রায়হানাকে প্রথম দিন দেখেই পছন্দ হয়েছিল আহসানের। দুইজনকে আলাদা কথা বলার সুযোগ দিয়েছিল রায়হানার বাবা মিজান সাহেব। আহসান কানাডায় থাকে। আইটিতে পিএইচডি করছে। দেশে এসেছে এক মাসের ছুটিতে। এসেই দেখে বাবা মায়ের মেয়ে দেখার ধুম। রায়হানা ওর তৃতীয় পাত্রী দেখা। মেয়ে দেখতে দেখতে ও বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলো। রায়হানা মেয়েটার চেহারায় এত সরল সৌন্দর্য আছে, যে প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে গেল আহসার আর ওর পরিবারের সবার। তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনমিক্সে মাস্টার্স মেয়ে। প্রোফাইল খুব হালকা না মোটেই।
আহসানের চেহারায় দীর্ঘ প্রবাসবাসের আত্মবিশ্বাস। মিজান সাহেব এমনিতেই খুব সহজেই মানুষকে আপন ভাবা শুরু করে দেন। আহসানের সামনে মাথা নিচু করে থাকা রায়হানাকে, আর সেদিকে চোরা দৃষ্টিতে তাকানো আহসানকে দেখে মিজান সাহেবের চোখে পানি এসে পড়লো। আহা, এত লক্ষী মেয়েটার জন্য এমন রাজপুত্রই দরকার ছিল!
বিয়ের কথা বার্তা শুরু হতে মিজান সাহেবের আরেকবার চোখে পানি আসার পালা। মিজান সাহেব বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন ২ লাখ টাকা দেন মোহরে, আহসানের বাবা জিল্লুর সাহেব নিজে থেকেই ১০ লাখ টাকা দেন মোহর সেধে বসলেন। নাহ, এত বড় দিল যাদের, সে সংসারে মেয়েটা সুখেই থাকবে।
তারপর, বিয়ের দিন। কাজী সাহেব একে একে তিনবার জিজ্ঞাসা করলেন,
'ঢাকা জেলার বনানী থানার স্থায়ী নিবাসী মোহাম্মদ আহসানুল করিম, পিতা জনাব মোহাম্মদ মিজানুল করিম, ঢাকা জেলার রমনা থানার স্থায়ী নিবাসী মোহাম্মদ আবদুল হক সাহেবের কন্যা রায়হানা হককে ১০ লাখ টাকা দেন মোহরে, ২ লাখ টাকা উসুলে বিবাহ করিতে চান। আপনি কি রাজি?'
অনেক কান্নাকাটি চললো। তারপর রায়হানা ছোট্ট একটা কবুল বললো। চারিদিকে আলহামদুলিল্লাহ রবের বন্যা বয়ে গেল। কাজি সাহেব আর সাক্ষীরা চলে যেতে আহসানের মা এসে একে একে রায়হানার গলায়, কানে, হাতে, নাকে, মাথায় নানা সাইজের, নানা বাহারের গয়না পড়িয়ে দিয়ে গেলেন। একটু পরে খালা, চাচী, মামী, বান্ধবীদেরা এসে গলার শীতাহার, কানের ঝুলানো দুল, নাকের নোলক, কপালের টিকলি, হাতের চুড়ি আর আংগুলের আংটি এক এক করে ধরে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো, 'এটা কে দিয়েছে? আর এটা?' 'বাহ এই সেটটা দারুণ তো, এটা কোত্থেকে?'
রায়হানা ঈষৎ লাজুক হাসি হেসে বলছিলো, 'এটা শ্বশুর বাড়ি থেকে দেয়া... এটাও... হ্যা, এইটাও।'
রায়হানার পাশে উদ্ভাসিত হাসিতে রায়হানার মা। অবশেষে বড় ঘরে মেয়েকে রাণীর সাজে দিতে পেরে মনে হচ্ছে, নাহ, এই মেয়েটা রাণী হতেই এসেছিল পৃথিবীতে। সবাই রায়হানার শ্বশুর বাড়ির উদারতা নিয়ে বিপুল প্রশংসা করতে লাগলো। রায়হানার সৌভাগ্য নিয়েও অনেক মন্তব্য রচিত হলো। মনে মনে রায়হানা ভীষণ গর্বিত বোধ করলো।
সেদিনের পরে আর কখনও রায়হানা দেনমোহর শব্দটুকু শুনে নি। আর সারা জীবন ভেবে এসেছে ওই ২ লাখ টাকার গয়নাগুলো শ্বশুরবাড়ির দয়ার দান।
মেয়েটাকে কেউ বলে দেয় নি, ওই ২ লাখ টাকা দিয়ে ওর শ্বশুর বাড়ির লোকেরা সুনাম কিনেছিল। আর রায়হানার মোহরানার পুরা ১০ লাখই অনাদায় রয়ে গেছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

