somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফরহাদ ভাই ও তার ক্রিকেটীয় জোস্!

২০ শে মার্চ, ২০১১ দুপুর ১:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আঠার তারিখে দুপুরে আমার রাশিয়া ফেরত এক বন্ধু ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করল, -কিরে ব্যাস্ত নাকি?
-এই তো ব্যাস্ততা আছে অল্প। তোর না ঢাকার বাইরে যাবার কথা?
- নারে টিকেট পাই নাই। তুই যদি ফ্রি থাকিস আজকে তাহলে বিকেলের দিকে আসতে পারি?
- এইটা আবার জিগাইতে হয় নাকি। আসবি আয় কোন সমস্যা নাই।
-ঠিকাছে তাইলে শহিদ আর রমা’রে বলি। শোন আমার সাথে একটা গেস্ট আছে-সারপ্রাইজ দিব।
- কে আছে কাউসার?
- নাহ্ ওতো সুইজারল্যান্ডে এখন।
-তাইলে বিয়াই-লিটন?
- ধ্যাৎ নাঃ-আসলে দেখিস।
- ওকে ঠিকাছে আয়- রওনা দেবার ঘন্টাখানেক আগে ফোন দিস।
ওরা আসতে আসতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল। তার সেই সারপ্রাইজ আমাকে কিছুটা বিস্মিত অবশ্যই করেছিল।আমার বহু পুরনো এক বন্ধু বড়ভাই! নাম ফরহাদ।রাশিয়া ছাড়ার পরে গত সতের বছরে দেখা হয়েছে মাত্র দু’বার। শেষবার তাও বছর দশেক আগে। প্রথমবার দেখা হয়েছিল এয়ারপোর্টে-আমার সঙ্গে ছিল আমার বান্ধবী আর ওর সাথে ভাইবোন আত্মীয় স্বজন সহ এক দঙ্গল মানুষ।কথা বেশী হয়নি টুকটাক হাই-হ্যালো!দ্বীতিয়বার,এলীফ্যান্ট রোডের এক রেস্টুরেন্টে। সেবারও ওর সাথে ওর আত্মীয়স্বজন আর আমার সাথে কয়েকজন গেস্ট!
ওকে রাশিয়াতে সবাই চিনত চুলা ফরহাদ,আর আমরা ঘনিষ্ঠরা ডাকতাম লাউ ফরহাদ বলে। চুলা ফরহাদ বলার কারন তার অতি দর্শনীয় লম্বা চুলের জন্য । দারুন সুদর্শন আর দশাশই ফিগারে ফেঞ্চকাট দাড়ি আর লম্বা চুল তাকে অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম করেছিল। প্রথম দর্শনে মনে হত না জানি কি ডাকাবুকো রাগী তেজী পুরুষ।বন্ধুদের জন্য অবশ্য যেকোন বিপদে ঝাপিয়ে পড়লেও – মনটা ছিল ভীষন নরম!
ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি গোঁপ ছেটেছিল সে খানিকটা বিপদেই পড়ে। তার এক বন্ধু একবার শ’তিনেক গ্রাম ভদকা খাইয়ে এক রুশ ছেলেকে পেটানোর জন্য প্ররোচিত করেছিল।সেও মওকামত ছেলেটাকে পেয়ে বেদম মার দিয়েছিল।কিন্তু পরে যখন খবর পেল যে, রুশ ছেলেটা মাফিয়া দলের সদস্য- আর সে এখন সারা মস্কোতে খুজে বেড়াচ্ছে তারই মত দাড়ি গোঁপের এক বাংলাদেশী বা ভারতীয়কে – মুহুর্তে সেগুলো উধাও। ক্লিন-সেভড্ ফরহাদকে চেনাটা তখন একটু মুশকিল-ই ছিল!
চুরানব্বুইতে সে ইউ কে তে যায় ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে। বিয়ে করেছিল তার বছর খানেক বাদেই। লন্ডন প্রবাসী এক সিলেটি মেয়েকে। সেই কন্যাকে ইমপ্রেস করার জন্যই সে তার বাহারি চুল ছেটে চেহারায় ইনোসেন্ট ভাব এনেছিল!
রমা(মহিলা কিন্তু নয়- দারুন সু-পুরুষ সে)আসেনি। শহিদকে নিয়ে আমরা চারজন আড্ডা দিলাম অনেক রাত অব্দি।
পুরনো দিনের কত হাসি মজা আর কষ্টের গল্পই না চলল অবিরাম। কখনো হাসির দমকে পেট ধরে বসে পড়া কখনো চোখের কোলে জলের অস্পস্ট রেখা!মুহুর্তে ফিরে গেলাম আমরা সেই দিন গুলোতে। কত স্মৃতিই না ঝাপসা হয়ে গেছে। কত প্রিয় বন্ধুকে বেমালুম ভুলে গেছি!
ফরহাদ ভাই এসেছে মাসখানেক হল – চলে যাবে সামনের সপ্তায়! বৌ ছাড়া কেন এসেছে জানতে চাইলে বলল, খেলা দেখতে আইছি রে!
কি কন ইংল্যান্ড থেকে শুধূ খেলা দেখতে এসেছেন?
-আরে ব্যাটা শোন – আমার মত এইরকম আরো কত পাগল আছে। খেলা অলরেডি চারখান দেখছি। চিটাগাং-এ গেছিলাম খেলা দেখতে।
- আমি কিছুটা বিস্মিত!একাই দেখছেন নাকি আরো কেউ আছে সাথে?
- আবার জিগায়। দশ বার জনের পুরা টিম। কাইল ভোরেই আমি যাব চেয়ারম্যান বাড়ি। ওই জায়গা থেকে পুরা গ্রুপ নিয়া আসব খেলা দেখতে।
-আপনি আছেন মিরপুরে- এই জায়গা থেকে মাঠে যাইতে দশ মিনিট লাগে।আমি বুঝলাম না তাইলে আপনার চেয়ারম্যান বাড়ি যাওয়ার কি দরকার?
-আরে ব্যাটা বুঝস না ‘জোস’- পুরা জোস লইয়া মাঠে আসতে হবে।
- আপনার কি মনে হয় কালকে সা.আফ্রিকার সাথে বাংলাদেশ জিতবে?
- অবশ্যই জিততেই হবে। জিতবেনা মানে জিতাবই।
কি আবেগ কি উচ্ছাস ভালবাসা লোকটার – আমি বেশ অবাক হই!
সকালে যথারীতি ঘুম ভাঙতে একটু দেরী হল। তার আর চেয়ারম্যান বাড়ি যাওয়া হল না।তার ব্যাগ থেকে ক্রিকেট দলের জার্সি ট্রাউজার বের করে- তাড়াহুড়ো করে ছুটল মাঠের দিকে। দারুন উত্তেজিত সে, যাবার মুখে ভীষন আবেগে বলল সে ,’শালার আজকে মনে হয় চিল্লাইতে চিল্লাই মইরা যাব’।
আমি ফের অবাক হলাম।
ক্রিক ইনফোতে স্কোর দেখছিলাম আর নিজের কাজে ব্যাস্ত আধবেলা। বিরতিতে তার ফোন;
এই শোন- আমার পেটের অবস্থা এমনিতেই ভাল না- তারপরে এইখানের খাবার খাইলে-পুরা খবর হয়ে যাবে।খেলা শেষ আসব আমি, বেমী কিছু না একটু ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খাওয়াইলেই হবে।
-ঠিক আছে সমস্যা না আসার ঘন্টা খানেক আগে ফোন দিলেই হবে।তা খেলার ভাব কেমন বুঝছেন?
- কেমন আবার – আমরা জিতব!
বাংলাদেশের ব্যাটিং দেখার জন্য তাড়াতাড়ি করে বাসায় গেলাম।রাস্তা দারুন উত্তেজিত ক্রিকেট শ্রোতা আর দর্শকেরা।সবার সেকি দারুন উন্মাদনা!আমি নিশ্চিত বাংলাদেশ হারবে- তবুও মনে মনে ভীষনভাবে চাচ্ছিলাম, আরেকবার অন্তত আরেকটা অঘটন ঘটুক!
বাসায় গিয়ে টিভির সামনে বসতেই একে একে চারটি তারা খসে পড়ল। বুকের ভেতর চাপা কস্ট। তবুও নিজের থেকে বেশী খারাপ লাগছিল ফরহাদ ভাইয়ের জন্য। ইস্ বেচারা!
সাড়ে চারটার দিকে ফিরে এল ফরহাদ ভাই। যেন ক্লান্ত বিদ্ধস্ত একজন মানুষ- তার সেই দারুন উন্মাদনা উত্তেজনা আবেগ আর ভালবাসা ব্লটিং পেপার দিয়ে কেউ যেন শুষে নিয়ে গেছে…
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মার্চ, ২০১১ রাত ১১:৩৩
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×