তীব্র শূন্যতা কাটাতে কখনও সখনও গভীর রাতে স্কেচ প্যাড খুলে বসি। তারপর, চারিদিকে নি:স্তবদ্ধতা। সাদা কাগজ ফ্যাকাশে মুখে তাকিয়ে থাকে। পেনসিলটা আমার হাত থেকে কাগজে দৌঁড়াতে শুরু করে না আর। পাতা উল্টে মাস কয়েক আগের আঁকা ফুল দেখি, পাতা দেখি। অ্যালবাম নামিয়ে সেই সোনা মাখা বিকেল দেখি। মোমবাতি জ্বালিয়ে মিষ্টি আলোয় থম মেরে বসে থাকি। আমার স্কেচ প্যাডের গালে তবু রং লাগে না। শেষ মেষ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘুমোতে চলে যাই।
টুমুকে চিঠিটা পাঠালাম অবশেষে। কত বছর পরে, দুই বছর? মেইল করে প্রাপ্তিসংবাদ দিল, খুব খুশী হয়েছে ও। অথচ, নিজেকে দিয়ে কি জোর করে লিখালাম চিঠিটা। রাশাটাও ম্যাসেজ করলো সেদিন, ওর করা এই প্রথম এসএমএস। আমার সংক্ষিপ্ত উত্তরের পর আরও একটা ম্যাসেজ করলো। ওটার জবাব দেয়া হয় নি। এই মেয়েটার সাথেই আগে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতাম? মানব জন্মরহস্য নিয়ে গম্ভীর মুখে জটিল সব আলোচনা করতাম? কখনও নিচের ড্রয়ার খুললে নীল মলাটের চিঠির ডায়রীটা আলগোছে হাতে নিয়ে চমকে উঠি। ঠিক কত ঘন্টা, কত মিনিটে চিঠি পেয়েছি, চিঠি পেয়ে ঠিক কি মনে হয়েছিল, সব সেখানে লেখা। কি প্রচন্ড উৎসাহে চিঠি লেখতাম, চিঠি পড়তাম তখন! এখন পুরানো চিঠি পড়তে গিয়ে ক্লান্ত লাগে। কিসব ছেলেমানুষী!
নিচের ড্রয়ার খুলে সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে দেই আরও কত কারণে। ও যে আমার কবরখানা। অপরিনত স্বপ্নগুলোকে ওখানে ছুঁড়ে ফেলি। এতিম মেয়েটাকে বুকে নিতে চেয়েছিলাম কত আগে? ভাবতে গেলে ধূলো পড়া স্বপ্নটা এত ফ্যাকাশে লাগে যে মনে হয় যুগ যুগ আগের স্বপ্ন। কিন্তু আসলে সময়টা বছর খানেক আগের। টিনের বাক্সটায় টুক টুক করে টাকা জমালাম। মাঝে মাঝেই তামাটে পয়সাগুলো গুণে দেখতাম, বুক ধরে ধাতালো গন্ধ শুনতাম। আমার মেয়ের হাসি কেনার টাকা জমেছে তো?
কয়েকদিন বিপুল উৎসাহে মেয়ে খুঁজলাম, আমার সোনার দেশের শ্যামল মেয়ে। উৎসাহ মরতে সময় লাগে নি। বাংলাদেশ থেকে আমাকে মেয়ে দিবে, কিন্তু বাপমা মরা শুকনো মুখের মেয়ে থেকে চুরি করে খাবে না, এমন কাউকে খুঁজে পেলাম না। 'স্যরি আমরা এ বছরই একটা প্রজেক্ট করছি', 'ওহো, তুমি চাইলে ইন্দোনেশিয়ায় স্পন্সর করতে পারো, কিংবা আফ্রিকা' শুনতে শুনতে বিরক্তি ধরে গেল। ভাগ্যিশ সিডর এসেছিল একদম সময় করে। ভার হয়ে থাকা মেয়ে চিন্তা ওখানে ঢেলে দিয়ে দায়মুক্ত হলাম যেন... ব্যর্থ অপরিনত স্বপ্নটাকে তাড়াতাড়ি চালান দিলাম নিচের ড্রয়ারে। এখনও নিচের ড্রয়ার খুললেই না পাওয়া মেয়েটার অভিমানী অশ্রু দেখতে পাই... 'তুমি আমাকে খুঁজে পেলে না কেন?'
তাড়াতাড়ি ড্রয়ার বন্ধ করে স্বস্তি পাই। না দেখে থাকার চেষ্টা করি তিওমানের টাকাগুলো।
ইয়াহু, গুগল, এমএসএনের দেয়াল চুঁইয়ে তীব্র হতাশারা আসে দলবেঁধে। দেশ থেকে গরমে সিদ্ধ, অভুক্ত, তিক্ত কণ্ঠগুলো শুনি কি শুনি না। ফিলিস্তিনের রক্তাক্ত সাংবাদিকের অন্ধকার হয়ে যাওয়া ভিডিও ক্লীপ দেখে মনে হয় হলিউডের কোন ছায়াছবির একাংশ। এর চেয়ে কত দুধর্ষ ঘটনা হয় হলিউডে! এ আর তেমন কি! ইসারইলী প্রধানমন্ত্রী যখন মৃত সাংবাদিককে ইনিয়ে বিনিয়ে সোজা বাংলায় 'তুই মরেছিস নিজের দোষে' বলে, তখনও আমার চেহারায় কোন ভাবান্তর হয় না। এই লোকটার মত কজ এন্ড এফেক্টের হিসাব শিখতে পারলে নিচের ড্রয়ার খুলে ওমন লাগবে না। অভিমানী মেয়েটাকে বলতে পারবো, চুপ বেয়াদব মেয়ে, তুই আমাকে খুঁজে পাস নি তাই বল!
অসির চেয়ে মসির জোর বেশি--কি বোকা দিনগুলোতে বোকা তত্ত্বটায় বিশ্বাস করতাম! পেশীতে জোর না থাকলে কি, কীবোর্ড তো আছে! খুব যত্ন করে চরিত্রগুলো সাজালাম। কিন্তু ধুর ছাই, আমি লিখতে গেলেই ছেলেগুলো মিহি গলায় ন্যাকা ন্যাকা কথা বলে! আচ্ছা, ছেলেরা খুব রেগে থাকলে কিভাবে কথা বলে? খুব ভালোবাসায়? অনেক কষ্টে? আমি জানি না! লিখতে হলে আমাকে যে নিজের ভিতরে শুনতে হবে, দেখতে হবে সব! তাই চরিত্রগুলোও ড্রয়ারবন্দী হয়ে গেল অনির্দিষ্টকালের জন্য।
লেখাটা খুব অগোছালো হয়ে গেল। কারণ, মাথায় গিজগিজে চিন্তা আর বুকে থম হয়ে থাকা অনুভূতির মূল কারণকেই কীবোর্ডে নামানো হলো না। অপরিনত স্বপ্নগুলো নিয়েই লিখলাম, নতুনের হাতছানি চুপ করে বসে রইল আমার ভিতরেই। কত্তদিন ধরে লিখতে ইচ্ছা করে.. কিন্তু রক্তে সাঁতার কাটা গ্লুকোকরটিকয়েড লিখতে দেয় না কিচ্ছু। খুব করে যা চাই, তা সামনে এসে দাঁড়ানোর সম্ভবনায় আমি এরকম ম্রিয়মান হয়ে যাই কেন?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

