রোজা আসি আসি করছে, চেষ্টা করছি রুটিনটাকে এখনই রোজার মত করে নিতে। না হলে রোজায় ভীষণ কষ্ট হয়। ক্ষুধায় না, আমি দিনের পর দিনও না খেয়ে থাকতে পারি। হু হু করে ওজন কমে যায়, ক্ষুধা এসে চলে যায়। কিন্তু আমি না খেয়েও বেঁচে থাকি।
রোজায় কষ্ট হয় ঘুমে। প্রচন্ড ঘুমে সারা দিন ঢুলি। কারন ঘুম হয় ভাঙা ভাঙা। রাতে দেরিতে ঘুম, সকালে আগে উঠে যাওয়া, সেহরী খেয়ে আবার ঘন্টা খানেক ঘুম, তারপরে ক্লাসের জন্য উঠে যাওয়া। ঘুম আনতে সময় যায়, ঘুম ভাঙতে সময় যায়। আসল ঘুম আর হয় না। অথচ এমনটা হওয়ার কথা না, রোজা তো বরকতের মাস। নিশ্চয়ই কিছু একটা ভুল হ্য় আমার।
মাঝখানে আমার রুটিনটা বাড়াবাড়ি রকমের খারাপ হয়ে গিয়েছিল, যখন ইন্টারনেটে চ্যাট করা হতো দেশে বিদেশের দূর দুরান্তের মানুষের সাথে। সেই রাত একটা, দুইটা, তিনটায় ঘুমাতে যাওয়া। বেশি কথা বলতে থাকলে একসময় অনুভূতিরা ভোতা হয়ে আসে। চ্যাটের এক নম্বর কুফল। তাছাড়া রুটিন ব্যাড়া ছ্যাড় হয়। তো ঠিক করেছি, রোজার অভ্যাসের জন্যই আগে ঘুমাতে যাব। রাত দশটা। তারপরে, ভোর চারটায় উঠে গিয়ে একেবারেই ঘুমানো যাবে না, চা খেয়ে পড়তে বসতে হবে। সকালে অন্তত: দুই ঘন্টা পড়াশোনার সময় পাওয়া যাবে। ফুলপ্রুভ প্ল্যান! কি জিনিয়াস!
ওমা, প্রতি রাতে ঘুমাতে যাই ঠিকই রাত দশটায়। কিন্তু চারটায় এলার্ম শুনে উঠে বিরক্ত হয়ে এলার্ম বন্ধ করে রাখি। ধুর, কিসের চিল্লাচিল্লি। স্নুজ হয়ে আবার কিছুক্ষন পরে ঘুম ভাঙে। আবার নতুন করে মেজাজ খারাপ হয়। আবার ঘুমাই। শেষে ফজরের সময় যাই যাই করতে থাকলে পড়ি মরি করে উঠে ফজর পড়ি। বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা! ঘুমও হচ্ছে, পড়াও হচ্ছে না!
আজ বহু কষ্টে উঠলাম, কিন্তু পড়া আর হলো কই? মীরার সাথে আড্ডা দিলাম ঘন্টা খানেক (ওকে ঘুমাতে না দিয়ে), মায়ের সাথে আড্ডা দিলাম আরও খানিক্ষন, তারপরে ভাইয়ার সাথে। বাবা ঘুমিয়ে না পড়লে নিশ্চয়ই আরও খানিক্ষন আড্ডা দিতাম। রুমে এসে পড়তে বসে দেখি মোটে আধা ঘন্টা আছে, তারপরেই ইউনির জন্য যেতে হবে। উফ, শয়তান আমাকে কত ভাবে যে ট্যাকল করে! আড্ডা দেয়া অবশ্যই ভালো ব্যাপার, কিন্তু প্ল্যান করেও যে পড়াশোনা করতে পারলাম না, অর্থ্যাৎ নিজের কাছে কথা না রাখার অপরাধে অপরাধী হয়ে গেলাম, এতে শয়তান নিশ্চয়ই সাম্বা নৃত্য দিচ্ছে! (খাইয়ালামু)
ট্রেইনে বসে না-পড়া-ফিজিওলজির উপর চোখ বুলাচ্ছি, হরমোনগুলোর নাম মুখস্ত করছি, তখনই পাশ থেকে শুনলাম কণ্ঠস্বরটা, "খুবই মজার ব্যাপার স্যাপার নিয়ে পড়াশোনা করছ মনে হয়!"
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখি বছর চল্লিশেক হবে মহিলার বয়স, উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে আছে। আমি হেসে ফেললাম, 'হ্যা আমার খুবই ভালো লাগে। তুমি পড়েছ বুঝি ফিজিওলজি?'
'আরে নাহ, আমার পড়াশোনা সব সময় হিউমেনিটি নিয়ে ছিল, কিন্তু বিজ্ঞানের প্রতি একটা মুগ্ধতা ছিল সব সময়।'
'হিউমেটিনি!? আমার কিন্তু সব সময়ই খুবই দুর্বলতা ছিল হিউমেনিটি নিয়ে, তাই এমন একটা সাবজেক্ট করছি, যাতে আমি হিউমেনিটি আর পিওর অ্যাডভান্সড সাইন্স দু'টোরই স্বাদ পাই। পড়ছি নিউরোসাইন্স, তাই সাইকোলজি আর পিওর সাইন্স দু'টোই পড়তে হচ্ছে।'
এবার মহিলার উচ্ছ্বাস দেখে কে, 'এত্ত মজার আর ইন্টারেস্টিং সাবজেক্ট, তুমি নিশ্চয়ই খুবই বুদ্ধিমতী, না হলে পড়ার সুযোগ পেতে না আর নিজের দিকে তাকাও, কি সুন্দর তুমি! য়ু আর বিউটিফুল এন্ড আ জিনিয়াস। সব আছে তোমার, ভীষণ রকমের ভাগ্যবতী তুমি'। এই পর্যায়ে টের পেলাম গাল ভয়াবহ গরম হয়ে গিয়েছে, মহিলার উচ্চকণ্ঠের উচ্ছ্বাসে ট্রেইনের পুরো বগির মানুষেরা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে। এতটা এম্ব্যারাসিং পরিস্থিতিতে পড়ি নি অনেক দিন। মহিলার উচ্ছ্বাস থামে না, একি মুশকিল! মাথা নিচু করলাম। তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে হিউমেনিটিতে নিয়ে গেলাম, সাইকোলজির বেশ কয়েকটা সাবজেক্ট করার সুযোগ আছে আমার ডিগ্রীতে, সেই সূত্রে হিউমেনিটি পড়ার অতৃপ্তি স্বাদের অনেকখানি পূর্ণ করে নিচ্ছি, সেই গল্প শুরু করলাম।
মেরি মহিলার নাম, কাজ করছেন একটা চ্যারিটি সংগঠনে।
সারাটা পথ অনেক গল্প হলো। গল্প হলো পৃথিবীর যুদ্ধগুলো নিয়ে, অনেক দূরে, একটা ছোট্ট বাক্সে সে সব বাস্তবতা শক্ত করে বন্দী করে রাখতে পেরে আমরা ভাগ্যবান, আর বড় স্বার্থপর। ঝট করে মনে পড়ে গেল আমার সোনার দেশটা এখন ঘোলাটে পানির নিচে তলিয়ে আছে...
চলে যাওয়ার পরেও অনেক ভাবলাম। একটা সময় ছিল, যখন একুশ বলতে অনেক বড় মনে হতো। আমার মা এক সন্তানের মা ছিল একুশ বছর বয়সে। একুশে কত হাতি ঘোড়া করে ফেলব ভেবেছিলাম! কি করতে পেরেছি?
কত বিচ্যুতি হয়, উপলব্ধি হয়, সবকিছু ভুল মনে হয়, সব ভাঙচুর করে আবার নতুন করে পথচলা শুরু হয়। তারপরে, আবারও কত ছোট খাট অর্থহীন সমস্যায় বিপর্যস্ত হয়ে যাই। মুখে একটা নতুন ব্রন হলে চিন্তায় বিমর্ষ হয়ে যাই, লেবু চিপি, উপটান দেই। মাথার চুল ধুই দুই ঘন্টা সময় নিয়ে। উইন্ডো শপিং করে কাটিয়ে দেই ঘন্টার পর ঘন্টা, গোলাপি জিপসি স্কার্টের সাথে টপ খুঁজে না পেয়ে। গান শুনে মন খারাপ করে একটা সকাল, একটা বিকাল, পুরা রাত, কিংবা কয়েক দিন, কি সহজে পার হয়ে যেতে দেই। হুমায়ূন পড়ে এখনও মন খারাপ করি। সালমান রুশদি পড়ে পরীক্ষার আগের রাত চলে যেতে দেই। পড়া বইগুলোই বার বার পড়ি। ব্লগে বসে বসে গালাগালিময় কুৎসিত লেখাগুলো পড়ি। কত্তদূরের মানুষদের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা অর্থহীন প্রলাপে সময় কাটাই। নেই নেই করে দিন গুণে যাই, অথচ... অথচ কত কিছু বোঝাই হয়ে আছে নিজেতে, সেগুলো অবহেলায় পড়ে থাকে। অনেক দূরের দিকে স্থির থাকে ঘোলাটে দৃষ্টি--নিজের পায়ের কাছের সব কিছু যে অবহেলায় পিষে যেতে থাকে!
(এই অপরাধবোধের কথা লিখতে এসে খেয়াল করি আমি আগে পরের কথাগুলো খুব বেশি বলছি, মাঝখানেরটুকু বাদ দিয়ে। যেন অপরাধবোধটুকুও চাপা দিয়ে রাখতে চাই। নিজেও জানতে চাই না। ঘাটাঘাটি করতে চাই না।)
পৃথিবী আমাকে বড় ঋনগ্রস্ত করে দিচ্ছে প্রতিদিন... একুশ তো হয়ে গেল, কবে শুরু করব ঋনশোধ আমি?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

