সাউথ আফ্রিকান মেয়ে লরিসা আমার ফিজিওজি ল্যাব পার্টনার। ব্যাঙের হৃদপিন্ড ব্যবচ্ছেদ থেকে শুরু করে নিজের শরীরের রক্তচাপ মাপামাপি এক সাথে করেছি। একটাই সমস্যা মেয়ের। খালি হাসে। লরিসা আর ওর বান্ধবী সিনথু। ব্যাঙের হৃদপিন্ড খুঁজে পাচ্ছি না। হি হি হি। প্রি-ল্যাব কুইজে দশে তিন পেয়েছি। হি হি হি। অপটিক ডিস্ক দেখতে পাই না। হি হি হি। এই সমস্যাটা বাদ দিলে দারুণ একটা মেয়ে। ভারতীয় রক্ত আছে শরীরে, লজ্জা পাওয়া, মায়াবতী হওয়া টাইপের ভারতীয় মেয়েদের সহজাত দোষ গুণের সাথে অসাধারন সৌন্দর্যের কিছু অংশ চলে এসেছে। খুব সুন্দর, মায়াবতী দু'টো বড় বড় চোখ। প্রথম দিন থেকেই দেখি ওই চোখ দিয়ে পিছনের টেবিলের রবিনের সাথে খালি চোখে চোখে কথা কয়! অংক মিলে না, রবিনের কাছে বিচার চলে যায়। ল্যাবে বোরড হয়ে গেলে কান্না কান্না মুখ করে বলে, ক্ষুধা পেয়েছে। রবিন চকলেট পাঠানোর ব্যবস্থা করে।
সেইটা দেখে সিনথু আবার হি হি হি। লরিসা সিনথুর পিঠে দেয় কিল। আমি তো ধরেই নিয়েছি--হয়ে গ্যাছে!
এক ফাঁকে জিজ্ঞাসা করেই বসলাম, 'আর য়ু গাইজ গোয়িঙ আউট?' শুনে সিনথু আরও হাসি। লরিসা এবার চোখ উল্টে জিজ্ঞাসা করে, 'তাই মনে হল?' সিনথু তখনও দাঁত বের করে হেসে যাচ্ছে। বললাম, 'ইজন্ট দ্যাট সো অবভিয়াস?'
লরিসা এবার ঝাপিয়ে পড়ে তাড়াতাড়ি বলে, 'আরে নাহ। সিনথু শুধু আমাদের ক্ষেপিয়ে মজা পায়। ও বলে আমাদের মধ্যে নাকি কেমিস্ট্রি আছে। আসলে ওসব কিছু না। আমরা শুধু বন্ধু।' অগত্যা!
সেদিন, শিরা উপশিরা নিয়ে বড় জ্বালায় আছি। মাইক্রোস্কোপের ভিতর দিয়ে মাইক্রোসার্কুলেশনে গতি প্রকৃতি বিশ্লেষন করছি। মাইক্রোস্কপিক ব্যাপার স্যাপারের জটিল একটা সমস্যা নিয়ে মুখ তুলে তাকাতেই দেখি রবিন লরিসাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আছে। সিনথু হাসছে হি হি। লরিসা মুচকি মুচকি হাসছে। আমার চোখে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার ভাব থেকে থাকবে হয়তো--তিনজনই সে কি হাসি। আরে মুশকিল তো! সিনথু রবিনকে বলে, 'তোমাদের মধ্যে যে কেমিস্ট্রি আছে, সেটা সন্ধ্যাও বলেছে। ও বলে এটা নাকি খুব অবভিয়াস।' রবিন হেসে ফেলল। লরিসাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল।
আমি কি করব রে বাবা, আসল কেমিস্ট্রি না চোখের ভুল সেই বিশ্লেষনের চাইতে শিরা উপশিরা পড়া বরং আরও সোজা।
গত এগারো সপ্তাহ ধরে ওদের দেখলাম। দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেল তিন জনের সাথেই। হাসির উপকারিতা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। যত সমস্যাই থাকুক, দম ফাটা অনিয়ন্ত্রিত হাসি শুনলে কেন জানি সব সমস্যাই তুচ্ছ মনে হয়। রবিনও খুব মজার মানুষ। খুবই মিশুক আর ভদ্র। ওর ব্যাপারে সবচেয়ে মজা লেগেছে প্রথমদিনের ঘটনা। আমি কোন দেশ থেকে জিজ্ঞাসা করছিল, বলেছিলাম অনুমান করতে। সাধারনত বিদেশী কেউ অনুমান করতে পারে না। পারলেও অনেক্ষন পরে। ভারত, পাকিস্তান, ফিজি, সব ঘুরে টুরে তারপরে বাংলাদেশে। রবিন প্রথমবারেই স্পষ্ট করে বলল, 'বাংলাদেশ'। বাহ!
ওদের খুনসুঁটি আজও দেখলাম বাসে বাড়ি ফিরতে ফিরতে। আর নিশ্চিত হলাম ওদের মধ্যে অন্য কিছু আছেই আছে! অথচ ওরা নিজেরা কিছুতেই স্বীকার করবে না। কিন্তু রবিন যতটা আগলে ধরে থাকতে চায় লরিসাকে, লরিসার সব অন্যায় আবদার মেনে নেয়, লরিসা একটু ঠোঁট উল্টাচ্ছে দেখলেই পারলে হাঁটু গেড়ে মাফ চায়, লরিসা যেভাবে সব ছেড়ে দেয়ার নির্ভরতায় রবিনকে খুঁজে সামান্যতেই-- বন্ধুত্বে ঠিক অতটা সম্ভব না। তীব্র মায়া দেখি ওদের চোখে।
আমার খুব করে মনে হচ্ছে, ভুল পড়ি নি ওদের চোখ। কেবল নিজেদের কাছে স্বীকার করতে পারে নি এখনও। যেদিন স্বীকার করবে, সেদিন বলতে পারব, আমি ঠিক জানতাম! প্রমান স্বরূপ থাকবে সন্ধ্যাবাতি ব্লগের একটা পোস্ট!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

