বিভ্রান্ত রাহুল মদের পেয়ালা হাতে বসে আছে শূণ্য দৃষ্টিতে। মাঝে মাঝে একটু একটু করে চুমুক দিচ্ছে। পাশে বসে স্যু তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখছে ওকে। হঠাৎই দৃঢ় কণ্ঠে করে বলে ওঠে কথাটা, 'এগজিস্টেনশিয়াল অ্যাঙস্ট'।
তখন থেকেই শব্দ দু'টো মাথায় ঢুকে আছে। এগজিস্টেনশিয়াল অ্যাঙস্ট। উপরের অংশটা "হলিউড বলিউড" মুভ্যির ছোট্ট একটা অংশ। মুভ্যিটা ভালো লেগেছিল। ইচ্ছা করেই মুভ্যিটা তৈরি করা হয়েছে বলিউডের আদলে, কিন্তু ভিতরে একটু বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলিউডের ক্লিশেইড, উদ্ভট দিকগুলো ঢুকানো হয়েছে। সাইজে বেশ ছোট অবশ্য। হাসি পায়, ভালোও লাগে।
দেখার পরে বছর ঘুরে গিয়েছে, কিন্তু মাথা থেকে শব্দ দু'টো যায় নি। ডিকশনারীতে দেখব দেখব করেও শব্দগুলোর অর্থ দেখা হয় নি।
এখন সন্ধ্যা হয় পাঁচটায়। সাইকোলজি ক্লাসটা ছয়টায়। শেষ হয় সাতটায়। বাসায় যেতে যেতে বাজে রাত নয়টা। অথচ বাসা থেকে বেরোই সেই সকাল আটটায়। সব মিলিয়ে বিদঘুটে রকমের ক্লান্ত থাকি সাইকোলজি ক্লাসে। ঘুমে ঢুল ঢুল করি। কাল ঘুম আসে নি। এগজিস্টেনশিয়াল অ্যাঙস্টের অর্থ আবিষ্কারে মগ্ন ছিলাম, তাই।
এগজিস্টেনশিয়ালিস্টদের থিওরী অনুযায়ী, আমরা "কিছু না" থেকে আসি, আবার "কিছু না" তে মিলিয়ে যাব। মৃত্যু মানে তো সব শেষ। যে কোন সময় মৃত্যু আসতে পারে, বাসে বসা পিছনের পাগল লোকটা অকারণেই মাথা ফাটিয়ে ছাতু বানিয়ে ফেলতে পারে, প্রিয় মানুষটা হঠাৎই মারা যেতে পারে। জীবনটা এমনই, স্থায়িত্ব আর নিশ্চয়তা খোঁজা বৃথা।
'নাথিংনেস' আর শূণ্যতাই হলো এগজিস্টেনশিয়ালিস্টদের মৌলিক ধারণা। আমরা আছি তাই আছি। এর কোন কারণ নেই। আমরা মারা যাবো, শেষ হয়ে যাব। তারও কোন কারণ নেই। বেঁচে থাকা বা মরে যাওয়াতে আসলে বিশ্বজগতের কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হচ্ছে না--ইহাও একটি চরম সত্যি কথা।
তারপরেও বেঁচে থাকতে হবে, সুস্থ থাকতে হবে। সুস্থ থাকতে হলে, এই সব সত্যি জেনে, মেনে নিয়ে জীবনের একটা ক্ষনস্থায়ী মানে তৈরি করে নিতে হবে নিজের মত! তাহলে, দু'দিনের প্রেম ফুরিয়ে যাবে বা প্রেমিকা বুড়িয়া যাবে জেনেও পাগলের মত ভালোবাসা যাবে। জীবনের কোন স্থায়ীত্ব বা নিশ্চয়তা নেই জেনেও নিজের মত একটা অর্থ থাকবে, তাই।
যারা অর্থ তৈরি করতে পারে না, তারা বিভ্রান্তি আর হতাশায় ভুগে। আত্মহত্যার কথা চিন্তা করে। নানা মানসিক রোগ বাসা বাঁধে!
শুনতে শুনতে ঘুম ছুটে গিয়েছিল। এগজিস্টেনশিয়ালিস্টদের জীবন দর্শনের একটু ভিতরে ঢুকে ভাবার চেষ্টা করতেই হাল ছেড়ে দিলাম। বুক জুড়ে হাহাকার শুরু হয়ে যায়। ঠাশ করে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই চারপাশ থেকে, প্রকৃতি থেকে, এক কৃষ্ণগহ্বরের জন্ম হয় বুকের গভীরে। মা গো মা, মানুষ ভাবে কি করে ওমন করে?
আরও কিছু ইন্টারেস্টিং আইডিয়া আছে। যেমন, সমাজে আমরা আসলে নিজেদের "আসল সত্ত্বা" বা 'ট্রু সেলফ' নিয়ে থাকি না কখনও। আমাদের জন্ম হয় "আসল সত্ত্বা" নিয়ে। যত বড় হই, তত নিজেদের আসল সত্ত্বা থেকে বিচ্ছিন্ন হই। যা ইচ্ছা করে তা আর করতে পারি না তখন। মানুষ যা চায়, নিজেদের উপর সেই মুখোশ এঁটে ঘুরে বেড়াই। মাঝে মাঝে মুখোশ আর আসল সত্ত্বার মধ্যে এই আকাশ পাতাল তফাৎটা ধারণ করা আর সম্ভব হয় না। তখন ভেঙে পড়ি আমরা। আসল সত্ত্বাটা নগ্ন হয়ে বের হয়ে আসে, যাকে আমরা, যারা আসল সত্ত্বাটা সার্থকতার সাথে ঢেকে রাখছি তারা, পাগলামি বলি। পাগলরা কাজকর্ম চিন্তাভাবনা কথাবার্তা বলার আগে আশে পাশের মানুষের কথা ভাবে না।
এগজিস্টেনশিয়াল অ্যাঙস্ট হলো আসল সত্ত্বা চাপা দেয়া মানুষদের উদ্বেগ আর ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়া সত্ত্বার খেলা।
আমাকে বেশি টানে হিউমেনিস্ট চিন্তা ধারা। আমার বিশ্বাস আসলে সব কিছুর মানে যুগিয়ে চলে। জীবনের গতি আর খুঁটি নাটি অর্থ খুঁজে বের করার দায়িত্ব নিজের, কিন্তু সামগ্রিক অর্থের রূপ রেখা তো টেনে দেয়া, তাই স্বস্তি। বুক জুড়ে ওই মহাশূণ্যের হাহাকার, সদাবিরাজমান বিভ্রান্তি আর অর্থহীনতাকে জীবনের অংশ করে নেয়ার প্রচেষ্টা নিয়ে বাঁচতে হয় না!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


