‘যশোর, ১৪ই সেপ্টেম্বর। নিখিল পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি জনাব মতিউর রহমান নিজামীর আগমনে যশোর ইসলামী ছাত্রসংঘের শহর শাখার উদ্যোগে এক ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। তিনি গত ৯ই সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় সংঘ অফিসে এক কর্মী বৈঠকে মিলিত হন এবং বিকেল ৪ টায় স্থানীয় বিডি হলে সুধী সমাবেশে ভাষণ দান করেন। এ সুধী সমাবেশে বক্তৃতা করেন সংঘের জেলা সাধারণ সম্পাদক জনাব মোহাম্মদ জিয়াউল হক, শহর শাখার সভাপতি জনাব নূরুল ইসলাম। সংঘকর্মী জনাব আজিজুর হকও বক্তৃতা দান করেন।
নিখিল পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি জনাব মতিউর রহমান নিজামী তাঁর সারগর্ভ ভাষণে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে স¤প্রতি যা ঘটেছে তা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক, কিন্তু সবকিছুই অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ কিছুসংখ্যক অপরিনামদর্শী নেতার ব¹াহীন রাজনীতিই এর জন্য দায়ী। বিগত নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী আঞ্চলিক দল ও সারা পাকিস্তানভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে চিন্তাধারার মৌলিক পার্থক্য ছিল।
তিনি বলেন, স¤প্রতি যারা পাকিস্তান ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল আল্লাহ তাদের প্রত্যেককে লাঞ্ছিত করেছেন। তিনি আরো বলেন, পাকিস্তানকে যারা আজিমপুরের গোরস্তান বলে শ্লোগান দিয়েছিল তাদেরকে পাকিস্তানের মাটি গ্রহণ করেনি। তাদের জন্য কোলকাতা আর আগরতলার মহাশ্মশানই যথেষ্ট।
সংঘ নেতা জনাব নিজামী ছাত্র সমাজ ও দেশের জনগণকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, অতীতের এ দুঃখজনক ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য সকল মহলকে সজাগ থাকতে হবে। তিনি বলেন, ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত আমরা ভুলে গিয়েছিলাম আমরা কোন জাতি। কিন্তু ৬৫-এর ৬ই সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত যেদিন পাকিস্তানের পাক ভূখণ্ডে নগ্ন হামলা চালিয়েছিল সেদিন প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে রেডিও টেলিভিশন ও জনগণ সরকারীভাবে কলেমা পড়ে মুসলমানিত্বের স্বকীয় ঐতিহ্য স্বীকার করলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় মাত্র ৬ বছরের মধ্যে এত বড় দুর্ঘটনা ভুলে গিয়ে ১৯৭১ সালে ডেকে আনলাম নিজেদের সর্বনাশ। এদেশের মুসলমানরা ভারতীয় হিন্দু দাদাদের ধোঁকায় পড়ে গেল। এতে শুধু দেশেই নয় বিদেশেও তারা খ্যাতি হারিয়েছে।
জনাব নিজামী উপসংহারে বলেন, দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে আমরা জীবনের বিনিময়ে যেমনভাবে পাকিস্তানের সেবায় এগিয়ে এসেছি তেমনি সরকারের উচিত হবে আমাদেরকে খাঁটি সৈনিকরূপে গড়ে তোলা। তিনি ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে তরুণ ছাত্র সমাজকে সত্যিকার পাকিস্তানী হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
সভায় বক্তৃতাকালে জনাব জিয়াউল হক পাকিস্তানের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন এবং বর্তমান অনৈসলামিক শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য সরকারের নিকট জোর আবেদন জানান।
জনাব নূরুল ইসলাম বলেন, পাকিস্তানে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য এবং পাকিস্তানের আদর্শ রক্ষার জন্য আমরা প্রয়োজন হলে জীবন দিতে প্রস্তুত রয়েছি। সভায় গৃহীত এক প্রস্তাবে ভারতীয় দালাল ও তার এজেণ্টদের পাকিস্তান ধ্বংসের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি অভিনন্দন জানানো হয়। অপর এক প্রস্তাবে অনতিবিলম্বে প্রাক্তন প্রাদেশিক গভর্নরের ঘোষিত ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করার জোর দাবী জানানো হয়েছে।
অপর এক প্রস্তাবে সরকারী অফিস-আদালত থেকে ইসলাম ও পাকিস্তান বিরোধী সকল কর্মচারীদেরকে বরখাস্ত করে খাঁটি দেশপ্রেমিক মুসলমানদের নিয়োগ করার দাবী জানানো হয়েছে।
জনাব মতিউর রহমান নিজামী গত শুক্রবার সকালে যশোর জেলা রেজাকার সদর দফতরে সমবেত রেজাকারদের উদ্দেশ্যে পবিত্র কোরান শরীফের সুরায়ে তওবার ১১১ ও ১১২ আয়াতের আলোকে জাতির এই সংকটজনক মুহূতে প্রত্যেক রেজাকারকে ঈমানদারীর সাথে তাদের ওপর অর্পিত এই জাতীয় কর্তব্যে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যেককে একটি ইসলামী রাষ্ট্রের মুসলমান সৈনিক হিসেবে পরিচিত হওয়া উচিত এবং মজলুমকে আমাদের প্রতি আস্থা রাখার মত ব্যবহার করে তাদের সহযোগিতার মাধ্যমে ঐ সকল ব্যক্তিকে খতম করতে হবে, যারা সশস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তান ও ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।’
দৈনিক সংগ্রাম : ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ : ২৯ ভাদ্র ১৩৭৮
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুলাই, ২০১০ রাত ৮:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


