস ইস্পিশাল। ওহহো, এখনও তো দিবসটা আসে নাই।










নাহ, অনেক দুষ্টুমি হল। এইবার মোমবাতিটার আসল রূপ দেখি।




আরও কিছু সুন্দর মোমবাতি আছে। এইগুলো দেখিয়ে পোস্ট শেষ করি।




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29522899 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29522899 2012-01-15 19:02:42
কিছু মিছু - ৪



কিছু মিছু - , ,


ইদানিং আলসেমীতে পেয়ে বসেছে। ব্লগে লিখতে গেলেই মনে হয়, দূর এত কষ্ট করে কে?
আরেকটা ফাঁকিবাজি পোস্ট দিই তার চেয়ে। প্রতিটা ছবির সাথে তারিখটাও দিয়ে দিলাম।

১. ১১ অক্টোবর, ২০১১।




২. ১১ অক্টোবর, ২০১১।




৩. ১২ অক্টোবর, ২০১১।




৪. ১৩ অক্টোবর, ২০১১।




৫. ২ নভেম্বর, ২০১১।




৬. ৩ নভেম্বর, ২০১১।




৭. ৩১ ডিসেম্বর, ২০১১।




৮. ৩১ ডিসেম্বর, ২০১১।




৯. ১০ জানুয়ারী, ২০১২।




১০. ১১ জানুয়ারী, ২০১২।




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29520759 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29520759 2012-01-11 22:52:20
ডাইরীর পাতা থেকে-২৮<img src="http://cdn.somewhereinblog.net/smileys/emot-slices_25.gif" width="23" height="22" alt=":P" style="border:0;" /><img src="http://cdn.somewhereinblog.net/smileys/emot-slices_25.gif" width="23" height="22" alt=":P" style="border:0;" /><img src="http://cdn.somewhereinblog.net/smileys/emot-slices_25.gif" width="23" height="22" alt=":P" style="border:0;" />


২২শে মে, ২০০৪।

আমি, বড়পা, জানের জান ভাগ্নে আর আরও কয়েকজন একটা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমি একটা প্লেটে ভাত খাচ্ছিলাম :-* । একটা বি আর টি সি-র বাস আমাদের সামনে দিয়ে আস্তে আস্তে মোড় ঘুরছিল। ভাগ্নে এক লাফে বাসের সামনের দরজা দিয়ে উঠে পড়ল। বাসে একটা সুন্দর গান বাজছিল। কী গান ঠিক মনে নেই। আমার গানটা পুরোটা শুনতে ইচ্ছা হচ্ছিল, কিন্তু বাসটা চলে যাচ্ছিল। আমি দৌড় দিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে উঠে পড়লাম। এরপর বাসের সিঁড়িতে বসেই ভাত খেতে থাকলাম আর গান শুনতে থাকলাম <img src=" style="border:0;" />। কিছুক্ষণ পর বাসটা আবারও ইউটার্ন নিয়ে আবার আগের জায়গায় এসে থামল। আমি আর ভাগ্নে দুজনেই নেমে পড়লাম।

আমি বাসায় গিয়েছি। দেখি বড়পার হাতে একটা গয়নার সেট। বড়পা সেগুলো পরে দেখছিল। এরপর শুধু নেকলেসটা নিয়ে বলল, আমি শুধ এটা নিব, কানের দুল তোমরা নিতে পারো। আমি দুল জোড়া নিয়ে অনেক চেষ্টা চরিত্র করে কানে পরলাম। কিন্তু দুলগুলো এত ভারী ছিল যে মনে হচ্ছিল কান ছিঁড়ে পড়ে যাবে। হঠাৎ দেখি আমরা বাসার সবাই একটা ফাস্ট ফুডের দোকানে বসে আছি। আমার কানে তখনও সেই দুল। আমি খুলতে খুলতে বড়পাকে বললাম, এগুলো পেয়েছ কোথায়, এত ভারী!

দুলগুলো খুলে হাতে ধরে নেড়ে চেড়ে ভালোভাবে দেখতে থাকলাম, ডিজাইনটা খুবই সুন্দর ছিল। আম্মাকে দেখলাম দোকানের বাইরে একটা ছেলের সাথে কথাবার্তা বলছেন। ছেলেটাকে দেখে মাস্তান টাইপ মনে হল। সে আম্মার সাথে কথা বলতে বলতে বারবার আমার হাতের দিকে তাকাচ্ছিল। আমি দুলজোড়া ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে রাখলাম। বড়পাকে বললাম, এই দুল কি সোনার, না ইমিটেশনের, না গোল্ড প্লেটেড? বড়পা কিছু বলল না। ছেলেটাকে দেখলাম এখনও আমার হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ খেয়াল হল আমার হাতে এনগেজমেন্ট রিংটা আছে। আমি তাড়াতাড়ি খুলে সেটাও দুলের সাথে রেখে দিলাম। বড়পাকে বললাম, আম্মা এই ছেলেটার সাথে এত কী কথা বলছে?

আর মনে নাই। /<img src=" style="border:0;" /> ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29518585 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29518585 2012-01-08 14:24:31
যে লেখাটা লিখব লিখব করেও লেখা হয়নি কয়েকবার লিখতে গিয়েও থেমে গিয়েছি। হয়তো না লেখাই ভালো ছিল। কষ্ট বাড়বে। যে কষ্টটুকু সযত্নে লুকিয়ে রেখেছি সেটা বাইরে আসতে না দেয়াই তো উচিৎ। আবার উল্টোটাও হয়ত ঠিক, হয়ত লিখলেই বুকের ভিতর জমে থাকা কষ্টগুলোর ভার কমবে। জানি না কোনটা ঠিক।


প্রায় তিন মাস আগের কথা। কুরবানী ঈদে বাড়ি যেতে পারব না এমন একটা আভাস পাচ্ছিলাম। তাই ঈদের বেশ আগেই বলতে গেলে এক রকম জোর করেই ছুটি নিয়ে নিলাম বাড়ি থেকে ঘুরে আসার জন্য। আব্বার সাথে দেখা করতে গেলাম। ওখানে গেলে পিচ্চি ভাগ্নে-ভাগ্নীদের সাথেই কেটে যায় সারাটা দিন। ফেরার সময় আব্বা জানতে চাইলেন কতদিনের ছুটি, আরেকদিন আসতে পারব কি না। কিন্তু আমার কর্মস্থলে ফেরার সময় হয়ে এসেছে, বললাম আর আসা হবে না। আব্বা একটু মন খারাপ করলেও বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, ভালোভাবে যাস।

বাস ধর্মঘটের কারণে রওনা দেয়া হল না কর্মস্থলে। বিকাল পর্যন্ত ধর্মঘট ছাড়ে কি না সেই আশায় সব গুছিয়ে তৈরি হয়ে বসে রইলাম। সন্ধ্যায় যখন নিশ্চিত হলাম আজকে আর যাওয়া হবে না, ভাবলাম আব্বার সাথে আরেকবার দেখা করেই আসি। বের হয়ে গেলাম তখুনি। সাধারণত ঐ বাসায় গেলে সকালের দিকে যাই, সন্ধ্যার পর চলে আসি। এবার রওনাই দিলাম সন্ধ্যায়। বাসায় গিয়ে কলিংবেল টিপতেই দরজা খুলে দিলেন আব্বা নিজে। এই অসময়ে আমাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, তুই? তোর না আজ রওনা দেয়ার কথা? বললাম, যেতে পারিনি।

আব্বা খুশিতে ঝলমল করে উঠলেন। যেন আমি একটা ছোট বাচ্চা এমনভাবে বললেন, কী খাবি বল, দোকান থেকে নিয়ে আসি। বললাম, কিছু লাগবে না। তবু জোর করতে থাকলেন আব্বা। ওদিকে পিচ্চি ভাগ্নেটাও বাইরে যাওয়ার জন্য লাফাতে থাকল। আব্বার অসুস্থ শরীর, পিচ্চিকে সামাল দিতে পারবে না। বললাম, আচ্ছা পিচ্চিকে নিয়ে আমি সাথে যাচ্ছি। দোকানে গিয়ে আব্বার সেই এক কথা, কী খাবি বল কিনে দিই। পিচ্চি চকলেট বাগিয়ে নিল। আব্বা বারবার আমাকে জোর করতে থাকলেন কিছু নেয়ার জন্য। জানেন যে আমি আইসক্রিম খুব পছন্দ করি, তাই আইসক্রিমের কথা বললেন। কিন্তু আমার তখন খুব ঠান্ডা লেগেছে। বললাম, আমি এখন আইসক্রিম খেতে পারব না আব্বা, আমার কিছু লাগবে না। দেখলাম আব্বা মুখ কালো করে ফেলছেন। তাড়াতাড়ি বললাম, আচ্ছা আমি ডালভাজা খাব। এইবার আবার হাসিতে ভরে উঠল আব্বার মুখ। ডালভাজা কিনে দিয়ে আমাদেরকে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন।

একটু পর আব্বাও ফিরে এলেন। এসেই খোঁজ নিলেন আমি ডালভাজা খেয়েছি কি না। বললাম, খেতে কি আর দেরী করেছি, সব সাবাড় করে দিয়েছি। তৃপ্তির হাসি দেখতে পেলাম আব্বার মুখে। আরও কিছুক্ষণ থাকতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু রাত হয়ে যাচ্ছিল। আব্বার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম।

পরদিনও ধর্মঘট চলছিল, তারপরও এরই মধ্যে অনেক ঝামেলা করে কর্মস্থলে পৌঁছুলাম। একদিন দেরি করে আসার জন্য ঝাড়িও খেতে হল। কুরবানী ঈদে যে ছুটি পাব না সেই ব্যাপারে নিশ্চিত হলাম। এমন কি ঈদের পরেও ছুটি পাব না। ঈদের দিন সকালে হাসপাতালে বসে আছি, আব্বা ফোন দিলেন। দুঃখ করে বললেন, এইবার আমি কুরবানী দিতে পারলাম না রে, আমার আর সেই সামর্থ্য নেই। আমি কী কী রান্না করেছি তার খবরও নিলেন।

ঈদের ছুটিতে ডিউটি করেই কাটাতে হল। ঈদের পরের সপ্তাহেও একটা ঝামেলায় আটকে গেলাম, আবারও সেই ডিউটি। তার পরের সপ্তাহেও ৪৮ ঘন্টার ডিউটি পড়ে গেল। আর বুঝি বাড়ি যাওয়া হবে না এমন একটা আশংকায় পেয়ে বসল। হঠাৎ করে এত মন খারাপ লাগল যে টারজানকে ফোন করে কান্নায় ভেঙে পড়লাম, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। বারবার জানতে চাইছিল, কী হয়েছে তোমার। আমি তো নিজেও বুঝতে পারছিলাম না কী হয়েছে আমার। বললাম, কিছুই হয়নি, তুমি শুধু নিয়ে যাও আমাকে এখান থেকে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না ওর।

৪৮ ঘন্টার ডিউটি শেষ হল, পরদিন সকালে ওয়ার্ডে রাউন্ড দিচ্ছি। একটা ফোন এল বিটিসিএল-এর একটা নাম্বার থেকে। কেমন যেন একটা অনুভূতি হল, বুকটা যেন একটু কেঁপে উঠল। ফোনটা ধরলাম, ফোনটা এসেছিল হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল থেকে, নার্স কথা বলছিলেন, আপনি কোথায় আছেন? তাড়াতাড়ি আসুন, আপনার আব্বার অবস্থা ভালো না। মেডিকেলের পেশায় এইরকম কথা বলার ধরণ আমার পরিচিত। আমি জানি কী হয়েছে আর নার্স আসলে কী বলতে চাইছে। আমার আর কিছু বলার শক্তি নেই, আমার পায়ের নীচেও যেন মাটি নেই। তখনই আম্মার গলার আওয়াজ পেলাম, তুই চলে আয়, তোর আব্বা আর নেই।

ঐ দেখাই তাহলে আব্বার সাথে আমার শেষ দেখা ছিল, ঐ আদরটুকুই আব্বার শেষ আদর ছিল। ঐটুকু আদর পাব বলেই আমার সেদিন রওনা দেয়া হয়নি, আর হঠাৎ করে ঐজন্যই হয়ত আব্বাকে দেখতে ইচ্ছা হচ্ছিল। জানি না, হয়ত আব্বাও আঁচ করতে পেরেছিলেন এটাই আমাদের শেষ দেখা হবে, তাই সেদিন এইভাবে আমাকে আদর করেছিলেন।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29516144 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29516144 2012-01-04 16:52:21
ইরানের দিনগুলো - ১১ (শেষ) ইরানের দিনগুলো - , , , , , , , , , ১০



লদানের কথা বলতে গেলে শেষ হবে না। কুটুর কুটুর করে অনেক গল্প করতাম আমরা। তবে মিস হত বাসে, লদান সব সময় খালাম্মার সাথে বসত, আর আমরা দুই পিচ্চি একসাথে। আমি শুনতাম লদান খালাম্মার সাথে পুরোটা রাস্তাই গল্প করত। একদিন আমরা জায়গা বদল করলাম। আমি বসলাম লদানের পাশে। সেদিন আমরা ইচ্ছামত গল্প করলাম।

লদানের দুইটা ছোট ভাই-বোন ছিল। আমার এতগুলো ভাইবোনের খবরও নিল সে। ওর বাবা ছিলেন রিটায়ার্ড, মা অসুস্থ। পুরো সংসার লদানই চালাত। পরে চিঠির মাধ্যমে জানতে পারি তার মায়ের ক্যান্সার হয়েছিল, কেমোথরাপি দিয়েও তাকে বাঁচানো যায়নি।

লদান আমার কাছে জানতে চাইত আমি বড় হয়ে কী হতে চাই। বলেছিলাম, ডাক্তার হতে চাই, কাটাকুটির ডাক্তার। পরে যখন চিঠিতে জানিয়েছিলাম আমার ডাক্তার হয়ে কাটাকুটি করার খবর, খুব খুশি হয়েছিল লদান।

একবার লদান আমাকে বলেছিল, আচ্ছা আমি যদি কখনও তোমাকে এমনি দাওয়াত করি আমাদের দেশে আসার জন্য, তুমি কি আসতে পারবে? বলেছিলাম, না রে ভাই, ঐ সামর্থ্য নেই আমার। বেচারী কষ্ট পেয়েছিল, এই প্রসঙ্গ ভুলেও আর কখনও তোলেনি।

যেদিন আমার ঠিকানা লিখে নিয়েছিল, ঠিকানার একটা অংশ বুঝতে পারছিল না। বলল, এটা কী? রাস্তার নাম? বললাম, না, এটা আমাদের বাড়ির নাম। খুব অবাক হয়েছিল, তোমাদের দেশে বাড়িরও নাম হয়?

প্রায়ই সে আমাদের দেশ সম্পর্কে জানতে চাইত। একবার জানতে চেয়েছিল আমাদের দেশের মেয়েরাও কি ওদের মত হিজাব পরে কি না। বলেছিলাম, কেউ কেউ পরে, সবাই না। আবার একবার কোথা থেকে শুনেছিল যে আমরা চুলে তেল দিই। জানতে চেয়েছিল কী তেল দিই। বললাম, নারকেল তেল। আরও কোন তেল দিই কি না সেটাও জানতে চেয়েছিল। কিন্তু ঐ মুহূর্তে মনে পড়ছিল না আর কোন নাম। মনে পড়লে কদুর তেলের কথা বলতে পারতাম।

রাস্তায় বের হলেই লদান পরিবেশ দূষণের কথা বলত। আমি বলতাম, আমাদের দেশের দূষণের তুলনায় এটা কিছুই না। যেদিন পাহাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম, পাহাড় থেকে তেহরান শহরটা দেখা যাচ্ছিল ধোঁয়ার সাগরে ডুবে থাকা একটা শহরের মত। ভাবছিলাম ঢাকা শহরকে এইভাবে দেখলে না জানি কেমন দেখা যাবে।

তেহরানের রাস্তাঘাট পরিষ্কার তো ছিলই, আরেকটা ব্যাপার খুব ভালো লেগেছিল। তেহরানের ফুলের দোকানগুলো খুবই সুন্দর আর অদ্ভূত। এগুলো সরকারীভাবে করা কি না জানি না। প্রতিটা দোকানই এক রকম, সবচেয়ে মজার হল এদের অবস্থান। বড় বড় রাস্তার পাশের দোকানগুলো এমনভাবে অবস্থিত যে দোকানের অর্ধেকটা বড় রাস্তায়, আর বাকী অর্ধেকটা থাকে ফুটপাথ জুড়ে। দোকানগুলোর আকার হল ষড়ভুজাকৃতির। আর পুরোটাই কাঁচের দেয়ালে মোড়া। তাই ভিতরের সব সুন্দর সুন্দর ফুল বাইরে থেকেই দেখা যেত।

আর সকালবেলা রাস্তায় বের হলেই একটা দৃশ্য রোজ দেখতাম। কোন বৃদ্ধলোক অথবা বৃদ্ধমহিলা কাঁধে করে এত্তগুলো নানরুটি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। জানি না এগুলো কোন বাড়ির জন্য না কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য, কিন্তু এই কাজে বৃদ্ধ কিংবা বৃদ্ধা ছাড়া অন্য কাউকে দেখিনি।

আমাদের যে বাসে নেয়া হত, সেটা বেশ বড় বাস ছিল। তবে তার চেয়েও বড় বড় বাস রাস্তায় দেখেছি। মজা লাগত দুইটা বাসের জোড়া লাগানো দেখে, মাঝখানটা দেখা যেত কেঁচোর মত। ওখানে মটর সাইকেলগুলোর সামনে বড় একটা প্লাস্টিকের ঢালের মত লাগানো থাকত। ঢালটা পুরোটা ঘষা কাঁচের মত, মাঝখানে দেখার জন্য একটু অংশ পরিষ্কার। আর মটর সাইকেলে পুরুষ বা মহিলা যে-ই বসুক, দুই পাশে পা দিয়ে বসত। এমন কি বড় বড় জোব্বা টাইপের বোরকা পরেও। আমাদের দেশের মেয়েদের মত একপাশে দুই পা ঝুলিয়ে কখনও কাউকে বসতে দেখিনি।

বড় বড় রাস্তাগুলোতে আমাদের প্রতিযোগিতার লোগোসহ ব্যানার আর ফেস্টুন ঝুলতে দেখেছি অনেক। বুঝতে পারছিলাম বেশ জোরে-সোরে প্রচার করেই প্রতিযোগিতাটা হচ্ছিল। তার প্রমাণও পেয়েছিলাম মাশহাদ যাওয়ার সময়। আমাদের সামনেই একটা পরিবার বসেছিল। একটা সুন্দর বাবু ছিল ওদের। বাবুর মা আমাদের দিকে তাকিয়েই খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে বাবুর বাবাকে কি যেন বলল। ভদ্রলোকও আমাদের দিকে তাকিয়ে একই অভিব্যক্তি দিলেন। তাদের কথা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তবে এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম যে তারা চিনতে পেরেছে যে আমরা প্রতিযোগী।

মাশহাদে যাওয়ার সময় আরেকটা মজা হয়েছিল। আমাদের দুই পিচ্চির পাশেই বসেছিল সুদানের পুরুষ সুপারভাইজার। তার সাথে কখনই কথা হয়নি। এখনও হচ্ছিল না। একবার দেখলাম উনি সামনের সিটের সাথে লাগানো টেবিলের মত অংশটুকু খোলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু আসল চাবিটা না ঘুরিয়ে একবার এই কোণা, আরেকবার ঐ কোণা ধরে টানাটানি করছেন। আমার মাথায় একটা দুষ্টুমি বুদ্ধি এল। আমার পাশে ছিল আমার রুমমেট, আর তার অন্যপাশে সেই সুদানী ভদ্রলোক। আমি রুমমেটকে বললাম, দেখ উনি তো বুঝতে পারছেন না টেবিলটা কিভাবে খুলবেন, আমরা তাকে একটু শিখিয়ে দিই, আমরা আমাদের টেবিলগুলো খুলে দেখাই। রুমমেটও রাজী হল। আমরা একসাথে আমাদের টেবিল দুটো খুলে টেবিলের উপর একটু তবলা বাজিয়ে আবার বন্ধ করে রাখলাম। ভদ্রলোক ঠিকই খেয়াল করলেন। আর মনে হয় একটু লজ্জাও পেলেন। যা হোক, যখন আমাদের খাবার এল, আমি আমার টেবিলটা আবার খুলে নিলাম। সুদানী ভদ্রলোক ঝটপট নিজের টেবিলটা ঠিকমত খুলে নিয়ে তাড়াতাড়ি করে আমার রুমমেটের টেবিলটাও খুলে দিলেন। আমরা ফিক ফিক করে হাসতে থাকলাম।

মাশহাদ থেকে ফিরে এসে লদানের সাথে আর দেখা হয়নি, তবে আমরা যাবার আগের দিন লদান ফোন করেছিল। অনেক কথা বলছিল সে, ভালো ভাবে যেন যাই বারবার এই দুআ করছিল। আমি জানতে চেয়েছিলাম কোথায় আছে এখন, কিছুতেই সেই উত্তর দিল না। আমাদের সাথে একটু দেখা করতে বলতাম, কিন্তু মনে হল সেটা সম্ভব হবে না তার জন্য, সেজন্যই এড়িয়ে যেতে চাইছিল।

যা হোক, আমাদের যাওয়ার দিন ঘনিয়ে এল। আমরা সবাই পোটলা-পুঁটলি বেঁধে রওনা দিলাম খুব ভোরে। এয়ারপোর্টে পৌঁছে পেলাম দুঃসংবাদটা। আমাদের ভিসার মেয়াদ নাকি চার ঘন্টা আগে শেষ হয়ে গিয়েছে। সবার মাথায় বাজ পড়ার মত অবস্থা। শাহরম এসেছিল আমাদের বিদায় জানাতে। সে বলল, আপনারা চিন্তা করবেন না, আমি এর ব্যবস্থা করছি। সে সবার পাসপোর্ট নিয়ে দৌড় দিল। একটা ঘন্টা সবাই বসে বসে দুআ পড়ছিল, সবাই ধরেই নিয়েছিল যে আমাদের আর দেশে যাওয়া হবে না আর আমাদেরকে ধরে জেলে ভরে দিবে। একমাত্র আমারই কোনরকম দুশ্চিন্তা হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল একটা না একটা ব্যবস্থা হবেই, বরং আমরা আর একদিন পরেই দেশের মাটিতে পা রাখব এই খুশিতেই আমি উৎফুল্ল ছিলাম। যা হোক, ঘন্টাখানেকের মধ্যেই শাহরম ফিরে এল, আমাদের ভিসার মেয়াদ সে বাড়িয়ে এনেছে।

বিদায় জানিয়ে আমরা রওনা দিলাম দেশের উদ্দেশ্যে। এইবার আমরা করাচী না হয়ে দুবাই হয়ে এলাম। আর এইবার এয়ারপোর্টে বসে বসে বোর হবার মত ইচ্ছা কারুর ছিল না। আমরা বের হয়ে গেলাম। পার্ক ভিউ হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে পাশের একটা ইন্ডিয়ান হোটেলে ভাত খেলাম। এরপর বের হলাম ঘুরতে। হাঁটতে হাঁটতেই দেখতে থাকলাম শহরটা। একটা ব্যাপার খুব অদ্ভূত লেগেছিল। দুবাইয়ের সবগুলো ব্যাংক বিশাল বিশাল, আর প্রতিটাই লাইটিং করে সাজানো, আমাদের দেশের বিয়েবাড়ির মত। একটা নদীর পাড়ে গেলাম হাঁটতে হাঁটতে। নদীর নাম জানি না। আমাদের সাথের এক প্রতিযোগী কী মনে করে নদীর পানি আঁজলা ভরে নিয়ে মুখে দিল। দিয়েই ইয়াক থুঃ। নোনা পানির নদী এটা। আবার আমাদের সবাইকেও সাধছিল টেস্ট করে দেখার জন্য। আমি বললাম, দরকার নাই।

এরপর গেলাম শপিং-এ। মার্কেট খুঁজতে কষ্ট হয়নি। দুবাইয়ের রাস্তাঘাটে সব ইন্ডিয়ান লোকজন। ওদেরকে জিজ্ঞেস করে করেই পৌঁছে গেলাম মার্কেটে। এখানেও সব দোকান চালাচ্ছে ইন্ডিয়ানরা। স্বর্ণের দোকান থেকে শুরু করে ঘড়ি, কসমেটিক্স, কাপড় সব দোকানই ইন্ডিয়ানদের। খালাম্মা স্বর্ণের একটা চেইন কিনলেন। ছেলে প্রতিযোগীরা কিনল ঘড়ি। আমরা দুই পিচ্চি এক সেট করে জামার কাপড় কিনলাম। আমিই কিনেছিলাম প্রথমে, আমার দেখাদেখি রুমমেটও ঐ একই জিনিস নিয়ে নিল, সে নিজে কোনটাই পছন্দ করতে পারছিল না।

হোটেলে ফিরে গোসল করে আবার রওনা দিলাম এয়ারপোর্টে। এমিরেটস এয়ারলাইনসে করে 'বেবি'স ডে আউট' দেখতে দেখতে চলে এলাম ঢাকায়। এয়ারপোর্ট থেকে নেমে কি যে একটা শান্তি লাগছিল সেটা নিজেও ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। নেমেই দেখি আমাদের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা ফুলের তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবাইকে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নিয়ে গেল ভিআইপি লাউঞ্জে। এতদিন শুধু টিভিতেই দেখতাম এখানে সব খেলোয়াড়দের বরণ করা হয়। এখন আমরাই এখানে বসে আছি। ফুলের শুভেচ্ছার আরও বাকী ছিল। আমার রুমমেটের ফুফু আমাদের জন্য ফুলের মালা নিয়ে এসেছিলেন, আর আমার বাসা থেকেও আব্বা-আম্মা আর ছোট ভাই-বোন এসেছে, তারাও ফুলের তোড়া নিয়ে এসেছে। আমি এক ঝলক আব্বা-আম্মার সাথে দেখা করেই আমার পোটলা-পুঁটলি আনতে চলে গেলাম। একটু টেনশনে ছিলাম কারণ শুরুতে বেল্টে পাচ্ছিলাম না আমার লাগেজ। পরে দেখলাম যে ভিআইপি-দের জন্য আলাদা বেল্ট। ওখানে গিয়েই পেয়ে গেলাম সব লাগেজ। এর মধ্যে ছোট বোন এসে শোনে যে আমি এসেই আবার ভিতরে চলে গিয়েছি। বেচারী দুঃখে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। যা হোক, পোটলা-পুঁটলি উদ্ধার করে এনে আবার দেখা হল সবার সাথে। সবাইকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অফিসে নিয়ে যাওয়া হল। আরেক দফা সংবর্ধনার পর আমরা যার যার বাসায় গেলাম। ছোট ভাইটা এতক্ষণ কোন কথা বলার সুযোগ পায়নি আমার সাথে। বাসায় রওনা দেয়ার সময় সুযোগ পেয়ে আমার কাছে এসে কানে কানে বলল, আচ্ছা, তোমাকে তো ইরান থেকে একটা বস্তা দিয়েছে, আর কী কী দিয়েছে? আমি আঁৎকে উঠলাম, বস্তা! কম্বলের প্যাকেটে মোড়া দামী ইরানী কার্পেটটাকে ও মনে করেছে বস্তা! পুরাই জাত মেরে দিল।



যাক, শেষ হল আমার ছোট্ট কিন্তু বিশাল ভ্রমণ।


সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29513420 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29513420 2011-12-31 15:36:02
ইরানের দিনগুলো - ১০
ইরানের দিনগুলো - , , , , , , , ,



প্রতিযোগিতা আর তার ফলাফল নিয়ে বলেছি, পুরস্কার নিয়েই কিছু বলা হয়নি। যারা প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় হয়েছিল প্রত্যেকের জন্য পুরস্কার হিসেবে ছিল বিখ্যাত ইরানী কার্পেট। বহন করার সুবিধার্থে কার্পেটগুলো ভাঁজ করে কম্বলের প্যাকেটে করে দিয়েছিল। আকারে ছোট হলেও এগুলো ছিল হাতে বানানো সবচেয়ে ভালো মানের কার্পেট। এটা নিশ্চিত হয়েছিলাম ইরানবাসী সেই বাঙালী মহিলার কাছ থেকে। উনি একদিন আমাদের রুমে এসে কার্পেটগুলো দেখে বলেছিলেন, এটাই সবচেয়ে ভালো মানের কার্পেট, হাতে বানানো, মেশিনে বানানোগুলোর মান ভালো হয় না, আর সেগুলো কমদামী।

আমাদের সার্টিফিকেটটাও ছিল বিশাল আর লেদার দিয়ে মোড়ানো।

পুরস্কার ছাড়াও সবাইকেই কিছু উপহার দেয়া হয়েছিল। তার মধ্যে ছিল একটা সবুজ ভেলভেটের বক্সের ভিতর একটা কুরআন শরীফ। এছাড়া ফুলের ছবিওয়ালা কয়েকটা গ্রিটিং কার্ড আর একটা ছোট্ট সুন্দর ডাইরীও দিয়েছিল। ঐ ডাইরীতে সবাই বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের নাম ঠিকানা লিখে নিচ্ছিল। আমার কাছ থেকেও অনেকে আমার নাম ঠিকানা লিখিয়ে নিল। যদিও এদের কেউই আমার সাথে আর যোগাযোগ করেনি। আমিও কয়েকজনের নাম ঠিকানা নিলাম। বিশেষ করে শ্রীলংকার মেয়েদের সবার ঠিকানা নিলাম। এদের সাথেই সবচেয়ে বেশি কথা হত। শ্রীলংকার সুপারভাইজার তার মেয়ের নাম ঠিকানাও দিয়ে দিলেন। বললেন, আমার মেয়ে তোমার বয়সীই, তুমি ওকে চিঠি লিখলে ও খুশী হবে। আফসুস, কেউ কথা রাখেনি। এই সুপারভাইজারের মেয়েকে আমি চিঠি দিয়েছিলাম, সে কোন উত্তর দেয়নি। শ্রীলংকার ক্বারীয়াকে নিয়ে তো আরেক কাহিনী হয়েছিল। তাকে চিঠি দেয়ার পর প্রথমে একটা বিশাল চিঠি নিয়ে উত্তর পেলাম তার কাজিনের কাছ থেকে। যাকে চিঠি দিয়েছি তার নামে নানান রকম তথ্য দিয়ে সে জানাল যে সে আর চিঠি লিখতে পারবে না, তাই এই কাজিন আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়। মেজাজটা এমন খারাপ হয়েছিল। আমি কোন উত্তর দিইনি। এরপর আরেক কাহিনী। ঐ মেয়েই আমাকে উত্তর দিল। সে আমার চিঠি পেয়ে খুব খুশী। এরপর নিজের সম্পর্কে যা যা তথ্য দিল তার কোনটাই ঐ কাজিনের কথার সাথে মিলে না। এইবার আমি উত্তর দিলাম, ঐ কাজিনের চিঠির কথা উল্লেখ করে। আর কোন উত্তর পাইনি। এই কাহিনী এখানেই শেষ।

যা বলছিলাম। লদানের কাছে একটা ছোট রাইটিং প্যাড থাকত সব সময়। সে ছিল ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক, একটা স্কুলের শিক্ষক আর পার্টটাইম দোভাষী। তো সেই রাইটিং প্যাডে সে আমাদের সবার নাম ঠিকানাই লিখে নিয়েছিল। আমিও তার নাম ঠিকানা আমার ডাইরীতে লিখে নিলাম। দেশে ফিরে একদিন পরেই তাকে চিঠি দিয়েছিলাম। কিন্তু কোন উত্তর পাইনি। মন খারাপই হয়েছিল, লদানের তো এমন করার কথা না। অবাক কান্ড হল, প্রায় দেড় বছর পর ঐ চিঠি আবার আমার কাছে ফেরৎ এল। তার মানে লদানের হাতে এই চিঠি পৌঁছায়ইনি।

এর ছয় বছর পর কী মনে করে যেন আবারও লদানের এই ঠিকানায় একটা চিঠি দিলাম। উত্তরের কোন আশাই করিনি। কিন্তু আবারও আমাকে অবাক করে দিয়ে এইবার লদানের উত্তর পেলাম। সেও আমার চিঠি পেয়ে বিশ্বাস করতে পারছিল না এতদিন পরেও আমি চিঠি দিতে পারি। যা হোক, কাহিনী হল লদানের পরিবার ঐ সময়ই বাসা বদল করেছিল, এইজন্য ঐ আগে চিঠি তার হাতে পৌঁছায়নি। এইবার চিঠিটা এমন এক পুরনো প্রতিবেশীর হাতে পড়েছিল যে ইংরেজী বোঝে। তাই সে চিঠিটা রেখে দিয়েছিল, পরে লদানের সাথে দেখা হওয়াতে হস্তান্তর করেছিল। যা হোক, এই চিঠিতে লদান তার ই-মেইল অ্যাড্রেসসহ ফেসবুক আইডিও দিয়ে দিয়েছিল। আর আমাদের পায় কে? এখনও তার সাথে যোগাযোগ হচ্ছে ফেসবুকের কল্যাণে।

দেশ থেকে রওনা দেয়ার সময় মেজপা আমাকে দুই জোড়া কানের দুল দিয়ে বলেছিল যেন কাউকে উপহার দিই। লদানকে দিয়েছিলাম এক জোড়া। যেদিন ওর হাতে দিয়েছিলাম সেদিনই সকালে আমরা শপিং-এ গিয়েছিলাম। লদান ভেবেছিল ওখান থেকেই কিনেছি, প্রথমে তাই নিতেই চাচ্ছিল না। পরে বললাম, এটা বাংলাদেশ থেকে আনা। তখন সাথে সাথে খুব খুশি হয়ে নিয়ে নিল। এর পরের দিন দেখি সে একটা প্যাকেট নিয়ে আমাদের রুমে হাজির। প্যাকেট খুলে বের হল একটা মাটির দেয়াল ফুলদানী। ডিজাইনটা খুবই অদ্ভূত। একটা জুতা পরা পা, জুতার সামনের অংশ ছেঁড়া, ছেঁড়া অংশ দিয়ে পায়ের আঙ্গুলগুলো বের হয়ে আছে। লদান বলল, এটা আমার পক্ষ থেকে তোমাদের তিনজনের জন্য। তিনজন তো আর একটা ফুলদানী ভাগাভাগি করে নিতে পারি না, অন্য দুজনের কেউই এটা রাখতে চাইল না, তাই আমার কাছেই থাকল। অনেক দিন আম্মার ড্রইংরুমের দেয়ালে এটা টাঙানো ছিল। একদিন হঠাৎ পড়ে ভেঙে গিয়েছে।

একদিন সকালের নাস্তার সময় ইরানের এক প্রতিযোগী এসে খালাম্মাকে একটা রঙীন ফিতা কেটে বানানো প্রজাপতি দিয়ে বলল, এটা আমি আপনার জন্য কাল রাতে বানিয়েছি। খালাম্মা খুব খুশি হয়ে নিলেন, কিন্তু পরে রুমে এসে বললেন, এটা বাচ্চাদের জিনিস আমি নিয়ে কী করব, তুমিই নিয়ে যাও। অতএব এটাও আমার স্যুটকেসেই ঢুকল। এটা মনে হয় এখনও আমার পুরনো আলমারীতে আছে। অবশ্য আঠা শুকিয়ে ফিতাগুলো আলগা হয়ে গিয়েছে।

আমাদের একটা করে সাইড ব্যাগও দেয়া হয়েছিল। দেশে ফেরার সময় সবার কার্পেট আর সাইডব্যাগগুলো একসাথে বেঁধে একটা পোটলা করে আনা হয়েছিল। এছাড়া প্রতিযোগীদের সবাইকে একটা করে ভিডিও ক্যাসেট দেয়া হয়েছিল যেখানে উদ্বোধনী আর সমাপনী অনুষ্ঠানসহ যার যার পারফর্মেন্সের ভিডিও ছিল।

আমাদের আরেকটা খুব সুন্দর উপহার দেয়া হয়েছিল। সেটা হল একটা অ্যালবাম, যেখানে ওদের অফিসিয়াল ফটোগ্রাফারের তোলা গ্রুপ ফটোগুলোসহ প্রত্যেক প্রতিযোগীর ছবি দেয়া হয়েছিল। একদিন দুপুরের খাওয়ার পর ফটোগ্রাফার সবাইকে নিয়ে বাগানে গেল। সেখানে একজন একজন করে প্রত্যেক প্রতিযোগীর ছবি তোলা হচ্ছিল। শুরুতে শুরুতে সব ঠিকঠাকমতই হচ্ছিল। হঠাৎ একজন প্রতিযোগী ছবি তুলতে গিয়ে হাসতে হাসতে হেঁচকি তুলে ফেলল। কাহিনী কী বোঝা গেল না। কিন্তু দেখা গেল যতবারই সে স্থির হয়ে দাঁড়ায়, যখনই ছবি তুলতে যাবে তখনই সে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। বহু কষ্টে অবশেষে তার ছবিটা তোলা গেল।

কিন্তু দেখা গেল ততক্ষণে ব্যাপারটা সংক্রামক ব্যাধির মত ছড়িয়ে পড়েছে। এরপর যে-ই ছবি তোলার জন্য দাঁড়ায় হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। কাহিনী কী বুঝলাম না। আমার রুমমেটও একই কাহিনী করল। শেষে যখন আমি গিয়ে দাঁড়ালাম, তখন বুঝলাম কাহিনীটা কী। গিয়ে দাঁড়াতেই দেখি লদান সবার পিছনে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ পাকাচ্ছে। ওই কার্টুনমার্কা ভঙ্গী দেখে হাসি চাপা মুশকিল। সে কিন্তু সাথে সাথে লুকিয়ে পড়েছে, কেউ আর জানছে না যে সেই আসল দুষ্টুমিটা করছে। এর মধ্যে শ্রীলংকার সুপারভাইজারের সাথে আমার চোখাচোখি হওয়ায় উনি মনে করলেন যে তাকে দেখে হাসছি। বললেন, আমি বরং লুকিয়ে যাই। উনি লুকালে আর কী হবে, আসল দুষ্টুটা তো একটু পর পর চোখ পাকিয়েই যাচ্ছে। ফটোগ্রাফারের তখন ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি অবস্থা। যা হোক, লদানের কাছ থেকে চোখ সরিয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করে ছবি তুললাম। যদিও মিটিমিটি হাসি দিয়েই যাচ্ছিলাম, ঐটা আর বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

লদানের সাথে আমাদের সম্পর্কটা খুব সুন্দর ছিল। সে আমাদের খুব যত্ন নিত। একবার মিউজিয়ামে বেড়াতে যাওয়ার সময় খালাম্মা বললেন, তোমরা দুজন ঘুরে আসো, আমি আজকে বিশ্রাম নিই। পরে লদান শুধু আমাদের দুজনকে দেখে জানতে চাইল খালাম্মা আসবেন না কেন? বললাম, খালাম্মা আজকে বিশ্রাম নিবেন। লদান খুবই টেনশনে পড়ে গেল কী হয়েছে। পরে তাকে শান্ত করতেই বললাম, খালাম্মার মাথাব্যথা করছে। লদান সাথে সাথে কোত্থেকে দুইটা প্যারাসিটামল ট্যাবলেট নিয়ে এল খালাম্মার জন্য।

একবার আমার কাছ থেকে কয়েকটা বাংলা কথা শিখে নিল লদান। যেগুলো প্রতিদিন বলা হয় আমাদের সাথে। যেমন, চলুন বাসে উঠি, আসুন বাস থেকে নামি, ধন্যবাদ, সুপ্রভাত, কেমন আছেন? - এইসব কথা। শিখিয়ে দেয়ার পর সেগুলো ব্যবহারও করতে থাকল। তবে মাঝে মাঝে একটু গুলিয়ে ফেলত। একবার বাস থেকে নামার সময় সে বলল, চলুন বাসে উঠি। খালাম্মা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তে পড়তে কোনমতে সামলালেন। লদান খুব অবাক হয়ে বললে, কী হয়েছে? পরে আমি ওকে বললাম যে ও উল্টা কথা বলছে। বেচারী খুব লজ্জা পেয়ে গিয়েছিল।

আরেক গাইড মারজানও আমার কাছ থেকে কিছু বাংলা শিখে নিয়েছিল, সেটা আমার রুমমেটের প্রতিযোগিতার জন্য। হিফজ প্রতিযোগিতার সময় ভুল করলে তাকে থামিয়ে আবার শুরু করতে বলা হয়, এই কথাগুলো ফারসি, আরবি বা ইংরেজীতে বললে রুমমেট বুঝবে না, এইজন্য এইটুকু বাংলা শিখিয়ে দিতে হয়েছিল মারজানকে।

আমরা যেদিন বাংলাদেশী হাইকমিশনারের বাড়িতে দাওয়াত খেলাম, সেদিন আমাদের ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। পরের দিন সকালে নাস্তার সময় খালাম্মা বললেন, কালকে তোমার বাসায় সবাই খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল, তাই না? লদান খুব মন খারাপ করে বলল, হ্যাঁ সবাই টেনশন করছিল, এত দেরী তো কখনও হয় না। খালাম্মা বললেন, তুমি বাসার সবাইকে খুব মিস কর সারাদিন, তাই না? লদান আরও মন খারাপ করে বলল, হ্যাঁ, তা তো করিই। খালাম্মা তখন বললেন, শোন, মনে কর আমি তোমার আরেক মা, আর এরা দুইজন তোমার দুই ছোট বোন, যতক্ষণ আমাদের সাথে থাকবে মনে করে নিবে যে তোমার আরেক পরিবারের সাথেই আছ তুমি। এইবার লদানের মুখে হাসি ফুটল। আমাদেরকে জড়িয়ে ধরল। আর অন্য সব গাইডদের ডেকে ডেকে বলতে থাকল, এই দেখ আমার নতুন পরিবার।

মাশহাদে লদানের যাওয়ার কথা থাকলেও একটা সমস্যার কারণে যেতে পারেনি আমাদের সাথে। ওখানে গিয়ে আরেক গাইড মারজান আমাকে এক সময় বলছিল, আমি বুঝতে পারছি তোমরা লদানকে মিস করছ, লদানও তোমাদের মিস করছে, ও তোমাদের অনেক বেশি ভালোবাসে, যখনই আমরা একসাথে বসে গল্প করি ও সারাক্ষণ তোমাদের কথা বলতে থাকে।

মাশহাদে রওনা দেয়ার সময় লদানের মত অন্য যেসব গাইড যায়নি, সবাই বিদায় নিয়ে নিচ্ছিল, কারণ আর দেখা হবে না ওদের সাথে। সবাইকেই দেখলাম খুব কান্নাকাটি করতে। লদান তো ভয়েই সেদিন দূরে দূরে রইল। ওর সাথে ভালো করে বিদায়টুকুও নিতে পারলাম না। বাসে উঠে বারবার ওর দিকে তাকাচ্ছি, সে কিছুতেই তাকায় না, ইচ্ছা করে মুখ ঘুরিয়ে রাখে। একবার চোখাচোখি হওয়াতে দেখলাম জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করল। কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করছিল সে। যখন বাস ছেড়ে দিল, তখন সে তাকিয়ে হাত নাড়ল শুধু, আমি জানি চোখের পানি সে আর আটকাতে পারেনি।



আরও কত কথাই না মনে পড়ে। আরেক পর্বে বলি।

চলবে.............


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29511682 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29511682 2011-12-28 19:23:52
ট্রিপল সেঞ্চুরীর খানাপিনা (দুঃসাহসটা করেই ফেললাম)


ট্রিপল সেঞ্চুরী হয়েছে আগের পোস্টে। পুলাপাইনের দাবীতে ইরান সিরিজ আপাতত মুলতুবী রেখে খানাপিনা পোস্ট নিয়ে চলে এলাম। তাও আবার গুগল মামুর কাছ থেকে ধার করা খাবার নিয়ে না, নিজের রান্না নিয়ে। (যেন কত বড় রাঁধুনি!) শুধু কয়েকটা খাবারের ছবিই দিতে পারতাম। কিন্তু ব্লগে এতদিন হয়ে গেল, ৩০০ পোস্ট দিয়ে ফেললাম, অথচ এখন পর্যন্ত কোন রেসিপি পোস্ট দেয়া হয়নি। তাই এই পোস্টে একটা রেসিপি দেয়ার দুঃসাহসই করে ফেলি, তাও আবার সচিত্র।

খাবারের নাম "এগ রোল"। রোল বলতে যেরকম হয়, ভেজিটেবল রোল কিংবা বিফ রোল, ওগুলোর সাথে পার্থক্য হল ঐ রোলে ভেজিটেবল বা বিফ থাকে রোলের ভিতরে, এখানে ডিম থাকবে রোলের বাইরে।

প্রথমে উপকরণ: ছয়টা এগ রোলের পরিমাণ দিলাম। (এইটা যে এত কঠিন কাজ কে জানত। উপকরণের পরিমাণ লিখতে গিয়ে ইচ্ছা করছিল প্রতিটার পাশে লিখে রাখি 'আন্দাজমত' <img src=" style="border:0;" />)

আটা বা ময়দা: ৩/৪ কাপ। (মানে এক কাপের চার ভাগের তিন অংশ, আবার তিন-চার কাপ মনে করবেন না।)
পানি: ৩/৪ কাপ।
লবণ: আন্দাজমত। (এইটার পরিমাণ বলাটা একটু ঝুঁকিপূর্ণ।)
শুকনা মরিচ গুঁড়া: দুই চিমটি।
ডিম: ২ টা।
টমেটো: ২ টা।
গাজর: ছোট হলে ৪-৫ টা। মাঝারী হলে ২ টাই যথেষ্ট।
কাঁচামরিচ: ২ টা।
সরিষার তেল: এক চামচ।
সয়াবিন তেল: পরিমাণমত।

এইবার পদ্ধতিতে আসি। প্রথমে গাজরের খোসা ছাড়িয়ে গাজর, টমেটো আর কাঁচা মরিচ ধুয়ে নিলাম।



গাজর আর কাঁচামরিচ কুচি কুচি করে কেটে নিলাম। কেউ চাইলে গাজর ঝুরি করে নিতেও পারেন।



টমেটোও কুচি করে নিতে হবে। যত ছোট করা যায় তত ভালো।



কুচিগুলো একসাথে রেখে দিলাম, এক্ষুণি লবণ দিলাম না, নইলে পানি উঠে যাবে।

এবার একটা পাতিলে (অথবা যে যেভাবে আটা বা ময়দা সিদ্ধ করেন) পানি নিয়ে চুলায় বসিয়ে দিলাম, যতক্ষণ না এইভাবে পানি ফুটতে শুরু করে।



পানি ফুটে উঠলেই তাতে আধা চামচ লবণ গুলে আটা বা ময়দা দিয়ে তাড়াতাড়ি কাঠের খুন্তি দিয়ে নেড়ে আটা বা ময়দা সিদ্ধ করে নিতে হবে। এরপর পিড়ি বেলন বের করলাম।



সুন্দর করে আটা বা ময়দার কাই তৈরী করলাম, এইভাবে কোলবালিশের মত করে। পানির পরিমাণ একটু বেশি ইচ্ছা করে নিয়েছি যাতে কাইটা নরম হয়। শক্ত হলে রুটি পাতলা হবে না।



এইবার কোলবালিশ ভেঙে ছোট ছোট ছয়টা বল করে ফেললাম।



বলগুলো একটা একটা করে বেলে ছয়টা পাতলা নরম গোল গোল রুটি বানিয়ে ফেলুন। পাতলা হওয়া দরকার এইজন্য যে এগুলো চুলায় খুব অল্প সময় থাকবে, পাতলা না হলে ভিতরে কাঁচা থেকে যেতে পারে।



রুটি বানানো হলে আসল উপকরণে আসা যাক। দুইটা মাঝারি সাইজের ডিম। মুরগী বা হাঁস যার যেমন পছন্দ। আমি নিয়েছি ফার্মের মুরগীর ডিম।



একটা বাটিতে ডিম ভেঙে নিয়ে তাতে এক চিমটি লবণ আর দুই চিমটি শুকনা মরিচ গুঁড়া নিলাম।



এবার ডিমটুকু ফেটে নিলাম। চামচ দিয়ে যেটুকু ফেটানো যায় ওটুকুই যথেষ্ট।



এবার কড়াই বা ফ্রাইপ্যানে মৃদু আঁচে অল্প করে তেল গরম করে ফেটানো ডিমের মধ্যে রুটি একটা একটা করে ডুবিয়ে নিয়ে গরম তেলে ছেড়ে দিলাম, একটু পর উল্টে দিলাম। ঠিক যেভাবে বোম্বাই টোস্ট বানায় পাউরুটি দিয়ে। তেল একবারেই বেশি না দিয়ে প্রতিবার একটু একটু করে দেয়া ভালো।



এবার আমাদের টমেটো-গাজর কুচিতে আন্দাজমত লবণ আর এক চামচ সরিষার তেল দিয়ে মাখিয়ে নিলাম।



এই মিশ্রণটুকু একটু করে ডিমে ভাজা রুটির মধ্যে নিয়ে নিলাম।



এইবার রোল করে দিলেই তৈরী হয়ে গেল মজাদার এগ রোল।



ছয়টা রোল কয়জন খাবেন সেটা আপনাদের ব্যাপার। আমি তো একাই সব সাবাড় করি।<img src=" style="border:0;" /> অবশ্য দুই বেলায়।



কেউ চাইলে ভিতরের সালাদটা ইচ্ছামত করতে পারেন, শসাকুচি, পেয়াঁজকুচিও দেয়া যায়। আবার ডিমের মধ্যেও পেঁয়াজকুচি দেয়া যায়। আমার কাছে অবশ্য এই খাবারে পেঁয়াজটা কেন যেন ভালো লাগে না।

এই রান্নার পিছনের ইতিহাসও বলি একটু। কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পিছনের গেটের বাইরে রাস্তায় খাবারের ঠেলা নিয়ে দুইজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জানতে চাইলাম তারা কী বিক্রী করে। খুব আগ্রহ নিয়ে তারা বলল, দিদি, এর নাম এগ রোল, খাবেন? ওদের রুটি বানানোই ছিল। গরম তাওয়ায় তেল দিয়ে ডিমের মধ্যে রুটিটা সেঁকে দিয়ে সালাদ দিয়ে মুড়ে দিল। গরম গরম ঐ এগ রোলের স্বাদ যেন এখনও পাই।

এবার একটা ছোটখাট দুঃসংবাদ। আমার ইরানের দিনগুলো সিরিজটা আবার ফিরে আসবে পূর্ণোদ্যমে। যদিও মূলকথাগুলো বলা শেষ, কিন্তু এখনও আরও অনেক বাড়তি কথা বলার আছে। সেগুলো এক পর্বে শেষ করে দিব বলে লিখেও ফেলেছিলাম, আমার ব্লগ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পোস্ট হয়েছিল সেটা। কিন্তু সামুর বাঘের কাছে আমার হার স্বীকার করতেই হল। পুরো লেখাটা গায়েব হয়ে গিয়েছে। আবার ধৈর্য্য ধরে লিখতে বসব, তবে অত বড় করে আর লেখা সম্ভব হবে না। আরও তিন-চার পর্ব নিয়ে লিখতে হবে।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29510657 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29510657 2011-12-26 23:54:50
ইরানের দিনগুলো - ৯
ইরানের দিনগুলো - , , , , , , ,


রোজই লটারী করে ঠিক করা হত পরের দিন কোন কোন দেশের প্রতিযোগিতা হবে। আমার নাম একবারও উঠল না লটারীতে। তাই প্রতিযোগিতার একেবারে শেষ দিনেই আমার পারফর্মেন্স নির্ধারিত হল। এর আগের দিনই আমার রুমমেটের হিফজ প্রতিযোগিতা হয়ে গিয়েছিল। খুব ভালো পারফর্মেন্স দিয়েছে সে। ওকে নিয়ে আশা করা যায়। রাতের বেলা খাবার সময় একজন ভদ্রলোক এলেন আমার কাছে কয়েকটা চিরকুট নিয়ে। একটা তুললাম। একটা আয়াত লেখা আছে। পরদিন সকালে এই আয়াত থেকে তিলাওয়াত শুরু করতে হবে। ১৫ মিনিট ধরে যতটুকু তিলাওয়াত করা যায় করতে হবে।

টেনশনে আমার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। গলা দিয়ে আর খাবার নামে না। চামচ-কাঁটা রেখে দিয়ে বসে রইলাম। লদান বলল, তুমি খাচ্ছ না কেন? ভয় পাচ্ছ? মাথা নেড়ে বললাম, হুঁ, অনেক কঠিন আয়াত। লদান বলল, কিন্তু ঐ ভদ্রলোক তো বলছিলেন যে সহজ একটা বাছাই করেছ। আমার কাছে এখন সবই কঠিন। পরে লদান আর খালাম্মা দুজনেই আমাকে সাহস দিতে থাকলেন। আমি আর কিছুই খেতে পারলাম না ঐ রাতে। খাওয়ার পর রুমে এসে কুরআন শরীফ নিয়ে আয়াতটা বের করলাম। আসলে মনে হয় সহজই, কারণ আয়াতগুলো মোটামুটি ছোট ছোট আর সবগুলো আয়াত এক ধরণের। এরকম হলে তিলাওয়াতের জন্য সুবিধা। কিন্তু তবু টেনশন হচ্ছিল।

আমাকে সাহায্য করতে আমাদের সাথে আসা বাংলাদেশী ক্বারী এলেন। আমাকে ভালো করে কয়েকবার প্র্যাকটিস করিয়ে দিলেন। আর বললেন, যেন সকালে আরও দুই-তিনবার প্র্যাকটিস করি আর এমনিতে মনে মনে সারাক্ষণ প্র্যাকটিস করতে থাকি। একটু সাহস পেলাম। ঐ রাতে অবশ্য ঘুম ভালো হয়নি।

পরদিন সকালে আমি আমার কুরআন শরীফ ব্যাগে করে নিয়ে গেলাম। ওখানে যদিও কুরআন শরীফ থাকবে, কিন্তু ওদের ছাপার স্টাইলের সাথে আমি অভ্যস্ত না, তিলাওয়াত করতে গিয়ে ভুল করে ফেলতে পারি। এখন কোনরকম ঝুঁকি নেয়া যাবে না। বাসে বসে সারাক্ষণই মনে মনে প্র্যাকটিস করছিলাম। অডিটোরিয়ামে গিয়ে শুনলাম একজনের হিফজ পারফর্মেন্সের পরেই আমার ক্বিরাত হবে। কোনদিকে মনোযোগ না দিয়ে কুরআন শরীফ খুলে এক মনে প্র্যাকটিস করে গেলাম। হঠাৎ মনে হল কেউ ছবি তুলল। তুলুক, আমার তাকানোর সময় নাই।

একটু পর আমার নাম ঘোষণা করা হল। আমি স্টেজে গিয়ে বসলাম। রেহেলে রাখা কুরআন শরীফটা পাশে রেখে আমারটা রাখলাম। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তিলাওয়াত শুরু করলাম। পাশেই একটা বোর্ডে ট্রাফিকের মত তিনটা লাইট - সবুজ, হলুদ আর লাল। শুরুতে সবুজটা জ্বলে ছিল। ১২ মিনিট তিলাওয়াত শেষে হলুদ লাইট জ্বলল। বুঝলাম এখন আমার তিলাওয়াত শেষ করার প্রস্তুতি নিতে হবে। ঠিক যে আয়াতে শেষ করব বলে ঠিক করেছিলাম, সেটা তিলাওয়াত করার পরেই লাল বাতি জ্বলে উঠল। আমার সময়ের হিসাব ঠিকই ছিল। বাংলাদেশী ক্বারীর কাছ থেকে একদিনের জন্য ধার করা ক্যামেরাটা লদানের হাতে দিয়ে রেখেছিলাম। স্টেজ থেকে নেমে আসার পর লদান বলল, তিনটা ছবি তুলেছি, একটা সামনে থেকে আর দুইটা দুই পাশ থেকে।

সবাই বলল মোটামুটি ভালোই হয়েছে আমার তিলাওয়াত। যেমনই হোক, শেষ হয়েছে এটাই আমার শান্তি। মনে হচ্ছিল মাথার উপর থেকে একটা বিশাল বোঝা ফেলে এসেছি। পরে ডিজি স্যার লদানের কাছে জানতে চেয়েছিলেন আমি কেমন পারফর্ম করেছি। লদান তো অতি উচ্ছাসের সাথে বলে দিল, অনেক সুন্দর হয়েছে। ডিজি স্যার বললেন, তাহলে কি ফার্স্ট হবে? আমি বললাম, আরে না না স্যার, ওর কথায় কান দিবেন না, বাড়িয়ে বলছে।

সেদিন আমার পারফর্মেন্সের পর চা-বিরতির সময় আমাদের সবাইকে নিয়ে গেল বিচারকদের রুমে। এখানকার বিচারের নিয়মটা একেবারেই অন্যরকম। বিচারকরা সম্পূর্ণ আলাদা একটা রুমে বসেন, তারা প্রতিযোগীদের চেহারাও দেখেন না, নাম, দেশ কিছুই শোনেন না। শুধু একটা সিরিয়াল নাম্বার দেয়া থাকে। নাম ঘোষণার পর তাদের হেডফোন চালু করা হয়। তারা শুধুমাত্র তিলাওয়াত শুনে মার্কস দেন। তাই পক্ষপাতিত্বের কোন সুযোগ নেই। ওদের সেই রুমে গিয়ে আমরা তাদের বসার জায়গা, হেডফোন সবকিছু দেখলাম। সাত-আটজন বিচারক ছিলেন। সবাই মহিলা। আর ছেলেদের জন্য সব পুরুষ বিচারক। সবার মার্কস যোগ করে গড় করে চুড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে।

দিনের প্রতিযোগিতা শেষে বের হয়ে বাসে ওঠার সময় একটা আকাম ঘটিয়ে ফেললাম। সব টেনশন দূর হয়ে এত বেশি রিল্যাক্স হয়ে গিয়েছিলাম যে নাচতে নাচতে বাসের দিকে রওনা দিচ্ছিলাম। ফুটপাথ থেকে একটু ঢালু হয়ে রাস্তায় মিশেছে, এমন জায়গায় এসে পা পিছলে ধড়াম! আসলে পুরোপুরি ধড়াম হইনি, পিছনেই লদান ছিল। মাটির সাথে আমার সংযোগ ঘটার আগেই সে আমাকে দুই হাত দিয়ে ধরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এই দৃশ্য ততক্ষণে সবাই দেখে ফেলেছে। সবাই হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরিয়ে ফেলল। আমিও সেই হাসিতে যোগ দিয়েছিলাম, শুধু আমার মুখটা :`> হয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ইরানী গাইড মারজান দুষ্টুমি করে বলেই ফেলল, ও লদান, তুমি কি ওকে ধাক্কা দিয়েছিলে না কি? লদানও হাসতে হাসতে বলল, আরে না, আমার তো কিছুই করা লাগে নাই।

তো সেইদিনই প্রতিযোগিতা শেষ হবার কথা। পরের দিন ফলাফল ঘোষণার সাথে সাথে পুরস্কার বিতরণ আর সমাপনী অনুষ্ঠান হবে। কিন্তু সেদিন রাতেই দেখা গেল মিশরের প্রতিযোগীরা এসে পৌঁছেছে। যেহেতু ফলাফলের আগেই এসে পৌঁছাতে পেরেছে, তাই পরদিন সকালে ওদের প্রতিযোগিতা নেয়া হল। ফলাফল ঘোষণা হবে বিকালে।

বিকালে সবাই দুরু দুরু মন নিয়ে গেল অনুষ্ঠানে। আমার কোন টেনশন নাই। আমি নিশ্চিত যে আমার বিষয়ে প্রথম হবে মালয়েশিয়া, দ্বিতীয় ইরান আর তৃতীয় পাকিস্তান। বাকীদেরটা বলতে পারি না। শুরুতে সেই বক্তৃতা শুরু হল, যার কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, বোঝার চেষ্টাও করছিলাম না। খালাম্মা একটা বক্তব্য দিলেন, লদান সেটা ফারসিতে অনুবাদ করে শোনাল। ডিজি স্যার একটা টাশকি খেলেন, উনি জানতেনই না যে খালাম্মা বক্তব্য তৈরী করে রেখেছিলেন। পরে অবশ্য অন্য দেশের সুপারভাইজাররা একটু মন খারাপ করে খালাম্মাকে বলেছিলেন যে এই বক্তব্যে শুধু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে না বলে অন্য সব দেশের পক্ষ থেকেই বলা উচিৎ ছিল। খালাম্মা আমাকে পরে বললেন, আমি কি জানি নাকি অন্যরা কী বলতে চায় না চায়, আমি তো আমার দেশের কথাই বলব। তবে খালাম্মার বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে একজন ইরানী সুপারভাইজার খালাম্মাকে ফারসি কবিতার একটা বই উপহার দিয়েছিলেন।

অনুষ্ঠানের মধ্যেই রেডিও-র সেই বাঙালী সাংবাদিক আমাকে ডাক দিলেন। আমি উঠে গিয়ে লবিতে দেখা করলাম। দেখি ওখানে লদানও আছে, তার হাতে একটা নীল কাগজে ফারসি ভাষায় ছাপা কিছু লেখা। লদান বলল, এটা কী জানো? তোমাদের ফলাফল। আমি জানতে চাইলাম ফলাফল। লদান বলল, ছেলেদের ক্বেরাতে বাংলাদেশ দ্বিতীয়, হিফজেও বাংলাদেশ দ্বিতীয়, মেয়েদের হিফজেও বাংলাদেশ দ্বিতীয়, আর ক্বেরাতে তুমি তৃতীয় হয়েছ। আমি খুশিতে নাচতে থাকলাম। সত্যি সত্যিই লাফাচ্ছিলাম প্রায়। এত্ত খুশি জীবনে কখনও হয়েছি বলে মনে পড়ে না।

সেই সাংবাদিকও খুব খুশী। বাংলাদেশের এমন সাফল্য যে প্রতিটি প্রতিযোগীই পুরস্কার পেয়েছে। সে পুরো ফলাফলটা বাংলায় লিখে নিল। আমিও অন্যদের ফলাফল শুনে নিলাম। ছেলেদের ক্বেরাতে ইরান প্রথম আর পাকিস্তান তৃতীয়; ছেলেদের হিফজে মরক্কো প্রথম, ইরান তৃতীয়; মেয়েদের হিফজে পাকিস্তানের পিচ্চি মেয়েটা প্রথম, তুরস্ক তৃতীয়; আর মেয়েদের ক্বিরাতে ইরান প্রথম, মালয়েশিয়া দ্বিতীয় হয়েছে। আমার মুখে হাসি যেন আর ধরেই না। প্রায় নাচতে নাচতেই অডিটোরিয়ামে ফিরে এলাম আর সবাইকে ফলাফল বলে দিলাম। মালয়েশিয়ার ক্বারীয়া একটু মন খারাপ করল, সে প্রথম হবার আশা করেছিল। পাকিস্তানের ক্বারীয়ারও মন খারাপ।

যা হোক একটু পর অফিসিয়ালি ফলাফল ঘোষণা করা হল। এরপর সম্মিলিত পারফর্মেন্সের হিসাবে দেশেরও একটা ফলাফল ঘোষণা করা হল যেখানে ইরান প্রথম, পাকিস্তান দ্বিতীয় আর বাংলাদেশ তৃতীয় হল। যদিও একমাত্র বাংলাদেশেরই সব প্রতিযোগী পুরস্কার পেয়েছে, কিন্তু প্রথম পুরস্কার একটাও ছিল না বলে এই দৌড়ে একটু পিছিয়ে গেলাম আমরা। যা হোক, আমরা সবাই খুশি ছিলাম আমাদের ফলাফলে।

একটা ব্যাপারে অবশ্য একটু খটকা লাগল। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শুধু প্রথম পুরস্কার প্রাপ্তদেরই পুরস্কার প্রদান করা হল। আর বাকীদের ঐদিন রাতের খাবারের পর আলাদা করে ক্লাবেরই ছোট একটা হলে নিয়ে পুরস্কার দেয়া হল। এটা নিয়ে পরে ডিজি স্যার ওদেরকে বেশ ভালোমতই কথা শুনিয়ে দিলেন।

পরদিন লদান আমাদের রুমে এসে দেশে ফোন করার ব্যবস্থা করে দিল। প্রথমে খালাম্মা তার মেয়েদের সাথে কথা বললেন। এরপর আমি ফোন করলাম বাসায়। আম্মার সাথে কথা হল, মেজপার সাথেও কথা বললাম। আমাদের ফলাফল জানিয়ে দিলাম। আমার আরেক রুমমেটের বাসায় ফোন করার চেষ্টা করা হল, লাইন পাওয়া গেল না। তবে আম্মা ওর ফুফুকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিলেন খবরটা।

এতদিন পর এইসব কথা লিখতে গিয়েও ভালো লাগছে। খুব সুখের ছিল ঐ অনুভূতিগুলো। এখনও কেউ যদি জানতে চায় জীবনের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি কী? সবার আগে এই মুহূর্তগুলোর কথাই মনে পড়ে।

ইরানের কথা বলার আছে আরও অনেক কিছু। আগামী পর্বে বাকীটুকু বলে শেষ করার চেষ্টা করব।


চলবে..............


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29504611 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29504611 2011-12-17 14:47:51
ইরানের দিনগুলো - ৮


ইরানের দিনগুলো - ১
ইরানের দিনগুলো - ২
ইরানের দিনগুলো - ৩
ইরানের দিনগুলো - ৪
ইরানের দিনগুলো - ৫
ইরানের দিনগুলো - ৬
ইরানের দিনগুলো - ৭


আজকে একটু মূল আলোচনায় আসি। মানে যে উদ্দেশ্য ইরানে যাত্রা করেছিলাম, সেই প্রতিযোগিতার কথায়। প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, লটারী এগুলো নিয়ে আগে বলেছি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরদিন সকালে শুধু মেয়েদের নিয়ে গেল অডিটোরিয়ামে। আজ এখানে গিয়ে একটা ধাক্কা খেলাম। সবাই মেয়ে, প্রতিযোগী তো বটেই, গাইড, অনুষ্ঠান সঞ্চালক, দর্শকের সারিতে বেশ কয়েকটা মাদ্রাসা থেকে দলে দলে আসা মেয়েরা, এমন কি অনুষ্ঠানের ভিডিও ক্যামেরাম্যানও মেয়ে। মনটাই ভরে গেল। প্রতিযোগিতা শুরু হল। চারজন ক্বারীয়া ও চারজন হাফিজার প্রতিযোগিতা হবার কথা ছিল, কিন্তু সময়ের অভাবে দুইজন করে হল। প্রথম দিন কোন কোন দেশের প্রতিযোগিতা হয়েছিল অত মনে নেই, শুধু মনে আছে ইরানের ক্বারীয়া আর পাকিস্তানের হাফিজা ছিল। ওদের তিলাওয়াত শুনে চুপসে গেলাম। আমি তো এদের ধারে-কাছেও যাই না। দ্বিতীয় দিন মালয়েশিয়ার ক্বারীয়ার তিলাওয়াত শুনে আরও চুপসে গেলাম। সাহস যা সামান্য ছিল প্রথম দুই দিনেই খতম। পুরস্কার পাওয়াতো অনেক দূরের কথা, এদের পাশাপাশি আমার মিনমিনে তিলাওয়াত শুনতে কেমন হাস্যকর লাগবে, সেটাই তখন চিন্তা। সেই বাঙালীদের নিয়ম অনুযায়ী শেষ দিক থেকে প্রথম না হয়ে যাই। পরে অবশ্য পাকিস্তান আর শ্রীলংকার প্রতিযোগীদের তিলাওয়াত শুনে একটুখানি ভরসা পেলাম। ওরাও ভালো তিলাওয়াত করেছিল, তবে আমি মনে হয় অন্তত ওদের কাছাকাছি যেতে পারব।

দ্বিতীয় দিনের প্রতিযোগিতা শেষে বাসে উঠে মালয়েশিয়ার ক্বারীয়াকে অভিনন্দন জানালাম। বললাম, তোমার পারফর্মেন্স সবচেয়ে ভালো লাগল। সে মিষ্টি হেসে ধন্যবাদ জানাল। সেদিন খবরের কাগজে আগের দিনের প্রতিযোগিতার কথা লিখেছিল। গাইডরা খুব উচ্ছ্বাসের সাথে খালাম্মাকে অনুবাদ করে শোনাল, এখানে লিখেছে, প্রথম দিনের প্রতিযোগিতায় ইরানের ক্বারীয়া সবচেয়ে ভালো পারফর্মেন্স করেছে। খালাম্মা বললেন, তাহলে কালকের কাগজে এই জায়গায় মালয়েশিয়ার নাম আসা উচিৎ। এই কথায় গাইডরা মনে হল একটু মন খারাপ করল। ওহ, এর আগের দিন আবার আমাদের সেই গ্রুপ ছবিগুলো খবরের কাগজে এসেছিল।

সেই সাংবাদিক মেয়েটা একদিন আমাদের রুমে এল। সাথে দোভাষীর কাজ করার জন্য আমাদের গাইড লদান। আমার সাক্ষাৎকার নিল সেদিন। আমার নাম, বয়স, কোন ক্লাসে পড়ি এসব তথ্য নেয়ার পর জানতে চাইল ইরানে আসার সুযোগ পেয়ে কেমন লেগেছিল। বললাম, বিশ্বাসই হচ্ছিল না। এই কথাটুকু লদানকে অনুবাদ করে দিতে হল না, সাংবাদিকটা হেসে বলল, এটা আমি বুঝতে পেরেছি। তারপর আমি প্রথম কত বছর বয়সে ক্বিরাত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি জানতে চাইলে বললাম ৮-৯ বছর বয়সে। ভয় পেয়েছিলাম কি না সেটাও জানতে চাইল। বললাম, তখন তো ভয় পেয়েছিই, এখনও পাই। এই প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কোন ব্যাপারটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে সেটাও জানতে চাইল। আমি একটু চিন্তা করছি দেখে সে মনে করিয়ে দিল, ঐ যে উপর থেকে কুরআন নেমে আসছিল, সেটা? আমি বললাম, সেটাও ভালোই ছিল, তবে আমার কাছে ছোট্ট ছেলেটার কুরআন তিলাওয়াত সবচেয়ে ভালো লেগেছে। এই বয়সেই এত সুন্দর করে কিভাবে তিলাওয়াত করছিল সেটাই আমার কাছে অবাক লেগেছে। ইরান কেমন লাগছে জানতে চাইল। বললাম, অবশ্যই খুব ভালো লেগেছে, বিশেষ করে এখানকার মানুষদের আন্তরিকতা বেশি ভালো লেগেছে। আর জানতে চাইল এই প্রতিযোগিতার ব্যাপারে আমার কী ধারণা? বললাম, এরকম প্রতিযোগিতা হওয়া ভালো, এতে করে কুরআন শিক্ষার প্রতি উৎসাহ বাড়বে, এইসব আর কি। আরও কী কী প্রশ্ন করেছিল এখন মনে নেই।

সেদিন শুধু প্রশ্নোত্তর পর্ব সেরেই চলে গিয়েছিল মেয়েটা। আরেকদিন সে এল একজন ফটোগ্রাফার নিয়ে। আমার রুমমেটরা তখন বিশ্রাম নিচ্ছে, আমিও শুয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সে বলল, একটু তৈরী হয়ে বাইরে আসো, তোমার ছবি তোলা হবে। আমি ঝটপট তৈরী হয়ে নিলাম। আমাদের রুমের বাইরের দেয়ালে একটা বড় পেইন্টিং ঝুলছিল। ওটার সামনে দাঁড়াতে বলল। আমি চুপচাপ দাঁড়ালাম। কিন্তু তাদের আবার চুপচাপ ছবি তোলা পছন্দ না। বলল, তুমি কথা বলছ এরকম ছবি তোলা হবে, মনে কর তুমি সাক্ষাৎকার দিচ্ছ। কথা বলার সময় ছবি তোলা আমার একটুও পছন্দ না। আমি বললাম, কী বলব? বলল, যে মনে আসে বলতে থাকো। আমি আমার নাম-ধাম-বয়স বলতে থাকলাম। বলতে গিয়ে এমন হাসি পাচ্ছিল যে হি হি করে হেসে দিলাম। আর ঐ সময়ই ছবিটা তোলা হল।

পরদিন কাগজে আমার ছবিসহ সাক্ষাৎকার ছাপা হল। আমি দাঁত কেলিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। গাইডরা আর অন্য দেশের সুপারভাইজাররা সবাই এসে বলতে থাকল, আরে তুমি তো হেব্বি একটা হাসি দিয়েছ। আবার আমার বয়স নিয়েও সবাই হাসাহাসি শুরু করল। আমার বয়স বলেছি তের, আর ছাপায় ভুলের কারণে সেটা হয়েছে একশ তের। আমি নাকি একশ তের বছরের বুড়ি, তাই ফোকলা দাঁতে হাসছি। <img src=(" style="border:0;" />

আমার ছবির নীচেই শ্রীলংকার ক্বারীয়ার ছবিও দেয়া হয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছে তাকেও ছবি তোলার সময় কথা বলতে বলা হয়েছে। তার ছবিতে সে মুখটা বোয়াল মাছের মত হা করে আছে। এই কাগজের বেশ কিছু কপি দেশে নিয়ে এসেছিলাম। বাসায় সবাই দেখে বকা দিল, ছবি তোলার সময় এইভাবে দাঁত কেলায় নাকি? একটুও বুদ্ধি-শুদ্ধি নাই। আমি মনে মনে বলি, তাও তো দাঁত কেলানো ছবি আসছে, বোয়াল মাছের মত হা করা ছবি আসে নাই।

কাগজটা ফারসি কাগজ ছিল। কাজেই কী কী লেখা আছে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। লদানকে বলতে পারতাম। কিন্তু এর মধ্যে ইরানে দশ-বারো বছর ধরে আছে এমন এক ভদ্রমহিলার সাথে দেখা হল, তার স্বামী এখানে বিশ বছর ধরে আছে, রেডিও-র সাংবাদিক। উনার কাছেই কাগজটা দিলাম, বললাম, একটু বলেন না এখানে কী লিখেছে। পরে উনি যা বললেন তাতে বুঝলাম আমি ঐ সাংবাদিককে যা যা বলেছিলাম তা-ই হুবহু লেখা হয়েছে। পরে দেশে এসে দেখলাম ইরানী দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকেও একটা পত্রিকায় আমার ছবিসহ একটা সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে, কিন্তু শুধু আমার নাম, বয়স এই তথ্যগুলো ঠিক রেখে বাকী সব বানিয়ে বানিয়ে লিখে রেখেছে। এমন রাগটা লেগেছে না।

যে বাঙালী ভদ্রমহিলার কথা বলছিলাম, তার স্বামীও এই প্রতিযোগিতার খবর কাভার করার জন্য এসেছিলেন। প্রথমে একদিন রেডিও থেকে একজন বাঙালী ভদ্রমহিলা এলেন সাক্ষাৎকার নিতে। ঐ সময় খুব ভীড় আর হাউ-কাউ হচ্ছিল। এর মধ্যেই টেপ রেকর্ডারে সাক্ষাৎকার নিয়ে গেলেন। পরে সেই ভদ্রলোক এসে জানালেন যে ঐ দিনের রেকর্ডে আমার কোন কথাই আসেনি। তাই একটা ভালো রেকর্ডার এনে তিনি আরেকদিন আমার সাক্ষাৎকার নিলেন। এইদিন লবিতে নিরিবিলি বসে সাক্ষাৎকার দিলাম। প্রথমেই নাম, বয়স জানার পর জানতে চাইলেন কোন স্কুলে কোন ক্লাসে পড়ি। সেটাও বলার পর বললেন, ক্লাসে তোমার রোল কত? মর জ্বালা, এখন কি পড়া ধরা শুরু করবে না কি রে! বললাম, আমার রোল ২। সাথে সাথে যেন চাঁদ হাতে পেয়েছে এমন করে ভাবে গদ গদ হয়ে উনি বলতে থাকলেন, ওহ, আমরা তাহলে দেখতে পাচ্ছি আমাদের বাংলাদেশের প্রতিযোগী শুধু কুরআন তিলাওয়াতেই না, লেখাপড়াতেও অনেক ভালো। আমি হাসি চেপে পরের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে গেলাম। যা হোক, এই সাক্ষাৎকারের প্রচার আমি নিজে না শুনলেও পরে জেনেছিলাম যে মিডল ইস্টে থাকা আমার কিছু আত্মীয় নাকি শুনেছিল।

আরেক দিন আমার সাক্ষাৎকার নেয়া হল টিভিতে। অডিটোরিয়ামের পেছনে একটা ছোট্ট করে ভ্রাম্যমান স্টুডিও বানিয়ে সাক্ষাৎকার নেয়া হল। এইদিন আমার সাথে দোভাষী হিসেবে লদানও ছিল। টেনশন হচ্ছিল। খুব অল্প কিছু প্রশ্নের উপর দিয়েই গেল, উত্তরগুলোও সংক্ষেপে দিয়ে যাচ্ছিলাম। তবে পরে মনে হচ্ছিল যে উত্তরগুলো আরেকটু সুন্দর করে গুছিয়ে দেয়া যেত। যা হোক, দুঃখের বিষয় হল এই সাক্ষাৎকারের প্রচারও আমি নিজে দেখতে পারিনি।

প্রতিযোগিতার গল্প এক পর্বে শেষ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু অনেক কথা এখনও বলা বাকী রয়ে গেল। পরের পর্বেই শেষ করি।



চলবে................



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29502014 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29502014 2011-12-13 15:52:03
ইরানের দিনগুলো - ৭

ইরানের দিনগুলো - ১
ইরানের দিনগুলো - ২
ইরানের দিনগুলো - ৩
ইরানের দিনগুলো - ৪
ইরানের দিনগুলো - ৫
ইরানের দিনগুলো - ৬


আজকে একটু খানা-পিনার কথায় আসি। ভিনদেশে এটা একটা বড় ব্যাপার। প্রথম দিনের সকালের নাস্তা আর রাতের খাবারের মেনুতে আস্ত চিকেনের কথা বলেছিলাম। এই মেনুগুলো ঐ একবার করেই পেয়েছি। ভাগ্যিস! নইলে আমার খাওয়া নিয়ে খুব ঝামেলা হয়ে যেত।

আমাদের সকালের নাস্তার মেনু ছিল রুটি, সিদ্ধ ডিম, মাখন, জেলী। আর রঙ চা। আমি প্রথম দিন রুটিতে মাখন-চিনি লাগিয়ে খাচ্ছি দেখে লদান আমাকে শিখিয়ে দিল, রুটিতে প্রথমে মাখন লাগিয়ে তার উপর জেলী লাগিয়ে নিলে খেতে ভালো লাগবে। বুদ্ধিটা কাজে লাগিয়ে দেখলাম আসলেই মজা লাগে। এই ভাবে একটা বা দুইটা রুটি খেয়ে এরপর সিদ্ধ ডিমে লবণ ছিটিয়ে নিয়ে খেতাম। আমার দুই রুমমেটের অবশ্য এই খাদ্যটা পছন্দ হয়নি। তারা সামান্য একটু রুটি খেত, ডিমটাই ছিল তাদের সকালের নাস্তা।

এখানে রুটির একটু বর্ণনা দেয়া দরকার। রুটিগুলো আমাদের দেশের সাধারণ রুটির মতই, কিন্তু আমাদের রুটির মত গোল না, চারকোণা করে কাটা। আমি মনে করেছিলাম এভাবেই বুঝি বানায়, গোল বানানোর চেয়ে এটাই তো সুবিধা। পরে লদানের কাছে শুনলাম, এই রুটি হাতে বানানো না। এগুলো স্বয়ংক্রিয় মেশিনে বানানো হয়, একবারে লম্বা লম্বা করে বানায়, পরে বর্গক্ষেত্রাকারে কেটে কেটে পরিবেশন করা হয়। মেশিনটা দেখতে ইচ্ছা হচ্ছিল খুব, কিন্তু বলার সাহস পেলাম না।

এখানে সব সময় রঙ চা দেয়া হত, এটাই আমার প্রিয়। আর সাথে চিনির কিউব। আমরা চায়ে একটা বা দুইটা চিনির কিউব নিয়ে চামচ দিয়ে গুলে খেতাম। এই কথাটা এভাবে আলাদা করে বলার কারণ হল, ইরানীরা এভাবে চা খায় না। তারা চিনির কিউব হাতে রাখে, কিউবে একটা কামড় দেয় আর চায়ে একটা চুমুক দেয়। এইভাবে একবার খাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। ভয়ংকর বিস্বাদ লাগে এইভাবে চা খেতে।

একদিন শুধু গরম পানির গ্লাস, চিনির কিউবের প্যাকেট আর টি-ব্যাগ ধরিয়ে দিয়েছিল। তাও আবার একটা অডিটোরিয়ামে বসে। সেখানে টি-ব্যাগ কোথায় ফেলব বুঝতে পারছিলাম না। এদিকে চা তো বেশি কড়া হয়ে যাচ্ছিল। পরে পাশে বসা শ্রীলংকার প্রতিযোগীকে দেখলাম সে চিনির কিউবগুলো চায়ে নিয়ে টি-ব্যাগ সেই প্যাকেটে রেখেছে। ব্রিলিয়ান্ট! বলে আমিও ঐ পদ্ধতি করলাম।

সকালের নাস্তা আর দুপুরের খাবারের মাঝখানে একটা হালকা নাস্তা দেয়া হত। মেনু ছিল এক প্যাকেট ওয়েফার বিস্কুট, একটা জুসের টেট্রাপ্যাক, একটা ফল - আপেল, কমলা বা কলা। জুসের মধ্যে কমলা আর আপেল জুসটাই ভালো লাগত। মাঝে মাঝে আঙুরের জুস দিত, এটা বেশি খেতে পারতাম না। ওয়েফারটা খুব মজার ছিল। বিকালের নাস্তার মেনুও একই ছিল। আপেল বা কমলা দিলে খেতে নিতাম।

কলা আমার তেমন পছন্দ না। তাই চেষ্টা করতাম অন্য কাউকে দিয়ে দিতে। কেউ না কেউ নিয়েই নিত। তবে একবার খুব যন্ত্রণার মধ্যে পড়েছিলাম। বাসে উঠে নাস্তা দেয়ার পর কলাটা এদিক ওদিক যতই চালান করি, সেটা ঘুরে ঘুরে আবার আমার কাছেই চলে আসে। পরে সেই পিচ্চি পটপটুনি যাহরার হাতে দিলাম। সে তার মায়ের সাথে আমার সামনের সিটেই বসেছিল। তাকে দিতেই সে আগ্রহ নিয়ে কলাটা নিল। আমি খুশি হলাম যে একটা ব্যবস্থা হল শেষ পর্যন্ত। কিন্তু না, তার মা দেখে একটা বকা দিয়ে সেটা আবার আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে যাহরার জন্য রাখা কলা খেতে দিলেন। আমি আশায় আশায় ছিলাম যে সে নিজেরটা খাওয়া শেষ করলে আমি তাকে আমারটা দিব। কিন্তু পিচ্চিটা ঝামেলা পাকিয়ে ফেলল। কলার খোসা ছাড়িয়েই সে উপরের কালো তিতা অংশটুকু খেয়ে নিল। তারপরেই চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিল। কি আর করা, সেই কলা রুমে নিয়ে এসে ফ্রিজে রেখে দিলাম। পরে মনে হয় ফেলেই দিতে হয়েছিল।


ইরানের কমলা খুব মজার ছিল। ভীষণ মিষ্টি আর রসে টইটুম্বুর। তবে কমলা দেয়া হত খুব কম। বেশির ভাগ সময় কেনু দিত। এইটার খোসা ছাড়ানোই একটা ঝক্কি। ছোট একটা ছুরি নিয়ে ভয়ে ভয়ে কাটতাম, কখন না আঙুল কেটে ফেলি। তেমন দুর্ঘটনা অবশ্য হয়নি।

দুপুর আর রাতের মেনু ছিল আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। কারণ এই মেনুটাই একেক দিন একেক রকম থাকত। আর প্রতিটাই খুব ভালো লেগেছিল। প্রথমেই থাকত স্যুপ, তাও একেক দিন একেক রকম। বেশির ভাগ সময় ভেজিটেবল স্যুপ থাকত। এর মধ্যেও নানান রকম স্বাদের আর রঙের হত। স্যুপের সাথে সেই মেশিনে করা রুটিও থাকত। তবে আমি শুধু স্যুপই খেতাম। মাঝে মাঝে স্যুপের বদলে থাকত টক দই। চিনি মিশিয়ে খেয়ে নিতাম, মজাই লাগত। ইরানীরা অবশ্য চিনি মেশাত না, তবে একজন গাইড ছিল সে একবার গল্প করছিল যে ভারত উপমহাদেশের লোকজন চিনি মিশিয়ে খায়, এটা ভালোই লাগে। তার মা পাকিস্তানে থাকতেন, মায়ের কাছে সে শুনেছে। একবার তার মায়ের ছবিও নিয়ে এসেছিল আমাদের দেখাতে। ইরানীদের মত চিনি ছাড়াও খেয়ে দেখেছি কয়েকবার, খুব একটা খারাপ লাগেনি।

স্যুপ বা টক দইয়ের পর আসত মেইন কোর্স, সবচেয়ে আকর্ষণীয় আমার কাছে ছিল এটাই। পোলাও থাকত দুই রকমের। একটা আমাদের দেশের মতই সাদা সুগন্ধী পোলাও, আরেকটা পালং-পোলাও। পালং-পোলাও আমার বেশি পছন্দের ছিল। বাসমতী চালের সাথে পালং শাকের পেস্ট দিয়ে বানানো এই পোলাও পেলে বেশি করে নিতাম।

মাছ-মাংসের যে কোন একটা আইটেম থাকত। মাছ কিংবা বিফ কিমা করে কাবাবের মত করে রান্না করত। কাবাবটা বানাত লম্বা করে। যার যতটুকু ইচ্ছা কেটে কেটে নিতাম। খুব অল্প তেলে ভাজা, আর অল্প মসলা দিয়ে বানাত এটা। এইজন্যই ভালো লাগত।

সবজীর একটা তরকারীর মত থাকত, এটা তেমন একটা আকর্ষণীয় ছিল না।
সালাদটা হত দেখার মত। কত কিছু যে দিত সব কিছুর নামও জানি না। বেশি করে নিতাম সালাদ। আর মাঝে মাঝে থাকত মুরগীর রোস্ট। এটাও খুব মজা লাগত।

ডেজার্টে থাকত বাহারী রঙের জেলী। এই জিনিসটা কেন যেন ভালো লাগত না। প্রায়ই ডেজার্ট খেতাম না। তবে আমি পোলাও-মাংস বা মাছ যে পরিমাণে খেতাম তাতে ডেজার্টের জন্য খুব একটা জায়গাও থাকত না পেটে। খাওয়া নিয়ে আমার সমস্যা না হলেও আমার রুমমেটদের জন্য ভালোই সমস্যা করেছিল। তারা খুব একটা খেতে পারত না। ভিনদেশের খাবারে স্বাদ তাদের একেবারেই ভালো লাগেনি। প্রায়ই তারা দেশের ডাল-ভাতের জন্য হা-হুতাশ করত।

একদিন আমাদের রাতের খাবারের দাওয়াত ছিল ইরানে বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূতের বাড়িতে। সেখানে রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী আমাদের জন্য বাঙালী খাবারের আয়োজন করেছিলেন। এখানেও ভালোই খাওয়া-দাওয়া করেছিলাম। পোলাও, মুরগীর রোস্ট ছাড়াও ভাত, ডাল, বেগুন ভর্তা আর নানান রকম ভাজি দিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করা হয়েছিল। আমরা মজা করে খেলেও এই দিন লদানের কষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সে বেচারী ঝালের চোটে কিছুই খেতে পারছিল না। পরে তাকে শুধু ভাত আর মুরগীর রোস্ট খেতে বললাম। সেটাই অল্প করে খেয়ে নিল।

মজা করে পেট পুরে খাওয়ার পর আমার একটু সমস্যা হয়ে গেল। খাওয়ার পর যখন সবাই মিলে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করছে, তখন আমার পেটে ব্যথা শুরু হল। রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী তার মেয়ের রুমে নিয়ে আমাকে শুইয়ে দিলেন। কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না কেন হঠাৎ ব্যথা হল। পরে লদান বলল, প্রতিদিন দুইবেলা সফট ড্রিংকস খাওয়ার কারণে হতে পারে। আমার কাছেও সেটাই মনে হল। আর সেই সাথে হঠাৎ করে অনেক দিন পর ঝাল বেশি খাওয়াটাও একটা কারণ হতে পারে।

একদিন ইরানের প্রতিযোগীরা আমাদের রুমে এসেছিল আমাদের সাথে পরিচিত হতে। সাথে করে নিয়ে এসেছিল এক প্লেট পেস্ট্রির মত বিস্কুট। দেখতে যত বেশি আকর্ষণীয়, খেতে ততটাই বিচ্ছিরি। এক টুকরো খেয়ে বাকীটুকু ফেলে দিতে হয়েছিল।

তেহরানের মেয়রের দাওয়াতে যেদিন খাওয়া-দাওয়া হল, এই মেনুটা আমার খুব একটা পছন্দ হয়নি। এইদিন বেশি তেল-মসলা দিয়ে রান্না করা হয়েছিল। আমার রুমমেটের জন্য বেশি সমস্যা হয়ে গিয়েছিল, এমনিতেই আগের দিন সে বাসে বমি করে দিয়েছিল। এই দিন তাই সালাদের প্লেটে কচি কচি শসা দেখে সে আমাকে বলল আমি যেন তার জন্য দুইটা শসা নিয়ে রাখি। আমার ব্যাগে টিস্যু দিয়ে মুড়ে দুইটা শসা রাখলাম। খুব কাজে দিল এগুলো। পরে বাসে উঠে এগুলো খেয়ে নিতে তার বমি ভাবটা চলে গিয়েছিল। (বমির কথাটা না বললেও হত।)

মাশহাদের হোটেল রোজ-এর খাবারও খুব মজার ছিল। বিশেষ করে ওদের স্যুপটা খুব ভালো লেগেছে। আরও একটা মজার ব্যাপার হল, ওখানে একজন বাঙালী ওয়েটার ছিল। সে আমাদের স্যুপ পরিবেশন করতে এসে বাংলায় কথা বলত। আরেকটু দিব? চলবে? এইটুক বাংলা শুনেই শান্তি লাগত। হয়ত এজন্যই স্যুপটাও মজা লাগত।

খানা-পিনা নিয়ে আপাতত এইটুকুই মনে পড়ছে। পরে আরও কিছু মনে পড়লে লিখব আবার।




চলবে..................]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29500110 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29500110 2011-12-10 16:07:25
ইরানের দিনগুলো - ৬
ইরানের দিনগুলো - ১
ইরানের দিনগুলো - ২
ইরানের দিনগুলো - ৩
ইরানের দিনগুলো - ৪
ইরানের দিনগুলো - ৫



ইমাম খোমেনীর বাড়ি থেকে ফেরার সময় বেশ কিছু রাস্তা হেঁটে এসে বাসে উঠতে হয়েছিল। এই রাস্তাটা বেশ ঢালু ছিল। আসার সময় উঠতে গিয়ে তেমন একটা টের পাওয়া যায়নি, কিন্তু এখন নামার সময় দেখা গেল ঢালুর পরিমাণ একেবারে কম না। আমি ভয়ে ভয়ে ছিলাম কখন না পিছলে সটাং হয়ে যাই। অবশ্য তাতে একটা লাভ হত, সবার আগে তাড়াতাড়ি বাসের কাছে পৌঁছে যেতে পারতাম। <img src=" style="border:0;" />

যা হোক কোন দুর্ঘটনা ছাড়াই জায়গামত পৌঁছে বাসে উঠতে পারলাম। পিছলে পড়ার এই ভয়ের কারণটা পরে বলব নে।

আমার কাছে তো ক্যামেরা ছিল না। একদিন দুপুরে লাঞ্চের পর আমাদেরই এক প্রতিযোগী আমাকে তার ক্যামেরা দিয়ে বলল, আজকে সকালে আমাদেরকে সুন্দর একটা পার্কে নিয়ে গিয়েছিল, তোমাদেরকেও নিশ্চয়ই বিকালে নিবে, ছবি তুলে নিও। আফসোস, ঐদিন আমাদেরকে একটা মিউজিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে ছবি তোলা নিষেধ। <img src=" style="border:0;" />

একদিন আমাদেরকে একটা মাদ্রাসায় নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে মাদ্রাসার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাল, হামদ-নাতও হল। এরপর হঠাৎ করে আযান দিয়ে নামায পড়া শুরু হল। তখনও যোহরের ওয়াক্ত হয়নি। আমি বুঝতে পারছিলাম না। পাকিস্তানী ক্বারীয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কিসের নামায। সে বলল, ওরা শিয়া যে, শিয়াদের নামাযের সময় তো আমাদের মত না। জানলাম ওরা নামায পড়ে তিন বার, সূর্যোদয়ের আগে ফজরের নামায, দুপুরের আগেই জোহর আর আসরের নামায একসাথে, রাতে মাগরিব আর ইশার নামায একসাথে। আমরা সুন্নীরা পাশে বসে রইলাম। তবে কিছু দেশের প্রতিযোগী বুঝতে না পেরে তাদের সাথে নামাযে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

একদিন আমাদেরকে শপিং-এ নিয়ে যাওয়া হল। একটা মাঝারি ধরণের মার্কেটে গেলাম। এতদিন বাস থেকে রাস্তার দুই পাশে কত সুন্দর সু্ন্দর দোকান দেখেছি। এই মার্কেট সেই তুলনায় তেমন সুবিধার না। যা হোক, আমরা তো আর চিনি না। যেখানে নিয়ে এসেছে সেখান থেকেই শপিং করব। ঘুরে ঘুরে দেখছি, কিন্তু আমার শপিং-এর অভ্যাস নেই বলে বুঝতে পারছিলাম না কী কিনব। আব্বার জন্য কয়েকটা আংটি নিলাম। তার মধ্যে একটা খুবই সুন্দর, মাঝখানে একটা বড় রুবি, আর দুইপাশে ছয়টা করে ছোট ছোট ফিরোজা পাথর বসানো। আব্বার আঙ্গুলের মাপ তো ছিল না, আমার বুড়ো আঙ্গুলের মাপে কিনলাম। একটা কালোর উপর সাদা বুটিওয়ালা হেয়ার ব্যান্ড কিনলাম ছোট বোনের জন্য। সে সময় তার খুব শখ ছিল এসবের।

ছোট ভাইয়ের জন্য খেলনা খুঁজছিলাম। কিন্তু এই মার্কেটের খেলনার দোকানগুলো দেখে পুরোপুরি হতাশ হলাম। আমাদের দেশের কোন গ্রামের মেলাতেও এর চেয়ে ভালো মানের খেলনা পাওয়া যায়। কাপড়ের দোকানে গিয়েও পছন্দমত কিছু পেলাম না। ইরানী মেয়েরা জিনস আর টি-শার্ট পরে। ঐ জিনিস তো আর আমি কিনব না। বোরকাগুলো সুন্দর ছিল। ওগুলোর দাম আরও সুন্দর ছিল। আমাদের আরেকজন প্রতিযোগী আমাকে বলল এখানে নাকি মেয়েদের মোজা ভালো পাওয়া যায়, আমাকে বারবার কেনার জন্য তাগিদ দিচ্ছিল। বিরক্ত লাগছিল, আরে বাবা আমি মোজা কিনব কি কিনব না সেটা তো আমার ব্যাপার। আর কিছুই কেনা হল না আমার। খালাম্মা খুব শপিং করলেন। জায়নামায, ইরানী পারফিউম, তার মেয়েদের জন্য স্কার্ট-টপস। আমি সামান্য যাও কিছু কিনেছি, আমার রুমমেট কিছুই নিল না। শপিং-এর ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা আমার চেয়েও করুণ। আফসোস! আফসোস! সবার আগে মার্কেট থেকে বের হয়ে এলাম আমরা। বাসে উঠব, কিন্তু বাসের দরজাটা খুলতেই পারছিলাম না। ড্রাইভার পাশেই হাত-মুখ ধুচ্ছিল। তাকে ডাকতে সে ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করল কিভাবে দরজা খুলতে হবে। আমি তাও পারলাম না। অগত্যা সে নিজেই এসে খুলে দিল। বেশ কিছুক্ষণ পর সবাই একে একে বের হয়ে বাসে উঠল, সবার হাত ভর্তি শপিং ব্যাগ।

প্রতিযোগিতা যখন শেষ, আমাদের আরও তিনদিন পর দেশে ফেরার ফ্লাইট। আমাদের সবাইকে এবার নিয়ে যাওয়া হবে তেহরানের বাইরে, মাশহাদ শহরে, ইমাম রেজা-র মাজারে। রাতের বেলা ফ্লাইট। সকালে লদান এসে জানাল, আমরা যদি বিশ্রাম নিতে চাই তাহলে নিতে পারি। আর যদি বের হতে চাই তাহলে আমাদের নিয়ে একটা কারুশিল্প একাডেমীতে নিয়ে যাবে, সেখানে কাপড় কেটে ফুল বানানো শেখানো হবে। খালাম্মা সাথে সাথে বললেন, আমি তো বিশ্রাম নিব, তোমরা দু'জন গেলে যেতে পারো। আমার রুমমেটও জানাল আমি গেলে সে সাথে যাওয়ার চিন্তা করতে পারে, নইলে সেও বিশ্রাম নিতেই আগ্রহী। আমারও ক্লান্তি এসে গিয়েছিল কিছুটা। লদানকে বললাম, আমরা সবাই আজকের দিনটা বিশ্রাম নিতে চাই। এখন আফসোস হয়, গেলেই পারতাম।

রাতের বেলা অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে মোটামুটি নিম্নমানের একটা প্লেনে বিরক্তিকর খাবার খেতে খেতে গেলাম মাশহাদে। বিরক্তি নিয়ে গেলেও এয়ারপোর্টে নেমে মন ভালো হয়ে গেল। আমাদেরকে ফুল দিয়ে বরণ করে নিল ছোট ছোট মহা কিউট এত্তগুলো পুতুল। তারপর তারা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে রইল দুইপাশে। আমরা এগিয়ে গেলাম। যেতে যেতে কয়েকটা পুতুলের গাল না টিপে পারছিলাম না। পুতুলগুলোও জানে সবার আদর তাদের পাওনা। তাই গাল টিপতেই তারা গাল এগিয়ে দেয় আরেকটু আদরের আশায়। ঐ আশা ফিরিয়ে দেয়ার সাধ্য নেই কারুর। আদর করতে করতেই চললাম বাসের দিকে।

আমাদেরকে নেয়া হল হোটেল রোজ-এ। সুন্দর হোটেল, পছন্দ হল একবারেই। সবচেয়ে ভালো লাগল এজন্য যে আমাদের বাংলাদেশের মেয়েদের একটা স্যুট দেয়া হল, অন্যদেরও দিয়েছিল হয়ত। স্যুটে ছিল দুইটা বেডরুম, একটায় একটা ডাবল বেড, আরেকটায় দুইটা সিঙ্গেল বেড। দুই রুমেই বিশাল বিশাল দুইটা ক্লজেট আর লাইট লাগানো ড্রেসিং টেবিল। বাথরুমের সাথে লাগোয়া একটা ছোট স্পেস যেখানে ফ্রিজ ভর্তি ফলমূল আর সফট ড্রিংকস রাখা। ফল কেটে খাওয়ার জন্য ছুরিও আছে। আমরা আপেল আর আঙুরগুলোর সদ্ব্যবহার করলাম।

পরদিন সকালে নিয়ে যাওয়া হল ইমাম রেজার মাজারে। এখানে যাওয়ার আগে মেয়েদের সবাইকে বড় বড় চাদরের মত আলখেল্লা দেয়া হল গায়ে জড়িয়ে নেয়ার জন্য, নইলে মাজারে ঢুকতে দেয়া হবে না। সবাই আলখেল্লা জড়িয়ে গেলাম মাজারে। বিশাল আর অনেক পুরনো মাজারের শৈল্পিক সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হচ্ছিলাম। অনেক মানুষ সেখানে এসে মানত করছে, দোয়া পড়ছে, নামায পড়ছে। আমরা শুধু কবর জিয়ারতের দোয়া পড়লাম। তারপর ভিড়ের মধ্যে একটু বসার জায়গা করে বসে রইলাম। আমাদের তো আর কিছু করার নেই। একজন স্থানীয় মহিলা আমাকে বেকার বসে থাকতে দেখে একটা দোয়ার বই ধরিয়ে দিল। ভদ্রতার খাতিরে নিলাম সেটা। বের হবার সময় ওটা রেখে আসছিলাম, খালাম্মা বললেন, নিয়ে নাও তো, রুমে গিয়ে দেখব কী ধরণের দোয়া আছে ঐ বইয়ে। নিয়ে রাখলাম বইটা। পরে অবশ্য সেটা ভুলে হোটেলের খাবার টেবিলে রেখে এসেছিলাম।

মাজার থেকে বের হয়ে পাশের একটা মিউজিয়ামে নিয়ে যাওয়া হল। এখানে এসে আবারও মুগ্ধ হতে হল। এটা একটা কুরআন শরীফের মিউজিয়াম। কত রকম পুরনো কুরআন শরীফ যে আছে। কোনটা এত পুরনো যে কাগজগুলো অনেকখানিই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কোনটা এত ছোট যে একটা আঙুলের চেয়েও ছোট হবে। আবার কোন কোনটা এত বড় যে পুরো দেয়াল জুড়ে আছে। সবগুলো দেখলাম অনেক সময় নিয়ে। বেশ কিছু পুরনো লিপিও ছিল। একটা জায়গায় এসে একটু থমকে গেলাম। লেখাগুলো যেন খুব পরিচিত লাগছে। এটা তো আরবী নয়, কেমন জানি বাংলার মতই, কিন্তু পড়ার চেষ্টা করে পারছি না। পাশে লেখা বর্ণনা পড়ে দেখলাম ওটা হল ব্রাহ্মী লিপি। এর থেকেই তো বাংলার উদ্ভব। মনে হচ্ছিল যেন দূরদেশে এসে নিজের দেশের একটা ছোঁয়া খুঁজে পেলাম।

এই মিউজিয়াম থেকে বের হয়ে পাশেই আরেকটা মিউজিয়ামে নেয়ার কথা হচ্ছিল। কিন্তু আমাদের গাইডরা সবাই প্রতিবাদ জানিয়ে সেটা বাতিল করল। সবাই খুব বেশি ক্লান্ত। আসলেই তাই ছিলাম। আমরা ফিরে এলাম হোটেলে। রাতেই আবার তেহরানে ফিরতে হবে। বিশ্রাম নিয়ে নিলাম যতটুকু পারি। বের হবার সময় সবাইকে হোটেলের পক্ষ থেকে ছোট্ট উপহারের বক্স দেয়া হল। এখানে ছিল রোস্টেড পেস্তাবাদাম, মিছরি, সুগন্ধি এলাচ আর একটা আতর। আবারও সেই বিরক্তিকর ফ্লাইটে করে ফিরে এলাম তেহরান।

এরপর একদিন বিশ্রামের পর আমাদের দেশে ফেরার পালা। সেই কথায় না হয় আবার পরে আসি।



চলবে...........

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29498322 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29498322 2011-12-07 19:45:18
ইরানের দিনগুলো - ৫ ইরানের দিনগুলো - ১
ইরানের দিনগুলো - ২
ইরানের দিনগুলো - ৩
ইরানের দিনগুলো - ৪



এবার কী বিষয় দিয়ে শুরু করা যায় ভাবছি। ঘুরাঘুরি, খানা-পিনা, না কি প্রতিযোগিতা। ঘুরাঘুরি দিয়েই শুরু করি। ঐটাই ছিল এই ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়।

আমাদের রুটিন ছিল সকালবেলার শিফটে মেয়েদের প্রতিযোগিতা হত, ঐ সময় ছেলেদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়া হত। আর বিকালের শিফটে ছেলেদের প্রতিযোগিতা আর মেয়েদের ঘুরাঘুরি সেই একই জায়গায়। এতে আমাদের মেয়েদের জন্য একটা সুবিধা ছিল, প্রতিযোগিতার যা কিছু টেনশনের ব্যাপার, সকালেই শেষ। বিকালে আরাম করে ঘুরাঘুরি করা যেত। তখন রোদ-গরমের ব্যাপারটাও থাকত না।

প্রথম দিন পার্ক, আন্ডারগ্রাউন্ড এ্যাকুইরিয়াম মিউজিয়াম আর দ্বিতীয় দিন পাহাড়ে টেলিকেবিনে বেড়ানোর কথা বলেছি। এরপর থেকে শুরু হল মিউজিয়াম ঘুরে দেখানো। একটা মিউজিয়ামে গিয়ে একটু অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। অনেকগুলো নগ্ন ভাস্কর্য ছিল। ইরানীরা দেখলাম এতে খুবই অভ্যস্ত। আমি এগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাচ্ছিলাম। তবে একটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে বাধ্য হলাম। এত সুন্দর ছিল মূর্তিটা। একজন মা কোলে একটা দুধের শিশুকে নিয়ে দুধ খাওয়াচ্ছে আর সামনে বসা আরও দুইটা যমজ বাচ্চা, এক বছর বয়সের হবে, তারা খাওয়ার জন্য পাখির ছানার মত হা করে আছে আর মা এক হাতে খাবার তুলে তাদের মুখের উপর ধরে আছে আর হাসছে। আমরা সবাই ঘুরে ঘুরে চারপাশ থেকে ভাস্কর্যটা দেখতে থাকলাম। মিউজিয়ামে ছবি তোলা নিষেধ বলে খুব মন খারাপ হচ্ছিল। ঐ মিউজিয়ামে অনেক মূর্তির মধ্যে একটা হিন্দু দেবতার মূর্তিও ছিল। ওরা অবশ্য ওটার নাম জানত না। আমি জানিয়ে দিলাম, এটা গণেশের মূর্তি। বের হয়ে আসার সময় দেখলাম একটা স্যুভেনিরের দোকান। মালয়েশিয়ার প্রতিযোগী কয়েকটা পোস্টার কিনল ক্যালিগ্রাফির। আমাদের গাইড লদানও দেখলাম টুক করে কি যেন কিনে নিল। পরে রাতে বিদায় জানানোর সময় সে আমার হাতে দুইটা ছবি ধরিয়ে দিল। দেখলাম সেই ভাস্কর্যের ছবি। <img src=" style="border:0;" />

ইরানের রাজতন্ত্রের শেষ রাজা মোহাম্মদ রেজা শাহ্-এর পতনের পর তার ছয়টি প্রাসাদকে মিউজিয়ামে পরিণত করা হয়। এর মধ্যে বড় দুইটাতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দেখে ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। একেকটা প্রাসাদ আমাদের দেশের আহসান মঞ্জিলের সমান, ভিতরে আরও অনেক বেশি আলিশান করে সাজানো। এইরকম ছয় ছয়টা প্রাসাদ দিয়ে লোকটা করত কী? একেকটা ফার্নিচার একেক দেশ থেকে অর্ডার দিয়ে বানানো, তার ডিজাইনের যে কত বাহার। ঝাড়বাতিগুলোর একেকটাতেই মনে কয়েক হাজার টুকরো ক্রিস্টাল। নাহ বর্ণনা দিতে গেলে আর পারব না। দোতলা না তিনতলা যেন ছিল প্রাসাদগুলো মনে নেই। বের হয়ে এসে সবাই মিলে প্রাসাদের সিড়িতে আবার সেই ফটোসেশন। এবারও সেই সাংবাদিক মেয়েটা ঝামেলা করলই। আমাকে টেনে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল, এদিকে আমার পিছনে কয়েকজন একটু খাটো মেয়ে দাঁড়ানোয় তারা গেল ঢাকা পড়ে। ফটোগ্রাফারের ইশারা বুঝতে পেরে আমি নিজেই সরে একপাশে দাঁড়ালাম। বাসে উঠতে যাব, তখন দেখলাম একটা পিচ্চি বাবুদের দল এসেছে, স্কুল ইউনিফর্ম পরা। লাইন ধরে সারিবদ্ধভাবে আসছে পুতুলের মত বাচ্চাগুলো, কোন হুড়াহুড়ি নেই, দৌড়াদৌড়ি নেই। সামনে ওদের ম্যাডামরাও আছেন। বাচ্চাগুলো একসাথে কিছু বলতে বলতে আসছিল। লদানকে জিজ্ঞেস করলাম, কী বলছে ওরা? লদান জানাল, ওদের স্কুলে শেখা কোন কবিতা আবৃতি করছে।

স্কুলের বাচ্চাদের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ল, ইরানে প্রথমে এসে ভোরবেলা যে হোটেলটায় নিয়ে গিয়েছিল, ঐ হোটেল মারমারের রুমের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখেছিলাম, ছোট ছোট ইউনিফর্ম পরা বাচ্চারা স্কুল ব্যাগ আর পানির ফ্লাস্ক কাঁধে ঝুলিয়ে মায়ের সাথে স্কুলে যাচ্ছে। বাচ্চাগুলোকে দেখে ঠিক পুতুলই মনে হয়।

শাহ্-এর মূল যে প্রাসাদটা ছিল, সেটার সামনে একটা ভাঙা মূর্তি ছিল শাহ্-এর। ভাঙা মানে শুধু বুটজুতা দুটো ছিল, বাকীটুকু উপড়ে ফেলা হয়েছিল। ঐ বুটজুতার সাইজ দেখেই বোঝা যায় কত বিশাল ছিল মূর্তিটা। একটা প্রাসাদের বাইরে একটা স্যুভেনিরের দোকান ছিল। এই দোকানটা একেবারে চষে ফেললাম। তবে পছন্দসই জিনিস খুব একটা পেলাম না। প্রাসাদের ভিতরের একটা ছাদের ডিজাইন নিয়ে একটা ছবি ছিল, সেটা কিনলাম। একটা সবুজ রঙের লেদারের অর্নামেন্ট বক্স, একটা খুব সুন্দর ডিজাইনের ছোট পকেট আয়নাও কিনলাম। বড় দুই বোনকে দেয়া যাবে এগুলো। হয়ত আরও কিছু কিনতে পারতাম, কিন্তু আমার নিজে কেনাকাটার অভ্যাস একেবারে ছিল না বললেই চলে। এইটুক কিনেই আমি টেনশনে ছিলাম যে বকা খেতে হয় কি না। খালাম্মাকে বলতে তিনি হেসে বললেন, কি যে বল, শখ করে কিছু জিনিস কিনেছ, বকা দিবে কেন?

দুইদিন দুইটা প্রাসাদ দেখিয়ে মাথা খারাপ করার পর আমাদের একদিন নিয়ে যাওয়া হল ইমাম খোমেনী-র বাড়িতে। সেখানেও মিউজিয়াম করা হয়েছে। কিন্তু এখানকার দৃশ্য একেবারেই বিপরীত। একেবারেই সাদামাটা দোতলা একটা বাড়ি, সাধারণ একটা কার্পেট বিছানো একটা হল আছে, তার উপর বারান্দার মত একটা জায়গা, একটা অতি সাধারণ কাঠের চেয়ার বসানো। এখানে বসে খোমেনী বক্তৃতা দিতেন, আলোচনা করতেন। এই হলে আমরা সবাই বসলাম। প্রজেক্টরে খোমেনীর জীবনের উপর তৈরী একটা প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হল। ইরানীদের অনেকেই কেঁদে উঠেছিল এই সময়। শাহ্-এর মূর্তি উপড়ে ফেলার সেই দৃশ্যও ছিল এই প্রামাণ্যচিত্রে। পরে বের হওয়ার আগে এই হলেই সবার একসাথে ছবি তোলা হল।

ফেরার পথে লদান আমাকে জানাল যে ইমাম খোমেনীর সম্পর্কে কিছু বলার জন্য আমাকে ডাকা হতে পারে, আমি যেন একটা বক্তৃতা মোটামুটি তৈরী করে রাখি। আমি লিখে ফেললাম ঐ রাতেই। অবশ্য পরে আর বক্তৃতা দেয়ার জন্য ডাকা হয়নি, বেঁচে গেছি।

আরেকদিন আমরা গেলাম ইমাম খোমেনীর মাজারে। ইমাম খোমেনীর বাড়িটা যত সাধারণ, তার মাজার ততই আলিশান। এত বড় মাজার আগে কখনও দেখিনি। বিশাল এলাকা নিয়ে করা, দামী কার্পেটে পুরোটা হল মোড়ানো। মূল মাজারটা গ্রিল দিয়ে ঘেরা, আর আমাদের দেশের মাজারের মতই ঐ মাজারের চারপাশে মানতের টাকার ছড়াছড়ি। লদানসহ অন্য সব গাইডরাই বলছিল, এখানে মানত করে সবাই টাকা দেয়, কিন্তু এগুলো আসলে বেদাত। আমরা কবর ঘুরে দেখে শুধু কবর জিয়ারতের দোয়া পড়লাম। এরপর ঐ বিশাল চত্বরের এক কোণায় সবাই বসলাম। এখানে ছোটখাট একটা মাহফিল হল। ইরানী প্রতিযোগীরা ছাড়াও আরও কয়েকজন তেলাওয়াত করে শোনাল। মুগ্ধ হবার সাথে সাথে টেনশনটাও বাড়ল, এদের সাথে আমাদের প্রতিযোগিতা করতে হবে।

একদিন আমাদের নিয়ে যাওয়া হল আরেকটা ছোট অডিটোরিয়ামে। সেখানে বাচ্চাদের অনুষ্ঠান হয় মনে হয়। স্টেজটা সেভাবেই সাজানো ছিল গাছপালা, পাখি, ফুল দিয়ে। এখানে ছোট ছোট বাচ্চারা তেলাওয়াত করল, আরবী হামদ-নাত শোনাল। এইদিন ইরানী গাইডদের সুপারভাইজার তার স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন। বড় দুই ছেলে পুরাই বাপের কপি-পেস্ট। আর ছোট মেয়েটা ভীষণ কিউট আর ঠিক একটা পুতুল। বয়স খুব বেশি হলে আড়াই কি তিন হবে। মিষ্টি গলায় পটর পটর করেই যাচ্ছে যার এক বর্ণও বুঝি না। বাসে উঠেই দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিল। ওর বাবা কি যেন বলতেই সে চিৎকার করে বলল, আই অ্যাম যাহরা। এই একটা ইংলিশই মনে হয় শিখেছে। আবার দেখি তার বাবা কি যেন বলল, আর সে সবাইকে টুক করে একটা ফ্লাইং কিস দিয়ে দিল। সবাই ওকে টিপে ভর্তা করে দিতে চাইল, কিন্তু সে কি আর সুযোগ দেয়? অডিটোরিয়ামে গিয়েও তার দৌড়াদৌড়ির কোন কমতি ছিল না। স্টেজে উঠে হার্ডবোর্ডের গাছ-ফুল নিয়ে টানাটানি করে দেখছিল সেগুলো কতটা মজবুত।

আরেকদিন একটা ডিনারের দাওয়াত ছিল সম্ভবত মেয়রের পক্ষ থেকে। একটা বিশাল হলে খাওয়া-দাওয়ার পর আরও বিশাল অডিটোরিয়ামে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্ররা, আর আমাদের বয়সী ইরানী ক্বারীরা তেলাওয়াত করে শোনাল, আরবী হামদ-নাত শোনাল। অনুষ্ঠানের মাঝখানে হঠাৎ দেখি অডিটোরিয়ামের বিশাল ছাদটা খুলে যাচ্ছে। হু হু করে ঠান্ডা বাতাস ঢোকা শুরু করল। সবাই শীতে কাঁপাকাঁপি শুরু করে দিতে আবার বন্ধ করে দেয়া হল ছাদ। এইদিন ফেরার সময় বাসে উঠে লদানকে আর খুঁজে পেলাম না। অথচ এমন কখনও হয় না যে রাতে সে আমাদের কাছ থেকে বিদায় না নিয়ে চলে গেছে। খালাম্মা বললেন যে বাসে ওঠার সময় তাকে কে যেন ডেকে নিয়ে গেল। খুব টেনশনে পড়ে গেলাম। ওর কোন নাম্বারও তো নেই আমাদের কাছে। পরদিন সকালে দেখা হতেই সে নিজেই আমাদের বলল, অনেক দুঃখিত কালকে হঠাৎ একটা জরুরী কাজ এসে পড়ায় আমি বিদায় নিতে পারিনি আপনাদের কাছ থেকে। কিন্তু কী হয়েছিল সেটা আর বলতে চাইল না। পরে, অনেক বছর পরে জেনেছিলাম, ঐদিন তার মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

ঘোরাঘুরির গল্প তো দেখি বিশাল বড় হয়ে যাচ্ছে। এখনও তো আরও বাকী আছে। আরেক পর্বে যাওয়াই লাগবে।


চলবে....................






]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29495484 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29495484 2011-12-03 16:00:53
ইরানের দিনগুলো - ৪

ইরানের দিনগুলো - ১
ইরানের দিনগুলো - ২
ইরানের দিনগুলো - ৩


পরদিন সকালে উঠে তৈরী হয়ে নাস্তা করতে গেলাম। নাস্তার টেবিলে আমাদের জানিয়ে দেয়া হল আমাদেরকে নিয়ে এখন পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া হবে। তাই আমরা যেন অবশ্যই বেশি করে গরম কাপড় পরে নিই, বা সাথে নিয়ে নিই। আমরা রুমে এসে প্রত্যেকে মোটা সোয়েটার পরে নিলাম। এদিকে আমাদের সাথের যে প্রতিযোগী শেষ মুহূর্তে এসেছিল ছেঁড়া স্যান্ডেল আর প্রায় একবস্ত্রে, তাকে ইরানে এসে প্রথম রাতেই এক জোড়া ভালো জুতা কিনে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু গরম কাপড় বলতে তেমন কিছু কেনা হয়নি। তার একটা পাতলা সোয়েটার ছিল, সেটাই পরে নিল। ঐ সময় ওতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করছিল সে। উল্টো আমরাই মোটা সোয়েটার পরে ঘামছিলাম।

বাসে করে আমরা সবাই রওনা দিলাম। আস্তে আস্তে পাহাড়ী এলাকার দিকে যেতে থাকল বাস। পাহাড়ের ঢালে সারি সারি বাড়িঘর দেখছিলাম, আর ভাবছিলাম, এত হিসাব করে বাড়ি বানাল কিভাবে? দেয়াল একদিকে বড়, একদিকে ছোট, কিন্তু কোন হিসাবে কোন গড়মিল নাই। এদিকে রাস্তা যতই উঁচুতে উঠছে, ঠান্ডা ততই বাড়ছে। আমার মোটা সোয়েটারে তখন খুব আরাম বোধ হল।

এক জায়গায় এসে বাস থামল। সেটা একটা ছোট পাহাড়। নেমে দেখি চারপাশে শুধু বড় বড় পাহাড় আর পাহাড়। আরও অনেকেই ঘুরতে এসেছে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে। আমরা হেঁটে হেঁটে গেলাম একটা কাউন্টারে। ওখান থেকে টিকেট কেটে নিয়ে উঠলাম টেলিকেবিনে। এইবার শুরু হল আসল যাত্রা। ছোট পাহাড়টা থেকে টেলিকেবিনে করে দুলতে দুলতে আরেকটা উঁচু পাহাড়ে রওনা দিলাম। চারপাশে আর নীচের দৃশ্য দেখে আর কুলাতে পারছিলাম না। আনন্দে দাঁত তো সবগুলোই বের হয়ে ছিল। লদান আমাকে জিজ্ঞেস করল, ভয় পাচ্ছ না কি? অবশ্য তুমি এতে ভয় পাওয়ার মানুষ না। কিসের ভয়, আমি পারলে আনন্দে নাচি। আমার রুমমেট একটু ভয় পেয়েছে মনে হল। নিচের দিকে কয়েকটা পাহাড়ের গায়ে কিছু লেখা দেখলাম ফারসিতে। ঐখানে কে গেল আর কিভাবে গেল সেটাই বুঝলাম না।

মেঘের মধ্যে দিয়ে মজার এই টেলিকেবিন ভ্রমণ করে আমরা পৌঁছে গেলাম দূরের একটা উঁচু পাহাড়ে। সেখানে নেমে দেখি একটা সুন্দর মোটামুটি বড় রেস্টুরেন্ট। পুরোটা পাথরের দেয়ালে করা। আর কাঠের গুড়ির থাম। ওখানে সবাই চা-নাস্তা করতে বসলাম। খাব কি, আমি তো রেস্টুরেন্টের সৌন্দর্য্য দেখতেই ব্যস্ত। হঠাৎ চোখে পড়ল আমাদের বেচারা সহপ্রতিযোগীর দিকে। সে ঠান্ডায় কুঁকড়ে এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। ওর জন্য আসলেই খুব কষ্ট হয়ে গিয়েছে। শাহরম এগিয়ে এল ওকে রক্ষা করার জন্য। নিজের গায়ের সবুজ কোটটা তাকে পরিয়ে দিল। বেচারা খুব লজ্জা পাচ্ছিল, কিন্তু আরামটাও অস্বীকার করতে পারছিল না। ওখান থেকে ফিরে আসার পর তার প্রথম কাজ ছিল গরম কাপড় কেনা। এরপর যতদিন ইরানে ছিলাম, বেচারাকে আর কখনই মোটা সোয়েটার ছাড়া দেখিনি।

এখানে আসার সময় টেলিকেবিনে আমরা তিন রুমমেট আর লদান ছাড়াও শ্রীলংকার প্রতিযোগীরা ছিল। ফেরার সময় আমরা বাংলাদেশীরা সবাই এক টেলিকেবিনে উঠলাম, আমাদের গাইডসহ। ডিজি স্যার বললেন, যাওয়ার সময় যে টেলিকেবিনে উঠেছিলাম, ঐটার সামনের কাঁচ ভাঙা ছিল, কনকনে ঠান্ডা বাতাসটা সরাসরি বুকে এসে লেগেছে, এখন মনে হচ্ছে ঠান্ডা লেগে যাবে। আসলেই ঐ দিন বিকাল থেকে ডিজি স্যারের গলা এমনভাবে বসে গেল যে দুই দিন ঠিকমত কথাই বলতে পারলেন না।

যা হোক, সুন্দর একটা স্মৃতি নিয়ে ফিরলাম টিচার্স ক্লাবে। এখানে লাঞ্চ করে নিয়ে রুমে এসে গোসল করে একটু বিশ্রাম নিয়েই আবার তৈরী হয়ে নিলাম। আজকে আমাদের নিয়ে যাবে আমাদের প্রতিযোগিতার স্থানে। আজকে হবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সব সময়ের মত সবার আগে বাসে গিয়ে উঠলাম। একটা বড় অডিটোরিয়ামে নিয়ে যাওয়া হল। জাঁকজমক করে সাজানো হয়েছে পুরো অডিটোরিয়াম আর স্টেজ। একে একে অতিথিরাও এলেন। শুরু হল অনুষ্ঠান। একজন অনুবাদক প্রতিটি ঘোষণাই ইংরেজীতে অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন। এক সময় পর্দা সরে গেল স্টেজের, দেখা গেল স্টেজের মাঝখানে একটা ছোট বেদীর মত করে স্টেজ বানানো হয়েছে, ওখানেই বসে প্রতিযোগীরা কুরআন তেলাওয়াত করবে। একটা কাঠের রেহেল রাখা আছে, কিন্তু কুরআন শরীফ নেই। হঠাৎ দেখা গেল উপর থেকে নেমে আসছে একটা কুরআন শরীফ, চিকন তার দিয়ে ঝোলানো। ব্যাকগ্রাউন্ডে তেলাওয়াত চলছিল তখন। কুরআন শরীফটা আস্তে করে নেমে এসে রেহেলে বসে গেল। একজন ৮-৯ বছরের ছেলে গিয়ে সেই স্টেজে বসল। সুন্দর সুরে সবাইকে মুগ্ধ করে দিয়ে সে তেলাওয়াত করল।

এরপর শুরু হল একে একে সব অতিথিদের ভাষণ। কেউ ফারসি, কেউ আরবীতে দিলেন বক্তব্য। এই সময় আমাদের সবাইকে হেডফোনসহ রেডিও দিয়ে দেয়া হল যেখানে একেক চ্যানেলে একেক ভাষায় অনুবাদ করে দেয়া হচ্ছিল তাদের বক্তব্য। এই ব্যাপারটা অবশ্য আমি প্রথমে বুঝতেই পারিনি। এখন আমাকে রেডিও কেন শুনতে হবে সেটাই ভাবছিলাম। পরে লদানের মত আরেকজন গাইড আমাকে বলল, চ্যানেল ফোর দাও, ওখানে ইংরেজীতে অনুবাদ করছে। তারপর বুঝলাম কাহিনী। কিন্তু আমার আবার বক্তৃতা শুনলে ঘুম আসে। কিছুক্ষণ শুনে রেডিও বন্ধ করে আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে অডিটোরিয়ামটা দেখতে থাকলাম।

একটু পর সব প্রতিযোগীকে ডাকা হল। লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে দিল। আর সব দেশ থেকে একজনের হাতে যার যার দেশের নামের প্ল্যাকার্ড ধরিয়ে দেয়া হল। এরপর একে একে দেশের নাম ঘোষণা করা হল আর আমরা স্টেজে গিয়ে প্ল্যাকার্ডসহ দাঁড়ালাম। এই ব্যাপারটা খুব পছন্দ হল, একটা অলিম্পিক অলিম্পিক ভাব। তবে দেখলাম বেশ কিছু প্ল্যাকার্ড অব্যবহৃত পড়ে রইল, ওসব দেশ থেকে প্রতিযোগী আসার কথা থাকলেও তারা আসেনি বা আসতে পারেনি।

যা হোক, গ্ল্যাডিওলাস ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়া হল আমাদের। ইরানে আসার সময় আম্মা আমাকে একটা সোনার ব্রেসলেট দিয়েছিলেন সব সময় পরে থাকার জন্য। ফুল নিয়ে সিটে এসে বসার সময় এক ইরানী ভদ্রমহিলা সেটা দেখে ধরে কি জানি বললেন ফারসিতে, আমি কিছু না বুঝে বোকার হাসি দিলাম শুধু।

মূল অনুষ্ঠান শেষে শুরু হল ফটোসেশন। বিভিন্ন গ্রুপ ফটো তোলা হচ্ছিল। এক মহিলা সাংবাদিকের সাথে পরিচয় হল। মহিলা না বলে মেয়েই বলি, একেবারেই কমবয়স। আর ওরা যে সবাই এত সুন্দর কেন? এই মেয়েটা আমাকে দেখেই এত বেশি উচ্ছলতা প্রকাশ করা শুরু করল, কেন জানি না। সে আবার ইংরেজী ভালো জানে না। আমাকে দেখলেই হাসি দিয়ে হড়বড় করে ফারসিতে কি কি জানি বলা শুরু করে, একবার হাত ধরে টানে, একবার গাল টিপে দেয়, একবার থুতনি নেড়ে দেয়, আজব যন্ত্রণা। আমি কি ছোট বাবু?

একবার তো একটা গ্রুপ ফটো তোলা হচ্ছে, ঐ সাংবাদিক মেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এসে আমার হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে দিল। পরে দেখি ফটোগ্রাফার ছবি তুলতে গিয়েও থেমে গিয়ে আমার দিকে ইশারা করে কী যেন বলল। আমি আশে পাশে তাকিয়ে দেখি ঐ গ্রুপে সবাই ছেলে। কী কান্ড, ছেলেদের গ্রুপে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। <img src=" style="border:0;" /> চুপচাপ সরে এলাম ওখান থেকে।

যা হোক, ছবি তোলাতুলি শেষ হলে আমরা আবার ফিরে এলাম বাসস্থানে। ডিনারের পর আবারও ডাক পড়ল আমাদের। ক্লাবের একটা ছোট রুমে সবাই একত্র হলাম। রুমের মেঝেতে পুরোটাই কার্পেটিং করা, সবাই কার্পেটে বসলাম। আগামীকাল থেকে প্রতিযোগিতা শুরু হবে। কয়েকদিন ধরে চলবে। এখন প্রতি রাতে লটারী করে ঠিক করা হবে যে পরদিন কোন কোন দেশের প্রতিযোগী পারফর্ম করবে। সেই লটারী করতেই সবার এখন একত্র হওয়া। লটারীর নাম তোলার জন্য ছেলেদের থেকে একজন আর মেয়েদের থেকে একজনকে যেতে বলা হল।

যে ভয়টা পাচ্ছিলাম। হাজারবার না করা সত্ত্বেও মেয়েদের মধ্যে থেকে ঠেলে ঠুলে আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হল। লদানই এর জন্য সবচেয়ে দায়ী, ঐটাকে যে কী করতে ইচ্ছা করছে এখন। যা হোক, লটারীতে চারটা দেশের নাম তুলে দিলাম। ভাগ্য ভালো বাংলাদেশের নাম উঠাইনি। নইলে প্রথম দিনই আমার পড়া লাগত, আর আমি ভয়ে টেনশনে সব গুবলেট করে ফেলতাম। আগে প্রতিযোগিতায় অন্যদের পারফর্মেন্স দেখে নিলে মনে একটু সাহস আসবে, নিয়মটাও বোঝা যাবে। যে যে দেশের নাম উঠেছে, তাদেরকে আবার লটারীর মাধ্যমে কুরআনের আয়াত দেয়া হল যেগুলো তাদের প্রতিযোগিতায় তেলাওয়াত করতে হবে। আজকের রাতটাই তারা সময় পাবে প্র্যাকটিস করার।

যাক, প্রথম দিনের মত ওরাই টেনশন নিয়ে প্র্যাকটিস করুক। আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাই।




চলবে...............


এরপরের ঘটনাগুলো আর দিনের ক্রমানুসারে লিখতে পারব না, অত মনে নেই। তাই এরপর শুধু একেকটা বিষয় নিয়ে লেখার চেষ্টা করব।



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29492868 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29492868 2011-11-29 16:10:50
ইরানের দিনগুলো - ৩ ইরানের দিনগুলো - ১
ইরানের দিনগুলো - ২


টিচার্স ক্লাবে ঢুকতেই আমাদের অভ্যর্থনা জানাল সুন্দরী ইরানী মেয়েরা। এরপর প্রতি দেশের মেয়েদের আর ছেলেদের জন্য আলাদা আলাদা গাইড পরিচিত হয়ে নিল। আমাদের গাইড যে মেয়েটি হল, লম্বা ছিপছিপে শরীরের তীক্ষ্ম চেহারা আর মিষ্টি হাসির একজন, তার নামটা প্রথমে আমরা ধরতে পারলাম না। খালাম্মা বারবার জিজ্ঞেস করে বললেন, কী নাম বললে? নাদিয়া? সে কয়েকবার বলার পরেও আমরা না বোঝায় সে হেসে বলল, আপনারা যেটা ইচ্ছা ডাকতে পারেন, নাদিয়া মনে হলে নাদিয়াই ডাকুন। যা হোক, পরে তার নামের ব্যাজ দেখে বুঝতে পেরেছিলাম, তার নাম লদান। আমাদেরকেও যার যার নামের ব্যাজ দেয়া হল, আর বলা হল যেন সব সময় ব্যাজ পরে থাকি, এমন কি খাওয়ার সময়ও। ওখানে আমাদের নাম আর দেশের নাম লেখা ছিল।

লদান আমাদের রুমে পৌঁছে দিয়ে বলল, আপনার ফ্রেশ হোন, আমি একটু পর এসে লাঞ্চ করতে নিয়ে যাব। লদানের এত শক্তি, আমার বিশাল স্যুটকেসটা এক হাতে তুলে নিয়ে মেইন গেট থেকে রুম পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল। আমি তো ওটা দুই হাতে টানি, তাও আবার চাকার উপর ভর করে। আমার স্যুটকেসটাই সবচেয়ে বড় ছিল। ডিজি স্যার দেখে বলেছিলেন, তুমিই ভালো করেছ, বেশি করে কাপড়-চোপড় নিয়ে এসেছ, তোমার আর সমস্যা হবে না। আসলে অন্যরা এক সপ্তাহের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল, আর আমাকে দুই সপ্তাহের কাপড় গুছিয়ে দেয়া হয়েছিল।

আমাদের এই রুমটা আমার খুব পছন্দ হল। বিশাল রুম। দরজার পাশে একটা সিঙ্গেল বেড, এরপর অনেকখানি জায়গা, সেখানে সোফা, টেবিল সাজানো। ছোটখাট একটা ড্রয়িংরুমই বলা যায়। আরেক কোণায় একটা ডাবল বেড। সেটা এমনভাবে বসানো যে হঠাৎ কেউ রুমে আসলে ঐ বেডটা দেখা যাবে না। রুমের একপাশে পুরোটা দেয়াল জুড়ে উপর থেকে নীচ পর্যন্ত কাঁচের জানালা। সেখান থেকে পিছনের বাগানের অর্ধেকটাই দেখা যায়। বাগানের ঐ পাশে দেখলাম আরেকটা একতলা দালান।

আমরা গোসল করে তৈরী হয়ে নিলাম সবাই। লাঞ্চের সময় হতেই লদান চলে এল। আমাদের নিয়ে গেল বাগানের পিছনের সেই একতলা দালানে। দেখলাম সেটার পুরোটাই বিশাল ডাইনিং হল। বেসমেন্টে কিচেন। যেতে যেতে খালাম্মা সময় জেনে নিলেন। হিসাব করে দেখলাম বাংলাদেশের সময় থেকে আড়াই ঘন্টা পিছনে। সবাই যার যার ঘড়ির সময় পাল্টে নিল। আমি বাংলাদেশের সময়টাই রাখলাম। মনে মনে আড়াই ঘন্টা মাইনাস করে নিলেই তো হল।

ডাইনিং হলে অন্য দেশের প্রতিযোগীদের সাথে পরিচিত হলাম। নাম মনে রাখতে পারছিলাম না কারুরই। সেটা অবশ্য সবারই সমস্যা হচ্ছিল। সবাই তাই দেশের নামটাই জানতে চাইছিলাম। নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার অনুভূতিটা এই প্রথম বুঝতে পারলাম। দেশের নামের সাথে সাথে সবাই আরেকটা তথ্য জানতে চায়, বয়স। কেন জানি বয়স বলতে লজ্জা লাগছিল। প্রতিযোগিতাটা ছিল ১২ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত। বেশির ভাগ প্রতিযোগীই ছিল ১৬-১৭ বছরের। কয়েকজনকে আরেকটু বড়ও মনে হচ্ছিল। শুধুমাত্র পাকিস্তানের হাফিজা মেয়েটা ছিল ১২ বছরের, সর্বকনিষ্ঠ প্রতিযোগী। আর তারপরই আমরা বাংলাদেশের দুই মেয়ে, দুজনেই সাড়ে তের বছরের। মনে হল পিচ্চি বলে সবাই একটু আদর আদর ভাব দেখাচ্ছিল। বিশেষ করে অন্য দেশের সুপারভাইজাররা।

তবে ব্যাপারটা একেবারে খারাপও লাগেনি। সবচেয়ে ভালো লেগেছিল শ্রীলংকার সুপারভাইজারকে। তিনি খুব আন্তরিকভাবে কথা বলতেন। মালয়েশিয়ার ক্বারীয়ার সাথে সুপারভাইজার হিসেবে তার মা এসেছিলেন। উনি অবশ্য চুপচাপ থাকতেন, তার মেয়েটা মিশুক ছিল। দেখা হলেই টুকটাক কথা বলত, বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চাইত। তবে অনেকেই ছিল যারা ইংরেজী জানত না বলে কথাবার্তা হত না, কিন্তু দেখা হলে মিষ্টি একটা হাসি দিত। ইরানী প্রতিযোগীদের তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল স্পোকেন ইংলিশের উপর, শুধুমাত্র এই প্রতিযোগিতায় সবার সাথে কথাবার্তা বলার জন্য। এছাড়া আমাদের গাইড তো ছিলই, যে কোন সময় অনুবাদকের কাজ করার জন্য। ইরানের প্রতিযোগীর সংখ্যা বেশি ছিল। প্রতি বিষয়ে একজন করে প্রতিযোগী ছাড়াও দুইজন করে ব্যাক-আপ প্রতিযোগী ছিল, কোন কারণে একজন অংশ নিতে না পারলে ব্যাক-আপ চলে আসবে মাঠে। আর প্রত্যেকের সাথে তাদের গার্জিয়ানও ছিল। তাই আমরা যখন একসাথে কোথাও যেতাম, আমাদের বাহিনীতে প্রায় অর্ধেকটাই থাকত ইরানীরা।

বিকালে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল একটা পার্কে। পার্কটার নাম মনে নেই। শুধু মনে আছে খুব সুন্দর ছিল। ছোট ছোট লেকের মত ছিল, তার মাঝে কৃত্রিম ফোয়ারা। আর জানা-অজানা নানান ফুলের গাছ তো ছিলই। তবে এই পার্কের দর্শনীয় জিনিসটা ছিল আন্ডারগ্রাউন্ডে। সেখানে একটা অ্যাকুইরিয়ামের মিউজিয়াম ছিল। একেকটা ঘরে বিশাল বিশাল সব অ্যাকুইরিয়াম, আর সেখানে নাম না জানা সব মাছ। মাছের নামগুলো যদিও লেখা ছিল, কিন্তু অত কঠিন কঠিন নাম কেই বা মনে রাখে। আমরা ঘুরে ঘুরে সব মাছ দেখলাম। এখানে আবার ছবি তোলা নিষেধ। আমার কাছে অবশ্য ক্যামেরা ছিলও না। একটা মাছ দেখে সবাই খুব ভড়কে গিয়েছিল, সাপের মত দেখতে, সবার দিকে রাগী রাগী চোখে তাকিয়ে গজ গজ করছিল। আসলে গজ গজ তো করছিল না, গোল্ডফিশের মত করে মুখ খুলছিল আর বন্ধ করছিল (শুধু তার মুখটা ছিল লম্বাটে), কিন্তু তার রাগী চোখ দেখে মনে হচ্ছিল যে আমাদের বকা দিচ্ছে।

মাছের রাজ্য দেখা শেষ হলে আমরা পার্কে সবাই মিলে ফটোসেশন করলাম। আজকে অবশ্য প্রফেশনার ফটোগ্রাফার ছিল না, তাদেরকে পেয়েছিলাম পরদিন থেকে। যারা শেষ সময় পর্যন্ত আমাদের বিভিন্ন সময়ের ছবি তুলে গিয়েছে। তারপর সেগুলো দিয়ে কী করেছে পরে বলব।

আমাদের ডিজি স্যার তখন ফারসি শিখতে ব্যস্ত। শাহরম খুব আগ্রহ নিয়ে স্যারকে ফারসি শব্দ শেখাতে থাকল। একসাথে এত শব্দ শুনে কিছুই মনে রাখতে পারছিলাম না। তাই চেষ্টাও করলাম না। কথায় কথায় স্যার লদান নামের অর্থ জানতে চাইলেন, কেউ ঠিকমত বলতে পারল না। একজন এর কাছাকাছি একটা শব্দ বের করে তার অর্থ জানাল, সে করেনি। এটা নিশ্চয়ই কারুর নামের অর্থ হতে পারে না।

সন্ধ্যা পর্যন্ত পার্কে ঘুরাঘুরি করে আমরা ফিরে এলাম আমাদের বাসস্থানে। একটু পরেই রাতের খাবারের ডাক পড়ল। ইরানের খাবার নিয়ে একটা আলাদা পর্বই দিতে হবে মনে হচ্ছে। যা হোক, এখন প্রথম রাতের খাবারের মেনুটা শুধু বলে রাখি। একটা আস্ত চিকেন রোস্ট প্রত্যেকের জন্য, যেটা আমরা কেউই শেষ করতে পারিনি।

আর পানি মানেই হল বরফ গলা ঠান্ডা পানি। এখানে নরমাল পানি কেউ খায় না। ভারী সমস্যা। পাকিস্তানের ক্বারীয়া দেখলাম কিছুক্ষণ নরমাল পানির জন্য এদিক ওদিক ডাকাডাকি করল, কিন্তু সুবিধা করতে না পেরে শেষে বলল, ঠিক আছে, এই পানিই রেখে দিই, একটু নরমাল হলে খাব। আমি দেখলাম এই পানি খেলে আমার গলা দিয়ে আর কোন আওয়াজই বের হবে না। তাই ড্রিংকস খাওয়াই ভালো, সেটা একটু কম ঠান্ডা। ড্রিংকস বলতে এখানে কোক, সেভেন আপ, পেপসি এগুলোর কিছুই দেখিনি। ইরানের ড্রিংকস হল জামজাম। (আমাদের দেশে মনে হয় এসেছিল কিছুদিন আগে।) এটাই খেতাম বাধ্য হয়ে। খালাম্মা মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে বলতেন, নাও শুরু কর আবে জমজম খাওয়া। রোজ দুইবেলা এই ড্রিংকস খাওয়ার একটা কুফলও ভোগ করেছিলাম পরে, সেই কাহিনী পরেই বলি।

ডিনারের পর আমরা যার যার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। অনেক ধকল গিয়েছে, এবার একটা শান্তির ঘুম দিতে হবে। পরের দিনটা কেমন যাবে সেটা চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লাম।


চলবে.............
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29491126 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29491126 2011-11-26 21:38:20
ইরানের দিনগুলো - ২
ইরানের দিনগুলো - ১


যাত্রাপথে কী কী হয়েছিল ডাইরীতে মোটামুটি লিখে রেখেছিলাম। কোন কাজ ছিল না, তাই একটু পর পর ডাইরী বের করি আর লিখি। এয়ার হোস্টেজ সবাইকে ড্রিংকস দিচ্ছিল। সামনের এক লোক কি জানি নিল, হার্ড ড্রিংকসই হবে। আমার কাছে এসে কী নিব জানতে চাইলে প্রথমে বোকার মত চা খেতে চাইলাম। জানাল যে চা দেয়া হবে লাঞ্চের পর, এখন চাইলে জুস খেতে পারি। কমলার জুস নিলাম আমার আর আমার সাথের প্রতিযোগিনীর জন্য। বরফ দিতে চাইলে মানা করে দিলাম। বরফ ছাড়াই যে ঠান্ডা, খেয়ে গলা খুসখুস শুরু হয়ে গিয়েছিল।

লাঞ্চের সময় খাবার দিতে এলে কেন যেন আরও বোকা হয়ে গিয়েছিলাম। চিকেন আমার প্রিয়, অথচ আমি নিলাম মাছ-ভাত। তাও যদি মজার রান্না হত। অর্ধেকও মনে হয় খেতে পারিনি। অবশ্য আমার আরেকজন সহ-প্রতিযোগী (মোটামুটি রাক্ষসের মতই খেতে পারে) আমার দুরবস্থা দেখে প্লেট খালি করতে সাহায্য করল। আমার খাওয়া কম হয়েছে এটা নিয়ে সমস্যা হয়নি। টেনশন আর উত্তেজনা সব মিলিয়ে ক্ষুধাবোধ টের পাচ্ছিলাম না। পাশের প্রতিযোগিনী (সে ক্বুরআনের হাফিজা) আমার চেয়েও বেশি উত্তেজিত। কিছুক্ষণ পর পর শুধু বলছিল, কী আজব! আমরা আকাশে উড়ে যাচ্ছি।

করাচী এয়ারপোর্টে কী যন্ত্রণার মধ্যে পড়েছিলাম সেটা ডাইরীতে লিখে রেখেছি। একটা অদ্ভূত ব্যাপার হল, অনেক কিছু মনে থাকলেও এই কষ্টটুকুর কথা এখন খুব একটা মনে পড়ছে না। অথচ ডাইরীর লেখা দেখে বুঝতে পারছি অসহ্য লাগছিল ঐ সময়। এরকমই হয়, যে কোন ভ্রমণের কষ্টের অংশটুকু ভুলে গিয়ে আনন্দটুকুই মনে থাকে। এই অংশটুকুর সাথে তাই আর কিছু যোগ করতে পারলাম না। যা হোক, সব কষ্ট আর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আমরা ইরানে রওনা দিলাম।

তেহরানে ল্যান্ড করার পর প্লেন থেকে নামার সময় আমাদের পাসপোর্ট বারবার চেক করা হচ্ছিল নিশ্চিত করতে যে আমরা সত্যি বাংলাদেশী নাকি ইন্ডিয়ান কিংবা আমরা ইন্ডিয়ায় ৬ দিনের কম সময় ছিলাম কিনা। এর কারণ ছিল ঐ সময় ইন্ডিয়ায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল আর সারা বিশ্বে এ নিয়ে আতংক ছড়িয়ে পড়েছিল।
এরপর আমাদের এয়ারপোর্টে রিসিভ করা, হোটেল মারমারে নিয়ে যাওয়া আর আমার টানা সাড়ে ঊনত্রিশ ঘন্টা জেগে থাকার কথা ডাইরীতে লিখেছি। এরপর কেন যেন আর ডাইরীটা নিয়ে বসা হয়নি। এখন মনে হচ্ছে লেখাটা চালিয়ে গেলে খুব ভালো হত।

এখন অনেক কিছুই মনে নেই। দেখি চেষ্টা করে কতটুকু লিখতে পারি। ডাইরীটা লেখা শেষ করে রেখে দিতেই খালাম্মা (সুপারভাইজার) বললেন, তুমি একটু শোও তো, একটুও ঘুমাওনি তুমি, অসুস্থ হয়ে পড়বে তো। আমি বললাম, আমার তো ঘুম আসছে না। খালাম্মা একরকম জোর করেই শুইয়ে দিলেন। আর আমি শুয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম। অবশ্য খুব বেশিক্ষণ ঘুমানো হয়নি। একটু পরেই আমাদের সকালের নাস্তার ডাক পড়ল। আমরা তৈরী হয়ে নেমে এলাম নীচে।

ডাবল ডিম পোচ আর ব্রেড, এই হল নাস্তার মেনু। তাও আবার খেতে হবে কাঁটা চামচ দিয়ে। আজব জ্বালা। পোচ ডিমের কুসুম কেমনে কাঁটা চামচ দিয়ে খায়? জানি না অন্যরা কিভাবে খেয়েছে, আমি শুধু সাদা অংশটুকুই খেলাম। আমার সেই খাদক সহ-প্রতিযোগী বড়ই আফসোসের দৃষ্টিতে আমার প্লেটের উজ্জ্বল কমলা দুইটা ডিমের কুসুমের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি তো কিছুই খেলে না।

নাস্তার টেবিলেই আমাদের সাথে পরিচিত হল সবুজ কোট পরা একজন ভদ্রলোক। ইনিই হবেন বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের গাইড। নাম শাহরম। তার চেহারাটা কেন যেন চেনা চেনা লাগছিল। পরে খালাম্মা (যিনি বয়স্ক হলেও ভীষণ রসিক ছিলেন) মনে করিয়ে দিলেন, আমাদের এই গাইডের চেহারা একটা ইংলিশ কমেডি সিরিয়ালের চরিত্রের মত, "পারফেক্ট স্ট্রেঞ্জারস"-এর বাল্কি। এরপর যখনই খালাম্মা শাহরমকে নিয়ে কিছু বলতেন, তাকে বাল্কি নামেই অভিহিত করতেন আর খিক খিক করে হাসতেন।

যা হোক, আমাদের ডিজি স্যারের সাথে শাহরমের খুব খাতির হয়ে গেল। সে খুব মাথা নেড়ে নেড়ে স্যারের সাথে গল্প জুড়ে দিল। এদিকে পাশের টেবিলে আরেকজন গাইড একটা কাজে শাহরমকে ডাকছিল "অ্যায় অ্যায়" করে। কিন্তু শাহরম তখন গল্পে এতই মশগুল যে কোনদিকে মনোযোগ নেই। সেই গাইড একটু বিরক্ত হয়ে চড়া গলায় স্পষ্ট স্বরে ডেকে উঠল, "শাহরম!" এত জোরে নিজের নাম শুনে সে আক্ষরিক অর্থে লাফ দিয়ে উঠে জবাব দিল।

মনে করেছিলাম এই হোটেলই হবে আমাদের আগামী দশদিনের বাসস্থান। কিন্তু নাস্তা শেষে আমাদের আবার লাগেজ গুছিয়ে নিতে বলা হল। আমাদের থাকার জায়গা এখানে না, এখন নিয়ে যাওয়া হবে নির্ধারিত জায়গায়। আবারও সব গুছিয়ে নিয়ে বাসে উঠলাম। একটা ব্যাপার ছিল, বাসে ওঠার ব্যাপারে আমরা দুই পিচ্চি খুবই তৎপর থাকতাম সবার আগে ওঠার জন্য। সবচেয়ে ভালো সিটটা দখল করাই উদ্দেশ্য, এতে মোটামুটি সফলই ছিলাম।

বাসে যেতে যেতে রাস্তার দুই পাশের দৃশ্য গোগ্রাসে গিলতে থাকলাম। প্রথমবারের মত ফ্লাই-ওভার দেখে পুরাই মুগ্ধ। এখানে কাপড়ের দোকানগুলো ভারী আকর্ষণীয়। বড় কাঁচের দেয়ালের ঐপাশে ভীষন সুন্দর বিয়ের সাদা পোষাকগুলো সাজানো। একটা দোকানের নাম পড়ার চেষ্টা করলাম, ফারসি তো পড়তে পারি না, তবে দেখে আন্দাজ করলাম, নামটা ছিল "পোশাক"। শাহরম তো এদিকে মোটামুটি তার গল্প চালিয়েই যাচ্ছে। আমিও একটু মনোযোগ দিয়ে শুনতে চাইলাম কী বলছে। শুনলাম সে একটা বড় ক্যাম্পাস দেখিয়ে বলল, এটা উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। একটা চৌরাস্তার সিগনালে বাস থামার পর সে বলল, সামনে দিয়ে যে রাস্তাটা গিয়েছে, এটা ইরানের সবচেয়ে দীর্ঘ রাস্তা।

রাস্তায় অনেক যানবাহন থাকলেও ট্রাফিক জ্যাম তেমন একটা ছিল না। অবশেষে শহরের কোলাহল ছেড়ে আমরা একটু নিরিবিলি এলাকায় ঢুকলাম। দেখলাম একপাশে উঁচু দেয়াল ঘেরা একটা বিশাল এলাকা। একটু খেয়াল করে দেখে মনে হল সম্ভবত সেটা ক্যান্টনমেন্ট এলাকা, দেয়াল ঘেঁষে একটু পর পর ওয়াচ টাওয়ার আছে, আর প্রতিটায় একজন করে সৈন্য পাহাড়া দিচ্ছে। রাস্তার অন্যদিকে একটা বাগান ঘেরা দালান, দুই বা তিনতলা ছিল, এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। এটাই আমাদের থাকার জায়গা। প্রথমে হোটেল মনে করলেও পরে জেনেছি এটা ছিল টিচার্স ক্লাব। শিক্ষক সম্মেলনের সময় এখানে সারা দেশ থেকে শিক্ষকরা এসে থাকেন। এর নাম হল, "বাসগাহে ফারহানদিয়ান"। আমাদের সবার হাতে এই জায়গার ম্যাপসহ ঠিকানা লেখা একটা গোলাপী রঙের কার্ড দেয়া হয়েছিল যাতে কখনও কোথাও হারিয়ে গেলে কাউকে এই কার্ড দেখিয়ে এই জায়গায় ফিরে আসতে পারি।



চলবে..............




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29485222 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29485222 2011-11-17 18:26:46
ইরানের দিনগুলো - ১ মেজপা আমার পিচ্চিকালের লেখাটা ছয় পর্বে ভাগ করে ব্লগে দিয়ে দিল, তাও আবার আমাকে না জানিয়েই। যা হোক, আমি না হয় আমার মত করেই আবার লিখি (যদিও ঐ লেখাটুকুও আমারই)। সতের বছর আগের কথা। ঠিকমত সবকিছু মনেও নেই। ঘটনা কিছু আগে-পরে হয়েই যাবে। তারপরও দেখি চেষ্টা করে কতটুকু পারি।

ক্লাস নাইনে পড়ি তখন। আরও ছোটবেলা থেকে, ক্লাস ফোর-ফাইভে থাকতেই ক্বেরাত শেখা শুরু করেছিলাম। নানান প্রতিযোগিতায় অংশও নিতাম তখন থেকেই। মনে করেছিলাম এটাও বুঝি অমনই একটা প্রতিযোগিতা, আম্মা যখন বললেন এর জন্য প্রস্তুতি নিতে। কিন্তু ঠিক আগের রাতে জানতে পেরেছিলাম যে এটা আসলে একটা বাছাই পর্ব, যেখানে নির্বাচিত হলে মূল প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার সুযোগ হবে যেটা অনুষ্ঠিত হবে ইরানে। ভয়ে সারারাত মনে হয় ঠিকমত ঘুমাতেও পারিনি। তারপর কিভাবে কিভাবে প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হয়ে গেলাম সেই গল্প ডায়রীতে লিখেছি।

এরপর চলতে থাকল প্রস্তুতি। তার গল্পও কিছুটা ডায়রীতে এসেছে। সে সময় আম্মা মোটামুটি দৌড়ের উপর রাখতেন। ক্বেরাত প্র্যাকটিস করতে বসাতেন জোর করে। আমার মত অলস মানুষের পিছনে লেগে না থাকলে তো চলবে না। মেজপা বলত, আমি এতদিন ভাবতাম বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা প্র্যাকটিসের এত সুযোগ পেয়েও কেন দেশের বাইরে গিয়ে খারাপ খেলে? এখন সামনা-সামনি দেখে বুঝতে পারছি, ওরাও এইরকম আলসেমীই করে নিশ্চয়ই। এমন কি ছোট ভাইটাও ঐ সময় আমাকে শাসন করত। মাত্র ক্লাস টু-তে পড়ত, আমাকে বকা দিয়ে বলত, এই তুমি বসে বসে সময় নষ্ট করছ কেন? যাও ভিসিআর দেখ। আমরা শুনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি। ভিসিআরের কাহিনী হল, ক্বেরাতের কিছু অডিও আর ভিডিও ক্যাসেট ছিল, ওগুলো শুনে শুনে প্র্যাকটিস করতাম। ছোট ভাই সেটাই বুঝাতে চাইছিল।

টুকটাক প্রস্তুতি নিয়ে রাখছিলাম, যদিও ফ্লাইটের তারিখটা নিশ্চিতভাবে জানা ছিল না। বিশেষ করে মেজপা আমার লাগেজ একটু একটু করে গুছিয়ে রাখছিল আগে থেকেই। বড়পা একদিন শপিং-এ নিয়ে গেল টুথব্রাশ, মিনি সাইজের টুথপেস্ট, শ্যাম্পু, তেল, সাবান আর টুকটাক জিনিসপত্র কিনে দিতে। পুরো সময়টাই আমি এত টেনশনের মধ্যে থাকতাম যে নিউমার্কেটের শুকনো খটখটে রাস্তায়ও কিভাবে যেন দুই পা ছড়িয়ে ধপাস করে পড়ে গিয়েছিলাম। :`>

এর মধ্যে একদিন আম্মা ব্যাংকের কিছু কাজ করতে আমাকে সাথে নিয়ে গেলেন। ওখান থেকে ফিরে এসে শুনি ইসলামী ফাউন্ডেশন থেকে ফোন এসেছিল, আগামীকাল সকাল এগারটায় ফ্লাইট। আমার মাথা ঘুরাতে থাকল। মেজপা আমাকে শান্ত করে বসিয়ে বলল, এত টেনশনের কিছুই নেই। আমি তোমার লাগেজ গুছিয়ে দিচ্ছি, তুমি শুধু দেখে নাও কোথায় কী রাখলাম। সব কাপড় ইস্ত্রী করে ঢুকিয়ে টুকটাক জিনিসগুলো কোথায় কী রাখল সব আমাকে দেখিয়ে দিল মেজপা। আমি টেনশনে কোন কথাই বলতে পারছিলাম না, খালি হুঁ হুঁ করে গেলাম।

রাতে যখন সব ভাই-বোন একসাথে বসে গোছ-গাছের ফিনিশিং টাচ চালাচ্ছি, আব্বা সে সময় ছোট ভাইকে পাশের ঘর থেকে ডাক দিলেন। কিন্তু ছোট ভাইয়ের তখন আমাদের ছেড়ে এক মুহূর্তও কোথায় যেতে ইচ্ছা করছিল না। একটু পর ছোট বোন ওকে বলল, আব্বা না তোমাকে ডেকেছেন? যাও শুনে আসো, নাইলে দেখবা যে কালকে আপুনিকে এয়ারপোর্টে নিয়ে যাওয়ার সময় তোমাকে সাথে নিবে না। ছোট ভাই ভেবে দেখল আসলেই তো সেরকম হতে পারে। কিন্তু আব্বা ডেকেছেন বেশ কিছুক্ষণ পার হয়ে গিয়েছে। সে দৌড়ে পাশের ঘরে যেতে যেতে বলল, কী হইছিল আব্বা?

সেই রাতে খুব একটা ঘুমাতে পেরেছিলাম কি না ঠিক মনে নেই। তবে খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তৈরী হয়ে পুরো পরিবারসহ রওনা দিলাম ইসলামী ফাউন্ডেশনে, সেখান থেকে সব প্রতিযোগী আর সুপারভাইজাররা একসাথে রওনা দিলাম এয়ারপোর্টে। কিন্তু সবাই এলেও একজন প্রতিযোগী তখনও এসে পৌঁছায়নি। তাকে বারবার ফোন দিয়েও পাওয়া যাচ্ছিল না। সিনেমার মত এয়ারপোর্টে একেবারে শেষ মুহূর্তে সে দৌড়ে দৌড়ে ঢুকল একটা ছোট সাইডব্যাগ আর ছেঁড়া স্যান্ডেল পরে। আসলে ওর কাজিনরা ওর সাফল্যে এতই ঈর্ষান্বিত ছিল যে ফোন করে বারবার জানানো সত্ত্বেও খবরটা তার কাছে পৌঁছে দিচ্ছিল না। শেষ মুহূর্তে ফোনটা সে নিজে ধরে খবর পেয়ে সাথে সাথে এক কাপড়ে চলে এসেছে। যা হোক, তবু আসতে পেরেছে এতেই সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ভাগ্য ভালো যে আমাদের সবার পাসপোর্ট, ভিসাসহ অন্যান্য জরুরী কাগজপত্র আমাদের সুপারভাইজারের কাছেই ছিল।

আমরা রওনা দিলাম। আমি টেনশন তখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ডিপার্চার লাউঞ্জে ঢুকবার আগে সবাই পিছন ফিরে সবার আত্মীয়ের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। একমাত্র আমি কোনদিক না তাকিয়ে সোজা ঢুকে গেলাম। আমার মাথা কাজ করছিল না একদম। কিন্তু আমার এই আচরণে আমার বাসার সবাই যে কেমন কষ্ট পেয়েছিল সেটা পরে বুঝতে পেরেছি।


নাহ, আমি হাবিজাবি এত যে কেন লিখি। রাইসুল জুহালা ঠিকই মন্তব্য করেছিল।


চলবে..........]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29483828 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29483828 2011-11-15 17:51:54
পেটুক বড় বিলাইয়ের ঈদের খানাপিনা

ঈদ গিয়েছে সেই কবে। (অবশ্য টিভি চ্যানেলগুলোর ঈদ এখনও চলে।) এতদিনে আমি এলাম ঈদের গপ্প করতে। তাও আবার খানাপিনার। এবার ঈদটা একটু অন্যরকম হয়েছে আমার জন্য। সারা দিন-রাত হাসপাতালেই কেটেছে। তাই যা করার আগের দিনই করে রাখতে হয়েছে। মানে রান্নাবাটির কথা বলছিলাম আর কি। বাজার করার জন্যও খুব বেশি সময় পাইনি, ঈদের আগের দিন সকালে যতটুকু পেরেছি তা-ই সম্বল। সারা দুপুর-বিকাল-সন্ধ্যা ধরে রান্নাবাটি আর ঘর পরিষ্কার করলাম। এরপর বসলাম মেহেদী দিতে, যা না দিলে ঈদই হবে না আমার। কিন্তু এবার তো আমার ভাগ্নী নেই, তাই নিজেই হাবিজাবি একটা ডিজাইন করে নিলাম।




মেহেদীর রঙটা শুরুতে ভালোই ছিল। পরদিন হাসপাতালে বারবার হাত ধুতে ধুতে প্রায় অদৃশ্যই হয়ে গেল।





ঈদের দিন ভোরবেলা উঠেই ফিরনি তৈরী করে ফেললাম। আফসোস কিসমিস কিনতে পারিনি। তাই দেখতে একেবারেই সাদা-মাটা হয়েছে।




সাথে শাশুড়ীর পাঠানো লবুনি আর পাঁপড়ও ভেজে নিলাম।






দুপুরে হাসপাতালে যারা ডিউটিতে আছে তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হল। তাই দিয়ে চলল দুপুরের খাবার। মেনু ছিল পোলাও আর মুরগীর রোস্ট। সাথে একটু সালাদ করে নিয়েছিলাম। রাতে বাসায় ফিরে ফ্রিজ থেকে নিজের রান্না বের করলাম। আমার মেনুও আহামরি কিছু না।

প্রথমে ফ্রাইড রাইস। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন মরিচ বেশি দিয়ে ফেলেছি। যদিও ঝাল হয়নি একটুও।




তারপর আছে মিক্সড সবজি। এখানে মনে হয় মশলা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। যদিও কেউ অভিযোগ করেনি।




এর সাথে থাই চিকেন কারি। সুইট এন্ড সাওয়ার করার কথা ভেবেছিলাম, কিন্তু রান্নার সময় লেবুর রস দিতে ভুলে গিয়েছি। পরেও দেয়া যেত, কিন্তু আর দিলাম না। যা হয়েছে একেবারে খারাপ হয়নি।




পরদিন দুপুরে দাওয়াত ছিল বাড়িওয়ালার বাসায়। আইটেম বিফ তেহারী, ডেজার্টে মিষ্টি দই। বোনাস হিসেবে এক পিচ্চির জন্মদিনের কেকও খাওয়া হয়ে গিয়েছে।

বিকালে খালা আর এক ভাতিজী বেড়াতে এলে নাস্তা হিসেবে দিলাম বিফ হালিম।




খালা কিন্তু খালি হাতে আসেননি। সঙ্গে ছিল সেমাই-পায়েস, পোলাও-মাংস। এই দিয়ে চলল রাতের খাবার। পেট ততক্ষণে জানান দিয়ে দিয়েছে যে অনেক হয়েছে, এইবার থামো। কিন্তু তাই কি আর থামা হয়? যতই চাই যে ফ্রিজের পোলাও শেষ হয়ে যাক, বিভিন্ন উৎস থেকে খাবার-দাবার এসে আবার ভরে যায়। বহু কষ্টে কালকে সব শেষ করলাম, আজকেই আবার চলে এল আরেক দফা। আমার ঈদের খানা-পিনা আর শেষই হচ্ছে না। পেটটা এবার রাগ করে কাজই না বন্ধ করে দেয়।

সবচেয়ে বড় আফসোসটার কথাই বলা হল না। আমার নিজের দেয়া কুরবানীর মাংসই এখন পর্যন্ত চোখে দেখলাম না। ঐটা না খেলে কি আর কুরবানী ঈদের খানা-পিনা হয়?

সবাইকে ছেড়ে ঈদ করতে কেমন লেগেছে সেটা আর না-ই বললাম। কিন্তু যে বেচারা আমাকে সঙ্গ দেবার জন্য সবাইকে ছেড়ে ঈদের আগের রাতে চলে এসেছিল, ঈদের দিন তাকেই সঙ্গ দেবার কেউ ছিল না। সারাদিন একলা একলা বাসায় বসে আমার ব্লগ মুখস্থ করেছে। রাতে আমি বাসায় ফেরার পর বলে, বাকবাকুমের ডিউটি কেমন হল? <img src=" style="border:0;" /> ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29481869 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29481869 2011-11-12 16:05:54
ঘুরে এলাম মুজিবনগর - ২ আগের পর্ব


ঐ বিশাল মানচিত্রের চারপাশ ঘিরে রয়েছে প্রমাণ আকারের ভাস্কর্য। অবশ্য সবগুলো এখনও তৈরী করা শেষ হয়নি বলে জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়নি। তবে দূর থেকে দেখা যায়। ভাস্কর্যগুলো করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে।






মুক্তিযোদ্ধাদের চোখ হাত বেঁধে গুলি করে মারা হচ্ছে।




৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ।




পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নারী নির্যাতন।




আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম।




আমবাগানে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ।




এরপর আমবাগানের মধ্য দিয়ে রওনা দিলাম মেহেরপুর ঘুরে দেখতে।




রাস্তার দুই পাশই খুব সুন্দর।




বের হয়ে যাচ্ছি স্মৃতিসৌধের বিশাল চত্বর থেকে।




দূরে ভারত সীমান্ত।




ডোবার উপর ছায়া দিয়ে রাখা এই গাছটা নজর কেড়ে নিয়েছিল।




এই পর্যন্ত ভ্রমণকারীদের যেতে দেয়া হয়, এরপর আরও কিছুদূরে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত শুরু।




আর যেহেতু যাওয়া যাবেই না, উল্টো দিকে আবার রওনা দিলাম। রাস্তার মোড়ে মোড়ে নতুন ধান শুকানোর এই দৃশ্য চোখে পড়ল।




একটা গ্রেভইয়ার্ড আছে এখানে।




মাটির ঘর, টালির ছাদ, সেই ছাদে এক পায়রা দম্পতি বসে রোদ পোহাচ্ছিল। (ওদের অবশ্য খুব খেয়াল না করলে দেখা যায় না।)




একটা গীর্জাও আছে এখানে, তবে সেখানে ভ্রমণকারীদের প্রবেশ নিষেধ।




তারপরও আমরা একটুখানি ঢুকে ছবি তুলেছিলাম। এরপর একজন এসে অপমান করে বের করে দেয়ার আগেই মানে মানে কেটে পড়েছি।




এত ঘুরাঘুরি করলাম যে বাহনে, সেটা ছিল এই পাটি বিছানো ভ্যান।




বাঁশঝাড়টার ছবি তোলার মুহূর্তে একটা কুকুর দৌড় দিয়েছিল সামনে দিয়ে।




ফেরার পথে বিজিবি পরিচালিত একটা ছোট্ট ছিমছাম রেস্টুরেন্টে বসে চা খেয়েছিলাম যেটা ছিল এই পুকুরটার উপর কাঠের তৈরী একটা রেস্টুরেন্ট।




মোটামুটি দেখানোর মত ছবি এইটুকুই। আরও কিছু হাবিজাবি ছবি আছে, ওগুলো না দেখালেও চলবে।




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29477545 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29477545 2011-11-03 16:53:34
ঘুরে এলাম মুজিবনগর



বাংলাদেশের কত জায়গায় যে ঘুরতে যেতে ইচ্ছা করে, কিন্তু সুযোগটাই হয়ে ওঠে না। কিছু দিন আগে হঠাৎ করে সুযোগ এল মেহেরপুরের মুজিবনগরে ঘুরে আসার। সুযোগ পাওয়া মাত্র লুফে নিলাম। সেলফোনের ক্যামেরায় যা মনে ধরেছে তুলেছি। এইবার দেখাতে শুরু করি। শুধু উপরের ছবিটা গুগল মামুর কাছ থেকে নিয়েছি।


যাত্রা শুরু করেই সেলফোন হাতে নিয়ে ক্লিক করা শুরু করে দিয়েছিলাম। কিন্তু বাসের ঝাঁকুনিতে বেশির ভাগ ছবির দফা-রফা হয়ে গিয়েছে। কয়েকটা একটু কম ঝাপসা হয়েছে সেগুলোই দিলাম।

এইটা চুয়াডাঙ্গার একটা সেতু, নাম জানতাম না। রুদ্রপ্রতাপের কাছ থেকে জানলাম, এটা গড়াই নদীর ওপর গড়াই ব্রিজ।




আরেকটা চিপা গলির মত সেতু ছিল, ঐটায় বাস ওঠার সময় উল্টোদিক থেকে একটা ট্রাক আসছিল, তাই আমাদের বাসকে একটু দাঁড়াতে হয়েছিল। ঐ ফাঁকে খাল বা নদী যা-ই হোক সেটার ছবি তুলে নিয়েছিলাম।




রাস্তার দুই ধারে গাছের সারি এত সুন্দর ছিল যে ইচ্ছা করছিল পুরোটা রাস্তার ছবি তুলে নিই, কিন্তু ঝাঁকুনি খেতে খেতে আর হল না। এই ছবিটাই সবচেয়ে কম ঝাপসা। বাকীগুলোর অবস্থা আরও কেরোসিন।




পথে আট মুক্তিযোদ্ধার সমাধিস্থলে গিয়েছিলাম।




মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের বিরাট এলাকায় ঢুকতেই প্রথমে দেখা যায় সুন্দর একটা মসজিদ।




মসজিদের পাশে একটা শিশুপল্লী।





এখানে একটা বিশাল মানচিত্র আছে বাংলাদেশের। মানচিত্রের বিভিন্ন অংশে একাত্তরের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো ভাস্কর্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আমার সেলফোনের পিচ্চি ক্যামেরায় মানচিত্রের পুরোটা একসাথে ধরা খুব মুশকিল হয়ে গেল। তাই একেক প্রান্ত থেকে একটু একটু করে ছবি নিলাম।

এটা রাজশাহীর দিকের, পদ্মার ওপর হার্ডিঞ্জ সেতু, যেটা মুক্তিযোদ্ধারা উড়িয়ে দিয়েছিল। পাশেই রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মমভাবে গুলি করে মারার দৃশ্য। ঢাকার অংশে রয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ আরও কিছু উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা।




চট্টগ্রামের কোণ থেকে পুরো বাংলাদেশ একসাথে দেখার প্রচেষ্টা।




খুলনায় মংলা সমুদ্র বন্দর। পাশে দেয়ালের কাছে দাঁড়ানো মানুষগুলো দেখে আন্দাজ করা যায় মানচিত্রটা কত বড়।




সাগরের বুক থেকে পুরো মানচিত্র একসাথে দেখার জন্য একটা ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। সেটার সবচেয়ে উপরের উঠেও পুরোটার ছবি নিতে পারলাম না। চট্টগ্রামটা বাদ পড়েই যাচ্ছিল।




তাই চট্টগ্রামের ছবি আলাদা করেই নিয়ে নিলাম। এখানে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর দেখা যাচ্ছে, একটা জাহাজসহ।




এইবার ওয়াচ টাওয়ার থেকে চারপাশের ছবি নিতে থাকলাম।




এটা যেন কী ছিল, ভুলে গিয়েছি। মনে হয় বিজিবির একটা ক্যাম্প।





পাশে একটা আম বাগান। এই বাগানেই রয়েছে মূল স্মৃতিসৌধ। পরে সেই ছবি আসবে।




আশে-পাশের ক্ষেতগুলো কেমন যেন ন্যাড়া ন্যাড়া। অবশ্য হেমন্তে ফসল কেটে ফেলারই কথা।





ছবি বেশি হয়ে যাচ্ছে। পরের পর্বে আরও দিব।





]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29476987 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29476987 2011-11-02 16:49:51
ডাইরীর পাতা থেকে-২৭<img src="http://cdn.somewhereinblog.net/smileys/emot-slices_25.gif" width="23" height="22" alt=":P" style="border:0;" /><img src="http://cdn.somewhereinblog.net/smileys/emot-slices_25.gif" width="23" height="22" alt=":P" style="border:0;" /><img src="http://cdn.somewhereinblog.net/smileys/emot-slices_25.gif" width="23" height="22" alt=":P" style="border:0;" />
২২শে সেপ্টেম্বর, ২০০৩।

আমি আব্বার সাথে কোথায় যেন যাবার জন্য বের হয়েছি। রাস্তায় কয়েকবার মাইক্রোবায়োলজীর স্যারের সাথে দেখা হল। কিন্তু আমি স্যারকে দেখে এতই ভয় পেয়ে গেলাম যে দূর থেকেই পালিয়ে যাচ্ছিলাম। এরপর আমি কিভাবে যেন একা হয়ে গেলাম আর রাস্তা হারিয়ে ফেললাম। হঠাৎ দেখি একটা বিল্ডিং-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমি ঢুকে গেলাম সেখানে। সেটা একটা পুনর্বাসন কেন্দ্র ছিল।

একজন মহিলা আমাকে দেখে বলল, আপনি কি ঘুরে ঘুরে দেখতে চান? চলুন আপনাকে ঘুরিয়ে দেখাই। এরপর আমাকে দোতলায় নিয়ে গেল। সেখানে একটা ওয়ার্ডে নিয়ে গেল। কয়েকজন রোগী, ডাক্তার আর নার্স ছিল। সবাই মনে হল বেশ বিরক্ত। আমার আর ঘুরে দেখতে ইচ্ছা হল না। আমি বারান্দার সাথের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসলাম। পিছন থেকে মহিলাটা ডাকাডাকি করছিল। আমি মাথা নেড়ে চলে এলাম।

এরপর আমি ভাবতে থাকলাম কিভাবে বাসায় যাব। হাঁটতে হাঁটতে মনে হল একটা রেল স্টেশনের কাছে চলে এসেছি। কিন্তু স্টেশনে ঢুকবার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। দেখি এক দল মানুষ হুড়াহুড়ি করে কোথায় যেন যাচ্ছে। ওদের পিছন পিছন গেলাম। ওরা একটা বড় লোহার দরজা দিয়ে কোথায় যেন ঢুকে পড়ল। আমি ঢুকতে যাব দেখি দরজা লাগিয়ে দিচ্ছে। আমি বললাম, দাঁড়ান দাঁড়ান আমি ঢুকব। একটা লোক দরজা একটু ফাঁক করল। আমি ঢুকতে গিয়ে দেখি সেটা একটা সিনেমা হল। তাড়াতাড়ি বের হয়ে এলাম।

দেখি রাস্তার উল্টা দিকেই স্টেশনে ঢুকবার গেট। আমি ঢুকে পড়লাম। কিন্তু কোন কাউন্টার থেকে টিকেট নিব বুঝতে পারছিলাম না। হঠাৎ সবকিছু উধাও হয়ে গেল।

আমি দেখি কলেজে বসে আছি, আরও অনেকে বসে আছে বিভিন্ন ব্যাচের। সেই মাইক্রোবায়োলোজীর স্যার ক্লাস নিচ্ছেন। স্যার বললেন, একটা বাড়ির কাজ দিয়েছিলাম সবাই সেটা বের কর। আমি বাড়ির কাজ করিনি, ব্যাগ খুলে দেখলাম খাতাও আনিনি। অনেকেই দেখলাম আমার মত খাতা আনেনি। আবার অনেকে খাতা এনেছে কিন্তু বাড়ির কাজ করেনি। স্যার এটা দেখে খুব রাগ করলেন। অনেক ঝাড়ি দিলেন সবাইকে।

তারপর কি যেন বলতে থাকলেন। সবাই খাতা বের করে লিখতে থাকল। আমিও লেখার চেষ্টা করলাম কিন্তু বুঝতেই পারছিলাম না স্যার কী বলছেন। ভাবলাম পরে এক বান্ধবীর কাছ থেকে খাতা নিয়ে লিখে নিব। এরপর আরও দুজন স্যার এলেন, তাদেরকে চিনি না। মাইক্রোর স্যার এবার তাদের কাছে আমাদের নামে বলতে থাকলেন, এরা এত ফাঁকিবাজ হয়েছে, বাড়ীর কাজ দিয়েছি কেউ করেনি।

এরপর স্যার হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আর এই যে তুমি তোমার ভাবটা কমাও, রাস্তায় দেখা হলেও মুখ ঘুরিয়ে চলে যাও, বেশী ডাঁট দেখাও, না? আমার সাথে ওসব দেখিয়ে কোন লাভ হবে না.......... এভাবে আরও অনেকক্ষণ ধরে ঝাড়ি দিলেন। আমি ভয়ে কাঁপছিলাম। পাশের নতুন স্যারদের একজন আমাকে মাথা নেড়ে সান্ত্বনা দিতে থাকলেন। এরপর নতুন স্যারটা কথা ঘুরানোর জন্য জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা একজনও কি বাড়ীর কাজ করেনি?

মাইক্রোর স্যার বললেন, করেছে দুজন, একজন ফার্স্ট বয়, ভেরি গুড স্টুডেন্ট, আর একজন হল ঐ মেয়েটা। দেখি স্যার আমাদের ব্যাচের একটা মেয়েকে দেখাচ্ছেন। স্যার তাকে নিয়ে আরও বললেন, এই মেয়েটা যখন ফাঁকি দেয় চরম ফাঁকি দেয়, আবার যখন কিছু সিরিয়াসলি করে খুব ভালোমত করে।

এরপর ক্লাস শেষ হয়ে গেল। আমি বান্ধবীর কাছে ওর খাতা নিতে। কিন্তু দেখি এরই মধ্যে ওর খাতা নেয়ার জন্য লম্বা লাইন লেগে গিয়েছে। আমি আর চাইলাম না।

এরপর আর ঠিকমত মনে নেই।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29475023 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29475023 2011-10-30 15:18:32
তার নাম জানা নেই - ৫, ৬, ৭, ৮



তার নাম জানা নেই - ১
তার নাম জানা নেই - ২
তার নাম জানা নেই - ৩,৪


৫.

নাস্তা খেতে খেতে তোকুম হঠাৎ ফিক করে হেসে উঠল। মামা বলল,
--"কী রে জোবেদা, কী হল তোর?"
-"মামা, আজ স্বপ্নে দেখলাম কি জানেন? খুব ভোরে একটা একটানা -- উহ্ মাগো, গিছি গিছি, উহ্, জ্বলে গেল রেএএএএ।"

আম্মা বলল,
--"কী হল? কী হল?"
-"মনে হয় চিম -- মানে পিঁপড়া কামড়েছে।"
--"ডেটল লাগাতে হবে?"
-"না না, ঠিক আছে। লাগবে না।"

তোকুম এরপর আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমাকে ভস্ম করে দিতে চাইল। আমি ভস্ম হলাম না। হবই বা কেন? আমিই যে ওকে চিমটি কেটেছি তার কি কোন সাক্ষী-প্রমাণ আছে?


৬.

-"হতচ্ছাড়ী! চিমটি দিলি কেন?"

আমি নির্বিকার চিত্তে বিছানায় শুয়ে পেপার পড়তে থাকলাম।
-"কী হল? কথা কানে যায় না? ধাক্কা দিব নাকি জোরে একটা।"
--"ধাক্কা তো দিচ্ছিসই। থামলি কখন?"
-"তুই আমাকে চিমটি দিলি কেন?"
--"চিমটি? আমি? কই না তো। দিয়েছি না কি?"

তোকুম দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত হয়ে বসে পড়ল। আসলে মেয়েটা পাগলী হলেও আমাকে খুব পছন্দ করে। কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক থেকে বলল,
-"সবাই আমার থেকে কি যেন লুকাচ্ছে রে। আব্বু, আম্মু, আন্টি, মামা, দাদী। এমন কি তুইও।"
--"আমি তো তোকে বলেছিই, এখন কিছু বলব না।"
-"কেন রে? বল না।"
--"এটা একটা সারপ্রাইজ। বলা যাবে না এখন।"
-"ধুত্তোর ছাই।"

আমি আবার চিন্তায় ডুবে গেলাম। সুন্দর একটা প্ল্যান করতে হবে। কাজটা প্রথমে তো সহজই মনে হয়েছিল। এখন দেখছি তোকুম বাবাজী ফেলনা নয়। সস্তা ধরণের মিথ্যা বললে টের পেয়ে যাবে। কিন্তু দামী মিথ্যা পাই কোথায়? আমি যদি --
-"অ্যাই! কী হল তোর?" আমি চমকে উঠলাম।
--"অ্যাঁ! কী হল?"
-"শুনছিস না? আন্টি ডাকছে।"
--"ও। আসছি আম্মা। তুই এ ঘরেই বোস। আর জানালা খুলিস না। আমি শুনে আসছি।"
-"আচ্ছা।"

আম্মা রান্নাঘরে ছিল। আমি গিয়ে দাঁড়ালাম। আম্মা "শোন" বলে হাত নেড়ে কাছে ডাকল। কাছে যেতেই গলা নামিয়ে বলল, "নাস্তা খাওয়ার সময় তোকুম কী বলতে যাচ্ছিল রে, তুই যে থামিয়ে দিলি?"

এই রে! আম্মা বুঝে ফেলেছে। মামাও কি বুঝে ফেলেছে না কি। না, মামা বুঝবে না, পুরুষ জাতি তো। আম্মা তো আমাদের মতই নারী।
-"কী রে, কী ভাবছিস অত?"
--"অ্যাঁ! না মানে, কিছু না। মানে, তোমাকে বলব না। মানে, পরে বলব, এখন না।"
আম্মা দুষ্টুমি চোখে তাকিয়ে বলল, "আচ্ছা যা।"

আমি আমার ঘরে ঢুকে দেখি তোকুম আমার বেঞ্চে বসে বিড় বিড় করছে। পা টিপে টিপে ওর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। শুনি ও "তোকুম তোকুম" করছে। আচ্ছা, আমিও তো এরকম অন্যমনস্ক হয়ে বসেছিলাম, আর তোকুম বলেছিল আমি আন্ডা পাড়ছি। দাঁড়াও তোকুম বাবাজী, আমি এবার বদলা নিব। আস্তে করে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে চিৎকার করে বললাম,

হাট্টিমা টিম টিম তোকুম বেঞ্চে পাড়ে ডিম তাহার খাড়া দুটো শিং তোকুম হাট্টিমা টিম টিম

তোকুম চমকে উঠেই হতভম্ব হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।


৭.

ঠক, ঠক, ঠক।

আম্মা রান্নাঘরে কাজ করছে। তোকুম আমাকে ওর নতুন এক্সপেরিমেন্টগুলো বর্ণনা করছে। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছি। কিছুক্ষণ পর পর বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ছি আর প্রয়োজনমত পরামর্শও দিচ্ছি।

ঠক, ঠক। ঠক, ঠক, ঠক।

"দ্যাখতো, কে এল", আম্মা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল। আমি উঠলাম। দরজা খুলে দেখি দুইটা গাছ। তিনটা হবার কথা ছিল, আরেকটা কোথায় গেল? আমি যথাসম্ভব শান্ত ভাব এনে বললাম, "কী চাই?"

মোটা গাছটা বিশ্রীভাবে হেঁ হেঁ করে হেসে উঠল। বাবা গো, এসিড ছুঁড়ে মারবে না তো! ভয়ে আমার হার্টবিট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবুও চেহারায় বিরক্তি ফুটিয়ে বললাম, "কী ব্যাপার?"

বিশ্রী খ্যানখ্যানে গলায় জবাব এল, "আপনে গো একতলা বাড়া অইব নি? কয় রুম? বাড়া কত?"

রান্নাঘর থেকে এতক্ষণ শব্দ আসছিল, সেটা বন্ধ হয়ে গেল। আমি বললাম,
--"একতলা ভাড়া হয়ে গিয়েছে। আগামী মাসের শুরুতেই নতুন ভাড়াটিয়ে আসবে। এ্যাডভান্সও নেয়া হয়েছে। কাজেই--"
-"তাইলে যে দ্যাখলাম, টু-লেট ঝোলতাছে।"
--"ভুল করে নামানো হয়নি।"
-"অ। বুল কইরা নামান নাই। আপনে কইলে আমরাই নামায়া দেই।"
--"না। আপনার আর কষ্ট করতে হবে না। আমরাই নামিয়ে নিব।"

লোকটা, মানে সেই গাছটা অদ্ভূতভাবে ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল। আমি বললাম,
--"অবশ্য আপনারা যদি আমাদের কষ্ট লাঘব করতে একান্তই আগ্রহী হন, তাহলে নামাতে পারেন। আপত্তি নেই।"
-"হ হ। সেইটাই তো কইতেছি।"

তারপর গাছটা চিৎকার করে বলল, "ঐ ক্যাবলা! টু-লেটটা নামা। বালা কইরা নামাবি। যাতে চিহ্ন থাহে।"

লোকটার মতলব কী? দরজা ভাঙবে না কি? নিচ থেকে সম্ভবত মেইন গেটের কাছ থেকে আরেকটা চিৎকার শোনা গেল, "অক্ষণি নামাইতেছি।"

হঠাৎ একটা আর্ত চিৎকার। কন্ঠস্বর আগেরটাই, "গেছি রে, ও বাবাগো, ও মিয়াভাই, এক্কেরে গেছি।"

উপরের গাছ দুটো, আর আমিও, দৌড় দিয়ে নিচে নামলাম। দেখলাম, একটা লোক, মানে সেই তিন নাম্বার গাছ তার ডালপালা ছড়িয়ে ড্রেনের পাশে পড়ে আছে। নিচের দিকের ডালে, মানে পায়ের সাথে সাদা সিলোফেন পেপার লেগে আছে। প্রথম গাছ দুটো দৌড়ে গেল তার কাছে। সেই মুহূর্তে মেইন গেট দিয়ে ইউনিফর্ম পরা কয়েকজন লোক ঢুকলেন।

"অন্যের বাড়িতে ঢুকে মানুষকে উত্যক্ত করা ও ভাঙচুর করার পরিকল্পনা করার অভিযোগে আপনাদের আটক করা হল।"

হাতকড়া পরানোর সময় লক্ষ করলাম ডিমওয়ালা গাছটাই পড়ে গিয়েছিল। তার প্যান্টের পিছনে কি যেন সবুজ সবুজ লেগে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
--"আপনারা এখানে? এত তাড়াতাড়ি?"
-"আমরা কাছাকাছিই তৈরি হয়ে ছিলাম। সাত্তার সাহেব তো আগেই ফোনে বলে রেখেছিলেন। আর একটু আগে সম্ভবত তোমার মা ফোন করেছিলেন।"
--"ও তাই তো! পিছনে আম্মা কী করছিলেন একবার ঘুরেও দেখিনি।"

আম্মা আর আন্টি ততক্ষণে নিচে নেমে এসেছেন। আমি বললাম,
--"কিন্তু ঐ গাছটা, মানে, লোকটা পড়ল কী করে?"
-"আরে! আমার সব গোবর থেঁতলে নষ্ট করে দিয়েছে। সিলোফেন পেপার দিয়ে ঢেকে রেখেছিলাম। কত কষ্ট করে কত দূরের ডেইরী ফার্ম থেকে গোবর জোগাড় করেছিলাম। হায় হায়, এখন কী হবে?"

আমরা সবাই চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখি জোবাইদা খাতুন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গোবরের জন্য আহাজারি করছে। আন্টি বললেন,
-"তাহলে তোর কাজ এটা?"
--"থাক থাক। ওকে আর কিছু বলো না। ওর জন্যই তো ওরা ভাঙচুরের আগেই ধরা পড়ল।" আম্মা বলল।

তোকুম হঠাৎ আহাজারি থামিয়ে বলল, "আচ্ছা! সবাই তাহলে মাস্তানদের ব্যাপারে জানত। শুধু আমিই জানতাম না। (আমার দিকে তাকিয়ে) মনে হচ্ছে কাল থেকে আমরা স্কুলে যেতে পারি।"

আমি মিটিমিটি হাসতে থাকলাম আর মনে মনে বললাম, মেয়েটার মাথায় এত বুদ্ধি! ঝানতাম না।

পুলিশ অফিসার বললেন, "আমি তাহলে চলি। আল্লাহ হাফিজ। এন্ড গুড লাক।" শেষের কথাটা তোকুমকে উদ্দেশ্য করে বলা।

আম্মা বলল, "অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।"


৮.

মামা আর আংকেলকে খবর দেয়া হয়েছে। তারা ক্লিনিক থেকে চলে এসেছেন। সবাই তোকুমকে বাহবা দিচ্ছে। দাদী আর নানীও আছে। তোকুম এখন আর মন খারাপ করে নেই। তিড়িং বিড়িং করে লাফাচ্ছে আর কেউ বাহবা দিলে সাথে সাথে বিনয়ে গলে গিয়ে বলছে, "থ্যাংক য়্যু, থ্যাংক য়্যু।"

আমি বললাম,
--"আচ্ছা তোকুম, তুই অত কষ্ট করে গোবর এনেছিলি কেন রে?"
-"হ্যাঁ রে তাই তো, গোবর এনেছিলি কেন?" আন্টি বললেন।

আম্মা, আংকেল, মামা সবাই জানার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলেন। শুধু দাদী বললেন, "আমার আর জেনে কাজ নেই বাবা। আমি চললাম।"

নানী বললেন, "হ্যাঁ, আমিও গেলাম।" আমি বললাম,
--"নানী, তুমি কি এখন ঘুমাতে যাচ্ছ?"
-"হ্যাঁ, আমার তো আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, তোদের মত পড়ে পড়ে ঘুমাব আর কি।" ঝামটা মেরে নানী চলে গেলেন।

আমরা সবাই হেসে উঠলাম। আংকেল বললেন,
--"হ্যাঁ জোবু, শুরু কর।"
-"ব্যাপারটা হয়েছে কি, ড্রেন হচ্ছে গিয়ে প্রবহমান নদীর মত। তবে নদীর সাথে এর পার্থক্য হচ্ছে এর নিচে মাটি নেই, পাকা সিমেন্ট শুধু। এদিকে আমার প্ল্যান মোতাবেক এতে পদ্ম ফোটাতে গেলে এর নিচে মাটি লাগবে। ড্রেনে তো আর বেশি মাটি দেয়া যায় না। তাই এমন কিছু লাগবে যা অল্প দেয়া যাবে, অথচ উদ্ভিদের জন্য পুষ্টিমানে থাকবে ভরপুর। সেজন্য আমি গোবর নির্বাচিত করলাম। আবার যে সে গোবর হলে তো চলবে না, সাধারণ গরু-মহিষের -- কী হল? উঠে যাচ্ছেন কেন সবাই?"

আমি ছাড়া বাকী সবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে চলে গেলেন।


পরিশিষ্ট:

ঘরে আর কেউ নেই। শুধু জোবাইদা খাতুন ওরফে তোকুম নামের মেয়েটি দু'হাত নেড়ে কিছু বর্ণনা করছে আর খুব মনোযোগ দিয়ে তার সব কথা শুনছে একজন - তার নামটা জানা নেই।




(এই গল্পটা লেখা শেষ করে আমার খুব কাছের দুই সখীকে ডাইরীটা পড়তে দিয়েছিলাম। তাদের একজন ডাইরীতে একটা চিরকুটসহ ফেরৎ দিয়েছিল। চিরকুটে লেখা ছিল, আমি জানি তার নামটা কী? সে হল তোকুমের বান্ধবী বাক বাকুম। <img src=" style="border:0;" />)




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29469468 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29469468 2011-10-20 01:12:52
তার নাম জানা নেই - ৩,৪
তার নাম জানা নেই - ১
তার নাম জানা নেই - ২


৩.

খাওয়ার টেবিলে বসে আছি। খাবার নাড়ছি, মুখে ঢুকাচ্ছি। খাচ্ছি কি না বুঝতে পারছি না। গলা দিয়ে নামাচ্ছি শুধু। এত বড় একটা বিপদের সামনে আমাদের পড়তে হবে, আমি কোনদিন ভাবিওনি। আম্মা, মামারও দেখছি একই অবস্থা, জোর করে মুখে খাবার ঢুকাচ্ছে যেন। টেবিলে আংকেল, আন্টিও আছেন। তোকুম অনেক আগেই খেয়ে-দেয়ে চলে গিয়েছে। কিছুক্ষণ পর আংকেল আন্টিও উঠে পড়লেন। আজ সবাই একসাথে খেয়েছি। অবশ্য খেয়েছি বললে ভুল হবে, খেতে বসেছি মাত্র। আগেও এরকম একসাথে রাতের খাবার খেয়েছি, ক্লাস এইটে যখন বৃত্তি পেয়েছিলাম। অবশ্য আজকের ব্যাপারটা গুরুতর।

খেতে বসে আলোচনা করার কথা ছিল। কিন্তু কেউই কিছু বললেন না। আসলে ব্যাপারটা এতই জঘন্য যে - থাক, ওসব এখন বলে লাভ নেই। গন্ডগোলটা হয়েছে মামা আর আংকেল যে ক্লিনিকে কাজ করেন সেখানকার একজন নার্সকে নিয়ে। নার্সের ছেলেটা অসুস্থ ছিল, তবে সিরিয়াস নয়। মামাকে সেই নার্স তার ছেলেকে আগে দেখতে বলেছিল। মামা তার আগে ঐ ছেলের চেয়েও গুরুতর অসুস্থ একজন রোগীকে দেখতে যান। নার্স এত চেঁচামেচি শুরু করলে আংকেল, মানে তোকুমের বাবা তাকে সবার সামনে ধমক দেন ও চাকরী থেকে সাময়িকভাবে ২ সপ্তাহের জন্য বরখাস্ত করার ব্যবস্থা করেন। নার্স এরপর বলে যায় যে দুজনকেই দেখে নেবে।

পরদিনই ঐ নার্সের স্বামী মামাকে আর আংকেলকে এই বলে শাসিয়ে গিয়েছে যে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ঐ নার্সকে চাকরীতে পুনর্বহাল না করলে সে মাস্তানদের লেলিয়ে দিবে। এখন আমাদের অবস্থা যে কী! আমাকে আম্মা সবই বলেছে, কিন্তু তোকুমকে বলার সাহস কেউ পাচ্ছে না। কী বলতে কী বুঝবে। এখন ওকে শুধু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাড়িতে রাখতে হবে। সেটা অবশ্য খুব কঠিন কিছু না। ওকে শুধু বললেই হবে যে স্কুলে যাওয়া কয়েকদিনের জন্য বন্ধ। ও মহানন্দে ওর কার্যাদি সম্পাদনে ব্রতী হবে।

নানান কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমাতে গেলাম। ভেবেছিলাম দুশ্চিন্তায় ঘুম আসবে না। কিন্তু বিছানায় পিঠ লাগাতেই দু'চোখ বন্ধ হয়ে এল। স্বপ্নে দেখলাম তোকুম আর আমি দুজনে মিলে মরিচ গাছ থেকে পটল ছিঁড়ে ছিঁড়ে ড্রেনে ভাসিয়ে দিচ্ছি। কিছুক্ষণ পর ড্রেনটা শুকিয়ে গেল আর পটলগুলি লাফিয়ে লাফিয়ে বলতে থাকল, "শুকনো ড্রেনে ফেলছিস যে আমাদের? চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ড্রেনে পানি না দিলে তোদের পিছনে মাস্তান লেলিয়ে দিব।" কী কান্ড!


৪.

ঘুম ভাঙল কুকুরের ডাকে। পাশের বাড়ির মফিজ সাহেবের কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করছে। বিচিত্র কুকুর। মফিজ সাহেবকে খুবই পছন্দ করে। কিন্তু মফিজ সাহেব যদি তাকে না জানিয়ে বাইরে যায় তাহলে ফেরার পর চোর মনে করে ঘেউ ঘেউ করে পাড়া মাথায় তোলে। আজ নিশ্চয়ই কুকুরকে না জানিয়ে মফিজ সাহেব মর্নিং ওয়াকে গিয়েছিলেন। এখন ফিরেছেন, তাই এত হৈ চৈ।

আড়মোড়া ভেঙে জানালায় গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম মুফিজ সাহেব এক হাতে তাঁর সুন্দর ছড়িটা নিয়ে তিড়িং বিড়িং লাফাচ্ছেন, (সম্ভবত কুকুরটাকে বোঝাতে চাইছেন যে তিনিই তার মনিব) আর কুকুরটা সমান তালে ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছে। ভাগ্যিস গলায় চেইন বাঁধা আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিলাম। হঠাৎ আমার চোখ গেল রাস্তার ওপারে। তিনটা লোক, প্রত্যেকের মাথায় একটা করে কাকের বাসা, একটা বাসায় আবার একটা ডিম। লোকটা পেছন ফিরে দাঁড়িয়েছিল। ওটা কি কোকিলের ডিম নাকি? কোকিল তো জানি কাকের বাসায়ই ডিম পাড়ে। পরে অবশ্য বুঝেছি ওটা মাথার টাক। সমস্ত মাথা জুড়ে এত চুল, মাঝখানটা খালি, তাও আবার ডিমের সাইজের। সকালের রোদের আলো পড়ে চকচক করছে।

লোকটা হঠাৎ এদিকে ফিরতেই আমার সাথে চোখাচোখি হল। মুহূর্তেই বুঝলাম, আমার দিকে নয়, লোকটার দৃষ্টি তিনতলায়, এই ঘরটার ঠিক উপরের ঘরে। আমি তাড়াতাড়ি জানালা বন্ধ করে দিলাম। দৌড় দিলাম সিঁড়ির দিকে। আম্মা দেখে বলল, "কী রে, এভাবে দৌড়ে কোথায় যাচ্ছিস?"

আমি কোনমতে আম্মাকে বুঝিয়ে বলতেই আম্মার মুখ সাদা হয়ে গেল। আমি আর দেরী না করে তিনতলায় গেলাম। অনেকক্ষণ দরজা ধাক্কাধাক্কির পর মরিয়ম চোখ কচলাতে কচলাতে বিড়বিড় করে কি যেন বলতে বলতে দরজা খুলে দিল। দৌড় দিয়ে তোকুমের ঘরে গেলাম। দরজা খোলা রেখেই ও ঘুমায়। এখনও ঘুমাচ্ছে। আস্তে করে গিয়ে ওর পাশে বসলাম। কি নিশ্চিন্তেই না ঘুমাচ্ছে। যদি জানত কি ভয়ানক বিপদ এখন আমাদের সামনে।

আলতো করে ওর পিঠে হাত রাখলাম। ও হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে আমার গলা চেপে ধরল। আমি আঁ আঁ করে চিৎকার করে উঠতেই ছেড়ে দিয়ে বলল, "ও তুই নাকি? এত সকালে এখানে কী করছিস?"

আমি জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে থাকলাম। "কী রে, খুব বেশি লেগেছে নাকি রে?" বলে এক হাত আমার গলায় রাখল। আমি এক ঝটকায় হাত সরিয়ে দিলাম। ও বলল, "তুই দেখছি ভীষণ রেগেছিস?" আমি অন্যদিকে ঘুরে বসলাম।

-"রাগিস না রে। আমি তো ইচ্ছা করে অমন করিনি। আমি ভেবেছিলাম-"
--"থামলি কেন? বল যে ভেবেছিলি আমি রাক্ষুসে গাছ।"
-"হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই ভেবেছিলাম।"
--"কী!" আমি ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলাম।
-"দাঁড়া দাঁড়া, আগে কথা তো শোন। আমি আজ স্বপ্ন দেখলাম কি জানিস? খুব ভোরে একটা একটানা শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি জানালা খুলে দাঁড়ালাম। দেখি কি রাস্তার ওপারে তিনটা গাছ। তিনটা গাছের মাথায় তিনটা কাকের বাসা। একটা বাসায় একটা ডিম। ও কি! অমন চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছিস কেন? বলেছিই তো স্বপ্নে দেখেছি, সত্যি তো না। শোন, তারপর ডিমওয়ালা গাছটা ঘুরে দাঁড়াল। আমি তখন একটা ভেংচি কেটে জানালা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। এদিকে গাছ তিনটা আমাদের মেইন গেট দিয়ে ঢুকে তিনতলায় উঠে দরজায় বেদম ধাক্কাধাক্কি শুরু করে দিল। মরিয়ম কি যেন বলতে বলতে দরজা খুলে দিল। ডিমওয়ালা গাছটা আমার ঘরে পা টিপে টিপে এসে আমার পাশে বসল। তারপর একটা ডাল আমার পিঠে রাখল। আমি তখনই ঝটকা মেরে উঠে কাকের বাসার গোড়ায় হাত দুটো চেপে ধরলাম। তারপর দেখি ওটা তুই। কী রে, তুই মাথায় হাত দিয়ে বসে আছিস কেন? কেন, তুই উল্টাপাল্টা স্বপ্ন দেখিস না? বল, দেখিস না?"
--"চুপ কর, গাধী তুই চুপ কর।"
-"কী হয়েছে তোর? মাথা ধরেছে না কি?"
--" না রে না। ঘুমের ঘোরে তুই যা দেখেছিস তার কিছু অংশ সত্যিই ঘটেছে। ঘুমের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করার অভ্যাস তোর আছে আমি তো জানিই। তাই বলে আজ কেন?"
-"কী হল তোর? সারা ঘরে এভাবে পায়চারি করছিস কেন? বিড়বিড় করেই বা কী বলছিস?"

আমি ওর পাশে বসে ওর হাত ধরলাম।
--"তোকুম, তুই জানালা খুলিস না। আর ছাদেও যাস না। যা কিছু করার ঘরের মধ্যে বসে কর।"
-"এই ঘর থেকেও বের হব না?"
--"উমম। না। আমার ঘরে যেতে পারিস।"
-"কিন্তু ব্যাপারটা কী? তোর হাত এত ঠান্ডা কেন?"

আমি ওর হাতটা ছেড়ে দিয়ে আবার পায়চারি শুরু করলাম। কী বলব ওকে? কী বলে বোঝাব? বেশ কিছুক্ষণ পায়চারি করে আবার ওর পাশে বসলাম।
--"দ্যাখ তোকুম, আমি একটা প্ল্যান করেছি। মানে একটা এক্সপেরিমেন্ট।"
-"এক্সপেরিমেন্ট? আমার মত তুইও-"
--"না না। ওসব কিছু না। মানে, তোকে কিভাবে বোঝাব?"
-"প্রেমঘটিত ব্যাপার-স্যাপার না কি?"
--"ধ্যৎ!" একটা ধাক্কা দিয়ে শুইয়ে দিলাম তোকুমকে।
-"তাহলে কী? বলিস না কেন?" উঠে বসল তোকুম।
--"এখন না, পরে বলব তোকে। তবে কয়েকদিনের জন্য আমাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ থাকবে।"
-"কয়দিনের জন্য?"
--"সেটা স্থির করে এখনই বলা যাচ্ছে না। দু'দিনও হতে পারে, দশদিনও হতে পারে।"
-"ওক্কে। নো প্রবলেমো। তুই তোর এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে থাকবি, আর আমি আমারগুলো নিয়ে থাকব। শুধু ছাদে বা বাগানে যাওয়া যাবে না, তাই তো?"
--"একজ্যাক্টলি। তোর ড্রেনের পরিকল্পনা আপাতত মুলতুবী রাখতে হবে।"

তোকুম আহত দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবল। তারপর বলল,
-"আচ্ছা ঠিক আছে। ওটা এখন থাক। আমি নতুনগুলো নিয়েই থাকব।"
--"হ্যাঁ রে, তোর নতুন এক্সপেরিমেন্টগুলো কী রে?"
-"নাস্তা করে আয়, সব বলব। নাস্তা তো করিসনি, না?"
--"না করিনি। তাহলে এখন যাই। আধঘন্টার মধ্যেই আসছি, কেমন!"

আমি দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকালাম। তোকুম জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতে বললাম, "আয় না, একসাথে নাস্তা করি।" তোকুম একটু ভেবে নিয়ে বলল, "ঠিক আছে। তুই যা, আমি আসছি।"

আমি দোতলায় নেমে দেখি মামা টেলিফোনে কথা বলছেন। রিসিভার রাখার পর আম্মা বলল, "কী বললেন ওসি সাহেব?"
-"বললেন যে গন্ডগোল করলে যেন খবর দিই। তারা তৈরি থাকবেন। কী রে, জোবেদা কি জেগেছে?"

আমি বললাম,
--"হ্যাঁ, জেগেছে।"
-"জোবেদা কি ওদেরকে দেখেছে?"
--"ন-না। দেখেনি। ও কিছু জানে না। ওকে আমি জানালা খুলতে মানা করে দিয়েছি।" স্বপ্নের কথাটা আর বললাম না মামাকে।
-"কেন মানা করেছিস জিজ্ঞেস করেনি?"
--"সে আমি ম্যানেজ করে নিয়েছি, তুমি ভেব না। আর আমি সারাদিন ওর সাথেই থাকব। আম্মা, ওকে বলেছি আমাদের সাথে নাস্তা করতে। ও আসছে।"
আম্মা বলল, "ঠিক আছে, তুই হাত মুখ ধুয়ে আয়। নাস্তা দিচ্ছি।"







চলবে...................

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29468566 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29468566 2011-10-18 15:45:22
তার নাম জানা নেই - ২

তার নাম জানা নেই - ১


২.

পাশের ঘরে টেলিফোন বাজছে। আমি ধরবার জন্য ওঠার আগেই তোকুম রিসিভার তুলল। সর্বনাশ! তোকুম এতক্ষণ পাশের ঘরে ছিল না কি? আমি তো এদিকে এ ঘরে ওর দাদীর কানে ড্রেনের প্ল্যানটা তুলছিলাম। তোকুম শুনে ফেলেনি তো? তোকুম শুনেছে কি না জানি না, দাদী বোধ হয় আমার কথাগুলো শোনেননি। কেমন ঝিম মেরে বসে আছেন। অথচ এতক্ষণে তো তার চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করবার কথা। তোকুম ফোন রেখে লাফ দিয়ে এ ঘরে ঢুকল। খুশি খুশি চেহারা করে আমাকে বলল,

-"রং নাম্বার। তুই এখানে কী করছিস রে?"
--"কি-কিছু না। তুই কি এতক্ষণ ও ঘরে ছিলি?"
-"না রে। ঐ যে ওখানে ছিলাম।" বলে দাদীর চোখ এড়িয়ে এমন ভাবে চোখ নাচাল, বুঝলাম এতক্ষণ সে ড্রেন ঘাঁটাঘাঁটি করছিল। আমি বললাম,

--"তবে যে ফোর ধরলি।"
-"আরে ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই তো ফোন বাজল।" বলতে বলতে আমার পাশে এসে বসল। আমি আঁতকে উঠলাম।
--"এঁ হেঁ হেঁ। ছুঁস না আমাকে।"
-"কেন? ছোঁব না কেন? (ফিসফিস করে) হাত ধুয়ে এসেছি তো।"
--"হাঁত ধুঁয়ে এঁসেছিঁ তোঁ।"
-"অ্যাই খবরদার! এভাবে আমাকে ভেংচাবি না।"
--"অ্যাঁই খঁবরদাঁর এঁভাবেঁ আঁমাকেঁ ভেংচাঁবি না।"

তোকুম দু'হাত নেড়ে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ দাদী বিরক্ত কিন্তু অন্যমনস্ক গলায় বললেন, "তোরা যা তো এখান থেকে, দুজনেই যা।"

আমরা দুজন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে চলে এলাম। আমি সিড়ির কাছে যাচ্ছি দেখে তোকুম বলল,
-"কী রে, যাচ্ছিস কই?"
--"দোতলায়। স্কুলের হোম টাস্ক করতে হবে।"
-"শুনবি না আমার কাজ কদ্দুর হল?"
--"পরে। আর তুইও এখন হোম টাস্কগুলো শেষ কর।"

তোকুম এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যেন আমি ওকে অথৈ জলে ডুবিয়ে দিয়ে যাচ্ছি। আমি পাত্তা না দিয়ে নেমে এলাম। ঘরে এসে খাতা খুলে বেঞ্চে বসলাম। আমার ঘরে কোন চেয়ার নেই। টেবিল আর বেঞ্চ। লিখতে বসলাম ঠিকই, কিন্তু মনটা পড়ে আছে তিনতলায়। আচ্ছা, তোকুমের দাদী এরকম করলেন কেন? উনার কি শরীর খারাপ? হার্ট অ্যাটাক হবে না তো? অবশ্য উনার হার্টের অসুখ নেই। তবুও, বয়স হয়েছে তো। ধ্যৎ, যতসব উল্টাপাল্টা চিন্তা মাথায় আসছে। মনে হয় কোন কারণে উনার মন খারাপ। তাই বলে এত অন্যমনস্ক হয়ে থাকবেন! তোকুমের প্ল্যানটা ভন্ডুল করতে হবে তো। নানীকে দিয়ে বলাতে হবে দেখছি। কিন্তু নানী আবার সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমায়। কাজ-কম্ম নেই তো।

হঠাৎ আমার পিঠে এইসা একটা চাপড় পড়ল।
-"কী রে গোবরা, আমাকে তো খুব করে হোম টাস্ক করতে বলে চলে এলি। নিজে দেখি হা করে বসে ডিম পাড়ছিস।"
--"না রে তোকুম, ভাবছিলাম যে দাদী -- বান্দরী! তুই আমাকে গোবরা বললি কেন?"

আমি ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। তোকুম আমার হামলা প্রতিহত করতে করতে বলল,
-"তুই বা অমন হা করে ছিলি কেন?"
--"আমি মোটেও হা করে ছিলাম না।"
-"তুই তো নিজেকে দেখতে পাচ্ছিলি না। এতবড় একটা হা করে ডিম পাড়ছিলি।"
--"কী বললি গাধী? কী করছিলাম বললি?"
-"ডিম পাড়ছিলি, ডিম। আন্ডা চিনিস তো?"
--"তোকে আজকে আমি--"

আমার কথা শেষ হল না। আম্মা আমাকে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকল। আমাদের দুজনকে বিশেষ কেচকি মারা অবস্থায় দেখে বলল, "কী হচ্ছে এসব?"

অনিচ্ছা সত্ত্বেও তোকুমকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। আম্মা তোকুমকে বলল,
--"মা, তুমি এখন পড়তে যাও, ওর সাথে আমার একটু কথা আছে।"
-"ঠিক আছে আন্টি, আমি এখন যাই। গুড বাই আন্ডাওয়ালি।"

আমি আবার ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। আম্মা আমাকে ঠেকাল, আর সেই ফাঁকে তোকুম পগার পার। আম্মা বলল, "বস, তোর সাথে জরুরি কথা আছে।"

আম্মা কন্ঠস্বর শুনে ভয় পেয়ে গেলাম। কোন অঘটন নয় তো! তোকুমের দাদীও কি একই কারণে অন্যমনস্ক ছিলেন? আমার ভীষণ ভয় লাগছে।




চলবে.............
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29467546 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29467546 2011-10-17 00:09:15
তার নাম জানা নেই - ১ (ক্লাস টেনের শেষের দিকে পড়ার চাপে যখন মাথা নষ্ট প্রায়, তখন মাথা ঠান্ডা করতে একটা হাবি জাবি গল্প লিখেছিলাম। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে অল্প অল্প করে লিখতে গিয়ে তিন মাস লেগেছিল গল্পটা শেষ করতে। অনেক ভুল-ভাল আছে জানি। তবু ব্লগে দেয়ার সাহসটা করেই ফেললাম। হাস্যকর বা বিরক্তিকর হলেও কিছু করার নেই।)


সেপ্টেম্বর-নভেম্বর, ১৯৯৫।


-"ধ্যৎ! সব ভন্ডুল হয়ে গেল।"
--"কী ভন্ডুল হয়ে গেল রে গাধী?"
-"গাধী বলিস না, মেজাজ এমনিতেই খারাপ হয়ে আছে।"

ঘরে ঢুকে কথাগুলো বলেই ধুপ করে খাটে বসে পড়ল তোকুম। ওর নাম অবশ্য তোকুম না, তবে আমি ডাকি। ও মাঝে মাঝেই আনমনা হয়ে পড়ে আর মুখ দিয়ে 'তোকুম তোকুম' শব্দ করে। অবশ্য ও ঠিক কী বলে বুঝি না, আমার কানে 'তোকুম তোকুম' শব্দটাই আসে। গালে হাত দিয়ে কি যেন চিন্তা করছে তোকুম। সামনের কাটা চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে বলে কপাল দেখা যাচ্ছে না, তবে কপাল কুঁচকে আছে বুঝতে পারছি। গায়ে ধাক্কা দিয়ে বললাম-
--"কী রে, কী হল?"
-"বললাম তো সব ভন্ডুল হয়ে গেল।"
--"যা বান্দরী!"

ওকে আমি প্রায় সারাক্ষণই বান্দরী, গাধী বলে গালি দিই। খুব রেগে যায় ও এসব শুনলে। রেগে যায় বলেই আরও বেশি করে দিই। কিন্তু এখন কিছু বলল না, রাগলোও না। মনে হচ্ছে ওর নিজের তৈরী রেসিপি অনুযায়ী ভাত দিয়ে চটপটি বানাবার প্ল্যান ভেস্তে গেছে। আবার বাড়ির পাশের ড্রেনের মধ্যে পদ্মফুল ফোটানোর প্ল্যানও ভেস্তে যেতে পারে। কি যে আবোল তাবোল প্ল্যান করতে পারে মেয়েটা। একটু নরম সুরে জিজ্ঞেস করলাম,
--"কী হয়েছে রে তোকুম?"
-"আর বলিস না, ছাদের বাগানের প্ল্যানটা গেছে।"
--"কোনটা? ঐ যে মরিচ গাছে পটল ধরানোর প্ল্যানটা?"
-"হুঁ।"
--"বলিস কী রে? এমন দুর্দান্ত একটা প্ল্যান। কিভাবে ভন্ডুল হল?"
-"আরে ঐ দাদীজানের কান্ড। পটলের যে লতাগুলি জোগাড় করেছিলাম সব ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে। বলেছে আমি যদি আবার ঐ রকম প্ল্যান করি তো আমার পা দুটো মাটিতে পুঁতে দিয়ে আমার গায়ে বিছুটি পাতা জন্মানোর প্ল্যান করবে।"
--"কী ভয়াবহ! কী মর্মান্তিক! তা তুই ডাস্টবিন থেকে লতাগুলো তুলতে পারলি না?"
-"চেয়েছিলাম তো। কিন্তু তার আগেই মরিয়মের মা ময়লা ফেলে দিয়েছে। আমি অবশ্য পরে গিয়ে ময়লা ঘেটেছি, কিন্তু পেলাম না। বোধ হয় বস্তির ছেলেপেলে উঠিয়ে নিয়ে গেছে।"

আমার পেটের ভেতরটা গুলিয়ে উঠল। অনেক কষ্টে বমির ভাবটা চেপে বললাম,
--"তা দাদী জানলো কী করে?"
-"কি জানি, বোধ হয় মরিয়ম বলে দিয়েছে। ওকে পেলে আমি--"

বলেই এমন একটা ভঙ্গি করল যে তাকে মনে হল অমরেশ পুরীর চাচী আম্মা। ভাগ্যিস মরিয়ম এখানে ছিল না। থাকলে এখনই চিৎকার শুরু করে দিত। ওর যা চিৎকার! দু'হাতে চুল টেনে ধরে ইঁ-ইঁ-ইঁ করে চিৎকার ছাড়ে। শুনলে কানে তালা লেগে যায়। একবার তোকুম একটা এক্সপেরিমেন্ট চালাচ্ছিল। জ্যান্ত শোল মাছ মানুষের কোলে দিলে মাছের কি রকম অবস্থা হয় তা নিয়ে একটা পরীক্ষা করছিল। সে নিজে বাজারে গিয়ে য়্যাব্বড় একটা শোল মাছ নিয়ে এল। আমাকে বলল মাছটাকে কোলে নিতে। আমি তো তিন লাফে সরে গেলাম। তোকুম নিজে মাছটাকে কোলে নিতে পারছে না, কারণ তাহলে নাকি ও সেটাকে ভালোমত পর্যবেক্ষণ করতে পারবে না। তোকুম "যাই মরিয়মকে দিই" বলে তিনতলায় দৌড় দিল। আমিও পিছনে পিছনে গেলাম মজা দেখবার জন্য। মরিয়ম তখন শাকপাতা বাছছিল। তোকুম দৌড় দিয়ে ওর সামনে গিয়েই মাছটা ওর কোলে ফেলে দিল। মরিয়ম শাক ফেলে একটা লাফ দিল। মাছটা মেঝেতে পড়ে লাফাতে থাকল। ততক্ষণে মরিয়ম ওর স্বভাবমত দু'হাতে চুল টেনে ধরে ইঁ-ইঁ-ইঁ করে চিৎকার জুড়ে দিয়েছে। আমি তো হো হো করে হেসেই আর কূল পাই না। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে চোখ খুলে দেখি মরিয়ম আগের মতই চিৎকার করে যাচ্ছে, তোকুম মাছটা তুলে নিয়ে আহত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আর মরিয়মের মা মরিয়মের চিৎকার থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে এখন কানে হাত দিয়ে বসে আছে।

ও কী! ও কী! তোকুম যে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। অবস্থা মনে হচ্ছে বেগতিক। আমি তাড়াতাড়ি দোতলায় নেমে আমার ঘরের দরজা লাগিয়ে বসে পড়লাম। পরিস্থিতি শান্ত হয়েছিল কিভাবে জানি না, তবে অনেক সময় লেগেছিল। পরদিন তোকুম মুখ ভার করে আমার ঘরে এসে বলেছিল,
-"কি মুশকিল দ্যাখ তো, আমার এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল কী লিখব এখন?"
আমি বললাম,
--"কেন? এক্সপেরিমেন্টটা আর শেষ করিস নি?"
-"কিভাবে করব? আম্মা মাছটা কেটে ফেলল, তবেই তো মরিয়ম ঠান্ডা হল। দুপুরে সবাই মাছটা নিয়ে গুরুভোজন চালিয়েছে।"
--"তাহলে এক কাজ কর। এক্সপেরিমেন্টের নাম পাল্টে দে। তাহলেই আর ফলাফলের ঝামেলা থাকে না।"
-"কী রকম?"
--"দ্যাখ, তোর এক্সপেরিমেন্টের নাম হল 'জ্যান্ত মাছ মানুষের কোলে দেয়ার পর মাছের অবস্থা', এখানে 'মাছের অবস্থা' কেটে দিয়ে 'মানুষের অবস্থা' লিখে দে। ব্যস তাহলেই তো হল।"
-"তাই তো!" বলে দৌড় দিয়ে তোকুম চলে গেল।

আসলে তোকুম আমার যে কোন পরামর্শই মহামূল্য উপদেশ মনে করে মেনে চলে।

যাক গে, যা বলছিলাম। তোকুমের বর্তমান প্ল্যান ভেস্তে যাওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে বললাম,
--"থাক, দুঃখ করিস না। তোর তো আরও প্ল্যান আছে, ওগুলোর কাজ এগিয়ে নিয়ে যা।"

তোকুম একটু চিন্তা করে বলল, "হুঁ, ঠিক।" তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

আহা বেচারী তোকুম, যদি জানত যে ওর প্ল্যান ভেস্তে দেয়ায় আমিই মূখ্য ভূমিকা পালনকারী। আমিই দাদীর কানে তুলে দিয়েছি ওর সাধের প্ল্যানের খবর। দেবই বা না কেন, নইলে আমার সাধের বাগান আর মরিচ গাছগুলোর বারোটা বাজত।

এখন ও নিশ্চয়ই পাশের ড্রেনটা ঘাঁটা ঘাঁটি করছে। মেয়েটার বুদ্ধিশুদ্ধি তো নেই-ই, ঘেন্নাও নেই। ওর এই প্ল্যানটারও খবর আছে, আমি আছি যে। ও আমাকে ওর একমাত্র শুভাকাঙ্ক্ষী মনে করে। কারণ একমাত্র আমিই ওর সব প্ল্যানের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি আর এসব বিষয়ে সুপরামর্শ দিয়ে থাকি। অথচ আসলে আমিই ওর সবচেয়ে বড় শত্রু।

এবার আমাদের একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে দিই। আমি থাকি আমার নানার বাড়িতে। তিনতলা বাড়ি। দোতলায় আমরা থাকি, তিনতলায় তোকুমরা মানে জোবাইদা খাতুনরা ভাড়া থাকে। একতলায় আপাতত টু-লেট ঝুলছে। আমি নানী, আম্মা আর একমাত্র মামুজানের সাথে থাকি। নানা নেই, আর আব্বা কুয়েতে। তোকুম থাকে ওর বাবা-মা আর দাদীর সাথে। আর আছে মরিয়ম ও তার মা। ওর দাদী আর আমার নানীর মধ্যে খুব ভাব। ওর আম্মার ভাব আমার আম্মার সাথে আর ওর আব্বার ভাব আমার মামার সাথে, তারা দুজনেই ডাক্তার। তোকুম আর আমার মধ্যে সত্যিকারের ভাব আছে কি না বলতে পারি না, তবে আমরা দু'জন ক্লাসমেট। দুজনে একই স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ি। পড়াশোনায় দু'জনেই মোটামুটি ধরণের।



চলবে........।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29466642 http://www.somewhereinblog.net/blog/shathidmc/29466642 2011-10-15 16:43:27