আল্লাহর রাসূল (সা.) - এর যিন্দেগী ছিল খুব সাদা-মাঠা । তিনি নিঃস্ব ও দরিদ্রের মত যিন্দেগী যাপন করতেন । ধন-সম্পদ উনার নিকট এলে তা সাধারণ সাহাবীদের মধ্যে বিতরণ করে দিতেন । রাসূলে খোদা (সা.) মিসকীনদের মত জীবন-যাপন করার জন্য দোয়া করতেন ।
তিনি বলতেন, " হে আল্লাহ আমাকে মিসকীনদের জীবন দান কর, মিসকীন অবস্হায় আমার মৃত্যু দান কর এবং মিসকীনদের সাথে আমার হাশর কর ।"
উনার দোয়া কিভাবে উনার জীবনে প্রতিফলিত হয়েছিলো তার বিবরণ মা আয়েশা এভাবে দিয়েছেন, আল্লাহর রাসূলকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেয়া পর্যন্ত মোহাম্মদের পরিবার পরিজন একাধারে দুদিন পেট পুরে বার্লির রুটি খাননি । রাসূলের জীবনের অভাব অনটন সম্পর্কে অপর এক বর্ণনাতে মা আয়েশা বলেন, হে আমার বোনের ছেলে (উরওয়া) দুমাসে আমরা তিন চাদের উদয় দেখেছি কিন্তু মোহাম্মদের বাসগৃহে আগুন জ্বালানো হয় নি । আমি (উরওয়া) জিজ্ঞেস করলাম , কি জিনিষ আপনাদের বাচিয়ে রাখত ? তিনি বললেন, খেজুর ও পানি । অবশ্য (কোন কোন সময়) প্রতিবেশী আনসারদের শীতকালে দুগ্ধদানকারী উটনী ছিলো এবং তারা আল্লাহর রাসূলের জন্য দুধ হাদিয়া পাঠাত, আমরা সে দুগ্ধ পান করতাম । "
নবী সহধর্মিনীগণ রাসূলে খোদার জীবন সঙ্গিনী হিসেবে অভাব অনটনের জীবন বরণ করে নিয়েছিলেন । কোন সময়ে খেয়ে , কোন সময়ে না খেয়ে বা আধপেটা খেয়ে পরিতৃপ্ত ও সন্তুষ্ট থাকতেন । মহানবী (সা.) আধ্যাত্বিক জীবন ও পরকালের জীবনকে দুনিয়ার ক্ষণস্হায়ী জীবনের থেকে বেশী প্রাধান্য দিয়েছিলেন ।
কিন্তু উনারাও ছিলেন আমাদের মত মানুষ । তাই সময় অসময়ে মানবীয় চাহিদা মাথাচাড়া দিয়ে উঠত । মহানবী (সা.) উনার প্রিয় ও পবিত্র স্ত্রীগণের জন্য যে খেজুর ও অন্যান্য সামগ্রী নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন তাতে উনারে চাহিদা মোটেই পূরণ হত না । এদিকে নবুয়তের দায়দায়িত্ব ও কর্তব্য এত বিরাট ও ব্যাপক ছিলো যে তা উনার দেহ, মন ওও মগজের সমগ্র শক্তি এবং উনার প্রতি মুহুর্ত সম্পূর্ণ শুষে নিচ্ছিল । তাই পরিবার পরিজনের জন্য চেষ্টা-সাধনা করার তার বিন্দুমাত্র ফুরসত ছিলো না । অপরদিকে এ সময় মদীনায় কিন্চিত গণিমাতের মাল আসতে লাগল । কিন্তু এ সময় আল্লাহর রাসূল একের পর এক শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করছিলেন । যুদ্ধের ব্যায়ভার বহন করার পর্যাপ্ত ক্ষমতা ইসলামী রাষ্ট্র বা মুসলিম জনগণের ছিল না । সম্ভবত সময় সময় গণীমাতের মাল আগমণ লক্ষ করে পবিত্র সহধর্মীনিগণ ভাতা ও রসদ বৃদ্ধির দাবী উত্থাপন করলেন । তাদের এ দাবী পূরণের সামর্থ মহানবীর না থাকার কারণে তিনি মানসিক অশান্তি ভোগ করছিলেন ।
এ সম্পর্কে মুসলিম শরীফে উল্লেখিত হয়েছে জাবির বিন আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন, একদিন আবু-বকর (রা.) এবং উমর (রা.) মহানবীর খেদমতে হাযির হয়ে দেখলেন যে, মহানবী (সা.) এর স্ত্রীগণ উনার চর্তুপার্শ্বে বসে রয়েছেন এবং তিনি নিরুত্তর । তিনি ওমর(রা.) কে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি যেভাবে দেখছ তারা আমার চর্তুপার্শ্বে বসে রয়েছে এবং আমার কাছে খরচের জন্য টাকা পয়সা দাবী করছে । আবু-বকর (রা.) ও উমর (রা.) তাদের কন্যাদ্বয়কে তিরস্কার করলেন এবং বললেন, তোমরা আল্লাহর রাসূলকে উত্তোক্ত করছ এবং এমন জিনিষ দাবী করছ যা উনার কাছে নেই ।
এমন অবস্হার প্রেক্ষাপটে মহান আল্লাহ পাক আয়াত নাযিল করলেন,
"হে নবী , তোমর স্ত্রীদের বল তোমরা যদি দুনিয়া ও তাহার চাকচিক্যই পাইতে চাও তাহা হইলে এস আমি তোমাদেরকে কিছু দিয়া ভালোভাবে বিদায় দেই । "
"আর যদি তোমরা আল্লাহ ও তাহার রাসূল এবং পরকলের ঘর পাইতে চাও , তাহা হইলে জানিয়া রাখিও তোমাদের মধ্যে যাহারা সৎকর্মশীল, তাহাদের জন্য আল্লাহ বিরাট পুরস্কার নির্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন ।"
অভাব অনটনের কষাগাতে যারা অস্হির এবং অধীর হয়ে উঠেছিলেন আল্লাহ সুবাহানাল্লাহ তায়ালা উনাদের সামনে দুটা পথ তুলে ধরলেন ।
এক, তারা ইচ্ছা করলে দুনিয়ার আনন্দ স্ফুর্তি, সৈান্দর্য ও চাকচিক্যের জীবন গ্রহণ করতে পারে । দু্ই, আল্লাহ, তার রাসূল এবং সুখ-শান্তি ভরা আখিরাতের গৃহ তারা বেছে নিতে পারে ।
এটা ছিলো এক বিপ্লবী ঘোষণা । কোন সমাজ এবং কোন দেশে কখনও এ দুর্লভ আযাদী স্ত্রীদেরকে দেয়া হয়নি । দুঃখ দারিদ্রের জীবন গ্রহণ বা বর্জন করার এ অধিকার প্রদান না করা হলে সন্দেহ প্রবণ মানুষের মনে এ সন্দেহ চিরদিনের জন্য থেকে যেত যে, কট্টর যিন্দেগী বরণ করে নেয়ার জন্য আল্লাহর রাসূল তার স্ত্রীদের বাধ্য করেছিলেন ।
রাসূলে খোদার বিবিদের সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হওয়ার পর মহানবী (সা.) সর্ব প্রথম উম্মূল মুমেনিন আয়েশার হুজরায় আসলেন । তিনি বললেন, হে আয়েশা, আমি তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব কিন্তু তার জবাব তোমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ করে দিলে উত্তম হবে ।
মা আয়েশা (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) কি কথা ? মহানবী (সা.) সূরায়ে আহযাবের উক্ত আয়াত তেলাওয়াত করে শুনালেন ।
আয়েশা (রা.) বিনিতভাবে জবাব দিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ করার কি প্রয়োজন রয়েছে ? আমি আল্লাহ, তার রাসূল এবং আখিরাতের ঘর এখতিয়ার করছি ।
রাসূলে খোদা (সা.) উনার উত্তর শুনে খুব খূশী হলেন ।
বলাবাহুল্য প্রত্যেক স্ত্রীকে তিনি সূরা আহযাবের আয়াত তিলাওয়াত করে শুনিয়েছিলেন এবং তাদের প্রত্যেকে মা আয়েশার অনুরূপ জবাব দিয়েছিলেন । এতে অনুমিত হয় যে, উনারা মহানবী (সা.) কে অন্তর থেকে ভালোবাসতেন কিন্তু অসহনীয় অর্থনৈতিক অভাব অনটনের কষাঘাতে উনার জর্জরিত ছিলেন ।
সূত্রঃ সংগ্রামী নারী, মুহাম্মদ নুরুজ্জামান । আধুনিক প্রকাশনী, ঢাকা ।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মে, ২০১১ রাত ৩:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



