(লেখাটা আমার ভীষন প্রিয় বন্ধুর অতিপ্রিয় কুকুরের নামে উৎস্বর্গীকৃত।)
একরুমে থাকে ওরা গাদাগাদি করে সাত আটজন। গেস্ট আসলে কখনো সে সংখ্যা গিয়ে বেড়ে দাড়ায় বার কিংবা চৌদ্দজনে।কারোই তেমন কাজ কর্ম প্রায় নেই বলতে গেলে।সবাই তাদের দেশ থেকে পাঠানো টাকা কিংবা গচ্ছিত কিছু অর্থ বা অন্যের ঘাড়ে বসে খায়। বাড়িখানা অনেকটা বারোয়ারি হোস্টেলের মত।লতায় পাতায় পরিচিত মস্কো কিংবা মস্কোর বাইরের কেউ সমস্যায় পড়লেই কোন অগ্রিম তার বার্তা নাদিয়েই এখানে এসে দু চার পাচ দিন থেকে শুরু করে কয়েক মাস অব্দি থেকে যায়। কেউ আসে আড্ডার লোভে দুয়েকজন আসে অর্থাভাবে কেউ আসে ভিসার জন্য কেউ আসে প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে আবার কেউবা আসে অসতর্ক মুহুর্তের সামান্য ভুলের জন্য অকালে সন্তানের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে বাচার জন্য।
সারাদিন কাটে তাস খেলে রকমারি রান্না করে টেলিফোনে গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর করে- কখনো মদ খেয়ে মাতলামী হৈ চৈ হুল্লোড় আর কিঞ্চিৎ হাতাহাতি মান অভিমান বাদানুবাদ আর ভবিষ্যত পরিকল্পনায়।প্রতিদিন নতুন নতুন গেস্ট আসে আর আড্ডা জৌলুস বাড়ে।অতিথি যখন বিদেয় হয় তখন কখনো হাঁফ ছেড়ে বাচে কিংবা কষ্টের ছায়া নামে চোখে মুখে।সেখানে ঘুমোনো আর খাওয়া দাওয়ার পর্ব চলে ভীষন আগোছালো আর বিস্মৃঙ্খল ভাবে। যার যখন খুশি খাচ্ছে-যার ইচ্ছে দু দন্ড জিরিয়ে নিচ্ছে।
এভাবে মোটামুটি উত্তাপবিহীন কিছুটা একঘেয়ে এই দিনগুলিতে বেশ অন্য রকম এক আমেজ আনল তাদের এক বন্ধুর বিয়ে। সে থাকে মস্কো থেকে বেশ ক’শ কিলমিটার দুরে। দেশ থেকে বহুদুর রুশ দেশে এই প্রথম কোন বন্ধুর বিয়ে তাই সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল সদলবলে বিয়েতে যাবে।রুশ বিয়েতে মজা বলতে সারারাত পান উৎসব আর নাচের অছিলায় জড়াজড়ি লেপ্টলেপ্টি।
কুকুরের প্রতি এমনিতে আনিসের তেমন আকর্ষন কখনোই ছিলনা।সদলবলে বাইরে ঘুরতে গিয়ে কোন এক সকালে সেই শহরেই রাস্তার ধারে বসে এক বৃদ্ধার কিছু কুকুর ছানা বিক্রি করতে দেখে কেন যেন ঝোকের মাথায় আগপিছু না ভেবে কিনে ফেলেছিল একখানা।
বন্ধুরা তার এই পাগলামি দেখে ঠাট্টা মস্করা করেছিল খুব-যেখানে মানুষের থাকার জায়গারই অভাব সেখানে সে কুকুরছানা রাখবে কোথায়? আনিস হয়ত হয়ত সেই কুকুরছানাটাকে সেখানেরই ফেলে আসত কিংবা কারো উপহার দিয়ে দিত। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই একগুয়ে একরোখা বন্ধু আমার বন্ধুদের ইয়ার্কি ঠাট্টার জবাব দিতে পণ করল সেটাকে নিজের কাছেই রাখবে।
অবশেষে সেই কুকুরছানা দীর্ঘ পথ ট্রেনে চেপে মস্কোতে এল আনিসের সেই ডেরায়।
কুকুরের বাচ্চা কোন নিয়ম নীতি মানেনা-এত ছোটযে সে কোন প্রশিক্ষন দেয়ার প্রশ্নই আসেনা। সারাদির ঘর জুড়ে ছুটোছুটি করে খাবার যতটুকু খায় ছড়ায় তার থেকে বেশী। যেখানে সেখানে ঘুমোয়-প্রাকৃতিক কর্ম গুলো লেপ কাথা কিংবা কার্পেটের উপরেই অবলীলায় সারে।সে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার! সবাই দুদিনেই ত্যাক্ত বিরক্ত!
ওদিকে সবার যন্ত্রনা আর বিরক্তি দেখে আনিসের আনন্দ যেন ধরে না। এতদিন পরে সে একটা মনের মত কাজ পেয়েছে যেন। কুকুরের প্রতি তার আদিখ্যেতা দেখে সবারই গা জ্বলে যায়।
একঘেয়ে দিনগুলিতে সাঝে মধ্যে বৈচিত্র আনে মিলন ভাই।তিনি সবার বয়সে একটু বড়তো বটেই তারইপরে কিঞ্চৎ ধনবান। আসার পথে ব্যাগ ভর্তি করে খাবার আর মদ নিয়ে আসেন।বাসায় এলেই হুলস্থুল শুরু হয়ে যায় তাকে নিয়ে-সেই রাতটাতে সবাই মেতে ওঠে উৎসব আনন্দে।
একটু ধার্মিক শ্রেনীর কয়েক জন কুকুরকে করেছে অস্পৃশ্য আর মদকে হারাম বলে ছুয়ে দেখেনা। কিন্তু উৎসবে তারাও শামিল হয়-উপভোগ করে সবার মত করেই।
সেদিন গভীর রাত অব্দি চলল খানা পিনা আর গল্প গুজব-স্বভাবতই দুয়েকজন মাতাল তখন।স্পস্টভাষী রফিক(ছদ্মনাম)সেই তথাকতিথ ধার্মিক কুকুর বিরোধীদের প্ররোচনায় একটু বেশীই গিলেছিল সেদিন।আর মতাল হয়েই নেশার ঘোরে কখন কিভাবে যেন আনিসের সাথে শুরু হল তর্ক বিতর্ক-অনুঘটক সেই কুকুর ছানা!
প্রথমে মৃদু উত্তেজনা-দুয়েকজনের উস্কানীতে লেগে গেল হাতা হাতি।এমন ঘটনা এখানে বিরল নয় কিন্তু। মাতাল হয়ে হাতাহাতি প্রায়শই-সবারই এটা গা সওয়া হয়ে গেছে। আচমকা ওরে বাবারে মারে বলে শহিদের বিকট চিৎকার।প্রথমে আঁতকে উঠল সবাই-কিন্তু পরক্ষনেই হাসাহাসি গড়াগড়ি।
ঘটনাটা এমন;উত্তেজনার এক ক্ষনে আনিসের সাথে হাতাহাতি শুরু হতেই কোত্থেকে সেই কুকুর ছানা দৌড়ে এসে কামড়ে ধরেছে শহিদের অন্ডকোষ!শহিদ চিৎকার চেচামেচি করছে আর আর ঘরময় দৌড়াচ্ছে কিন্তু তখনো সেই পিচ্চি কুকুর সেইখানটায় কামড়ে ধরে ঝুলে আছে আর রাগে গড় গড় করছে।অবশেষে সবার অনুরোধে আনিস-ই গিয়ে ছাড়িয়ে আনল তাকে।
সেই থেকে আনিস বা তার কুকুরকে কেউ কিছু বলে না ভয়ে।ওদিকে সেই কুকুরছানার প্রতি আনিসেরও আদর ভালবাসা আদিখ্যেতা উত্তর উত্তর বেড়েই চলছিল।
ওদিকে জাতে জার্মানী শেফার্ট সেই কুকুর ছানাও তার আদরে আর প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠছিল তরতর করে।আনিস কুকুরটাকে দুবেলা রান্না করে নিজের হাতে খাওয়ায়,নিজে হপ্তায় দু হপ্তায় একবার গোসল না করেলেও কুকুরটাকে মাঝ মেধ্যেই শ্যম্পু সাবান ডলে সাফসুরোত করে।রান্না ঘরে চলে কুকুরের রান্না নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট।কুকুরের রান্নার জন্য বাসন কোসন আর রান্না ঘরের চুলার দখল থাকায় নিজেদের রান্না লাটে ওঠে। মাঝে মধ্যে গোসল খানায় কুকুরের পশমে সয়লাব আর সারা বাড়িতে তার ছড়ানো উচ্ছিষ্ট আর মল মুত্রের ছড়াছড়িতে বাকি সব হোস্ট গেষ্ট অল্প কদিনেই ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে উঠল। দুচারজন সকাল বিকেল ফন্দি আটে কি করে ওটাকে তাড়ানো যায়। তবে কেউ কেউ যে আদর করতনা তা কিন্তু নয়।আগেই বলেছি কিছুটা একঘেয়ে সেই প্রবাস জীবনে একটু অন্যরকম স্বাদ এনে দেবার জন্য তার হিতাকাঙ্খীও মিলে গেল দু’একটা।
জর্মন শেফার্ড নাকি নেকড়ের বংশধর। পূর্ব পুরুষের জাত মান রাখতে সে দাত নখের ধার শানাতে গিয়ে কত জনের চামড়ার জুতো আর পশমী কোট যে ছিন্ন ভিন্ন করল তার ইয়ত্বা নেই।
একটা জাত কুকুরকে কিভাবে ট্রেইন্ড করতে হয় সে বিদ্যে কারোই জানা ছিলনা। তবুও একে ওকে জিজ্ঞেস করে ঠেলা গুতো গাল মন্দ দিয়ে তাকে একটু লাইনে আনলেও-ওদের এই ছন্নছাড়া জীবনের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে সেও মাঝে মধ্যে উদ্ভট আচরন করে।
বেশ কদিন বে ওয়ারিস ঘুরে বেড়ানোর পরে অবশেষে কোন পূর্ব পুরুষের পদবি ছাড়াই তার একখানা নাম ঠিক হল ‘জো’। আমার ধারনা হয়তো চু চু শব্দ থেকেই জো নামের উৎপত্তি।সহজ নাম যখন তখন সবাই ডাকে। জো ও মহা উদ্যোমে এর ঘাড়ে ওর মুখে আচড় মেরে লাফ ঝাপ দিয়ে এলোমেল ছোটে। খাবারের প্লেট উন্মুক্ত থাকলেই চেটে পুটে স্বাদ নেয়-বেকুব কুত্তা তার উদরের ধারন ক্ষমতা আঁচ না করতে পেরে উল্টা পাল্টা খেয়ে অবশেষে বমিতে রুম ভাসায়।...ক্রমশ
প্রথম পর্ব। পরবর্তী পর্বে সমাপ্ত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

