রে...
বালিয়াড়ি ডেবে নিলে
পা
বিশ্বাস কিছু তবু
জোগায় মরিচীকা।
সে এক নিঃসঙ্গ নাবিক।
কেওড়া পাতায় ছাওয়া ছোট্ট কুটির। তার সামনে প্রকান্ড পাথর। নিঃসঙ্গ নাবিক তাতে সকাল সন্ধ্যা'য় পা ঝুলিয়ে বসে। তাকায় সমুদ্র পাখীর ডানা পেরিয়ে দিগন্তে। জলের রেখায়। কোন অচিন উপকূল ছোঁয়া বাতাসে তার কাঁচা-পাকা লম্বা চুল কেঁপে উঠে, বালি লুটোপুটি খায় তার পায়ের কাছে। কেওড়া বন জুড়ে শন্ শন্ হাহাকার বয়ে যায়। বৃদ্ধ নাবিক তখন প্রস্তরে শরীরের ভার রেখে উন্মুখ হয়ে থাকে দূর সমুদ্র পানে।
একদিন, সে আজ কতদিন যেন হলো। স্রোতে ভাসতে ভাসতে, ঢেউয়ের ডগায় অচেতন তাকে ঠাঁই দিয়েছে এ দ্বীপ। সুবিস্তৃত সমুদ্র জাহাজ পাড়ি দিচ্ছিল মহাসমুদ্র যথারীতি। উজ্জ্বল দিন। রৌদ্রে উদ্ভাসিত সমুদ্র। নির্মেঘ নীল আকাশ। শান্ত সমুদ্রে তর্ তর্ করে চলছে সমুদ্রযান। কিন্তু সমুদ্র অশান্ত হলো। তখন পড়ন্ত বিকেল। প্রথমে দূর দিগন্তে ছোট্ট কালো বিন্দু। যেন সমুদ্র পাখী। তারপর হঠাৎ - হঠাৎই কালো বিন্দু প্রকান্ড রূপ নিয়ে ছেয়ে ফেললো নীলাকাশ। উন্মত্ত মোষের গর্জনে ধেয়ে এলো বাতাস। সে কি দাপট। সমুদ্র যেন নরক হঠাৎ। আকাশ সমান ঢেউ ধেয়ে এলো একের পর এক। মাথায় তুলে নাচাতে লাগলো জাহাজ। পরমুহুর্তে প্রায় ছুঁড়ে ফেলে দিলো অনেক নীচে। এমনি করে বার বার। সমুদ্রে এমনটা অনাকাংখিত বটে তবে অপ্রত্যাশিত নয়। নাবিকেরা সবাই দীর্ঘ অভীজ্ঞ, সাহসী, সমুদ্র তাদের বাড়ি ঘর। তাই এমন দূর্যোগে বিচলিত হলেও ভুললো না কর্তব্য-কর্ম। প্রথমেই নামিয়ে ফেলতে হবে সবকটা পাল। ওদিকে ঘনাল সন্ধ্যা। সমুদ্র নিকষ কালো, যেন কালি ঘোলা আঁধার। দৃষ্টি চলে না দু'হাত দূরে। শুধু মাঝে মাঝে আকাশের এ মাথা হতে ও মাথা আঁধার চিরে সুতীব্র বিদ্যুৎ ঝলকে ঝলসে উঠছে উত্তাল উদ্দাম বিক্ষুদ্ধ সাগর, বুক হিম হয়ে আসে আকাশ ফাটানো বাজ গর্জনে। সমুদ্র যেন শত শত ক্ষুধার্ত রাক্ষসীর ক্ষুধায় মরিয়া, ঘনিয়ে তুলেছে হাজারো অজগরের নিঃশ্বাস। আর তীব্র তীক্ষ বল্লমের ফলার মত অঝোর বৃষ্টি।
অমন সাহসী সব নাবিকেরাও ক্রমশঃ নিয়তিকে দিতে চাইলো রক্ষার ভার। টান পড়লো পালে। গোটা কয়েক ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেলো বাতাসের প্রথম ধাক্কায়। যারা ছিঁড়লোনা, গোল বাধালো তারাই বেশি। বাতাসে ফুলে ফেঁপে জাহাজকে নিয়ে যাচ্ছে তারা কোথায় কে জানে। সমগ্র জীবনীশক্তি দিয়ে নাবিকেরা পাল নামাতে চাইলো। কিন্তু তখন খ্যাপা শুকর নেমেছে ফসলে। তারি মাঝে সব'চে বড় পালটি আটকে গেল বড় খুঁটিতে। শত চেষ্টায়ও নামালো গেলনা, সুবিধে রইলোনা নিদেন পক্ষে দড়ি কেটে মুক্তি দেবার। জাহাজ দুলছে মোচার খোলার মত। পাহাড় সমান ঢেউ যেন লোফালুফি খেলছে মস্ত জাহাজটা নিয়ে। বরফ শীতল পানি স্নায়ু অবশ করে দিতে চাইলো। তখন জীবন থেকে মৃত্যূ একাকার। নামাতে হবে পাল। অথচ দৃষ্টি চলেনা আঁধারে। দাঁতে ছুরি কামড়ে খুঁটি বেয়ে উঠে পড়লো সে উপরে। জাহাজ একবার এ পাশের জল ছোঁয় কাত হয়ে , আবার ও পাশের। পিচ্ছিল খুঁটি। তারি মাঝে পা বাঁধিয়ে এক হাতে ঝুলে অন্যহাতে কেটে দিলো পালের দড়ি। ঠিক তখনই আকাশ ছোঁয়া ঢেউয়ের ধাক্কায় জাহাজ উঠে গেলো ত্রিশ ফুট, তার হাতের বাঁধন গেল ফসকে আর সে হীমশীতল খোলা সাগরে গিয়ে পড়লো জাহাজ হতে পঞ্ঝাশ গজ দূরে।
এরপর জল-
জোয়ার-
ঢেউ-
হীম আর
সবশেষে কতক্ষন পর কে জানে নির্জন দ্বীপের এই সৈকতে।
একেক দিন সমুদ্রে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখে মরিচীকা জাগে। যেন দূর সমুদ্রের জাহাজ থেমেছে তার দ্বীপে। নামগোত্র হীন জনমানবহীন দ্বীপে নিঃসঙ্গ নাবিক দিন গোনে অবশেষে মরিচীকা ক্ষণের। কোন কোন দিন মধ্যদুপুরে কোন কোন দিন সাঁঝ প্রহরে - যখন হাজারো রঙ বিচিত্র নকশায় সাজে আকাশ ; সমুদ্র, কোন কোন দিন রাতে - লক্ষ নক্ষত্র জাগা উন্মুক্ত সমুদ্রে, কোন কোন ঝড়ে নিঃসঙ্গ সে নাবিক মরিচীকা দেখবে বলে
অপেক্ষায়
অপেক্ষায়
মমি হয়ে যায়।
মমি হয়ে গেলে অপেক্ষা ফুরোয়,
লক্ষ বছর দু'দন্ডে ফুরোয়,
তারপর একদিন-
সবদিন স্মৃতিতে
মিলায় -
শুণ্য জেগে থাকে প্রানপণে।
আসে তো অমনও দিন।
(পরবর্তী পর্ব: গা...
ছবিটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত
"প্রথম পর্ব : সা..." এখানে
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৪:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


