somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... এক বছর!!!
ভালো আছি। ব্যস্ত আছি। অলসও আছি। দুটোই আছি।

এই মূহুর্তে ঘুম পাচ্ছে। ভীষণ ভীষণ। ঘুমিয়ে পড়ব। কিছুক্ষণের ভেতর ভেতর।

প্রায়কিছুই লিখি নি এর মধ্যে। ভালোই হলো। কঙ্কাল সম্পর্কে একটা ধারণা হলো। মাংশের আগে কঙ্কাল লাগে। কে না জানে।

বি-ড্যাশআয়ন চলছে। ফিল ইন দ্য ব্লেংক্স। অনেক কিছুরই। আশু রোগমু্ক্তির সম্ভাবনা নাই। দীর্ঘ প্রসেস। বাংলায় প্রক্রিয়া। কিন্তু রোগ ধরতে পেরেছি। এইটাই আলহামদুলিল্লাহ'র।

আর, উকুলেলের প্রেমে লাইলী। এক রাতেই দীর্ঘ হাঁটা। ক্লান্ত অনেক।
খুব মিষ্টি খেলনাধ্বনি। গিটার তালাক। উকু...লেলে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/29461410 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/29461410 2011-10-07 03:40:22
আকাশভরা 'শূন্যতা'রা!
বহুদিন বৃষ্টি ভিজি না। বৃষ্টি হয় না এমন না। বৃষ্টি হয়। আমি তখন থাই গ্লাসটা টেনে দিই পুরোটা। বৃষ্টি ফোঁটা আছড়ে পড়ে থাই গ্লাসেতে। আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমি আর আগের মতো কান পেতে পেতে বৃষ্টি শুনি না। জানলার ওপাশ ব্লার হয়ে যায়। দূর গাছগুলো গলে গলে পড়ে। সবুজগুলো মাখামাখি। আকাশ কেমন জলরংছবি।

বহুদিন বৃষ্টি ভিজি না। আমার খুব বৃষ্টি ভিজতে ইচ্ছে করে। বৃষ্টি জলে হা করে থাকতে ইচ্ছে করে। বৃষ্টি খেতে ইচ্ছে করে। বুড়ো আঙুল আর তর্জনি দিয়ে বৃষ্টি ফোঁটা ধরতে ইচ্ছে করে। বৃষ্টি ফোঁটা ভীষণ পাজী। ধরতে পারি না।

ইদানীং সকালগুলো গোমড়ামুখো। আকাশটাতে আকাশ দেখি না। শূন্যতা দেখি। আকাশে কোনো শূন্যতা নেই। আকাশ মানে পূর্নতারও বেশি। অথচ ইদানীং আকাশে কোনো আকাশ থাকে না। সমস্ত আকাশ ফেরারী হয়েছে। আকাশভরা 'শূন্যতা'রা!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/29213859 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/29213859 2010-08-02 23:55:36
হাঁটতে হাঁটতে আমার ভীষণ ক্লান্ত লাগে
যখন বৃষ্টি ঝরে জানলাগুলোতে হামলে পড়ে, তখন ছাদের বিশাল ছাতাটা একলা ভিজে কাঁদতে থাকে। ওখানে অনেকগুলো বিকেল থাকার কথা ছিল ডানা গুটিয়ে। অনেকগুলো পেলব কমলা আলো বিকেল। নরম তুলতুলে রোদ। কিন্তু পাখিগুলো ইদানীং সংসারী হয়েছে যেন। আর, পাশের, ঐ দূরের বিল্ডিংটার ছাদের পানির ট্যাংকিতেও ময়লা জমে না অনেকদিন। শেওলাও না। তখন মন্দিরের শঙ্খ আমাদের অন্ধ করে দেয়। আমরা খুব জোরে জোরে ঘণ্টি বাজাতে থাকি। একটানা। অনেকক্ষণ।

তুলসীপাতার জলের ছিটা আমাদের গায়ের উপর নাক কুঁচকে বসে থাকে। আমরা ওদের দিকে তাকিয়ে প্রচণ্ড জোরে হেসে উঠি। ধূপদানী থেকে ধোঁয়া উড়তে থাকে সুগন্ধকে পিঠে করে। সন্ধ্যের আলো তখন ঝিমাতে ঝিমাতে প্রায় ঘুমিয়েই পড়ে।

****************

হাঁটতে হাঁটতে আমার ক্লান্ত লাগে। ভীষণ ক্লান্ত। নিজেকে আমার খুব স্বাভাবিক মনে হয়। হেরে যাওয়া কেউ মনে হয় না। কেবল হাঁটার গতিটা কমে আসে খুব। স্যান্ডেলটাকে খুব ভারী মনে হয়। রাস্তা পেরোনোর সময় সব্জি বাজারের কূপির আলো, এবং ধোঁয়া, আমি কিচ্ছু দেখি না। থালার সামনে শুয়ে থাকা মাছের লাশগুলোকেও না। বামহাতে লুঙ্গি তুলে নির্লজ্জ দর কষাকষিগুলোও না। কেবল কিছু বৃষ্টি ফোঁটা দেখি চোখের সামনে। চশমার কাচ জুড়ে ছোট ছোট কিছু বিন্দু। অথচ সামনের পৃথিবীটাকে কী অনায়াসেই ঘোলা করে দেয়!

****************

বাসায় হয়ত স্নান করার জল নেই। কিংবা আমার হয়ত ইচ্ছে থাকবে না। ঘামে ভেজা নোংরা টিশার্টটাকে ঝুলিয়ে রাখব হয়ত আরো অনেকদিন। কিন্তু আমার ভীষণ ক্লান্ত লাগে। স্যান্ডেলটাকে খুব ভারী লাগে। রাতটাকে অনেক কালো লাগে। অনেক দীর্ঘ।

বাসায় ফিরেই ক্লান্ত আমি হয়ত সটান শুয়ে পড়ব মেঝের উপর। অনেক কাজ বাকি। অসমাপ্ত। অগোছালো। অথচ আমি ঘুমিয়ে পড়ব। একটা রাত কেটে গেলে হয়ত সব ঠিক হয়ে যাবে। সকাল হলে হয়ত দাঁড়াতে পারব মুখোমুখি...

আয়নার সামনে...

হয়ত না...

আমি জানি না...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/29022184 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/29022184 2009-10-08 00:46:16
আধো ঘুম আধো খুন
ইদানীং হাতের উপর উপুর হয়ে ঘুমিয়ে থাকি। রক্তগুলো পথ খুঁজে পায় না। গেইট তালা মারা পেয়ে ফিরে চলে যায়। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে থাকে। বড় বড় কিছু কাঠের গুড়ি নিয়ে ধুমা-ধাম-ঠুস-ঠাস। ঘুম ভেঙে যায়। অবশ একটা হাত আমার, কেটে ঝুলিয়ে রাখার মতো। ঘুমের ভেতরই আমার কান্না পায়। আমার হাতের জন্য খুব মায়া লাগে। এই হাতের কতো স্মৃতি। "হায় জীবন, তুমি এতো ছোট কেনে?"

চোখ খুলতে ইচ্ছে করে না। প্রচণ্ড ঘুমের মধ্যেও চাবি খুঁজতে থাকি গেইট এর তালার। তালাটাতে মরচে পড়েছে। বৃষ্টিজলে ভিজে ভিজে মরচেগুলো তরল হয়ে গেছে। হাতের আঙুলে জাপ্টে ধরে। চাবির গোছা ঝনঝন শব্দ করতেই থাকে, আমি চাবি খুঁজে পাই না। অথচ আরেকটা খুন করার বাকি!

আমার কিচ্ছু ভাল্লাগে না। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। খুনের স্বপ্নে আমি তলিয়ে যেতে থাকি... তলিয়ে যেতে থাকি... আরেকটা খুন আমায় হাত নেড়ে ডাকে... আমি ছুটতে থাকি... ছুটতে থাকি...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/29021177 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/29021177 2009-10-06 01:55:27
ধ্রুবতারা
আজকে আবার শার্ট প্যান্ট ইন করলাম। শু পালিশটা খুঁজে পেলাম, কিন্তু শুর মুখে হাসি ফোটাতে পারলাম না। গোমড়া মুখেই বাক্সবন্দী হলো। কাঁদার মধ্যে স্প্রিন্ট টানল। তারপর থুতনীর নিরীহ কালোঘাস নজর কাড়ল বেশ কয়েক জনের। আমি রেলিং থেকে ফুঁ দিয়ে অনেকগুলো পিঁপড়াকে উড়িয়ে দিতে থাকলাম একটা একটা করে। তারপর কল্পনা করতে থাকলাম ওদের ওড়ার দৃশ্যটা। স্লো মোশনে। ওরা চিৎকার করে করে চার তলার উপর থেকে নীচে পড়ছে। ঠিক সিনেমার মতো করে। স্প্যাশাল ইফেক্ট দিয়ে নয়। একদম সত্যি সত্যি। তারপর বেডমিন্টন কোর্টে ধুপ করে ল্যান্ড করেই উপরে আমার দিকে তাকিয়ে ডান হাতের আঙুল তুলে শাসাচ্ছে, আমার চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করছে।

কাল রাতের ঝড় থেমে গেল আজ সকালে। আমি আবার নেশার বোতল হাতে তুলে নিলাম। আকাশ থেকে রাবার দিয়ে ঘষে ঘষে মুছে দিলাম ধ্রুবতারাটাকে। ফ্লুইড দিয়ে একদম সাদা করে দিলাম।

আরেকটা আকাশ আঁকব এখন। আবারও আঁকব ধ্রুবতারা একটা। আগেরটাই। নতুন করে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28995256 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28995256 2009-08-17 12:05:45
সাদা-কালো ভোর-রাত
বৃষ্টি এখন চাল ভেজাবে। খয়েরি রঙের ঘুমিয়ে পড়া চাল জেগে উঠবে মুখে কালো কালো বসন্তের দাগ নিয়ে। তারপর পিচ্চিগুলোর পেন্ট উঠে যাবে হাঁটুর উপরে। দোকানগুলোয় ভীড় বাড়বে। ফ্লেক্সিলোডের সংসার ভেঙে যাবে, রামদা টানা পেশিগুলো ছুটি পাবে কয়েক পশলা।

তারপর মধ্যস্থতা করে কেউ ঝগড়া না থামালে পুকুর পাড়ে স্রোতের বেগটা বেড়ে যাবে। অর্জুনের শুটকী-শিদল রেইনকোট পড়বে। কাঁচামরিচগুলো কাকভেজা হবে। খামাখা-বালিগুলো চুয়ে চুয়ে পড়বে, টিটকারি মারতে থাকবে শ্রমিকগুলোর ঘামকে। পুকুর জলে মাছগুলো কী ভাববে তখন? চুপটি মেরে বসে থাকবে কি স্বপ্ন ভুলে?

গলাকাটা সুঠাম দেহের গায়ে সবুজ শার্ট। বুক খোলা। ওর মুণ্ডু থেকে বাতাস বেরোয় তীব্রবেগে। বাতাসগুলো আঁকড়ে ধরে গাছের লতা। সারা দিনমান আঁকড়ে থাকে। বৃষ্টিশেষে জল হয়ে যায়। ফাঁকফোকর দিয়ে কোথায় জানি হারায়। আমি আর পিছু নিতে পারি না।

কীটস এর ছাদের উপর চতুর্দশীর চাঁদ। নাকি ভরদুপুর! বুঝতে পারি না! গ্রেস্কেল-এ দিন রাত সমান হয়ে যায়! কে জানি বাঁশী বাজাচ্ছে দু হাত দিয়ে। নিশ্চয় ও বাড়ির দারোয়ান হবে। মুদ্রার ও পিঠে জংলী একটা। ওখানে রাত নিশ্চিত। ওটাও গ্রেস্কেল। কিন্তু রাত জানি নিশ্চিতভাবে।

বাক্সে আমার দমবন্ধ লাগে না এখন আর। আমার বোধহয় দম লাগে না। স্যাঁতস্যাঁতে এই গন্ধগুলোই আমায় বাতাস জোগায়, অক্সিজেন দেয়। অন্য কেউ সহ্য করতে পারে না। পালাতে চায়। আমি ওদের শিকল পড়াই। দু হাত বেঁধে কোনায় ফেলে রাখি। ওরা হাঁসফাস করতে থাকে। আমি ওদের চোখের সামনে কবিতা লিখি। তারপর দুমড়ে মুচড়ে ছুঁড়ে ফেলি ওদের মুখের ভেতর। ওরা অপেক্ষায় থাকে। গিলে ফেলে শুকনো কাগজ। আমার তখন করুণা হয়। কয়েকটা কাগজ গ্লাসের পানিতে চুবাই। ভেজা ভেজা নরম কবিতা ছুড়ে মারি ওদের মুখে। হাতবাঁধাগুলো বেজায় খুশি। পেট পুরে খায় বাক্সকবিতা। তখন মাকড়সাগুলোও নেমে আসে মাঠে। চারপাশে বাঁশ গেড়ে-বেঁধে আগুন জ্বালায়। সারারাত ধরে চলতে থাকে উন্মত্ত নৃত্য। ক্যাম্পফায়ার। ওরা আগুনে পোড়ায় আমার বাঁশির সুর। আমরা সবাই মিলে বাঁশিকাবাব খাই। মশলা ছাড়াই।

তারপর ভোর হলে মাকড়সা গুলো মেঘ হয়ে যায়। আমার জানলার উপর ভারী কাপড়ের পর্দা হয়ে ঝুলে থাকে দুপুর অব্দি। আমি ওদের গন্ধ শুঁকি। ওদের গায়ে কান্না মুছি। ওরা মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। চুলে বিলি কেটে দেয়। মুণ্ডুছাড়া সবুজ শার্টটা খুন হয়ে যায়। নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকে। গ্রেস্কেলে ভোর রাত হয়ে আসে, জংলীর রাতটা ভোর।

ছাতাটা আমার আড়মোড়া ভাঙে...

৩১০৭০৯১২৪৪]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28986677 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28986677 2009-07-31 12:46:52
ভেজা ভেজা
একজন হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে, হাঁত বাঁধা পেছনে, পেটানো শরীর, মুখে চাপা ক্রোধ...আরেকজন দুহাত মেলে দিয়েছে দুপাশে--মুক্তির আশায়...

ঘাস ছিঁড়লাম, বালু উড়ালাম। ইটের ভাটা মাথায় রেখে ছবি তুললাম। স্নানরতাদের সংকোচ এড়িয়ে গেলাম খামাখা একটা গল্প জুড়ে দিয়ে।

আমরা হাঁটতেই থাকলাম, হাঁটতেই থাকলাম...

তারপর আবার দুপাশের স্রোতে আঙুল বোলালাম। ঘোলা জলের লাজুক স্রোতে। সিমেন্টের বড় বড় ব্লকগুলোতে নৌকা ভিড়ল, আমাদের নৌকা, কচুরিপানার আয়োজন সেখানে। আমাদের দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইল বিশাল আকাশ। আকাশে তখন একটা বিকেল, একটা মস্ত বড় আকাশ, আর একটা ক্লান্তসূর্যাস্ত--একটা ব্রিজের ফাঁকে--নীচের জলে স্পষ্ট সন্ধ্যা, লালচে আলো। কিন্তু দেখলাম কেবল আমি একাই। একজন কিছুটা ভান করল। বাকিরা সবাই ধোঁয়াচ্ছন্ন।

হঠাৎ দেখায় মাটির দেয়াল লজ্জা পেল না! আমি লজ্জা পেলাম। মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। একটা স্নিগ্ধ সারল্য পরশ বুলিয়ে গেল আমার সবটুকু জুড়ে। আমি ভীষণ মুগ্ধ হলাম। মা'র মনে করিয়ে দেয়া 'লজ্জাবতী'র কথা আমার আর বলা হলো না। আমি বেমালুম ভুলে গেলাম। মাটির দেয়ালের লজ্জা দেখে। খসে পড়া দেয়ালের কান্না শুনে। মশারির স্ট্যান্ড-এ ঝোলানো মলিন কাপড়গুলোও চোখ নামিয়ে রইল। এক কোনায় ধুলোপড়া বইয়ের তাকে এলোমেলো বইগুলোও চোখ এড়িয়ে গেল না। কিংবা মাটির মেঝেতে পা ঘষানোর শীতল অনুভূতি। টুকটুকে লাল লজ্জাগুলো উড়ে উড়ে চলে গেল। কিচিরমিচির করতে লাগল আশেপাশেই। মাথার উপর গোছানো চুলের গোছা দুষ্টুমি করতে থাকল একটানা।

শাড়ির আঁচল এগিয়ে এলো ধীরপায়ে। এবং কোনো অনুযোগ ছাড়াই একটুকরো অজুহাত।

তারপর আঁধার চিরে এগিয়ে চলল আমাদের-দুচোখ। বৃষ্টি এলো না। একটু একটু সোঁদা গন্ধ এলো নাকে। ভেজা ভেজা। আজ প্রথম বারের মতো। যদিও চমকে গিয়েছিলাম প্রথমে। ভূত দেখার মতো করে। তবু মোমবাতির আলো একটুও কাঁপল না।

বিষণ্ণতা চলে গিয়ে একটুকরো হাসি এলো মুখে। আমার খুব ভালো লাগল।

ফিরতে ফিরতে বৃষ্টি এলো। বা-হাতে ধরা ছাতা বেয়ে বেয়ে অমনি আমার জিন্স উঠে গেল হাঁটু পর্যন্ত, আর স্যান্ডেলজোড়া ডানহাতে। ভরদুপুরের পিচগলা রাস্তাটাকে ভীষণ নিরীহ মনে হলো বৃষ্টিভেজা স্পর্শ পেয়ে। অবাক বিস্মিত চোখজোড়াগুলোকে এড়িয়ে গেলাম। অনেকগুলো কেরোসিনকুপি দেখলাম দূরে সারি সারি। পাশাপাশি অনেকগুলো হলুদ আলো। বৃষ্টিভেজা। মাছের বাজারের। এক পশলা বৃষ্টিবেলায় কুঁকড়ে যাওয়া মাছের বাজার।

কিন্তু রাস্তায় জমে যাওয়া জলগুলোর মন ভালো করে দিতে পারলাম না আমি...সারাদিনের ব্যস্ত ক্লান্ত বোবা ঘোলাজল...

২৬০৭০৯০১৪৭]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28983762 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28983762 2009-07-26 01:53:03
বৃষ্টিকথা
আমি ভাবছিলাম রবীন্দ্রনাথের কথা--ধরণীর গগনের মিলনের ছন্দে।

(অথচ আকাশকে তখন খুব বিষণ্ণ লাগছিল। আর দোতলার গ্রীলবারান্দা থেকে 'ধরণী'কে তো আর ভালো করে দেখাও যায় না!)

কিন্তু তারচেয়ে বেশি হার্বার্টের চিত্রকল্পটাই টানছিল। দিনের আলোর প্রাচীরটানা আকাশ-মর্ত্যের রাতের আঁধারে একাকার হয়ে যাওয়া।

আমার খুব ইচ্ছে করছিল রবীন্দ্রনাথকে জিতিয়ে দিই...'নবীন ঘাসে' চোখ ডুবালাম, 'ভাবনা'কেও ভাসিয়ে দিলাম 'পূব বাতাসে', হার্মোনিয়াম হাতে অন্ধকার ঘরে ঘামলামও কিছুক্ষণ উদলা গায়ে...কিন্তু পারলাম না...

আর সব বাদ দিয়ে মা হঠাৎ করে গান ধরল, "জনগণমন অধিনায়ক জয় হে..."

আমার ভীষণ অবাক লাগল! বর্ষার সাথে এই গানের কোনো অপ্রকাশিত গোপন সম্পর্ক আছে কি না তাই ভাবতে লাগলাম!

বৃষ্টির ছিটা লেগে আমার স্কাইকালারজিন্সের হাঁটুটা তখন আরেকটু বেশি গাঢ় নীলচে রঙের হয়ে উঠছিল। দূরের গাছগুলো, দূরের ল্যাম্পপোস্ট-টাওয়ার এবং আকাশের বেশ কাছাকছি বিল্ডিংগুলোকে আমি তখন আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে দিলাম স্কেচ করার পর। ওরা আবছা আবছা হয়ে গেল। বোবাদের অসহায় চোখের মতো।

মা কিছুতেই "গুজরাট মারাঠা" লাইনটা গাইতে পারছিল না, মাত্রা মিলছিল না। আমি অনেক চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঠিক করে দিতে পারলাম না। আমি একবার গেয়ে শোনাই, তারপর মা গায়, তারপর আমরা দুজনই হেসে উঠি খিলখিল করে...আমাদের হাসির শব্দ চাপা পড়ে যায় বৃষ্টির শব্দে...

আকাশ তখন একরঙা হয়ে গেছে...

আমি ছাদ থেকেই ডাক দিলাম, অ ড্রায়বার, রায়নগর দর্জিফারা...

ড্রাইভারটা থেমে গেল আর আমি টিশার্ট গায়ে দিয়ে, ব্যাগ ঝুলিয়ে, পকেটে চাবি-মানিব্যাগ-মোবাইল ঢুকিয়ে, বাবার স্যান্ডেলটা পায়ে দিয়ে দিলাম দৌঁড় বারান্দা থেকে নীচে।

ড্রাইভারকে ছাতা দিলাম। নিলো না। তারপর ওর নীল পানিকাপড় আমাকে আস্ত গিলে ফেলল খুব সহজে। ভিজে জবজবে হয়ে যাওয়া পেটানো শরীরের ড্রাইভারের গায়ে এসে বসল একটা কালো মহিষ, আর আমার ড্রাইভারটা অম্নি হয়ে গেল মাইকেল শুমাখার! দুর্দান্ত বেগে ছুটে চলল আমাদের ময়ূরপঙ্খী।

তারপর আমার চশমার কাচজোড়া কেবল ঝাপসা হয়েছে উত্তরোত্তর। আমিও মুছি নি। একটা দুইটা গাড়ির হেডলাইটে চোখের সামনে জলের প্রতিসরণে ইয়াব্বড় একএকটা আলোর আল্পনা দেখতে আমার ভালো লাগছিল।

জিন্দাবাজার তখন থমকে আছে। রাজাম্যানশন, মিলেনিয়াম আর ব্লু-ওয়াটারের উঠোনে তখন অনেকগুলো ভেজা চুল। অনেকদিন পর পানি জমে যাওয়া জিন্দাবাজারকে দেখলাম। রিক্সার চাকার স্পোক ভিজিয়ে দেয়ার মতো জল তখন জিন্দাবাজারের রাস্তায়। বৃষ্টিবন্দী মানুষগুলোর চোখেমুখে অপেক্ষার বিরক্তি নয়, উচ্ছাসই দেখলাম বরং। হঠাৎ একছাদে হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কারো সাথেই কারো কথা নেই। তবু নীরব একটা রোমান্টিকতা সবার ভেতরে।

তারপর ধোপাদিঘিরপাড় ক্রস করতেই একটা সিএনজির যক্ষা হয়ে গেল। রাস্তার মাঝখানে কাশি জুড়ে দিল। আমার ভাঙাচোড়া রিক্সাটা তখন বিজয়ের হাসি হেসে ওকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল আমাদের দুজনকে নিয়ে।

সিএনজিলাশ আরেকটা দেখলাম জেইলরোড মোড়ে। একদম নিথর নিস্তব্ধ।

ততক্ষণে বৃষ্টি বেশ কমে গেছে। কিন্তু চশমার কাচ স্পষ্ট হয় নি। আলোর আল্পনা তখনও আঁকছিল কাকভেজা মোটরসাইকেলগুলো। আর আমি পিচের রাস্তায় বৃষ্টিফোঁটার ছিটকে পড়ার দৃশ্যগুলো এঁকে নিচ্ছিলাম খুব দ্রুত। বৃষ্টিফোঁটা খুব জোরে জোরে আছড়ে পড়ছিল রাস্তার উপর।

ফেরার পথে বৃষ্টি ছিল না...আর চশমাটা আমার ব্যাগ এর ভেতর...ভাঙা...

আজ নতুন একটা ফ্রেম কিনতে যাব...

১৯০৭০৯১২০৮]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28980373 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28980373 2009-07-19 12:21:45
কানিশাইলবিকেল-২
অনেকক্ষণ পর একটা 'হাতের মুঠো' এঁকে ফেললাম হঠাৎ করে। কিন্তু কেমন পেলব পেলব একটা ভাব। মুষ্ঠির দৃঢ়তা নেই, ঔদ্ধত্য নেই। তার পাশে একটা হাঁসের ছানা আঁকা হয়ে গেল একটু পর। কিছু একটার উপর বসিয়ে দিলাম হাঁসের ছানাটাকে। হাঁসের ছানাটা ডানা ঝাপটাল না। চুপ করে বসে রইল। তার পিঠের উপরই পেলব মুষ্ঠি।

তারপর লাল জোছনা হয়ে গেল একটা দিঘি। দিঘির জলে ভাসিয়ে দিলাম ছোট ছোট অনেকগুলো দ্বীপ। ওরা ভাসতে থাকল, হাসতে থাকল। দিঘির জলে স্পষ্ট সন্ধ্যা।

আহ! দিঘি...শান্ত দিঘি!...দিঘির জলে দ্বীপ ভাসানো...দিঘির জলে স্বপ্ন আঁকা!...

অনেকদিন পর জল আঁকলাম। স্বচ্ছ জল। জলের মুখে মুচকি হাসি। ক্লান্ত দিঘিটা ছড়িয়ে গেল আকাশ জুড়ে। অনেকটা উপর পর্যন্ত। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম কেবল...

তারপর একটা সময় সবুজ পাতাগুলো কালো হয়ে আসতে লাগল। আকাশ জুড়ে অনেকগুলো 'সিলহৌট'...লম্বা লম্বা...গোল গোল...দ্রুত ছুটে যাওয়া...

আরো কয়েকটা আঁকতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু মেঘগুলোও তখন ঘুমিয়ে পড়েছে...

১৪০৭০৯১৪১৪]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28978111 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28978111 2009-07-14 14:23:44
ঘাম শুকিয়ে গেছে অনেকটাই
রিক্সায় বসে রেডিওটা টিউন করলাম আজও। অথচ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম 'আর কক্ষনই না।' রেডিওটা একটানা বকে গেল কপালের ঘাম মুছতে মুছতে। আমি ঘাড়েরগুলো মুছে চলেছি একটু পরপর। ড্রাইভারের সাদা চুলে কড়া রোদ অনেক বেশি প্রতিফলিত হচ্ছিল। হিংসে হচ্ছিল অনেক।

কিন্তু আমি অনেকবার ডাকলাম রিক্সায় বসে। সম্ভবত হেলম্যাট এর কারণে। একদমই শোনে নি। অথচ যখন মোড় নিয়েছিলাম ডান দিকে, তখন একবার চোখাচোখি হয়েছিল। আমি ব্যাপারটাকে হাল্কা করতে চাইলাম। তাই একটু এগিয়েই যখন ছোটখাট একটা জ্যাম-এ আটকা পরে আমার রিক্সা আর ওর বাইকটা প্রায় কোলাকুলি করতে বসেছিল, বেশ কয়েকবার ডেকেছি হাসিমুখে। কিন্তু ওকে বেশ বিব্রত মনে হলো। খুব দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে গেলেই যেন বেঁচে যায়।

রিকাবীবাজার মোড়ের আঁস্তাকুড়টার সাম্রাজ্য আরো বেড়েছে দেখলাম। ওটার পাশে ব্যস্ততা বেড়েছে স্যান্ডু গেঞ্জী আর লুঙ্গিগুলোর। আর রাস্তা দিয়ে ওটার সামনে দিয়ে খুব দ্রুত চলে যাওয়া রিক্সায় বসা যাত্রীগুলোর হাসিও কমে গেছে। কেউ কেউ অবশ্য খুব জোরেও হেসে উঠছে নাক চেপে রাখতে না পেরে। সেন্ডু গেঞ্জীগুলো নিশ্চয় খুব অবাক হয় সবার এইসব ভীমরতি দেখে!

আমি যখন রিক্সা থেকে নেমে গেলাম তখন স্ট্যাডিয়ামের ফ্লাডলাইটগুলো ক্লান্ত দু জোড়া চোখ মেলে খুব অসহায় ভাবে তাকিয়ে ছিল। আর থরে থরে সাজানো সবুজ চামড়ার ভেতর সঙ্গোপনে পেকে যাওয়া আমগুলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।

তারপর হাঁটতে হাঁটতে আমার চোখ চলে যায় ওদের জানলায়। ছাতা দিয়ে দৃষ্টি ঢাকি প্রায় পুরোটা। ছাতার একদম প্রান্ত ঘেষে ফোকাস করি চারতলায়। কিন্তু আমি একটাও রিক্সা পাই না হাঁটতে হাঁটতে। তখন আমার একিলিসের কথা মনে পড়ে...

নেশায় পেয়ে বসেছিল সেদিন আমায়। একটার পর একটা মুণ্ডু খসে পড়ছিল শরীর থেকে। পুরোটা গলা কেটে ফেলার সেই অনুভূতিটা এখনও সজীব। অদ্ভুত সেই নেশা। কী তীব্র মাদকতা! স্বপ্নেও এমন হবে, ভাবি নি কখনও। কিন্তু আমি নিজেকে থামাতেই পারছিলাম না। একটা একটা মস্তকহীন ধড় মুখ থুবড়ে পড়ছিল। আমি কেবল তলোয়ার চালিয়েই যাচ্ছিলাম...

এবং সবশেষে আমি মিথ্যে বললাম। আরেকটা বিকেলকে ধোকা দিলাম সন্ধ্যের কথা বলে। যদিও কাল রাতে বসন্ত হয়েছিল আকাশের মুখে। কিন্তু ইলেকট্রিসিটি চলে আসায় খুব দ্রুত নামতে হয়েছিল ছাদ থেকে...

আরও একটি বাক্সবন্দী দিনকে আলিঙ্গন করে নিয়ে...

১৩০৭০৯১৬০৯]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28977710 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28977710 2009-07-13 16:10:32
আমার গল্প তবু বলা হয় না...
নীরব টাইলস-বেসিনের মৌনতাভাঙানো পানি পড়ার শব্দে লজ্জা পেয়ে আমি যখন মাথা ঘুরিয়ে রাখি উপরের দিকে; বাথরুমের ভেন্টিল্যাটরের গায়ে যখন ওপাশের কাঁঠালপাতা আল্পনা আঁকে একরঙা প্রচ্ছদে; এবং বৃষ্টির ফোঁটায় কাঁপতে থাকে ভেন্টিল্যাটরের ছোট্ট ক্যানভাসে; মাঝে মাঝে ইন, মাঝে মাঝে ফ্রেইমআউট; তখন আমি সাঁতার কাটি কমোডের গায়ে -- তীব্রবেগে ছিটকে পড়া একঝাঁক জলকণাদের ক্ষণিক স্রোতে।

স্যাঁতস্যাঁতে বিছানায় তারপর আছড়ে পড়ে আযান। আযানের সুরে আমি ভৈরবী খুঁজি; ফেইড আউট বৃষ্টির শব্দে সিম্ফনি-সোনাটা। আর সুবোধ বালক ঘুমিয়ে পড়ে রাতের কোলে মাথা রেখে।

আমার গল্প তবু বলা হয় না...

নতুন আরেকটা না হয় তুমিই বলো?...

০৯০৭০৯০২৪২]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28975546 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28975546 2009-07-09 02:42:47
সন্ধ্যে হলেও মায়েদের অপেক্ষা অহর্নিশ
কিন্তু পাখির মতো করে
ছেলেদের আসলে ঘরে ফেরা হয় না

১৯০৬০৯১৩৩১]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28966671 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28966671 2009-06-19 13:25:17
ঘোড়াডুম সাজে
ব্যাগের ভেতর কালো ছাতাটার আরামের ঘুম ভাঙালাম বেশ কয়েকবার। আবার ঘুম পাড়িয়েও দিলাম। একটা সিএনজিতে চড়ে বসলাম। দাঁতে দাঁত কষে অপেক্ষা করতে থাকলাম সিএনজি ছাড়ার; আর ড্রাইভারটা -- বাকি দুইটা সিটের প্যাসেঞ্জার পাওয়ার।

তারপর খুব ভাব নিয়ে নেমে গেলাম রোদের রাজ্যে। পেছনের, "ওউত্তো বাই, সারিদিরাম" কে 'থোড়াই কেয়ার করি' ভাব দেখিয়ে হনহন করে হেঁটে এগিয়ে গেলাম অনেক দূর। একবারও পেছন দিকে না তাকিয়ে খামাখা খুঁজতে লাগলাম রিক্সা কিংবা সিএনজি। তারপর একটা সিএনজি এলো। আমি উঠে গেলাম ড্রাইভারের পাশের সিটটাতে। একটু একটু লজ্জা পেয়ে বললাম, 'আমার দেরি ওই যার তো!' ড্রাইভার মিটিমিটি করে হাসছিল মুখ টিপে। আর আমার পিত্তি জ্বলছিল রাগে। আমি নেমে যাওয়ার পর নতুন আরেকজন উঠেছে দেখলাম ঘাড় ফিরিয়ে।

এখন বাসায়। একটু পর জলরং মেশানো শেখাব ওকে। কাজটা নাকি অনেক সহজ! জলের সাথে মিশিয়ে দিলেই হলো!

১৭০৬০৯১৪১৩]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28965841 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28965841 2009-06-17 14:07:53
আজও হার মেনেছিলাম বৃষ্টির কাছে
আজও হার মেনেছিলাম। কিন্তু শেষমেষ বৃষ্টিই আমাকে জিতিয়ে দিল।

ব্যাগ থেকে খুব দ্রুত লাফ দিয়ে বেরোলো ওয়েটিং ফর গডট, দ্য আউটসাইডার আর নীল রঙের একটা ভিআইপি ডায়রি। ফুল শার্টের হাতা উঠে গেল ভাঁজ হয়ে।

সিএনজির ভেতর সিগ্যারেটের তীব্র গন্ধ ভেংচী কাটতে লাগল আমার নাকের চারপাশে উড়তে উড়তে। আমি অনেক সংকোচ নিয়ে লোকটাকে বললাম, "বাই সিগেরেট্টা একটু তারাতারি খাইলিবানি?"

আমার ধারণা ছিল লোকটা আমার দিকে কটমট করে তাকাবে; তারপর ড্রাইভারটাকে বলবে, "ঐ, গারি সাইড খরসাইন...;" ড্রাইভার তার নির্দেশমতো গাড়ি সাইড করলে সে নেমে যাবে সামনের-ড্রাইভারের-পাশের সিটটা থেকে; তারপর আমাকে টেনে নামাবে পেছনের সিট থেকে -- আমার পাশের বুড়োটা তার হাতের ইদ্রিছ ছাতাটাকে দু পায়ের ফাঁকে রেখে ময়লা জমে ছাই রঙা হয়ে যাওয়া পাতলা পাঞ্জাবী গায়ে কাঁপতে থাকবে তখনও -- ড্রাইভারটা তখনও হ্যান্ডেলটা ছাড়বে না, দু হাতে শক্ত করে ধরে থাকবে, তার উপর ওর ডান হাতের বুড়ো আঙুলটাও নড়বে না একচুলও, ঠিক ঠিক বসে থাকবে সে হর্ণের বাটন-টার পিঠে -- তারপর লোকটা একহাতে আমার ভাঁজ করা হাতার ফুল হাতা শার্টের কলার ধরে অন্য হাতে আরেকবার ফুঁকে নেবে ওর আধপোড়া সিগ্যারেটটা; তারপর ভ্রূ কুঁচকে, মাথাটাকে উপর-নীচ উপর-নীচ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলবে, "কিতা খৈসোস তুই আমারে? হে? কিতা খৈসোস?"...

এরকম একটা ঝামেলা হবে আমি জানি। এজন্যই সবসময় চুপ থাকি। বাসের ভেতরও যখন সিগ্যারেটের গন্ধে পুরো চারপাশটা উথাল-পাথাল করতে থাকে, তখনও চুপ করে থাকি আমি। টি-শার্টটা নাকের উপর পর্যন্ত তুলে থাকি, জানালাটা একবার খুলে বাতাস ঢুকিয়ে আবার বন্ধ করে দিই। আমার পক্ষে যা যা সম্ভব, তার সবটাই করি, তবু কিচ্ছু বলি না। কী দরকার খামাখা ঝামেলা বাড়িয়ে! আমার সমস্যা তো আমার নিজেরই সমাধান করতে হবে!

কিন্তু লোকটা জানি না কেন, শেষ আরেকবার টান দিয়ে দুম করে সিগ্যারেটটা রাস্তার মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিল!

১৬০৬০৯১৩৩৬]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28965348 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28965348 2009-06-16 13:36:25
আমার একলা থাকার ঘর, আহা! একলা রইল না...
তারপর কিছুক্ষণ হাত-তালি পড়ে ওদের সিম্ফনি শুনে। ওদের গান থেমে যায়। হাত ধুই না আমি। কাল-সকালে লাল দাগগুলো খয়েরি হয়ে যায়।

বালিশগুলো ভিজতে থাকে ঘাড়ের ঘামে। বেডকাভারগুলো কুঁচকে যায়। ফ্যানের বাতাসে শুকাতে থাকে সেই ঘামগুলো। আর তারপর কাল-সারারাতের অমানবিক পরিশ্রমে ক্লান্ত ফ্যানটা একটু জিরোয়।

টেবিলের ওপর ছোট্ট ডুপ্লেক্সে ধুলো জমে না। সবগুলো ফাঁক-ফোকর ধুলোকণা পিঠে নিয়ে নাক ডাকছে, নতুন আর কারো জায়গা নেই। ধুলোকণাগুলো ডুপ্লেক্সের আশ-পাশে ঘুরতে থাকে উড়তে উড়তে। সুযোগ খুঁজতে থাকে একটু বাতাসের। একটা-দুইটা উড়ে গেলেই জুড়ে বসবে সেই লোভে। কিন্তু ঐ বাতাসে সেও উড়ে চলে যায় বেশ দূরে।

'বুরুদা'র থ্রিলার উড়তে থাকে ডুপ্লেক্সের ছাদের ওপর...

থার্টি ফার্স্ট নাইট। হঠাৎ করে দরজায় পাথরের টুকরা ছুড়ে মারার আওয়াজ। দরজা খুললে একটা ছোট্ট ব্যাগ। ব্যাগের ভেতর একটা আর্চিসের কার্ড। আর এই ডুপ্লেক্সটা। অনেক রঙিন। অনেক কিউট।

এত বড় একটা ছেলে ছোট্ট একটা বাচ্চা ছেলেকে নিউ ইয়ারে কার্ড-গিফট দেবে! এত রাতে! সেই সংকোচে পাথর ছোঁড়ার কাছে হাত পাততে হয়েছে বুরুদাকে।

বুরুদা এখন চশমা পড়ে। রাস্তায় একসাথে হাঁটতে হাঁটতে শুনি ডাক্তার বলেছে সে নাকি অপুষ্টিতে ভুগছে। হাঁটতে হাঁটতে ওর, অনেকগুলো বিয়েতে দাওয়াত না পাওয়ার কষ্টের গল্প শুনতে থাকি। সবগুলো কাছের মানুষের বিয়ে। 'খ সাইন তুই, কিলা লাগে?'

আমি চুপ করে থাকি। লোডশেডিঙে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা রাস্তার হলুদ বাতিগুলো বুরুদার কথা শুনে হাসে। রাস্তার দুপাশে মানুষজনের কথা আরো বেশি করে স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের কাছে। লামাবাজার মোড়ের সাইকেল-রিক্সার বেল এর শব্দ অনেক দূর থেকেই শুনতে পাই আমরা একসাথে।

‌'বুরুদা, চটপটি খাইবাই নি?' আমরা তখন স্ট্যাডিয়ামের সামনে।

শান্ত অনেক দূর থেকে রিক্সায় দাঁড়িয়ে গিয়ে হাত নেড়ে ডাক দিয়েছিল। আমি ঠিক চিনতে পারি নি। কিছুটা ধারণা করেছিলাম ও হতে পারে। অনেক লম্বা চুল। আর ওর পাশের ছেলেটাকে ওওদের বন্ধুদের একজন লেগেছিল যার নাম আমি জানি না কিন্তু চেহারা চিনি। স্ট্যাডিয়ামের সামনে নেমে যখন ও রিক্সাভাড়া দিচ্ছিল তখন নিশ্চিত হলাম শান্তই। আমাকে দাদা বলে ডাকছিল, বাসায় যেতে বলছিল। আমি খুব অস্বস্তিবোধ করছিলাম। আমি ওর বন্ধুই হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু...

সেও কি ইচ্ছে করেই আমাকে সিনিয়র করে রাখছে!

'নারে। আমি চটপটি খাইনা।'

উত্তরটা আমাকে একটুও চমকে দেয় নি এমন একটা ভাব করে আমি অন্য একটা প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছিলাম। বুরুদা থামিয়ে বলল, আমার মতোই ওর একটা খুব প্রিয় ভাই ছিল। প্রতি সন্ধ্যায় সে বুরুদার দোকানের সামনে আসত। ওরা একসাথে চটপটি খেত। সেদিন সন্ধ্যায়ও খেয়েছে। বুরুদা ওকে ওদের বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসেছে একসাথে হেঁটে হেঁটে। 'ধাম' করে বিশাল পাঞ্জার একটা 'আদর'ও দিয়েছে পিঠে অনেক জোরে। আর পরদিন সকালেই শোনে সে মারা গেছে! এমসি কলেজের পুকুরে খেলা শেষে পা ধুতে গিয়ে পা পিছলে নাকি মারা গেছে। সাঁতার জানত না। তারপর থেকে বুরুদার আর চটপটি খেতে ইচ্ছে করে না। ওর কথা মনে পড়ে যায়।

এই রাস্তাটা আমার খুব প্রিয়। রিকাবীবাজার মোড় থেকে স্ট্যাডিয়ামের গা ঘেষে চৌহাট্টা মোড় পর্যন্ত। এই রাস্তার হলুদ বাতিগুলো আরেকটু বেশি উজ্জ্বল।

বুরুদার কথা শুনে আমি কেবল 'ও' বললাম।

............................................................................................

তখন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। আমার ব্যাগের ভেতর ছাতা ছিল। আর আমি ওর ঘুম না ভাঙিয়ে ভিজে ভিজেই হাঁটছিলাম। একটা দোকানে 'গুডনাইট' পেয়েছি, কিন্তু ওটা ছিল সকেট সিস্টেম। পুরো মেশিনটাকেই সকেটে ঢোকাতে হয়। আমি চাইছিলাম লম্বা তারে প্লাগ লাগানো একটা মেশিন। কয়েকটা দোকানে হামলা চালাতে সংকোচ করলাম না পছন্দের জিনিসটা বেছে নিতে। নিজের টাকায় কিনছি। নিজের জন্য।

শেষমেষ তিন নম্বর দোকানাটাতে ঢুকে জিজ্ঞেস করলাম, 'গুডনাইট ম্যাট আসে নি?'

মধ্যবয়স্ক স্টিলের ফ্রেমের চশমা মাথা নাড়ে।

'মানে মেশিনটা আর কি,' কেবল লিকুইডটা বের করে দেয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতায় বললাম আমি, ‌'ওউ যে প্লাগ লাগাইল?'

মধ্যবয়স্ক চশমা আবারও মাথা নাড়ে মিটিমিটি হাসতে হাসতে। আমি ছোট্ট ছেলেটার দিকে তাকাই। ঝুলে থাকা লেইস এর প্যাকেটগুলোতে তাকাই। দেয়ালে তাক করে রাখা অল ক্লিয়ার ফর ম্যান, হ্যাড এন্ড শোউল্ডার ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর ছেলেটার হাতে ধরা একটা লাল প্যাকেটের দিকে। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে মধ্যবয়স্ক চশমা মুখ খোলে, 'টেস্ট খরি দিতাম নি?'

আমি একটা মাঝামাঝি ইশারা করলাম। হ্যাঁও না, না-ও না। ধুলোজমা প্যাকেটটা খুলে প্লাগটা ঢোকানো হলো সকেটে। সুইচ দিতেই মেশিনের ইন্ডিকেটর লাইটটা জ্বলে উঠলো লাল রঙ মেখে আর আমরা সবাই নিশ্চিত হয়ে গেলাম মেশিনটা ঠিক আছে, যদিও এটার কাজ আলো দেয়া না।

লাল প্যাকেটের গায়ের ধুলো মোছা হলো। একটা সাদা জালির ব্যাগে ঢোকানো হলো। তারপর আমার হাতে তুলে দেয়া হলো দুইটা ১০০ টাকার নোট নিয়ে ১ টাকা ফেরত দিতে দিতে। আমি মনে মনে অপেক্ষা করছিলাম ও না আসুক একটা বারের জন্যও যদি ওদের বাসার কেউও ফ্লেক্সিলোড করতে আসে! কিন্তু কেউ এলো না। দোকানে কেবল আমরা তিনজন।

ওদের দুজনকে রেখে আমি বেরিয়ে এলাম দোকান থেকে। রাস্তার পাশের উঁচু স্ল্যাবগুলোর উপর হাঁটতে লাগলাম। ডান দিকে ফেলে যেতে লাগলাম কয়েকটা ফার্মেসি আর সিতারা বেকারীর ভেতর থেকে আসা মিষ্টি সেই খুব চেনা গন্ধটা। বেড়ে যাওয়া বেগের গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে ঘাম ঝরানোর মতো যথেষ্ট বেগে দৌঁড়ে দৌঁড়ে হাঁটতে লাগলাম আমি।

ইতো যখন প্রথম গোলটা দিল তখনও আমি কোনো গন্ধ পাই নি। বেশ বোকা বোকা লাগছিল লাল ইন্ডিকেটর লাইটটা জ্বলতে দেখেই মেশিনটা ভালো আছে এই ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছিলাম ভেবে। অবশ্য মেসি দ্বিতীয় গোলটা দিতে দিতেই মনটা আবার ভালো হয়ে গেল আমাকে আর মশারি টাঙিয়ে ঘুমাতে হবে না ভেবে।

আমি এখন মশারি ছাড়াই ঘুমাই! আমি যখন অনেকগুলো ভিডিও ক্লিপিংস এলোমেলোভাবে দেখতে থাকি ঘুমের ঘোরে, তখন আমার নাকের পাশে গুডনাইটের গন্ধ উড়তে থাকে লাঠি হাতে। মশাগুলো আর গান বাঁধে না। দু হাত আমার লাল হয়ে কাল-সকালে খয়েরি হওয়ার সুযোগ পায় না।

আমার একলা থাকার ঘর, আহা! একলা রইল না!...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28958393 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28958393 2009-05-31 23:11:59
আগডুম বাগডুম
বুড়োর মুখে ময়লা জমে। দুয়েক কোণায় ভাঁজ পড়ে যায়। জিন্দাবাজার পয়েন্টে দাঁড়িয়ে রোদের ছায়ায় বাসের অপেক্ষা করতে করতে ওমর খৈয়ামের পিঠে ঘামের ফোঁটা পড়ে। মুছতে গিয়ে নিউজপ্রিন্টটা কুঁচকে যায় লজ্জা পেয়ে। তারপর বাসে উঠে অরিনকে দেখতেই সে "আ...রে...!" বলে চেচিয়ে ওঠে। আর ওর পাশের সিটে বসে পড়লে বিব্রতবোধ করে। ওদের রঙিন জীবনের গল্প বলে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ১০-১২টা ছেলেমেয়েকে "আমরা" বানিয়ে ফেলে কী অনায়াসেই! গল্পে গল্পে পিকনিকে চলে যায়, চিৎকার চেচামেচি করে, কোনো একজনের বাসায় সবাই মিলে রান্না করে খায়...ফাঁক-ফোঁকরে তাদেরই একজন যে ওকে ল্যাপটপ কিনে দিতে সাহায্য করবে, সেটা বলে। আমি কপালের ঘাম মুছতে থাকি। অনেকদিনের শ্যাম্পু না করা জটলাবাধা ময়লা চুলে হাত বোলাতে থাকি। জটের মধ্যে আটকে যাওয়া আঙুলগুলোকে দ্বিতীয় চেষ্টায় জিতিয়ে দিতে থাকি। বাসের জানালার ওপাশের দোকানগুলো হাসতে থাকে। জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, রিকাবীবাজার, সুবিদবাজার, পাঠানটুলা, মদিনা মার্কেট...

কিন্তু আমি রবিশঙ্করকে পেলাম না। চৌরাসিয়াকেও না। অবাক হলাম। মন খারাপও হলো একটু। কিন্তু আর খুঁজলামও না অন্য কাউকে।

সকালে উঠে আমি আমার মোজা খুঁজে পেলাম না! একটা আছে সু-এর ভেতর। অন্য আরেকটা নেই! তারপর আমি বাধ্য হয়ে বাবার মোজাই পায়ে দিলাম। বাবার মোজায় বয়সের ছাপ স্পষ্ট। আমারটা বেশ তরুণ ছিল। কিন্তু পড়ার পর বেশ স্বাচ্ছন্দ্য লাগল পায়ের তলায়। ফিরে এসে সু খোলার সময় বেয়াদবী না করলেই হলো।

একটা গিটার দেখলাম একজনের হাতে। একটা ফুটবলও! গাড়ি চালু হলে আমি কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে চোখ বন্ধ করলাম। শ্রেয়া ঘোষাল তার প্রজাপতিমনের ডানা মেলার গল্প বলতে লাগল একটানা। জানলা ভেদ করে রোদটাও হামলে পড়ল আমার ওপর শ্রেয়ার গান শোনার জন্য। আমার কালো টিশার্ট ওদের খুব ভালোবেসে আতিথেয়তা করল। আর আমি স্নান করতে থাকলাম ঘামের জলে তাড়াহুড়োয় বাসা থেকে করে আসতে পারি নি বলে।

বেশ কয়েকবার থামলাম। অনেকগুলো টিশার্ট-জিন্স চিৎকার চেচামেচি করতে থাকল বাসের ভেতর। একটা দুইটা হাফ শার্ট আর কয়েকটা ফতুয়াও। অনেকগুলো চুপচাপ স্যালোয়ার-কামিজের মধ্যে মাত্র একটা ছিল সবাক চলচিত্র। বাকিরা কেবল হাততালি আর কানাকানি নিয়ে ব্যস্ত। একটা অন্যান্যদিনবোরকাও ছিল স্যালোয়ার-কামিজদের দলে। খুব স্মার্ট। মানিয়ে নিতে একটুও সমস্যায় পড়ে নি এমনই মনে হয়েছে।

একটা কালোফ্রেমকে সবাই 'স্যার' 'স্যার' করছিল। জোর করে তাকে দিয়েও একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত আবৃত্তি করানো হলো! অবশ্য মাঝে মাঝে গানও মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল উনি সুর করে গাওয়ার চেষ্টা করছেন।

আরেকজন অনভ্যস্ত ইন করা হাফশার্ট হঠাৎ করেই খুব পপুলার হয়ে গেলেন! সবাই তাকে 'দুলাভাই' 'দুলাভাই' করতে লাগলো। উনি খুব লজ্জা পেয়ে সবাইকে একটা করে বাদাম খাওয়াতে লাগলেন হাতের ঠোঙা থেকে। একজন না করায় খুব লজ্জা পেয়ে 'প্লিজ' বললেন।

তারপর তিন বাস জিন্স-স্যালোয়ার কামিজ ঘুরতে লাগল জঙ্গলের ভেতর। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে যেতে শুরু করল সবাই। কোন দিকে যাচ্ছে কেউ জানে না! ডানে বায়ে..অনেক রাস্তা। কোনটা সঠিক কেউ জানে না! সঠিক মানে ঠিক কোন দিকে!

অনেক প্রশ্ন এবং অনেক ক্লান্তি ভীড় করতে থাকল ছোট ছোট দলগুলোর মাথার উপর। জঙ্গলের ভেতর ডানে বায়ে ছোট ছোট বাশের কঞ্চিগুলো টিশার্টগুলোর হাতের ভেতর চলে যেতে থাকল। অনেকগুলো সবুজ পাতা-ফুল - স্যালোয়ার-কামিজগুলোর হাতে। আর কোথাও কোথাও রবীন্দ্রসঙ্গীত গুনগুন করতে থাকল কোনো কোনো স্যালোয়ার কামিজ-জিন্স।

অনেক ঘোরাঘুরি পর ক্লান্ত সবাই বসে পড়ল রেল লাইনের উপর। একটা সিএনজি 'পোঁ-পোঁ' করলে পরে কয়েকজন উঠে গিয়ে অন্য কোথাও বসল। ভীষণ মোটা স্যালোয়ার কামিজটা হাতে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে বলতে থাকল প্যাকেট যার যার দায়িত্বে রাখতে হবে। কারণ ওদের সাথে নাকি আমাদের কথা হয়েছে জায়গা নোংরা করা যাবে না।

একটা স্যালোয়ার কামিজ পিচ্চি একটাকে ডাকলো কাছে। 'আমি তোমাকে দুই টাকা দিব, তুমি এই বাক্সটা একটু ফেলে দিও?'

'ট্যাকা লাগব না।' বলে পিচ্চিটা বাক্সটা তুলে নিল। আর দূরে এক কোণে জড়ো করতে লাগল আর সবার ফেলে দেয়া প্যাকেটগুলো। দুটো কুকুর তাদের পিকনিকটা সেরে নিল এই ফাঁকে।

গরম হয়ে অসহ্য হয়ে যাওয়া কয়েক বোতল কোকাকোলা তারপর আশ্রয় নিতে থাকল বাড়ানো হাতে ধরে রাখা প্লাস্টিকের গ্লাসগুলোর কোলে। প্লাস্টিকের গ্লাসগুলো কুঁচকে যেতে থাকল একটু পরপর। উড়তে থাকল আকাশে - কারো কারো রেইনবোকিক হওয়ার খায়েশে।

পেটের ভেতর হজমযন্ত্রগুলো চালু হতে শুরু করলে কয়েকটা জিন্স-টিশার্ট সেই কুঁচকে যাওয়া প্লাস্টিকের গ্লাসগুলোকে চিমটি দিয়ে তুলতে থাকল মাটি থেকে। পিকনিক সেরে চলে যেতে থাকা কুকুরগুলোকে আবারও কাছে ডেকে এনে নাক দিয়ে গন্ধ শুঁকিয়ে "ধুর শালা"র মতো একটা অনুভূতির জন্ম দিতে দিতে।

তারপর আবারও ইয়ারফোন। আবারও শ্রেয়া ঘোষাল। কিন্তু রোদের আর শখ নেই প্রজাপতিমনের ডানা মেলার গল্প শোনার। তিন বাস জিন্স-স্যালোয়ার কামিজও তাদের চোখের পাতায় মাধ্যকর্ষণ শক্তি অনুভব করতে শুরু করেছে। ডানে বায়ে বাতাসগুলোর চিৎকার বেড়ে গেছে আরও। একটা দুটো জানালা একটার পর একটা মুখ গোমড়া করতে শুরু করল। আর বাতাসের চিৎকারের ভলিয়ুমও কমতে থাকলো আস্তে আস্তে।

তারপর আমি গানটাকে ফাস্ট ফরোয়ার্ড করলাম। আর আমরা ক্রমশ কালো হতে থাকা একটা সুড়ঙ্গ ভেদ করে এগোতে লাগলাম। তারপর একসময় সারাদিনের ক্লান্তিটা বুঝতে শুরু করলাম বাস থেকে নেমে রিক্সা খুঁজতে খুঁজতে।

প্রিঙ্গলসটা খুব মজার ছিল। কিটক্যাটটাও। অনেক আদর মাখানো ছোট্ট চিঠিটাও।

আর আমি এখন টেবিলটা গোছাবো। আমরা প্র্যাকটিক্যাল করব!

তবে আজ রাতে বুড়োকে নিয়ে ঢুকব না...আজ আমি স্বপ্ন দেখব...

১৪০৫০৯১২০৩]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28950407 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28950407 2009-05-14 00:00:38
ঘুমপাড়ানীর গান
রিক্সায় উঠে বসার পরও কিছুটা ভয় ছিল, ঘুম পাড়ানোর আগেই না ঘুমন্ত সূর্যকে দেখতে হয়! সিটে বসে অশান্তি হচ্ছিল। সুযোগ খুঁজছিলাম। গতিটা একটু ঢিলে হলেই বলব - ড্রাইবার, একটু জুরে ছালাউরেবা। তারপর ড্রাইভারটা বসা থেকে উঠে-বসে চালাত। গায়ে-মুখে একটু বেশি বাতাস লাগতো। দু পাশের দোকানপাটগুলো একটু বেশি দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে যেত। তারপর আবার সবকিছু আগের মতো হয়ে যেত।

কিন্তু আমি সুযোগ পেলাম না। ড্রাইভারটা মোটামুটি বেশ দ্রুতই চালাচ্ছিল।

নদীতীরে গিয়ে দেখি সূর্য খিলখিল করে হাসছে!

আমার কালো টিশার্টের পিঠের উপর তারপর চড়ে বসল শেষ বিকেলের রোদ্দুর। আর আমি নদীর দু তীরে বাঁধানো কংক্রিট-টাইলসের পিঠে। সূর্যের চোখে ঘুম নেই! তবে কিছুক্ষণ পরপর দূরের সবুজ পাতাগুলোর মুখে হাসি ফোটানো বাতাসটা আমাকেও ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল।

অনেক নীচে, নদীর খুব কাছাকাছি, বড়বড় পাথরগুলোর আড়ালে আড়ালে গজিয়ে ওঠা লম্বা লম্বা নাম না জানা বুনো ঘাসগুলোর ফাঁকে ফাঁকে দুটো কিশোর। অথবা কিশোরী। ঠিক কৈশোর না ওদের, শৈশব-কৈশোরের মাঝামাঝি একটা সময়। দুটো ছেলে, দুটো মেয়ে অথবা একটা ছেলে-একটা মেয়ে বললেই বেঁচে যেতাম। কিন্তু দূর থেকে দেখে ওদের বুঝতে পারছিলাম না। অথচ সাধারণত দূর থেকেও ছেলে-মেয়েতে পার্থক্য করা যায়। আমি পারলাম না!

সমস্যা একজনকে নিয়ে। একজনের গায়ে ফ্রক; কোনো মেয়ে ছেলের পোশাক পড়লেও কোনো ছেলের মেয়ের পোশাক পড়ার কথা নয় ভেবে ওকে আমি মেয়েই ভেবেছি। কিন্তু অন্যজনের গায়ে জামা নেই। প্যান্টটা দেখেও কিছুই বোঝা যায় না। সমস্যা ওকে নিয়েই।

ওরা শুকনো ডাল খুঁজছিল সেই বুনো ঘাসগুলোর ফাঁকে। বেশ কিছুক্ষণ খুঁজে টুজে দুইহাত দিয়ে স্বচ্ছন্দে ধরতে পারার মতো পরিমাণ হয়ে গেলে ওগুলোকে কোলে করে এক জায়গায় জমা করছিল। আমি চুপচাপ দেখছিলাম ওদের। আড়চোখে সূর্যকেও একটু পরপর। সূর্য কিছুটা ক্লান্ত তখন। একটু একটু ঢুলুনি শুরু হয়েছে।

"বাই...এ বাই...আব্বায় মুরগী আনসোইন..." হাফপ্যান্ট পড়া আরেকটি অর্ধনগ্ন ছেলের দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আসা দেখলাম কথাগুলোকে সঙ্গে করে। অন্যজনকে নিয়ে সংশয়টা দূর হলো। ছেলেই। এবং সংশয়টা দূর হলো আরেকজনের ডাকে। বোনকে কেউ 'বাই' ডাকে না আমি জানি। খুব সহজ সূত্র।

ছেলেটা কাছে আসল। ওর বড় ভাইয়ের কোনো মনোযোগ পেলো না। সে আগের মতোই শুকনো ডাল খুঁজছে আর জড়ো করছে। ফ্রক পড়া মেয়েটিও।

"আব্বায় মুরগী আনসোইন।" এবারে আগের চেয়ে উচ্ছ্বাসটা আরেকটু বেশি।

কিন্তু বড় ভাইয়ের গাম্ভীর্য আরো বেড়ে গেছে! আস্তে করে কিছু একটা বলেছে যেটার মানে 'তো আমি কী করব' ধরণের। একটা অবহেলা মাখানো উত্তর। কিন্তু ছোট ভাইয়ের আনন্দ কিছুতেই কমে নি তাতে!

আমি ভুলেই গিয়েছিলাম ঘুম পাড়ানোর কথা! অভিমান নিয়ে, দেখলাম, সূর্য প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছে! আমার ওকে ঘুম পাড়ানো হলো না। একা একা ঘুমিয়ে পড়া ওর পিঠে আলতো করে কিছুক্ষণ পিঠ চাপড়ে দিলাম কেবল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম আস্তে আস্তে।

সবসময় কি আর আমিই ঘুম পাড়িয়ে দিব! এখন অনেক বড় হয়েছে না ও!

১৩০৪০৯২২০০]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28937713 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28937713 2009-04-13 22:08:00
কানিশাইলবিকেল
অনেক দেরী করে ঘুমিয়েছি কাল রাত। আজ সকালে ভাইভা ছিল বলে আবার খুব ভোরেও উঠেছি। তাতে করে পুরোটা দুপুর অনেক ঘুমঘুম চোখে কাটালাম। আর বিকেলে বিছানাবালিশকে অনেক আপন মনে হলো। 'এ বাঁধন যাবে না ছিঁড়ে' টাইপ!

আজ বিকেলটা খুব বাজে যাওয়ার কথা ছিল। কারণ এমন একটা ক্লান্তঘুমটা ভেঙেছে কাস্টার্ড পাউডার আনতে যাওয়ার কথা শুনে। একদম হুলস্থূল কাণ্ড! মা কর্ন ফ্লাওয়ার নিয়ে এসেছেন কাস্টার্ড পাউডারের বদলে। আমাকে গিয়ে ঠিক জিনিসটা নিয়ে আসতে হবে। এবং সেটা ঘুমটাকে অসমাপ্ত রেখেই। বিছানাবালিশের সাথে প্রচণ্ড ভালোবসার বাঁধনটা ছিঁড়েই।

কিন্তু বিকেলটাকে আমি বাজে যেতে দিলাম না। কাস্টার্ড পাউডার কিনে, রিক্সায় বসে শর্টস পড়ায় হাঁটুর নিচ থেকে উন্মুক্ত লোমগুলোতে বাতাসের দোলা খেতে খেতে যখন বাসায় পৌঁছালাম, তখন আমি জিন্স পড়ে আসার জন্য সময় চাইলাম রিক্সা ড্রাইভারের কাছে 'দেরী অইত না বা' বলে। তবে দোতালায় উঠে মাকে কাস্টার্ড পাউডারের কৌটাটা দিয়ে, শর্টস ছেড়ে জিন্স পড়ে নিয়ে, আরেকটা বাড়তি কাজ করলাম - বাথরুমে ফ্লাশ। তারপর আমরা দুজন গেলাম কানিশাইলে।

কানিশাইলে গিয়ে সবার সাথে জম্পেশ একটা আড্ডা দিলাম। আমার বিকেলটা আর মন্দ গেল না। সূর্যাস্ত, বিকেলবাতাস, সুরমার নোংরা পানি, বাতাসে শুকিয়ে-আসা-কুকর্মের ভাসা ভাসা গন্ধ, ঐ নীচে পাথরে দাঁড়িয়ে স্নানরতাদের ইতঃস্তত শাড়ি বদলানো, ঘাটের নৌকাটা ও পাড়ে পৌঁছুলেই মানুষগুলোর পিঁপড়ে হয়ে যাওয়া...অনেকদিন গল্প হয় না ওদের সাথে। আজ হলো।

বাসায় ফিরেছি হেঁটে হেঁটে। একটা ছেলে সাইকেল থামিয়ে দু হাত দিয়ে হ্যান্ডেল ধরে এবং সিট থেকে মাঝখানের রডটাতে নেমে গিয়ে দু পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল মেইনরোডটা কোন দিকে। আমি দেখিয়ে দিয়ে ওকে পেছনে রেখে হাঁটা শুরু করলাম। আমার তখন বেশ হাসি পাচ্ছিল। সাইকেল নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ছেলেটা পথ হারিয়ে ফেলেছে!

১১০৩০৯২০০০]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28922971 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28922971 2009-03-11 20:05:02
প্লাস্টিক ডোর Like the mountains in springtime like a walk in the rain
Like a storm in the desert like a sleepy blue ocean
You fill up my senses come fill me again.

তারপর স্প্যানিশ রোমান্স। কর্ড-রিদম, টিউন - দুটোই। বাথরুমের সুইচ অন। প্লাস্টিকের দরজা লাল - ভেতরে লাইট জ্বলছে। ডাইনিঙে হাতঘড়ি, মোবাইল ফোন আর চশমা। অথচ একটু আগেই বাবা ঘুমাচ্ছিল।

বারান্দায় বেশ রোদ। নরম রোদ। গ্রিলের ফাঁকে জলরংপুকুর। আকাশে লেখা ছিল I wander lonely as a cloud...

একটা পাতায় লেখা 764840. রিমনের রোল নম্বর। দুইটা ডিজিট ভুল। ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে। ডিজিট ভুল হওয়ায় সমস্যা হয় নি খুঁজে পেতে, নামও লেখা ছিল পাশেই। ভুলটা কার জন্য হলো বুঝতে পারলাম না, ওর বলতে নাকি আমার লিখতে।

পেনড্রাইভের ফিতায় অনেক ময়লা জমেছে। রুমের ভেতর সামান্য বিদ্রোহ। দুটো বালিশ 'এল' হয়ে আছে। তাদের মাঝখানে গীটার টা শুয়ে আছে। গীটারের মাথাটা একটা টিশার্টের হাতা ছুঁয়ে আছে। টিশার্টটা উল্টানো। কালো রঙের । ওর কুঁচকে যাওয়া কোলে গীটারের পিক। জানালার পাশের কাপড় রাখার জায়গাটাতেও সামান্য বিশৃঙ্খলা। ফ্যানের গায়ের পুরু ময়লার স্তর এখনও আছে, কিন্তু বাতাসও দিচ্ছে আগের মতোই। হয়তো কমে গেছে। এতটা কি আর খেয়াল করতে পারি আমি।

মুখোশ বানাব কিছু। দেয়ালে ঝোলাব। এই কথা মনে হয়েছে ড্রয়িংরুমের ঢুকে। ঘড়িটার ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে। এটা দেখে আমার মুখোশ বানানোর কথা মনে পড়ল!

রোদ কমে আসছে। স্ট্যাডিয়ামের ঘাস, নাকি কানিশাইল! অবশ্যই আরেকবার প্লাস্টিকের লাল দরজা আগে। তারপর টিশার্ট।

০৭০৩০৯১৭০৩]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28921056 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28921056 2009-03-07 17:01:17
সুমন
সবসময় একটা স্যান্ডোগেঞ্জী থাকে ওর গায়ে। ওটার রং সবসময়ই সাদা। ধবধবে সাদা নয়, ময়লা ময়লা সাদা। চুলটা বেশ এলোমেলো। পরিপাটি করে আঁচড়ানো নয়। ভ্রু বেশ ঘন এবং মোটা। বয়স আন্দাজ করার ক্ষমতা আমার নেই। অথবা কখনও চেষ্টা করি নি। কিন্তু এটুক বলতে পারি, ওর হাতের পেশিগুলো এখনও বাঁধতে শুরু করে নি। এখনও একটা আলসেমি ভাব আছে ওদের মধ্যে। আর নিলয়দের বাসায় যখন বেশ আরামেই আছে, বিপন্নতায় পরিশ্রমী হয়ে ওঠার সম্ভাবনাটাও খুব কম ওদের।

সুমনের নির্মল হাসি এখনও দেখি নি - খুব মজা পেয়ে স্বতস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসা কোন হাসি। এখন পর্যন্ত যতটুকু দেখেছি, তাতে স্বতস্ফূর্ততার উপর সংকোচের একটা গাঢ় আস্তরণ। কিন্তু তাতে সরলতা আছে। সাধারণত 'বোকা বোকা' ব্যাপারটাকেই আমরা সরল বলি, তাই বললাম।

এতদিন খেয়াল করছিলাম না। চেয়ার বের করে নিলয়কে সাহায্য করা কমে গেছে ওর। গেইট খুলতেও সুমনের পরিবর্তে নিলয়ই বের হয় সবসময়। আজ অনেকদিন পর দেখলাম সুমনকে।

অবশ্য সরাসরি দেখা না হলেও ওর আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার উর্ধ্বগামী গ্রাফের প্রতিটা বিন্দু চোখে পড়ছিল। পড়াতে পড়াতে দরজার ওপাশে হাসির রোল ওঠার মধ্যে সুমনের কণ্ঠটা ঠিকই খুঁজে পাচ্ছিলাম কিছুদিন ধরে। ওর প্রতি অভিযোগগুলোর নমনীয়তা কমে আসছিল দরজার ওপাশে। আদর করে বোঝানোর পরিবর্তে সেগুলো সত্যি সত্যিই অভিযোগ হয়ে উঠছিল। এবং ধীরে ধীরে, খুব মাঝে মাঝে, সেগুলো দ্বিপাক্ষিকও হয়ে উঠছিল! এখনও বোকা বোকা, তবু সুমনের নির্বাক চলচিত্রগুলো আস্তে আস্তে সবাক হতে শুরু করছিল। আমার চোখে পড়ছিল, তবু খুটিয়ে দেখা হচ্ছিল না।

আজ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম সুমনকে। ওর ঘাম-তেলে চকচক করতে থাকা গ্লোসি-শরীরটা এখন অনেক বেশি ম্যাট হয়ে উঠেছে। পুরোপুরি ধবধবে না হলেও গায়ের স্যান্ডোগেঞ্জীটা সে পথেই এগোচ্ছে। কালো শরীরের মধ্যে উজ্জ্বলভাবে জ্বলে ওঠা ওর ঝকঝকে দাঁতের হাসিটার মধ্যেও সেই আত্মবিশ্বাসহীনতা উধাও! 'আমি সেই খনির সন্ধান পেয়ে গেছি, হে মানুষ'। সুমনকে সেরকমই নির্ভার লাগল। এবং নিলয়কে ঠিক সাহায্য না করলেও ওর টেবিল চেয়ার ঠিক করার প্রক্রিয়াটাতে সুমন যেখানে বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে নির্বাক দর্শক হয়ে থাকত, এতদিন, আজ সে একদম সময় নষ্ট করল না! পর্দা সরিয়ে খুব দ্রুত বেরিয়ে গেল ড্রয়িংরুম থেকে। সুমন চলে যাওয়ায় ড্রয়িংরুমে তখন কেবল আমি আর নিলয়। আর আমাদের চেয়ার টেবিল। এক ব্যাগ বই খাতা, পেন্সিল আর পেন্সিলের দাগ মোছার ইরেজার। প্রথমদিককার সুমনের সেন্ডোগেঞ্জিটার মতো ময়লা ময়লা সাদা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28920653 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28920653 2009-03-06 11:22:31
বেঁচে থাকা প্রতিনিয়ত মৃত্যু একএক বেঁচে থাকা প্রতিনিয়ত মৃত্যু একএক ইদানীং আমি আর বেঁচে নেই তাই

অনেকদিন ধরেই মৃত্যু নেই আমার। একই জীবন নিয়ে একটানা চলছে অনেকদিন। বরং নতুন নতুন জন্ম হচ্ছে নতুন নতুন সত্তাসমূহের। জন্ম নয়, আমি মৃত্যু চাই। একটা মৃত্যু। তারপর আরেকটা মৃত্যু। তারপর আরেকটা।

কখনও কখনও যখন মৃত্যু আসে নি আপনা আপনি, আমি নিজেই খুন করেছি নিজেকে। এখনও তাই আরও একবার খুনি হবো আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে চেয়ে।

০২০৩০৯১৮০৯]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28919112 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28919112 2009-03-02 18:08:40
হিসেব
পুকুর ঘাটটা রাস্তার পাশ দিয়েই। পুকুরটা বিশাল। আমাদের দোতালা বাসার বারান্দা থেকে পুরোটা দেখা যায়। আমি বলি 'পন্ডভিউ' বাসা আমাদের। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে শ্যাম্পুর গন্ধ লাগল নাকে। শ্যাম্পুটাও চেনা। অল ক্লিয়ার ফর ম্যান। শ্যাম্পুটার গন্ধটা খুব এট্রাকটিভ। মিনিপ্যাকের গায়ে এমন কি লেখা আছে, নারীদের থেকে সাবধান! অর্থাৎ এই শ্যাম্পু তাদের কাছে টানতে পারে! ঘাটে যে গোসল করে গেছে, আমি জানি সে কাজীবাজারে মাছ বিক্রি করে কিংবা রিক্সা চালায়। ওর ওই কথা ইংরেজিতে পড়তে পারার কথা না।

দোকানটার সামনে দিয়ে যেতেই ছোট ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, দাদা বালা নি? আমি 'অয় বালা' বলে হাঁটতে শুরু করলাম। আবার মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমার নাম জানি কিতা? প্রশ্নটা খুব বিব্রতকর ছিল। অনেকদিন ধরেই ছেলেটা প্রতিবার ওর দোকানের সামনে দিয়ে গেলেই আমাকে 'দাদা বালানি' প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়ে একই সাথে সম্মান জানানো এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখার কাজটা সেরে নেয়। আমিও প্রতিবার জবাব দিয়ে এসেছি। প্রথম দিকে কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গিয়ে। কিন্তু আজ এতদিন পর ওর নাম জিজ্ঞেস করলাম! আরও পরে করলে ব্যাপারটা আরও বিব্রতকর হবে ভেবে আজই হয়ে গেলাম এক আধটু। কিন্তু ছেলেটাকে একদম বিব্রত মনে হলো না। একগাল হাসি দিয়ে বলল, কামরান।

গলিটা পার করে বড় রাস্তায় উঠতেই একটা ফার্মেসি। অনেক আলো। সাদা আলো। ফ্লুরোসেন্টের। ফ্লুরোসেন্টের আলোয় একটা স্নিগ্ধতা আছে। মনটা ভালো হয়ে যায়।

মেট আসে নি?
না মেট নাই।
এইচটিজেড?
না।
আলট্রাফেন?
না।

এইচটিজেড আসে নি?

আচ্চা মেট সাড়ে আটশ অইবো নি?

ঘুরছি ঘুরছি। কেবল না শুনছি।

বাইয়া, আলট্রাফেন আসে নি?
না আলট্রাফেন নাই।
মেট?
না ইতা অইতো না।

প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হলো। 'ইতা অইতো না' মানে! আমি কি নিষিদ্ধ কোন কিছু খুঁজলাম নাকি? মেট কি খুব নগণ্য কিছু? যেটা তোমার দোকানে থাকতেই পারে না? ভাবনাটা কেবল মাথার ভেতর। চোখের উপর মাইনাস পয়েন্ট টু ফাইভ। হাত দুটো শর্টস এর পকেটে। আর নিত্যউপহারের টিশার্টের পিঠে চড়ে বুকের উপর রবীন্দ্রনাথ।

ফার্মেসিতে যারা বসে ওদের প্রতিভায় মুগ্ধ হই। কীভাবে এতগুলো ওষুধ এর কথা মনে রাখে? নামটা উচ্চারণ করলেই বলে দেয় "না"। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, শালারা নিশ্চয় ভণ্ডামি করছে। নিশ্চয় মানুষের চেহারা দেখে ওষুধ দেয়। চেহারা দেখে কাস্টমার পছন্দ হলেই কেবল বলে, "উমম, আসে"।

আমার তো মনে হয় আমি একটা ওষুধের নাম বলব, তারপর ওরা বলবে আলট্রাফেন ক্যাপিটাল এ-দি না স্মল এ-দি? আমি বলব ক্যাপিটাল এ। তারপর ওরা খুঁজতে থাকবে। একটু পর বলবে বানানটা আবার খউক্কা সাইন। আমি বলব। ওরা বলবে, আলট্রাজেন তো ফাইসি। এর খান্দাত-উ (কাছেই) তো অওয়ার খতা।...এ...ওউত্তো ফাইসি। আলট্রাফেন, আলট্রাজেনর খান্দাত। আমি ফয়লাউ বুচ্চিলাম, জি'র আগে এফ আইবো।

কিন্তু ওরা কেমন করে জানি সব মনে রাখে! অথবা চেহারা দেখে কাস্টমার পছন্দ হলে হ্যাঁ না বলে। এই ব্যাপারে কোন ধারণা নেই তো, তাই ক্ষোভ জন্মায়। একই সাথে মুগ্ধও হই। মানে, দুটোর মধ্যে যে কোন একটা।

কোনোমতে মেট সাড়ে আটশ কিনলাম। আরেক দোকানে এইচটিজেডও পেলাম। এইচটিজেড পুরো এক পাতা পেলাম না। ছয়টা ছিল মাত্র। ফার্মেসিতে একটা মাত্র ছেলে ছিল। চেহারা দেখে আমি বুঝেছি নতুন। এখনও অভিজ্ঞ নয়। দোকানের সামনে দাঁড়াতেই টিভিটা অফ করে দিয়েছিল। কিছু একটা শোনা যাচ্ছিল। থেমে গিয়েছিল। ছয়টার দাম কত জিজ্ঞেস করাতে অনেকক্ষণ প্যাকেটটার উপর থিসিস করল। আমি বুঝলাম। মাকে ফোন দিতে দিতে শুনলাম 'বিশ টেখা দেউক্কা।' মা বলল আট টাকা। কোন কোন ফার্মেসি ছয় টাকাও রাখে। ছেলেটা খুব লজ্জা পেল। কারণ আমি ওর উপর রেগে যাই নি। খুব লজ্জা পেয়ে বোঝাতে চেয়েছি, হয়ত ওর ভুল হচ্ছে, দামটা খুব সম্ভবত আট টাকা। 'আমি বুল খইসি। আফনারটাউ ঠিক আসে।' আমি দশ টাকার নোট একটা বের করলাম। ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, দুইটিকি অইবো নি? আমি বের করলাম। 'অইসে নানি। আমি দিলাম বারো টেখা, তুমি দিলাই ফাস টেখা। তুমার সাত টেখা রাখা অইলো।' ছেলেটা বুঝল না। আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। এখন কী করে বোঝাই ওকে! ছেলেটা বলল, দাড়াউক্কা, এখটেখা লইয়া যাউক্কা। সে ড্রয়ারে সার্চ দিল। না পেয়ে একটা কাঁচি বের করল। রুমের পেছনের দিকে গিয়ে একটা ওষুধের প্যাকেট বের করল। এক পাতা বের করল। ডেস্কের সামনে এসে একটা ট্যাবলেট কাঁচি দিয়ে কাটতে কাটতে বলল, সিভিট খাউক্কা। আমি একটা আদর মাখানো হাসি দিয়ে ডেস্কের উপর থেকে সিভিট টা তুলে নিলাম। আমাদের হিসেব মিলে গেল!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28916368 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28916368 2009-02-25 20:47:43
১৯০ আর ১২০
বু* দা প্রেশার মেপে দেখল ১৯০ আর ১২০!!!

টিভি অন। চ্যানেল পাল্টাচ্ছে। এই এখন একটা, একটু পর অন্য কিছু। স্থির হলো এটিএন এ এসে। খবর। বড়মামির ব্যস্ততা। গামছা ভেজানো, মার চোখ মুখ মুছে দেয়া। বড়মামার একটানা বক্তৃতা। রহস্যের সমাধান। বরই এর সাথে আজ বিকেলে কাঁচা লবন খাওয়া হয়েছে বেশ, এজন্যই। মা বলল ইদানীং নাকি বেশি বাইরে বেরোচ্ছেন। হাসাহাসি হলো মাকে নিয়ে। তারপর বললেন, হ্যাঁ, আজ সব্জিতে লবণ বেশি ছিল। বড়মামা বললেন, কাঁচা লবণ না খাওয়ার জন্য তিনি আজ এমনকি আলুভর্তাও খান নি। খেলেও লবণটা ভাতের ভাঁপে সেদ্ধ করে নাকি খেয়েছেন ক দিন আগে।

আজ আমি আর মা নয়টাতেই রাতের ভাত খেয়ে ফেলেছি। মা আবার রান্না বসাবেন কি না ভাবতে শুরু করলেন। ভাত খেলে হয়ত ভালো লাগেবে। বড়মামা জোরেসোরে না করলেন। মা চুপসে গেলেন। অস্থির হয়ে কী সব বলতে লাগলেন। ওষুধ খুঁজতে খুঁজতে আমরা তখন ক্লান্ত। বড়মামা বকা দিলেন, কেন সব ওষুধ একসাথে রাখো না বুঝি না। মা বাচ্চাদের মতো কথা বলছিল।

ওরা আসার আগে আমি পা ঘষে দিচ্ছিলাম খুব জোরে জোরে। বেশ ঠাণ্ডা হয়ে এসেছিল।

সবাই চলে গেছে। চ্যাম্পিয়ন্স লীগ চলছে। ম্যানইউ আর ইন্টার মিলান। মা নাক ডাকছে। মায়ের পায়ে অনেকগুলো মশা। উঠে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়তে বলব। কিছুটা শান্ত হয়ে এসেছে। যাওয়ার সময় আরেকবার মাপা হয়েছে। ১৭০ আর ১১০। ফ্যান ছাড়া থাকায় ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল সবকিছু। লাইটটাও অফ ছিল। নিশ্চিন্তেই ঘুমুচ্ছেন। কাল সকালেই আজ রাতের সমস্ত কিছু নিয়ে হাসাহাসি হবে সবাই মিলে। সবাই মানে আমি আর আমার মা।

২৫০২০৯০২৫৭]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28915983 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28915983 2009-02-25 02:55:37
ভাইয়া...
রবীন্দ্রনাথ মানিক রা ছিলই। নতুন করে এখন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির, তারাশঙ্কর, কাফকা, সালমান রুশদী, ঝুম্পা লাহিড়ী, অরবিন্দ আদিগা, আর্থার সি ক্লার্ক-রাও যোগ দিয়েছে। কিশওয়ার, শেলী, কীটস, জন ডান, কোলেরিজ, বেকন, আনা ফ্রাংক, এমন কি হোমার-ভার্জিল-দান্তেও বসে আছে একজনের পিঠে আরেকজন। কী অসম্মান হচ্ছে ওদের!

তারপর আবার চৌরাসিয়া-রবিশঙ্কর-মোজার্ট-বিটোভেন।

এমনিতেই সময় দেয়া হয় না কাউকেই। চুপচাপ পড়েই থাকে ওরা যার যার জায়গায়। ধুলো জমে। পিঠ ঠেকিয়ে থাকায় দেয়ালের শীতলতায় স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আসে বইয়ের পাতাগুলো। সিডিগুলো বুড়িয়ে আসে। অনেক কিছুই ভুলে যায়। তারউপর পুরো পৃথিবীটা এলোমেলো করে রেখে আরও অত্যাচার করব? নাহ, অত খারাপ মানুষ নই আমি...

২৪০২০৯১৫১০]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28915756 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28915756 2009-02-24 15:13:12
কাচের দেয়ালের এপাশ-ওপাশ
রুমের ভেতর ফাঁকা জায়গাগুলো কমে আসছে খুব দ্রুত। হুহু করে বেড়ে চলেছে বইয়ের সংখ্যা। মসৃণ মলাট, খসখসে মলাট, মলাট ছাড়া, ধুলো না ঝাড়া, ইত্যাদি, ইত্যাদি আর ইত্যাদি।

বইগুলোর বাসাবদল হয়। বাবার সেল্ফ থেকে বের করে আনা বইগুলো বলতে গেলে আর যায়ই না ওখানে। আমার রুমেই উল্টেপাল্টে গুটিসুটি পাকিয়ে শুয়ে থাকে। আমি কাছে গিয়ে বসে পড়ি, জিজ্ঞেস করি, কি রে, যাবি না? ওদের নাকি এখানেই ভালো লাগে। ওখানে কাচের ঘরে বন্দী থাকতে ওদের ভালো লাগে না। কাচের দেয়ালটা নাকি অদ্ভুত একটা জিনিস। এপাশ-ওপাশ দুপাশটাই দেখা যায়। স্পষ্ট। কিন্তু দুপাশের ছোঁয়া যায় না কোন কিছুই। এপাশটায় স্যুট-টাই পড়ে দাঁড়িয়ে থাকে ওরা। ওপাশটায় আরও কিছু স্যুট-টাই পড়া মানুষ ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায় ওদের দিকে। ঘাড় বাঁকিয়েই চলে যায় একপাশ থেকে আরেক পাশে। কাউকে পছন্দ হলে দেয়াল ভেঙে ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু ওটা নাকি স্পর্শ নয়। তারচেয়ে এই দমবন্ধ রুমটাতেই নাকি সুখে আছে ওরা। স্যুট-টাই ছেড়ে এখানে এই ধুলোবালির মধ্যেই। কোন কাচের দেয়াল নেই। কাচের দেয়াল থাকলেও সবকিছু স্পষ্ট, এখনও সবকিছু স্পষ্ট। তবু...

আমি ওদের কথা শুনে মুচকি হাসি। ইঁচড়ে পাকামো দেখে আদর করে গালটা টেনে দেই। মাথায় হাত বুলিয়ে দেই। আদর পেয়ে ওদের ঠোঁটগুলো হেসে ওঠে। আর কমে আসা অক্সিজেনের ভেতরই আমি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি তখন।

২২০২০৯১২৪৫]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28914658 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28914658 2009-02-22 12:45:57
আঁস্তাকুড়ে মরে পড়ে থাকা বেড়াল
রাস্তার পাশে আঁস্তাকুড়ে মরে পড়ে থাকা একটি বেড়াল। বাঁকানো শরীর। শক্ত হয়ে আছে। দেখলেই বোঝা যায়। মুখটা হা করা। পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে ব্যস্ত হয়ে উঠছে সবার ডান হাত। আর আমি অবাক হয়ে ভাবছি দুনিয়ার সব বামহাতি গেল কই! ধন্য মৃত্যু তোমার, চোখ উল্টানো নিথর-ঘুমমগ্ন বেড়াল হে!

আঁস্তাকুড়টা ঘনক হতে পারে নি। উপরে ছাদ নেই। তারউপর মেইনগেইটটা আজীবন খোলা। গেইটে দরজা নেই। শেওলা ধরা কংক্রিটের দেয়ালটা ওখানে আর জোড়া লাগে নি। সেই গেইট দিয়ে ভুড়ির মতো বেড়িয়ে আছে সমস্ত আবর্জনা। একটা শিল্পিত ভঙ্গীতে। আহ! উপরে ছাদ নেই!

দেয়ালগুলো কাকের আড্ডাখানা। শেওলাগুলো স্থায়ীবাসিন্দা। কা কা, কা কা। দুএক কদম টুকরো টুকরো লাফ। ঠিক কাকের মতো করে ঘাড় বাঁকানো। ডানে। বায়ে। কাকগুলো দেখতে সত্যিই কাকের মতো।

ঠিক সাড়া না। তবে ভেতরে নড়াচড়ার শব্দ। খুব মৃদু! কড়া নেড়েই চলেছি। সম্ভাবনায় বেড়ে যাওয়া দ্রুততায়।

কাকটার মসৃণ ল্যান্ডিং ছাদহীন ঘনকের ভেতর। আরও কয়েক কদম টুকরো লাফ। ছোট্ট ছোট্ট। সামনে এগোনো। পেছনে ফেরা। আলুর খোসায় কয়েকটা ঠোকর। কয়েক কদম টুকরো লাফ। সামনে-পেছনে। ছোট্ট ছোট্ট। মাছের আইশ, পাকস্থলী-নাড়িভুড়ি। কিছুক্ষণ প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান।

বেড়ালটা তখনও ঘুমে। শক্ত শরীরে। পাশ দিয়ে তখনও ব্যাস্ত ডানহাতিরা। মাঝে মাঝে দুএকটা মোটর সাইকেল। একই লয়ে স্যান্ডেলের ঘষার আওয়াজ, আঁস্তাকুড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বেড়ে যাওয়া লয়। অনেক বিরতী দিয়ে একটা দুটো রিক্সার বেল। খসে পড়া নারকেল গাছের খোসার আওয়াজ। মাথার উপর কয়েক ডাল পাতা। তার ফাঁকে স্কুল পালানো সূর্যদুপুর। বেড়ালটা ঘুমে। শক্ত শরীরে। এক ঝাঁক মাছিদের নিয়ে। মাছিরা ব্যস্ত সিম্ফনি রচনায়। স্ট্রিং ছাড়া বুড়ো অর্কেস্ট্রায়।

বিছানা থেকে নামার শব্দ। চুড়ির মৃদু হাসি। কল্পনায় চুলের মধ্যে হাত চালানো। এলোচুলকে বশে আনা। মেঝেঘষা শাড়ির আঁচল। ঘষাহাঁটার ক্রমশ ফেইডইন। কড়া নাড়ানোর থেমে যাওয়া।

কড়া নাড়ানোর থেমে যাওয়া।

বেড়ালটা তখনও ঘুমে। শক্ত শরীরে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28911860 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28911860 2009-02-16 04:25:11
তেরো ফেব্রুয়ারি, দুই হাজার নয় (ডায়েরি)
চোখে আগুন জ্বলছে। দুপুর-বিকেল খুব ঘুমিয়েছি, কিন্তু রাতের ঘুম দিনে কাভার করা যায় না। কাল রাত আর প্রায় ঘুমাই নি।

কাল রাত আর প্রায় ঘুমাই নি। এক ঘণ্টার মতো চোখ বন্ধ করেছি। বাবা এসে ঘুম ভাঙিয়ে দিলো, বু* দা আমাকে ফোন করে কোন সাড়াশব্দ পাচ্ছে না!

মশারির ঘোমটা সড়ালাম। মুখের ভেতর ফেনা তুললাম। এলোচুলে ঝড়। তারপর খুললাম পাঞ্জাবির ভাঁজ। তাড়াহুড়ো করে বের হলাম। খুব দ্রুত হাঁটা। অনেক দূরে মাইকিং। মনে হলো শুরু হয়ে গেছে। বাঁশির রাগে উদ্বোধনী। মাইকে ভেসে আসছে সেটা। খানিকটা হাঁটার পর স্পষ্ট হলো কথাগুলো, "ইন্নালিল্লাহী, ওয়া ইন্না ইলাহী রাজিউন..." ফিক করে হেসে ফেললাম। কারো মৃত্যুসংবাদ এই সাতসকালে হাসি ফোটালো আমার মুখে, পৃথিবীটা কত অদ্ভুত!

বু* দার সাথে রিক্সা থেকে যখন নেমেছি, সংস্কৃত কলেজ তখনও গড়ের মাঠ। শুরু হতে কখনই দেরি হয় না এই অনুষ্ঠান। কিন্তু 'হেই দিন কি আর আসে? এহন দিন বদলাইসে না?'

মেয়র গত রাত রাষ্ট্রপতির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ছিলেন। ঢাকা থেকে অনেক রাত করে ফিরেছেন সিলেটে। বসন্ত উৎসব উদ্বোধন করার কথা উনার।

অপেক্ষা হিসেবে আমরা শুনতে থাকলাম, 'এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা-সুরমা নদী তটে'। অদ্ভুত রকমের বিশ্রী! এত্ত সুন্দর একটা গান, এত্ত সুন্দর একটা সুর, অথচ বাঁশির সাথে অক্টোপ্যাড আর তবলার কেরামতি দেখানোর প্রতিযোগিতা। তবলওয়ালা তনু দার লয় নিয়ে সমস্যা আছে। ধীরে বাজাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এদিকে উনার ধীরে ধীরে বাড়িয়ে নেয়া লয়ের সাথে সামাল দিয়ে বাজাতে গিয়ে বেচার বাঁশিওয়ালার অক্সিজেন সিলিন্ডারে "বীপ বীপ বীপ বীপ..."। প্যাডওয়ালা সুদিপ দা অনেকদিন ধরে বড় বড় প্রোগ্রাম বাজাচ্ছেন, কিন্তু রুচির কিছুটা অভাব আছে। অদ্ভুত অদ্ভুত সব পার্কেশন বাজান। খুব বেমানান লাগে শুনতে। তারপর সুযোগ পেলেই ইন্টারল্যুড এর সময় স্ন্যায়ার-কিক, পারলে পুরো প্যাডের সমস্ত কিছুই বাজিয়ে ফেলবেন। মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়।

বাসন্তী শাড়ির পিচ্চি পিচ্চি ভার্সনগুলো দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল তারপর। কী মিষ্টি করে কিচিরমিচর করছে সবাই! ওদের আজ 'প্রোগ্রাম'। ওরা আজ স্টেজে উঠবে। উত্তেজনায় আজ অনেক ভোরেই উঠে গেছে ওরা-- ওদের রেখেই যদি প্রোগ্রাম শুরু হয়ে যায়! ওদের মুখগুলো ভোরবেলাকার মতোই শুভ্র। এখনও কোন ব্যাডসেক্টর পড়ে নি ওদের হার্ডডিস্কে। আবৃত্তি-গানে-নাচে একটা দুইটা করে অনেকগুলো ছবি জমা করছে ওরা এখন এলবামে।

মেয়র এলেন। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হলো। উদ্বোধন করলেন সুলতানা কামাল। মেয়র কাগজে করে অনেকগুলো উদ্ধৃতি নিয়ে এসেছেন। রবীন্দ্রনাথের, জীবনানন্দের। বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দিলেন সেগুলো। শোনালেন অনেকগুলো প্রোজেক্টের কথা। 'প্রান্তিক ভবন' ভেঙে ফেলার পর নাট্যপাড়ার যে ফলবতী আড্ডাগুলো হারিয়ে গিয়েছে, সিলেটের নাট্যাঙ্গন এবং সাংস্কৃতিক চর্চা যে থেমে গিয়েছে, সেটা ফিরিয়ে আনতেই 'সারদা হল'-এর পাশে নতুন আরেকটি ভবন নির্মিত হচ্ছে। নতুন একটি পাঠাগারও হচ্ছে। শিশুদের জন্যও আরেকটি। বক্তৃতার শুরুতে উপস্থিত অতিথিদের নাম বলতে গিয়ে সুলতানা কামাল না বলে বললেন সুফিয়া কামাল, এবং অনেক কাব্যচর্চার পর যথারীতি ফিরে এলেন 'গুড়িফিরি বটর তল'-এই। রাজনীতির কথায়।

আমার কথাগুলো কেমন ব্যাঙ্গাত্মক হয়ে গেল যেন! আসলে আমি ওভাবে বলতে চাই নি। 'মেয়রসাব' আসলে খুবই ভালো। সংস্কৃতিমনা। বাংলাদেশে প্রথম বারের মতো 'মেয়র কাপ' চালু করার উদ্যোক্তাও তিনি। কাল ফাইনাল। সিলেট স্ট্যাডিয়ামে। ফ্লাডলাইটের আলোয়। এইসব সপ্রাণ উপস্থিতির জন্যই তিনি এত জনপ্রিয়। এবং উনার বক্তৃতাও বেশ সাবলীল। অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের মতো ফাঁপা কলসীর শব্দ শোনা যায় না তাতে।

প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হলো। চলল, 'বসন্তে ফুল গাঁথল আমার জয়ের মালা, বইল প্রাণে দখিন হাওয়া-- আগুনজ্বালা'।

আমার তখনও একটুও ঘুম পায় নি। বাসা থেকে বেরোতে বেরোতে লাগা প্রচণ্ড খিদেটাও 'দে ছুট'। কিন্তু 'আনন্দলোক' হতাশ করল! প্রথমেই-- প্লা** নেই! গানগুলোও খুব কঠিন কঠিন ছিল। কড়ি-কোমলে অনেক অবাধ বিচরণ ছিল স্বরগুলোর। অথচ অপরিপক্ক নতুন কন্ঠে সেগুলো 'অধরা'! এস্রাজটাও একদম বেসুরো। আজ নতুন কেউ ছিল। এতদিন ধরে আনন্দলোকের সঙ্গী 'অশোক দা' ছিল না। নতুনজন খুব কাচা এখনও। হার্মোনি কি এতই সহজ! ইচ্ছেমতো বাজালেই কি তাকে শোনাবে ভালো! গান চলছিল এক কর্ডে। আর উনি আপন মনে উনার সুরসৃষ্টিতে মগ্ন! অন্য একটা কর্ডে! এস্রাজের এত মিষ্টি আবেদন যে কই! গোঙানির মতো শোনাচ্ছিল শব্দটা। কী বিচ্ছিরি অবস্থা!

ভীড় বাড়ছিল আস্তে আস্তে। সাড়ে সাতটার অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে প্রায় দশটায়! অনেক স্টল ছিল মাঠের বামপাশে।

'শ্রীহট্ট সংস্কৃত কলেজ'-এর এই ছোট্ট মাঠটাই এখন সিলেটের বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার প্রাণ। রমনার বটমূল, সিলেটের সংস্কৃত কলেজ। পহেলা বৈশাখে 'আনন্দলোক', আর বসন্তে 'বসন্ত উদযাপন পরিষদ, সিলেট'। অনেকগুলো শাড়ি পাঞ্জাবি। অনেকগুলো বিশুদ্ধ হাসি। অন্তত একদিন হলেও বাঙালি হওয়ার হাসি। টুকটুকে বাচ্চার দল। জীবনে প্রথমবারের মতো পাঞ্জাবি-শাড়ি। স্বতস্ফূর্ত মা-বাবার স্নেহ। খোঁপায় খোঁপায় তরুণী হয়ে ওঠার খুশি।

আমি বাসায় ফিরে এলাম দুপুরে। তারপর ঘুম। ঘুম থেকে উঠলাম বিকেলে। চোখে আগুন জ্বলছিল তখন। সন্ধ্যাবেলা বের হব না। অনেকেই ফোন করেছিল। বাসায় শুনে-- 'জাহান্নামে যা'।

আমি চৌরাসিয়া শুনব এখন। আনন্দ ভৈরবী। স্পিকারের উপর ছয় তলায় বসে আছে লোকটা। ওঁর উপরে আরও পাঁচ তলা। সিডির কাভারের উপর সেই কখন থেকে আড় করে মুখে বাঁশি ঠেকিয়ে অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য। লিখতে লিখতে আড়চোখে ইঙ্গিত করছিলাম, 'এইতো শেষ, আর একটু'...কিন্তু অনেক দেরী করে ফেলেছি। নাহ, থামছি...

১৩০২০৯১৯২৭]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28910688 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28910688 2009-02-13 18:38:16
বারো ফেব্রুয়ারি, দুই হাজার নয় (ডায়েরি)
কাল ভোরে উঠতে হবে। জোর করে হলেও ঘুমোতে হবে এখন।

প্রিন্টারের উপর থেকে কাপড়টা সরেছিল সন্ধ্যায়। এখনও খোলা। থাক, আজ রাতটা ওভাবেই কাটুক ওর।

আমার বুকটাও ভারী। কাল সকালে পহেলা ফাল্গুন। অনেক ভোরে আকাশ দেখব। আকাশটা খুব ভালো। নিশ্চয় আমাকে হতাশ করবে না।

'আনন্দলোক', অপেক্ষায় থেকো...
প্লা**, তোমার গান শুনব...
পাঞ্জাবি রে, আর একটা রাত। কষ্ট করে কাটিয়ে দে? কাল ভোরেই তোর ভাঁজ খুলব...

(০১২৪)
এখনও ঘুমাই নি!

১২০২০৯২৩৫৭]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28910385 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28910385 2009-02-12 23:54:10
হাঁটতে হাঁটতে বুড়োর বাড়ি
অনেক ছোটবেলায় আমি আবিস্কার করলাম, সারাদিনে আমি আসলে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছি না! কেবল ঘুমাবার আগে, বিছানায় শুয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলছি-নিচ্ছি আমি! সারাদিনে তো একদম টের পাই না ব্যাপারটা। হাঁটতে হাঁটতে কী করি, এখন যে সেটা মনে করতে পারছি না, সেই ব্যাপারটাও প্রায় ওরকম।

হাঁটার ব্যাপারটা শুরু হয়েছে আসলে অভাব থেকে। রিক্সাভাড়া না থাকা থেকে। কিন্তু তারপর কেমন করে জানি অভ্যাস হয়ে গেল। এখন বাসা থেকে বেরোলে আমার মনেই থাকে না আমাকে যে রিক্সায় চড়ে কোথাও যেতে হবে। ঠিক সময়ে পৌঁছুতে হবে, এমন কোন তাড়া না থাকলে তো আর কথাই নেই।

আমি আস্তে হাঁটি না। খুব দ্রুত হাঁটি। রেসিং গেইম খেলার মতো মজা পাই আমি হাঁটতে হাঁটতে।

জিন্দাবাজার আর বন্দর বাজার সিলেটের সবচেয়ে ব্যাস্ত এলাকা। বিজ্ঞাপনের ভাষায় "শহরের প্রাণকেন্দ্র"। ডানে বায়ে সামনে পেছনে, এমন কি উপরের এবং নীচের ডান-বাম কোনায়ও মানুষ। মার্কেটের পর মার্কেট গড়ে উঠছে সিলেটে। জিন্দাবাজারে এখন আর রোদ পড়ে না। পুরোটা সকাল এবং দুপুর, জল্লারপাড় থেকে জিন্দাবাজার পয়েন্ট পর্যন্ত রাস্তাটা "ছায়াসুনিবিড়"! রাস্তার দুপাশে ডানে বায়ে কোমরে হাত দিয়ে ভ্রূ কুঁচকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে ইয়াব্বড় বিল্ডিংগুলো। আরও নতুন নতুন পালোয়ান গড়ে উঠছে ওদের পাশে। খুব দ্রুত। সে এক অসাধারণ দৃশ্য।

জিন্দাবাজার পয়েন্ট থেকে ডানে গেলে (কোন দিক থেকে!) বন্দরবাজার। আমার সবচেয়ে প্রিয় রাস্তা। সবচেয়ে প্রিয় ট্র্যাক। এই রাস্তা দিয়ে প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলি আমি সবাইকে পাশ কাটিয়ে। প্লাস্টিকের সাদা টুপিওয়ালা লোকটা মুখের মধ্যে কী একটা পুরে দেয়। ওটা থেকে শব্দ বের হয়। লোকটা হাত উপরে তুলে নাচায়। ওর হাতে লম্বাটে কিছু একটা থাকে। কয়েকটা রিক্সা থেমে যায়। তার পেছনে হুমড়ি খেয়ে রিক্সাগুলো দলবেঁধে দাঁড়িয়ে যায়। ড্রাইভারগুলো পা চুলকায়। সর্দি ফেলে শব্দ করে। লুঙ্গি তুলে নাক মোছে। কেউ কেউ প্যাসেঞ্জারের সাথে ভাব জমাবার চেষ্টা করে। অপ্রয়োজনীয় গল্প জুড়ে দেয়। ভাড়া বেশি পাওয়ার লোভে। অধিকার বাড়িয়ে নিতে। প্যাসেঞ্জারের কেউ কেউ সে ফাঁদে পা দেয়। পোড় খাওয়া কেউ কেউ আবার খুব কৌশলে ফিরিয়ে দেয় সে বুমেরাং। ড্রাইভারের ভাড়া তাতে আরেকটু কমে যায়। কোন কোন যাত্রী রিক্সায় বসে আনমনে নাকের ময়লা পরিস্কার করে। নাকের ভেতর থেকে বের করে আঙুলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে পিষে পিষে ছোট্ট একটা দলার মতো বানায়। টোকা মেরে ফেলে দেয়। ডানে বামে চোরের মতো তাকায় কেউ দেখল কি না নিশ্চিত হওয়ার জন্য। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া ছোট্ট একটা ছেলে সেটা দেখে হাত তুলে দেখায় ওর মাকে। মা ছেলেটাকে ঝাড়ি দিয়ে হাত নামায়। ঠিক এরকম একটি জীবন্ত স্থিরচিত্রের মধ্যে আমি হাঁটতে থাকি। খুব দ্রুত। আমার পাশে সাই সাই করে দৌঁড়ে যায় অনেকগুলো ফুল শার্ট। কোনটার গায়ে বউয়ের অনেক যত্ন। কোনটার গায়ে ব্যাচেলার জীবনের অভিশাপ। আমার পাশ দিয়ে খুব দ্রুত হাঁটতে থাকে অনেকগুলো লুঙ্গি। অনেকগুলো খোলা গা। অনেকগুলো চানাচুরওয়ালা। ফুটপাতে পসরা সাজিয়ে বসা ছোট ছোট ব্যাবসায়ী। হোটেলের উত্তপ্ত কড়াইয়ের নাকের উপর পাক খেয়ে খেয়ে উড়তে থাকা আলোর প্রতিসরণ। কড়াইয়ের কোলে শুয়ে থাকা সকালের কিমাপুড়ি। আমার পাশ কেটে দ্রুত হেঁটে যায় অনেকগুলো আপেল। অনেকগুলো কূল বড়ই, কালোজাম, ঘড়ির দোকান, মধ্যবয়সী শাড়ি, সিঁথির সিঁদুর, ধূর্ত জোড়াচোখ। আমি একটার পর একটা ল্যাভেল ক্রস করতে থাকি। প্রচণ্ড উত্তেজনায়ও স্টিয়ারিংটাকে শক্ত করে ধরে থাকি। হর্ন বাজাই না। হর্নের আওয়াজ শুনি।

আসলে এই গেইমের টিউটোরিয়াল কমপ্লিট করেছি আমি স্কুলে থাকতে। টিফিন পিরিয়ডে। ক্লাসের বারান্দায় রেলস্টেশনের সিনেম্যাটিক কোন প্ল্যাটফর্মের মতো ভীড়ে। আমি সেখানে দৌঁড়াতে থাকি। ডানে বামে সবাইকে পাশ কাটিয়ে দৌঁড়াতে থাকি। অনেকগুলো সাদা শার্ট। শার্টের বুকে বেইজ-নেইমপ্লেইট। কারো কোমরে বেল্ট, কারোটাতে নেই। বেশিরভাগের হাতেই একটা করে ঠোঙা। হয় চানাচুর, কিংবা আচারের। আমি কোনটাকে পড়তে দেই না। কারো ঠোঙাই উল্টে যায় না আমার ধাক্কায়। আমি দৌঁড়াতে থাকি প্রচণ্ড ভীড়ের মধ্যে। আমি দৌঁড়াতে থাকি। প্রচণ্ড ভীড়ের মধ্যে।

এতদূর লিখতে লিখতে মনে পড়ে গেল, বুড়োটা এখনও কাঁদছে মলাটের ভেতর। মার্লিনটা ওর বড়শিতে আটকেছে। কিন্তু এরপর আর কিছুই হতে দিচ্ছি না! ডোন্ট ওয়োরি বুড়োভাই, আমি আসছি...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28910324 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28910324 2009-02-12 21:54:05
গল্প : আমারও একটা লেজ গজিয়েছিল
বাথরুমের ভেতর অনেক কসরত করতে হয়েছে। (বেসিনের আয়নার ওপাশে কেবল মুখ দেখা যায়। আয়নার সামনের রেক-এ রাখা ব্রাশ রাখার স্ট্যান্ড, শেভিংক্রিম আর শ্যাম্পুর বোতলটাকে সরিয়ে গন্ধ শোঁকার মতো করে কাছে গেলে নাভির কাছাকাছি পর্যন্ত। তারপরই ময়লা জমে লালচে হয়ে যাওয়া সাদা বেসিন। কিছুতেই কোমরের নিচের অংশটা দেখা যায় না।) ছোট প্লাস্টিকের লাল বালতিটাকে উল্টে দিয়ে ওটার উপর দাঁড়িয়ে, উল্টো করে রাখা কলসীর উপর দাঁড়িয়ে নৃত্যরত আদিবাসী নারীর মতো শরীরটাকে একটু একটু করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অনেক কষ্টে ঘাড় বাঁকিয়ে আয়নাটাকে অনেক অনুরোধ টনুরোধ করে নিশ্চিত হলাম।

কীনব্রিজের নিচে সুরমার পাড়ে বাঁধানো রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বিকেলটাকে দেখলাম ঘুমিয়ে পড়তে। উত্তেজনায় অনেক ছবি আঁকলাম মনে মনে। সন্ধ্যেবেলা বাসায় ফিরেও চলতে থাকল আঁকিবুকি। মাথার ভেতর কে যেন চিৎকার করতে থাকল-- 'আমার লেজ গজাইসে! আমার লেজ গজাইসে!'

সেদিনের আগ পর্যন্ত রাস্তায় বেরোলে খুব হিনম্মন্যতায় ভুগতাম। প্রায় সবার পেছনেই কী সুন্দর লম্বা লম্বা লোমশ এক একটা লেজ! আর আমি ল্যাডিস মার্কা-- মুখটা কাচুমাচু করে ওদের সাথে একই রাস্তায় হেঁটে যাই! আমার পেছনে কিচ্ছু নেই!

পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে লেজওয়ালাদের লেজের দিকে আড়চোখে তাকাই। মুগ্ধ হই! অথচ আড়চোখে তাকাই বলে বিস্মিত হতে পারি না চোখেমুখে।

আমার তাকানো দেখে লেজওয়ালাগুলোর ভাব আরও বেড়ে যায়। একটা করুণার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় শালাগুলো। আমি সানগ্লাস পড়া শুরু করি তারপর থেকে। সানগ্লাসের বোরকার আড়াল থেকে সব দেখি, মুগ্ধতা আর সমস্ত ঈর্ষা ওটার ভেতর পুরে আনি, আর প্রতি বিকেলে সুরমার পাড়ে দাঁড়িয়ে রেলিঙে হেলান দিয়ে সানগ্লাস খুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলি। "আমারও জে অলান একটা লেজ কুনদিন অইবো!"

সেই সকালে স্বপ্নপূরণ হওয়ার আগ পর্যন্ত ওরা আমাকে বলত, 'হালা ল্যাডিস'। আমি চুপ করে থাকি। কিচ্ছু বলি না। ওরা বলে, 'মাইনশোর ল্যাঙ্গুর ফিসেদি থাকে বে হালার হালা। তোর ল্যাঙ্গুর তো দেকি সামনেদি!' ওরা হাসিতে ফেটে পড়ে। আমি চোখমুখ লাল করে বাসায় ফিরে প্যান্ট খুলে কমোডের সামনে দাঁড়াই। আমার শরীর কাঁপতে থাকে। প্রচণ্ড রাগে আমি ধারালো কিছু খুঁজতে থাকি হাতের নাগালে। তারপর কিছু না পেয়ে টেপটা ছেড়ে দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ি। ফোঁসফোঁস করা পানির টেপটার সমস্ত রাগ অর্ধেক পানি ভরা ড্রামটার গায়ে শব্দ করে আছড়ে পড়ে।

এই সময়টাতে নাকি খুব যত্নে থাকতে হয়। একদম টানাটানি করা চলবে না, সময় দিতে হবে, ওকে নিজের মতো করেই বেড়ে উঠতে দিতে হবে। কিন্তু আমি পারি না। আমার ধৈর্য ছাড়িয়ে যেতে থাকে। ওদের মতো আমারও অর্ডার দিয়ে প্যান্ট বানাতে ইচ্ছে করে। পেছনের ফুঁটো দিয়ে লোমশ লেজটাকে ঝুলিয়ে দিয়ে খুব ভাব নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে ইচ্ছে করে। আমি টানাটানি করি না। কিন্তু সারাক্ষণ হাত বোলাতে থাকি। বালতির উপর উঠতে থাকি। ঘাড় বাঁকিয়ে বাঁকিয়েই মনে মনে ভাবতে থাকি, "লম্বা অর...লম্বা অর।"

আমার ঘুম কমে যায়। সারারাত বিছানায় এপাশ ওপাশ করি। প্যান্টের ভেতর হাত ঢুকাই। তর্জনিটাকে খাড়া করে দাঁড় করাই লেজের গোড়ায়। মাপ নিই। বাথরুমে ঢুকে আর কমোডে বসে থাকি না। দাঁড়িয়ে থাকি। বেড়াল ছানার মতো বোকামি করি। বোকার মতো ঘাড় বাঁকিয়ে বনবন করে ঘুরতে থাকি। আমার বোকামি দেখে বাথরুমের টাইলসগুলো দাঁত বের করে হাসতে থাকে।

আস্তে আস্তে আমার পেছনের লেজটা ছাড়িয়ে যেতে থাকে সামনেরটাকে। আমি আর বাথরুমে যাই না। আমি আর আয়নায় তাকাই না। রাতে আমি আর কম্বল গায়ে দিই না। আমার আর এসব কিচ্ছু লাগে না।

আমি অর্ডার দিয়ে প্যান্ট বানিয়ে ফেলি একদিন। জমিদারি ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করি রাস্তায় রাস্তায়। কীনব্রিজের ধারেকাছেও আর যাই না। পুচকে ছেলেগুলো আমার পাশে হেঁটে যেতে যেতে আড়চোখে আমার লেজের দিকে তাকায়। আমি আমার ভ্রূ, কাঁধ, চোখ আর মুখের ভঙ্গির উপর চাপিয়ে দেই কয়েক টন বিদ্রুপ আর ব্যাঙ্গ। ওরা সানগ্লাস পড়তে শুরু করে। আমি ওদের বাথরুমের পানির ড্রামে টেপ এর ফোঁসফোঁস রাগ শুনতে থাকি। বেড়ালছানার মতো ওদের বনবন করে ঘুরতে থাকা কল্পনায় দেখতে থাকি।

তারপর একদিন আমি নিজেই বাথরুমের ভেতর বেড়ালছানা হয়ে যাই। বনবন করে ঘুরতে থাকি। ধারালো কিছু খুঁজতে থাকি হাতের নাগালে। না পেয়ে পানির টেপটা ছেড়ে দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ি। ফোঁসফোঁস করে রাগ করা টেপটার সমস্ত পানি শব্দ করে আছড়ে পড়তে থাকে ড্রামের ভেতর। টাইলসের ফাঁকের ময়লাগুলো দাঁত মেলিয়ে হাসতে থাকে আমার দিকে। "হালা ল্যাডিস..."

আমি গল্পটা এখানেই শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, লোকটা আমার কথা শুনে আমাকে হেসেই উড়িয়ে দিলো। আমার লেজ এর গল্প শুনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেলো। আমি অসহায়ের মতো চুপচাপ কাঁদছিলাম। আমি লোকটাকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারলাম না। অনেক কষ্টে লোকটা হাসি থামিয়ে বলল, "তে তুমার লেজটারে তুমি একবারও আয়নাত দেকসো নি বা?"
"আশ্চর্য, আয়নাত দেখা লাগত কিতাল্লাগি!"
"বুচ্চি, দেখসো না। যাও, বাড়িত গিয়া লেফর তলে গুমাই তাখো গিয়া।"

লোকটা হাসতে হাসতে চলে গেল। আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম বোকার মতো। তারপর সত্যিই বাসায় গিয়ে কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকলাম। আমি আবার বাথরুমে যাওয়া শুরু করলাম। আয়না দেখতে শুরু করলাম। সত্যিই আমার প্রতিরাতে তারপর থেকে শীত লাগতে থাকল। আমাকে কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমাতেই হয় বাধ্য হয়ে।

গল্পটা আমি এখানে এসেও যে করেই হোক শেষ করে দিতাম, যদি না গতকাল বিকেলে একটা মোটা করে লোক আমাকে ওর পাগল-ছাগল মার্কা কথা শোনাত। বলে কি না ওর নাকি লেজ গজিয়েছিল! কী ফালতু কথা! মোটা লোকটা আমাকে প্যান্ট খুলে দেখালো ওর কাটা লেজের গোড়াটা। আমি উনাকে একটা ডাক্তার দেখাতে বল্লাম। নিশ্চয় কোন চর্মরোগ। বিষফোঁড়া টাইপের কিছু একটা হতে পারে। আমি ওর উদ্ভট গল্প শুনে হাসি থামাতেই পারছিলাম না। একদম গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বললাম, "তে তুমার লেজটারে তুমি একবারও আয়নাত দেকসো নি বা?"।

লোকটা খুব অবাক হয়ে গিয়ে, কয়েক চিমটি রাগ মিশিয়ে দিয়ে বলল, "আশ্চর্য, আয়নাত দেখা লাগত কিতাল্লাগি!"

আমি মিটিমিটি হাসলাম। "বুচ্চি, দেখসো না। যাও, বাড়িত গিয়া লেফর তলে গুমাই তাখো গিয়া।"]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28910257 http://www.somewhereinblog.net/blog/shobdoshonon/28910257 2009-02-12 18:04:09