যশোর শহরসহ বিভিন্ন উপজেলায় মাদক বিক্রি হচ্ছে দেদার। আর এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও। ‘পাস টিকিটের’ বিনিময়ে তাঁদের এই ব্যবসার সুযোগ করে দিচ্ছেন পুলিশের সদস্যরা।
পুলিশ কখনো-সখনো কোনো মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করলেও সহযোগীরা তাঁদের ছিনিয়ে নিচ্ছেন। আবার গ্রেপ্তার করলেও কিছুদিন পর মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন মাদক ব্যবসায়ীরা।
নিরাপদ বাহন কমিউটার ট্রেন: প্রতিদিন সকালে কমিউটার ট্রেন খুলনা থেকে ছেড়ে যশোর হয়ে বেনাপোলে যায়। দুপুরে ট্রেনটি বেনাপোল থেকে আবার যশোর হয়ে খুলনায় আসে। প্রতিদিন অর্ধশতাধিক ব্যক্তি ওই ট্রেনে করে মাদক বহন করছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের সহায়তা করছেন ট্রেনের চালক ও কর্মীরা। জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স দল ট্রেন থামিয়ে তল্লাশি করার চেষ্টা করলে খবর পেয়ে তাঁরা ট্রেনের গতি কমিয়ে মাদক বহনকারীদের নেমে যেতে সহায়তা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বেনাপোল রেলস্টেশনের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ আলী: বেনাপোল রেলস্টেশনের মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন ভারত সীমান্তবর্তী ভবারবেড় এলাকার মোহাম্মদ আলী। বেনাপোল থানার ‘ক্যাশিয়ার’ ও আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয় দিয়ে তিনি ফেনসিডিলের ব্যবসা করছেন। থানায় টাকা দেওয়ার কথা বলে মোহাম্মদ আলী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বোতলপ্রতি পাঁচ থেকে ১০ টাকা চাঁদা তোলেন। এ ছাড়া যেসব বাড়িতে খুচরা ফেনসিডিল বিক্রি হয়, সেই সব বাড়ি থেকে দৈনিক ২০ টাকা করে চাঁদা তুলছে পুলিশের টহল দল।
এ ছাড়া বেনাপোলে হেরোইনের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন ভবারবেড়ের মো. সেলিম। আলী ও সেলিম দুজনের বিরুদ্ধে বেনাপোল থানায় মাদকদ্রব্য আইনে একাধিক মামলা হয়েছে।
মোহাম্মদ আলী মাদক ব্যবসার অভিযোগ অস্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এখন শার্শা উপজেলা কৃষক লীগের সদস্য। টুকটাক ঠিকাদারি কাজ করছি। মাদক-ঠাদকের সঙ্গে কখনো ছিলাম না, এখনো নেই।’ কথা প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘মাদকসম্রাট তো আমি না; সেলিম।’
তবে কৃষক লীগের শার্শা উপজেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম বলেছেন, মোহাম্মদ আলী কৃষক লীগের কেউ নন। তিনি মূলত সন্ত্রাসী।
মোহাম্মদ আলীর ব্যাপারে বেনাপোল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামীম মূসা প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশের নামে টাকা তুলতে আলীকে একাধিকবার নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি কথা শোনেন না।’
যোগাযোগ করা হলে যুবলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য ও বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধু মোহাম্মদ আলী নয়, বেনাপোলে এ রকম অসংখ্য মাদক ব্যবসায়ী আছে, যারা কোনো না কোনো দলের সমর্থক। পুলিশ তাদের কাছ থেকে টাকার স্লিপ নিয়ে মাদক ব্যবসার সুযোগ করে দিচ্ছে।’
চৌগাছা-শার্শায় একসের আলী সিন্ডিকেট: শার্শার কায়বাবাজারে সার-কীটনাশকের ব্যবসার আড়ালে শার্শা ও চৌগাছার মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন একসের আলী। তিনি ভারতের গড়জালা সীমান্তের লক্ষ্মীপুর গ্রাম (সেখানে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া নেই) থেকে সাত থেকে আটজন শিশু ও দিনমজুর ব্যক্তির মাধ্যমে প্রতিদিন ফেনসিডিল আনেন। পরে কায়বাবাজার থেকে বিভিন্ন যানবাহনে করে যশোরের শীর্ষস্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী বারান্দিপাড়া এলাকার আবু তালেব ও শংকরপুর এলাকার কাজী তারেকের কাছে পাঠাতেন।
এ ব্যাপারে একসের আলী বলেন, ‘ব্যবসা আর আগের মতো নেই। এখন কায়বা ঘাট দিয়ে দৈনিক ১০০ থেকে ১৫০ বোতল ফেনসিডিল উঠছে।’
একসের নিজেকে চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য বলে দাবি করেছেন। দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য দলের ফান্ডে টাকা দেওয়া লাগে বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে সপ্তাহ খানেক আগে শংকরপুর থেকে তারেককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আর বারান্দিপাড়ার আবু তালেবকে ১৩ সেপ্টেম্বর ৭০ বোতল ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত বৃহস্পতিবার তাঁকে আবার জেলহাজতে পাঠানো হয়।
এ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারের অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া কোতোয়ালি থানার এসআই তোফায়েল আহম্মেদ বলেন, আবু তালেব মাদক নিজের কাছে রেখে ব্যবসা করেন না। তিনি মূলত একটি বাগানে গর্ত করে বস্তায় ভরে ফেনসিডিল রাখেন। আর কাজী তারেক দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে শংকরপুরে মাদক ব্যবসা করছেন। তাঁর কারণে ওই এলাকার যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। এ জন্য তাঁর গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজন উল্লাস করে পুলিশকে মিষ্টি খাইয়েছে।
যৌনপল্লিতে মাদকের দোকান: যশোর শহরের মাড়োয়ারি মন্দির, ঝালাইপট্টি ও বাবুবাজার এলাকার যৌনপল্লিতে মাদক বিক্রির আটটি দোকান রয়েছে। দোকানগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন যৌনপল্লির দালাল কাসেম ও হাসান। দোকানগুলো থেকে কোতোয়ালি থানার পুলিশ লক্ষাধিক টাকা চাঁদা নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের পাস টিকিটের কারবার: যশোর শহর থেকে বেনাপোলের দূরত্ব মাত্র ৪৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে কোতোয়ালি, ঝিকরগাছা, শার্শা ও বেনাপোল বন্দর থানা এবং চাঁচড়া পুলিশ ও একটি হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। রয়েছে বিজিবির কড়া প্রহরা। এত কিছুর পরও বেনাপোল থেকে যশোরে অবাধে মাদক আসছে কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট থানা এলাকার ওপর দিয়ে মাদকের গাড়ি নেওয়ার সময় থানার টাকা তোলা ক্যাশিয়ারদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট টাকা দিয়ে পাস টিকিট নিতে হয়।
এ ব্যাপারে কোতোয়ালি থানার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, কোতোয়ালি থানা এলাকার ওপর দিয়ে মাদকের গাড়ি নিতে হলে আট হাজার টাকার স্লিপ নিতে হয়। কোতোয়ালি থানার এই স্লিপ কাটার দায়িত্বে রয়েছেন চাঁচড়া এলাকার বাসিন্দা পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কনস্টেবল মতিয়ার রহমান ওরফে মতি এবং ওই এলাকার রানা। ঝিকরগাছা থানার স্লিপও কাটেন মতি। এ ছাড়া শংকরপুর এলাকায় ৩০ থেকে ৪০ জন মাদক ব্যবসায়ী রয়েছেন। চাঁচড়া ফাঁড়ির ইনচার্জ বিভিন্ন চুক্তিতে তাঁদের কাছ থেকে টাকা তোলেন বলেও তিনি জানান।
মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে কোতোয়ালি থানার ওসি এমদাদুল হক শেখ বলেন, ‘ওসব ভুয়া কথা। টাকা তোলার অভিযোগ সত্য নয়। প্রতিপক্ষের পুলিশ কর্মকর্তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে।’ পুলিশের কনস্টেবল মতিকে চিনলেও রানাকে চেনেন না বলে ওসি জানান।
এসব ব্যাপারে পুলিশ সুপার কামরুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার সখ্যের প্রমাণ পেলেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তা ছাড়া মাদক ব্যবসায়ীরা অনেক শক্তিশালী। তাদের কারাগারে আটকে রাখা যাচ্ছে না। কেমন করে যেন তারা আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে যায়।’
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ সকাল ১০:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


