somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কাহিনীর শিরোনাম 'মা' হবার কথা ছিল

২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ দুপুর ২:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


অফিসের কাজের ছেলেটা আচমকা চলে যাওয়ায় ভারী বিপদে ছিলাম! নীচতলা থেকে তিন তলা পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করা। বার বার গেট খোলা,ফুট ফরমায়েশ খাটা, অতিথি বা বন্ধু এলে তাদের যৎসামান্য আপ্যায়ন করার জন্য একটা অল্প বয়েসী ছেলে খুব জরুরী ছিল।
আমার বাসায় গ্রাম থেকে নিয়ে আসা ষোল সতের বয়সের যে মেয়েটা কাজ করে সে-ই একদিন অনুরোধ করল দেশ থেকে তার ছোট ভাইকে এনে যেন আমার কাছে রাখি।
-বয়স কত রে?
-বার তের হবি।
-এর আগে আর কাজ টাজ করেছে কোথাও?
-হ্যা করছিল- এক এমব্রুডাইরি ফ্যাকটোরিতে ছিল আঠার মাস।ওরা ওরে আটকায় রাখছিল। মা ম্যালা খুইজ্যা ওরে বাইর কইরছে। মাস খানিক হইল বাইত্তে আইছে। মা এহন ভাল কাওরে ছাড়া ওরে দিব না।
-ঠিক আছে তোর মারে জিগেস করিস আমার এখানে পাঠাবে কিনা?
-জে আচ্ছা জিগাবোনে।
ক’দিন পরে আমিই ফের জিজ্ঞেস করলাম
-কিরে তোর ছোট ভাইয়ের খবর কি?
-মা-রে কইছি। মা পাঠাবি। ওর কুনো ভাল জামা কাপড় ন্যাইতো হের লিগা আমি বেতন পাঠাইলে জামা কিন্যা পাঠাবি।
-তোর মাকে বল জামা কাপড় কাপড় কেনা লাগবে না। আসলে আমি কিনে দেব।
-ঠিক আছে কোবোনে।
আসার ভাড়াও নাই নিশ্চই। ওকে বললাম, ওর ভাইকে যেন অমুকের কাছে পাঠিয়ে দেয়-আমি আনানোর ব্যাবস্থা করব।
দুদিন বাদেই ছেলেটা এসে হাজির। প্রথম দেখায় আমি বেশ হতাশই হয়েছিলাম। এত ছোট!
সাস্থ্যের গড়ন ওর বোনেরই মতন মোটার ধাত।খাটো,বোতাম ছেড়া একটা শার্ট গায়ে-পেটটা বেঢপ ভাবে ফুলে আছে। পরনে একটা নেভী ব্লু রঙ জ্বলা হাফ প্যান্ট। পিছনের পকেট দুটো মনে হচ্ছে সামনে এনে তাপ্পি মেরে জোড়া লাগানে।মনে হয় প্যান্টখানা উল্টো পরেছে। পায়ে বেশ উচু হিলের রেক্সিনের তেমনই জীর্ন সেন্ডেল।তবে গায়ের রঙ কালো হলেও চেহারাটা বেশ মায়াবী।
জড়তা নেই এক্কেবারে।বুঝলাম বয়সের তুলনায় বেশ পেকে গেছে! হালকা বাদামী একজোড়া জীবন্ত চোখ দৃস্টি আকর্ষন করে।
নাম জিজ্ঞেস করতেই হেসে ফেলল, বলল ‘শরিফ’।
হাসিতে ওকে খুব ভাল লাগল-কিন্তু একটু শংকিত হলাম। ওর বোনের মত নাতো?
ওই মেয়ের সারাক্ষন নাকি হাসি পায়! তাকে ভুলের জন্য বকা বকি করলেও রান্না ঘরে বসে মুখে আচল দিয়ে ফুলে ফুলে হাসে।আর কমিউনিকেশন সহজলভ্য হওয়ায়- মেজাজ একটু খারাপ থাকলে ওর মাকে ফোন করে ঝগড়া করে। কথা বলা শেষে কি ভাবে তাকে অপদস্থ করেছে সেইটে ভেবে আবার অনবরত হাসতে থাকে!
যাহোক শরিফকে নিয়ে আসলাম আমার ফ্যাক্টরি কাম অফিসে। ফ্যাক্টিরির পোলাপান ওকে দেখে আমার মতই একটু শকট্ হল। এই পিচ্চি কি কাজ করবে?
কিন্তু দু চার ঘন্টাতেই সবাই বুঝে গেল, সাইজে খাট হলে কি হবে- বেশ ঝানু মাল সে।এখানেই ওর থাকা খাওয়ার ব্যাবস্থা হল।

পরদিন-ই সে আমার কাছে এসে হাজির।
-‘বস একখান প্যান কিনা নাগবো।আমার একখানই প্যান।‘ খাটি গোয়ালন্দী একসেন্টে।
-আর কি লাগবে?
-আর একখান গুঞ্জি আর সেন্ডেল।
-ঠিক আছে তুই যা কালকে কিনে দিব।
পরদিন আরেকজনকে দিয়ে পাঠালাম নান্নু মার্কেটে ওর জামা কাপড় কেনার জন্য। ফিরে আসল ওর সা্ইজ থেকে একফুট লম্বা একটা জিন্সের ফুল প্যান্ট আর দু-ইঞ্চি বড় একটা স্যান্ডেল নিয়ে।
প্যান্টটা নিচে গুটিয়েছে হাত খানেক- কোমড়ের কাছে ঢিলার জন্য সবসময় ধরে রাখতে হচ্ছে। সেই প্যান্ট পরে সিড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে মাঝে মধ্যেই হোচট খাচ্ছে।
যাকে ওর সাথে সপিং এ পাঠিয়ে ছিলাম তাকে গিয়ে ঝাড়লাম।ওকে কেন ফুল প্যান্ট কিনে দিয়েছে এই জন্য।
ও বলল,
-উপায় ছিলনা।ও জীবনে ফুল প্যান্ট পরে নাই। গোঁ ধরেছিল নাকি ফুল প্যান্ট ছাড়া অন্য কিছু কিনবে না।
এই নিয়ে আমি রাগ করলে সে আবার ফিক ফিক করে হাসে। পিচ্চি বুঝে গেছে এই লোকরে ভয় পাওয়ার কিছু নাই!
পরদিন আসল ফের অন্য এক আবেদন নিয়ে,
-বস আপনের ফোন থিক্যা একখান ফোন দিবেন?’
আমি কপাল কুচকে জিগেস করলাম,
-কাকে?
-আমার মারে। আইস্যা কথা হয় নাইক্যা।মার মনে হয় মনডা খারাপ। এট্টু কথা কইতাম।‘
-তোর মা ফোন পাইল কোথায়? এই না শুনলাম সারা বছরই নাকি সে প্রায় না খেয়ে থাকে?
সে ফের হেসে ফেলল,
-আরে না মায় ফোন পাবি কই। পাশের গেরামে একজন আছে হেই ডাইক্যা দিবে।‘
-ও ঠিক আছে। কিন্তু আমার ফোন থেকেতো ফোন করা যাবেনা। তুই এই দশ টাকা নিয়ে যা বাইরে থেকে ফোন করিস।
মার সাথে কি কথা হয় সে আবার সুযোগ পেলে আমার কাছে এসে বলে।
-মায় জিগাইল খাওন দাওন ঠিক আছে কিন্যা।মারে টারে নাকি? কামকাজ হিগতিছি কিন্যা?এই গুল্যা। আমি কইলাম, তুমি চিন্তা কইরনা-আমি ভাল আছি। এইহানকার সবাই খুব ভাল।‘

ফ্যাক্টরিতে ওর অবস্থা এতদিনে বেশ পোক্ত হয়ে গেছে। ফ্যাক্টিরর হেড কারিগর সায়েম বিয়ে করেছিল অল্প বয়সে। বছর দু'য়েক আগে বনিবনা না হওয়ায় বউ চলে গেছে। সাথে করে তার ছেলে-মেয়ে দুটোকেও নিয়ে গেছে। তার ছেলের বয়স শরিফের মতই হবে। সেজন্য শরিফকে সে খুব আদর করে।
আর মেসের বুড়ি বুয়ার চার কুলে কেউ নাই। সেও তাকে বেশ আদর প্রশ্রয় দেয়।
খাটি গ্রাম্য ভাষায় কথা বলায়, ওকে নিয়ে সারাক্ষনই সবাই হাসাহাসি করে। সেও রেসপন্স করে সমান তালে।
এভাবে মাস দুয়েক চলে গেল। সপ্তায় দু-চারদিন মার সাথে ও কথা বলবেই। আর সুযোগ পেলেই সবার কাছে মায়ের গল্প করে। ব্রাক থেকে লোন নিয়ে মা একটা ছাগল আর গরু কিনেছে নাকি। সেই ছাগল আর গরুরে খাওয়াতে গিয়েই নাকি ওর মার না খেয়ে থাকার অবস্থা! সেই ছাগলের নাকি বাচ্চা হয়েছে- দুধ দেয় এখন। সপ্ন দেখে সে গ্রামে গিয়ে সেই ছাগলের দুধ খাবে আর বাচ্চাদের নিয়ে খেলবে। ওদিকে গরুটাও নাকি গর্ভবতী।
বলতে গিয়ে খুশীতে ওর চোখ জ্বল জ্বল করে।
কাজের মাঝে মাঝে ফাঁকি যে দেয় না তানা। আচমকা না বলে কয়ে উধাও হয়ে যায়। নীচ তলার কোন এক কোনে গিয়ে বসে থাকে। কখনো না ডাকলেও চার-পাচবার দৌড়ে আসে। আমারে ডাইকসেন?
আবার কখনো ডাকাডাকি করলেও টু-শব্দ করে না।
ফ্যাক্টিরির সবাই বলে, মাঝে মধ্যেই নাকি ও মাইর খাওয়ার কাম করে। কিন্তু কেউ মারতে পারেনা ওর হাসির জন্য। এত প্রানবন্ত আর নিস্পাপ এর হাসি!

মাঝে মধ্যে সুযোগ পেলে- বসের খোলস ছেড়ে ওদের সাথে একই ফ্লোরে কাজ করি। তখন সবার সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে মেশার সুযোগ পাই।
একদিন শরিফকে কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম, ওর আগের কাজের ব্যাপারে?
কাজ করত সে সাভারের কাছে এক এ্যমব্রোডোয়ারী ফ্যাক্টরিতে।ওর সাথে সম-বয়সী আর আট-দশটা ছেলে ছিল। মালিক নিজেই তার ফ্যাক্টরির হেড কারিগর ছিল। ওরা ছিল তার চ্যালা-চামুন্ডে।
সেখানে নিয়ে আসার পর আঠারো মাস নাকি ওদের কাউকে বাড়িতে যেতে দেয়নি। এমনকি ফোনে যোগাযোগও করতে দেয়নি।
প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে রাত তিনটে পর্যন্ত কাজ হত।এর মধ্যে খাওয়ার সময় টুকু ছাড়া ওদের কোন বিশ্রাম ছিলনা। শ্রান্তিতে ক্লান্তিতে ওরা একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেও বেদম মার খেতে হত। হাতের কাজ একটু এদিক ওদিক হলেই মার। ঘুম থেকে একটু দেরী করে উঠলেও শাস্তি। প্রতিদিন নাকি নিদেন পক্ষে দু-বার মার খেত সে। সেই ভয়ঙ্কর পিশাচ মানুষটা নাকি ওদের পেটানোর সুযোগ না পেলে তার বউ আর তিন বছরের বাচ্চাকে ধরে পেটাত।
কি ভয়ঙ্কর পারভার্ট!
গোসল করার জন্য কয়দিন আগে বুকিং দিতে হয়। সারা গা নাকি খোঁস পাঁচড়ায় ভরে গিয়েছিল তার।
সেখানকার সেই জঘন্য পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে চিরস্থায়ী ভাবে নাকি শ্বাস কষ্ট হয়েছে তার।
আঠার মাসে কোন বেতন দেয়নি-তিন মাস ছ’মাস পর পর নাকি দশ টাকা করে দিত। সুখের মধ্যে ছিল শুক্রবারের ছুটি-বিকেলে একটু ঘুরতে বেরুতে দিত।
-পালাস নাই ক্যান?
-কি কন বস। হের বিরাট একখান রাম দাও ছিল। আগে নাকি মানুষ খুন কইরত। পালালি যদি মাইরা ফ্যালায়!
একবার কেন যেন ওদেরকে নিয়ে অন্য এক শহরে যাচ্ছিল সে। পথের মাঝেই শরিফের গেরাম পড়ে। শরিফ নাকি মাকে এক নজর দেখার জন্য খুব কান্নাকাটি করেছিল। সে নাকি চলন্ত গাড়ি থেকে নেমে দৌড় দিয়েছিল ওর বাড়ির উদ্দেশ্যে- কিন্তু সেই পাষন্ড তাকে যেতে দেয়নি। ধরে নিয়ে এসেছে ফের!
রোজার মাস চলে এসেছে শরিফ আর তার বোন দিন গুনতে শুরু করেছে। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবে বলে। বাড়ি বলতে ওদের বিরান চড়ের ঢিবির উপরে শন আর বাঁশ দিয়ে দাড় করানো দেড়-খানা ঘর।
শরিফের বড় আরেক বোন আছে। সে নাকি অনেকদিন বেকার থেকে কিছুদিন আগে ঢাকায় এসে গার্মেন্টস এ চাকরি নিয়েছে।ওর মার এখন দারুন সু সময়! তিন ছেলে মেয়েই ঢাকায় চাকরি করে।
খড়-কুটো কুড়িয়ে হাতে দু-চার টাকা যা সে পায়- নিজে না খেয়ে সেই টাকা দিয়ে ছেলে মেয়েকে ফোন করে নয়তো জমিয়ে রাখে ঈদে ওদের ভাল মন্দ খাওয়াবে বলে।
এর মধ্যে সায়েম ওর মাকে একটা শাড়ি দিয়েছে। আমিও দিয়েছি। সেই শাড়িগুলোর বার বার ভাঁজ খুলে দেখে সে- কিভাবে মাকে ঈদের আগে পাঠাবে এই নিয়ে তার বিরাট টেনশন! হাতে তার দু-চার টাকা আসলেই এখন আর চানাচুর ক্যান্ডি না খেয়ে মায়ের জন্য চুড়ি, টিপ কেনে।
সেদিন কে একজন লুকিয়ে আমাকে দেখাল তার মায়ের জন্য কেনা লাল চুড়ি গোছা।
আর শরিফ এসে বলল,
-বস মায় ছাব্বিশ রোজায় আমারে আর বুনি রে যাইতে কইছে।
আমি কপাল কুঁচকে বললাম,
-ক্যান- এত আগে ক্যন?
-আমি রাজি হই নাই। আমি গেলি-ফ্যাক্টরির সমস্যা হবেনে। মায় কইল, সাতাইশ এ রোজায় নিকি মোল্লা খাওয়াবি।‘
-কি বলিস- মোল্লা খাওয়াবে মানে? তোর মাতো নিজেই খাইতে পায়না আবার মোল্লা খাওয়াবে কি?
মুখটা সে একটু ম্লান করে বলল,
-ওই দিন বাপে মইরছেতো।
-তোর বাপে কিভাবে মরেছে?
-খারাপ বাতাস নাইগ্যা।
-তখন মোল্লারা কই ছিল-ঝাঁড় ফুক দিয়ে তোর বাপেরে বাচাইতে পারে নাই?
আমার কথা তার মনে ধরল।‘ এক ফাঁকে সে বাসায় গিয়ে বোনের সাথেও ঝগড়া করে আসল,'যেই মোল্লারা ওর বাপেরে বাচাইতে পারে নাই তাগেরে খাওয়াবে ক্যান?‘
ওর বোন আবার এই সব ব্যাপারে ভীষন উৎসাহী মনে হল। সে উল্টো ওকে বলল’ মা কইছে তোরে দশ বার জনের রান্ধার জন্য একখান হাড়ি কিনব্যার।‘

এইসব কথা শরিফ সুযোগ পেলে আমাকে এসে বলে-ভাবসাবে মনে হল,’এরকম একটা হাড়ি কিনলে খারাপ হয়না।‘
বিশ রোজা থেকে শুরু হল ওর আরেক টেনশন! বাড়ি যাবে কার সাথে? ওর বোনতো ছাব্বিশে রোজায় চলে যাবে, ও যাবে ক্যামনে কার সাথে?
ফ্যাক্টরিতে ওর আশে পাশের এলাকার অনেক ছেলে থাকলেও, সবাই ওকে নিয়ে মজা করছে। জনে জনে যাকেই জিজ্ঞেস করে সেই বলে,এবার ঈদে বাড়ি যাবে না।
আর সে সব অনুযোগ অভিযোগ নিয়ে আমার কাছে আসে। কাজের সময় বিরক্ত করে বলে ধমক-ধামকও খায়। আমি ওকে বার বার নিশ্চিন্ত করলেও ও কেন যেন ভরসা পায় না।
ছাব্বিশে রোজায় বিকেলের পর থেকে আকাশ মেঘলা। গুড়ুম-গাড়ুম আওয়াজের সাথে বৃষ্টিও হয়েছে কয়েক পশলা।
শরিফের বোন সকালে চলে গেছে। গত সন্ধ্যেয় দুই ভাই-বোন ইফতারের পরে অনেক্ষন গল্প করেছে! হয়তো ঈদে গিয়ে দেশে কি ভাবে মজা করবে এইটেই ছিল মুখ্য আলোচনার বিষয়।
আমি রাত এগারটার দিকে অফিস থেকে বের হতে গিয়ে দেখি মুল ফটকের কাছে চাবি হাতে মেঝের উপর শরিফ বসে আছে। মাথার চুল এলোমেলো –চোখটা টক টকে লাল!
-কিরে কি হয়েছে তোর?’ বলে ওর মাথায় হাত দিতেই ও ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেলল। পিছন থেকে আরেকজন বলল,
-বস সন্ধ্যার পর থিকাই ওর ওর শরিরটা খুব খারাপ। একবার মাথা ঘূইরা সিড়ি থেকে পইড়া গেছিল।
-তার মানে?
আমি রাগারাগি করলাম, আমাকে কেন জানানো হয়নি। ওকে কেন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়নি বলে।এখুনি ডাক্তারের কাছে নিতে বলে টাকা দিলাম।
পরে ফোন করে জেনে নিলাম তেমন গুরুতর কিছু নয়। রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে।
ওদিন সারা রাত নাকি শরিফ ঘুমায়নি অব্যাক্ত যন্ত্রনায় সে কেদেছে।‘পরদিন সেই বুড়ি বুয়া বলেছিল আমায়।
ভোর আটটায় সেলফোন খানা সুরেলা শব্দে বেজে উঠল। এত সকালে আমার সাধারনত ফোন আসেনা। ঘুম চোখে বিরক্তি ভরে ‘হ্যালো’ বলতেই শুনলাম এক মর্মবিদারক এক সংবাদ!
গত রাতে শরিফের মা মারা গেছে!
কি ভয়ঙ্কর কথা, ওর মার নাকি কোন অসুখ-বিসুখ ছিল না। বেশ শক্ত পোক্ত মহিলা ছিল সে! তবে কিভাবে?
এ খবর আমি শরিফকে ক্যামনে দিব? ফ্যাক্টিরর কয়েকজনকে ফোন করলাম।ওরা কেউ ফোন ধরল না।
কোন মতে মুখে পানি ছিটিয়ে আমি নিজেই চলে আসলাম ফ্যাক্টিরতে। রাস্তা থেকেই শুনলাম চিৎকার করে শরিফের কান্নার শব্দ! বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল।
‘কোন পাষন্ড যেন এতক্ষনে ওকে বলে দিয়েছে’।
ভিতরে ঢুকে দেখলাম সেই উল্টো হাফ প্যান্ট খানা পরে খালি গায়ে চেয়ারে বসে হাঁউমাঁউ করে কাঁদছে।
তার চারিদিকে ছোট-খাট একটা জটলা! সবাই সান্তনা দিতে ব্যাস্ত। বুড়ি বুয়া তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলছে,
-তুই কাদিস না। আমরা মোবাইল কইরার খবর নিছি। তোর মা মরে নাই- মেডিকেলে আছে। তোর মা মইরবার পারে না। তুই গিয়া দেখবি সে ঠিক হইয়া গ্যাছে।‘
সবার সান্তনা ও আশ্বাসে সে কি বুঝল কে জানে কিন্তু কান্না থামল। কিন্তু ভিতরে তার রক্তক্ষরন- টলমল জলভরা অসহায় উদাস নয়নে তাকিয়ে রইল জানালা দিয়ে আকাশ পানে! সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভয়ঙ্কর আক্রোশে যেন বুকটা দমকে দমকে কেঁপে উঠছে...

(শরিফের মা' ছোট্ট সেই ঘরটাতে একাই থাকতে। ওর কোন আত্মীয় পরিজন নেই। ওদের বাড়ি থেকে কয়েকশ হাত দুরে গ্রামের শুরু। ওর মা সেদিন ঘর লেপে, ছেলে মেয়েদের জন্য পিঠার চাল কুটে-পরদিন মোল্লা খাওয়ানোর যোগার-যন্ত করে,সন্ধ্যের দিকে ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টির মুখে রান্নাঘরে গিয়েছিল খড়ি রাখতে। ঠিক সেই সময়ে আকস্মাৎ বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়। সারারাত সেইভাবে তার মৃত দেহখানা দাড়িয়ে ছিল। সকালে পাশের গ্রামের কেউ একজন তাকে ডাকতে এসে সাড়া না পেয়ে রান্না ঘরে গিয়ে তাকে মৃত আবিস্কার করে। শরিফকে তখুনি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম ওর গ্রামের বাড়িতে।
শরিফ গিয়ে ঠিক জানাজার মুখে লাশ পেয়েছিল। কতিথ আছে বজ্রপাতে মৃত মানুষের হাড় গোড় দিয়ে নাকি অনেক দুরারোগ্য রোগের অব্যার্থ পথ্য হয়(নেহায়েৎ গাজাখুরি গপ্পো!) তাই ওর মায়ের লাশ তুলে নিয়ে যাবে ভেবে বাড়ির উঠোনেই কবর দিয়েছিল।
তবুও শান্তি নেই। কিছু মতলববাজ ফেরেব্বাজ লোক সারাদিন রাত পায়তাড়া করেছিল সেই লাশ তুলে নেবার। কখনো টাকার লোভ কিংবা ভয় দেখিয়ে সেই লাশ নেয়ার ফন্দি এঁটেছে তারা। শরিফরা তিন ভাইবোন বহু দিন-রাত সেই কবরখানা আঁকড়ে ধরে পড়ে ছিল মায়ের লাশখানা চুরি হওয়ার ভয়ে। তবুও সে লাশ চুরি হয়ে গেছে!!!!! – কি ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর এই পৃথিবীর কিছু কিছু মfনুষ…)

বি.দ্র. লেখাটার অন্য কোন শিরোনাম খুজে পাইনি।

সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৪:৪৫
২০টি মন্তব্য ২০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×