দেশ আবার ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরে যাচ্ছে’
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা জামিনে মুক্তি পেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করায় দেশ আবার ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরে যাচ্ছে। শুধু এ দুই শীর্ষ নেত্রী নন, দেশের দুইটি বড় দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের যেসব মন্ত্রী ও এমপি দুর্নীতির দায়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন, তারাও জামিনে বাইরে বেরিয়ে আসছেন। এসব রাজনীতিক কারাগার থেকে বাইরে বের হওয়ায় রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের মূলস্রোতের দুই নেত্রীকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। দেশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও এমন দৃশ্য ছিল অভাবনীয়। বাংলাদেশের রাজনীতির এ নয়া মোড় নিয়ে দ্য ইকনোমিস্ট ‘দ্য বেগমস আর ব্যাক’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ইকনোমিস্টের ইন্টারনেট সংস্করণে প্রকাশিত এ নিবন্ধে বলা হয়, ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা দখল এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী বাংলাদেশের দুই বিবদমান সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা ওয়াজেদ প্রভাবাধীন যুগের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে এক বছরের অধিক কারারুদ্ধ থাকার পর দুই বেগম মুক্তিলাভ করেছেন। ১১সেপ্টেম্বর সরকার খালেদা জিয়াকে জামিনে মুক্তি দিয়েছে। তার পাঁচদিন পর সরকার আমেরিকা থেকে শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের আইনগত বাধা দূর করে। গত ১১ জুন প্যারোলে মুক্তিলাভের পর শেখ হাসিনা চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। আগামী মাসের প্রথমদিকে তিনি দেশে ফিরে আসবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। তবে উভয় নেত্রী এখনো বিচারাধীন। সরকারের অনুমতি ছাড়া কৌঁসুলিগণ তাদের মামলাগুলো চালু করতে পারবেন না। সরকার দুই বেগমের রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটানোর চেষ্টা বাদ দিয়েছে। বড় ধরনের কোনো অঘটন না ঘটলে তাদের দুইজনের একজন হবেন বাংলাদেশের আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী।
বিস্ময়করভাবে ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে দুইজনের মধ্যেই। ১৯৯১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত পালাক্রমে দুই বেগমই ক্ষমতায় ছিলেন। এ দুই বেগম তীব্র শত্রুতামূলক ও দুর্নীতিপ্রবণ রাজনীতি অনুসরণ করেছেন। যার পরিণামে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে। প্রথমে সেনাবাহিনী তাদের দু্ইজনকে নির্বাসনে পাঠানোর এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করে। পরে তারা দুই নেত্রীকে কারাগারে নিক্ষেপ করে এবং তাদের দলে ভাঙ্গন ধরানোর চেষ্টা করে এই আশায় যে, তাতে নয়া নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটবে। তা সত্ত্বেও দুই বেগমের দল ঐক্যবদ্ধ থাকে। দুইটি বিষয় তাদের দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সহায়তা করেছে। একটি ছিল পৃষ্ঠপোষকতা এবং আরেকটি ব্যক্তিপূজা। দুইটি দল দুই বেগম ছাড়া চলতে পারে না। এ বাস্তবতা সত্ত্বেও গত সপ্তাহে দলকে আজীবন নেতৃত্ব দানে বিএনপির প্রস্তাব বেগম খালেদা জিয়া ফিরিয়ে দিয়েছেন।
বাংলাদেশীদের জন্য সুখবর হলো যে, ২০০১ সালের পর প্রথমবার তারা একটি সরকার নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছে। এ নির্বাচনে কারচুপি করা প্রায় অসম্ভব হবে। নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা থেকে জাল, মৃত ও ভুয়া ভোটারের নাম বাদ দিতে সক্ষম হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পরামর্শে প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ১৮ সেপ্টেম্বর নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন। সরকার খুব শিগগির ২০ মাসব্যাপী জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিতে পারে।
এটা বিব্রতকর যে, যে দুইজন রাজনীতিবিদ গণতন্ত্রকে অকার্যকর করে রেখেছিলেন, বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রে উত্তরণের দায়িত্ব তাদের উপরই ন্যস্ত হয়েছে। তারা কয়েক দশক একে অন্যের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যদিও সরকার তাদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার কথা বলছে। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন বর্জন রোধে সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের অব্যাহতি দিতে গিয়ে সরকারকে মূল্য দিতে হয়েছে। ২০০১ সাল থেকে পরবর্তী ৫ বছর বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এ মাসে সরকার বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে মুক্তি দিয়েছে। তারেক রহমান ছিল সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের কেন্দ্রবিন্দু। দুই বেগমের অনুসারীরা জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন। মনে হচ্ছে দুর্নীতির অভিযোগে যাদের শাস্তি দেয়া হয়েছিল তারা ছাড়া পেয়ে যাবে। ঢাকায় কেউ কেউ উদ্বিগ্ন যে, জেনারেলদের পক্ষে এত সব হজম করা কঠিন হবে। সেনাবাহিনীকে বহুদলীয় ব্যবস্থায় নিজেদের নিরাপদ প্রস্থানের পথ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু পুনর্গঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর উপর তাদের প্রভাব খুব সামান্য। পশ্চিমা সরকারগুলো বিগত দুই বছর সেনাবাহিনীকে দেশের বিশৃংখল রাজনীতি সুস্থ খাতে প্রবাহিত করার জন্য সমর্থন দিয়েছে। এখন তাদের সমর্থন জানানোর দিন শেষ হয়ে আসছে। বিদেশী সরকার এবং বাংলাদেশী কেউ সেনাবাহিনীকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। তবে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, জেনারেলগণ রাজনীতি থেকে বিদায় নাও নিতে পারেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামী জঙ্গি গ্রুপ জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যদের হুমকি দিচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সেনাবাহিনী ইতিপূর্বে এ জঙ্গি গ্রুপকে ধ্বংস করে দেয়ার দাবি করেছিল। গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতির ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল। জেনারেলদের পশ্চাদপসরণ অনিবার্য। তবে তারা যে ক্ষত রেখে যাচ্ছে তা বড় ধরনের নয় বলে মনে হচ্ছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

