পরীক্ষা শেষের পোস্ট দিয়েছিলাম নভেম্বরের ২২ তারিখে। ছুটি চললো এবার সাড়ে তিন মাস। ১০৯ দিন। বিশাল ছুটি। ইউনি ইয়ার শেষের ছুটি, তাই কোন পড়াশোনা নেই। ছুটি শুরু হওয়ার আগে মনে হয়েছিল... মা গো কি বিশাল ছুটি! অফুরন্ত ছুটি! কখখনও শেষ হবে না! এখন ছুটির এ প্রান্তে এসে আমি নিজেই হতভম্ব। আমার জীবনে আর কয়টা এতটা নিশ্চিন্ত, গায়ে হাওয়া খাওয়ানো ছুটি আসবে জানি না। কেন যেন মনে হচ্ছে, আর কখনও আসবে না। ভীষণ নিশ্চিন্ত এই ছুটিটা কি করে কেটে গেল!
-১০৯ দিনে পোস্ট করেছি ২৫ টা। গড়ে প্রতি চার দিনে একটা পোস্ট।
- বই কিনেছি ১১টা। কতগুলো পড়েছি নাম মনে করতে গিয়ে ছাব্বিশে গিয়ে ঠেকলাম। আরও পড়েছি হয়তো, নাম মনে পড়ছে না। বই হাতে বিছানায় যাওয়ার অভ্যাসটা মরতে বসেছিল। বই পড়তে পড়তে রাত পার করার অভ্যাসটা মরে গিয়েছিল। প্রচন্ড ক্লান্তি নিয়ে বাসায় ফিরে, শাওয়ার করে, টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে বই হাতে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়ার বিলাসিতা ভুলতে বসেছিলাম। সব ফিরে আসল।
- চাকরি শুরু করেলাম। গত সেমিস্টারে একটা চাকরির অভাব খুব বোধ করছিলাম। এপ্লাই করা শুরু করলাম পরীক্ষার মাঝখানেই। এপ্লাই করার পরের দিনই কল পেলাম একটা। কল সেন্টারের চাকরি। ফোন করে করে সবাইকে একটা চ্যারিটি সংগঠনে টাকা দান করার জন্য ত্যাক্ত করতে হবে। এপ্লাই সিরিয়াসলি করি নি, চাকরি পাওয়ার মত কি না যাচাই করতে করেছিলাম। একবার ডাক পরার পরে ভাবলাম, ছুটিতে, খারাপ কি? হাতে কিছু টাকা তো জমবে! কিন্তু কাজ শুরু করতে হবে পরীক্ষার মাঝখানেই। শুরু করে দিলাম। প্রথম দিন চার ঘন্টা থাকার কথা ছিল।
আমি চেয়ারে বসে বসে ফোন করছি, যন্ত্রের মত কথা বলছি, বেশির ভাগ সময়ই আনসারিং মেশিন, ফোন রেখে দিচ্ছি। দু'ঘন্টার মাথায় নিজেকে সত্যিই যন্ত্রের চেয়েও নিকৃষ্ট মনে হচ্ছিল। ঘুমে ঢলে পড়ে যাচ্ছিলাম। এত্ত ভীষণ বিরক্তিকর, আনপ্রডাক্টিভ কাজ মানুষ কি করে করে? আমি আর তিষ্টোতে না পেরে বলেই বসলাম, 'আমি আজ চলে গেলে অনেক অসুবিধা হবে?'
ভদ্রমহিলা কিছুটা বিষ্মিত হলেন, কিন্তু, বললেন,' আচ্ছা যাও। কিন্তু পরের মঙ্গলবার যখন আসবে, তখন কিছু কাগজ পত্র সাইন করে আজকের দু'ঘন্টার টাকা নিয়ে যেও।'
আমি আর ও পথ মাড়াই নি। টাকা নিতেও না।
তবে এর পরে দু'সপ্তাহের মাথাতেই দারুণ একটা কাজ পেয়ে গেলাম। দুই দুই দফায় ইন্টারভিউ হলো। ক্লাস রুমে এইচ এস সি স্টুডেন্টদের কেমিস্ট্রি পড়ানোর কাজ! আমার ভীষণ ভালো লাগার কাজ। সপ্তাহে চার দিন চাকরি করতে করতে ছুটির দিনগুলো বেশ কেটে গেল!
- সেলাই করলাম। ছোটবেলা সেলাই, রান্না এগুলো সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা ছিল না। এগুলো "মেয়েদের" কাজ। আমি "মেয়েদের কাজ" করতে চাইতাম না। মেয়েদের কাজ বলেই সমাজ আমাদের ভাবানো শেখায়, এগুলো কঠিন না মোটেই। 'ব্যপার না'। "মেয়েদের কাজ", ফালতু কাজ, তাই যে কেউ চাইলেই পারে।
অথচ রান্না ধরে বুঝেছি রান্না একটা আর্ট। কেমিস্ট্রি। অভিজ্ঞতা যেখানে ভীষণ প্রয়োজনীয় বিদ্যা। সেলাই ও কি সেরকম হবে? জামা কাপড়ের ব্যাপারে আমার খুব নিজেস্ব রুচি আছে। আমি স্রোতে চলা মানুষ নই, আবার অরুচিশীল কিছু পরেও স্রোতের বিপরীতে যেতে চাই না! নিজেস্ব রুচি অনুযায়ী জামা কাপড় কিনতে হলে প্রচুর সময় লাগে, অনেক দেখাদেখি লাগে, টাকাও লাগে। ভাবলাম, একটু সেলাই করেই দেখি না! শুরু করেছিলাম কামিজ দিয়ে। সব চাইতে সহজ সেলাই নাকি! ৭/৮টা কামিজ, এক খানা স্কার্ট আর দুই দুইটা সামার কোট (যার একটা দেখে কেউ বুঝতে পারছে না উহা বানানো!) বানিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম-- প্রত্যেকের জীবনে অন্তত: একবার হলেও জামা কাপড় সেলাই করার চেষ্টা করা উচিত!!! সেলাই অত্যন্ত জটিল এক খানা বিদ্যা, ইহাতে হিসাব কিতাব (কতখানি কাপড়ে কত কি হইবে? ঠিক কোন কোণে কাপড় কাটিলে কাপড়ের ছাট দেখিতে মনোরম হইবে?), প্ল্যানিঙ (হাতাটা কোথা হতে কাটা যায়? ছোট হইয়া যাইবে না তো?), কল্পনা শক্তি (ইহা সম্পূর্ণ হইলে ঠিক কি রকম হইবে?) আর প্র-চু-র পরিমানে ধৈর্য্য লাগে!!! নতুন সেলাই শিখলে যা হয়, এক বার সেলাই করে দশ বার সেলাই খোলা! ঘন্টার পর ঘন্টা নিবিষ্ট মনে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে নিয়ে এগুনো! কাউকে লক্ষ্য অর্জনে ট্রেনিং দিতে হলে সেলাই দিয়ে শুরু করা যায়!
- রান্না বান্না হয়েছে মোটামোটি। সেমিস্টারের মাঝ খানে মাকে সাহায্য করতে না পারার অপরাধ বোধ থেকে একটু একটু চেষ্টা করেছি পুষিয়ে দিতে। পুষিয়ে কি দেয়া যায়? তবু কিছু করেছি! নিজের উপর অখুশি নই! (বাসায় থাকার সময়টুকুতে পড়াশোনা ছিল না, পুরোদস্তুর গিন্নী হয়ে গিয়েছিলাম)।
- অংকনও চলিয়াছে। বহু, বহু দিন পরে ড্রয়িঙ করতে পেনসিল হাতে নিয়েছি। উপলক্ষ এক খানা ইউনি সামার কোর্স। ও নিয়ে নিয়েছে দুই সপ্তাহ।
- কোর্স করেছি তিনটা। একটা ড্রয়িং কোর্স। একটা বাহ্যিক পবিত্রতার কোর্স , আর আরেকখানা আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি। মাথা পুরোপুরি খালি ছিল না!
- ঘুরা ঘুরি চলেছে অনেক। বাসার সবার সাথে কায়ামাতে দুই দিনের ছোট্ট হলি ডে। মারুবরা বীচ। বন্ধুদের সাথে ওয়াটসন বে, গ্যাপ, বোটানিকেল গার্ডেনে ছোট খান পিকনিক... কারণে অকারণে দেখা করা, ঘুরাঘুরু... সবাই এক সাথে রাতে থাকা হয়েছে অনেক! ছবিটা গত পরশু তোলা। বন্ধুদের সাথে গিয়েছিলাম জায়গাটায়।
এভাবেই কেটে গেল একশত নয় খানা আস্ত দিন!
খুব পরিচিত, প্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরে যাচ্ছি আবার... গত বাঁধা জীবনের শুরুতে... আরও চার মাসের জন্য!
(পরবর্তী ছুটির অপেক্ষায়...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


