অনিবার্য অস্তিত্বের প্রমাণকরণ
ভূমিকাঃ
পূর্ববর্তী পাঠে আমরা আলোচনা করেছিলাম যে, ঐশী দার্শনিকগণ এবং কালামশাস্ত্রবিদগণ
আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণের জন্যে অসংখ্য যুক্তির অবতারণা করেছেন, যা দর্শন ও কালামশাস্ত্রে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আমরা ঐগুলোর মধ্যে যে প্রমাণটি অপেক্ষাকৃত কম ভূমিকার প্রয়োজন এবং সহজবোধ্য সেটিকে নির্বাচন করতঃ তার ব্যাখ্যা প্রদান করব। তবে একথা স্বরণযোগ্য যে, এ প্রমাণটি আল্লাহর অস্তিত্বকে শুধুমাত্র “অনিবার্য অস্তিত্ব” শিরোনামে প্রমাণ করে-অর্থাৎ যাঁর অস্তিত্ব অত্যাবশ্যকীয় এবং কোন অস্তিত্ব প্রদানকারীর উপর নির্ভরশীল নয়। অনিবার্য অস্তিত্বকে প্রমাণ করার পর তার ‘হ্যাঁ বোধক বৈশিষ্ট্য ও না বোধক বৈশিষ্ট্যকে অপর এক যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। হ্যাঁ-বোধক বৈশিষ্ট্যের উদাহরণ হল জ্ঞান, শক্তি ইত্যাদি এবং না-বোধক বৈশিষ্ট্যের উদাহরণ হল অশরীরীয় হওয়া, নির্দিষ্ট স্থানে ও কালে সীমাবদ্ধ না হওয়া।
প্রমাণের বিষয়বস্তু:
অস্তিত্বশীল বিষয়সমূহ, (বুদ্ধিবৃত্তিক মতে) হয় অনিবার্য অস্তিত্ব না হয় সম্ভাব্য অস্তিত্ব এবং কোন অস্তিত্বশীল বিষয়ই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এ দু’ধারণার বর্হিভূত হতে পারে না। সকল অস্তিত্বশীল বিষয়ই সম্ভাব্য অস্তিত্ব হতে পারে না। কেননা, সম্ভাব্য অস্তিত্ব কারণের মুখাপেক্ষী। সুতরাং যদি সমস্ত কারণসমূহ সম্ভাব্য অস্তিত্ব হয়ে থাকে, তবে প্রত্যেকটি কারণকেই অপর এক কারণের মুখাপেক্ষী হতে হবে। ফলে কখনোই কোন অস্তিত্বশীল বিষয় বাস্তব রূপ লাভ করবে না। অন্যভাবে বলা যায় ঃ কারণের ধারাবাহিকতা অসম্ভব। অতএব অস্তিত্বশীল বিষয়সমূহের কারণসমূহ ধারাবাহিকভাবে এমন এক অস্তিত্বশীল বিষয়ে উপনীত হয়, যা স্বয়ং অপর অস্তিত্বশীল বিষয়ের ফলশ্রুতি নয় অর্থাৎ যা হবে অনিবার্য অস্তিত্ব। এ প্রমাণটি আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণের জন্যে দর্শনের একটি সরলমত প্রমাণ, যা কয়েকটি খাঁটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিজ্ঞা দ্বারা রূপ লাভ করেছে এবং কোন প্রকার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল নয় । তবে যেহেতু এ প্রমাণটিতে দার্শনিক পরিভাষা ও ভাবার্থসমূহ ব্যবহৃত হয়েছে, সেহেতু যে সকল প্রতিজ্ঞা ও পরিভাষার মাধ্যমে, উল্লেখিত প্রমাণটি রূপ পরিগ্রহ করেছে তাদের সমপর্কে আলোকপাত করা অনিবার্য।
সম্ভাব্যতা ও অনিবার্যতা ঃ
প্রতিটি প্রতিজ্ঞাই (যতই সরল হোক না কেন) কমপক্ষে দুটি মদলিক ভাবার্থ যথাঃ উদ্দেশ্য ও বিধেয় নিয়ে গঠিত হয়। যেমনঃ সূর্য্য উজ্জল এ প্রতিজ্ঞাটিতে “সূর্য” হল উদ্দেশ্য আর “উজ্জ্বল” হল বিধেয় এবং প্রতিজ্ঞাটি সূর্যের জন্যে উজ্জ্বলতাকে প্রতিপাদন করে থাকে।
উদ্দেশ্যের জন্যে বিধেয়ের প্রতিপাদন তিনটি অবস্থার ব্যতিক্রম হতে পারে না। হয় অসম্ভব যেমনঃ “৪ অপেক্ষা ৩ বড়,” অথবা অনিবার্য যেমন ঃ “৪ এর অর্ধেক হল ২” নতুবা অসম্ভব বা অনিবার্য এ দু’য়ের কোনটি নয় যেমন ঃ সূর্য আমাদের মাথার উপর অবস্থান করছে।
যুক্তিবিদ্যার পরিভাষায় উপরোক্ত প্রথম ক্ষেত্রে প্রতিজ্ঞার সম্পর্ককে নিষিদ্ধ, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে প্রতিজ্ঞার সম্পর্ককে “অনিবার্য বা আবশ্যকীয় তৃতীয় ক্ষেত্রে প্রতিজ্ঞার সম্পর্ককে “সম্ভাবনা ” (বিশেষ অর্থে) গুণসম্বলিত বলা হয়ে থাকে ।
দর্শনে ‘অস্তিত্বশীল বিষয়’ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়ে থাকে। যা কিছু নিষিদ্ধ ও অসম্ভব তা কখনোই বাস্তব রূপ লাভ করে না (তাই এ বিষয়ের আলোচনা দর্শনের অন্তর্ভুক্ত হয় না)। ফলে দর্শনশাস্ত্র, অস্তিত্বশীল বিষয়সমূহকে বুদ্ধিবৃত্তির ভিত্তিতে অনিবার্য অস্তিত্ব ও সম্ভাব্য অস্তিত্ব এ দু‘ভাগে বিভক্ত করেছে।
অনিবার্য অস্তিত্ব বলতে বুঝায়, যে অস্তিত্বশীল বিষয় নিজ থেকেই অস্তিত্বশীল এবং তার এ অস্তিত্বের জন্যে অপর কোন অস্তিত্বশীল বিষয়ের উপর নির্ভরশীল নয়। ফলে স্বভাবতঃই এ ধরনের অস্তিত্ব অনাদি ও অনন্ত হবে। কারণ, কোন এক সময় কোন কিছুর অনুপস্থিতির অর্থ হল তার অস্তিত্ব নিজ থেকে নয় এবং অস্তিত্বে আসার জন্যে অপর এমন কোন অস্তিত্বশীলের উপর নির্ভর করতে হয় যে তার উপস্থিতি হল (এর উপস্থিতির জন্যে) শর্ত ও কারণ স্বরূপ; আর তার অনুপস্থিতিতে এর অস্তিত্ব থাকে না।
সম্ভাব্য অস্তিত্ব হল তা, যা নিজ থেকে অস্তিত্বশীল নয় এবং যার অস্তিত্বশীলতার জন্যে অপর কোন অস্তিত্বের উপর নির্ভর করতে হয়।
অস্তিত্বের এ শ্রেণীবিভাগ বুদ্ধিবৃত্তির ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং সংগত কারণেই তা নিষিদ্ধ অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। তবে বাস্তব অস্তিত্বসমূহ এ দু‘বিভাগের (অনিবার্য অস্তিত্ব ও সম্ভাব্য অস্তিত্ব) কোনটির অন্তর্ভুক্ত সে সম্পর্কে কোন দিকনির্দেশনা নাই। অন্য কথায়, এ ব্যাপারটিকে তিন ভাবে অনুধাবণ করা যেতে পারে। যথাঃ
প্রথমতঃ সকল অস্তিত্বই হল অনিবার্য অস্তিত্ব।
দ্বিতীয়তঃ সকল অস্তিত্বই হল সম্ভাব্য অস্তিত্ব।
তৃতীয়তঃ কোন কোনটি হল অনিবার্য অস্তিত্ব আবার কোন কোনটি হল সম্ভাব্য অস্তিত্ব।
প্রথম ও তৃতীয় ধারণায় ‘অনিবার্য অস্তিত্ব’ বিদ্যমান। অতএব এ ধারণাটিকেই (দ্বিতীয়) আলোচনার বিষয়বস্তু রূপে স্থান দিতে হবে যে, ‘সকল অস্তিত্বই কি সম্ভাব্য অস্তিত্ব হওয়া সম্ভব, না কি অসম্ভব’? আর এ ধারণাটির অপনোদনের মাধ্যমেই ‘অনিবার্য অস্তিত্বের’ ধারণা চূড়ান্তরূপে প্রতিষ্ঠিত হয় যদিও তার একত্ব এবং অন্যান্য গুণকে প্রতিপাদনের জন্যে অন্য কোন প্রমাণের উপর নির্ভর করা আবশ্যক।
অতএব, দ্বিতীয় ধারণাটিকে পরিত্যাগ করার জন্যে অপর একটি প্রতিজ্ঞাকে উল্লেখিত প্রমাণের সাথে সংযুক্ত করতে হবে। আর তা হল এই যে, ‘সকল অস্তিত্বই সম্ভাব্য অস্তিত্ব হওয়া অসম্ভব’। তবে এ প্রতিজ্ঞাটি স্বতঃসিদ্ধ নয়। এ কারণে একে নিম্নরূপে প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক ঃ সম্ভাব্য অস্তিত্ব কারণের উপর নির্ভরশীল এবং কারণের অসীম ধারাবাহিকতা অসম্ভব। অতএব কারণসমূহ তাদের ধারাবাহিকতায় এমন এক অস্তিত্বে গিয়ে পৌছাতে হবে যা কারণের উপর নির্ভরশীল নয়। আর তা-ই হল 'অনিবার্য অস্তিত্ব'। সুতরাং সকল অস্তিত্বই সম্ভাব্য অস্তিত্ব নয়। আর এখান থেকেই অপর এক দার্শনিক বিষয়ের সূত্রপাত ঘটে, যার ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। (চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


