ছয় সাত বছরের এক দঙ্গল ছেলে মেয়ে ছিল। চিল্লাচিল্লি চেঁচামেঁচি করে সারাক্ষন বাড়ি মাথায় রাখত। নতুন বিয়ে করা মামা মামীর এত সব গ্যাঞ্জাম ভালো লাগে না। নতুন মামী সুন্দর মুখ করে বসে থাকে, কিছু বলে না। মামা চেহারা কালো করে নাম ওদের নাম দিলেন 'গ্যাঞ্জাম পার্টি'। একটু প্রাইভেসির আশায় দরজা আটকে বসতেই দরজায় দুমাদুম কিল। গ্যাঞ্জাম পার্টি নতুন মামীর সাথে কথা বলতে চায়। কানে কানে। মামা পারলে ঘাড় ধরে বিদায় করেন। ঘাড় ধরে তো আর বিদায় হয় না, কখনও হাতে চকলেট ধরিয়ে দিতে হয়, কখনও আচারের টাকা। মাঝে মাঝে একটা বিকট হুংকার ছাড়তে হয়। তাতেও গ্যাঞ্জাম পার্টি দমে না। মিছিলের ভঙ্গিতে দুই হাত মুঠি করে উপরে তুলে 'গ্যাঞ্জাম পার্টি, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ' বলে মহা শোরগোলে এ ঘর থেকে ও ঘর ছুটে বেড়ায়।
গ্যাঞ্জাম পার্টির সব সদস্যরা বড় হয়ে গিয়েছে, পৃথিবীর এ কোণ ও কোণ চষে বেড়াচ্ছে, শুধু একজন ছাড়া। ও ঠিক সাত বছর বয়সে আটকে আছে। চোদ্দ বছর ধরে ঠিক এক জায়গায় আটকে আছে, গ্রামের এক শান্ত সবুজ কোণে। টলটলে শ্যামলা মুখে মোটা কাঁচের চশমা পড়া মায়া ভরা মুখটা সেই কবে মাটির নিচে চলে গেল, আর দেখা দেখি নেই। কত্ত ঝগড়া করেছি, চার চারটে মাসের বড় আমি, আমাকে তবু 'আপু' ডাকতে চাইত না ছেলেটা! নাম ধরে ডাকত!
কত্ত বড় স্পর্ধা!
মানাতে না পেরে শেষ মেষ কথাই বন্ধ করে দিতাম। সেই ঝগড়াটার আর মিটমাট হলো না। মাটির নিচে লুকিয়ে গেল জেদী ছেলেটা।
পনের বছর আগের কথা।
ঝম ঝম বৃষ্টিতে গ্রামের বাড়িতে উঠোন পিচ্ছিল। বিয়ে বাড়ি ভর্তি মানুষ। ছুটিতে নানুবাড়ি আসা গ্যাঞ্জাম পার্টির সদস্যদের বড় করুণ অবস্থা। এই বৃষ্টিতে শহুরে সবগুলো ছেলেমেয়েকে ঘরের ভিতর থাকার হুকুম জারি করা হয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজার অনুমতি নেই। বারান্দায় বসে বসে কাহাতক আর টিনের চাল থেকে গড়িয়ে পড়া জলের সূতো গোণা যায়! শেষ মেষ না পেরে, সেই জেদী ছেলেটা সব আইনের মাথায় পানি ঢেলে রওনা দিল পূবের ঘরে। ওর 'খুব জরুরি' কি যেন আনা লাগবে। এই যাবে আর আসবে। পা টিপে টিপে যাওয়া শুরু করতেই পা পিছলে চিৎপটাঙ। ধবধবে হালকা নীল গেঞ্জি কালো কাদায় একাকার। বারান্দায় দাঁড়ানো সবাই স্টেডিয়ামের দর্শকের মত হো হো করে হেসে উঠলো।
পিছলে পড়ে ব্যাক সাইডে হালকার উপর পাতলা ব্যাথা, তার উপর সারা গায়ে কাদা, এখন আর চুপি চুপি কাজ সেরে আসা আসি নাই। ওর বাপ দেখলে... তারও উপর একদল দর্শকের হো হো হাসি। বেচারা, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কাঁদবে কিনা ভাবতে বসে গেল। তখনই হলো অভাবনীয় কান্ডটা।
গ্যাঞ্জাম পার্টির একজন সমস্ত নিষেধাজ্ঞা থোড়াই কেয়ার করে লাফিয়ে নেমে গেল উঠোনে, তারপরে ইচ্ছা করেই পা ছড়িয়ে ধপাশ! এতক্ষন বৃষ্টির জন্য বন্দী গ্যাঞ্জাম পার্টির সদস্যদের মধ্যে হেব্বি সাড়া পড়ে গেল! বাকিরাও মুহূর্তেই ছুটে এসে নেমে গেল, উঠোনের উপরের পলি মাটির আস্তরে পা পিছলে সোজা চিৎ! বড়রা খবর পেয়ে বের হয়ে আসতে আসতে একেক জন আগা গোড়া কাদা মেখে ভূত।
আজও বৃষ্টি পড়ছে খুব। বৃষ্টিতে কাউকে ভিজতে দেখলেই আমার সেদিনের কথা মনে হয়। মনে আছে, মা বারান্দায় এসে সব দেখে হতভম্ব। আমরা ততক্ষনে মহা উৎসাহে 'পিছলা পিছলি' খেলছি। প্রতিবার নতুন উদ্দোমে 'ধপাশ'! ব্যাক সাইডের হালকা ব্যাথাকে পাত্তা দেয়া হচ্ছে না। মা বকা দিতে মুখ খুলতেই মধ্যবয়স্ক বড় মামা নেমে গেলেন কাদায়। নিজে একটা পিছলা খেয়ে বারান্দায় দাঁড়ানো মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, 'আয়!'
মা বলে, 'মাথা খারাপ?'
মামা এবার ধমকের সুরে, 'আয় নাম!'
মা হেরে যাওয়া সুরে বলে, 'আচ্ছা, আপনি এইটা কি বলেন? ভালো সেলোয়ার কামিজ পরা তো!'
মামা দ্বিতীয় কথাটা না শুনে হাত ধরে হেচকা টানে উঠোনে নামিয়ে আনলেন ছোট্ট বোনকে। তারপরে, বড়রা, ছোটরা সবাই মিলে সে কি পিছলা পিছলি!
একটু পরে নানু এসে চিল্লানো শুরু করলো, 'এমন করলে উঠোনের মাটি সরে যাবে, উঠোন নষ্ট হয়ে যাবে, ধান কে শুঁকাবে!' কিন্তু কে শুনে বুড়ির কথা! শেষ মেষ হাল ছেড়ে দিয়ে নানু নিজেও মজা দেখতে দাঁড়িয়ে গেলেন!
পিছলা পিছলি উৎসবের পরে কাদা মাখা ভূতেরা সব দল বেঁধে গিয়েছিলাম বাড়ির সামনের সবুজ পুকুরে গোসল করতে। তখনও ঝিম বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির মধ্যে পুকুরের পানিতে নামলে একটা মজা হয়। বৃষ্টির হিম শীতল পানির তুলনায় পুকুরের পানি তখন কুসুম গরম ঠেকে। আর নাক চেপে ধরে পানিতে ডুব দিলে অপার্থিব একটা ঝিমঝিমে শব্দ শোনা যায়। বৃষ্টির ঝিম ঝিম শুনতে শুনতে এখনও, কখনও সখনও সেই শব্দটা শুনতে পাই...
যখন ভাবতে বসি, তখন এতসব মরচে পড়া স্মৃতিকে মনে হয় অন্য কোন জীবনে ঘটে যাওয়া গল্পরাজি!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


