বন্ধু বাছাই সব সময় ঠিক হয় না। অনেক সময় ঠিক বন্ধু বাছাই করেও ঘটনাপ্রবাহের তোড়ে বাছাই-পর্বকে ভুল মনে হয়। বন্ধুদের নিয়ে ভাবতে বসে সেই নার্সারীর নীলার কথা মনে পড়ে। ওর সাথে ক্লাস থ্রী পর্যন্ত গলায় গলায় দোস্ত ছিলাম। ক্লাস ফোরে উঠে হঠাৎ মনে হলো, কোথাও ভুল হচ্ছে। নিজে থেকেই বন্ধুত্বের বাঁধন কাটলাম। ও আস্তে আস্তে তলিয়ে যাচ্ছিল কেন জানি না, আমাকেও নিয়ে যাচ্ছিল সাথে। আমাকে কেউ বলে নি, কিন্তু সেই বয়সেই বুঝে গেলাম। বাঁধন কাটা সে জন্যই। তারপরে মুক্ত হয়ে বদলেও গেলাম। স্কুলও বদলালাম। পৃথিবীর সেরা মেয়েগুলোকে বন্ধু হিসেবে পেলাম নতুন স্কুলে। মাঝে মাঝে মনে হয় ওই বাঁধন কাটার পরেই আমি বেড়ে উঠেছি সত্যি সত্যি, আজকের আমি হয়েছি। না হলে হতে পারতাম না। নীলার খবর পেয়েছিলাম অনেকগুলো বছর পরে। এস এস সি দিতে পারে নি একবারে, টেস্টে ফেল করে পরের বছর দিতে হয়েছিল। এই মেয়েটাই ছোট ক্লাসে ফার্স্ট হতো, হিংসা করার মত ঝকঝকে হাতের লেখা ছিল। আমার হাতের লেখা দেখে মা বলতো 'কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং', নীলার হাতের লেখা দেখে বরাবার ঈর্ষান্বিত হতাম। কত দিকে যে ওর মতো হতে ইচ্ছা হতো! এখন মাঝে মাঝে খুব মনে পড়ে ওর কথা। দু'জন দু'টো আলাদা পথে না গেলে কেমন হতো, ভাবনা হয়।
এরকম করি আমি, মাঝে মাঝে খুব স্বার্থপরের মত বাঁধন কেটে দেই নিজ হাতে। এর কারণ হতে পারে, আমি যাকে ভালোবাসি, তাকে খুব ভালোবাসি। তাকে জড়িয়ে, খুব শক্ত করে জড়িয়ে, আমার জীবন গড়ে উঠে। আমার ভালো লাগারা বড় হয়। আমি ছোট চারাটা থেকে ধীরে ধীরে গুল্ম হয়ে উঠি, বৃক্ষ হয়ে উঠা হয় না আমার আর। নীলার সাথে যখন থাকতাম, ক্লাস থ্রী পর্যন্ত আমার সত্যিই দ্বিতীয় কোন বন্ধু ছিল না স্কুলে। বন্ধুত্বের অপমান মনে হতো দ্বিতীয় বন্ধুত্বকে। এতটা ভালোবাসতাম বলেই আমার আকাশটা ঢেকে রেখেছিল ও, টের পেতাম না। যখন টের পেলাম, তখন কেউ বলে দেয় নি, নিজ থেকেই সরে গিয়েছিলাম। আমার ভালোবাসার খুব অন্ধ একটা দিক আছে, সেই ছোট বয়সেই বুঝেছিলাম। আর, যাকে ভালোবাসি, আমি বদলে যাই তার মত করে। তাকে বদলে নিতে পারি না কখনই নিজের মত করে।
সেজন্যই এখন ক্রমবর্ধমান আকাশের বন্ধুদের খুঁজি, নিজেকে যেন কখনও বন্দী, আবদ্ধ, ক্ষুদ্র, অপরিনত মনে না হয়। যে পাত্রে থাকব, সেই আকার নিবো জানি। তাই, নিজেকে ঢেলে দেয়ার আগে বিশাল পাত্র খুঁজে ফিরি!
আজকের দিনটা খুব সুন্দর। আকাশ পরিষ্কার। ঘাসগুলো বড় সবুজ। আজ একজনের জন্মদিন। মনে পড়তেই কেন যেন স্মৃতিরা ধুপ ধাপ ধাক্কা দিচ্ছিল মনের দরজায়। যে স্মৃতিচারণ করলাম, তার সাথে খুব একটা সম্পর্ক নেই, হালকা কিছু সম্পর্ক আছে, যা আমি বুঝতে পারব, আর হয়তো সে। মিলটা কোথায় বুঝার চেষ্টা করছি। মিলটা গভীর কিছুতে, ও মোটেই নীলার মত না। অগভীরতায় মিল খুঁজলে তাই হতাশ হতে হবে। মিলের জায়গাটুকু এতটুকু হতে পারে--কখনও কখনও বুঝতে পারি না, পথগুলো ক্ষনিকের যে সময়টুকুতে এক সাথে মিলেছিল, সেই ব্যাপারটা ভালো ছিল, না খারাপ ছিল। তবে, এতটুকু বুঝি, রাস্তাগুলো এক সাথে থাকার মত না হলেও, পথের মালিক খারাপ না মোটেই। তবু, কেউ বৃক্ষ হয়ে না উঠলে পথের চিহ্ন বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে যায়। নানা রঙের, নানাবিধ বৃষ্টি। ধুয়ে যাওয়া পিচ্ছিল পথে হোঁচট খেতে হয় শুধু।
সুখে থাকুক সে। সব সময়।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই নভেম্বর, ২০০৭ ভোর ৬:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


