somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুভ্যি: বিফোর সানরাইজ

২৮ শে নভেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৫:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'বিফোর সানরাইজ'--মুভ্যিটার নাম আগে শুনি নি। ৯৫ এর মুভ্যি। তেমন নাম করে নি হয়তো। স্বাভাবিক। গল্পের কোন ধারা নেই। গল্পের নাকি শুরু থাকতে হয়, তারপরে রহস্য গাঢ় হতে থাকে, শেষ মেষ একটা ক্লাইমেক্সও থাকে। এই মুভ্যির তেমন কিছু ছিল না। বাইশ তেইশ বছরের একটা ছেলে আর একটা মেয়ে কথা বলে পুরাটা সময়। ছেলেটা আমেরিকান, ভিয়েনাতে হলিডেতে গিয়েছে। মেয়েটা ফ্রেঞ্চ। ট্রেইনে দেখা। ছেলেটা মেয়েটাকে রাজি করায় ওকে ভিয়েনা ঘুরে দেখানোতে। মেয়েটা নেমে যায় ট্রেইন থেকে! তারপর পুরাটা মুভ্যি আগায় ওদের দুইজনকে ঘিরেই। ওরা সারা শহর ঘুরে বেড়ায়। সারাক্ষন কথা বলে। সংলাপটুকুই মুভ্যি। মুভ্যিতে আমরা একশন দেখতে চাই, আর্টের প্রকাশ দেখতে চাই। এতে সেসব ছিল না, তাই মুভ্যি হিসেবে ভালো লাগার কোন কারণ নেই, তবু আমি ভাবছি, সেটা এখন থেকে আমার খুব প্রিয় মুভ্যির তালিকায় ঢুকে গেল।

কারণটা যে কি, ব্যাখ্যা করতে পারছি না। তবে, প্রথম পাঁচ মিনিটেই আমার মনে হলো, মেয়েটা একদম আমার মতো! ও যা করছিল, একই পরিস্থিতিতে আমি ঠিক সেগুলোই করতাম। এক একবার ভাবছি একটা কথা, পরক্ষনেই দেখি মেয়েটার মুখে সেকথা। আমি যেরকম অনেক ভেবে ফেলি ঠিকই, তারপর হুট হাট করে ফেলি মন যা চায় তাই, মেয়েটাও তেমনি।

ওরা সেদিন সন্ধ্যায়, তারপর সারা রাত ভিয়েনাতে ঘুরে বেড়ায়। ভিয়েনা বলে কথা, সারা রাত রেস্টুরেন্ট, চার্চ সব খোলা ছিল। ওরা শুধু ঘুরে বেড়ায়, মেয়েটা ওর ছোট বেলার স্মৃতি খুঁজে দেখায় নানা জায়গায়, আর কথা বলে। ও এক অখ্যাত কবরস্থানে নিজের শৈশবের স্মৃতি খুঁজে পায়। শৈশবের স্মৃতিগুলো বুকের গভীরে রেখে শুধু খুলে দেখায় যাকে ভালোবাসে তাকে।
বিশাল চার্চটায় যায় গভীর রাতে, গিয়ে বলে ও বিশ্বাস থেকে চার্চে আসে না। আসে, কারণ চার্চ ব্যাপারটা ওকে মুগ্ধ করে। এত বিশাল একটা ঘর, বছরের পর বছর, শত শত বছর ধরে মানুষের দু:খ কষ্টকে ধারণ করে আছে। কত মানুষ এখানে এসেছে তীব্র হতাশা নিয়ে, উদ্বেগ নিয়ে, কষ্ট নিয়ে, কান্না নিয়ে, সব ঢেলে দিয়ে ফিরে গিয়েছে। একটা ঘর, এত কিছু ধারণ করছে! তাই অবিশ্বাসী হয়েও ও চার্চে বসে থাকতে পারে ঘন্টার পর ঘন্টা।

ছেলেটা তখন ওর এক নাস্তিক বন্ধুর এক হাসির ঘটনা বলে, দু'জনেই হেসে গড়িয়ে পড়ে। কিংবা যখন গিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে বসে, হাত পড়তে আসে মহিলাটা। আমি যেমন খুব আগ্রহ নিয়ে সেগুলো শুনতাম, ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে শুনলো ভবিষ্যত বাণী। কিন্তু মহিলাটা যাওয়ার পরে দু'জনেই হেসে ফেললো। আমি ঠিক এমনটাই করতাম। আমার বিন্দুমাত্র আস্থা নাই যারা হাত পড়ে তাদের উপর, ওদের ট্রিকসগুলো, কথা বলার ধরণ, আত্মবিশ্বাস জাগানো, ভালো লাগানো সাথে সাথে একটা খারাপ কিছু বলে অথেনটিসিটি প্রতিষ্ঠা করানো, সব কিছু বুঝতে পারি। তবু মজা লাগে হরোস্কোপ পড়তে, হয়তো রূপকথার মত পড়তে পারি তাই।
ওমা, পরক্ষনেই দেখি, আমি যেভাবে ভাবছি, ওরা সেভাবেই হাত দেখা ব্যাখ্যা করে যায়! কিংবা কবিতটা, শুনে আমারও মুগ্ধতা এসেছিল। কিন্তু স্কেপটিক মনটা বলছিল, এতো জোড়া লাগানি কাজ। কি আশ্চর্য, সাথে সাথে বলে দিল ওরা!

সংলাপগুলো এভাবে আগায়। সত্যি জীবনের মত, ফ্লো করে, একজনের একটা কথায় আরেকজনের কিছু মনে হয়ে যায়। খুব স্পনটেনিয়াস। সাবলীল। জীবন্ত।

মেয়েটা ওর বাবা মায়ের কথা বলে, ওকে সারা জীবন প্রচুর স্বাধীনতা দিয়েছে। কখনও বেঁধে রাখে নি। নিজেরাও শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা ছিলেন। একজন সাধারন ছেলে বা মেয়ে নিজের বাবা মায়ের কাছে যা কিছু চায়, সব দিয়েছে। মনে হতে পারে, তাহলেই তো হলো, বাবা মায়ের ব্যাপারে নিশ্চয়ই কোন অভিমান নেই, অপ্রাপ্তি নেই! তা কিন্তু না! ও বলে, বাবা মায়ের সাথে ওর নিজেস্ব কিছু সংঘাত আছে, শি হ্যাজ আ ফাইট অফ হার ওউন! এটা অন্য কেউ শুনলে বুঝবে না, কিন্তু হয়তো এটাই স্বাভাবিক। প্রতিটা ছেলেমেয়েরই বাবা মায়ের সাথে নিজেস্ব কিছু বোঝাপড়া আছে। আমি শুনে মুচকি হেসে দিলাম, আমার কথা জানলি কি করে মেয়ে?

কিংবা, যখন ক্যাফেতে গিয়ে অপরিচিত মানুষের মত কথা শুরু করে দুই জন। এই কাজটা আমি অনেক করেছি। খুব কাছের কাউকে ফোন করে অন্য কারো মত কথা বলা, যখন সে জানে এ 'আমি'। দুষ্টুমির ফাঁকে ফাঁকে খুব সহজেই নিজেকে জানানো হয়ে যায় সেভাবে।

কিংবা ছেলে-মেয়ে ইস্যুতে যখন ঝগড়া করে দু'জনে। আমার খুব প্রিয়, হাজার বার করা, ক্লিশেইড একটা আলোচনা। ওরা আঁতলামিতে আমাকেই মুভ্যি সেটে ঢুকিয়ে নিয়েছিল। এক দ্বীপে যদি একশজন নারী আর একজন পুরুষ থাকতো, তাহলে কি হতো? কিংবা সেই পুরুষসংগী খেঁকো মাকড়সার গল্প করলো। কিংবা মেয়েটা খুব সিরিয়াস ভংগিতে যখন বলছিল, ওর প্রবল বিশ্বাস ফেমিনিস্ট আন্দোলনের হর্তা কর্তা পুরুষরাই, যেন ওরা নারীদের থেকে সুবিধা লুটতে পারে সমাজ সংসারের চোখ রাঙানি ছাড়াই।

মেয়েটার সব ব্যাপারে একটা ডীপার দ্যান দ্যা সারফেইস চিন্তা ছিল, হঠাৎ হঠাৎ খুব সিরিয়াস হয়ে সেসব নিয়ে বলা শুরু করে। সারা রাত, অনবরত কথা। ও বুদ্ধিমতী মেয়ে, কিন্তু ভীষণ নাইভ। অ্যাডভেঞ্চারাস, কিন্তু ভিতরে ভিতরে খুব ভালনারবল। একটা ব্যাপার নিয়ে লক্ষ কোটি বার ভাবে। মাথা খাঁটিয়ে, যুক্তি খাঁটিয়ে, নিজের বিশ্বাসের চশমা দিয়ে ভাবে। তারপর কি করে? ঠিক ঠিক হৃদয়ের দেখানো পথে চলে। পৃথিবীর সবাই মুভ্যিটা দেখলেও হয়তো আমার মতো আনন্দ পেতো না। আমি যে বরাবর ঘাড়ের উপরের ব্রেইন খাটিয়েও শেষ মেষ 'ব্রেইন অফ দ্যা হার্ট' এর কথা মত চলি!

মেয়েটা ভাবে ও বড় হয়ে গিয়েছে, কিন্তু আসলে ও বড় হয় নি। তাই ভাবনাগুলো এত সাবলীল ভাবে বলে ফেলতে পারে। ওর নাকি মনে হয় ওর ভিতরে একটা নব্বই বছরের বুড়ি বাস করে! মা গো, ঠিক এই কথাটা আমাকে বেশ কয়েকজন বলেছে। আমার চিন্তাধারা আর কথা শুনে নাকি মনে হয় আমার পিচ্চি শরীরের আড়ালে এক বুড়ি থাকে। একটু কাছে আসলেই টের পাওয়া যায়, ওসব চরম ফাঁকিবাজি!

এসথেটিক সেন্সে গোল্লা মার্কা, কাহিনীর কোন লাইন বাইন নাই, সংলাপ আর সংলাপ, মুভ্যি না হয়ে টক শো হতে পারতো, তবু আমার ভালো লেগেছে। অনেক বেশি ভালো লেগেছে। হয়তো আজকাল মুভ্যিগুলো এত বৈচিত্রে ভরা থাকতে চায়, নতুন হতে চায়, ইনোভেটিভ, আর্টিস্টিক আর অরিজিনাল হতে চায়, যে মুভ্যিগুলো আমাদের মৌলিক সত্ত্বা থেকে দূরে সরে গিয়েছে অনেক। ওসব দেখে সার্কাস দেখার আনন্দ পাওয়া গেলেও নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায় না মুভ্যির আনাচে কানাচে।

আরও পাঁচ বছর পরে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে মুভ্যিটা। তখনও কি একই রকম ভালো লাগবে? নাকি ছেলেমানুষী মনে হবে?
৩৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×