কাল রাত আর আজ সকাল মিলিয়ে পড়লাম অমিত আহমেদের 'গন্দম'। একটা রিভিউ লিখব নিজের মত করে। কিন্তু পড়ার পর থেকে মাথায় গিজবিজ করছে ঢাকা, ঢাকার সন্তানেরা। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া অর্ধ ইংলিশ অর্ধ বাংলা বলিয়ে, ইয়াবা খাওয়া, ডিজে-পিলস-মীটসালো পার্টি করা বাংলার সন্তানেরা। ওরা কি বাংলাদেশের ভবিষ্যত?
শিপু আপু দেশ থেকে ফিরার পরে অধীর আগ্রহে দেশের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। ও দেশের বাইরেই বড় হয়েছে। তাই ওর দৃষ্টিকে মোটামোটি একজন বিদেশির দৃষ্টি বলা যায়। ও ৭ বছর পরে দেশে গিয়ে এরকম একটা লিস্ট দিল--
১. ঢাকায় এখন এত্ত গাড়ি! আগে কখনও এত গাড়ি ছিল না!
২. ইশশ এত্ত সুন্দর সুন্দর স্যালওয়ার কামিজ। চারুকলার পাশে একটা নতুন দোকান করসে, ওখানে আর্টকলেজের ছেলেমেয়েরা সব ডিজাইন করে, খুব চীপ। ৭০০ টাকায় অনেক সুন্দর সুন্দর।
৩. ভ্যালেন্টাইন্স ডে'র দিন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে গেলাম। সবাই ফুল টুল নিয়ে অবস্থা শেষ। খালি কাপল আর কাপল।
৪. জ্যাম... জ্যামের কথা আর বলো না। কোথাও যাওয়ার মুডটাই থাকে না।
৫. তাও ভালো সময়ে গেসি। আব্বু দুই বছর আগে গেসে, তখন তো সারা সপ্তাহেই হরতাল। এখানে গাড়ি পুড়ে, ওখানে গাড়ি পুড়ে।
মোটামোটি ঢাকা কেন্দ্রিক আলোচনা।
আমি দেশ থেকে এসেছি সেই ২ বছর আগে। ল্যান্ড করার পরের দিন থেকে আমার ভয়াবহ ডিপ্রেশন শুরু হয়েছিল। ইচ্ছা করছিল ছুটে কোথাও চলে যাই, আমার বাড়ির বাতাস এতটা গুমোট হতে পারে না। তখন চারিদিকে জেএমবি'র বোমাবাজি চলছে। টিভি ছাড়তেই শুনি বোমায় মারা যাওয়া এক লোকের ছোট্ট ছেলে খুব কাঁদতে কাঁদতে বলছে, 'আমার বাবা কোথায়? আমার বাবা কোথায়?'
গ্রামে যাওয়ার পরে দু'টো পরিবর্তন দেখলাম--
দাদুবাড়ি নানুবাড়ি, দুই জায়গারই নদীর তীর ঘেষে বড় বড় ইন্ডাস্ট্রী হচ্ছে। সেই নিয়ে গ্রামের মানুষদের চাপা অসন্তোষ। বাইরে থেকে শ্রমিক এসেছে। ওরা কাজ করে, সারা রাত লাইট জালিয়ে তাস পেটায়। গ্রামের মেয়েরা আগে সন্ধ্যার আগে নদীর দিকে যেত, ঘুরতে। এখন নদীর তীরে পরিবেশ ভালো না। রাতের বেলা কারেন্ট চলে গেলে সবাই মিলে নদীর তীরের রাস্তা ধরে হাঁটতাম। মাথার উপর শুধু এক থালা চাঁদ। চারিদিক নিস্থবদ্ধ। এবার কারেন্ট গেলেও সেরকম সুযোগ আসলো না। জেনারেটরের দুষিত আলো আর কারখানা থেকে চিল্লাচিল্লি।
বাসে চড়ে যেবার যাচ্ছিলাম, সেবার মাঝ পথে গিয়ে বাস আর যাবে না। সামনে ভাংচুড় হচ্ছে। নেমে, অনেক ঝামেলা করে গিয়েছিলাম তবে।
গ্রামে গিয়ে আরেকটা ব্যাপার জেনে হতভম্ব হয়েছিলাম। এখনও সম্পত্তি শুধু ছেলেরাই পায়। শরীয়ার আইন অনুযায়ী সম্পত্তি ভাগ হলেও মেয়েরা বাবার বাড়ির সব সম্পত্তির দাবী ছেড়ে দিবে, সেটাই সবাই আশা করে। বাপের বাড়ি থেকে সম্পত্তি নিল তো সে মেয়ে বাপের বাড়ির সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দিয়ে এলো। কি উদ্ভট! 'কোন দাবি নেই' বলার পরেও মেয়ের জামাইয়ের কাছে মুখ রক্ষার জন্য ঘর বোঝাই করে ফার্নিচার দিতে হয়।
বড় হচ্ছি আমি, সাথে সাথে আমার চেনা বাংলাদেশ বদলে যাচ্ছে। যখন ব্লগ পড়ি, পত্রিকা পড়ি, বড় আলোচনা পড়ি, তখন মাঝে মাঝে মনে হয় বোধ হয় বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক, মানসিক আর সামাজিক মুক্তির আর দেরি নেই মোটেই।
কিন্তু পরক্ষনেই এমন কিছু দেখি, যার জন্য দুম করে মন খারাপ হয়ে যায়। এই আমার বাংলাদেশ?
স্বাধীনতা দিবসের আড্ডা পোস্টে আপনাকে আমন্ত্রন জানাচ্ছি। বাংলাদেশ নিয়ে আপনার বিচ্ছিন্ন কিংবা একীভূত আশা আকাঙ্খা, ভালোবাসা, নিরব কান্না, স্বপ্ন, উদ্বেগ, সংগ্রাম, সব কিছু নিয়ে আড্ডায় আসুন। জানান আমাদের। স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীন বাংলাদেশের গর্বিত প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর প্রতিটা প্রান্ত থেকে এক আড্ডায় এক করি আমাদের কণ্ঠস্বর।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মার্চ, ২০০৮ সকাল ১০:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


