০১
গল্পটি মৌসুমী ভৌমিকের সেই গানের মেয়ে- ফুটপাতের মেয়ের। আলো যাকে কামড়ে ধরে, আলো থেকে যে আড়াল করতে চায় নিজেকে, সেই ফুটপাতের মেয়ের। মেয়েটির নাম কমলা। গায়ের রং যদিও বা কালো তবু তার এই কমলা নামের রহস্য কি তা জানা হয়না । পথের পড়শীরা এই নিয়ে নানা উপহাস করলেও তা গায়ে মাখেনা কমলা কিংবা তার একমাত্র আপনজন তার নানী। জীবন যেখানে বিপন্ন, অন্ন যেখানে অনিশ্চিত যেখানে অন্যের কথা নিয়ে ভাব-বিলাসের ভাবনাই আসেনা ওদের। অথচ জগতে এই কথার জন্যই কতো না কাটাকাটি, কথার জন্যই কতো না কান্ড! তাও মাঝে মাঝে ভীষণ ক্ষেপে ওঠে কমলা। নাম নিয়ে সে ভাবেনা। কমলা হলেও সে কমলাই, না হলেও সেই সে-ই। কে জানে নামের আমি নাকি আমার নাম! কমলা এবং তার নানীর সম্পর্ক নিয়েও কথা বলতে ছাড়েনা পড়শীরা। কেবল ক্ষেপে যায় তখনই কমলা। এই নির্লজ্জ, নিরাপত্তাহীন জীবনের একমাত্র নিরাপত্তাই যে তার নানী তা সে বোঝে জ্ঞান হবার পর থেকেই। গায়ের রং কালো, খাবার জোটাতে পারেনা রোজ, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অনুভূতিহীন হয়ে ওঠা শরীর তার কম আকর্ষণীয় নয় তা সে বোঝে পুরুষের দৃষ্টিতেই। অন্য কোন ভাব তার মধ্যে না জাগলেও একটা প্রবল প্রতিবাদের আলোড়ন সে টের পায় আপাদমস্তকেই। চলনে বলনের আধুনিকতাই হয়তো তার কাল হলো। এই নিয়ে নানীর অভিযোগের কমতি নেই। কোন কোন দিন নানীর তীব্র আভিযোগ-
-রাস্তায় ঘুমাস, মাগী তোর অত ভং কিসের লো? এমন করি থাইলে মরদ তো তোর দিকে চোক দিবাই পারে!
এতো অসম্মানজনক অভিযোগও নিরবে সহ্য করে কমলা। তাছাড়া তার উপায়ই বা কি!
কিন্তু এই নিরব কমলাও ক্ষেপে ওঠে, অশ্রাব্য ভাষার সমস্ত গালি সে এক নিঃশ্বাসে ঝেড়ে দেয় কোন কোন মাঝরাতে তার কাঁথা ধরে টান মারা কোন পুরুষের উদ্দেশ্যে। তাদের কাউকে সে দেখে, কাউকে বা না। তবুও জেগে উঠেই সে চিৎকার করে উঠে,
-বেজন্মার পুতেরা, মাগী লইয়া শুইয়াও আশ মেটেনা রে?
তার অভিযোগে কারো কর্নপাত না হলেও জেগে ওঠে দু'জন মানুষ । একজন তার নানী আর অন্য জন দু'মানুষ পরে শোয়া লালচাঁন। নানী তার অভিযোগে কোরাস গায় বটে, কিন্তু লালচাঁন কেবলী দর্শক। তাতে যেন গায়ে আরো আগুন জ্বলে কমলার। ইচ্ছে করে সমস্ত গালি ছুড়ে দিতে লালচাঁনের দিকে-
- ওই হাবাগোবার বাচ্চা, কিছু কইতে পারবিনা যখন তখন আমার চিল্লানি শুইন্না ফাল দিয়ে ওঠনের কাম কি তোর? পর পুরুষ আমারে টানে হেইডা দেকতে ভারি ভালা লাগে, নারে!
কিন্তু বলা হয়ে ওঠেনা কমলার। কোথায় যেন এই একটি মাত্র ব্যতিক্রম হয় তার। অথচ হিসেবি মানুষ সে। অহেতুক ব্যপারে নাক গলায় না কমলা। নিয়ম করে সে কাজে যায়, নিয়ম মেনেই সে ফিরে আসে। ফুটপাতে তাদের জীবন কাটলেও স্বাভাবিক সকল কিছুই ঘটে যায় তাদের নিজস্ব সীমানায়। প্রেম প্রীতি, বিয়ে, বাচ্চা-কাচ্চা, বিবাদ-বিরহ. ঝগড়া-ঝাটি, এমন কি খুন পর্যন্ত। রোজ রাতে বা দিকে তিনমানুষ পরের কালুর বাবা আর মা মারামারিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। যদিও কালুর বাপ মাসের মধ্যে বেশীর ভাগ সময়ই থাকে জেলে। আর সে কারণেই যেন ঝগড়ার সূত্রপাত হয় রোজ। নতুন নতুন গালিতে পারদর্শী কালুর বাপের শেষ কথা একটাই- শালার এর চেয়ে জেলও ভালো! সংসার মানুষকে নাকি জীবনের দিকে টানে, আর ফুটপাতের সংসার তাকে ঠেলে দেয় উল্টো পথে- জেলের দিকে! ভালোতে যেহেতু জেল জোটেনা, তাই শান্তির লোভেই কি কালুর বাবা মেতে ওঠে অপকর্মে? যার পরিচয়ে সবার কাছে তারা পরিচিত সেই কালুর দেখা পাওয়া যায়না কোথাও। শোনা যায় একদিন কালু চলে যায় এই রাস্তা ছেড়ে। আর ফিরে আসেনা। এখন সে কোথায় থাকে তাও জানেনা কালুর বাবা মা। জানবার আগ্রহও দেখায় না কখনো। কেবল কালুর মা মার খেয়ে যখন নেতিয়ে পড়ে, তখন বিলাপ করে বলে- আমার কালু থাকলে এমন করতে পারত না কেউ আমার লগে!
কমলারা থাকে রমনার কালী মন্দিরের ফুটপাতের দেলায় ঘেঁষে। থাকে বলা যায়না বলা যায় ঘুমায় ওরা। ওদের ভোর হয় ভোর হবার আগে, আর রাত হয় রাতের প্রায় শেষে। যে যার কাজে বের হয় ওরা, ফেরে রাতে। ঘরহীন মানুষগুলো ঘরের চিহ্নও বড়ো আর্শ্চযের। তার নড়চড় হয়না কখনো। বাইরে থেকে মনে হয় রাস্তায় ঘুমালে জায়গার কোন ঠিকঠিকানা আছে? আছে আছে। আছে বলেই জায়গা বদল হয়না ওদের। হতে দেয়ও না। রোজ রাতে যে পুলিশ কে চাঁদা দেয় সেই পুলিশই বেঈমানের মতো ওদের উপর লাঠি চালায়। এতো কষ্টের জায়গা কেউ ছাড়তে রাজি হয়না। তাই চাইলেই কেউ একজন নতুন করে জায়গাও জোটাতে পারেনা এখানে।
নানান কথা হয় কমলা আর তার নানীর সম্পর্ক নিয়ে। তাতে কান না দিলেও মাঝে মাঝে তা ভাবায় কমলাকে। সত্যি তার পরিচয় কি? এসব ভেবে কোন কোন রাতে ঘুম হয়না কমলার। সে রাত জেগে জেগে নানান প্রশ্ন করে নানীকে। নানীকে জিগ্যাস করে তেমন কোন উত্তর জোটাতে পারেনা কমলা। মা-বাবার কথা জানতে চাইলেই নানী তাকে শোনায় একটাই কথা। তার বাবা-মা ছিল। একবার কমলাকে তার নানীর কাছে রেখে তারা যায় গ্রামের বাড়ি। যাবার পথে লঞ্চ ডুবে তারা মারা যায়। তারপর থেকে কমলা থাকে তার নানীর কাছেই। বাবা-মায়ের নাম কখনো সে জানতে চায়নি, প্রয়োজনও হয়নি কখনো। কেবল জানতে চেয়েছিল তার বাড়ির হদিস। এতো প্রশ্ন ভালো লাগেনা নানীর, সহজ কথায় তাই তার জবাব- কবেই ভাঙ্গছে তা নদীতে! যেন সইতে পারেনা কমলা। তবু চুপ করে থাকতে হয়। আর প্রশ্ন করা চলেনা নানীকে। থেকে থেকে কার প্রতি যেন ভীষণ অভিমান উপচে ওঠে। হয়তো তার বাবা-মা'র প্রতি কিংবা নিজের প্রতি অথবা এই নানীর প্রতি। হয়তো বা এই জন্মটার প্রতিই। এভাবে না জন্মালেও তো চলতো পৃথিবীর কি এমন ক্ষতি হতো যদি আমি না জন্মাতাম। এমন আকাশ কুসুম ভেবে ভেবে কোন কোন রাত কাটে কমলার।
রাতের ভাবনা রাতেই শেষ হয়ে আসে। ভোর হবার আগেই ছুটতে হয় কাজে। এই জীবনে আবেগের চাইতে আহারের চিন্তা বড়ো ব্যাপক। ভাবনায় যখন ভাত জোটেনা তখন কি লাভ এসব ভেবে! আমি বেঁচে আছি. আমাকে বেঁচে থাকতে হবে, সব সত্যের বড়ো সত্য এই।
নানী তার বুড়ো হয়েছে অনেক আগেই। আজকাল ঠিক মতো চলতে ফিরতেও পারেনা চোখে দেখেনা বলে। তাই ভোরে উঠে যদি দুটো পান্তা জোটে তাই খেয়ে নানীকে নিয়ে হাঁটা দেয় সে। তাকে শাহবাগ মোড়ে বসিয়ে দিয়ে কমলা হাঁটা দেয় চাঙ্খার পুলের দিকে। ওখানেই কাজ করে কমলা। রহিমা চাচির ভাতের হোটেলে। রিকশা চালকদের ভাতের হোটেল। সেখানে থালা বাসন মেজে দেয়ার বদলে সে পায় রোজ ত্রিশ টাকা আর দুপুরের খাবার। কোন কোন দিন চাচি যাবার সময় কোন উদ্বৃত্ত খাবারও দিয়ে দেয় নানীর জন্য। সেদিন রাতে আর রাঁধতে হয়না তাকে। কাজ থেকে ফেরার পথে সে নানীকে তুলে নেয়। কাজ, খাওয়া আর শোয়া এই তিন কর্মের ভেতরই যেন জীবন বাধা পড়ে থাকে। তার বাইরে আর কোন জীবন নিয়ে ভাবেনা কমলা। যদিও লালচাঁনের কালো দেহ আর লাল চোখ তাকে অন্য কিছুর ইশারা করে। কিন্তু প্রেমের পীড়াপীড়ি তাকে কেবল বিরক্তই করে। কোন লোভ জাগাতে পারেনা।
লালচাঁন তবু আশা ছাড়েনা আবার সাহস করে কিছু বলতেও পারেনা। কেননা সে জানে ইচ্ছের বিরুদ্ধে কমলাকে টলানো যাবেনা। তাতে হিতে বিপরীতই হবে। মার তো খেতেই হবে, তার উপর কমলার এতো কাছাকাছি থাকার এই জায়গাটাও হবে হাতছাড়া। নতুন কোথাও জায়গা জোটাবার নিশ্চয়তার ভাবনা তাকে দমিয়ে রাখে। তবু কমলার জন্য এটা-সেটা করবার প্রবৃত্তিকে দমাতে পারেনা লালচাঁন। সে কাগজ টোকানোর কাজ করে। কোন কোন দিন ফ্লাক্স ভাড়া নিয়ে করে চা ফেরী। তাতে যৎসামান্যই আয় হয় তার। যার সিংহভাগ চলে যায় খাওয়ার পেছনে। তবু মাঝে মাঝে ভালো আয় হলে লালচাঁন কমলার জন্য কেনে চুড়ি,ফিতা কিংবা বাসমতি তেল। দেয়ার জায়গার অভাব বলে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে চুপি চুপি তা রেখে আসে কমলার মাথার কাছে। তাছাড়া উপায়ই বা কি? তার আর কমলার মাঝে যে দুই মানুষের ব্যবধান! পাশে শুতে পারলে হয়তো কানে কানে কিছু বলেই সে দিত। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনা। এই দুই মানুষের দুরত্ব ঘোচানোই লালচাঁনের জীবন মরন সমস্যা। ভোরে উঠে কমলা এইসব জিনিস দেখে ঠিকই বুঝতে পারে এ কর্মটি কার। সে কেবল বড়ো বড়ো চোখ করে লালচাঁনের দিকে তাকায় কিন্তু কিছু বলেনা। এইটুকুই লালচাঁনের একমাত্র ভরাসা।
এভাবেই দিন কাটে কমলা আর লালচাঁনের। পরিবর্তনহীন সময়। লালচাঁন কাগজ কুড়ায়, কমলা এঁটো বাসন মাজে আর নানী করে ভিক্ষা। কেবল শীত আর বর্ষা আসে আলাদা হয়ে ওদের জীবনে।
সময় কেটে গেলেও লালচাঁনের সময় আর কাটতে চায়না। সে ভীষণ ব্যাকুল হয়ে ওঠে কমলার সাথে তার ঐ দুই মানুষের দুরত্ব ঘোচাতে। কমলা তা বুঝেও যেন বুঝতে চায়না। আর এটাই আরও বেশী উস্কে দেয় লালচাঁনকে। তারপর একদিন সে ঝুঁকিই নিয়ে নেয়। সকালে সে কাজে গিয়েও পুরো বেলা কাজ না করেই ফিরে আসে এবং সোজা চলে যায় কমলার কাজের জায়গায়। কমলাকে দেখেই সে আর কিছু বলতে পারেনা তাই কোন উপায় না দেখে খেতে বসে যায় কমলার হোটেলে। তাই দেখে মুচকি হাসে কমলা। তাতে আরো আগুন জ্বলে ওঠে লালচাঁনের মনে। তারপর কমলা তাকে ভাত দিতে এলে সাহস করেই এক নিঃশ্বাসে বলে বসে,
-কাম শেষ করি রমনার গেটে আইসো।
তার জবাবে কোন কথাই বলেনা কমলা। মেজাজ খারাপ হয়ে যায় লালচাঁনের। এ তার সারাজীবনের স্বভাব। কেন ভালো-মন্দ কিছু বললেও তো হয়! রাগে ভাত শেষ না করেই উঠে যায় লালচাঁন। ফেরার পথে তবু তার মনে আশা জাগে কমলা নিশ্চয়ই আসবে। সে আশার ঝলকানি তাকে পুলকিত করে। মুহুর্তে ফুরফুরে মেজাজ ফিরে পায় লালচাঁন। বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে সে সোজা চলে যায় রমনার কালি মন্দিরে। বিকাল পযর্ন্ত তাকে যে অপেক্ষা করতেই হবে।
লালচাঁন চলে যাবার পর কি যেন ঘটে যায় কমলার ভেতর। ভীষণ রাগ করতে চায় সে কিন্তু কিছুতেই পেরে ওঠেনা। সমস্ত শরীরের পুলককে সে লুকাতে চায় কিন্তু তা অনায়াসে ধরা পরে বাসন-কোসনের গায়ে। এতো শব্দ করে কখনো কাজ করেনা কমলা। তবে কি এঁটো বাসনও কোরাস ধরলো লালচাঁনের দাবীতে। কেমন ঝিমুনি ধরে আসে সর্বাঙ্গে। তারপর হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে – সে যাবে লালচাঁনের কাছে।
রমনার গেটে অপেক্ষমান লালচাঁনকে দূর থেকেই দেখতে পায় কমলা। জামা কাপড় বদলে এসেছে লালচাঁন। তেল দিয়ে মাথাটাও আচঁড়ে নিয়েছে যত্ন করে। দূর থেকে দেখেই হাসি পায় কমলার, তবু স্বভাব সুলভ ভাবেই সে দাঁড়ায় লালচাঁনের মুখোমুখি। কমলা সামনে আসতেই কিছুটা বিব্রত বোধ করে লালচাঁন। সারাদিন অসংখ্যবার প্র্যাকটিস করা কথাটা আর কিছুতেই সে মনে করতে পারেনা। কিছু বলবার আগেই কথা ফোটে কমলার,
-তোমার সাহস দেহি আমি তো তাইজ্জব! মেলাই সাহস হইছে তোমার!
-ক্যানে আমি আবার কি করলাম? তোমার লগে কি আমি একটু কতাও কইতে পারিনা?
-পারো। তয় এত সাহস দেহাইবা সেইডা ভাবিনাই।
-কি এমুন সাহস দেখাইলাম?
-ক্যানে দুপুরসুম যে হেটেলে গেলা, আবার কও কিনা রমনায় আসবার!
-তুমি মনে লয় ঝগড়া করবারই আইছো?
-আইছিই তো।
-ঝগড়াডা কি ভিতরে যাইয়া করা যায়না?
-যায় তো!
এরপর আর হাসি লুকাতে পারেনা কমলা। হাসতে হাসতে সে হাঁটে লালচাঁনের পাশাপাশি আর হাঁটতে হাঁটতে বলে,
-তুমি কেমন তর পুরুষ মানুষ? এত ভীতু!
-মুই ভীতু না। মোর মেলাই সাহস, তয় আমার সাহস দেইখা তুমি যদি ভয় পাও সেই জন্যি আমি সাহস দেখাই না।
-ভয় পালি চুড়ি, ফিতা, তেল দেইখা আমার তো ভয় পাওনের কতা, নাকি?
-তাও তো হাচা!
কথায় কথা জমে ওঠে, জমে ওঠে মানুষ দুজনও। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে তারা দু'জন চলে যায় রমনার অনেক ভেতর দিকে কিন্তু বেঞ্চে বসতে সাহস করেনা। তার আগে অবশ্য লালচাঁন কিনে নেয় দু'টাকার বাদাম। সেই বাদাম খেতে খেতে কমলা তন্ময় হয়ে ভাবে লালচাঁন বুঝি তার মনের কথা পড়তে পারে। নইলে রোজ সন্ধ্যায় ফুটপাতের ধারে বসে ভ্রাম্যমান যুগলদের দিকে চেয়ে চেয়ে যে লোভ তার হতো, তা আজ এক নিমেষে কি করে সত্য করে দিল লালচাঁন!
অনেক সময় পেড়িয়ে যায় এভাবে। কমলা তাড়া দেয় নানীকে নিয়ে ফিরতে হবে বলে। লালচাঁন এক শর্তে রাজি হয় যদি সে কাল আবার এখানে আসে। এবার আর কোন ভনিতা করেনা কমলা। সহজ ভাবেই সে জানায় কাল সে আবার আসবে। তারপর রমনা থেকে বের হয়ে তারা দু'জন একই জায়গায় ফেরে ভিন্ন পথে।
এরপর থেকে এটাই নিয়মে দাঁড়িয়ে যায় দু'জনের জীবনে। হয়তো বা ভালোবাসার ক্ষেত্রে শ্রেণী বৈষম্যের ভেদ থাকেনা বলেই রোজ তারা দেখতে চায় একে অন্যকে। তাই কাজ শেষে রোজ তাদের দেখা হতে থাকে । কথাতো বাড়তেই থাকে রোজ, সেই সাথে বাড়ে স্বপ্ন বুনণও। একসময় হাঁটা বন্ধ করে তারা বসে দূর্বাঘাসে, তারপর বেঞ্চে, তারপর আরো ঘনিষ্ঠতায় একে অন্যের কাঁধে মাথা রেখে। মানসিক আদ্রতা একসময় শারীরিক উত্তাপে বদলে যায়। কমলা নিঃশব্দ থাকলেও সেদিন যাবার সময় লালচাঁনই সরাসরি বলে-আজ রাতে শেষ টহল পুলিশের গাড়ি চলে গেলে সে অপেক্ষা করবে মন্দিরের পুকুর পাড়ের কড়ই গাছের নিচে। লালচাঁনের কথায় রাগ যতটা না লাগে,তারচেয়ে ঢেড় বেশী আড়ষ্ট হয় সে লজ্জায়। নিরুত্তর ভাবেই সেদিন সন্ধ্যায় ফিরে আসে সে।
কোন জবাব না পেলেও সময় মতো আঁধো অন্ধকারে অপেক্ষা করে লালচাঁন। একসময় পূর্নিমা তিথীর শেষ লগ্নের আধো চাঁদের আধো অন্ধকারে সে দেখে তার আকাক্ষিত মানুষের আর্বিভাব। মুখোমুখি দাঁড়ালেও কথা বললে পারেনা কেউই। কেবল দু'জনের শরীরের ভেতর এক উষ্ণ স্রোত বয়ে যায়। একসময় লালচাঁনই তৎপর হয়ে ওঠে। বাধা দিতে চায় কমলা, সে কেবল মানসিকতায়, নিজের শরীরই তার বিরুদ্ধাচারণ করে। লালচাঁনের শক্ত খসখসে হাত নির্দয়ের মতো এঁকে বেঁকে চলে কমলার সোমত্ত দেহের ভাঁজে ভাঁজে। ব্যথাও পায় সে কিন্তু অজানা এক পুলক তাকে আড়ষ্ঠ করে রাখে । আর অন্য দিকে উন্মাদের মতো ব্যাকুল লালচাঁন ততক্ষণে হয়ে ওঠে গনগণে পুরুষ। শরতের খোলা আকাশের নিচে, ঘাসের গালিচায় দুজন মানব মানবী মেতে ওঠে আদিম খেলার নেশায়। এ যেন সাপ লুডু খেলা শরীরে শরীরে। চূড়ান্ত আবগের কম্পমান মুহূর্তে কেবল একবার অস্ফুট স্বরে কমলা বলে,
-আমারে বিয়া করবা তো তুমি?
ক্লান্ত দেহে ভালোবাসার রিনিঝিনিতে আকুল লালচাঁনের কানে সে প্রশ্ন পৌছায় কিনা বোঝা যায়না।
পরদিন কেউ জেগে ওঠার আগেই কমলা চলে যায় কাজে। এতো ভোরে সে কখনো যায়না, কিন্তু আজ আর পারলো না। যেন কিছুতেই এই মুখ সে দেখাতে পারবেনা লালচাঁনকে। কেমন করে সে যাবে তার সামনে। অন্যদিকে ঘুম থেকে উঠে কমলাকে না দেখে আতংকে নীল হয়ে ওঠে কালো মানুষটি। যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ার আশংকায় পেয়ে বসে তাকে। এতো ভোরে কমলার চলা যাওয়া কিসের আলামত? তবে কি কাল রাতের জন্য তাকে ঘৃনা করল কমলা? জবাবের জন্য ছটফটানি থাকলেও বিকেলের জন্য তাকে অপেক্ষা করতেই হবে। সারাদিন কোন রকম করে কাটল লালচাঁনের, বিকালে ঠিক সময়ে সে অপেক্ষা করল কমলার জন্য কিন্তু সময় পেড়িয়ে গেলেও আসলনা কমলা। লালচাঁনের ইচ্ছে হলো একছুটে চলে যায় কমলার কাছে। তাকে জিগেষ করে কেন সে এমন করছে তার সাথে? কিন্তু পারেনা। এমন কি তার দখলকৃত ফুটপাতের জায়গায় গিয়েও বসতে পারেনা লালচাঁন। উদভ্রান্তের মতো সে ঘুরে ফেরে শহরের এ গলি সে গলি। যখন টহল পুলিশ চলে যাবার সময় হয়ে আসে তখন সে গিয়ে দাঁড়ায় আগের জায়গায়। মনে মনে ধরে নেয় কমলা আর আসবেনা। তবু সে অপেক্ষা করে তার জন্য। প্রতিক্ষার সময় কেটে যায়। লালচাঁন ভেবে পায়না সে কি করবে? ঘরহীন, ঠিকানাহীন ফুটপাতের মানুষের জীবনের ব্যকরণই বুঝি এমন। সবর্ত্র কেবল অনিশ্চয়তা। ভাবতে ভাবতে একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে যখন চলে যাবে ভাবছে তখনই ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। কেউ একজন তাকে জড়িয়ে ধরে পেছন থেকে। কেবল জড়িয়েই ধরেনা. যেন সব শক্তি দিয়ে তাকে দ্রবীভূত করে নিতে চায় নিজের সর্বাঙ্গে! যে উদ্দামতা কাল পেয়ে বসেছিল লালচাঁনকে আজ যেন তা পেয়ে বসেছে অন্য কাউকে। লালচাঁন ভালবাসার বষর্ণে সিক্ত হতে হতে ভাবে এ কোন কমলা! কাল যে লজ্জায় আড়ষ্ট ছিল আজ তার ভেতর এই উন্মাদনা জাগিয়ে দিল কে? আবেগের বর্ষণে ভাবনা বিলুপ্ত হয় লালচাঁনের কেননা তাকেও মেতে উঠতে হয় মুহুর্তে। যেন এই চড়াচড়ে কথা বলে কিছু নেই, আছে কেবল অনুভুতি, কেবল আছে অলীক এক উন্মাদনা। এবং সেই প্রথম ফুটপাতের জীবনের গ্লানি ভুলে দুজন মানুষ অনুভব করে এ জন্ম তাদের অর্থহীন জন্মমাত্র নয়। তাদের জীবনেও আছে সব; আছে স্বপ্ন, ভালো লাগা,মন্দ লাগা। গ্লানিকর জন্মের ইতিহাস না ঘেটে এই প্রথম তারা ভাবিত হয় তাদের ভবিতব্যের জন্য।
সময় এগিয়ে যায় সময়ের নিয়মে। কমলা আর লালচাঁন ভালোবাসার উন্মত্ততায় কাছে আসে নিয়মিত ভাবেই। প্রবল আবেগে পৃষ্ট হতে হতে স্বপ্নের ফানুস ওড়ায় তারা। জীবরে প্রতি আগ্রহ যেমন বাড়ে তেমনি বাড়ে আকাক্ষাও। কমলাই প্রথম প্রকাশ করে সে স্বপ্নময়তার,
-চাঁন। এমন করি খোলা আসমানের নিচে আর কতদিন? এমুন ঘুটঘুটে আন্দারে ঘাসের উপর বসি তোমারে সোহাগ করি যে মোর মন ভরে না।
-কি করবো কমলা। ঘরের সাদ তো আমারও মনে ধরে, কিন্তু..
-কিন্তু ক্যানে? মোরা দুইজন মানুষ কাম করি কি একখান ঘর পামুনা! খাট পালং তো চাই না মুই, চাইনা আকাশ ছোয়া দালানও। খালি একখান এক চালাওয়ালা ছাপরা ঘর। তাও যুদি না হয় তাইলে না হয় পেলাসটিকের ঢাকা দেয়া একখান ছউনি। তার মদ্যি তোমার বুকে মুখ রাখি তো ঘুমাতে পারব!
বিচিত্র মানুষের মন। বাস্তবতার কাছে স্বপ্নও কত অসহায়। জীবনের সবচাইতে বড়ো অর্জন যেখানে একটু থাকা খাওয়ার নিঃশ্চয়তা মাত্র, স্বপ্ন সেখানে ডানা ভাঙ্গা পাখির মতো অকর্মন্য। হয়তো তাই কমলার কথার কোন জবাব দেয়না লালচাঁন বরং তার শরীরের ওঁম নিতে নিতে চুপ করেই থাকে।
০২
ক'দিন যাবত শরীর ভালো যায়না কমলার। কোন অসুখ নেই তবুও অসুখ, নিজের ভেতর অন্যের অস্তিত্ব অনুভবের অসুখ। যে অসুখে কেউ হয় আনন্দিত সেই অসুখেই অনিশ্চয়তা বাড়ে কমলার। কি করবে সে এখন? লালচাঁনকে জানালে সে নিশ্চয়তার আশ্বাস দেয় মাত্র। বলে ঘরের খোঁজেই সে আছে, এতো উতালা হওয়ার কি আছে? কিন্তু কমলা আস্বস্ত হতে পারেনা। সময় চলে যাচ্ছে, এখুনি কিছু করা দরকার। নানী সব বুঝতে পারে কিন্তু কিছু বলেনা। হয়তো এই জীবনের অভিজ্ঞতাই তাকে বলে দেয় কিছুই করার নেই। কেবল রোজ রাতে একটা কথাই সে বলে কমলাকে-মরদটাকে ধরে রাখতে পারবি তো? দ্বিধা বাড়ে তাতে আরো বেশী। নিয়ম করে রোজ লালচাঁন আসে বটে কিন্তু ঘরের খোঁজ দেয়না কিছুই। বিয়ের কথা এরমধ্যে বলেও কমলা, কিন্তু লালচাঁন তাতে কোন রা করে না। সে বলে,
- ঘর হলে বিয়েতে কি মোদের জেবন আটকি থাকপে?
সময় চলে যায় দ্রুত কিন্তু কমলা কোন সিদ্ধান্তে পৌছতে পারেনা। অজস্রবার ভাবে যে আসছে তাকে নিয়েই তার যত ভাবনা এখন। কি করবে সে? এখনই কি থামিয়ে দেবে একটি নতুন জীবন সৃষ্টির গতি? নাকি তাকে বাড়তে দেবে আপন নিয়মে? আর চাইলেই কি করে সে তাকে রোধ করবে? এসবেই কিছুই জানা নেই তার। কেবল ভাবনার ভেতর দিয়ে দিনের সংখ্যাপাত বাড়ে, তার সাথে বাড়ে আরো একটা জিনিস। কমলা লক্ষ্য করে তার কেবল পেটই বাড়ছেনা সেই সাথে বেড়ে যাচ্ছে লালচাঁনের সাথে তার দূরত্বও। যে পেট বাড়া লালচাঁনের জন্যই সেই পেট বাড়ার সমগতিতে লালচাঁনের দূরত্ব বাড়াকে সে ভালো আলামত হিসেবে ভাবতে পারেনা। অনিয়মিত ভাবেই আসে লালচাঁন। একদিন পেট খসাবার প্রস্তাবও করে। কিন্তু এই নব জন্মের গতি রোধ করবার আর কোন উপায়ই খোলা থাকেনা ততদিনে।
এ সংবাদে যেন ভীষণ আশাহত হয় লালচাঁনকে। দিনে দিনে যত পেট বেড়ে ওঠে ততই আতংক বাড়তে থাকে কমলার। পড়শীরা এই নিয়ে তেমন কোন কথা বলেনা সেটাই আশ্চর্য লাগে তার। এই মানুষ গুলোই সামান্য বিষয় নিয়ে রোজ চুল ছেঁড়াছিঁড়ি করে। অথচ এতো বড়ো একটা ঘটনা তাদের একটুও কি ভাবিত করেনা! কেউ কেউ কমলার দিকে চেয়ে হাসে কেবল, তারচেয়ে বেশী অভিব্যক্তি প্রকাশ করেনা।
লালচাঁনের অনিয়ম বেড়ে যায়, কিন্তু বাড়তে থাকে গর্ভজাত শিশুর ক্রমবিকাশ। শেষের দিকে কমলা আর কাজেও যেতে পারেনা। তাই সারাদিন তাকে থাকতে হয় মন্দিরের পুকুর পাড়ে। সে বুঝতে পারে দিন ঘনিয়ে আসছে। সুস্থ অবস্থায়ই যেখানে আহার জোটানো কষ্ট সেখানে কর্মহীন দিনে নানীর ভিক্ষার টাকায় একপ্রকার না খেয়েই দিন কাটে কমলার। না খেয়ে না হয় নিজের শরীর বয়ে বেড়ানো যায় কিন্তু অভুক্ত শরীরে দু'জনের ভার বইতে কষ্ট হয় তার।
তারপর একদিন শিশুটির আগমনের ঘন্টা বাজে। সে ঘন্টার শব্দ এতো তীব্র যে এই দূর্বল শরীরে তা সইতে পারেনা কমলা। এসময় তেমন কেউ থাকেনা এই এলাকায়। তাও যে ক'জন পড়শী থাকে তারা কমলাকে নিয়ে যায় মন্দিরের পুকুর পাড়ের উত্তর দিকে জঙ্গলে। সেখানে তেমন কোন লোকজন যায়না সাধারনত। কেবল কিছু বেশ্যারা অলস ঝিমায়। সেখানেই আকাশের নিচে শাড়ির দেয়াল তুলে কমলার প্রসবের প্রস্তুতি চলে। অসহ্য যন্ত্রনায় নীল হয়ে ওঠে সে। যে পেটে হাত বুলিয়ে সে রোজ অনুভব করতে চেয়েছে অন্যের অস্তিত্ব আজ তার আগমনের রীতি যে কতটা যন্ত্রনাদায় কমলার জন্য তা কি সে বোঝেনা! ক্রমশ ব্যাথা নামতে থাকে নিচের দিকে। একটা তীব্র নিম্নমুখী ক্ষরণ টের পায় সে। যেন দেহের সমস্ত রক্ত কনিকা বেড়িয়ে যাচ্ছে ঐ নিম্নপথে, কেবল ব্যাথাটাই আটকে থাকে উরুসন্ধির কাছাকাছি। শরীরে যেন আর কোন শক্তিই অবশিষ্ট নেই। শেষ মুহূর্তে তার মনে হয় যা ইচ্ছা হোক, কেবল এই যন্ত্রনা বেড়িয়ে আসুক আমার ভেতর থেকে, আর সইতে পারছিনা। আলো অন্ধকারের ভেতর ডুবে যেতে যেতে সে শোনে পড়শীদের একটাই কথা,
- চিৎকার করি ভর দুপুরে মানুষ জড় করিস নে মাগী। আল্লা আল্লা কর।
আল্লার রহমতেই হয়তো বিনা চিকিৎসায়, বিনা পথ্যে কমলাকে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে দিয়ে স্বাভাবিক কন্যা শিশুটির জন্ম হয় শরতের খোলা আকাশের নিচে। শিশুটিকে দেখে পড়শীরা অবাক হয়- এ কার বাচ্চা গো! কমলার নানী চোখে দেখেনা তবু মহিলাদের কথা শুনে জানতে চায় কি হয়েছে। জবাবে মহিলারা ঠাট্টা কিংবা হিংসায় বলে,
-তোমার নাতনী দেহি আগুন প্রসব করিছে বুড়ি। এই বীজ তোমার নাতনী পালি কই?
কিন্ত এসব কোন কথাই কানে যায়না কমলার। এমনকি যে আগুন নিয়ে এতো কথা তার মুখটাও দেখা হয়না তার। আগুনের আগমনেই কিনা কে জানে, শিশুটির ভূমিষ্ট হবার চিৎকারের ভেতর দিয়েই জ্ঞান হারায় সে।
(চলবে...)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১০:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


