somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... কুড়িয়ে নেয়ার সময়
একটা কাজের জন্য যখন বহুগুণ প্রতিদান পাওয়া যায়, আবশ্যিক কাজের জন্য সত্তর গুণ প্রতিদান, ঐচ্ছিক কাজের জন্য আবশ্যিক কাজের প্রতিদান, তখন "কুড়িয়ে" নেয়ার সময়ই বটে!

রোজার প্রস্তুতি হিসেবেই শোনা শুরু করেছিলাম নোমান আলির কথাগুলো শুনতে শুনতে নিজের ভিতর "কুড়িয়ে" নেয়ার তীব্র ইচ্ছা হলো, মনে হলো কত কি মিস হয়ে যাচ্ছে... বলছিলেন নোমান আলি সূরা বাকারায় (১) আল্লাহ স্বামী স্ত্রীকে একে অপরের পরিচ্ছেদ বলেছেন। বাক্যাংশটা বহু শুনেছি, যখনই ইসলামে বিয়ের মূল্য নিয়ে পড়ি বা শুনি, এই বাক্যাংশটা থাকেই। কিন্তু কখনও কোথাও পড়ি নি যে এই বাক্যাংশটা আসলে রোজার আয়াতের একটা অংশ! বলছিলেন নোমান আলি, রোজার আয়াতেরই অংশ, কারণ রমজানে "কুড়িয়ে" নেয়াতে সাহায্য করবে স্বামী স্ত্রী, একে অপরকে, পরিচ্ছেদ হয়ে "বাঁচিয়ে" দিবে।

শুধু স্বামী স্ত্রীই না আসলে, ইদানিং খুব মনে হয়, খুব কাছের বন্ধুদের তো তাই করা উচিত... বাঙালী মায়েরা ছেলেমেয়েদের মুখে একটা দানা বেশি পুরতে পারলে কি খুশি হয়, সন্তানদের ছোটখাট শখ পূরণ না করতে পারলে কি অপরাধবোধে ভোগেন। কিন্তু এরচেয়েও বেশি যেটা দরকার, খুব বেশিই দরকার, সেই প্রয়োজনটুকু মিটাতে মায়েদের, বা প্রিয় মানুষদের সেরকম আকুলতা নেই।

অথচ ওই যে, তারাবীর নামাজ পড়া শুরু করলে প্রথম প্রথম জোশ থাকে খুব, তারপরে আট রাকাত পার হতেই সব গোলমেলে মনে হতে থাকে, সালাম ফিরাতেই জিজ্ঞাসা করতে হয়, কত রাকাত হলো? কিংবা ক্লাসে অথবা চাকরিতে গিয়ে ঘুমে ঢুলে পড়তে হয়, সারাক্ষন বড় ক্লান্ত লাগে, সবার করুনা পাওয়া নিজের অধিকার মনে হয়, অথচ, রোজা ফরজ করেই আল্লাহ বলছেন এভাবে আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারতেও পারি (২), আর আল্লাহ আমাদের জন্য কোন কষ্ট চান না (৩)! এটা কষ্ট না? এটাই বুঝি তাকওয়া!

বুঝালেন নোমান আলি, আমাদের শরীরি অস্তিত্বকে শুধু উপবাস করালেই হয় না, শরীরের ভিতরেও যে অস্তিত্ব, যা আমাদের পশু থেকে আলাদা করে, উন্নত করে, লিম্বিক সিস্টেমের উর্ধ্বে উঠার সুযোগ দেয়, সেই অস্তিত্বেরও প্রয়োজন আছে, তাকে খাওয়াতে হয়। আর তার খাবার হচ্ছে কুরআন।

সে জন্য কুরআনের মাসে কুরআন পড়তে হবে, বুঝতে হবে। সময় নিতে হবে, ভাবতে হবে... কিন্তু রোজার দিনগুলোতে নয়টা পাঁচটা কাজ করে এসে, ইফতার করে, তারাবী পড়ে, খুব কম ঘুমিয়ে, আসলে এই জিনিসটাই হয় না, "ভাবা"।

কুরআন পড়তে গেলে মনে হয়, কিন্তু এই ধরণেরই কি যেন পড়লাম না গত সপ্তাহে? গতানুগতিকতা চলে আসা মানেই তো বিরক্তি।

নোমান আলির কথায় যখন কুরআনের তিরিশ পারার ব্যাখ্যা শোনা শুরু করলাম পিএইচডির কাজ করতে করতে, ভেবেছিলাম, সেই তো একই কথা হবে, ব্যাকগ্রাউন্ডে শুনতে থাকি, নিজের কাজও করতে পারব। কিসের কি, কিছুক্ষন পরে পূর্ণ মনযোগ দিতে বাধ্য হলাম! নোমান আলি যখন ব্যাখ্যা করেন শব্দমূল সহ, তাঁর আরবি সাহিত্যের সুগভীর জ্ঞান দিয়ে বুঝিয়ে দেন, কাছাকাছি আরও অনেক শব্দ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ ঠিক কেন এই শব্দটাই ব্যবহার করেছেন, কিভাবে আর দশ সূরা আগের তিন নাম্বার আয়াতের থেকে এই আয়াতটা পুরাপুরি আলাদা, তখন হঠাৎ বুঝতে পারি নতুন করে, কুরআনের পাতায় পাতায় কত গল্প। এ পর্যন্ত নোমান আলি তিরিশ পারার পুরাটুকুই আর সূরা বাকারার অর্ধেকের কিছু বেশি ব্যাখ্যা করেছেন, আসলেই উপভোগ্য, রম্য-অর্থে না, নিজের জানাকে ভীষণ ভাবে চ্যালেঞ্জ করে সেই অর্থে।

ইয়াহিয়া ইবরাহীম আমার ভীষণ প্রিয় আরেকজন ব্যক্তিত্ব। মিশরীয় পরিবারের, কানাডায় বড় হওয়া, অস্ট্রেলিয়ায় বিয়ে করে আপাতত সেখানেই থাকছেন। ভাষাগত বিশেষ মেধা থাকবে বলেই হয়তো, একটা আয়াত বলেই এত সুন্দর সব শব্দ দিয়ে মুখে মুখে সেটার অনুবাদ করেন, যে ভীষণ মুদ্ধ না হয়ে পারি না। এক একজন মানুষের আন্তরিকতা ভীষণ ছুঁয়ে যায়। কথাগুলো যে শুধু থিওরী না, নিজের জীবনে পুরাপুরি বাস্তবতা, সেটা বুঝা যায়। কানাডায় আসার আগে যখন উদ্ভ্রান্ত হয়ে থাকার জায়গা খুঁজছি তখন ইয়াহিয়া ইবরাহিমের মত ভীষণ ব্যস্ত মানুষটাও, অজানা অচেনা আমার সামান্য ইমেইলে সাড়া দিয়ে সাহায্য করার অনেক চেষ্টা করলেন।

কিছুদিন আগে যখন ইয়াহিয়া ইবরাহীমের রোজা নিয়ে বক্তব্যটা পেলাম, খুব ভালো লাগল।

আর সবশেষ গত বছরের মত এবারেও মিফরাহর কল্যাণ ছড়িয়ে দেই, মিফরার দেয়া একটা লিংক, যারা উপকার নিতে চান, তারা অনেক উপকার নিতে পারবেন এখান থেকে।

শেষ করছি ২০১০ সালে রমজানের আগে লেখা "বছরের সেরা সময়গুলো আসছে আবারও... " এর লিংক দিয়ে। কে জানে, কে কোথা থেকে কি কুড়িয়ে নিতে পারে নিজের ঝোলায়?


-------
১. সূরা বাকারা: ১৮৭
২. সূরা বাকারা: ১৮৩
৩. সূরা বাকারা: ১৮৫]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29423065 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29423065 2011-07-31 04:21:07
হৃদয়ের মাথা অথবা মাথার হৃদয় - ১

ইউনিভার্সিটি শুরুর সময়টা আমার খুব খারাপ যাচ্ছিল। নিজের ব্যক্তিগত জীবনে নানা টানাপোড়নে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি নি। হুট করেই ঢুকে পড়েছিলাম একটা ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টে। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং টাইপের মেয়ে না। ওই একটা বছর আমার জঘন্য কেটেছে! রেজাল্ট খারাপ করেছি তো করেছিই (খারাপ মানে, ভীষওওওন খারাপ, ফেলও করেছি <img src=" style="border:0;" />(), এখনও পর্যন্ত কম্পিউটার ল্যাবগুলোর পাশ দিয়ে যেতে নিলে শিউরে উঠে, ওই কম্পিউটার ল্যাবগুলো ভীষণ অপছন্দ করি, ওখানকার গন্ধ অপছন্দ করি, ওখানকার রং অপছন্দ করি, বাতাস সহ্য করতে পারি না!

বুঝেছিলাম পালাতে হবে। কারণ আমি কিছু পছন্দ না করলে সেখানে আমি টিকতে পারি না। ইউনিভার্সিটির সাবজেক্ট লিস্টে দেখলাম 'নিউরোসাইন্স', তখন সেটাতেই অ্যাপ্লাই করে দিলাম। সাইকোলজিতে আমার বরাবর খুব আগ্রহ ছিল। আগ্রহের শুরু কবে, একেবারেই মনে নেই। মিসির আলী পড়তে পড়তে সেই আগ্রহ বাড়ত। কিন্তু মিসির আলী পড়ে মনে শান্তি আসতো না। কেমন একটা ভয় ভয় ভাবে ভরে যেত ভিতরটা। সব কিছুতেই বড় 'রহস্য'! অনেক বেশি দীর্ঘশ্বাস আর অসহায়ত্ব! মানুষের মন বড় 'রহস্যময়', রোগগুলো বড় 'রহস্যময়'! আমার এত রহস্য টহস্য ভালো লাগে না, কারণ জানতে আর বুঝতে ইচ্ছা করে। মানুষের শুধু শুধু একটা রোগ হবে, উল্টা পাল্টা কাজ কর্ম করবে, তার কোন কারণ থাকবে না?!

নিউরো+সাইন্স, রহস্যকে শুধু রহস্য বলে ফেলে না রেখে যেখানে রহস্যের সমাধানের চেষ্টা করা হয়। তিন বছর পড়লাম নিউরোসাইন্স। আমার জীবনের দারুণ তিনটা বছর। নিউরোসাইন্স অনেকগুলো ডিসিপ্লীনের সমন্বয়। একদিকে সাইকোলজি পড়ানো হচ্ছে, মাথার বিভিন্ন থিওরেটিক্যাল ফিলোসফি, অন্যদিকে অ্যানাটমি, যেখানে সব কিছু 'চোখে' দেখা যায়, একটা অসুস্থ মস্তিষ্ক আর সুস্থ মস্তিষ্কের পার্থক্য যেখানে স্পষ্ট। আবার ফিজিউলজি কিংবা ফার্মোকলজি, যেখানে শেখা যায় কি করে একটা ওষুধের মাধ্যমে মাথার নিয়ন্ত্রন বদলে দেয়া যায়! অনেকে, এমনকি ডাক্তাররাও যখন শুনতো নিউরোসাইন্স পড়ছি তখন খুব ঘাবড়ে যেত, এত কঠিন সাবজেক্ট পড়ছি! আমার কঠিন লাগতো না, কারণ আগ্রহ ছিল প্রচুর! আমি শুধু ক্লাসের পড়া পড়তাম না, নিউরোসাইন্সে নোবেল বিজয়ী এরিক ক্যান্ডেলের বই থেকে শুরু করে নিউরোসাইন্স নিয়ে লেখা নানারকম আধা-ফিকশন, নন-ফিকশন পড়তাম প্রায়েই। কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা সারা জীবন ফার্স্ট হয়ে এসেছে। এরকম একজনের সাথে নিজে ঘর করি তাই যন্ত্রনাটা পুরাপুরি বুঝি…... ওরা বুঝতেই পারে না আমি কি করে ফার্স্ট ইয়ারের ফার্স্ট সেমিস্টারে অর্ধেক সাবজেক্টে ফেল করে আবার গ্র্যাজুয়েশনের সময় নিউরোসাইন্সের মত কঠিন সাবজেএক্টে এমন রেজাল্ট করলাম। কি করে বুঝাই পার্থক্য একটাই--নিউরোসাইন্স!

অনার্স থেকে রিসার্চ শুরু করলাম। রিসার্চ মানেই একটা ছোট ব্যাপার নিয়ে অনেক বড় করে ভাবা, গভীরে গিয়ে পড়াশোনা করা। মাস্টার্স করি নি, রেজাল্টের জন্য মাস্টার্স টপকে একবারে পিএইচডির সুযোগ পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু এখন পিএইচডি করতে করতে মাঝে মাঝে আন্ডারগ্র্যাড খুব মিস করি। পিএইচডিতে আমাকে ছোট ছোট সব সূক্ষ্ম ব্যাপার স্যাপার নিয়ে ভাবতে হয়, আন্ডারগ্র্যাডে যেমন পুরা মাথাটা নিয়ে ভাবার সুযোগ পেতাম, সেরকম সুযোগ এখন কম আসে। তাই ভাবছি লিখে ফেলি যা জানি তা। মাঝে মাঝে পড়তে নিলে আন্ডারগ্র্যাডের সময়টুকুর কথা ভেবে খুব ভালো লাগবে!

নিউরোসাইন্সের মূল অ্যাপ্রোচ হচ্ছে, আমাদের ব্যবহার আর জ্ঞানের যে কোন পরিবর্তনের অর্থই হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্ক বদলে গিয়েছে!

এটা যখন প্রথম আমার ভিতরে ঢুকেছে, তখন শিহরিত হয়েছিলাম খুব! আমরা যে কোন নতুন জিনিস শিখলেই আমাদের ব্রেইন বদলে যায়! যে কোন নতুন জিনিস!

প্রতিটা নতুন বই, প্রতিটা নতুন গান, প্রতিটা নতুন মুভ্যি, এমনকি আমার জীবনে আসা প্রত্যেকটা মানুষ আমার মাথায় "শারিরীক", "বাস্তব" পরিবর্তন ঘটিয়েছে! এটা কি অদ্ভূত একটা উপলব্ধি না? এক একজন ব্লগার, আপনাকে না ছুঁয়ে, না দেখেও আপনার একেবারে খুলির ভিতর ঢুকে শারিরীক পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়ে আসতে পারে?!

আমাদের প্রতিটা নতুন অভিজ্ঞতার ফলে আমাদের ব্রেইনে দুই ধরনের পরিবর্তন হতে পারে। একটা হচ্ছে, ব্রেইনে যেই 'কানেকশন' আছে, সেটা বদলে যাওয়া, অথবা, নতুন কোন 'কানেকশন' স্থাপিত হওয়া। কানেকশন বলতে এক বা একাধিক ব্রেইন সেলের মধ্যে সংযোগ বুঝাচ্ছি। ছবিতে ব্রেইনের কিছু 'কানেকশন'।



ধরুন আমাদের মাথা একটা পার্কের মত। পার্ক ভরা সবুজ ঘাস। আপনি যখন প্রথমবার সেই সবুজ পার্কের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় যাবেন, তখন সেখানে কিছু ঘাস দুমড়ে মুচড়ে যাবে। এরপর যদি কয়েক দিন যেখান দিয়ে আর না যান, তাহলে ঘাসগুলো আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবে। কিন্তু এরপর প্রতিদিন সেই পথ দিয়ে হেঁটে দেখুন, আস্তে আস্তে পথটা স্পষ্ট হতে থাকবে এবং স্থায়ী হয়ে যাবে। প্রথমবার যদি পায়ে না হেঁটে মটরসাইকেল চালিয়ে যান, তাহলে সেই রাস্তাটা মোটামোটি স্থায়ী হয়ে যাবে! তাই অভিজ্ঞতাটা আসলে কি রকম, সেটার উপর নির্ভর করে কানেকশনটা কিরকম হবে।

আপনি ফেইসবুকে কারো নাম একবার দেখলেন, আপনার মাথায় একটা সেলের সাথে আরেকটা সেল কানেক্ট হবে। সাথে সাথেই খেয়াল করলেন সেই মানুষটা আপনার স্কুলের কোন বান্ধবীর কন্টাক্ট লিস্টে আছে, আপনার মাথায় আরেকটা কানেকশন স্থাপিত হবে। খেয়াল করলেন সেই মানুষটা আপনার পুরানো প্রেমিকার লিস্টে আছে! এবার হয়তো দশটা নতুন কথা মনে হয়ে যাবে, এবং দশটা কানেকশন স্থাপিত হবে! হালকা ভাবে দেখে গেলে যেখানে মানুষটার কথা মনে থাকতো না, এতগুলো কানেকশনের জন্য তাই আপনার মানুষটার কথা মনে থেকে যাবে।

যারা বিভিন্ন রকমের 'এডিকশনে' ভুগে, সেটা মদ হোক, ড্রাগ হোক, পর্ণ হোক, সিগারেট হোক, কিংবা দেবদাস টাইপের কোন স্যাডিস্টিক ভালোবাসা হোক, তৃতীয় পক্ষ হিসেবে নেশাগুলো দেখতে আমাদের খুব আজে বাজে ফালতু লাগে। মনে হয়, মনের জোর নেই কেন, সেটা থেকে উঠে আসতে পারছে না! কিন্তু আসল কারণ, তাদের মাথার ভিতর। এডিকশন একদিনে হয় না। প্রথমবার কেউ মদ খেলে, ড্রাগ নিলে বা পর্ণ দেখলে হালকা কানেকশন হয়, কিন্তু আস্তে আস্তে মদ, ড্রাগ, পর্ণ পর্যন্ত কানেশনকনটা গাঢ় হতে হতে একসময় হাইওয়ের মত হয়ে যায়! তখন মানুষ চেষ্টা করলেই সহজে উঠে আসতে পারে না। নিজের তৈরি করা সেই হাইওয়ের কাছে নিজেই খুব অসহায় হয়ে যায়! সেই হাইওয়ে ঢেকে ফেলার জন্য বা বদলে ফেলার জন্য দরকার সুদীর্ঘ দিনের অধ্যাবস্যায়। 'আনলার্নিং' জিনিসটা আসলেই কঠিন!

এটা পড়ার সময় আমার সব সময় মনে পড়তো সেই বাবা আর সন্তানের গল্প। ছেলেটার খুব রাগ ছিল, রাগ উঠলে মাথা ঠিক থাকতো না। বাবার কাছে যখন রাগ সমস্যা নিয়ে গেল, তখন তিনি একটা কাঠের টুকরো, কিছু পেরেক আর একটা হাতুড়ি দিয়ে বলেছিলেন, যখন প্রতিবার রাগ হবে, তখন অন্য কোন ভাবে রাগ প্রকাশ না করে কাঠের টুকরাটায় একটা করে পেরেক মারবে। ছেলেটা সূদীর্ঘ এক মাস কাঠের টুকরাটায় পেরেক মেরে গেল রাগ হতেই। কাঠের টুকরাটায় আর কোন জায়গা খালি ছিল না। পরের মাসে বাবা বললেন, প্রতিবার রাগ হলে একটা করে পেরেক তুলবে। ছেলে তাই করে গেল। মাস শেষে যখন বাবার কাছে আসলো, তখন বাবা বললেন, 'দেখো কাঠের টুকরাটা কি সুন্দর ছিল! তুমি প্রতিবার রাগ করেছো, আর এখানে পেরেক গেঁথে একটা করে ফুঁটা করেছো প্রথম মাসে। দ্বিতীয় মাসে তুমি শুধু পেরেক তুলেছো। তুমি যদি তখনও পেরেক গাঁথতে তাহলে এরকম আরও অনেক ফুঁটা তৈরি হতো।' গল্পের সারাংশে বলা ছিল, প্রতিবার রাগ করলে আমাদের হৃদয়ে সেরকম ফুঁটা তৈরি হয়!

ব্রেইন সম্পর্কে পড়ে বুঝলাম, এই পৌরনিক 'হৃদয়' আসলে মাথার ভিতর, আমাদের প্রতিটা ব্যবহারের ফলে মাথায় আসলেই বাস্তব পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তনগুলোর অনেকটুকুই হয়তো আমরা চাই না, ধুঁয়ে মুছে পরিবর্তন করে ফেলতে পারলে বাঁচি, কিন্তু আমরা যদি আমাদের ব্যবহার, উঠা বসার মানুষ, পড়ার বই, শোনার গান, দেখার মুভ্যি, ভাবার চিন্তা, অর্থ্যাৎ আমাদের আস্ত পরিবেশই পরিবর্তন করতে না পারি, তাহলে আমাদের ব্রেইনে আমাদের অনাকাংখিত পরিবর্তনগুলোই ঘটতে থাকবে অনবরত!


(চালানোর ইচ্ছা আছে...)


ছবি সূত্র ১


ছবি সূত্র ২
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29245378 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29245378 2010-09-26 06:34:52
মেয়ে হওয়া, মা হওয়া এপ্রিলের শুরু

আমার রিসেপশনে যে রিমা আসতে পারবে না ভাবি নি একদম। ওর মত হাসিখুশী, নাচুনে বুড়ি, যে ঢোলের বাড়ি হওয়ার আগেই নাচতে নেমে যায়, সে রকম মানুষ আমি কমই দেখেছি! ওর বিয়ে হয়েছে আমার বিয়ের কয়েক মাস আগে। বিয়ের আগে এখানে শুধু মেয়েদের একটা অনুষ্ঠান হয়, যেটাকে বলা হয় হেনস নাইট। হেনস নাইটে কনে সব মেয়েদের সাথে যতটা পারে মজা করে নেয়, হাজার হোক বিয়ের পরেই শুরু হবে বন্দী দশা!!!<img src=" style="border:0;" /><img src=" style="border:0;" /> রিমার হেনস নাইটে যাওয়ার জন্য যখন তৈরি হচ্ছি, তখন রিমার ফোন--আমি যেন ওর জন্য একটা সুন্দর শাড়ি নিয়ে যাই। লেবানিজ মেয়ে শাড়ি দিয়ে কি করবে? না বুঝলেও নিয়ে নিলাম!

গিয়ে বুঝলাম আসল ঘটনা বড়ই জটিল! সেদিন রিমা আটটা ভিন্ন গানের সাথে নাচল। প্রতিটা গানের সাথে এক একটা নতুন পোশাক! ওয়েস্টার্ন ইভিনিং ড্রেস থেকে শুরু করে শাড়ি! এক একটা নতুন গান শুরু হয় আর ও নতুন পোশাক পরে ঘরে ঢুকে। সব আরবি ঢিশটিক ঢিশটিক টাইপের গান, তাল ছাড়া কিচ্ছু বুঝি নি। শুধু একটা গানই হিন্দী ছিল, 'শাভা শাভা'! পুরুষালী গলায় শাভা শুরু হতেই শাড়ি পরে রিমা মহা নাটকীয় ভঙ্গীতে ঘরে ঢুকে আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই আমাকে টেনে নামিয়ে দিল ড্যান্স ফ্লোরের মাঝখানে! আমি বাংলাদেশী মেয়ে, ইন্ডিয়ার কাছাকাছি দেশ থেকে এসেছি, অতএব আমি নিশ্চয়ই বিয়ের নাচে রাণী আর ঐশ্বরিয়ার চেয়ে কম যাব না! <img src=" style="border:0;" /><img src=" style="border:0;" /><img src=" style="border:0;" /><img src=(" style="border:0;" />


সে দিন রিমাকে ভীষণ হতাশ করলাম এবং ওর দৃঢ় ধারণা জন্মে গেল যে বাঙালীরা মজা করতে জানে না! কখনও বলিউডের নাচ মনযোগ দিয়ে দেখি নি, এমনকি জাতিগতভাবে আমরা কখনও বিয়েতে নাচি না, নাচ-টাচকে ধর্ম কর্ম করা মানুষেরা ভালো চোখেও দেখি না, আর 'শুধু মেয়েদের আনন্দানুষ্ঠান' বলে আমাদের বাঙালী সংস্কৃতিতে কিছু নেই--এত সব আবিষ্কারেই রিমা হতাশ!

রিমা আর ওর মা আমি বিদায় নেয়ার আগে পই পই করে বলে দিল আমি যেন নিজের বিয়েতে ওদের অবশ্যই দাওয়াত দেই। ইন্ডিয়ার পাশের দেশটায় মানুষেরা কেম্নে বিয়ে করে দেখবে! বিয়েতে মজা করতে না পারলে মজা শিখিয়ে দিয়ে আসবে! রিসেপশনের দিন অনেক মানুষের ভিড়ে যখন রিমার মুখটা খুঁজে পেলাম না, তখন তাই খুব অবাক হলাম।

কারণ জানলাম কিছুদিন পরে…... রিমা প্রেগনেন্ট!!!

ইউনিভার্সিটিতে আমার কাছের বান্ধবীদের মধ্যে প্রথম মা হয়েছে জাহিদা। সেকেন্ড ইয়ারে থাকতে পাকনামি করে। আর রিমা, আমার বিয়ের মাত্র কয়েক মাস আগে বিয়ে করে, হজ্জ করে এসে দিব্যি প্রেগনেন্ট হয়ে গেল!
শুনেই মনে হলো, বাহ, এক্কেবারে সময় মত!


মে এর শুরু

ইউনিভার্সিটির বুকশপে হঠাৎই দেখা মারভেতের সাথে। কেমন আছে জিজ্ঞাসা করতে হুট করেই বললো কথাটা। দশদিন হলো মারভেতের মিসক্যারিজ হয়েছে।

খুব হতভম্ব হয়ে গেলাম শুনে। এরকম ক্ষেত্রে কি বলতে হয় আমি বুঝি না। মারভেত অবশ্য ইমোশন প্রকাশ করার মত মেয়ে না, ও বলে গেল ও আসলে ভ্রুনের সাথে অ্যাটাচড হওয়ার আগেই মিসক্যারিজ হয়েছে। ও টের পাওয়ার মাত্র তিন দিন পরে। মিসক্যারিজ হওয়ার পর যখন ও হাউমাউ করে কাঁদছিল আর সবাই শুকনো মুখে বলছিল, আরেকটা বাবু হওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার, তখন ও নাকি মাথা নেড়ে বলেছিল, আমি তো বাবুর জন্য কাঁদছি না, ব্যাথায় কাঁদছি!

ও হাসির সাথে মিশিয়ে টিশিয়ে বলে গেল পুরাটা ঘটনা, কিন্তু ভীষণ খারাপ লাগা নিয়ে আমি বাসায় ফিরলাম সেদিন।


আগস্টের শুরু

পিএইচডি, চাকরি, বাসা বদল নিয়ে মাথা খারাপ অবস্থা। হঠাৎই ফেইসবুকে মারভেতের খোঁচাখুঁচি শুরু হলো। রিমার বাচ্চা হবে আগস্টের শেষে। তার আগেই রিমাকে একটা সারপ্রাইজ বেবি শাওয়ার দিতে হবে! বেবি শাওয়ারের দিন হবু মায়ের জন্য অনেক রান্না বান্নার আয়োজন হয়, হবু মাকে নিয়ে নানা রকমের গেইমস খেলা হয়, তারপর হবু মা'কে নতুন বাবুর গিফটে ভাসিয়ে দেয়া হয়। আইডিয়াটা শুনে বেশ ভালো লাগল। 'সেলিব্রেশন অফ বার্থ!

রিমাকে দেখলাম অ-নে-ক দিন পর। প্রেগনেন্ট হওয়ার পর এই প্রথম! সেই রিমা, যে ছটফট করে লাফিয়ে বেড়াতো তার ৫'৭'' লেবানীজ শরীর নিয়ে এখন মা হয় হয় অবস্থা! যে ঘরে থাকলে সবার চোখ ওর দিকে থাকবেই! ভাবছিলাম সেই রিমা বুঝি বদলে গিয়েছে, কিসের কি! ও ওর বিশাল পেট নিয়ে ঘরে ঢুকে, প্রথমে প্রচন্ড অবাক হলো, তারপর সামলে উঠেই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো আমাদের! তারপর সেই আগের মতই চিল্লাচিল্লি, ওকে না জানিয়ে এত কিছু কেন করা হলো, ও তো মজাগুলো মিস করে ফেললো! এরকম সারপ্রাইজ পার্টির আয়োজন করার সময়ই তো অর্ধেক মজা শেষ হয়ে যায়! দেখে খুব ভাল্লাগলো, প্রেগনেন্সি ওকে কাবু করতে পারে নি একদম। চাকরি থেকে ছুটি নিয়েছে মাত্র দুই সপ্তাহ। এই দুই সপ্তাহেই হাঁপিয়ে উঠেছে রীতিমত। ও তো ঘরে বসে থাকার মেয়ে না! কবে যে পেটের বাবু বের হবে আর ও ছুটিয়ে বেড়াবে বাবুটাকে!

ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি আমাদের দেশে প্রেগনেন্ট মেয়েরা প্রেগনেন্সিটা ঢেকে রাখার প্রানপনে চেষ্টা করে। ছোটবেলায় তো বুঝতেই পারতাম না কেউ প্রেগনেন্ট হলে, বড়রা শুধু চোখে চোখে কথা বলতো। প্রেগনেন্ট মেয়েটা গায়ে বড় ওড়না জড়িয়ে থাকতো জুবু থুবু হয়ে। বাসার ছেলেরাও নিশ্চয়ই জানতো যে একটা প্রেগনেন্ট মেয়ে আছে, কিন্তু কোন ভাবে যদি প্রেগনেন্সির স্বীকৃতি দিতো জোরে সোরে, সেটা 'এই অবস্থার' কথা বলেই হোক, আর যেভাবেই হোক, তাতেই মহা লজ্জার ব্যাপার হয়ে যেত!

এজন্যই আরও রিমাকে দেখে মন ভরে গেল। কি আত্মবিশ্বাসের সাথে হেঁটে বেড়াচ্ছে পিঠ সোজা করে! আর না-হওয়া বাবুকে নিয়ে কি যে উৎসাহ! আল্ট্রান্সোগ্রাফীতে যখন বাবুকে দেখলো, তখন নাকি বাবু আঙ্গুল চুষছিল! শুধু কি তাই, একবার পিট করে চোখের পাতাও ফেললো! হাই তুললো! মেয়ে পেটে থাকতেই এত কিছু শিখে গিয়েছে, বের হয়েই তো হাঁটা শুরু করে দিবে!

আমরা যেহেতু খালা হবো, তাই আমাদের ও না-হওয়া মেয়েটার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। ওর নাম আয়েশা। আয়েশা বেশির ভাগ সময়ে গুটিশুটি মেরে পাথালি হয়ে শুয়ে থাকে। ওর মাথাটা থাকে রিমার বাঁ দিকে। আর ওর গুটুশ গুটুশ হাঁটুগুলো থাকে ডানদিকে। মাঝে মাঝে্ই সে হাঁটুগুলো নাড়ায়। মাঝে মাঝে আবার ওর হেঁচকিও ওঠা শুরু করে! রাতে হঠাৎ করে রিমার ঘুম ভেঙে যায় আয়েশার হেঁচকিতে, হিক্কুপ, হিক্কুপ, হিক্কুপ করে একটু পর পর রিমাকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিতে থাকে!

আমরা সবাই উপর থেকে হাতড়ে আয়েশাকে এক গাদা ভালোবাসা দিয়ে, আর আয়েশার জন্য বুক ভরা ভালোবাসা নিয়ে বাসায় ফিরলাম সেদিনের মত।


সেপ্টেম্বরের শুরু

২/৯/২০১০

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম রাতে, হঠাৎ এসএমএসের শব্দে পাতলা ঘুম ভাংলো। দেখব না দেখব না করেও মারভেতের নাম দেখে এসএমএস খুলে আধো আধো ঘুম নিয়ে পড়লাম। একবার, দুইবার, বার বার পড়লাম…...

"Funeral prayer for Aicha, the daughter of Mohamed and Rima will be held tomorrow at Rockwood Cemetery…"


------------------------------


ঘটনাটা কিভাবে হয়েছে কেউ জানে না। রিমা সারা প্রেগনেন্সিতে অসুস্থ হয় নি একদম। শেষের ক'টা দিন একটু শরীর খারাপ লাগছিল। তখন গেল ডাক্তারের কাছে। একজন ইন্টার্ন ডাক্তারের ডিউটি ছিল সেদিন। ডাক্তার অনেক্ষন ধরে কোন হার্টবিট পাচ্ছিল না। রিমা যখন খুব চিন্তায় পড়ে গেল, তখন ডাক্তার স্ক্রীনের দিকে দেখালো ওকে, ওই যে দেখো বাবুর হার্টবিট! উল্টো হয়ে আছে তো, তাই পেতে এত দেরি হলো!

রিমার শরীর পরের দুই দিন একটু বেশিই খারাপ হয়ে গেল। প্রেশার খুব হাই। আবারও গেল ডাক্তারের কাছে। এবার অন্য ডাক্তার। সেদিনের মত ওই দিনও ডাক্তার কিছুতেই হার্টবীট খুঁজে পাচ্ছে না। রিমা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল স্ক্রীনের দিকে। একটু যদি কিছু দেখা যায়! হঠাৎই দেখলো ও সেদিনের দেখা দাগগুলো, স্ক্রীনে নাচছে রিমার বুকে পানি এনে। উল্লসিত হয়ে চিৎকার করে ডাক্তারকে দেখালো। ডাক্তার ওর দিকে অদ্ভূত চোখে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বললো, 'এটা তোমার হার্টবীট, জরায়ুতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।'

রিমা, যেই রিমার গলার আওয়াজ আধা মাইল দূর থেকে শোনা যায়, ও হঠাৎই খুব চুপ হয়ে গেল। আস্তে করে বললো, 'কিন্তু আমি তো গত কয়েক দিন ধরে টের পাচ্ছিলাম, আয়েশা আমার পেটে নড়ছিল সারাক্ষন…...'

ডাক্তার ওর মাথায় হাত রেখে বললো, 'আয়শা নড়ছিল না, আয়শার দেহ পানিতে ভাসছিল, সেই ভাসাটাকেই তুমি ভুল বুঝেছো।…'

ডাক্তাররা চাচ্ছিলো রিমার পেট কেটে মৃত ভ্রুনটাকে বের করে ফেলতে। রিমা কিছুতেই রাজি হলো না। আয়েশার যেভাবে আসার কথা ছিল সেভাবেই আসবে আয়েশা। রিমার নিজের কষ্ট কম হওয়ার জন্য আয়েশার ভাই বোনদের পৃথিবীতে আসার পথ সরু করতে যাবে কেন ও? সুদীর্ঘ লেবারের পর রিমার বুকে আসল আয়েশা। প্রানহীন আয়েশা।

আমি রিমার মুখোমুখি হতে পারি নি আজও। এই ঘটনার সপ্তাহ খানেক আগে, আগস্টের চব্বিশ তারিখ রিমা একটা গণ-ইমেইল করেছিল, রমজানে দোআ কবুল নিয়ে। রমজানে সব দোআ কবুল হয়, তাই যারা বাবু চায়, তাদের দোআও আল্লাহ কবুল করবেন। ওই ইমেইলটা বার বার পড়লাম। তারপর সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে ওটারই একটা রিপ্লাই দিলাম। রিমাও জবাব দিয়েছিল সাথে সাথেই। জবাবটা আমার চেয়ে অনেক গুণ সাহসী।

বলেছিল, 'আমি দোআ করেছিলাম আল্লাহ যেন আয়েশাকে বেহেস্তে নেয়। আল্লাহ যে এভাবে আমার দোআ কবুল করবে আমি আগে বুঝি নি। লেবারের কষ্টের কিচ্ছু আমার মনে নেই, কিন্তু মানসিক কষ্টটুকু কাটিয়ে উঠতে পারছি না। মোহাম্মদের মুখের দিকে তাকাতে পারছি না, বেচারা খুব বড় ধাক্কা খেয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন। তিনি আমার ভালো ছাড়া খারাপ করেন নি কখনও, এবারও জানি আমার জন্য ভালোটাই করেছেন তিনি। কিন্তু তুমি যখন মা হবে, তখন হয়তো বুঝবে আমার ফীলিংসের কিছুটা... আমার আর মোহাম্মদের জন্য দোআ করো, এটা ছাড়া আর কিছুই চাওয়ার নেই আমার এখন…...'

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29240124 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29240124 2010-09-15 17:29:10
ঈদ প্যাচালী ঈদ না ক্যানসেল করতে হয়! আবার সেদিন নাকি কুরান পুড়ানো দিবসও! তাই নিয়ে কি হয় সে নিয়েও টেনশন।

টেনশনে জর্জরিত অবস্থায় ম্যানিয়েক মুসলিমের আর্টিকেলটা পড়লাম। কুরান পুড়াতে গিয়ে ইভেনজেলিক চার্চটার মানুষজন মহা বিপদে পড়ে গিয়েছে, কারণ ওরা অবাক হয়ে দেখল মুসলিমরা কুরআন পুড়ালে চেতেই না, বরং আরও খুশি হয়! ব্যাপার কি?? কারণ যাচাই করে দেখা গেল মুসলিমরা কুরআনের কপি শ্রদ্ধাপূর্ণ ভাবে ডিসপোজ করতে হলে কুরআন পুড়িয়ে ফেলে!!! অন্যদিকে ইসলামিক বুকস্টোরের মালিকও মহা খুশী, কুরআন পুড়ানো দিবস উপলক্ষে কুরআনের বিক্রি ৩০০% বেড়ে গিয়েছে। রিপ্রিন্টও বেড়েছে একেবারে রেকর্ড পরিমান! হতাশ হয়ে প্যাসচর সাহেব আবিষ্কার করলেন সবার ঘরে ঘরে কম্পিউটারেও কুরআন আছে। ইন্টারনেট ভর্তিও কুরআনের অসংখ্য কপি। কুরান পুড়ানো দিবসের পূর্ণতা দিতে কম্পিউটারের কুরআন পুড়াতে গিয়ে কম্পিউটারের টক্সিক গ্যাসে প্যাসচর সাহেবের সাঙ্গপাঙ্গরা সিরিয়াস অসুস্থ। ততদিনে আবার প্যাসচর সাহেব আবিষ্কার করলে পৃথিবীতে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ কুরআন মুখস্তও করে রেখেছে। ততক্ষনে প্যাসচর সাহেব ক্লান্ত হয়ে ক্ষান্ত দিলেন। সফল ভাবে কুরান পুড়াতে গিয়ে মানুষ তো আর পুড়ানো যায় না!

ম্যানিয়েক মুসলিমের আর্টিকেল আর ক্লেভেনোআমেরিকার ইউটিউব ভিডিও দেখতে গিয়ে হাসির ঠেলায় টেনশন অনেকটা হালকা হয়ে গেল। ঈদের মন পুরাপুরি ভালো হয়ে গেল যখন শুনলাম চারিদিকের চাপে প্যাসচর সাহেব কুরান পুড়ানো দিবস আপাতত স্থগিত করলেন! আলহামদুলিল্লাহ বললাম অনেক বার আর ওবামা আর আমেরিকাকে ধন্যবাদ দিলাম মনে মনে!

---

ঈদের আগের গিফট দেওয়া নেওয়ার ব্যাপারটা আমার ভীষণ ভালো লাগে! এম্নি আমরা নিয়মিত দেখা হওয়া বন্ধুরা ঈদ উপলক্ষে গিফট দেয়া নেয়ার একটা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছি। ছোট ছোট কাগজে নাম লিখে, ছোট ভাজ করে রেখে দেয়া হয়। তারপর সবাই একটা করে কাগজ নেয়। যার ভাগে যেই নাম জুটে, সে তার জন্য গিফট কিনে।

বাসায় বাবা মাকে গিফট এবার মন ভরে গিফট দিলাম। দুইজনের দুইটা প্রয়োজনীয় জিনিস সব ভাইবোনেরা মিলে। বাবা মাকে কাজে লাগার মত কিছু দিতে পারার অনুভূতিটা একেবারেই অন্যরকম!

চাকরি পাওয়ার পর প্রথম ঈদ। শ্বশুড় শ্বাশুড়ীকে খুবই সামান্য টাকা পাঠালাম, কাছে তো নেই, অল্প কিছু যদি কিনে নিতেন! এত সামান্য যে পরিমানটা কাওকে বলতেই আমার লজ্জা লাগবে! কিন্তু আমার শ্বাশুড়ীর হাতে যখন গিয়েছে… আম্মু সেই অতি সামান্য টাকা দিয়েই সবাইকে ঈদ গিফট দিলেন, সেটা চুড়ি হোক আর স্যান্ডেল হোক। দেয়ার সময় খুব করে বলেও দিলেন, 'এটা কিন্তু সন্ধ্যাবাতির দেয়া গিফট'! এত অল্প টাকাই এত হাতে গিয়েছে আম্মুর কল্যানে যে ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেলাম! মনে মনে ঈদের সেরা উপহারগুলোর লিস্টে আম্মুর আচরণটুকু টুকে নিলাম!

জোয়ান, নওমুসলিম মেয়েটা, যে অনেকখানি পথ মাড়িয়ে এসেছে আমাদের সাথে ঈদ করতে, ওর গিফটটাও সেরকম অসাধারন ছিল। মুসলিম হওয়ার পর এটাই ওর প্রথম ঈদ। ঈদের আগের দিন সারা দিন ভরে ছোট ছোট চকলেট বানিয়েছে, একটা বড় কেইক বানিয়েছে আর অনেকগুলো সসেজ রোল। এরপর সব এনে বাসায় দিয়ে গেল! ও নাকি মুসলিম হওয়ার পর কারো বাসায় গিয়ে খালি হাতে ফিরে নি, সবাই পোটলায় করে খাবার বেঁধে দেয়। জোয়ানও তো এখন মুসলিম। মুসলিম হলো আর এরকম করবে না তা কি হয়? যুক্তি শুনে হেসে ফেললাম।

---

ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় সে কি বৃষ্টি! ঈদের দিন সকালে আকাশ জোড়া কুয়াশা। সকাল আটটাতেও কুয়াশা কাটে না। মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল মাঠে ঈদের নামাজ হবে না ভেবে। কিন্তু আস্তে আস্তে ঠিক কুয়াশা কেটে গেল। বৃষ্টিও পড়লো না আর। খোলা আকাশের নিচে ঠিক ঠিক নামাজ পড়লাম। তারপর পিচকিদের সে কি উচ্ছ্বাস! ওদের জন্য জাম্পিং ক্যাসেল, ফেইস পেইন্টিং আর ললি ব্যাগ। ওদের উচ্ছ্বাস দেখতে দেখতেই অর্ধকে ঈদ হয়ে গেল আমার। প্রচুর খাওয়া দাওয়া করলাম। বাসায় দুই দিনে ১০০+ মানুষের সাথে ঈদ করলাম, আর এদিক সেদিক কত বাসায় যে গেলাম! কাউকে ঘুম থেকে তুললাম, কাউকে বাসা থেকে বের হওয়ার পথে ধরে ফেললাম, কাউকে বাসায় রেখেই বের হয়ে গেলাম! আজকেও অন্তত: জনা বিশেকের আসার কথা। ঈদের এখনও তাই অনেক বাকি! এক ফাঁক পেয়ে এসে বলে গেলাম… ঈদ মোবারক!

ছবি: ঈদের মাঠে হিলিয়াম বেলুন]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29238775 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29238775 2010-09-12 06:34:11
বছরের সেরা দিনগুলো আসছে আবারও... একদিন তর্কাতর্কির মাঝেই হঠাৎ থমকে গেলাম এক অদ্ভূত উপলব্ধিতে... কুরআনটা আমার তখনও পর্যন্ত নিজের ভাষায় আগা গোড়া পুরাটা একবারে পড়া হয় নি! খতম করেছি তো ছোটবেলা, সে তো আছে। এখান থেকে সেখান থেকে দারস পড়েছি, ব্যাখ্যা শুনেছি, অনুবাদ পড়েছি, কিন্তু কি আশ্চর্য, যেই আমি হাজার পৃষ্ঠার সুনীল কিংবা তার চেয়েও মোটা গন উইথ দ্যা উইন্ড পড়ে ফেলতে পারি এক সপ্তাহে, সেই আমি জীবনের প্রায় দুই দশক পার হয়ে ফেলেছিলাম কুরআনের মাত্র ছয় হাজার শব্দ আগা থেকে গোড়া রিডিং না পড়েই! অদ্ভূত লজ্জা নিয়ে কুরআনের অনুবাদ পড়া শুরু করেছিলাম সেই রমজানে, কয়েক বছর আগে। শুরু থেকে একটু একটু আরবির সাথে অনেক বেশি করে অনুবাদ পড়া শুরু করলাম প্রতিদিন। আর সে কি বিষ্ময়! কুরআনে অনেক কিছু এত সুন্দর ভাবে বলা আছে, যেটা আমি আগে কখনও শুনি নি! যেমন-- সূরা বাকারায় আল্লাহ যখন মুসলিমদের কাবার দিকে ফিরে নামাজ পড়ার নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন কি সুন্দর করে বললেন, "অবশ্যই নির্বোধ লোকেরা বলবে, “এদের কি হয়েছে, প্রথমে এরা যে কিব্‌লার দিকে মুখ করে নামায পড়তো, তা থেকে হাঠৎ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে? হে নবী! ওদেরকে বলে দাও, “পূর্ব ও পশ্চিম সবই আল্লাহর ৷ আল্লাহ যাকে চান তাকে সোজা পথ দেখান।"... প্রথমে যে দিকে মুখ করে তুমি নামায পড়তে , তাকে তো কে রসূলের অনুসরণ করে এবং কে উল্টো দিকে ফিরে যায় , আমি শুধু তা দেখার জন্য কিব্‌লাহ নির্দিষ্ট করেছিলাম।" (সূরা বাকারা: ১৪২ ও ১৪৩ এর কিছু অংশ)।

ব্লগে কত তর্ক করেছি যখন কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়া নিয়ে লেখাগুলো আসতো, কিন্তু আমি যত কিছু বলেছি তার কিছু না বলে যদি এই দুইটা আয়াত বলে দিতাম, তাহলে সব বলা হয়ে যেত! আল্লাহ তো নিজেই বলছেন তিনি সব দিকে আছেন, কিন্তু তবু তিনি চান আমরা কাবার দিকে ফিরে নামাজ পড়ি শুধু মাত্র পরীক্ষা করার জন্য যে কে তাঁর কথা শুনে!

গত রমজানে মোবাইলেই আস্ত কুরআনটা ঢুকিয়ে নিয়েছিলাম। খুব ব্যস্ত ছিলাম তখন অনার্স ফাইনাল নিয়ে। ইউনিতে যাওয়ার পথে ট্রেইনে কিংবা ল্যাবে এক্সপেরিমেন্টের ফাঁকে ফাঁকে আইপডে আরবি কুরআন শুনতাম আর সাথে সাথে ইংরেজি অনুবাদ পড়ে নিতাম মোবাইল থেকে। মুহাম্মদ (সা) এর কাছে কুরআন লিখিত ভাবে আসে নি, তাই কানে শুনাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছিল আমার। ঠিক যেভাবে তিনি শুনেছিলেন চোদ্দশ বছর আগে, সেভাবে শুনতে চাচ্ছিলাম! তাছাড়া যেই লিংক দিলাম, মিশারী রাশিদ আল আফাসের, ওঁর কুরআন শোনার অভিজ্ঞতাই অন্যরকম। কুরআন পড়ার সময় তিনি সুর বদলান, যেখানে ভালো লাগার কথা সেখানে একরকম, যেখানে ভয়ের কথা, সেখানে আরেক রকম। ছয় বছর আগে প্রথম ওনার তেলওয়াত শোনার আগ পর্যন্ত আমাকে কুরআন তেলওয়াত তেমন টানতো না! চ্যালেঞ্জ করলাম, একবার শুনে দেখেন!

গত রমজানে পড়া একটা আয়াতের কথা এখনও মনে আছে... কুরআনে আল্লাহ বলেছেন কোন মেয়ের সত্বীত্তের ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ দেয়ার শাস্তি হচ্ছে আশি দোররা এবং অপবাদদানকারীকে সারা জীবনের জন্য মিথ্যাবাদী ঘোষণা দেয়া (সূরা নূর: ৪)। শুধু তাই না, যারা শুধু অন্য জনের মুখে শুনে এই কথা আরেকজনকে বলে, তার ব্যাপারেও ভীষণ কঠিন সব কথা! ভীষণ রকমের অবাক হয়ে গিয়েছিলাম আয়াতটা পড়ে! বার বার পড়লাম! একটা মেয়ের ব্যাপারে একটা কথা উঠতে পারলেই হয়েছে, সত্য হোক মিথ্যা হোক, মেয়েটার সারা জীবন ধ্বংস হয়ে যায়.. এরকম ৮০% মুসলিমদের দেশে, প্রায় প্রতি বাড়িতে একটা করে কুরআন থাকা সত্ত্বেও! কি আশ্চর্য, মেয়েদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত আমি প্রথম শুনেছি/উপলব্ধি করেছি জীবনের দুই যুগ পার হয়ে যাওয়ার পরে!!! কি ভয়াবহ লজ্জা!!! তাও আমার হাতের কাছেই কুরআন থাকে, জ্ঞানের একসেস এত বেশি, তবুও! বাংলাদেশের যেই নিরপরাধ মেয়েগুলো মুখ বুজে দোররা খেয়ে যাচ্ছে, তাদের হাতে কি কেউ একটা করে কুরআন তুলে দিতে পারে না যুদ্ধ করার জন্য!

রমজানে, বছরের সেরা দিনগুলোতে আল্লাহ কুরআন পাঠিয়েছিলেন আমাদের জন্য। প্রতি রমজানে তাই একটু একটু চেষ্টা করি কুরআন সম্পর্কে আরেকটু জানার। যত জানি, তত মুগ্ধ হই।

এবার মিফরার কাছ থেকে দারুণ একটা আইডিয়া পেলাম। মিফরা কুরআন পড়বে কুরআন ঠিক যেভাবে এসেছে, সেভাবে। আমাদের কাছে এখন যেভাবে কুরআন আছে, সেভাবে কুরআন রাসুল (সা) এর কাছে আসে নি। অনেক সূরাই আগে পিছে, রাসুল (সা) সেটা পরে সাজিয়ে দিয়েছেন আল্লাহর নির্দেশে। সূরা ফাতিহা এসেছে অনেক পরে, কিন্তু একেবারে প্রথম সূরা এখন। সূরা আলাক এসেছে একেবারে প্রথমে, কিন্তু এখন একেবারে শেষের দিকে। কুরআন যেই অর্ডারে এসেছে, সেই অর্ডারে কুরআন পড়লে ঠিক কিভাবে ইসলাম রাসুল (সা) এর কাছে এসেছিল, সেই ধারণাটা পরিষ্কার হতে পারে অনেক। কুরআন নাজিলের অর্ডারটা পাওয়া যাবে এখানে

অনেক সময় কুরআন পড়তে গেলে খুব রিপিটিটিভ ঠেকে, মনে হয় একই কথা তো পড়ে এসেছি দশ পাতা আগেও! কিন্তু সেই কথাটা কেন আল্লাহ আরেকবার বলছেন দশ পাতা আগে, সেটা যদি জানা যায় কুরআনের ব্যাখ্যা পড়ে, তাহলে নিজেরই মাথায় বাড়ি দিতে ইচ্ছা করে স্রেফ পুনরাবৃত্তি ভাবার জন্য! ইবনে কাসিরের তাফসীরের বাংলা অনুবাদ কেমন আমি জানি না। আপাতত আমি ইবনে কাসিরের ইংরেজি অনুবাদ পড়ছি, যত পড়ছি, ততই মুগ্ধ হচ্ছি!

আরেকটা জিনিস আমার হয়তো এই রমজানে ধরা হবে না, কিন্তু খুব ইচ্ছা আছে কখনও শুরু এবং শেষ করার! এই ওয়েবসাইটে মাত্র কয়েক শ' শব্দ আছে, যেগুলো শিখলে কুরআনের ৮০% শব্দ শিখা হয়ে যাবে (কারণ কুরআনে একই শব্দ অনেকবার এসেছে)! আমি ভাবতেও পারি না, যেই কুরআন যুগ যুগ ধরে আমরা মাটিতে ছুঁতে দেই নি, সবচেয়ে উঁচু শেলফে রেখে দিয়েছি, ওজু ছাড়া ছুঁয়েও দেখিনি, সেই কুরআনের ৮০% শুধু মাত্র পড়েই বুঝে ফেলার অনুভূতি কেমন হবে! কিন্তু সত্যি, খুব ইচ্ছা করে সেই অভিজ্ঞতা পাওয়ার... <img src=" style="border:0;" /><img src=" style="border:0;" /><img src=" style="border:0;" />।

বছরের সেরা দিনগুলোর আসতে মাত্র এক সপ্তাহ বাকি... যখন ছোট ছিলাম, তখন রোজা আসত আর যেতো, না খেয়ে থাকার একসাইটমেন্ট আর ঈদের নতুন জামার আনন্দের চেয়ে বড় কিছু রমজান থেকে পাই নি। আস্তে আস্তে যখন জানলাম, এটা শুধু 'রমজান' না, বছরের সেরা দিনগুলো... তখন দিনগুলো চলে গেলে ভীষণ বিষণ্নতায় ভুগতাম। কেন জানেন? এই দিনগুলোতে শয়তানগুলো বন্দী থাকে সব। কিন্তু কি আশ্চর্য, শয়তানের অনুপস্থিতিতেও আমার কাজে, চিন্তায়, মেজাজে বড় সড় ধরণের কোন পরিবর্তন আসতো না! যখন ভিতরে চোরা ভয়টা ঢুকে যাওয়া শুরু করলো, শয়তানটা আসলেই হয়তো আমার মনটাকে ইচ্ছে মত বাগিয়ে নিয়েছে, তখন থেকেই ঈদের দিন যত আগাতো তত বেশি বিষণ্নতায় ভুগতাম!
এবার ভীষণ ইচ্ছা ঈদের দিন জোরে সোরে একটা 'আলহামদুলিল্লাহ' বলা... এই সুন্দর মাসের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে তারপরে। পারব কি না জানি না!!!

মিফরা মেয়েটা থেকে আরেকটা আইডিয়া পেয়েছি, এটা বলে শেষ করছি। রমজানে দোআ কবুলের সময়ের ছড়াছড়ি। রোজা রাখলে ইফতারে আগে দোআ কবুলের সময়, তারাবীর পরে, সেহেরীর আগে, শেষ দশ দিনের রাতগুলোতে। এই সময়গুলোতে আল্লাহর কাছে হাত তুলে কিছু চাইলে সত্যি মনে হয় আল্লাহ শুনছেন! অসংখ্য প্রমান আছে আমার নিজের জীবনে, অসম্ভব সব কিছু চেয়ে দিব্যি পেয়ে গিয়েছি... এক বিন্দুও বাড়িয়ে বলছি না কিন্তু...। যারা ওই সময়গুলো মিস করছেন, তারা সত্যিই মিস করছেন... <img src=" style="border:0;" />।

মিফরা এবার বললো, যত যা কিছু আছে, একটা লিস্ট করে প্রতিদিন চেয়ে যাও। আল্লাহ যদি একদিন দোআ কবুল করেন, তাহলে বাকি ঊনতিরিশ দিনে কোন কারণে তোমার রোজা আল্লাহ পছন্দ না করলেও অসুবিধা নেই, ওই একদিনে তো দোআগুলো সব কবুল হয়ে যাবে!

আইডিয়াটা সত্যিই খারাপ না! <img src=" style="border:0;" />]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29213443 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29213443 2010-08-02 13:28:46
খেয়াল বলে কথা!
বইয়ের নেশাটা মোটামোটি কনস্ট্যান্ট। বই আমার শুধু পড়লে চলে না। কোন বই খুব ভালো লেগে গেলে সেটা কিনে নিজের কালেকশনে রেখে দেই। আর ছবি আঁকা শুরু করে তো রীতিমত দুই সপ্তাহের ক্লাসও করে ফেললাম। আঁকলাম যতদিন, খারাপ আঁকি নি। কিন্তু যখন বুঝলাম ছবি আঁকতে কি পরিমান ধৈর্যের দরকার হয়, তখন আঁকার সরঞ্জামগুলোর ব্যবহার আস্তে আস্তে কমে গেল…

এম্ব্রয়ডারী গেল, কিন্তু মেশিনে সেলাই করে জামা কাপড় বানানো পুরাপুরি অন্যরকম ব্যাপার স্যাপার। কত হিসাব কিতাব আছে! আবায়া পরা শুরু করার ইচ্ছা করার পর থেকে খেয়াল করলাম পছন্দসই আবায়াগুলো ভীষণ দামী! এত দাম দিয়ে কে কাপড় কিনে? আমি কখনই কিনবো না--এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করে কাপড় কিনে, প্যাটার্ন কিনে, দিন রাত সেলাই করতে নেমে গেলাম। একে একে বানিয়ে ফেললাম আবায়া, স্কার্ট, সালওয়ার-কামিজ--সব মিলিয়ে পনেরোটা আইটেম হবে হয়তো! বাসা বদলানোর সময় খাটের নিচ থেকে একটা সেলাইয়ের খাতা উদ্ধার করলাম, পাতায় পাতায় কত ভেবে চিন্তে আঁকা সব ডিজাইন! বলাই বাহুল্য এখানেও ধৈর্যের পরীক্ষা টের পাওয়ার পরই পনেরতম আইটেমের পরে খাতাটা খাটের নিচে ঢুকেছে… এখন ডিজাইন নিজে করলেও দর্জি ছাড়া উপায় দেখি না!

গানের খাতা পেলাম দুইটাগুলো। কত গান শিখেছি এক সময়ে! যখন বুঝতে পেরেছি মিউজিকের থিওরী না বুঝে গান খুব ভালো গাওয়া যায় না, ভুল ভাল রয়েই যাবে, তখন ইন্টারনেট ঘেটে ঘেটে মিউজিকের থিওরীও পড়ে গেলাম কত দিন!

আমার ব্রাউজারের ফেভরিটসে এখনও ইন্দোনেশিয়ান ভাষা শিক্ষার বেশ কয়েকটা পৃষ্টা জমানো আছে। দু্ই বছর ধরে আছে ওগুলো। যদিও আমার ইন্দোনেশিয়ান 'নামা সায়া সন্ধ্যা' (আমার নাম সন্ধ্যা) পর্যন্তই ঠেকে আছে কিন্তু এখনও ওই শখ বাতিলের তালিকায় রাখি নি! ঠিক করে রেখেছি, সুযোগ আসলেই শিখে নিব। আরবি তো সেই কবে থেকেই শিখছি… কত কিছু ডাউনলোড করলাম, কত প্ল্যান নিলাম। আমার সুদীর্ঘ এবং অগোছালো অধ্যাবস্যায়ের ফলাফল হিসেবে অবশেষে জানি সজারাতুন মানে গাছ আর রজালুন মানে লোক!

রান্না বান্না বরাবরই ভালো লাগে। মাশরুম স্যুপ আপাতত আমার স্পেশালিটি আর সর্বশেষ এক্সপেরিমেন্ট ছিল থাই স্যুপ! ছবি তোলা আর ঘুরাঘুরি নিয়ে নাই বললাম, এই দু'টো শখ মনে হয় কখনও যাবে না! এগুলো খেয়াল না বলে শখ বলা যায়!

কিন্তু আমার সর্বশেষ খেয়ালটাকে খেয়ালই বলতে হবে মনে হয়! বেশ কয়েকদিন ধরেই দেখছিলাম নও ওর মোটা মোটা বইগুলো আমাদের পিচ্চি টেবিলটায় যুতসই ভাবে ছড়িয়ে বসতে পারছে না। কখনও মাটিতে বসে, কখনও বিছানায় বসে পড়ছে। তারপর একদিন হঠাৎ ও রুমে নেই।এদিক ওদিক খুঁজে ওকে আবিষ্কার করলাম গ্যারাজে। গ্যারাজের জঙ্গল থেকে আমাদের অতি প্রাগৌতিহাসিক ডাইনিং টেবিলটা উদ্ধার করে ওখানেই বসে বসে পড়ছে! টেবিলটা অনেক হাত ঘুরে আমাদের কাছে এসেছিল। কাঠের টেবিল কিন্তু টেবিলটার উপর এত অত্যাচার গিয়েছে যে এখন আর কাঠ বুঝা যায় না। এখানে সেখানে খাবলা খাবলা রং উঠা। যেটুকুতে রং উঠেনি, সেটুকুতে আবার স্টিকারের খাবলা খাবলা দাগ। কোন এক দুষ্ট পিচ্চির মালিকানাধীন ছিল নিশ্চয়ই টেবিলটা। নও ঘোষণা করে বসলো সেই টেবিলটাতেই ও এখন থেকে পড়বে… একটা টেবিল ক্লথ লাগিয়ে নিলেই দারুন হবে। আমার এত মায়া লাগলো বেচারার জন্য, ভাবলাম, চুপিচুপি একটা বড় টেবিল কিনে ওকে সারপ্রাইজ গিফট দেই। ওমা, ইন্টারনেটে বড় টেবিলের দাম দেখতে গিয়ে মাথায় বাড়ি! পছন্দসই টেবিলের দাম পাঁচশ+ অস্ট্রেলিয়ান ডলার‍! মাথা খারাপ! রাগ করে ব্রাউজার বন্ধ করে দিলাম।

তারপর গ্যারাজের টেবিলটা হাতিয়ে দেখতে দেখতেই আইডিয়াটা মাথায় আসলো। ওই টেবিলটাই সিরিষ কাগজ দিয়ে ঘষে বার্নিশ করে দিলে কেমন হয়?! একটা বড় টেবিল কিনে গিফট করার চেয়ে নিজ হাত বার্নিশ করে দিলে নও নিশ্চয়ই অসম্ভব খুশি হবে! এই ছেলেটাকে মুগ্ধ করতে আমার খুবই ভালো লাগে।

আইডিয়াটা আমার কাছে দারুণ লাগলেও বাসার প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ এবং বিচক্ষন মন্ডলীর কারও পছন্দ হলো না। 'এত বড় টেবিল সিরিষ কাগজ দিয়ে ঘষিয়ে রং উঠানো খেলা কথা নাকি?' 'মাঝপথে ছেড়ে দিবা, তখন আরও বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার হবে, এটা ধরার কোন দরকারই নাই।' 'টেবিল ক্লথ দিয়ে ঢেকে নিলেই হয়ে যাবে, এত কষ্ট করে কে?' 'নতুন একটা কিনে নাও, কাঠেরই কিনতে হবে এমন কোন কথা আছে?' ইত্যাদি ইত্যাদি নানা নেগেটিভ কথা বলে সব সেক্টর থেকে বিপুল পরিমানে নিরুৎসাহিত করা হলো।

কিন্তু খেয়াল বলে কথা!

একদিন দুপুর বেলা যখন বাসায় কেউ ছিল না, তখন ঘন্টা খানেক সিরিষ কাগজ দিয়ে ঘষে নিলাম টেবিলটা। প্রথম প্রথম শখের ঠেলায় খারাপ লাগছিল না, কিন্তু এক ঘন্টা পরে হাত পাথরের মত ভারি, অথচ টেবিলের এক চতুর্থাংশও হয় নি!

কি যে মন খারাপ হলো!

কিন্তু শুরু যখন করেই দিয়েছি, থামি কি করে, কোন মুখে? জেদ চেপে গেল খুব। দোকানে গিয়ে তিরিশ ডলারে সিরিষ কাগজ দিয়ে ঘষার মেশিন কিনে আনলাম। ভাবলাম, মেশিন শুধু রাখব আর হয়ে যাব। ব্যাস, সোজা কাজ! ওমা, মেশিন ছাড়তেই দেখি মেশিন তীব্র বেগে নড়ছে! এই প্রচন্ড বেগে নড়তে থাকা মেশিনটাকে দুই হাতে শক্ত করে ধরে এক জায়গায় স্থির রাখতে হয়, এবং একই সাথে মেশিনটা ধরে টেবিলের গায়ে চাপ দিতে হয়, এবং তার সাথে সাথেই সামনে পিছনে ঘষতে হয়! এক সাথে তিনটা ভিন্ন ডিরেকশনের শক্তি নিয়ন্ত্রন করতে গিয়ে প্রচন্ড শক্তি লাগে! তবু প্রচন্ড জেদ নিয়ে টানা তিন ঘন্টা করে গেলাম যুদ্ধ! যুদ্ধ শেষে সারা ঘরে গুড়া গুড়া ধূলা। আমার দুই বাহু খুলে চলে আসে আসে এমন ভাব। কিন্তু টেবিল?

রঙ-মুক্ত! <img src=" style="border:0;" />

এরপরের কাজটুকু সোজা ছিল। বার্নিশ লাগানো হয়ে গেলো দুই দিনেই। রং শুকানোর পর আমি নিজেই মুগ্ধ! বাসার প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ এবং বিচক্ষনমন্ডলীও ভূয়সী প্রশংসা করলেন এবং স্বীকার করে নিলেন তারা আমার খেয়ালকে ভীষণ রকমের আন্ডারএস্টিমেইট করেছিল <img src=" style="border:0;" />।

আর নও তো পুরাই ধরা! <img src=" style="border:0;" />)

আজকে যখন দেখলাম নও বইটই ছড়িয়ে পড়তে বসেছে সদ্য পাওয়া উপহারে, তখন মনটাই ভরে গেল! আর মনে হলো, যাক, রিসার্চ থেকে মন উঠে গেলেও না খেয়ে মরতে হবে না, কাঠমিস্ত্রীগিরি ক্যারিয়ার হিসেবে নিলেও মনে হয় খারাপ করব না <img src=" style="border:0;" />

(ছবিগুলো: বার্নিশের পরে (১ ও ৩), রং উঠানোর মাঝামাঝি সময়ে (২) এবং রং উঠানোর প্রায়ে শেষের দিকে (৪)।)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29210510 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29210510 2010-07-29 20:19:25
বিয়ে: আন্তরিকতা আর প্রফেশনালিজম
রিফাত ভাইয়ের বিয়ের সময় আমার বয়স ছিল পনের। তখনই শুনেছি ভাইয়া ভাবীর প্রেমের বয়স প্রায় বারো। কত যুদ্ধ করে যে বিয়ে করলো অবশেষে দু'জনে। কিন্তু বিয়ের দিন ভাবীকে নিয়ে যাওয়ার সময় ভাবীর কান্না দেখে কে! এক পর্যায়ে ভাবী পুরা বেহুঁশ, ভাইয়া বিব্রত মুখে দুই হাতে শক্ত করে ভাবীকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ পানি আনে, কেউ বাতাস দেয়।

এর কয়েক দিন পরেই বিয়ে হল কবির মামার। মামা মামীর আকদ হয়েছিল ছয় মাস আগে। বিয়ের দিন মামীর চোখে এক ফোঁটা পানি নেই। মামীর মা কাঁদছিলেন, মামী শুধু ওঁর মাথায় হাত বুলিয়ে চলে আসলেন। মামীর আড়ালে তখন সবাই ফিসফাস--বউ মানুষ না কাঁদলে ক্যামন লাগে!

সেই পিচ্চি আমার চোখে এত বিসাদৃশ লাগছিল ব্যাপারটা! এত বছরের পরিচয়ের পর বিয়ে হলো, তখন কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশ হতেও কেউ কিছু বললো না, যেন সেটাই স্বাভাবিক! অথচ অনেক আগে আকদ হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকতার দিন না কাঁদলেও ছি-ছি! এ কি কান্ড! কোনটা স্বাভাবিক?!

সেদিনের পর বাবা মাকে বিপক্ষে রেখে আমার আর ভাইয়ার সেকি তর্ক! বিয়ের সময় শুধু মেয়েরা কাঁদবে কেন? ছেলেরা কাঁদবে এটা তো কেউ আশা করে না! আগে না হয় মেয়েরা বিয়ে করে বাপের বাড়ি চলে যেত, জীবনে নিজ বাড়িতে আসা হতো না আর। 'কন্যাদান' করা হতো আগে, এখন তো আর কন্যাদান করা হয় না! বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মেয়েরা শ্বশুড় শ্বাশুড়ির সাথে থাকেও না! থাকলেও বাবা মায়ের সাথে সেই আকাশ পাতাল দুরত্ব তো থাকে না। একটা ছেলে তার বাবা মা থেকে যতটুকু সরে যায়, মেয়েটারও ঠিক তা-ই হয়।

মা প্রতি উত্তরে বলেছিল, আরে বোকা, মেয়েরা চলে যাচ্ছে বলে কাঁদে না, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে কাঁদে।

- কই, ছেলেদের জন্য ভবিষ্যতটা অনিশ্চিত না? শুধু মেয়েদের জন্যই অনিশ্চিত?

মা আমাদের এই চরম যুক্তি মাটিতে গুঁড়িয়ে দিয়ে বললেন, ছেলেরাও কাঁদে, শুধু সবার সামনে কাঁদে না!

তারপর আর কি, আমি ভাইয়া দু'জনেই এই সিদ্ধান্ত নিলাম---ঠিক যতটুকু কান্না আসা স্বাভাবিক, ততটুকু কাঁদলে অসুবিধা নাই। কিন্তু এর বেশি কান্নাটা বড় বেশি নাটুকে!

বাংলাদেশে আমার স্কুলের ৮০% বান্ধবীর নিজের পছন্দের বিয়ে হচ্ছে। প্রায় আধা যুগ পরিচয়ের পরে যখন ওরা অবশেষে বিয়ে করে, তখন ওদের জন্য হাউ-মাউ কান্নাটা স্বাভাবিক বলে মনে হয় না একদম!

আর বাকি ২০% বিয়ের আগেই আকদ করে ফেলে সকাল বেলা। একেবারে প্ল্যান করে, যেন কান্নাকাটিতে মেইকআপ নষ্ট না হয়ে যায়!

মন্তব্য আর পোস্ট পড়ে মনে হলো, ঠিক এইখানেই সবার প্রবলেম। এত বেশি প্ল্যানিং, কেউ মানতে চাইছে না! কিন্তু প্রফেশনালিজম আর পারফেকশন বজায় রাখতে চাইলে প্ল্যানিং আর রিহার্সেলের বিকল্প নেই। অত প্ল্যান না করলে আন্তরিকতা বজায় থাকবে ঠিকই, কিন্তু প্রফেশনালিজম জানালা দিয়ে পালাবে!

আমার বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হওয়ার ঠিক ছয় দিন পরে বিয়ে হলো।

বাড়ি ভর্তি মানুষের হুড়োহুড়ির মধ্যে আমার বিয়ের স্টেজ হিমেল ভাইয়া বানিয়ে দিল--মায়ের বিয়ের পঁচিশ বছরের পুরানো লাল টুকটুকে কাতান শাড়ি দিয়ে!

সেদিন যখন মাত্র পনেরো দিন আগে প্রথম পরিচয়ের মানুষটা এসে পাশে বসলো তখন ভীষণ লজ্জা লাগছিল। আর পরিস্থিতিটা এত অদ্ভূত ছিল যে ভীষণ হাসিও পাচ্ছিল! আমি ভাবতেই পারছিলাম না, এই মানুষটাই এখন আমার সবচেয়ে আপন! বান্ধবীরা পাশ থেকে চেতিয়েই যাচ্ছে, কিন্তু ওদের কি করে বুঝাই আমার এত হাসি পাচ্ছে কেন?!বরের পাশে বসা বেশির ভাগ ছবিতে আমি মুখ টিপে হেসেই যাচ্ছি!!! আয়না দেখতে গিয়ে দুষ্টামিও করলাম। আয়না ঠিক মত হচ্ছিল না বলে বর নিজ হাতে আয়না ধরে দেখে নিল বউকে। চারিদিকে তখন হইহুল্লোড় পরে গেল। এগুলো খুব স্বাভাবিক ভাবে হয়েছিল তখন, ইমোশনটাই ওরকম ছিল, বাস্তবতাটাই বড় বেশি স্বপ্নালু ছিল!

এখন ভাবলে খুব ভালো লাগে যে বিয়ের দিন হেসেছিলাম! ভাগ্যিশ! না হলে এত সুন্দর দিনটায় শুধু কান্নার স্মৃতি থাকতো! কেঁদেছি তো অবশ্যই, কাঁদব না! বিয়ের আগের ছয় দিন যত চোখের পানি ফেলেছি, সারা জীবনেও হয়তো তত চোখের পানি ফেলি নি! তখন তো ছিল বুক জুড়ে তীব্র ভয় আর অনিশ্চয়তা। অনেকগুলো বছর আগে মায়ের বলা কথাটার সতত্যা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু তবু মানুষের সামনে কেঁদেছি খুব অল্প। এতগুলো ক্যামেরা ধরা মুখের উপর, আনাড়ী ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা, মোবাইল ক্যামেরা…--সব মিলিয়ে এত অস্বস্তি লাগছিল যে কাজী এসে জিজ্ঞাসা করার সাথে সাথে কবুল বলে দিয়েছিলাম। বাবা মা যখন খুব কাঁদছিল, তখনও শুধু নি:শব্দে কেঁদেছি। এত ক্যামেরা আর মানুষের সামনে কাঁদাটাই কেমন নাটুকে নাটুকে লাগে!

সেদিনের প্রতিটা মুহূর্ত আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমাকে যদি কখনও সুযোগ দেয়া হয় অতীতে গিয়ে কিছু বদলানোর, আমি সেই দিনটার কিছুই বদলাবো না!

কিন্তু এগুলো শুধু আমার কাছে আর আমার পরিবারের মানুষগুলোর কাছে মূল্যবান। অতিথিদের কাছে না। অতিথিদের কাছে স্টেইজের লাল কাতানটা অর্থবহ না, তার চেয়ে আধুনিক কম্যিউনিটি সেন্টারগুলোর সেই গতবাঁধা কাঁচা ফুল আর ছোট ছোট লাইটগুলোর এসথেটিক মূল্য অনেক বেশি!

আমার শ্বশুড় বাড়ি থেকে যেই রিসেপশনটা হলো, সেদিনের জন্য শ্বাশুড়ি কত ঘুরে শাড়ি কিনে দিলেন! তারপর ম্যাচিঙ ওড়না, জুতা, চুড়ি, গোল্ড প্লেইটেড রূপার গয়না, কত কি! অথচ এত দিনের কষ্ট আর অর্থব্যয় যেই দিনের জন্য, সেই দিন ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে বসে থাকা ছাড়া আমার কোন স্মৃতিই নেই! সারাদিনের পরে বাড়ি ফিরে বড় অ্যান্টি-ক্লাইমেটিক লাগছিল, কি হলো কিছুই বুঝলাম না! দেড়শটা ছবি তোলার জন্য এত কিছু!

অথচ, আমাদের বিয়ের দিনের চেয়ে, সেই রিসেপশনের দিন অতিথিরা অনেক বেশি খুশি ছিল! খাওয়া দাওয়া পারফেক্ট, ভেন্যুটা ছিল পারফেক্ট, স্টেইজটা ছিল দারুণ, সব কিছু হয়েছিল এক্কেবারে সময় মত!

সিডনীতে আমার ছোট্ট একটা রিসেপশন হয়েছিল। সেটাও টিপিক্যাল রিসেপশনগুলোর মত হয় নি। রিসেপশনের সমস্ত দায়ভার পরিচিত আংকেল আন্টিরা নিয়ে নিলেন। ওদের একটাই কথা, আমাদের মেয়েরা বড় হয়ে হয়ে দেশে গিয়ে বিয়ে করে আসে, আমরা বিয়ে খেতে পারি না, মজা করতে পারি না, এটা কোন কথা হলো?! বিয়ের চারশ মানুষের সমস্ত রান্না করলেন সেই আংকেল আন্টিরা, নিজেদের মেয়ের বিয়ে বলে কথা! আংকেলরা এক সাথে হয়ে সারা রাত মশলা বাটলেন, আন্টিরা রাত জেগে জেগে মিষ্টি আর জর্দা বানালেন! আর রিসেপশনের দিন সারাদিন আমার মুখে বিশাল একটা হাসি ছিল, কারণ আমি যেই স্টেইজে বসেছিলাম সেটার মূল ডেকোরেশন এবং প্ল্যানিং করেছে 'বর' স্বয়ং, আমার জামাই!!!

মায়ের বিয়ের কাতান শাড়ি, নিজ স্বামীর হাতের ডেকোরেশন, এগুলো আমি হাজার হাজার টাকা দিয়েও কিনতে পারব না, জানি। কিন্তু অ্যামেচার কিছুই প্রফেশনাল জিনিসের মত এত সুন্দর হয় না। আমার রিসেপশনটা অন্যান্য সব রিসেপশনের মত 'পিকচার পারফেক্ট' হয় নি সত্যি, অনেক কিছুতেই প্রফেশনালিজম বজায় থাকে নি, কিন্তু আমাকে যদি আবার সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে আমি আবারও প্রফেশনালিজমের চেয়ে আন্তরিকতা প্রেফার করব! প্রফেশনালিজমের অনুপস্থিতিতে, আন্তরিকতার উত্তাপে অনেক গল্প জন্ম হয়, সেগুলোই আমার কাছে অমূল্য।

কিন্তু অতিথিদের কাছেও কি তাই? মনে হয় না! ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29208912 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29208912 2010-07-27 19:58:40
কাঁচের বাক্সে জীবন আর কতগুলো হিসাব-নিকাশ
প্রথম যেদিন গিয়েছিলাম, সেদিন কাঁচের বাক্সের ভিতরের বিশজনের একজন ছিল এঞ্জেলা। প্রথম দিনের দুরু দুরু বুকে, রাজ্যের বিষ্ময় নিয়ে উঁকি দিয়ে দেখেছিলাম দুই স্কয়ার ফিটের ছোট্ট কাঁচের বাক্সের ভিতরে রাখা ছোট্ট এঞ্জেলাকে। ছোট্ট মানে সত্যিই ছোট্ট। প্রথম দিনই সাবধানে মেপে দেখলাম, ওর পুরা পায়ের পাতা আমার মধ্যমা আঙ্গুলের এক কড়ের সমান ছিল। যেখানে আর সবাই দিব্যি চল্লিশ সপ্তাহ কাটিয়ে দেয় মায়ের পেটের ভিতর, এঞ্জেলা সেখানে মাত্র পঁচিশ সপ্তাহ পরেই বের হয়ে গেল। তখন তো আর নি:শ্বাস নিতে পারে না, ফুসফুস ভর্তি পানি। চোখ ফুটে তাকাতে পারে না, চোখের মনি তখনও দেখার জন্য পুরাপুরি তৈরি হয় নি ওর। মুখ দিয়ে খেতে পারে না, ওর নাড়ি ভূড়ি তখনও তৈরি হয় নি দুধের জন্য। ওর ছোট্ট শরীরটাকে তখন ওই কাঁচের বাক্সে ঢুকিয়ে দেয়া হলো। ওর ছোট্ট নাক দিয়ে নল ঢুকানো হলো ওকে অক্সিজেন দিতে। মুখ দিয়ে খাবারের নল ঢুকে গেল সোজাসোজি পেট পর্যন্ত।

তবে ছবির বাবুটার মত ওর পায়ের নিচটা এত মসৃন ছিল না। ছোট্ট শরীরে কত শত অসুখ বাঁধিয়ে বসে আছে, সে সব দেখার জন্য ওর পা থেকে রক্ত নেয়া হচ্ছে মাঝে মাঝেই। পায়ের নিচটা তাই মোরব্বার মত ঝাঝড়া হয়ে ছিল।

এত সব রক্ত নেয়া, নল ঢুকানোতে বড় মানুষেরাই কেঁদে অস্থির হয়ে যায়, কিন্তু এঞ্জেলা কি সুন্দর দেবশিশুর মত ঘুমাচ্ছে! অবাক হয়ে ডক্টর কীকে কারণ জিজ্ঞাসা করতেই দেখিয়ে দিলেন কাঁচের বাক্সের উপরের ছোট্ট সিরিঞ্জগুলো। একটায় মরফিন, আরেকটা ক্যাফেইন। প্রতিদিন ভারী ডোজের ঘুমের অষুধ দিয়ে ওকে, ওর মত আর সব শিশুগুলোকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হচ্ছে চব্বিশ ঘন্টা।

এঞ্জেলার ছোট্ট শরীরটা থেকে শুধু রক্তই নিচ্ছিল শুধু ডাক্তাররা। কিন্তু কোন রক্ত দিতে পারছিল না। ফুসফুসের একটা জটিল অপারেশন দরকার ছিল ওর। দরকার প্রচুর রক্ত। কিন্তু এঞ্জেলার বাবা মা জেহোভাস উইটনেস। ওরা বিশ্বাস করে মানুষের রক্তেই আত্মা থাকে। কোন মানুষের শরীর থেকে রক্ত নিবে, আত্মায় মিশ্রন হয়ে যাবে!

প্রতিদিন গিয়ে গিয়ে দেখতাম, ছোট্ট এঞ্জেলা আরও ছোট হচ্ছে। হাপড়ের মত ওঠা নামা করছে বুক। ওর ছোট্ট হৃদপিন্ডটা প্রানপণে কাজ করে যাচ্ছে, ছোট্ট শরীরের অল্প রক্তগুলোই এদিক থেকে ওদিক, ওদিক থেকে এদিক করতে।

এঞ্জেলার বিছানাটা খালি হয়েছিল ওর পাঁচ সপ্তাহ ছয় দিন বয়সে। ডাক্তার আর বাবা মা একমত হয়ে ওর অক্সিজেন সাপোর্ট খুলে ফেলেছিল।

কিন্তু রবার্টের অক্সিজেন সাপোর্ট খুলে ফেলার জন্য ওর মাকে অনেক বুঝিয়েও রাজি করতে পারে নি প্রথমে ডাক্তাররা। রবার্টের মাথা ভর্তি পানি, ওর হার্টের সব রক্ত উল্টো দিকে যাচ্ছে, বেঁচে থাকলেও বিকলাঙ্গ হবে… কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। অনেক পরে রাজি হয়েছিল ওর মা। ওর জমজ ভাই জেসন ছিল বলে রাজি হয়েছিল হয়তো। রবার্ট আর জেসনের ওদের পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী মা সন্তান ধারণের চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন গত দশ বছর। অনেকগুলো ভ্রুন ওঁর শরীরে বুনে দেয়া হয়েছিল গত কয়েক বছরে। কোন ভাবেই ভ্রুনগুলো থাকছিল না। শেষ মেষ রবার্ট আর জেসন থাকল। কত অসুখ নিয়ে জন্মালো দু’জনেই, কিন্তু জেসনের রবার্টের চেয়ে কম। ওর শুধু জন্ম হয়েছে পেটের নাড়ি ভুড়ি শরীরের চামড়ার বাইরে, অপারেশন করে সেগুলোকে ভিতরে ঢুকাতে হলো। ওর ছোট্ট শরীরটা বুকে নিয়ে ওর মা কি ভীষণ খুশি!

অথচ, জেসনের একেবারে পাশের বিছানার ডেভিডকে দেখুন। ডেভিডেরও জন্ম মাত্র সাতাশ সপ্তাহে। জন্মের পর থেকে ওর ছোট্ট শরীরে কত কাঁটা ছেঁড়া, কত নল ঢুকানো, রক্ত বের করা, রক্ত ঢুকানো। কিন্তু ও তবু দিব্যি দুই মাস কাঁটিয়ে দিল হাসপাতালে। তারপর একেবারে ঝরঝরে। পিটপিট করে তাকাচ্ছে এদিক সেদিক। বাড়ি যেতে প্রস্তুত। কিন্তু কোন বাড়ি যাবে? ওর মায়ের তো কোন বাড়ি নেই। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, নেশা করে, আজ এর ঘরে থাকে তো কাল ওর ঘরে। এসটিডি কিলবিল করছে শরীরে। এত এত অনাচার সহ্য করতে না পেরেই তো ডেভিড বের হয়ে গেল তাড়াতাড়ি। কিন্তু ও মরলো না। ওর আগে আরও তিন ভাই বোন হয়েছে ওর মায়ের, কেউই মরে নি। কিন্তু এখন আর কারো হদিশ নেই ওর মায়ের কাছে। হাসপাতাল থেকেই সরকার নিয়ে গিয়েছিল, এদিক সেদিক সন্তানহারা মানুষের বুকে তুলে দিয়েছে হয়তো। কিন্তু ডেভিডদের কেউ নিতে চায় না। মায়ের পেটে থাকা অবস্থাতেই তার শরীরে যত ড্রাগ গিয়েছে, ওর শরীরের ভিতরের অনেক কিছুই আর দশটা শিশুর মত নেই। জন্মের আগে থেকেই নিজের জন্মদাত্রীর সাথে যুদ্ধ করতে করতে ওর অস্তিত্বের জন্ম, ভিতরটা ভেঙেচুড়ে আছে ওর, কিন্তু যুদ্ধ করতে করতে সর্বংসহা ও, ওকে নিশ্চিহ্ন করা সহজ বুঝি?

তারই পাশের রেইচেল--লাল গালের গুটগুটে একটা মেয়ে। দারুণ স্বাস্থ্য, জন্ম হয়েছে একেবারে ঠিক সময়ে। কিন্তু নি:শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল বলে ওকে একটা মেশিনের সাথে লাগিয়ে দিল ডাক্তাররা। তাতে ওর পঁয়ত্রিশ বছরের মায়ের তাতে ভীষণ রাগ! মহিলা একজন নামকরা রিসার্চার। সারা জীবন ব্যর্থতার মুখ দেখেন নি। হাসপাতালে যেভাবে আসেন গটগটিয়ে, ইস্ত্রি করা শার্ট নিপূণ ভাবে ইন করে, বুঝাই যায় না এক সপ্তাহ আগে মা হয়েছেন। তারপর বুকের উপর হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। নাকে নল দেয়া সন্তানকে তিনি ছুঁয়েও দেখতে চান না। রেইচেল ওর পারফেক্ট লাইফে বিশাল এক ইম্পারফেকশন! স্বামীর সাথে শীতল গলায় ঝগড়া করে যান সন্তান সংক্রান্ত এই অনাহূত ঝামেলা। স্বামী বেচারা অপরাধী মুখে মাথা নিচু করে বসে থাকে।

আমি ডেভিডের মাথায় পাতলা চুলগুলো আস্তে আস্তে এলোমেলো করে দেই, রেইচেলের তুলতুলে মুঠিতে নিজের আঙ্গুল ঢুকিয়ে দেই। কাঁচের বাক্সের যান্ত্রিক উত্তাপের মাঝে আমার মানবীয় উষ্ণতা দিয়ে ওদের এই অদ্ভূত পৃথিবীতে অনাহূত আগমনকে স্বাগতম জানানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাই। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29198953 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29198953 2010-07-13 21:49:46
তিন বছরের ন্যানো পিচ্চির সাথে কথোপকথন
আদিবা আমার বিয়েতে এসে খুবই মুগ্ধ। বিদেশ বিঁভূই থাকলে যা হয়, এই প্রথম কোন বিয়ে দেখলো। বাসায় গিয়ে ওর আম্মু আব্বুকে বার বার জিজ্ঞাসা করছে ওর কবে বিয়ে হবে, ওর বর কি করে, বিয়ের সময় ও কিভাবে সাজবে। এসব গল্প ঘুরে ফিরে আমাদের কাছে এসেছে।

কাল রাতে ও যখন আসলো, তখন ওকে নিরীহ মুখ করে জিজ্ঞাসা করলাম, আদিবা, তোমার বিয়ে কবে?

আদিবা খাচ্ছিল। প্রশ্ন শুনে খাওয়া বন্ধ করে চোখ কুঁচকে তীব্র কণ্ঠে বলে, 'ছিহ লজ্জা'।

বুঝলাম, বিয়ের প্রতি অতি আগ্রহ বন্ধ করার জন্য ট্রিটমেন্ট হয়েছিল নিশ্চয়!

টুই আন্টি খুবই স্বাভাবিক মুখ করে বললেন, কিসের লজ্জা? আমরা সবাই বিয়ে করেছি, তোমার আম্মু বিয়ে করেছে, তুমিও করবে। লজ্জা না তো।

আদিবা মনে হয় একটু ভাবল।

একটু পরে টুই আন্টি জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার বর এখন কি করে?'

আদিবার গম্ভীর উত্তর, 'পড়াসুনা'।

টুই আন্টি--'ও হ্যা তাই তো। পড়াশোনাই তো করবে। ক্লাস টু থ্রীতে পড়ে মনে হয়।'

আদিবা আরও গম্ভীর মুখে সাথে সাথে উত্তর, 'না, ওয়ানে পড়ে'। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29197716 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29197716 2010-07-12 06:36:04
ডেড পয়েটস সোসাইটি, পরিবর্তন আর পরিবর্তিত সমাজ
আমার ইংলিশ টিচার মিস র‌্যামজি আমার জীবনে পাওয়া অন্যতম সেরা টিচার। এক কানে দুল পড়তেন। ছোট ছোট ব্লন্ড চুল স্পাইক করা। যখন ম্যাকবেথ হতেন তখন খুনী খুনী শোনাতো, লেডি ম্যাকবেথ হয়ে যখন বলতেন, 'অল দ্যা পারফিউমস অফ পারসিয়া উইল নট সুইটেন দিস লিটল হ্যান্ড', তখন মিসেস র‌্যামজির গলায় তীব্র অনুতাপ, বিষন্নতা উপচে পড়ত, গায়ে শিহরণ হতো। মনে আছে, মাত্র এক বছর আগে বাংলাদেশে বাংলা মিডিয়াম থেকে আসা আমার ক্রিয়েটিভিটির ছোট্ট একটা নমুনা দেখে আমাকে অ্যাডভান্সড ইংলিশের সেরা ক্লাসটায় নিয়ে নিলেন। অথচ তখন আমার ইএসএল (ইংলিশ এজ আ সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ) ক্লাসে বসে গ্রামার করার কথা ছিল। এরকম টিচারেরা ছোট ছোট সুযোগের দিয়ে মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

মিসেস র‌্যামজি হয়তো ভিন্ন চিন্তা করতেন, কিন্তু এখনকার পরিবর্তিত সময়ের জন্যই হয়তো, তিনি হেড টিচার ছিলেন। তাঁর ক্রিয়েটিভির মর্যাদা তিনি পেয়েছিলেন, যা মিস্টার কীটিংস পান নি। র‌্যামজির ক্লাসে টেমপেস্টের সাথে সাথে আমরাও চলে যেতাম সেই যাদুময় দ্বীপে। 'বেল শেক্সপিয়ারের' টেম্পেস্ট দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের, ছোট্ট একটা থিয়েটার, বুঝাই যায় মানুষ কাজের শেষে মাথা ঠান্ডা করার বিনোদনের জন্য যায় না সেখানে। ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টরা, ভিন্ন কিছুর স্বাদের জন্য যায় ওখানে। ডেড পয়েটস সোসাইটির ছেলেগুলো রম্য লিখেছিল মেয়ের অভাব নিয়ে, আর আমাদের স্কুল থেকে নিয়ে যাওয়া সেই নাটিকায় সেকচুয়াল ইমেজারির কোন অভাব ছিল না। নাটকটা দারুন ক্রিয়েটিভ ছিল, কিন্তু পারমিসিভ সোসাইটির কারণে পরিবর্তনটা লক্ষনীয়।

ডেড পয়েটস সোসাইটি অসম্ভব ভালো লেগেছে, শিহরণ হয়েছে, কিন্তু ভাবতে বসে মনে হচ্ছে, মানুষ এক সময় যার জন্য সংগ্রাম করে, পরে এমন একটা সময় আসে যখন সেটার বিরুদ্ধেই আবার সংগ্রাম করতে হয়। এক সময় পশ্চিমা সমাজটা কি ভীষণ রেস্ট্রিক্টিভ ছিল, যেখানে পড়াশোনা করানো হতো এক একটা গাধা বানাতে, মেশিন বানাতে। এখন সেই সিস্টেমটাই এত বেশি পারমিসিভ যে সবার ঘাড়ের উপরই দুইটা করে মাথা। ডেড পয়েটস সোসাইটিতে নীইল বাবা মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অভিনয় করতে না পেরে শেষ মেষ আত্মহত্যা করে। এখন বাবা মাকে যতটুকু সম্মান আর কৃতজ্ঞতা বোধ না দেখালেই নয়, ততটুকুই দেখতে পারি না আশে পাশে।

আমাদের স্কুলটা স্টেইটে রেটিংস বেশ ভালো ছিল, মেয়েদেরও সুনাম ছিল। কিন্তু মিস্টার এন্ডিকটকে সহ্য হতো না বলে ওনার প্যান্টের পিছনে চক দিয়ে চরম অপমানজনক লেখা লিখে সেই নিয়ে হাসাহাসি। অথচ মিস্টার এন্ডিকট নিতান্তই ভালো মানুষ ছিলেন। বোরিং ছিলেন, কিন্তু ভালো মানুষ ছিলেন।

এখানকার স্কুলে পড়েছি বলে সমাজের অনেকটুকু ভিতরে যেভাবে দেখতে পেরেছি ততটা হয়তো অন্য ভাবে দেখা যেত না। তখন মনে হয়েছে, ফ্রি থিংকিং, ক্রিয়েটিভিটি, ভিন্ন চিন্তা, এগুলো সবাই একই অর্থে নিচ্ছে না। কারো কারো কাছে এগুলো অর্থই স্বার্থপরতা, নিষ্ঠুরতা। হবে না কেন, মন কে ট্রেইন করতে না পারলে, অনেকগুলো ভুল ইমোশন কন্ট্রোল নিয়ে নেয়। ক্রোধ থাকা ভালো, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে। অন্যায়ের ডেফিনিশনটা মানুষ ঠিক মত না বুঝলে, তখন ন্যায়কেও অন্যায় মনে হবে। তখন গার্লফ্রেন্ড অনুমতি ছাড়া কম্পিউটার ঘেটেছে , সেটাকে অন্যায় এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার হস্তক্ষেপ মনে হয়ে, সেটাকেও খুনের জাস্টিফিকেশন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে (দ্রষ্টব্য: ৯ জুন ২০১০, সিডনী মর্নিং হেরাল্ড)

এমন ভাবে আটকে রাখা নিদারুণ অনুচিত, যাতে রস কস সব মরে যায়। কিন্তু বড় হওয়ার সময়টায় একটু পথ দেখানোও কি প্রয়োজন না, যেন ভিন্ন চিন্তা, স্বাধীন চেতনার বদলে দৈত্য দানোর জন্ম না হয়? ডেড পয়েটস সোসাইটিতে নীইল যখন আত্মহত্যা করল, তখন খুব হতাশ হলাম। এটা তো 'থিংকিং ফ্রর ইউরসেলফ' না!

পারমিসিভ সোসাইটি থেকে রেস্ট্রিক্টিভ সোসাইটিতে উল্টো হেঁটে যাওয়ায় কোন যৌক্তিকতা নেই। কিন্তু স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছা হয়, সমাজটা এক সময় এমন জায়গায় যাবে যেখানে নিজে নিজে ভাবা মানে ক্রিয়েটিভিটি আর ফ্রি থিংকিঙের বলি দেয়া না, কিন্তু নিজে নিজে ভাবা মানে স্বার্থপরতা আর নিষ্ঠুরতাও না। যেখানে বিপ্লব আর ভিন্ন চিন্তা শুধু নিজের এড্রোনলিন রাশ না, যেই ভিন্ন চিন্তা আর বিপ্লব মানুষের জন্য, সমাজের জন্য। স্বপ্ন দেখি ততটুকু সামষ্টিক বুদ্ধিমত্তার জন্য, যেই পর্যায়ে গেলে পার্থক্যটা বুঝা যায়।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29174647 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29174647 2010-06-11 05:19:02
বেলজিয়াম, বুরকা ব্যান, চরমপন্থী আর মধ্যপন্থী হ্যা অবশ্যই

ফ্রান্সে তো মাঝে মাঝেই বিতর্কের ঝড় উঠে নিকাব বুরকা নিয়ে।

আর বেলজিয়াম ... তর্ক বিতর্কের পালা সেরে পার্লামেন্টের ১৪১ জনের মধ্যে ১৩৯ জনের ভোটে সিদ্ধান্ত হয়ে গেল, বেলজিয়ামের রাস্তা ঘাটে, পার্কে, কোন পাবলিক জায়গায় 'চেহারা অস্পষ্ট হয়ে যায়' এমন কোন 'কাপড়' পরা যাবে না। আইনে বলা নেই, কিন্তু অলিখিত সত্য হচ্ছে, এই আইনের আওতায় পড়ছে একমাত্র মুখ ঢেকে বের হওয়া মুসলিম মেয়েরা।

বেলজিয়াম রাস্তা দেখিয়ে দিল। এখন আস্তে আস্তে ফ্রান্স, জার্মানী, ইংল্যান্ড সে পথে যাবে কি না, তা সময়ই বলে দিবে। বুরকা আর নিকাব ব্যানের যৌক্তিকতা যাচাই করার সময় এখনই। তাই কীবোর্ডে হাত দেয়া।

লেখার সুবিধার্থে কিছু শব্দ ব্যাখ্যা করে নেই যেন পাঠক আর আমি একই শব্দ দিয়ে একই জিনিস বুঝিয়ে থাকি। হিজাব হচ্ছে শুধু মাথার স্কার্ফ, ওড়না ইত্যাদি, যাতে পুরা মুখ খোলা থাকে। আর বুরকা দিয়ে সারা শরীরের সাথে সাথে মুখের পুরাটুকুই বা কিছু অংশ ঢাকা থাকে। নিকাবে শুধু চোখদু'টো খোলা থাকে। বুঝার সুবিধার্থে ছবি দিলাম। তর্ক বিতর্কগুলো নিকাব আর বুরকা ব্যান নিয়েই, হিজাব ব্যানের কথা এখনও কেউ বলছে না।

এখানে উল্লেখ্য যে হিজাব ব্যানের কথা হচ্ছে না মোটেই। হিজাবের সাথে একই দলে পরে যাবে খ্রীষ্টিয়ান নানদের মাথার কাপড়, রক্ষনশীল ইউরোপিয়ান বুড়িদের মাথার স্কার্ফ, শিখদের আর মুসলিমদের মাথার পাগড়ী, তারপর একে একে খ্রীষ্টিয়ান ক্রস, জুইশ টুপি ইত্যাদি। কিন্তু নিকাব বা বুরকা জিনিসটা মোটামোটি স্বতন্ত্র্য। অন্য কোন ধর্মে ধর্মীয় কারণে মুখ ঢাকার চল নেই। তাই এই আইনের আওতায় শুধু মুসলিম মেয়েরা, তাও সমাজের খুব অল্প একটা অংশ আটকা পরে যাচ্ছে।

প্রথম যুক্তি দেয়া হচ্ছে নিরাপত্তা। যার মুখ ঢাকা থাকে, তাকে চেনা যায় না, তাই দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পরে যায়।

যুক্তিটা প্রথমে খুব ই যুক্তিযুক্ত শোনায়। কারণ, সাধারণ চিন্তা বলে, এটাই সবচেয়ে সহজ ছদ্মবেশ। কিন্তু, সত্য হলো: আজ পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বে যত স্বন্ত্রাসী কাজকর্ম হয়েছে, তার কোনটাতেই বুরকা বা নিকাবে মুখ ঢেকে 'অপারেশনে' নামে নি আক্রমনকারীরা। বুরকা পড়লে সন্দেহ বাড়বেই, যারা সন্ত্রাসী তারা আর কিছু না হোক, ছদ্মবেশের উপর ভালোভাবে রিসার্চ করে নেয়, বুরকার মত এত সহজ ছদ্মবেশে ঢুকবে না।

সব ধরণের ছদ্মবেশ থেকে দেশকে মুক্ত রাখার পরবর্তী ধাপ হতে পারে এরকম: বেলজিয়ামে ঢুকার সাথে সাথেই সবার দাড়ি গোফ কেটে পরিষ্কার করতে হবে। বেলজিয়ামের ভিসা পাওয়ার পূর্ব শর্ত হবে সাথে ক্লীন শেভড একটা ছবি থাকতে হবে। আফটারঅল, সব সন্ত্রাসী আর ক্রিমিনালরাই ছদ্মবেশের শুরু করে দাড়ি গোঁফ দিয়ে…
দ্বিতীয় খুবই কমন কিন্তু একই রকম উদ্ভট যুক্তি হচ্ছে, নিকাব, বুরকা মেয়েদের জন্য অবমাননাকর। যেই মেয়েটা বুরকা পড়ছে, সে কি নিজের অস্তিত্ব নিয়ে বিব্রত? মুখ ঢাকতে হবে কেন? নিকাব আর বুরকার মত অপমান থেকে মেয়েদের বাঁচাতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আবশ্যক।

এই যুক্তিটা যারা দেয়, তারা বলে না, বেলজিয়ামে মাত্র ৩০ জন মেয়ে নিকাব পরে!
ধরে নিলাম নিকাবে সেই ৩০ জনের নারীত্বের ভয়াবহ 'অবমাননা' হচ্ছে। কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি সংখ্যক 'বেলজিয়ান' মেয়েরা প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রকৃতি প্রদত্ত চেহারা নিয়ে অশ্রুজল ঝরাচ্ছে। হাজার হাজার টাকা হাতে নিয়ে ছুটে যাচ্ছে কসমেটিক সার্জারী করে ভোঁতা নাককে খাড়া করতে, মোটা ঠোঁটকে চিকন করতে, নিচু বুককে উঁচু করতে আর উঁচু বুককে নিচু। মুখের কুঁচকানো চামড়াকে টেনে সোজা করতে। ব্রিটেনে প্রতি বছর ১ লক্ষ প্লাস্টিক সার্জারী হয়, আমেরিকায় ২০০৭ সালে ১২ মিলিয়ন প্লাস্টিক সার্জারী হয়েছিল। প্রতিদিন এর চেয়েও আরও অনেক বেশি মেয়ে ছুটছে চুলের রং, নখের রং, গায়ের রং, ভুরুর আকার বদলাতে। প্লাস্টিক সার্জারীর বিজ্ঞাপন হিসেবে একটা ওয়েবসাইটে লেখা:
"Cosmetic surgery is about perception and self esteem. The perception of looking and feeling good about your body image sends a signal to the world that you are confident and successful." (কসমেটিকপ্লাস্টিক ডট কো ডট ইউকে)।
মহা আশ্চর্য হয়ে ভাবতে হয়, এত ভয়াবহ কথাগুলো স্পষ্ট করে বলার পরেও প্লাস্টিক সার্জারী আর বিউটি পার্লারের রমরমা ব্যবসার কিছুই হয় না, বেলজিয়ামের, ফ্রান্স আর ব্রিটেনের লক্ষ লক্ষ মেয়ে ছুরি কাঁচির যন্ত্রনা সহ্য করে যায় নিজেদের চেহারা নিয়ে 'লজ্জা' কাটাতে, আর দেশের মাত্র ৩০ জন মেয়ের চেহারা নিয়ে লজ্জাবোধ কাটাতে একেবারে পার্লামেন্টের আইন পাশ! বাহ!
যারা উপরের যুক্তিটা দিয়েই নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন, তারা নিজেদের শুধরে নেন নিচের যুক্তিটা দিয়ে: অনেক মেয়েকে জোর করে নিকাব পড়ানো হয়। বাবা, স্বামী বা ভাই, সোজা কথা পুরুষ আত্মীয়দের এই অন্যায় অবিচার থেকে মেয়েদের রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এই যুক্তির সাথে আমি পুরাপুরি একমত। আমার এক বিন্দু দ্বিমত নেই সত্যি।
যেই মেয়েদের জোর করে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিকাব পড়ানো হয়, বুরকায় আবৃত করা হয়, তাদের মুক্তির দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের।

কিন্তু বুরকা ব্যান কি আসলেই সমস্যার সমাধান? যেই মেয়েরা মুখ থেকে একটা পাতলা কাপড় সরাতে পারে না পুরুষ আত্মীয়দের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে, বুরকা ব্যান করলেই কি ওদের মুক্তি হবে? না। তখন সেই পুরুষ আত্মীয়রা তাদের 'সম্মান' আর 'ধর্ম' রক্ষার খাতিরে তাদের ঘর থেকেই বের হতে দিবে না। বুরকা পড়ে ঘর থেকে বের হওয়ার স্বাধীনতাটুকু তো ওরা অন্তত: ভোগ করতে পারত, প্রয়োজনে সরকারী বেসরকারী সংস্থাগুলোর সাহায্য নিতে পারত, বেলজিয়ান সরকার সেই পথটুকুও সেঁটে বন্ধ করে দিল।

আর নারী আন্দোলন, আর নারী মুক্তির কথা যারা বলে, তারা কিভাবে এই আইনকে সমর্থন করছে, যেখানে পশ্চিমে বেশির ভাগ নিকাব পরিহিতাই নিজের ইচ্ছায়, জেনে বুঝে নিকাবকে গ্রহন করে? আমি সিডনীতে মাত্র দুইজন নিকাবীকে চিনি। এদের দুইজনই টিনেজ থাকা অবস্থায় ইসলামে এসেছে। একজনকে নিয়ে একবার লিখেছিলামও। এরা অধিকার সচেতন, আত্মসচেতন, আত্মবিশ্বাসী, সফল, বুদ্ধিমতী মেয়ে। নিকাব ওদের নিজেদের বেছে নেওয়া। ওদের কাছ থেকে নিকাবের অধিকার কেড়ে নেওয়া মানে হচ্ছে একটা মেয়ে যা 'উম্মোচন' করতে চাইছে না, তা উম্মোচন করতে তাকে বাধ্য করা। নিকাব দিয়ে শুরু এই আধুনিক বর্বরতা।

একটা আইন করার আগে ভবিষ্যতে এর প্রভাব কি পরতে পারে, সেটা ভাবতেই হবে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মত মানবাধিকার সংস্থাগুলো বেলজিয়ামের নিকাব ব্যানের বিরোধিতা করেছে, প্রতিবাদ করেছে, সুদূরপ্রসারী ঋনাত্মক প্রভাবের ভয়ের কথা জানিয়েছে। চিন্তা করে দেখুন, ফেইথ মরিসদের যখন রাষ্ট্রীয় ভাবেই আইনের রক্ষকেরা যখন ওদের পথে ঘাটে, পার্কে আইনের দোহাই দিয়ে মুখ খুলতে বাধ্য করে অপমান করবে, তখন সাধারন মানুষেরা কি করবে? বর্ণবাদী, রেইসিস্ট, অজ্ঞ মানুষের কি অভাব আছে, যারা আইনকে নিজের মত করে ব্যাখ্যা করবে? সরকার যেখানে নিজেই বলে দিচ্ছে মুখ ঢাকতে হলে সেই দেশের মাটিতে জায়গা হবে না, সেই মানুষগুলোর প্রতিক্রিয়া তখন কেমন হবে? বিবিসির একটা অপিনিয়ন পোলে একজন বেলজিয়ান আইনের সার্থকতা যাচাই করেছিলেন এক বাক্যে:
"This law will offend those who want to wear headscarves, crucifixes or other symbols of their religion, and only benefit those who are somehow offended by seeing the symbols of other people's beliefs in public."
'... এই আইনটা শুধু তাদের উপকারে আসবে যারা অন্যদের বিশ্বাসের প্রকাশ্য চিহ্ন দেখতে অস্বস্তি বোধ করে'।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ছয় লাখ ইহুদীকে ধুঁকে ধুঁকে মারার প্রক্রিয়াটা একদিনে শুরু হয় নি। দীর্ঘদিন ধরে জার্মানদের বুঝানো হয়েছে, ইহুদীরা পঁচা, ওদের জার্মানীতে থাকার অধিকার নেই। আস্তে আস্তে একদিন ইহুদীদের থাকার জায়গাগুলোর চারপাশে দেয়াল তুলে দেয়া হলো। ইহুদীদের গায়ে হলুদ রঙের তারা ঝুলিয়ে ঘুরতে হতো, সীল ছাপ্পড় দেয়া জন্তুর মত। ইউরোপ এই ভয়াবহ গণহত্যার সাক্ষী, তাই একটা জাতিকে কিভাবে সেই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় সেটা ইউরোপ খুব ভালো বুঝে।

তারপরেও, মানুষ বার বার ইতিহাসের নিদারুণ ভুল চক্র ধরে হাঁটতে থাকে


------

লেখাটা লিখেছিলাম ৬ মে। এর পরের আপডেইট:
১. ইংল্যান্ডে ভোট হয়ে গিয়েছে এবং উপরের মন্তব্য করা ভদ্রলোকের দল সংসদে একটা সীটও পায় নি! <img src=" style="border:0;" />


২. ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট সারকোজি বুরকা ব্যানের সিরিয়াস মিশনে নেমেছেন। তাঁর ভাষায়:
 ''We are an old country anchored in a certain idea of how to live together.
''A full veil which completely hides the face is an attack on those values, which for us are so fundamental. Citizenship has to be lived with an uncovered face. There can therefore be absolutely no solution other than a ban in all public places.''

পড়ে কিছুক্ষন চুপচাপ বসে ছিলাম, হতভম্ব হয়ে। একটা পশ্চিমা দেশের প্রেসিডেন্ট, তাও ফ্রান্সের মত প্রগতিশীল সরকার কিভাবে এই কথা বলে পার পেয়ে যায়: ''We are an old country anchored in a certain idea of how to live together." "আমরা একটা প্রাচীন দেশ, একসাথে থাকার জন্য আমাদের কিছু নিজেস্ব নির্দিষ্ট ধারণা আছে।"
পুরানো দেশ, এক সাথে থাকার নির্দিষ্ট ধারণা, পশ্চিমা একটা দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে ও এটা কি বলে?
এর পরে কি বলবে, ফ্রেঞ্চরা ঐতিহ্যগত ভাবে কখনও সুশি খায় নি, তাই চাইনীজদের ফ্রান্সে থাকতে হলে সুশি খাওয়া বন্ধ করতে হবে? ফও কি সাদাদের বর্ণবাদী ইতিহাস জানে না? ভিন্ন সংস্কৃতিকে জড়িয়ে ধরতে না পারার সংকীর্ণতাকে দু'পায়ে ঠেলে দূরে পাঠানো কি বর্তমান পশ্চিমের জীবনধারার আদর্শের অংশ না?


৩. অস্ট্রেলিয়ার সিনেটে উঠেছে বুরকা ব্যানের তর্ক । তাতে মাত্র ৩ জন হ্যা ভোট দিয়েছে! থ্যাংক য়ু অস্ট্রেলিয়া! ফ্রেড নীলের অবশ্য বুরকা এলার্জি বহু আগের। কয়েক বছর পর পরই বুরকা ব্যানের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু তেমন কাউকে পক্ষে জুটাতে পারে না।


৪. ফ্রান্সের বুরকা ব্যান আলোচনার (বুরকা ব্যান অফিশিয়াল হওয়ার আগেই) প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া: একজন আইনবিদ নিজ হাতে আইন তুলে নিয়ে শপিং সেন্টারে একজন নিকাবীর নিকাব টেনে ছিঁড়ে ফেলেন।
Click This Link

আমি নিকাব পড়ি না। কিন্তু চিন্তা করি আমার দাদী, যিনি সারা জীবন পর পুরুষের সামনে মুখ ঢেকে চলেছেন, তিনি ফ্রান্সে গেলে শপিং সেন্টারে যদি তার নিকাব ছিঁড়ে ফেলতেন একজন দাম্ভিক আইনবিদ, আমার কেমন লাগত? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29159409 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29159409 2010-05-21 06:50:13
ডিসেনসিটাইজেশন, সমকামিতা আর পেডোফিলিয়া
ডিসেনসিটাইজেশন যেমন মানসিক অসুস্থতা সারাতে থেরাপি হিসেব কাজ করে, তেমনি ভিন্ন ধরণের ডিসেনসিটাইজেশন সুস্থ মানুষকেও মানসিক ভাবে অসুস্থ করে দিতে পারে। এই ডিসেনসিটাইজেশন প্রক্রিয়া ব্যবহার করে আর্মিকে ট্রেইনিং দেয়া হয়। যেই ছেলেটা মাত্র আর্মিতে ঢুকেছে, তার হাতেই চাবুক তুলে দিলে সে ইন্টারোগেশনের সময় সেটা ব্যবহার করতেই পারবে না। তাই আমেরিকানরা একটা দারুণ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল। আর্মিতে আসা নতুনদের ইন্টারোগেশন রুমের দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখতো, ভিতরে সিনিয়ররা ঝাল মিটিয়ে রক্তারক্তি করে ইন্টারোগেইট করতো। বাইরে বসে থাকা নতুনেরা শুধু সেটা শুনতো। পরের দিন, শোনার পাশাপাশি, বাইরে থেকেই দেখার ব্যবস্থা হয়ে যেত। এরপর যখন ওদের হাতে চাবুক তুলে দেয়া হতো, তখন ওরা খুব সহজেই রক্তারক্তি করতে পারত।

রিসার্চে দেখা গিয়েছে যেসব শিশুরা এমন ভিডিও গেইম খেলে যেখানে মারামারি, রক্তারক্তি বেশি, সেই সব শিশুরা আস্তে আস্তে সেগুলোকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। তখন খেলার মাঠে কাউকে পছন্দ না হলে ঘুষি দিয়ে নাক ফাটিয়ে দেয়া তার কাছে কেবল স্বাভাবিকই মনে হয় না, উচিত বলে মনে হয়।

একটা সময় ছিল, খুব বেশি আগে না, একশ-দেড়শ বছর আগেই বিয়ের আগে প্রমিকার হাত ধরতে পারাই ছিল বিরাট ব্যাপার। জেইন অস্টেনের 'এমা' পড়তে গিয়ে চমকে উঠেছিলাম, যখন পড়লাম মিস্টার এলটন ঘোড়ার গাড়িতে 'মেইড ভায়োলেন্ট লাভ টু এমা'। পরে টিচার বুঝিয়ে দিলেন, মিস্টার এলটন জেইনের হাত ধরে প্রেম নিবেদন করেছিল। মাত্র দেড়শ বছরেই মেইকিং ভায়োলেন্ট লাভের সংজ্ঞায় অস্বাভাবিক রকমের পরিবর্তন। উদাহরন দিলাম জেইন অস্টেনের, সেটা মনে আছে বলে, কিন্তু মাত্র একশ বছর আগের শরৎচন্দ্রের সাহিত্যেও থীমটা ওরকমই। মুসলিম সাহিত্যিকদের সাহিত্যে তো ব্যাপারগুলো আরও সিরিয়াস ছিল।

মাত্র একশ বছরে পৃথিবীর কি ভীষণ পরিবর্তন। এর কিছু কিছু হয়তো দরকার ছিল, কিন্তু মানুষ সীমারেখাগুলো ধাক্কা দিয়ে সরাতে সরাতে এখন এমন অবস্থায় এসে পড়েছে যে সীমারেখাগুলো এখন কনফিউজিং।

যেই বাবা মায়েরা বিয়ের আগে হাত ধরার অধিকার নিয়ে যুদ্ধ করেছিল, তারা হঠাৎ করে টের পেল, তাদের ছেলেমেয়েরা বিয়ের আগে সঙ্গী/সঙ্গিনীর পুরাটুকুই উপভোগ করার অধিকার চায়। আর যেই বাবামায়েরা বিয়ের আগে সঙ্গী সঙ্গিনীর পুরাটুকুই উপভোগ করেছিল, তারা হঠাৎ টের পেল, তাদের ছেলেমেয়েরা আর বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আগ্রহী নয়।

এই সামাজিক আন্দোলনগুলো খুব কাছাকাছি হয়েছে। যেহেতু এই সীমারেখা নির্ধারনের একমাত্র একক ছিল মানুষের গণমত, সে জন্য মানুষের গণমত বদলানোর সাথে সাথে এই সীমারেখাগুলো বদলানো কেবল সময়ের ব্যাপার।

সমকামিতার ইতিহাস খুবই ইন্টারেস্টিং। আর একশ বছর আগেও সমকামিতা যে কি জিনিস, এবং সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ যে এরকম করতে পারে, সেটা সাধারন মানুষেরা চিন্তাও করতে পারতো না। এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় সমকামিতা নিয়ে একটু একটু লেখালেখি শুরু হলো, এবং সেটা থামলো না। আস্তে আস্তে সমকামীদের আন্দোলনের জন্য সমকামিতার যেটা আমার কাছে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং লাগে সেটা হচ্ছে, ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সমকামিতা মনোবিজ্ঞানীদের জন্য তৈরি করা মানসিক অসুস্থতার লিস্ট আইসিডি-৯ এ ছিল, অর্থ্যাৎ ১৯৯০ সাল পর্যন্ত, মাত্র ২০ বছর আগ পর্যন্ত সমকামিতাকে মানসিক অসুস্থতা হিসেবে গণ্য করা হতো। এরপর ক্লাসিফিকেশনটা বদলানো হয়েছে গণমতের চাপে পড়ে।

এরপরে শুরু হলো অদ্ভূত সব ব্যাপার। মানুষ বিয়ে করে, ২/৩ বাচ্চার বাবা মা হয়ে হঠাৎ করে বলা শুরু করলো, এখন আর সে নিজের স্বামী/স্ত্রীর প্রতি আগ্রহ নয়, তার সমকামিতার আগ্রহ হচ্ছে। এরকম খবর এখনও পর্যন্ত পত্রিকায় আসছে প্রায়েই, তাই গুগল সার্চ করলেই পাবেন অনেক খবর। সমকামিতা থেকে সমস্ত ট্যাবু উঠানোর আইনী ব্যবস্থা নেয়া হলো। ১৯৮০ সালের আমেরিকাতেও মাত্র ৩৪% মানুষ ভাবতো, সমকামিতা (নিজের জন্য না হলেও অন্য মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে) গ্রহনযোগ্য একটা জীবন পদ্ধতি। এখন সংখ্যাটা আরও অনেক বড়। এখন সমকামিতার কনফেশন মোটামোটি একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এত কথা বলার কারণ সমকামিতা নিয়ে কথা বলা না, যৌনতা নিয়ে আমাদের সামগ্রিক ডিসেনসিটাইজেশন নিয়ে বলা। কখনও ভেবেছেন, আমরা নিজেরাই যেই সীমারেখা নিজ হাতে দূরে ঠেলছি, বড় করছি, এর পরিনতি কোথায়, শেষ কোথায়?

চিন্তাগুলো আসলো, চার্চের শিশু যৌন নির্যাতনের খবরগুলো পড়তে গিয়ে। পেডোফিলিয়া জিনিসটা এত জঘন্য, যে আমি খবরগুলো প্রথম দিকে এড়িয়ে চলছিলাম। এখন দেখলাম, ইস্যুটা পোপ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে, তাই পড়তে পড়তে বেশ কিছু উদ্ভট খবরের মুখোমুখি হলাম। যার একটা হচ্ছে , ২০০৩ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশনের বাৎসরিক সম্মেলনে আমেরিকার বড় সড় মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে বেশ এক পরশ বিতর্ক হয়ে গিয়েছে, 'পেডোফিলিয়া' কে কি মানসিক অসুস্থতা হিসেবে রাখা হবে, নাকি হবে না, সেই নিয়ে। আমি খবরটা পড়ে কিছুক্ষন থ' মেরে বসে থাকলাম। এও সত্যি হতে পারে! পেডোফিলিয়া, ছোট ছোট নিষ্পাপ শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন মানসিক অসুস্থতা নাকি সুস্থতা, সেটা নিয়েও মানুষ 'বিতর্ক' করতে পারে? এটা কি সত্যিই সম্ভব? চোখের সামনে ভেসে উঠলো অসংখ্য খবর, বেশ কিছু মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কখনও নিজের বাবা, কখনও চকলেটের লোভ দেখিয়ে প্রতিবেশী, কখনও চার্চের প্রিস্ট, নিষ্পাপ শিশুদের টলটলের মনের সুযোগ নিয়ে সারা জীবনের জন্য ক্ষত সৃষ্টি করে দেয় ওদের মনে। একদিনের অল্প কিছু সময়ের জন্য এক এক জন মানুষের সারা জীবন বদলে গিয়েছে। হয় তারা নিজেরাই অসুস্থ হয়ে গিয়েছে, না হলে অস্বাভাবিক সব ফোবিয়ায় ভুগেছে। এই পেডোফিলিয়া মানসিক অসুস্থতা কি না, সেটাও বিতর্কের বিষয় হতে পারে?


তারপর মনে হলো, এটা হয়তো শুরু। ঠিক যেভাবে সমকামিতার আন্দোলন শুরু হয়েছিল, এখনও বোধ হয় তাই হচ্ছে...

খুব ভয় হলো আমার, আমরা কি ভয়ংকর একটা পৃথিবী তৈরি করছি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য, যেখানে ওভার এক্সপোজারের জন্য অসুস্থ একদল চরম ডিসেনসিটাইজড মানুষ থাকবে কেবল, যাদের কাছে কোন সীমারেখাই অর্থবহ হবে না, কোন বিকৃতিই আর বিকৃতি থাকবে না... ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29135285 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29135285 2010-04-15 08:51:05
গান শুনি না
আমি আর গান শুনি না। (গান বলতে এখানে বাদ্যযন্ত্র সহ যে কোন গান বুঝাচ্ছি, যদিও বাদ্যযন্ত্র ছাড়া গানও আর শোনা হয় না... সময়ের অভাব বা ইচ্ছার অভাবে, জীবনে ফাঁকা জায়গার অভাবে! সুরওয়ালা কিছু শোনা হলে একমাত্র কুরআন তেলওয়াতই শোনা হয়।)

মোটামোটি ক্লাস সেভেন এইট থেকে আমি নচিকেতা, সুমন, অঞ্জন আর রবীন্দ্র সংগীতের হাত ধরে গানের জগতের যেই স্বাদ পেয়েছিলাম, সেটা আমাকে বুদ করে রাখতো, সেখান থেকে কখনও বের হতে চাই, তাও ভাবি নি। আমার হার্ড ড্রাইভে গানের সংখ্যা হাজার ছাড়াতো তো অবশ্যই, সিডিতেও ইনভেস্ট করেছি প্রচুর। গান শুনতাম, গাইতাম, শোনাতাম। সুন্দর কোন গানের সন্ধান পেলে সেটা আমাকে ঘন্টার পর ঘন্টা মাতিয়ে রাখতো, নতুন কোন সুরের ভাঁজ আবিষ্কার করতাম, অকারণ মন খারাপ করতাম।

গানের জাস্টিফিকেশন আমার কাছে ছিল এরকম--'এতে কোন ক্ষতি নেই'। হিসেবের ধরণটা একটু বদলিয়েছে গত দুই এক বছরে। এখন জিজ্ঞাসা করার চেষ্টা করি, 'এতে কি কোন লাভ আছে?' প্রথম এই প্রশ্নটা যেদিন করেছি, সেদিন গান আটকে গিয়েছে। রোজার সময় অপ্রয়োজনীয় কাজ কাটছাট করতে গিয়েই তাই গান লিস্টের বাইরে চলে গিয়েছিল। ব্যাপারটা খুব সহজাত ভাবে এসেছে, যেটা আমাকে অবাক করেছে। গান যে আমার কি ছিল, সেটা আমি জানি বলেই অবাক করেছে! তারপর আর গান টানে নি, গান মিস করি না। স্বস্তি বোধ করি, ব্যক্তিগত জীবনের এমন একটা প্র্যাকটিস যেটা আসলে অন্য কাউকে এফেক্ট করবে না, স্রেফ আমার নিজের ভালো লাগা খারাপ লাগাকে এফেক্ট করতো, সেখানে বিতর্ক (আপনার আমার বিতর্ক না, শরীয়তের বিতর্ক, যেখানে পরকালীন ব্যপার স্যপার জড়িত) থেকে সরে আসতে পেরেছি বলে। তারপর নতুন ল্যাপটপে কোন গান নেই নি, আইপডও গানমুক্ত। বছর দেড়েক হবে মনে হয়।

গান সম্পর্কিত ফতোয়া সম্বন্ধে নতুন কিছুই পড়ি নি, কারণ এই ব্যাপারে আমার পড়াশোনা খারাপ ছিল না। এতটুকু বুঝতাম, এটা ভীষণ রকমের বিতর্কিত এটা এলাকা। কিন্তু যেটা বুঝতাম না, সেটা হচ্ছে, এটা নিয়ে বিতর্ক করার অধিকার আমার নেই, ব্লগে যাদের সাথে বিতর্ক হয়েছিল, তাদেরও নেই। এটা নিয়ে ওভাবে মত প্রকাশ করে বিতর্ক করায় তাই আমি লজ্জিত। আগের পোস্টটা তাই ড্রাফটে চলে গিয়েছে। কারও এ সম্পর্কিত ফতোয়া জানার দরকার হলে অসংখ্য আলেম আছেন চারিদিকে। এ ব্যাপারে কারও উপর কোন নির্দেশনা আমি চাপিয়ে দিতে রাজি নই!

এই পোস্টটা লেখা প্রয়োজন মনে হয়েছে, কারণ, আমি চাই না আমার ব্লগ পড়ে যে গান শুনতে চাইতো না ধর্মীয় কারণে, সেও নিজের প্র্যাকটিস বদলে ফেলে। আমার ওগুলো স্রেফ ব্লগ ছিল, ওয়েব লগ, আমার তাৎক্ষনিক চিন্তাভাবনার লগ, জ্ঞানের অলংঘনীয় উৎস নয়।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29134749 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29134749 2010-04-14 11:44:23
দুই শূণ্য শূণ্য নয় (পূর্ণ্য পূর্ণ্য) জানুয়ারি
দুই দুইটা মানুষের জন্ম হওয়া দেখলাম একদিনে। দু'টোই সিজারিয়ান অপারেশন ছিল। দেখতে দেখতে মনে হলো, আরে, মানুষের জন্ম হওয়ার মত এত সিরিয়াস ব্যাপার আসলে খুব কঠিন না। প্রথমে ক্যাথেটার ঢুকায়, যেটা দেখতে খুব খারাপ লাগছিল, কারণ মনে হচ্ছিল বাংলাদেশে গরিবের মেয়েদের প্রাইভেসি থাকতে নেই। এক গাদা ইন্টার্ন ডাক্তার, বড় ডাক্তার, নার্স, আয়া, বয়ের সামনেই একটা মেয়ের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে কষ্টের ঘটনাটার লজ্জাজনক সুচনা হয়। তারপর, বড় একটা সুঁই দিয়ে পিঠের নিচের দিকে এপিডিউরাল দেয়া হয়। তার কিছুক্ষন পরে একটা তরল মেখে এক পোঁচে পেট কেটে ফেলা হয়, তারপরে হাত ঢুকিয়ে একটা রক্ত মাখানো মাংসের পুটলি বের করে আনা হয়। তখন ডাক্তাররা সবাই খুব খুশি হয়ে যায়। 'এই মেয়ে হয়েছে', 'তিন কেজি!', 'ওয়েল ডান', 'দেখেন, কত সুন্দর মেয়ে'। তারপর হঠাৎ করে আবার সবাই খুব সিরিয়াস, যে সেলাই করছে, সে চিৎকার করে এই কেঁচি, সেই তুলা, ওই সূতা চায়। তার কিছুক্ষনের আবার সব স্বাভাবিক।

স্বাভাবিক জন্ম দেখার জন্য ডেলিভারি রুমে ঢুকেছিলাম। দেখলাম, একটা পেট উঁচু মেয়ে দুই পা ফাঁক করে একা একা শুয়ে আছে। পরণে ম্যাক্সি কোমর পর্যন্ত গুটানো। একটা চিকন রক্ত ধারায় বিছানার ওয়েলক্লথ ভরে যাচ্ছে। সাথে সাথে বের হয়ে চলে আসলাম। কয়েকবার ডিউটি ডাক্তারের চাপাচাপিতেও দ্বিতীয়বার আর ঢুকতে রাজি হই নি।

ফেব্রুয়ারি
সেন্ট মার্টিনসে অনেক অনেক মাছ ভাজা আর ডাব খেলাম। ঘোলা পানিতে স্নর্কলিং করলাম। বার্মিজ আচার খেয়ে পেট খারাপ করলাম। জীবনের শ্রেষ্ঠ রিকশা ভ্রমন করে কক্সবাজার থেকে হিমছড়ি গেলাম। সমুদ্র সৈকতে ঝাউবনের ছায়ায় বসে বার্মিজ গামছা বিছিয়ে দুপুরের খাবার খেলাম।

কোলকাতার ভাঁড়ের চা খেলাম। প্রেসিডেন্সি কলেজের সামনে একটা সাদা লুঙ্গি পড়া বুড়া লোকের মমতা মাখা 'মা' ডাক শুনে চোখ ভিজিয়ে ফেললাম।দীপা আর অনিমেষের কফি হাউজ আর কলেজ স্ট্রীটের বইয়ের দোকানে ঘুরলাম। নাখোদা মসজিদের শীতল সিমেন্টে কপাল ঠেকিয়ে সিজদা দেয়ার সময় ভাবলাম, পৃথিবীর সব মসজিদে গেলেই নিজের বাড়ি নিজের বাড়ি মনে হয়।

দুবাই এয়ারপোর্টে এক রাত কাটালাম। 'ক্যাশ কনভার্টার বুথে' সাথের সমস্ত বাংলাদেশী আর ভারতীয় বড় নোট, ছোট নোট আর খুচরা পয়সা ভাঙিয়ে একটা টুনা স্যান্ডউইচ আর কফি খেলাম।

পড়াশোনা শুরু করলাম খুব অনিশ্চয়তা আর অনাগ্রহ নিয়ে। প্রতিদিন বকা খাই। মন বসে না।

মার্চ
প্রজেক্ট বদলাতে হলো। এক মাস পরে লিটারেচার রিভিউ ডিউ।

এপ্রিল
জার্নাল পড়তে পড়তে একসময় পড়ার, লেখার আর চিন্তা করার জগতে ঢুকে গেলাম। স্বপ্নে তখন থিওরী দাঁড় করানোর চেষ্টা শুরু করলাম। লিটারেচার রিভিউ জমা দিলাম সহিসালাহ মত।

মে
কয়েক ইঞ্চি ইঁদুর বাচ্চাগুলো হাতে নেয়া শরু করতেও বিপুল সাহস অর্জন করতে হলো। হাতে নিলেই ছোট ছোট নখ দিয়ে আঁচড়ানো শুরু করে, একটু আগে মাকে ধরায় গ্লাভসে মায়ের গন্ধ। আমার হাত কাঁপতে থাকে, বুক দুরু দুরু।

জুন
রুটিন = ল্যাব-ইদুর-বাসা-ইন্টারনেট-ঘুম-ল্যাব…

মাঝে মাঝে রুটিনে ছেদ পড়ে ল্যাবের নানা নাটকে।

যেই বন্ধুরা চাকরি করছে, তারা যখন কলিগদের পলিটিক্সের কথা বলত, তখন হাসি পেত। মনে হতো, কি ছেলেমানুষী। সারাদিন ল্যাবে কাটাতে কাটাতে, আর দায়িত্ব নিয়ে প্রজেক্টের কাজ করতে গিয়ে টের পেলাম, বিজ্ঞানী আর ইউনিভার্সিটির লেকচারার হলেও কি, কিন্ডারগার্টেন পলিটিক্স, ছেলেমানুষী এখানেও আছে! এই ছেলেমানুষী পলিটিক্সটা বিচ্ছিরি মাকড়শার জালের মত। নিজের মধ্যে সামান্য সমস্যাও থাকলে, ইকটুশ খানি ফাঁকিবাজি বা অস্পষ্টতা থাকলেই এই জালে জড়িয়ে যেতে বাধ্য। যে আঙ্গুল তুলছে তার সারা শরীরে দগদগে বসন্ত, কিন্তু আঙ্গুল তুলতে পারছে বলেই অপরজনের মুখের একটা লাল ব্রনকেও ভয়াবহ বিচ্ছিরি লাগছে।

একজন মানুষকে চেনার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে, তাকে একটা ঝামেলায় ফেলে দেয়া। এত সব কান্ডের ভালো দিক ছিল, বেশ একটা দারুণ সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্ট হয়ে গেল।

মালয়শিয়ান একটা চাইনীজ ডাক্তার ফ্যাং, আমাদের ল্যাবে পিএইচডি করছি। ফ্যাং অসম্ভব সৎ। কখনও মিথ্যা বলে না, বাড়িয়ে বলে না, অনুমানে বিন্দুমাত্র কথা বলবে না। ওর এই সমস্ত গুণের জন্যই ও একেবারে আদর্শ বিজ্ঞানী।

ল্যাবের অন্যান্যরা পিছনে পিছনে লাগাচ্ছে, আসল ঘটনাকে অনেকগুণ বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছে, আস্তে আস্তে আসল ঘটনা ফুলে ফেপে একাকার। এ সব কিছু হচ্ছে, যাকে নিয়ে এতসব ঘটনা, পুরাপুরি তার অজান্তে। একটা অদ্ভূত 'সুশীলতার' মুখোশ পরে ঘুরছে মানুষ, যাকে নিয়ে কলিজা ফাটিয়ে গীবত করলো, তার সামনে একটু পরেই অমায়িক হাসি।

অন্যদিকে এমনও আছে, যে, যাকে সহ্য হচ্ছে না, তাকে পুরাপুরি না দেখার ভান করে দিন কাটাচ্ছে। রুমে ঢুকে সবাইকে সুপ্রভাত কামনা করে দিব্যি একজনকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। কনটেম্পট দেখানোটা যে একধরণের প্রবল রকমের চারিত্রিক দুর্বলতা, সেটা ভালো ভাবে বুঝলাম।

কিন্তু ফ্যাংকে আমি কখনও গীবত করতে দেখি নি। আর কখনও কোন কিছু অপছন্দ হলে সেটা বলতে দেরি করতে দেখি নি। আর ও যখন ভুল ধরিয়ে দেয়, সেখানে জয়ী হওয়ার আনন্দও দেখি নি! ফলে, ফাঁকিবাজেরা ওর আশে পাশে অস্বস্তিতে থাকলেও ওর শত্রু নেই একদম। ছোটবেলা মাধবী আপার মত ভালো স্কুল টিচার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। নতুন স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম, ফ্যাঙের মত মানুষ হওয়া।


জুলাই
ল্যাব-ইদুর-বাসা-ইন্টারনেট-ঘুম-ল্যাব… এর ফাঁকে ফাঁকেই ভবিষ্যত নিয়ে ভাবা শুরু করলাম।

এরকম করে পরবর্তী জীবনের বাকি প্রতিটি দিন, এবং এর চেয়েও ক্রমবর্ধমান ব্যস্ততায় নিজেকে ভাবতে পারছিলাম না। আমার সুপারভাইজারের নিজের সংসার নেই, উইকেন্ডেও ইউনিতে কাটায়, ওনার রিসার্চই ওনার বিনোদন, ঘুম। এরকম জীবনের ফলাফল কি? রিসার্চ প্রকাশিত হলে অনেক অনেক নাম, ডাক, ততটুকুর জন্য নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সমস্ত আরাম বোধ, ভালোবাসার মানুষদের সাথে সময় কাটানো, সব কিছু ভুলে থাকা কতটুকু অর্থবহ?

মনে হওয়া শুরু হলো, 'দুনিয়াদারি আর ভাল্লাগে না'। ল্যাব, ইঁদুর, এক্সপেরিমেন্ট, দৈনিক সম্পর্কগুলার ঝক্কি সব গোল্লায় যাক। আমি বাংলাদেশে যাই।

তখনই ভয় পেলাম। ঐতিহাসিক ভাবে প্রমানিত, আমার কোন কিছুতে বিরক্তি ধরে গেলে সেই কাজটা আর শেষ করতে পারি না। কিন্তু আবেগ আর দায়িত্ববোধ--দুইটার ঠোকঠোকিতে আবেগকে জিততে দেয়া ঠিক না, সেটা কেবলই বুঝতে শুরু করেছি। আবেগ জিতে গেলে, মায়েরা বাচ্চাদের উপর বিরক্তিবোধের চূড়ান্তে তাদের আছড়ে মেরেই ফেলতো।

কোন কিছু শুরু করে শেষ করতে পারাটা একটা বিশাল লাইফস্কীল, যেটা আমি অর্জন করি নি, কিন্তু অর্জন করাটা খুব দরকার মনে হলো।


দাঁতে দাঁতে চেপে ঘুরতে থাকলাম সেই ল্যাব-ইদুর-বাসা চক্রে।


আগস্ট
রোজাতে স্কাইপের সময়ের পুরাটুকুই দিলাম ইফতার আর তারাবিতে।
ল্যাব-ইদুর-বাসা-ইফতার-তারাবি-ঘুম-সেহেরী-ল্যাব…


সেপ্টেম্বর
আমার আটচল্লিশটা ইঁদুরকে একে একে এনেসথেশিয়া দেয়া হলো। জাপটে ধরে পেটের বাঁ দিকে ইনজেকশন দেয়ার আতঙ্ক আর ব্যথায় ছটফট করতে থাকা ইঁদুরটার হঠাৎ গতি স্লথ হয়ে যায়। হাঁটা এলোমেলো হয়ে যায়। তারপর এক সময় ইঁদুরটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে ঘুমাচ্ছে, কিন্তু লাল চোখগুলো তখনও খোলা, আর অস্বাভাবিক রকমের স্থির, ফ্যাকাশে। তখন পায়ে চিমটি দিলে যদি ঝটকে পা সরিয়ে নেয়, তাহলে আরও কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে হয়। পুরাপুরি নিস্তেজ হয়ে যাওয়ার পরে বুকে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে সবগুলো রক্ত বের করে আনতে হয় ড্রাকুলার মত। পেট কেটে মেদগুলো ছোট ছোট টিউবে ভরতে হয়। ধারালো কেঁচি দিয়ে ধুকপুকে তাজা হৃদপিন্ডটা বের করে এনে মাপতে হয়। আর যকৃত, কিডনী। মাথার খুলি কেটে হাইপোথালামাস আর হিপোক্যাম্পাস।

পর পর কয়েক রাত ঘুরে ফিরে ই১, কে৩, বি৪ কে স্বপ্ন দেখলাম… শেষের দিকে আটচল্লিশটা ইঁদুরকে আলাদা করে চিনতে পারতাম। বুকের কাছে নরম উষ্ণ শরীরটা চেপে রাখলে ওরা নিশ্চিন্তে মিশে থাকতো। কখনও আমার কনুই আর কোমরের তৈরি ছোট্ট অন্ধকার খুপড়িতে নাক মুখ গুঁজে রাখতো, আমার শুড়শুড়ি লাগতো, হেসে ফেলতাম। কখনও মাথা বাড়িয়ে ইতি উতি তাকাতো, কিন্তু পালাতে চাইতো না। এনিমেল হাইজের নির্জনতায় ওদের গান শোনাতাম। মন খারাপের কথা শোনাতাম। ওরা একটু অবাক হয়েই তাকিয়ে থাকতো যেন। ওদের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারতাম, কখন ভয় পাচ্ছে, কখন বোরড, কখন স্রেফ কৌতুহলী।

রিসার্চটা এতদিন ভালো লাগছিল না, কিন্তু আটচল্লিশটা প্রানের বিনিময়ে মানব জাতিতে জ্ঞানের পরিমান এক বিন্দুও বাড়বে না, সেটা ভাবতে ভালো লাগছিল না একদম। মন লাগালাম।

ইঁদুর নিয়ে রিসার্চের উপকারী দিকগুলো লিখতে হলে আমি অনেক কিছু লিখে ফেলতে পারব। এর প্রয়োজনীয়তা আমি বুঝি। কিন্তু বুঝলাম, এই বস্তু আমার জন্য না। সারাজীবনে হাজার হাজার প্রানহত্যার দায় আমি নিতে পারব না।

সুপারভাইজারকে জানিয়ে দিলাম, আমি আর থাকছি না এই ল্যাবে, কিংবা অন্য কোন ল্যাবে যেখানে প্রানীর উপর গবেষনা হয়…


অক্টোবর
সুপারভাইজার ভেগেছেন আমেরিকায় কনফারেন্সে। আমার স্ট্যাট পুরাটুকুই বাকি। কখনও স্ট্যাটের কাছ ধার দিয়ে যাই নি। জুলি পেলানের একটা আস্ত বই পড়ে ফেললাম। সারাদিন এসপিএসএস আর প্রিজম গুঁতাই। মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে আর এসএমএস করি না, টু-ওয়ে এনোভার নতুন কোন পোস্ট-হক টেস্ট করি। স্কাইপে কনভারসেশন শুরু করেও হঠাৎ কোন কাজে ডুবে যাই, পাঁচ মিনিট পরে খেয়াল করি অপর পাশে নি:শব্দতা।

সুপারভাইজার আসলেন থিসিস জমা দেয়ার দশ দিন আগে। সেই দশ দিন বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দশটা কিংবা আরও দেরি। ঘর ছাড়ি সেই ভোর সাড়ে ছয়টায়।

নভেম্বর
স্ট্যাট শেষ হয়ে যেতেই লেখাটা কি যে ভালো লাগছিল! নিজের কেইসটা নিয়ে বিতর্ক করা অনেকটা বোধ হয় শিখেছি ব্লগ করার সময়। একই লাইনের কাজ, কিন্তু বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চা। গালাগালি নেই, অপবাদ নেই, মিথ্যা কথা নেই, অনর্থক, অর্থহীন অহামিকার প্রদর্শন নেই।

অক্টোবরের শুরু থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঘুম হলো দৈনিক গড়ে ৪-৫ ঘন্টা। বাসার সবার চেহারা ভুলতে বসলাম। কিন্তু তবু, ফাইনাল প্রেজেন্টেশন দিয়ে বাসায় ফিরে মনে হলো… মনে হলো অনেক কিছুই!

যেমন, সারা জীবন আলসেমি করে এসেছি, কিন্তু, দায়িত্ব পালনে সিনসিয়ার, ব্যস্ত জীবনটা আসলে তৃপ্তিদায়ক! অসম্ভব তৃপ্তিদায়ক। অলস মানুষেরা হয়তো অনেক 'আরাম' পায়, কিন্তু 'তৃপ্তি' পায় না। কাজ' না করতে করতে একটা সময়ে নিজের উপর বিরক্তি ধরে যায়। সেই বিরক্তির কাছে সবটুকু সিননিয়ারিটি নিয়ে কাজ করার কষ্টটা পুরাপুরি অনুল্লেখযোগ্য!

আমার জীবনের সব বড় বড় স্বপ্নগুলো আবর্জনার বালতিতে ফেলে দিয়ে আসলাম। আমি শুধু একটা জিনিসই শিখতে চাই---যা করছি, তা-ই সবটুকু সিনসিয়ারিটি নিয়ে করতে চাই। সেটা রান্না হোক, রিসার্চ হোক আর ল্যাবের কোন কলিগের সাথে কনফ্লিক্ট রেজুলুশন হোক।


ডিসেম্বর
ঈদের দুই দিন পর থেকে ভালো খবরগুলো পেলাম একে একে।

- রেজাল্ট - কষ্ট পুরাপুরি সার্থক। মা বাবাকে বলার সাথে সাথে দু'জনের মুখে যেই আলো ছুটলো, সেটা চোখ ধাঁধিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। ইউনিভার্সিটি জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। বিদায়বেলা ভালো হলেই নাকি সব ভালো হয়?

- রিসার্চ - আমার অনার্সের প্রজেক্টটা দিয়েই এএনএতে এবস্ট্রাক্ট জমা দেয়া হলো। আমার অ্যাম্বিশন এত বেশি ছিল না। ইচ্ছা ছিল কোন মতে অনার্স পার করে দিয়েই ভাগবো, বাংলাদেশে যাবো!

- সারা বছর ভীষণ চিন্তায় ছিলাম আগামী বছর নিয়ে। পুরাদস্তুর বেকার হয়ে যাব না তো?
চাকরির জন্য আবেদন শুরু করার আগেই আল্লাহ অভাবনীয় একটা পথ খুলে দিল, ঠিক যেমনটা স্বপ্ন দেখছিলাম, তেমনটা।

বছরের মাঝখানে অসংখ্যবার মনে হয়েছে, সব বাস্তবতা থেকে ছুটে পালিয়ে যাই। আর দুই-তিন বছর আগে হলে আমি তাই করতাম, ছুটে পালাতাম। এবার নিজের স্বপ্নময় বুদবুদ থেকে বের হয়ে খুব করে চাইছিলাম পালাই পালাই মনটার বিপরীতে দাঁড়াই। সত্যিকারের সাহস দেখাই।

কিছুদিন আগে যখন নিচের কথাটা পেলাম একজনের ব্লগে, টুকে রাখলাম। মনের কথাটা বলেছেন ব্লগার…...

"Something is worth fighting for only AFTER you’ve fought for it.”

(কোন কিছু পাওয়ার জন্য যুদ্ধ করার পরেই কেবল যুদ্ধটা সার্থক হয়)। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29065400 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29065400 2009-12-25 18:31:08
নিকাব = প্রতিবন্ধক?
আমাদের ফ্যাকাল্টি এক হলেও ডিপার্টমেন্ট আলাদা, সেই সুবাদে খুব নিয়মিত দেখা হয় না, কিন্তু আস্তে আস্তে অনেক কথাই হলো। ও কনভার্টেড মুসলিম। সতের বছর বয়সে মুসলিম হয়েছে নিজে পড়াশোনা করে। ও অন্য ইউনিভার্সিটিতে পড়েছে আন্ডারগ্র্যাডের গত তিন বছর। আমাদের ইউনিভার্সিটির ডিগ্রী থাকার প্রেস্টিজ বেশি, তাই এখানে অনার্স করতে চেয়েছে। জানলাম, দুই বছর আগে বিয়ে করেছে। আমার খুব মজা লাগল। আমি বেশ কয়েকজন হিজাবীকে দেখলাম বিয়ের পর রেজাল্ট বাড়াবাড়ি রকমের ভালো করা শুরু করেছে। অথচ, ঢাকায় ফেলে আসা স্কুলের বান্ধবীরা যারা এখন ঢাবি, বুয়েট আর মেডিকেলে পড়ছে, ওরা পড়াশোনা শেষ করার আগে বিয়ে করবে না। পড়াশোনার পাঠ চুকাতে হবে সেই ভয়ে! হিজাবী মেয়েদের জামাইরা কি বেশি ভালো হয়? <img src=" style="border:0;" /> (প্লীজ কেউ আহত হবেন না, আমি জানি এটা অ্যাবসুলুউট সত্যি না!)

অনার্সের প্রথম প্রেজেন্টেশনের দিন ফেইথ যখন বিশাল বড় লেকচার থিয়েটারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো তখন হঠাৎ করেই সব কথা বন্ধ হয়ে গেল। হল ভর্তি বিজ্ঞানীরা নড়ে চড়ে বসলেন। উচ্চারন বুঝা যাবে তো? ফেইথ কথা শুরু করতেই সবাই হতভম্ব। দারুন প্রেজেন্ট করলো, প্রশ্নোত্তর পর্বের উত্তরগুলোও দারুণ আত্মবিশ্বাসী ছিল। আমার কেমন অদ্ভূত একটা ভালো লাগা হচ্ছিল।

অনার্সের ফাইনাল প্রেজেন্টেশনটাও যথারীতি ফাটাফাটি। এক অডিটরিয়াম ভর্তি ডাক্তার, ইউনিভার্সিটি প্রফেসার, অস্ট্রেলিয়ার বেশ কয়েকজন প্রথম সারির বিজ্ঞানীর সামনে শুধু চোখগুলো ছাড়া আর সব ঢাকা এই মেয়েটার আত্মবিশ্বাস আর সাবলীলতা রীতিমত ঈর্ষনীয়।

প্রেজেন্টেশনের পরে কথা হচ্ছিল ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে। জানলাম ও সিডনী ইউনিভার্সিটিতে পোস্ট গ্র্যাড মেডিসিনে চান্স পেয়েছে!!!! এতগুলো আশ্চর্যবোধক চিহ্নের কারণ হচ্ছে, সিডনী ইউনিভার্সিটি অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীনতম এবং মহা ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটা। সিডনী ইউনির মেডিসিন ভীষণ রকমের প্রেস্টিজাস, চান্স পাওয়াটাও তাই খুবই কঠিন। সাবকন্টিনেন্টের মানুষজন গাল ফুলিয়ে বলে মুসলিম, হিন্দু আর বাদামী চামড়ার কেউই নাকি চান্স পায় না, হিজাবী মুসলিম তো দূরের কথা (নিকাবী তো অকল্পনীয়)! শুনেছি, বিবাহিতদেরও নাকি নিতে চায় না, ক্যারিয়ার ফোকাস কমে যাবে তাই।

আর এই মেয়ে, সবগুলো প্রচলিত ধারণার বিপরীতে গিয়ে তিন ধাপের সিলেকশন স্টেইজ পার হয়ে, সামনা সামনি মৌখিক পরীক্ষাতেও উতরে গেল! আমার অদ্ভূত ভালো লাগা হলো।

মেইকআপ আর আমি তেল আর জল, এক সাথে মিশ খাই না। এ যুগের মেয়ে হয়েও কাজল ছাড়া আর কিছু দিতে জানি না, সেটাও খুব মাঝে মাঝে। কিন্তু পোশাক আশাক ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলার জন্য খুব দরকার, সেটা সব সময় বিশ্বাস করতাম। বোরখা পড়ব, কিন্তু ফুল তোলা নাকি মেটে আর ফর্মাল রঙের, এসব সিদ্ধান্ত নেই পরিস্থিতি বুঝে। এই মেয়েটাকে দেখে মনে হয়, হয়তো ব্যক্তিত্বে ঘাটতি আছে বলেই পোশাক আশাক দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করাটা এত দরকারি মনে হয়! বুঝি, নিকাব পরতে অনেকটুকু সাহসের দরকার হয়। অতটুকু সাহস আমার নেই। আমার ফাইনাল প্রেজেন্টেশনের পরে একজন বুড়ো প্রফেসর মন্তব্য করেছিলেন, 'তোমার প্রেজেন্টেশন দারুণ হয়েছে। স্লাইড, স্টাইল সুন্দর। আর তোমার হাসিটা চমৎকার, সবাইকে মাতিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট।' সেদিনই ফেইথের প্রেজেন্টেশন দেখে মনে হলো, মেয়েটাকে কেউ কখনও শেষের লাইনটা বলবে না। ওর সুন্দর প্রেজেন্টেশনের সেকেন্ডারী কৃতিত্ব কখনও সুন্দর হাসির হবে না। সব সময় ওর আসল মেধা, ব্যক্তিত্ব আর একেবারে ভিতরের সত্ত্বাটাই মানুষের শ্রদ্ধা কুড়াবে!


*নামটা বদলে দিয়েছি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29047861 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29047861 2009-11-22 15:35:02
বিয়ে ভাবনা - ১
জীবন সঙ্গী বা সঙ্গিনীর মধ্যে মিল খুঁজতে খুঁজতে জামার রং, কাপড়ের ধরণ পর্যন্ত গড়ায়। শুরু হয় হয়তো কাছাকাছি বয়স, একই দেশ, একই গ্রাম/পৈত্রিক/মাতৃক এলাকা, একই লাইনের চাকরি, একই ধর্ম, একই শহরে বড় হওয়া, একই গান ভালোবাসা, একই ধরণের বই ভালোবাসা, একই আদর্শ, এরকম অনেক 'একই', যাতে 'কমন প্লাটফর্ম' পাওয়া যায়, যাতে পুরা পৃথিবী ভেসে গেলেও দুই জন মানুষ একই তরীতে উঠে দিব্যি বেঁচে থাকে একজন আরেকজনকে নিয়ে। এখন কিছু কিছু মিল আছে যেগুলো বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে দারুণ কাজ করে। যেমন এক ভাষা বলতে, একই খাবার ভালোবাসা, এগুলো সমাজের বেশির ভাগ মানুষের দৈনন্দিন সুখের জন্য ভীষণ রকমের গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবার কাছে না। সমাজের মানুষ জন হই চই করে যখন নিজেরা এক ধরণের 'একই প্লাটফর্মে' অভ্যস্ত থাকে কিন্তু কেউ সাহস দেখিয়ে ফেলে তার চেয়েও ভিন্ন কিছু করে ফেলার, যেমন--বয়সে বড় কোন মেয়েকে বিয়ে করা, সিলেটের ছেলে হয়ে ময়মনসিংহের মেয়ে বিয়ে করা, হিন্দু হয়ে মুসলিম কাউকে বিয়ে করা।

সমস্যা হচ্ছে, মানুষ বুঝতে পারে না, যেই দু্ইজন স্রোতের বিপরীতে গিয়ে বিয়ে করতে চাচ্ছে, তারা নিজেদের একটা ছোট্ট নৌকা খুঁজে নিয়েছে। ইউনিভার্সিটিতে একই সাবজেক্টে পড়া, একই গান শোনা, একই খাবার খাওয়া, দিনের ৯৫% কাজ এক ভাবে করা দুইজন মানুষ যখন ১০০% সময় এক সাথে কাটাতে গিয়ে বিয়ে করতে চায়, তখন বাবা মায়ের টনক নড়ে, আরে হিন্দু মুসলমানের বিয়ে ক্যামনে হয়!

ভুল বুঝাবুঝি না হওয়ার জন্য আগেই ডিসক্লেইমার দিচ্ছি--আমার ধর্ম আমার কাছে সব কিছু। কুরআনে যেখানে বলা হয়েছে, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য, সেখানে আল্লাহর ইচ্ছার উপরে নিজের ইচ্ছা থাকাকে আমার কাছে ঔদ্ধত্য আর বোকামি মনে হয়। এক দিনে পাঁচবার নামাজ, অন্তত: একবার কুরআন পড়া, বাইরে যাওয়ার সময় পোশাক আশাকে সীল ছাপ্পড় আর খাওয়ার সময় সাবধানতা--এগুলো আমাকে খুব আলাদা করে দেয় অন্য ধর্মের যে কোন মানুষের থেকে, এমনকি নিজ ধর্মের এমন মানুষদের থেকে যারা ধর্মের অনুশাসনের চেয়ে নিজের বিচার বুদ্ধির উপর আস্থা বেশি রাখেন। আমি টাকা জমাতে পারলে ইউরোপে বেড়াতে যাওয়ার চেয়ে মক্কায় ঢু মারতে ভালোবাসব অনেক বেশি। তাই আমার বা আমার মত মানুষেরা, যারা ধর্মের অনুশাসন মেনে চলতে চান, তারা অন্য ধর্মের মানুষদের খুব ভালো বন্ধু বা সহকর্মী হিসেবে পেতে পারে, কিন্তু জীবন সঙ্গী কিছুতেই না। যেখানে আমি মন প্রান দিয়ে বিশ্বাস করছি আল্লাহর কথা জেনে বুঝে অমান্য করা ভীষণ অপরাধ, আল্লাহর কথা না মানলে মারা যাওয়ার পর ভয়াবহ সব পরিণতি হবে, সেখানে আমি যেই মানুষটাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, তার কাজ কর্মে এর বিপরীত কিছু দেখলে কষ্ট তো পাবই, কখনও মুখে নিষেধ করব, কখনও অভিমান করব, কখনও রাগও করব। জীবন সঙ্গীর সাথে চিন্তা ভাবনায় এত বড় বৈপরিত্য থাকলে এক সাথে সুখে থাকা যায় না।

কিন্তু, বাবা মায়েরা যখন নিজেরা শুধু ঈদ/পূজা ছাড়া ধর্মের কাছ ধার ঘেষেন না, তখন ছেলেমেয়েরা অন্য ধর্মের কারও হাত ধরলে সেখানে 'সমাজ গেল, জাত গেল, মান সম্মান ধূলোয় লুটিয়ে গেল' করে। ব্যাপারটা যে কি চরম রকমের যুক্তিহীন, সেটা মানুষ কেন বুঝে না, আমি জানি না।

শুধু মিল থাকলেই সব সময় সুখ আসে না, সেরকম উদাহরণও প্রচুর। তা না হলে একই জাতি বা একই ধর্মের মানুষদের মধ্যে বিয়ে হলে তালাক ব্যাপারটা থাকতো না। একই সাথে স্কুল কলেজ পড়া বন্ধু বান্ধবেরা বিয়ে করার পরে টের পায়, সারা জীবন এক ছাদের নিচে কাটানো সম্ভব না। দিনের পর দিন গান, প্রিয় খাবার আর চিন্তা ভাবনায় অসাধারন মিল পেয়ে এক সাথে থাকা শুরু করার পরে হাঁপিয়ে উঠে। ভাবছিলাম, এমন কেন হয়?

দেখলাম, মিল আর ভালোবাসার পাশাপাশি ভীষণ রকমের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, মানুষটাকে শ্রদ্ধা করতে পারা।

অনেক আগে একটা মুভ্যি দেখেছিলাম, বাবা মা সবার মতের বিপরীতে গিয়ে ডাক্তার রাণী মুখার্জী বিয়ে করেছিল পাড়ার কারিজমেটিক একটা ফাও ফাও ঘুরে বেড়ানো বেকার ছেলেকে। বিয়ের কয়েক মাস পরে প্রাথমিক মুগ্ধতা কেটে যাওয়ার পর শুধু ঝগড়া হতো। যেদিন যেদিন ঝগড়া হতো, রাণী সেই দিনগুলোতে ক্যালেন্ডারে লাল দাগ দিয়ে রাখত। মাস শেষে দেখা যেত শুধুই লাল।

স্কুল জীবনে দেখা মুভ্যিটা কিন্তু আমাকে খুব ভাবিয়েছিল। কি মিষ্টি রোমান্টিকতা আর দুষ্টুমিতে ভরা একটা সম্পর্ক এরকম হয়ে গেল কেন? ভেবে দেখলাম, মেয়েটা ছেলেটাকে শ্রদ্ধা করতে পারছে না। সে নিজে প্রতিদিন হাসপাতালে খেটে এসে বাসায় এসে দেখে স্বামী দিব্যি ঘুমাচ্ছে, ও প্রতিদিন নতুন দায়িত্ব নিচ্ছে ঘাড়ে, কিন্তু স্বামী সেই আগের ক্যারিজমেটিক বেকার ছেলেই, আর কিছু না। শ্রদ্ধা আসবে কোথা থেকে?

আমার পরিচিত একজন হিজাবী মেয়ে প্রায়ে পনের বছর আগে বিয়ে করেছিল গড়পরতা প্র্যাকটিসের একজন ছেলেকে। সব দিক দিয়ে দারুণ সুন্দর জুটি। কিন্তু ছেলেটা মেয়েটাকে নিয়ে কোথাও যাওয়ার সময় মটর সাইকেলে করে অর্ধেক পথ নিয়ে গিয়ে বলত, তুমি বোরখা খুলো, না হলে নিয়ে যাব না বন্ধুদের সামনে। কখনও অনুনয়, কখনও স্বামী-অধিকার খাটিয়ে নির্দেশ, কখনও ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিং, কখনও নি:শব্দ ধর্মঘট। মেয়েটা বিচ্ছিরি রকমের মানসিক কষ্টে পড়ে গেল। এক দিক দিয়ে স্বামীকে ভীষণ ভালোবাসে, অন্য দিক দিয়ে আল্লাহকেও। কাকে ছেড়ে কাকে ধরে?

শেষ মেষ অনেকগুলো বছর পরে ছেলেটা মেয়েটা ধর্মপরায়নতা মেনে নিয়েছিল। খুব পছন্দ না করলেও, অন্তত: হিজাব নিয়ে এখন আর কিছু বলে না বউকে। কিন্তু, এই পর্যায়ে আসতে অনেকগুলো বছর লেগে গিয়েছিল, এবং মেয়েটাকে অন্তত: খুব বুঝদার হতে হয়েছে। কখনও কখনও চোখের পানি নাকের পানি মিশিয়ে হিজাব খুলেই ফেলতো!

আবার এরকমও দেখেছি, স্বামী গান পছন্দ করে, কিন্তু বউ কানে আঙ্গুল দিয়ে রাখে, গান শোনা পাপ তাই। স্বামী বেচারা খুব প্রিয় প্রিয় গানগুলো জীবন সঙ্গিনীর সাথে ভাগাভাগি করতে পারে না। আস্তে আস্তে দূরে সরতে সরতে কয়েক বছর পরে দেখা গেল স্বামী সারা রাত টিভি দেখতে দেখতে সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়ে, বউ বেডরুমে। দিনের পর দিন শুধু প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া আর কোন কথা নেই।

এই উদাহরনগুলো ছোটবেলা থেকে সামনে ছিল বলে খুব ভাবিয়েছে। বুঝেছি, একজনের কাছে একটা জিনিসের গুরুত্ব এক নম্বরে থাকলে, অন্য জনের কাছে সেটা যদি একেবারেই অর্থবহ না হয়, তাহলে এক সাথে থাকা খুব কঠিন। এক নম্বরের জায়গায় দুই তিন নম্বরে থাকলেও হয়, শ্রদ্ধা ভাগ বাটোয়ারা করে থাকা যায় এক সাথে, ভালোবাসা দিয়ে। কিন্তু যেখানে স্বামী ভীষণ বিব্রতবোধ করছে বউয়ের ধর্মপরায়নতা নিয়ে, ধর্মপরায়ন বউ নিয়ে গর্ব দূরে থাক, হীনমন্য বোধ করছে, সেখানে, অন্য দিক দিয়ে এক সাথে ধরে রাখার অনেক কিছু না থাকলে, তৃপ্তিতে আর সুখে থাকা অসম্ভবের কাছাকাছি।

আমার খুব কাছের একজন আত্মীয়ের স্ত্রী আইরিশ এবং ক্যাথলিক। ধর্ম, সংস্কৃতি সব কিছু দুইজনের পুরাপুরি আলাদা। বিয়ের পঁচিশ বছর পরেও ওনার স্ত্রী প্রতি রবিবারে চার্চে যান। অথচ উনি নিজে উমরাহ করেছেন, হজ্জ্ব করেছেন, রোজা রাখেন, দৈনিক নামাযের অন্তত: চেষ্টাটুকু করেন। এত এত অমিল, অথচ এই মানুষটাই পুরাপুরি আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমাকে বলেছিলেন, 'আমি বাংলাদেশের গ্রামে বড় হওয়া ছেলে আর ও আয়ারল্যান্ডের কোন কোণার মেয়ে, কিন্তু পঁচিশ বছর ধরে আমি ওঁর সাথে আছি, এবং আমি তোমাকে বলছি, আমি ওঁকে নিয়ে ভীষণ রকমের সুখী। ওকে নিয়ে আমার এক বিন্দু আক্ষেপও নেই'।
পয়ষট্টি বছর বয়সেও ভীষণ হাসি খুশি মানুষটার উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস--বয়সের সাথে সাথে আসা স্বাভাবিক রোগগুলোও নেই। ওনার কথাটা পুরাপুরি বিশ্বাস করতে আমার একটুও কষ্ট হলো না।

ভেবে দেখলাম, এই দুইজন মানুষ এক সাথে সুখী, কারণ ওঁরা দুইজনই একজন আরেকজনের জীবন যাপনের ধরণকে শ্রদ্ধা করতে পারছে।

এতটুকু পড়ে কেউ যদি এই সিদ্ধান্ত টানেন যে শুধু নিজের মত করে ধর্ম পালন করলেই সুখের সংসার হবে, ধর্মের পুরাটুকু মেনে সেটাতে অন্যজনকে টানার চেষ্টা করা ভুল, তাহলে সিদ্ধান্তটা ভুল হবে। আমার পর্যবেক্ষন সেটা বলে না।

বরং, নিজের লিমিটেশন নিজের জানতে হবে। নিজেকে বুঝতে হবে, কোন জিনিসগুলো ভালোবাসতে পারবে, কোনগুলো শ্রদ্ধা করতে পারবে, কোনগুলো পারবে না।একটা ছেলের কাছে যদি ফর্সা=সৌন্দর্য্য হয়, কিন্তু মহৎ সাজতে গিয়ে কালো মেয়েকে বিয়ে করে, তাহলে সে নিজের এবং বউয়ের প্রতি চরম অবিচার করবে। যেই মেয়েটার কাছে পোশাক আশাক আর কথা বার্তার রুচিশীলতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করবে যদি ধনী, পড়াশোনায় ভীষণ ভালো, চেহারা ছবিও ভালো কিন্তু 'খ্যাত' কাউকে বিয়ে করে বিয়ের পরে সব সাইজ করে ফেলার আশায়। প্রথম থেকেই শ্রদ্ধা বস্তুটা সম্পর্ক থেকে পুরাপুরি উহ্য থেকে যাবে। প্রাথমিক মুগ্ধতা কেটে যাওয়ার পরে আশাহত বুকের ক্ষত লুকিয়ে রেখে হুল ফুটানো কথা আর ক্রমাগত আক্ষেপে দুইজন নির্দোষ মানুষ শুধু কষ্টই পাবে, তৃপ্তি পাবে না। হ্যা, দুইজনই নির্দোষ, শুধু জীবনের দর্শনে আকাশ পাতাল তফাৎ!

ভালোবাসা অনুপস্থিতিতে শুধু শ্রদ্ধা নিয়ে থাকলে একটা শীতল দুরত্বে সম্পর্ক আটকে যাওয়ার সম্ভবনা প্রচুর। আর শ্রদ্ধা ছাড়া ভালোবাসা থাকলে, সেই ভালোবাসা উড়ে যাওয়ার সম্ভবনাও অনেক। তাই সবচেয়ে ভালো সমাধান হচ্ছে, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা--এই দুইটার সুষম সমন্বয়!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29034308 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/29034308 2009-10-29 23:00:19
বছরের সেরা মাস
'সব মানুষের মুসলমান হয়ে জন্ম হয়, তারপর ওরা বড় হয়ে নিজেদের ধর্ম বেছে নেয়'--এই কথাটা আমাদের সমাজে খুব প্রচলিত কথা। কিন্তু যেই হাদীস থেকে কথাটা বলা হয়, সেখানে বলা হয়েছে, সবার জন্ম হয় 'ফিতরার' উপর, তারপর তারা বড় হয়ে নিজেদের ধর্ম বেছে নেয়।

'ফিতরা' হচ্ছে ভালো আর খারাপ আলাদা করার জ্ঞান, বোধ, চেতনা। মিথ্যা বলা ঠিক না, সেটা জানতে হলে বিশাল আলেম হওয়া লাগবে না, ছোটবেলা থেকেই মানুষ জানে, বুঝে। এটাই ফিতরা। সমস্যা হচ্ছে, সমাজে অনেক সময় খারাপকে খারাপ বলা হয় না। সমাজে একজন দ্বিমুখীচরিত্রের মানুষ যত সহজে উন্নতি করতে পারে, পুরাপুরি সৎ মানুষ তা হয়তো পারে না। এসব দেখে দেখে আমরা ভিতরের সেই ভালো মন্দ বুঝে নেয়ার ক্ষমতাটা ব্যবহার করা আস্তে আস্তে ভুলে যাই। প্রথমবার মিথ্যা বলার সময় চোখের পাতা নড়ে যায়, দ্রুত হার্টবিট হয়, খুব কষ্ট হয়। মিথ্যা বলে ফেলার পর ভিতরের খচখচানি যেতে চায় না। দ্বিতীয়বারও সেরকম হয়। কিন্তু আস্তে আস্তে ভিতরের খচখচানিতে অগ্রাহ্য করতে থাকলে, ভিতরের সেই আর্তনাদ শোনার কান বধির হয়ে যায়। তখন নির্লিপ্ত ভাবে মিথ্যা বলা যায়, উঠতে বসতে, নিজের দ্বিতীয় সত্ত্বার মত সহজাত ভাবে।

পাপের ব্যাপারে রাসুল (সা) এর দেয়া সংজ্ঞাটা আমার দারুণ লাগে--যখন একজন জিজ্ঞাসা করলেন পাপ অর্থ কি, তখন তার জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'তোমার বিবেক যাতে সায় দিবে না, তাই পাপ, সেটা থেকে দূরে থাকো।' (তিরমিজী)

এবার নিজের দিকে তাকানো যাক। প্রতিদিন কত ছোটখাট ঘটনা হয় যাতে আমাদের বিবেক সায় দেয় না, কিন্তু আমরা বিবেকের দরজা বন্ধ করে রাখি।

রাস্তায় কাউকে দেখে খুব খারাপ লাগলেও, 'কতজনকে আর সাহায্য করতে পারব' বলে বিবেকের দংশন নিয়ে পালাই। চোখের সামনে বাসে একটা মেয়ের গায়ে হাত দেয়া হলো, দেখি না। কোথাও ঘুষ দিলে কাজ একটু তাড়াতাড়ি হবে, বিবেককে মুখ খোলারও সময় দেই না… আর টেকনিক্যাল সত্য কথা? যেই কথাগুলো আক্ষরিক ভাবে মিথ্যা না, কিন্তু কথাগুলো এমন ভাবে সাজানো হয়, যেন শ্রোতা বিভ্রান্ত হয়? আপনার ব্যাংক একাউন্টে যদি কেউ ভুল করে টাকা জমা দিয়ে দেয় নিজের একাউন্টের বদলে, তখন কি করবেন? টাকাটা টেকনিক্যালি আপনার, আইন আপনাকে ধরতে পারবে না। কিন্তু বিবেকের খচখচানি কি যাবে? সামনে বসেই একজন আরেকজনের বদনাম করছে, শুনতে ভালো লাগছে না, তবু কিছু বলি না, শুনে যাই। এরকম অসংখ্য ঘটনা হয় প্রতিদিন, আমরা ক্রমাগত বিবেককে শাসাই, চুপ থাকতে বলি, রক্তাক্ত হতে দেই, নিজেরা নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করি।

সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে, যখন আল্লাহর কোন অধিকারের ব্যাপারে ভিতরের খচখচানিকে বধ করা হয়। শুনেছি, যাকাত ফাঁকি দিতে নাকি অনেকে মুখে মুখে গয়না ভাগ করে দিয়ে রাখে। তাতে ক্ষতিটা কার হয়? টেকনিকেল নিয়ম পার হওয়া যায়, কিন্তু এর বাইরে কি আর কিছু নেই? মুহাম্মদ (সা) একবার আয়েশা (রা) কে একটা খাসী রাঁধতে দিয়ে গেলেন। দিনের শেষে বাড়ি ফিরতেই আয়েশা (রা) জানালেন রাসুল (সা) কে জানালেন, 'আমি সব বিলি করে দিয়েছি, শুধু মাথাটাই বাকি আছে'। শুনে রাসুল (সা) হেসে বললেন, 'বলো, শুধু মাথাটা নেই, আর সব আছে।' বিশ্বাস দৃঢ় না হলে, শুধু মুখে বিশ্বাসের কথা বলে, আবার তাকে ফাঁকি দেয়ার ফিকিড় খুঁজলে কি লাভ?

যারা বিবেকের কথা শুনে, তাদের সাথে একটু মিশলেই বুঝা যায়, কথায়, কাজে, ভীষণ রকমের স্বচ্ছতা। অনেকের কাছে ঠকে যায় হয়তো অনেক সময়ই, কিন্তু নিজের কাছে ঠকে না একদম।

রোজার সময় মোক্ষম সুযোগ বিবেকের কথা শোনার। জানেন তো, এই সময়ে শয়তানেরা বন্দী থাকে, তাই ব্যাক গ্রাউন্ড নয়েজ কম। চেষ্টা করলেই শুনতে পারবেন বিবেকের আওয়াজ। এই রোজায় চেষ্টা করুন--

১. নিজের বিবেকের কথা শুনতে।

২. আল্লাহর কথা বেশি করে মনে করতে। ("তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। আশা করা যায়, তোমরা আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পারবে (সূরা বাকারা) )। আমরা অনেকেই আল্লাহকেই ঠিক মত চিনি নি, তাকে ভয় করবো কি করে? কি অসম্ভব সুন্দর সুন্দর গুনাবলী আছে আল্লাহর--'আল ওয়াদুদ'--যিনি এতটাই ভালোবাসেন, যতটা ভালোবাসা পাওয়ার বা দেয়ার কথা আমরা ভাবতেই পারি না। 'আল আফ'য়ূ'--যিনি সব খারাপ কিছুর শেষ চিহ্ন পর্যন্ত এমন ভাবে মুছে নিয়ে যান, যাতে একদম বুঝা যায় না সেখানে অন্য কিছু ছিল। 'আল মুজিব'--যিনি সব চাওয়ার উত্তর দেন। এরকম নিরানব্বইটা দারুণ দারুণ নাম। আল্লাহকে চেনার চেষ্টা করতে পারেন। আল্লাহর চিঠি, কুরআন, এখন আপনার ঘরেই আছে। কুরআন বুঝার চেষ্টা করতে পারেন এই মাসে।

৩. মাঝে মাঝে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন বা এরকম কোন আবেগঘন ঘটনা ঘটলে বুঝা যায়, আমাদের খুব ভিতরে রাসুল (সা) এর প্রতি তীব্র ভালোবাসা আছে। কিন্তু ভালোবাসার আসল প্রকাশ হওয়া চাই! তার সম্পর্কে আরও বেশি জানতে হবে, আর তিনি যা করতে ভালোবাসতেন, তা করতে হবে। রাতে তাহাজ্জুদ, প্রতিবার ওজু করার সময় দাঁত ব্রাশ, ইত্যাদি কয়েকটা উদাহরন।

৪. একটা ভালো কাজের অভ্যাস করুন। আইডিয়া: ঘরের কোণে একটা মাটির ব্যাংক রাখুন, সারা মাসের খুচরা পয়সা জমিয়ে ভালো কিছুতে দিন। রোজার পর থেকে প্রতি মাসে তা-ই করুন।

৫. একটা খারাপ অভ্যাস দূর করুন। সেটা আড্ডায় বসে চুপচাপ কূটনামী শোনা বন্ধ করাই হোক আর ব্লগাতে বেশি সময় খরচ করা হোক!

শেষ করছি ইমাম শাফী' (রহঃ) এর কথা দিয়ে:

"যাদের জ্ঞান আছে, তারা ছাড়া অন্য সবাই মৃত।
যাদের জ্ঞান আছে এবং ভালো কাজ করে, তারা ছাড়া অন্য সবাই ঘুমন্ত।
আর যাদের জ্ঞান আছে, এবং ভালো কাজ করে নিষ্ঠা এবং সততার সাথে, তারা ছাড়া অন্য সবাই ধোঁকায় আছে।"]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28995959 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28995959 2009-08-18 19:05:53
একজন মারওয়া আর একজন সাইকোপ‌্যাথ
মারওয়ার মৃত্যুর ঘটনা এক কথায় বিভৎস। খোদ কোর্টরুমে পুলিশ, আইনের ধারক বাহক আর চার বছরের ছোট্ট শিশুর সামনে বত্রিশ বছর বয়সী অন্ত:সত্তা মারওয়াকে আঠারো বার কুপিয়ে হত্যার দৃশ্যটা মুভ্যিতে দেখাতে হলে সেটাতে এমএ১৫+ রেটিং দিয়েও পার পাওয়া যেত কিনা সন্দেহ। অথচ, মারওয়ার জীবনটা খুব সাধারন ছিল, এত বেশি আটপৌরে যে মারওয়ার বদলে সাবিহা আর মিশরের বদলে বাংলাদেশ বসিয়ে দিলে জীবনটা অনায়েসে আমাদের দেশী কারও হতে পারত। মারওয়ার স্বামী মিশরের একটা ইউনিভার্সটিতে জেনেটিকসের লেকচারার ছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য ২০০৫ সালে জার্মানী গমন, সাথে নিয়েছেন স্ত্রী মারওয়া আর এক বছরের শিশু পুত্রকে। জার্মানী বলে কথা, হিটলারের দেশ ছিল সেই কবে, এখন তো হিটলার আর নাজীদের শাস্তি দিয়ে দেশটা থেকে এন্টি-সেমিটিজম, রেসিজম সব ভূত তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এখন জার্মানী আমেরিকা, ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সের সাথে তাল মিলিয়ে মানব-অধিকারের কথা বলে, জাত-বর্ণ-ধর্ম-স্ট্রেইট কি গে-কাপড়ওয়ালা কি ন্যাচারিস্ট--সব কিছুর উর্ধ্বে উঠে গিয়ে শুধু সমঅধিকারের কথা বলে। এমন যেই দেশের ফিলোসফি, সেই দেশ যে কোন মুক্তিকামী, স্বাধীন মানুষের স্বপ্নের দেশ। তৃতীয় বিশ্ব থেকে আসা মারওয়া আর সাবিহাদের জন্য তো অবশ্যই।

এমনই স্বপ্নের দেশের স্বপ্নের বাড়ির কাছের পার্কটায় মারওয়া তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে প্রায়ে বিকেলেই ঘুরতে যেতেন, দোলনায় শিশুপুত্রকে তুলে দিয়ে ধাক্কা দিতে দিতে নিজের শৈশবের দিনগুলোতে চলে যেতেন। সেরকমই একদিন হঠাৎ আগমন আরেকটা ছোট মেয়ের, সাথে তার আংকেল। ছোট্ট মেয়েটাও দোলনা চড়বে। সেই নিয়ে কথা কাটাকাটি। সেই কথা কাটাকাটিতে হঠাৎ আংকেল ক্ষেপে উঠলেন। চিৎকার দিয়ে উঠলেন, 'ইসলামিস্ট' আর 'টেররিস্ট' বলে।


ওহ, বলতে ভুলে গিয়েছি, মারওয়া স্কার্ফ পরে।

ভালো কথা, এই পর্যন্তও ঘটনাটা খুব অপরিচিত না। বাংলাদেশী অনেকেই স্কার্ফ পড়েন দেশের বাইরে গিয়ে এবং অনেককেই এমন সব গালি শুনতে হয় যে সব কিছুর অর্থও বুঝা যায় না। তবে একটা গালি কমন, 'টেররিস্ট'। টেররিস্ট উপাধি পেতে আপনাকে বোমা বানাতে হবে না, আপনি স্কার্ফ পড়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন, আপনি টেররিস্ট। বাস স্টপে দাঁড়াবেন আর দশ জনের মতই, আপনি টেররিস্ট। রাস্তার পাশে বসে খাবেন, আপনি টেররিস্ট। মারওয়ার মত নিজের তিন বছরের শিশুপুত্রকে নিয়ে পার্কের দোলনায় উঠবেন, ঠিক তখন যদি আরেকজনের ভাগ্নীর দোলনায় চড়তে ইচ্ছা করে, তাহলে আপনি অতি অবশ্যই অবশ্যই টেররিস্ট।

এ সমস্ত ক্ষেত্রে বেশির ভাগ মানুষ চোখ উল্টে চলে আসে। কারণ, একটা কথা পরিষ্কার যে এখানে যুক্তি খাটবে না। কি যুক্তি দিবেন, বলেন! আপনি তাকে চ্যালেঞ্জ করবেন কেন টেররিস্ট বললো, ঠান্ডা মাথায় জিজ্ঞাসা করবেন আপনি কবে কোথায় টেররিজম করেছেন, টেররিজমের সংজ্ঞা কি ইত্যাদি বলে? অতক্ষন শুধু গালি শুনেছেন, এবার একটা ঘুষিও খেতে পারেন। সুতরাং চোখ উল্টে চলে আসা ছাড়া বেশির ভাগ মানুষই তেমন কিছু করে না।

কিন্তু মারওয়া করতে গিয়েছিল। চুপ করে থাকাটা হয়তো নিরাপদ হতো, কিন্তু মারওয়া করতে চেয়েছিল কিছু। কারণ হয়তো, যেই দেশটা স্বপ্ন দেখিয়ে নিয়ে এসেছে, সেই দেশের আইনের লিখিত অক্ষরে তো অন্তত: এমন কিছু করা ভীষণ রকমের বেআইনী। আইনের কাছে যদি তিনি আজকে না যান, তাহলে তাঁর তিন বছরের শিশু পুত্র জানবে, তার মা টেররিস্ট। কারণ, একদিন একটা লোকের থেকে সেই গালি শুনে সুর সুর করে চলে এসেছিল মা। যেই ছোট্ট মেয়েটার জন্য দোলনা খালি করে দেয়া হলো, সে শিখবে, ওই যে ওরকম হিজাব পড়া সব মেয়েরাই টেররিস্ট।তাদের থেকে কাজ আদায় করার একটাই উপায়, গগন কাঁপিয়ে তীব্র ঘৃনাসহ টেররিস্ট বলে গালি দেয়া। এত তীব্র সত্যের মুখে কেউ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, মাথা নিচু করে চলে যেতে বাধ্য হবেই হবে।

দুইজন ভবিষ্যত জার্মান, এবং আরও অনেককে তীব্র ভুল থেকে বাঁচাতে মারওয়া প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল, আইনের কাছে গিয়েছিল মারওয়া।

ঠিক এখান থেকেই ঘটনাটা অপরিচিত হয়ে যায়। কোর্টে দাঁড়িয়েও 'এই দেশে থাকার কোন অধিকার তোমার নাই, নিজের দেশে চলে যাও' বলে চিৎকার করেছিল লোকটা। তারপর তো আসলোই ছুরি নিয়ে, কুপিয়ে হত্যা করলো অন্ত:সত্তা মারওয়াকে, স্বামীকে করলো শারিরীক ভাবে আহত, আর তিন বছরের শিশুপুত্রকে? সারা জীবনের জন্য মানসিক ভাবে ক্ষত বিক্ষত।

কি করে যেন আমি মৃত্যুর কথাটা কালকের আগে শুনি নি। ঘটনাটা ঘটেছিল এই বছরই, জুলাই মাসে।

কালকে প্রথম শুনতে গিয়ে দেখি, মারওয়ার মৃত্যুর জন্য পুরা জার্মানী, তারপর পুরা পশ্চিমা দেশকেই দোষারোপ করা হচ্ছে। ইসলাম আর পশ্চিমের যুদ্ধ ইত্যাদি বলা হচ্ছে। অথচ, প্রথমে শুনেই আমার মনে হয়েছে, লোকটা একটা সাইকোপ্যাথ। মানসিক ভাবে অসুস্থ লোক। না হলে এতটা অযৌক্তিক ঘৃনা থাকতে পারে কারো বুকে? এতটা রেসিস্ট হতে পারে কেউ?

তারপর, আরেকটু ভাবতে বসলাম। তখন তিনটা উপলব্ধি হলো। প্রথমত, কোথাকার কোন আমি, কি তার পড়াশোনা, এই আমিই কি সহজেই লোকটাকে পুরা জার্মানী আর পশ্চিম থেকে আলাদা করে ফেললাম। একটা লোকের অপরাধের দায়ভার পুরা দেশটার উপর চাপাতে চাইলাম না। লোকটাকে আলাদা করে মানসিক রোগীও ভেবে ফেললাম, অথচ, দেড় বিলিয়নের মুসলিমদের ছোট্ট একটা অংশের অপরাধের দায়ভার সব মুসলিমদের আর মুসলিমদের নবীর উপর চাপানো হয় কি সহজেই! যে সব বুদ্ধিমানেরা এই কাজ করছে, তারা নিজেরাও কি ওই খুনী জার্মানের রক্তের দাগ নিজ হাতে নিতে চাইবে? কি হিপোক্রেসী!

দ্বিতীয়ত, আমি আঙ্গুল তুলতে বাধ্য হলাম জার্মান এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর পলিটিশিয়ান এবং মিডিয়ার দিকে। নিউজে সারাক্ষন যদি মুসলিমদের টেররিস্ট হিসেবেই দেখে, তাহলে নিজের জীবনে যে কোন মুসলিমকে কখনও দেখে নি, সে কি করে জানবে যে এই মুসলিমেরা আসল মুসলিমদের খুব ক্ষুদ্র একটা অংশ? মুসলিমদের কখনই টিভিতে ভালো আলোতে দেখানো হয় না, সেরকমটা বললে অন্যায় হয়ে যাবে। দেখানো হয়, কিন্তু মুসলিমদের যখন টিভিতে আনা হয় মুসলিমদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে, তখন হিজাব ছাড়া মুসলিম মেয়ে আর ক্লীন শেভড মুসলিম পুরুষদের এনে তাদের 'মডারেট' সীল মেরে দেয়া হয়। তাতে যেই সাধারন মানুষেরা টিভি দেখছে, তারা শিখে নেয়, আচ্ছা, তার মানে মাথায় হিজাবী কিংবা দাড়িওয়ালা মুসলিমেরা নিশ্চয়ই 'মডারেট' না, তারা 'ইসলামিস্ট' এবং 'টেররিস্ট'। ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট সারকোজি কি সহজেই বুরকা পড়া মেয়েদের নিজের দেশে অবাঞ্চিত ঘোষনা করেন! দেশের মানুষেরা কেন আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে হিজাবী মেয়েদেরও অবাঞ্চিত ভাববে না? ফ্রেঞ্চ স্কুলগুলোতে, এমনকি জার্মানীর কিছু স্কুলেও হিজাব পড়া বেআইনী। দেশে যখন আইন করেই এমন মানুষদের অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়েছে, তখন কেন সাধারন মানুষেরা আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে তাদের চিৎকার করে শুনিয়ে দিবে না যে তারা 'টেররিস্ট' আর 'ইসলামিস্ট' আর 'এই দেশে তাদের জায়গা নেই'? আর টেররিস্ট, অবাঞ্চিত কেউ যখন ভাগ্নীর জন্য দোলনা ছেড়ে দেয় না, উল্টা গালি শুনে মামলা করে, তখন কেনই বা তাকে কুপিয়ে মেরে ফেলা হবে না? "জাত-বর্ণ-ধর্ম-স্ট্রেইট কি গে-কাপড়ওয়ালা কি ন্যাচারিস্ট" সব কিছুর উর্ধ্বে উঠে যেই দেশ মানুষের সমঅধিকারের কথা বলে, সেই দেশের পলিটিশিয়ান আর মিডিয়ার থেকে আরেকটু বেশি কিছু আশা করা কি খুব বেশি কিছু?

তৃতীয়ত, আমি পশ্চিমা দেশগুলোর কি দোষ দিব, আমাদের দেশের নরমাল টিভি চ্যানেলগুলোতে কখনও হিজাবকে ভালো আলোতে দেখানো হয়? আমাদের নেত্রীরা ভন্ডামী করতে হিজাব মাথায় তুলে নেন। ঢাকার বড় বড় স্কুলগুলোতে, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও হিজাব পরার জন্য শিক্ষিক শিক্ষিকাদের থেকে বাজে কথা শুনতে হয়… উপন্যাসগুলো পড়ে একশ' বছর পরের মানুষেরা নিশ্চয়ই ভাববে এই সময়ের হিজাব পরা আর দাড়িওয়ালা কেউ সুস্থ স্বাভাবিক ছিলো না… এসব থেকে শিখতে থাকা কোন এক সাইকোপ্যাথ কখনও ছুরি হাতে কিছু করে বসবে না, তার গ্যারান্টি কি? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28976508 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28976508 2009-07-11 10:03:00
ওপার বাংলায় বাইশ ঘন্টা - ৩

সাধারণ শৌচাগার!

কিংবা, কচ্ছপের মত দেখতে এম্বেসেডর গাড়ি, ওই যে, ফেলুদা আর তোপসে যে সব গাড়িতে করে চড়ে বেড়ায়!



আর, হাতে টানা রিকশা। রিকশাওয়ালারা সাড়ি বেঁধে বসে আছেন রিকশা নিয়ে, রিকশার ক্যান্ডিডেইট মনে হলো তেমন নেই। হাতে একটা ছোট ঘন্টি ধরা, সেটাতেই কিছুক্ষণ পর পর টুংটুং শব্দ করছেন।




প্রথমে দেখে হাতে টানা রিকশার কনসেপ্টটা খুব নিষ্ঠুর মনে হলো। তারপর দেখলাম, আসলে ওরা রিকশাটা এমন এক ভাবে হেলিয়ে রাখে, যে সেন্ট্রিপেটাল ফোর্সটা চালকের হাতের বা কোমরের উপর দিয়ে যায় না। এতগুলো রিকশাওয়ালা এভাবে শুধু শুধু বসে আছে, কেউ চড়ছে না, দেখে আমার বেশ মায়াই লাগল। রিকশা চড়ার চেয়ে না চড়াটাই বেশি নিষ্ঠুর মনে হল। নতুন অভিজ্ঞতার লোভও যে হয় নি, তাও না। একটা রিকশায় উঠেই গেলাম, অল্প একটুখানির জন্য, দুধভাত দুধভাত, শুধু নিউমার্কেটের পিছন থেকে সামনে আনবে, বাংলাদেশের হিসাবে ৫ টাকার জায়গাও না। রিকশা চালক বিহারী। বাংলা পারে না ভালো। নামার সময় জিজ্ঞাসা করলাম, চাচা কত চান? চাচা বিগলিত হাসি হেসে বলেন, 'পনেরো রুপিয়া'! এটা কোন কথা হলো!!! তবু, দামাদামি যেহেতু আগে করি নি, সেটাই দিয়ে দিলাম, শুধু বললাম, এটুকুর ভাড়া বুঝি পনেরো রুপি? উনি কিছু বলেন না। আবার বিগলিত হাসি হাসেন, আর পনের টাকাটা পকেটে রেখে আবার হাত বের করেন, 'বকসিস?' (!)

ততক্ষনে বুঝা শুরু করলাম, কলকাতা হচ্ছে বকশিসর শহর!

আরেকটু হেঁটে দেখি নিউমার্কেটের কোলকাতা হাটের বিজ্ঞাপন--



কিন্তু ছবিটা কিসের? এক জন আরেক জনের কান পরিষ্কার করে দিচ্ছে?? এমন উদ্ভট কথাটা মাথায় আসল কারণ, পরের দিন হাঁটতে গিয়ে দেখলাম, রাস্তার পাশে কান পরিষ্কার করা হচ্ছে <img src=" style="border:0;" /> (দৃশ্যটা হাসি উদ্রেককারী, কিন্তু মোটেই প্রীতিকর না!)--



ততক্ষনে কলকাতা শহর আমার ভীষণ ভালো লেগে গিয়েছে। নিউমার্কেট, এসপ্লানেডের মত ছোট একটা জায়গাতেই যেদিকে তাকাচ্ছি নতুন নতুন সব ব্যাপার স্যাপার দেখতে পারছি। আর এত ধরণের মানুষ, কলকাতার বাঙালী, বিহারী, ভারতের অন্যান্য জায়গা থেকে নানা মানুষ, অনেক ইউরোপিয়ান, এমেরিকান, সব মিলিয়ে, সেই রাতের বেলাতেও গমগমে অবস্থা, আমি একটা হিজাব পড়া মেয়ে, ভারতে যেমনটা দেখা যায় তার চেয়ে একটু অন্যরকম বোরখা পরে ভিনদেশের পথে ঘাটে হাঁটছি, কেউ দ্বিতীয়বার ফিরেও তাকাচ্ছে না, যেন এটাই স্বাভাবিক। কজমোপলিটন সিটি হয়তো একেই বলে, খুব দ্রুত আপন আপন ভাবা শুরু হয়, কারণ 'এটা তোমার শহর না', সেটা বলে দেয়ার জন্য কেউ থাকে না। কলকাতার সবটুকু নিশ্চয়ই এরকম না, কিন্তু নিউমার্কেটের আশে পাশের জায়গাটা সেরকম।

একটা লোককে অনেকগুলো জিনিস এক সাথে মিশাতে দেখে খুব লোভ হলো খাওয়ার। নাম জিজ্ঞাসা করে কি জেনেছিলাম ভুলে গিয়েছি, মনে হয় মিক্সড চাট ছিল। পনেরো টাকা দিয়ে কিনে খেতে গিয়েই বিপত্তি। চোখে পড়লো--




এর পরে আর খাওয়ার রুচি থাকে! ভাইয়াকে দেখাই নি, ও ভেবেছে নও এর জন্য মন খারাপ, তাই খেতে পারছি না। ও বাকিটুকু শেষ করল।

আরও দেখলাম, সেই রাত নয়টায়, রাস্তার পাশে জুতা পালিশ করছেন একজন মহিলা। ভেবে বের করলাম কেন 'বিদেশী' লাগছে। বাংলাদেশে আমি কখনও কোন মহিলাকে জুতা পায়ে থাকা অবস্থায় পালিশ করাতে দেখি নি!



কিংবা পাব৭, নীলচে আলোর পাবের বাইরে সেই পাব বন্ধের তীব্র প্রতিবাদ, ঝট করে অর্কের কথা মনে পড়ল কেন যেন। কলকাতায় রাস্তায় যত খোলাখোলি পাব দেখা যায়, বাংলাদেশে তা না।



আর এখানে সেখানে নানা ধরণের ফলের জুস আর লাচ্ছির দোকান।



লাইম জুসটা দারুণ, একটু লবণ মেশানো থাকে। আর মাটির ভাড়ের আমের লাচ্ছিটা। ২২ ঘন্টায় অন্তত: ৫ গ্লাস তো খেয়েছিই!

আরও অনেক কিছু দেখেছিলাম। কিন্তু ওরকম কয়েক ঘন্টায় পায়ে হেঁটে কলকাতার স্বাদ নিতে গিয়ে আমি যতটা টায়ার্ড হয়েছিলাম, এখন লিখতে তার চেয়েও বেশি টায়ার্ড লাগছে। তাই সেদিনের গল্প ঘুম দিয়ে শেষ করি। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28943307 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28943307 2009-04-27 18:46:14
ওপার বাংলায় বাইশ ঘন্টা - ২
হোটেল রুমে ঢুকে অবশ্য মন ভালো হয়ে গেল। ভাড়া মোটে তিনশ', তাই ফাইভ স্টার হোটেলের মত না অবশ্যই, কিন্তু তবু মন ভালো হল। ছোট্ট রুম, দুইটা সিংগেল বেড, পরিষ্কার চাদর, কম্বল, এক কোণায় ছোট্ট একটা টিভি আর এক পাশে বিশাল এক জানালা দিয়ে আসা রুম ভর্তি আলো। কয়েক রাত নির্ঘুম কাটানোর পরে আর ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ডের ম্যাক্সিমাম ক্যাপাসিটি এগজস্ট করার পরে, রুমটার কাছে সব ফাইভ স্টার তুচ্ছ হয়ে গেল। হাত মুখ ধুয়ে, নামায পড়ে, জেফরি আর্চারের কেইন এন্ড এবল নিয়ে বিছানায় উঠতেই আর কিছু মনে নেই।


ঘুম ভাঙল কয়েক ঘন্টা পরে। আলো কমে এসেছে অনেক। ওমা, কলকাতায় প্রায়ে ঘন্টা চারেক হয়ে গিয়েছে, কিন্তু কলকাতার কিছুই দেখি নি! এটা কোন কথা হলো? ভাইয়া ততক্ষনে একটা চক্কর দিয়ে এসেছে, জানালা দিয়ে আজান শুনে গিয়ে সেটার উৎস খুঁজে বের করে নামায পড়ে এসেছে। আমরা প্রথমে বের হয়ে পরের সারা দিনের জন্য ট্যাক্সি ঠিক করলাম। মনোজ নামের একটা বিহারী লোক, যার বাংলা এত সুন্দর, যে আমরা ভেবেছিলাম সে বাঙালী। টাকা এক্সচেইঞ্জ করলাম। তারপর শুরু করলাম পায়ে হেঁটে কলকাতা দর্শন। একটা শহরকে অপরিচিত শহরকে আবিষ্কার করার আর উপভোগ করার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে কোন রকম প্ল্যান ছাড়া পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো। ভাবার চেষ্টা করলাম, প্রথম দেখাতেই কেন ঢাকার চেয়ে অন্য রকম লাগে, মানুষের গায়ের রং এক, বলছেও সবাই বাংলা। সামান্য কিছু পার্থক্য ক্লু হিসেবে কাজ করে। যেমন, ভাংতির জায়গায় 'খুচরো', আর বেশ প্রমিত উচ্চারণ। আর ছোট খাট পার্থক্য, মানুষের পোশাকের আশাকে কিছু ভিন্নতা, দোকানগুলোর চাকচিক্য একটু বেশি, দোকানের সাইনবোর্ডে বাংলা ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দী, কখনও উর্দু।



আমাদের হোটেলটা নিউমার্কেটের একদম কাছে, মির্জা গালিব স্ট্রীটে। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। রাস্তায় বেশ কয়েকজন বিদেশী চোখে পড়ল। ট্যাক্সিওয়ালা বলছিল, ওই এলাকাটায় অনেক বিদেশী থাকেন, যারা স্বল্প খরচে, ভারতীয়দের মত করেই কয়েকদিন থাকতে চায়। একটু হাঁটতেই বেশ কয়েকটা বইয়ের দোকান চোখে পড়ল, এত্ত বই! সস্তাও অনেক।

প্রথম দেখাতেই সোনালী আলো মাখা পুরানো ধাঁচে তৈরি নিউমার্কেটের বিল্ডিঙটা পছন্দ হয়ে গেল।





ভিতরে ঢুকলাম স্রেফ ঢুঁ মারার জন্য। কিছু কেনার প্ল্যান ছিল না। কিন্তু একটা দোকানে গিয়ে কয়েকটা সূতীর ওড়না এত পছন্দ হয়ে গেল, যে দামাদামি করেই ফেললাম। তারপর আরেকটু ভিতরে উঁকি দিতে একটা গোলাপী রঙের কাঁধ ঝোলা ব্যাগও নিয়ে ফেললাম। ভাইয়া ততক্ষনে হুমকি দিচ্ছে, ওজনের কিচ্ছু বাকি নেই কিন্তু! আমরা বের হবো, তখনই একদল ইউরোপিয়ান টুরিস্টের আগমন। ওরা দাম শুনে মহা উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়লো। 'ও মাই গড, দিজ থিংস আর সোওও চীপ! উই আর সো্‌ওও কামিং ব্যাক!'



আমার মনে হলো, কারও ওদেরকে ইন্ডিয়ায় দামাদামির প্রথা শিখিয়ে দেয়া উচিত! শুধু এই উচ্ছ্বাসটুকু প্রকাশ করার জন্যই আমার চেয়ে কিঞ্চিত বেশি দাম দিতে হবে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28943300 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28943300 2009-04-27 18:31:08
ওপার বাংলায় বাইশ ঘন্টা - ১
তারপর, খুব কুয়াশা ঢাকা সকালটায়, অনেক কেঁদে কেটে, এয়ারপোর্টে কফির গ্লাস উল্টে ফেলে, খুব কাছের মানুষটার ভোঁতা মুখটা শেষ বারের মত দেখে নিয়ে সকাল ৯.২০ এর ফ্লাইটে উঠলাম ১০.৩৫ এ। সারা বোয়িঙে যাত্রী সর্বসাকুল্যে পনের জন। অথচ বিদায় নিতে নিতে ৯টা বেজে গিয়েছিল বলে বিমান বন্দরের কাস্টমসে অফিসাররা সে কি ঝাড়ি! ঘাড় ফিরিয়ে আমি শেষ বারের মত নওকে দেখতে গিয়েই আবার ঝাড়ি খেয়েছিলাম, 'হইছে হইছে, এখন আর মায়া বাড়ায় লাভ নাই।'

প্লেইন দিয়ে বাংলাদেশের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় কুয়াশার চাদরে মুড়ানো মায়া মায়া দেশটাকে শেষ বারের মত দেখা হলো না। কয়েকটা নির্ঘুম রাতের মাশুল দিতে গিয়ে ঘুমে চোখ খোলা রাখতে পারছিলাম না। একটু পর পর মাথাটা বিচ্ছিরি ভাবে ঢলে কাঁধে গিয়ে ঠেকছিল। চোখ খুললাম একেবারে দমদমে, ভাইয়ার চেঁচামেচিতে। ওর কাছে 'আন্তরাষ্ট্রীয়' বিমান বন্দর কথাটা খুব মজা লেগেছে। ঢাকায় শব্দটা 'আন্তর্জাতিক'।




ভিতরে ঢুকে এরকম আরও খটমটে, মজার বাংলা চোখে পড়লো। টয়লেটের জায়গায় 'শৌচাগার'। এগজিট - নিষ্ক্রমণ, এরাইভাল - আগমন, ডিপারচার - প্রস্থান, ইন্টারন্যাশলান ডিপারচার - বহির্দেশ যাত্রা, ভিউয়িং গ্যালারী - দর্শন অলিন্দ। কথ্য ভাষায় এসব শব্দ কি ব্যবহার করা হয় কলকাতায়? জানার সুযোগ পাই নি। তবে বাংলায় অনুবাদ করার জন্য এই তীব্র চেষ্টাটা বাংলাদেশে কম দেখা যায়, টয়লেটের মত যেসব শব্দের ইংরেজি প্রচলিত হয়ে গিয়েছে, সেগুলোকে সেভাবেই বাংলায় বানান করে লেখা হয়। আমাদেরটাই হয়তো বেশি প্র্যাকটিকেল, কিন্তু এরকম মিষ্টি অনুবাদগুলো পড়তে খুব মজা লাগছিল।

এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই অবশ্য ওই মুগ্ধতাটা পুরাপুরি ভুলে গেলাম ভীষণ ভাবে ঠকে গিয়ে। কলকাতায় নতুন শুনে প্রথমই খুব সহৃদয় এক ব্যক্তি এসে আমাদের ব্যাগ বোচকা টেনে নিয়ে গেল একটা প্রাইভেট কারের কাছে, সেই গাড়িতে নাকি এসি 'ফিট' করা আর সেজন্য আমাদের হোটেল পর্যন্ত যেতে দিতে হবে সাতশ' টাকা। অথচ মামনি বাবারা সারাদিনে পুরা কলকাতা শহর ঘুরেছে আটশ' টাকায়। ঘাপলা আছে নিশ্চয়ই! আমরা নিজেরাই ভুরু কুঁচকে আবার ব্যাগ বোচকা টানতে টানতে এয়ারপোর্টের কাছে ফিরে আসলাম। এবার আসলো খাঁটি কলকাতার উচ্চারণের একজন স্বঘোষিত বাংলাদেশী লোক, সে নাকি ফরিদপুরের মানুষ। দেশী মানুষদের জন্য খুব প্রাণ কাঁদে, ঠকতে দেখে উদ্ধার করতে এসেছে আমাদের। তার নিজেস্ব এম্বেসডার গাড়িগুলো আছে ওই যে ওইখানে পার্ক করা (লোকটা আংগুল দিয়ে দেখালো), সেগুলো দিয়ে সে নিয়ে যাবে মাত্র সাড়ে তিনশ টাকায়, হলুদ ক্যাবের মত একই ভাড়ায়। হলুদ ক্যাবগুলোও আছে কাছাকাছি, কিন্তু ওগুলো প্রিপেইড, ঝামেলা বেশি, আবার এয়ারপোর্টের ভিতরে ঢুকতে হবে। তাছাড়া, এই এম্বেসডার গাড়িগুলোতে এয়ারপোর্ট থেকে যাওয়ার সময় ভাড়া বেশি, কিন্তু আসার সময় একদম খালি আসে। খচাৎ করে একটা নাম্বার লিখে দিল আমাদের, যেদিন আসতে চাইব, সেদিন ফোন করে দিলেই একেবারে 'বিনা ভাড়ায়' নিয়ে আসবে আমাদের, যেটা হলুদ ক্যাব করবে না।

আমরা তবু অনিশ্চিত ভংগিতে হলুদ ট্যাক্সিগুলোর দিকে তাকাচ্ছিলাম, পরিচিত যান, কেমন যেন একটা নিশ্চয়তা আছে, লোকটা এবার মুখ শক্ত করল, 'ঠিক আছে যেতে পারেন, আপনাদেরই কষ্ট বেশি হবে, আসলে আমার মন পরিষ্কার, দেশি মানুষ দেখে সাহায্য করতে এসেছিলাম।' কিন্তু আমাদের তো এতগুলো ভারতীয় টাকা নেই যে! 'ঠিক আছে দাদা, বাংলাদেশী পাঁচশ টাকা দিয়ে দেন, আমি প্রায়েই দেশে যাই, আমার কাজে লাগবে'! আমরা কিছু বলার আগেই আরেকটা লোক এসে সুটকেসগুলো গাড়ির পিছনে ঠেশে ভরলো, তারপর, হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইল! দশটাকা? দাদা, একি কথা… সুটকেসগুলো গাড়ি থেকে নামিয়ে হোটেলের কাছে ফুটপাথে রাখার জন্য আবার ড্রাইভার হাত পাতলেন… আরও পরে, হোটেলে ফিরে গিয়ে যখন একটা হলুদ ক্যাবের ট্যাক্সিওয়ালাকে আমাদের ভাড়ার কথা বললাম, তখন সে সবগুলো দাঁত বের করে হাসা শুরু করল। ভাড়া নাকি বড়জোর দু'শ, তার বেশি না কিছুতেই। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28942874 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28942874 2009-04-26 18:46:20
উসুল
আহসানের চেহারায় দীর্ঘ প্রবাসবাসের আত্মবিশ্বাস। মিজান সাহেব এমনিতেই খুব সহজেই মানুষকে আপন ভাবা শুরু করে দেন। আহসানের সামনে মাথা নিচু করে থাকা রায়হানাকে, আর সেদিকে চোরা দৃষ্টিতে তাকানো আহসানকে দেখে মিজান সাহেবের চোখে পানি এসে পড়লো। আহা, এত লক্ষী মেয়েটার জন্য এমন রাজপুত্রই দরকার ছিল!

বিয়ের কথা বার্তা শুরু হতে মিজান সাহেবের আরেকবার চোখে পানি আসার পালা। মিজান সাহেব বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন ২ লাখ টাকা দেন মোহরে, আহসানের বাবা জিল্লুর সাহেব নিজে থেকেই ১০ লাখ টাকা দেন মোহর সেধে বসলেন। নাহ, এত বড় দিল যাদের, সে সংসারে মেয়েটা সুখেই থাকবে।

তারপর, বিয়ের দিন। কাজী সাহেব একে একে তিনবার জিজ্ঞাসা করলেন,
'ঢাকা জেলার বনানী থানার স্থায়ী নিবাসী মোহাম্মদ আহসানুল করিম, পিতা জনাব মোহাম্মদ মিজানুল করিম, ঢাকা জেলার রমনা থানার স্থায়ী নিবাসী মোহাম্মদ আবদুল হক সাহেবের কন্যা রায়হানা হককে ১০ লাখ টাকা দেন মোহরে, ২ লাখ টাকা উসুলে বিবাহ করিতে চান। আপনি কি রাজি?'

অনেক কান্নাকাটি চললো। তারপর রায়হানা ছোট্ট একটা কবুল বললো। চারিদিকে আলহামদুলিল্লাহ রবের বন্যা বয়ে গেল। কাজি সাহেব আর সাক্ষীরা চলে যেতে আহসানের মা এসে একে একে রায়হানার গলায়, কানে, হাতে, নাকে, মাথায় নানা সাইজের, নানা বাহারের গয়না পড়িয়ে দিয়ে গেলেন। একটু পরে খালা, চাচী, মামী, বান্ধবীদেরা এসে গলার শীতাহার, কানের ঝুলানো দুল, নাকের নোলক, কপালের টিকলি, হাতের চুড়ি আর আংগুলের আংটি এক এক করে ধরে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো, 'এটা কে দিয়েছে? আর এটা?' 'বাহ এই সেটটা দারুণ তো, এটা কোত্থেকে?'

রায়হানা ঈষৎ লাজুক হাসি হেসে বলছিলো, 'এটা শ্বশুর বাড়ি থেকে দেয়া... এটাও... হ্যা, এইটাও।'

রায়হানার পাশে উদ্ভাসিত হাসিতে রায়হানার মা। অবশেষে বড় ঘরে মেয়েকে রাণীর সাজে দিতে পেরে মনে হচ্ছে, নাহ, এই মেয়েটা রাণী হতেই এসেছিল পৃথিবীতে। সবাই রায়হানার শ্বশুর বাড়ির উদারতা নিয়ে বিপুল প্রশংসা করতে লাগলো। রায়হানার সৌভাগ্য নিয়েও অনেক মন্তব্য রচিত হলো। মনে মনে রায়হানা ভীষণ গর্বিত বোধ করলো।

সেদিনের পরে আর কখনও রায়হানা দেনমোহর শব্দটুকু শুনে নি। আর সারা জীবন ভেবে এসেছে ওই ২ লাখ টাকার গয়নাগুলো শ্বশুরবাড়ির দয়ার দান।

মেয়েটাকে কেউ বলে দেয় নি, ওই ২ লাখ টাকা দিয়ে ওর শ্বশুর বাড়ির লোকেরা সুনাম কিনেছিল। আর রায়হানার মোহরানার পুরা ১০ লাখই অনাদায় রয়ে গেছে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28937418 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28937418 2009-04-13 11:40:16
পৃথিবী দেখতে সাথে নিতে না পারার কৈফিয়ত (সন্ধ্যাবাতি) লিখেছিলাম ,
"আমার খুব মানুষ দেখার শখ। উত্তর বঙ্গে খালি পায়ে ঠেলা গাড়িতে চলার পাশাপাশি ইউরোপের আল্পস মুগ্ধ চোখে দেখতে চাই। চীনের কোন গ্রামে বসে পূর্বপুরুষের বন্দনা করতে চাই। আফ্রিকার সুন্দর মানুষগুলোর সাথে আগুন ঘিরে বসে প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে চাই। সাউথ আমেরিকার খোলা মনের মানুষগুলোর সাথে গলা মিলিয়ে হাসতে চাই, গান গাইতে চাই। মধ্যপ্রাচ্যের মাথা গরম মানুষগুলোর পাশে কালো বোরখায় নাক ঢেকে 'কেউ একজন' হয়ে যেতে চাই। মেয়ে আমি। আস্তমেয়ে। মেয়েদের অনেক বাঁধা, নিজের তৈরি, সমাজের তৈরি, ভালবাসার তৈরি। কতদূর পায়ের চিহ্ন ফেলতে পারব জানি না। কিন্তু এই একটা বছর আপনাদের সাথে থাকলাম, অনেকগুলো 'মানুষ' দেখলাম... আমার খুব বেশি ভাল লেগেছে। খুব।"

তখন লিখি নি, আমি সিঙ্গাপুরে বসে সুদূর ইউরোপের এক ভবিষ্যত নিউরোসাইন্টিস্টের চোখ ভরা স্বপ্ন দেখতে চাই। মালয়শিয়ার তিওমান দ্বীপে পৃথিবী উদ্ধারের তীব্র স্বপ্নে ডুবে থাকা মানুষগুলোর সাথে সাগরের নীলে হারাতে চাই। বাংলা, ইংরেজি, একটু একটু আরবি শেষে এখন ইন্দোনেশিয়ানে নিজের জিভ নাড়াতে চাই। বলি নি, কারণ তখন জানতাম না, ঠিক এক বছর পরে পৃথিবীকে নিজের করে নেয়ার অভাবনীয় একটা সুযোগ নিজ দোরে দেখা দিবে। আমার ফ্যাকাল্টি থেকে ফান্ড করছে আমাকে, সিঙ্গাপুরগামী প্লেইনে চড়বো আর মাসখানেক পরেই।

লিখেছিলাম, সামহোয়ারে এক বছরে অনেক মানুষ দেখে তীব্র ভালো লাগার কথা। ভেবেছিলাম, যখন যেখানেই মানুষ দেখি, যেই সামহোয়ার আমার যাত্রা শুরু করিয়ে দিয়েছিল, সেই সামহোয়ারে এসে নিজেকে উজাড় করে যাবো। আমার প্রথম সত্যিকারের বিদেশ যাত্রা, সিঙ্গাপুর যাত্রার সম্ভবনার পর থেকেই ভাবছিলাম, সামহোয়ারে ভার্চুয়াল দিনলিপি লিখতে হবে ঠিক। থুঁটি নাটি সব লিখবো! কয়টা একুশ বছর বয়সী বাংলাদেশী, তাও আস্ত এক খানা মেয়ে, এমন সুযোগ পায় বলুন!

আজ লিখলাম প্রথম পর্ব। ভ্রমন পূর্ব 'কি হবে না হবে' অনুভূতিতে ভরা পোস্ট। ব্লগস্পটে পোস্ট করলাম, সামহোয়ারে পোস্ট করতে পারলাম না।

কেন?

উত্তর দেয়ার আগে, আপনাদের জন্য জন্য একটি সহজ ধাঁধাঁ। বলুন তো, পৃথিবীর কোন্ দেশে অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে প্রতিবাদকারীকেই বধ হতে হয়? মেয়ে হলে তো কথাই নেই!

পারলেন না?

সে কি, সামহোয়ারইনে নিয়মিত আসেন, কিন্তু এই সহজ ধাঁধাঁর সহজ উত্তরটুকুও জানেন না?
উমম... হিন্ট দিচ্ছি, মানবীর ব্লগে যান। পড়ে দেখুন রাহেলা সংক্রান্ত পোস্টগুলো।

মেয়েটা কি নৃশংস ব্যবহার পেয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিল, সেই কত বছর আগের কথা। এখনও ওর খুনী ধর্ষকের পৃথিবী দাপিয়ে হেঁটে বেড়ায়।

এ লজ্জার কাহিনী আপনার আমার প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের কাহিনী।
কি, রাহেলার গল্প শুনে ঘেন্নায় রক্ত জ্বলে উঠে? রাহেলার সুবিচারের পিটিশনে সাইন করেন?

রাহেলাদের জন্ম এক দিনে হয় না। রাহেলা হত্যা মামলার আসামীরা ভূমি ফুঁড়ে বের হয় না। ওদের সৃষ্টিতে আপনার নিজেরও হাত আছে। আমাদের আশে পাশেই যে রাহেলার নির্যাতনকারী আর তাদের মাথায় তুলে রাখা মানুষে গিজ গিজ। আপনি কখনও তা নিয়ে সাহস করে কিছু বলেন নি, কারণ, রাহেলাদের নির্যাতনকারীদের হম্বিতম্বি আর কালো হাতের নিচে পিষে পড়বেন নিজেই।

পড়ুন, দেখুন, জানুন।
যা ভার্চুয়ালী প্রকাশিত হয়েছে, তা ভার্চুয়ালিটিতে সীমাবদ্ধ না থাকলে পৃথিবীতে আরেকটা রাহেলার জন্ম হতো। প্রচন্ড অশ্লীল মন্তব্য , দিনের পর দিন ঝুলে থাকার পরে আর অসংখ্য ইমেইলের মাধ্যমে প্রতিবাদ করার পরে কর্তৃপক্ষের চুপিসারে শুধু মন্তব্যটা ডিলিট করে দেয়া, আর একে সুবিচার মনে না করার 'অপরাধে' প্রতিবাদকারিনীর বধ হওয়া। হুম, রাহেলার খুনীরাও হয়তো 'এই দুষ্টু, আর এরকম করবি না' টাইপের বকা খেয়েছে। মানবীকে বলা দরকার, ওতটুকুই তো যথেষ্ট! কারো কোন অধিকার নেই একে সুবিচার মনে না করার!

ঘটনা এখানেই শেষ না, প্রতিবাদকারিনীকে বধ করার পরে অপরাধীর চরিত্রের যেই কালিমা প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে , সেই দাগ উঠাতে, ওই অশ্লীল মন্তব্যকে জাস্টিফাই করার জন্য এর উপর একের পর এক পলিটিক্যাল রং চড়ানো হচ্ছে। রং চড়ানো বললাম, কারণ অপরাধীর এরকম মন্তব্য এই প্রথম না। এবারে শুধু পলিটিক্যাল রং চড়ানোর রাস্তাটা সহজ ছিল। আমার প্রিয় পোস্টে রাখা শেষ তিনটা পোস্ট নিজেই পড়ে নিন, নতুন চোখের জন্ম হবে।

ভার্চুয়াল জীবনে একটা প্রতিবাদ করতে কি এসে যায়? আপনি চাকরি খোঁয়াবেন না, আপনাকে বাসায় গিয়ে কেউ মেরে আসবে না, কিন্তু আমরা যে সম্মিলিত মেরুদন্ডহীনতায় ভুগছি, তা থেকে বেঁচে আসার জন্য ছোট্ট একটা প্রয়াস হতে পারতো!

আপনি নিজে মেয়ে না হলেও একজন মেয়েকেই বিয়ে করবেন, আপনার কোল আলো করে টুকটুকে এক মেয়ে আসবে। দেশটাকে কাঁটামুক্ত না করলে আপনাকে, আপনার প্রিয় স্ত্রীকে, কিংবা আপনার রক্তে মাংসে গড়া মেয়েকেই হেঁটে যেতে হবে এই কাঁটাপথে।

নিজের গা বাঁচাতে চুপ থেকে লাভ নেই। সামহোয়ারের মত একটা পাবলিক ফোরামে জনমতই সব। আমার প্রিয় পোস্টের শেষ তিনটা পোস্ট পড়ে দেখুন, কর্তৃপক্ষকে আপনার ভাবনার কথা জানান। কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করে চোখ বন্ধ করে আছে আমি বিশ্বাস করতে চাই না। দেখিয়ে দিন, আজ হোক, কাল হোক, তারা দেখবেন হয়তো!

এই পুরা ব্যাপারটায় আমি অনেক সময় ব্যয় করে সামহোয়ারে অন্তত: তিনটা ইমেইল করেছি, একটারও জবাব পাই নি। আমার দৃঢ় সন্দেহ হচ্ছে, অশ্লীল মন্তব্যটা অসংখ্য প্রতিবাদী ইমেইলের বেড়ী ভেদ করে অনেকদিন ঝুলে থাকলেও এই পোস্ট প্রথম পাতায় যাওয়ার সাথে সাথে বধ হবো।

হলে ক্ষতি নেই আমার, দীর্ঘ, দীর্ঘ দিন সামহোয়ারের প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা নিয়ে থাকতে পেরেছি। রাগ ইমনকে করা ত্রিভুজের একটা কমেন্টের জন্য ত্রিভুজকে তিন মাসের জন্য ব্যান করা হয়েছিল। সামহোয়ারইন এ ধরণের অশালীন মন্তব্যের ব্যাপারে খুবই অসহনশীল বলেই জানতাম। অন্তত: এই রকম একটা বিষয়ে, যাকে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে অশোভন এবং অমানবিক বলে জানে, সেরকম একটা বিশ্বজনীন, অবিতর্কিত ক্রাইমের ব্যাপারে প্রতিবাদ করে কাজ হয় নি, সেরকম আগে দেখি নি। কিন্তু এবার কালো হাতের স্পর্শ অনেকদূর চলে গিয়েছে মনে হয়। কমেন্ট ডিলিটে অপরাধীর গা বাঁচানোই সহজ হয় কেবল, রেকর্ড ডিলিটেড।

তাই আপাতত: লেখা বিরতি দিচ্ছি সামহোয়ারইনে। উহু, পুরাপুরি চলে যাবো বলবো না, কারণ আমি স্বপ্নবাজ মানুষ। কখনও যদি রাহেলার খুনী মনস্কদের কালো হাতের ছায়া সরে যেতে দেখি, তাহলে আসবো।

কিন্তু দীর্ঘ দিন আপনাদের মাধ্যমে পৃথিবীকে চিনেছি বলে আপনাদের বলে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছি। আপাতত আমার পৃথিবী দেখার গল্প করবো ব্লগস্পট থেকে, সন্ধ্যাবাতি.ব্লগস্পট। আমার স্বপ্ন দেখার দিনগুলোতে আপনাদের স্বপ্ন ধার দেয়ার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

ভালো থাকবেন সবাই, আপনার মা, মেয়ে, বোন, স্ত্রী, প্রিয়তমা, সবাইকে নিয়ে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28795251 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28795251 2008-05-07 20:22:47
অপরিনত স্বপ্নের শ্মশান (নাকি নতুন স্বপ্নের হাতছানি?)
টুমুকে চিঠিটা পাঠালাম অবশেষে। কত বছর পরে, দুই বছর? মেইল করে প্রাপ্তিসংবাদ দিল, খুব খুশী হয়েছে ও। অথচ, নিজেকে দিয়ে কি জোর করে লিখালাম চিঠিটা। রাশাটাও ম্যাসেজ করলো সেদিন, ওর করা এই প্রথম এসএমএস। আমার সংক্ষিপ্ত উত্তরের পর আরও একটা ম্যাসেজ করলো। ওটার জবাব দেয়া হয় নি। এই মেয়েটার সাথেই আগে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতাম? মানব জন্মরহস্য নিয়ে গম্ভীর মুখে জটিল সব আলোচনা করতাম? কখনও নিচের ড্রয়ার খুললে নীল মলাটের চিঠির ডায়রীটা আলগোছে হাতে নিয়ে চমকে উঠি। ঠিক কত ঘন্টা, কত মিনিটে চিঠি পেয়েছি, চিঠি পেয়ে ঠিক কি মনে হয়েছিল, সব সেখানে লেখা। কি প্রচন্ড উৎসাহে চিঠি লেখতাম, চিঠি পড়তাম তখন! এখন পুরানো চিঠি পড়তে গিয়ে ক্লান্ত লাগে। কিসব ছেলেমানুষী!

নিচের ড্রয়ার খুলে সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে দেই আরও কত কারণে। ও যে আমার কবরখানা। অপরিনত স্বপ্নগুলোকে ওখানে ছুঁড়ে ফেলি। এতিম মেয়েটাকে বুকে নিতে চেয়েছিলাম কত আগে? ভাবতে গেলে ধূলো পড়া স্বপ্নটা এত ফ্যাকাশে লাগে যে মনে হয় যুগ যুগ আগের স্বপ্ন। কিন্তু আসলে সময়টা বছর খানেক আগের। টিনের বাক্সটায় টুক টুক করে টাকা জমালাম। মাঝে মাঝেই তামাটে পয়সাগুলো গুণে দেখতাম, বুক ধরে ধাতালো গন্ধ শুনতাম। আমার মেয়ের হাসি কেনার টাকা জমেছে তো?

কয়েকদিন বিপুল উৎসাহে মেয়ে খুঁজলাম, আমার সোনার দেশের শ্যামল মেয়ে। উৎসাহ মরতে সময় লাগে নি। বাংলাদেশ থেকে আমাকে মেয়ে দিবে, কিন্তু বাপমা মরা শুকনো মুখের মেয়ে থেকে চুরি করে খাবে না, এমন কাউকে খুঁজে পেলাম না। 'স্যরি আমরা এ বছরই একটা প্রজেক্ট করছি', 'ওহো, তুমি চাইলে ইন্দোনেশিয়ায় স্পন্সর করতে পারো, কিংবা আফ্রিকা' শুনতে শুনতে বিরক্তি ধরে গেল। ভাগ্যিশ সিডর এসেছিল একদম সময় করে। ভার হয়ে থাকা মেয়ে চিন্তা ওখানে ঢেলে দিয়ে দায়মুক্ত হলাম যেন... ব্যর্থ অপরিনত স্বপ্নটাকে তাড়াতাড়ি চালান দিলাম নিচের ড্রয়ারে। এখনও নিচের ড্রয়ার খুললেই না পাওয়া মেয়েটার অভিমানী অশ্রু দেখতে পাই... 'তুমি আমাকে খুঁজে পেলে না কেন?'

তাড়াতাড়ি ড্রয়ার বন্ধ করে স্বস্তি পাই। না দেখে থাকার চেষ্টা করি তিওমানের টাকাগুলো।

ইয়াহু, গুগল, এমএসএনের দেয়াল চুঁইয়ে তীব্র হতাশারা আসে দলবেঁধে। দেশ থেকে গরমে সিদ্ধ, অভুক্ত, তিক্ত কণ্ঠগুলো শুনি কি শুনি না। ফিলিস্তিনের রক্তাক্ত সাংবাদিকের অন্ধকার হয়ে যাওয়া ভিডিও ক্লীপ দেখে মনে হয় হলিউডের কোন ছায়াছবির একাংশ। এর চেয়ে কত দুধর্ষ ঘটনা হয় হলিউডে! এ আর তেমন কি! ইসারইলী প্রধানমন্ত্রী যখন মৃত সাংবাদিককে ইনিয়ে বিনিয়ে সোজা বাংলায় 'তুই মরেছিস নিজের দোষে' বলে, তখনও আমার চেহারায় কোন ভাবান্তর হয় না। এই লোকটার মত কজ এন্ড এফেক্টের হিসাব শিখতে পারলে নিচের ড্রয়ার খুলে ওমন লাগবে না। অভিমানী মেয়েটাকে বলতে পারবো, চুপ বেয়াদব মেয়ে, তুই আমাকে খুঁজে পাস নি তাই বল!

অসির চেয়ে মসির জোর বেশি--কি বোকা দিনগুলোতে বোকা তত্ত্বটায় বিশ্বাস করতাম! পেশীতে জোর না থাকলে কি, কীবোর্ড তো আছে! খুব যত্ন করে চরিত্রগুলো সাজালাম। কিন্তু ধুর ছাই, আমি লিখতে গেলেই ছেলেগুলো মিহি গলায় ন্যাকা ন্যাকা কথা বলে! আচ্ছা, ছেলেরা খুব রেগে থাকলে কিভাবে কথা বলে? খুব ভালোবাসায়? অনেক কষ্টে? আমি জানি না! লিখতে হলে আমাকে যে নিজের ভিতরে শুনতে হবে, দেখতে হবে সব! তাই চরিত্রগুলোও ড্রয়ারবন্দী হয়ে গেল অনির্দিষ্টকালের জন্য।

লেখাটা খুব অগোছালো হয়ে গেল। কারণ, মাথায় গিজগিজে চিন্তা আর বুকে থম হয়ে থাকা অনুভূতির মূল কারণকেই কীবোর্ডে নামানো হলো না। অপরিনত স্বপ্নগুলো নিয়েই লিখলাম, নতুনের হাতছানি চুপ করে বসে রইল আমার ভিতরেই। কত্তদিন ধরে লিখতে ইচ্ছা করে.. কিন্তু রক্তে সাঁতার কাটা গ্লুকোকরটিকয়েড লিখতে দেয় না কিচ্ছু। খুব করে যা চাই, তা সামনে এসে দাঁড়ানোর সম্ভবনায় আমি এরকম ম্রিয়মান হয়ে যাই কেন?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28791977 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28791977 2008-04-28 05:33:59
কিসু না http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28791130 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28791130 2008-04-25 18:34:25 বোকা বোকা কথা - উফ, তুই? কত্তদিন পরে... মনে মনে তোকে খুঁজতেছিলাম, সত্যি।
- হ্যা, তুই বল আর আমি বিশ্বাস করি আর কি।
- সত্যি, প্রমিস, কয়েকদিন ধরেই ভাবতেছিলাম তোকে ফোন করবো।
- এত চাপাবাজি করা লাগবে না। তুই বিদেশ থেকে ঘুরে আসলি চার মাস হইসে। এই চার মাসে আমাকে নিজে থেকে একবারও ফোন করলি না। যতবার কথা হইসে, প্রত্যেকবার আমি ফোন করলাম দেখে হইসে। এখন তুই বলোস ফোন করবি ভাবতেসিলি আর আমি বিশ্বাস করবো?
- না না সন্ধ্যা, এইটা ডিফারেন্ট... তোকে খুব ফোন করতে ইচ্ছা করতেসিলো, কিন্তু ভয় পাচ্ছিলাম।
- কিইইই??? আমাকে ভয়??? হি হি হি। কেন, কি করছিস?
- বলতে পারব না, তুই বকবি।
- শুনি না!
- আচ্ছা, তুই রাগ করিস না, হ্যা?
- উমমম... বল।
- আম্মু আব্বু তো এখনও রাজি হচ্ছে না, তাই আমরা ভাবছিলাম বিয়ে করে ফেলব।

- এই সন্ধ্যা, চুপ কেন??? কথা বল!
- তুই জানিস এই ব্যাপারে আমি কি ভাবি!
- জানি তো, জানি। শেষ বার ফোন করে যেই লেকচার দিলি, সে জন্যই ভয়ে আমি তোকে ফোন করে বলতে পারছিলাম না...
- মা বাবাকে রাজি করানো কি সত্যিই এত কঠিন সুমি? ওরা নিজেদের ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে কত আর কঠিন হবে? ওদের খুশি করা কত্ত সহজ... একটু কাছে বসে থাকবি, টুক টাক কাজ করে দিবি, খুশি হয়ে যাবে। ওদের কাছে যেটা ভালো মনে হয় সেটা তো ওরা করবেই। ওদের বুঝা এটা তোর জন্য বেস্ট, বুঝিয়ে, নিজেকে দেখিয়ে, খুশি করে কাজ আদায় করে নিবি... খুব কঠিন?
- তুই বুঝিস না... ওরা তো রাজি... অন্তত: আমি কান্নাকাটি করলে তো তাই বলে... কিন্তু শর্তের পর শর্ত... আপুর বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমি বিয়ে করতে পারব না... তুই তো আপুর ব্যাপারে জানিস, বলে আগামী দুই বছর সে বিয়ে করবে না। আব্বু আম্মু তবু নিজের সিদ্ধান্ত থেকে নড়ে না... বলে, সুমন ভালো চাকরি না পেলে এটা আগাবে না। আচ্ছা এটা কি বাংলাদেশ? যে ভালো চাকরি পেতেই হবে? কত স্টুডেন্ট বিয়ে করছে না? সে তো আর আমাকে না খাওয়ায় রাখবে না! টুক টাক ইনকাম তো আছেই.. তা না, ওদের বড় মুখে বলতে তো হবে মেয়ে জামাই কি চাকরি করে!
- আচ্ছা রাজি তো হলো... এবার শর্তগুলো ওদের দে... সুমন চাকরি পাওয়া পর্যন্ত ধৈর্য্য ধর.. ওরা নিজের অবস্থান থেকে নড়লো, তোরাও নড়ে দেখ... ওদের এশুরিটি দে... বিয়ে করতে এত টুকু কর! আপু যদি তখনও বিয়ে না করে, তখন একটা ব্যবস্থা হবে নে..
- তোর জন্য বলা খুব সহজ... আব্বু আম্মু এটাকে এঙগেজমেন্ট বলতেও রাজি না। মুখে বলছে রাজি, কিন্তু কোনভাবেই বিন্দুমাত্র স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছে না... জানিস আমার কি মনে হয়? ওরা ভুলে গেছে ওরাও যে একসময় এই বয়সে ছিল!
- হি হি হি। আমি নিজেও ভুলে যাই আমি এক সময় ছোট ছিলাম। আমার ছেলেমেয়েকে অনেক পেইন দিবো!
- দেখ আমার আর সুমনের দেখা হয়, কথা হয়। দুই জন দুই জনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি। চিন্তা করি। দুই জন মানুষের মধ্যে যখন আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে যায়, তখন কিন্তু ডিস্টেন্স মেইনটেইন করা কঠিন... ডিসটেন্স মেইনটেইন করতে পারছি না, আবার এঙগেজমেন্ট স্বীকৃতিও দিতে পারছি না... মানুষ জন আমাদের এক সাথে দেখে... সব মিলিয়ে একটা বিচ্ছিরি অবস্থা... গিল্টি লাগে... প্রচন্ড ফ্রাস্ট্রেশন হয়... তুই বুঝিস কি ভয়াবহ ফ্রাস্ট্রেশন???
- হি হি হি। স্যরি। হি হি হি। তোরা দু'জনই বাচ্চা, এটা হলো মেইন প্রবলেম। অন্তত: সুমন যদি তোর থেকে কয়েক বছরের বড় হতো, তাইলে এতটা প্রবলেম হতো না!
- হি হি হি। এইটা ঠিক বলেছিস। আমি তোকে যখন প্রথম দিকে ওর কথা বলতাম, তখন বলতাম কি গুরুগম্ভীর মানুষ... আর তুই বলতি, আসলে খুব বাচ্চা বাচ্চা, এইটা খোলস, মনে আছে?
- হ্যা মনে আছে। সত্য হইসে না?
- তুই যা যা বলেছিলি সব সত্য হইসে...
- হি হি হি। রিলেশনশিপ কাউন্সেলর হিসেবে নাম লিখিয়ে ফেলা উচিত কি বলিস?
- লিখাইস, এখন বল আমি কি করবো সন্ধ্যা...
- দেখ, তুই বিয়ে করলে তো আর বাবা মাকে বলবি না। তাতে কি তোরা গিল্টি ফিল করবি না?
- করবো। এখন্ও তো করি।
- তা করিস। আর একটা কথা কি জানিস? এখনের গিল্টটা সবচেয়ে ভয়াবহ। যখন কোন সম্পর্কে গিল্ট ঢুকে, তখন সেই সম্পর্কটা ভিতর থেকে পঁচে যেতে শুরু করে...
- কি ভয়াবহ কথা বলতেসিস... এভাবে বলিস না প্লীজ।
- সত্যি কথা বলছি... সবচেয়ে ভালো হতো, বাসায় চিল্লাচিল্লি কান্নাকাটি করে হলেও যদি বিয়ে দিতে রাজি করে ফেলতি বাবা মাকে। সুমনকে বল বাবা মাকে চাপ দিতে। এই দায়িত্ব তো সুমনের। হি হ্যাজ টু বি দ্যা ম্যান!
- সুমন ফ্যামিলির ছোট ছেলে... ও বলে ওর কথা কেউ গুরুত্ব দেয় না। বিয়ের কথা বললেই আন্টি রসিকতা করে। আর ও ওর বাবা মাকে কষ্ট দিতে চায় না।
- এক দিকে কষ্ট দিতে চায় না বলে চাপ দিবে না, অন্য দিকে মেয়ে ভাগায় বিয়ে করে ফেলবে!
- উফফ... আমাদের এখনকার অবস্থাটা তুই বুঝতে পারছিস না... খুব ডেস্পারেইট হয়ে এসব ভাবছি..
- হা হা হা। স্যরি, ইট ইজ কাইন্ড অফ ফানি। আচ্ছা শোন, আমার রিয়েল কনসার্নটা শোন। বাবা মা এক সময় মেনে নিবে। আশে পাশের কেউই মনে রাখবে না। কিন্তু তোদের মধ্যে যদি গিল্ট ঢুকে, ফ্রাস্ট্রেশন ঢুকে, বাবা মাকে কষ্ট দেয়ার দোষ তোরা একজন আরেকজনের উপর চাপানো শুরু করিস, তাহলে কিন্তু তোদের সম্পর্ক সিরিয়াসলি এফেক্টেড হবে...
- কি করব তুই বল? এই এফেক্টটা কমাতে এট লিস্ট বিয়ে করতে চাচ্ছি... সন্ধ্যা, তুই আমাদের সাক্ষী হবি?
- সাক্ষী!!! মেয়েরা সাক্ষী হতে পারে?
- হ্যা, একটা ছেলের বদলে দুই জন মেয়ে লাগে। তুই আর রুবি। এই দুইজনই জানিস... তোরা দুইজন আসবি।
- হি হি হি। সাক্ষী! গোপন বিয়েতে সাক্ষী! ওরে, জোস একটা অফার দিলি তো! দারুন একটা এক্সপেরিয়েন্স হবে!!!
- ধুর, হবি কি না বল।
- হি হি হি। শোন না, ছোট খালার বিয়েতে ফাজিল কতগুলো সাক্ষী জুটেছিল... খালা যত জোরেই বলে 'কবুল', সাক্ষীরা ততই বলে, শুনতে পারি না, জোরে বলেন! আমি কিন্তু ফাজিল সাক্ষী হবো!
- হি হি হি... সন্ধ্যা, তাইলে তুই সাক্ষী হবি সত্যিই?
- উমমমম আচ্ছা তোরা ব্যবস্থা কর। সাক্ষী যোগাড় হয়ে যাবে। আমি সাক্ষী না হলেও মানুষ জুটে যাবে। কিন্তু অন্য সব ব্যবস্থা তো কর... সুমন রাজি?
- ও প্রথমে রাজি ছিল না, এখন হয়েছে।
- সত্যিই হয়েছে তো? এরকম না তো যে তোকে না বলতে পারছে না?
- উমমম... প্রথমে রাজি হচ্ছিল না, তারপর আমি রাগ করলাম, এরপর ও নিজেই স্যরি বললো, বললো ভুল বুঝতে পারছে...
- দেখ, আবার কথা বলে দেখ। আমাকে জানা কি হয়।

-------------------------------
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সুমন সুমির কাছে গোপন বিয়েতে অরুচির কথা জানাতে সাহস পায় নি... কিন্তু সুমির সামনেই আরেক জিগিরি দোস্তের কাছে মুখ করুণ করে বলে ফেলেছে... 'আমি এভাবে করতে চাচ্ছি না, কিন্তু সুমি চাপ দিচ্ছে!'... সুমি ঘটনা বলে আর চোখ মুছে.. 'ও আমাকে বলতে পারলো না, আর আরেকজনের কাছে বলতে পারলো আমি নাকি চাপ দিচ্ছি??! আমাকে এইভাবে হিউমিলিয়েট করলো?' আমি কাষ্ঠ হাসি হাসি। গাইজ! সত্যিকারের সম্মান করা কাকে বলে, এতটুকুও জানে না? কলিজাটা আরেকটু শক্ত না হলে পুরুষ হওয়া যায়? আর মনে একটু বিষণ্নতা দোলা দেয়। এই সম্পর্কেও পোক ধরলো?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28788273 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28788273 2008-04-16 06:27:05
মেঘ ছোঁয়ার গল্প আমি সেদিন যে মেঘ ছুঁয়েছিলাম, আপনাদের সেদিনের কথা বলা হয় নি। বার বার বসেও পারি নি বলতে। আচ্ছা, মেঘ ছোঁয়া নিয়ে কি সত্যিই লেখা যায়? সেই পিচ্চিকালে যা দেখে কখনও ভ্যানিলা আইসক্রীম কখনও বেবী শ্যাম্পুর ফেনার মত লাগতো, হঠাৎ সেই মেঘে গা ডুবিয়ে বিহ্বল হয়ে থাকার গল্প কি অত সহজে করা যায়? প্রথম ছবিটাই দেখুন না... বিহ্বলতায় আমি প‌্যানারোমা ফরমেটে ছবি তুলতে ভুলে গিয়েছিলাম। তাই টুকরো ছবিগুলো জোড়া দেয়ার চেষ্টা করলাম নিজেই ফটোশপে। রং মিলে নি, কিন্তু বুঝতে পারবেন ঠিক, আকাশের রঙ, সাগরের রং, মেঘের রং। বা দিকে দেখুন, মেঘের রাজ্য। ডানে কিন্তু ফকফকা।

তার চাইতে আপনাদের একটা ভিডিও দেখাই। আমার স্টীল ক্যামেরা অলিম্পাসে কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও। পাহাড়ের গোড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা উঁচু পাহাড়টার উপরে মেঘের রেলগাড়ি দেখছিলাম, মেঘের ছেঁড়া অংশের আটকে যাওয়া দেখছিলাম।

সেদিন নব্বই কিমি থেকে দশ সেকেন্ডে গাড়ি ডেড স্টপে এনে জোশ একটা ব্রেক কষেছিলাম, ইচ্ছাকৃত না অবশ্য। কিন্তু টায়ার পুড়েছিল, পোড়া টায়ার থেকে ধোঁয়া আর চিহিইইইইইইঙঙঙঙঙ শব্দ শুনে আমি ভালোই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছিলাম।

তারপর, সেদিন গাছেও উঠেছিলাম অনেক দিন পরে।

সূর্য্যস্ত দেখেছিলাম। অসাধারন। দেখুন...

কিন্তু, মেঘের রাজ্যে ডুবে থাকা ছিল সেদিনের হাইলাইট।

আমি ঠিক ইবনে বতুতার উত্তরসূরী!

ধুত্তুরি ছাই, আমার মন অসম্ভব খারাপ। সেদিন আকাশ ভরা মেঘ কোন সুযোগে আমার ভিতর এসে ঢুকেছে! আপনারা বরং ছবি দেখুন...

ঢেউ ভাঙার নেশা ধরানো শব্দ...

এক টুকরো একলা মেঘ...


সী ক্লীফ ড্রাইভ... জানালা খুলে সিনেমা সিনেমা ড্রাইভ...


ওখানে অনেক রঙ...


ভয়ংকর সুন্দর...


এবং মেঘ।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28786866 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28786866 2008-04-11 19:10:42
অমিত আহমেদের 'গন্দম' পড়ে ব্লগীয় রিভিউ অমিত আহমেদ যখন গন্দম দেয়া শুরু করেছেন সামহোয়ার ইন ব্লগে, সেই বছর খানেক আগে, তখন সবচেয়ে আগ্রহী পাঠকদের মধ্যে আমার নাম অবশ্যই আসবে। বিতিকিচ্ছিরি টাইপের ব্লগীয় পরিস্থিতিতে গন্দমের উপস্থিতি একমাত্র স্বস্তি ছিল! লেখক যখন সচলে হিজরত করলেন, তখন গন্দমের তল্পি তল্পাও গুটিয়ে নিলেন। এই আমি, গন্দমের লোভেই সচলে কিছু হিট বাড়ালাম।

তারপর, ব্লগার অমিত আহমেদ যখন লেখক অমিত আহমেদ হয়ে উঠতে চাইলেন, তখন হুট করেই গন্দম ব্লগে দেয়া বন্ধ করে দিলেন। কি নিষ্ঠুর, কি নিষ্ঠুর! ঋতু রাজীবের কি হয় জানতে মন খুশখুশ করে। সজীব ইশিতার স্বপ্ন পূরণ হয় কি না জানতে ইচ্ছা করে। এক সময় হুট করে শুনি করে অ.আ. বইও বের করে ফেলেছেন, মোড়ক উম্মোচনের ছবি টবি ঝুলিয়ে, ফেইস বুকে গন্দম ফ্যান ক্লাব খুলে টুলে কি এক অবস্থা! আর এদিকে, আমাদের মত বিশ্বস্ত পাঠকেরা, যারা গন্দমের জন্য আকুল কিন্তু কয়েক সাগর ডিঙিয়ে গন্দম হাতে পাবার আশা নেই, তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলছি।

খুব বেশি দিন ফেলতে হয়নি দীর্ঘশ্বাস। এক সহৃদ মানুষ আমার গন্দম আকুতি টের পেয়ে পাঠিয়ে দিলেন আস্ত একখানা চকচকে গন্দম! পাওয়ার দিনই রাতে দেড়টা অব্দি পড়ে গন্দমের রাজ্যির শেষ সীমানায় পৌঁছে গেলাম।

ব্লগে পড়ার সময় ঘটনা জানার জন্য খুব তাড়াহুড়া করে পড়ছিলাম। দিন তারিখ, স্থানের ব্যাপারটা পুরাপুরি না দেখে ছিলাম। এবার মিনিটে মিনিটে সময় দেখলাম। ওহ, যারা জানেন না, বইটা ডায়রীর মত করে লেখা। দিন, তারিখ, মিনিট মিলিয়ে সময় আর ঘটনার শুরুতেই আলাদা করে জায়গার নাম ধাম।

এরকম উপন্যাস পড়ে অভ্যাস নেই। তাই প্রথম প্রথম হোঁচট খেতে হয়। দু’টো ভিন্ন সময় সমান্তরালে এগুচ্ছিলো। সেই ২০০৬ সালের শুরুর দিক আর ২০০৭ সালের শুরুর দিক। কিন্তু প্রথম কয়েক পর্ব পড়ার পরেই অভ্যাস হয়ে যায়। এই স্টাইলটাই খুব ভালো লেগে যায়। সত্যি সত্যি দিন তারিখ আর জায়গার জন্য ঘটনাগুলোকে সত্যি মনে হয়।

বইটা লিখা হয়েছে বাংলাদেশের উচ্চবিত্তদের নতুন প্রজন্মের তরুণ তরুণীদের নিয়ে। বাংলাদেশে যাঁরা বাংলা বই লিখেন আর আমরা যারা বাংলা বই পড়ি, তারা প্রায়ে সবাই-ই মধ্যবিত (অন্তত: লেখা শুরু করার সময় কেউ উচ্চবিত্তের ছিলেন বলে আমার মনে পড়ছে না!)। সেই মধ্যবিত্ত লেথকেরা এক ধরণের হীনমন্যতা কিংবা ঔদ্ধত্য নিয়ে লিখে যান উচ্চবিত্ত শ্রেনী নিয়ে, ভিন্ন জাতের মানুষদের নিয়ে, তীব্র মমতা পাওয়া যায় না লাইনের ফাঁকে ফাঁকে। পাঠকের মনেও তাই মমতা আসে না, সহানুভূতি আসে না। পাঠক ওদের সাথে নিজের জীবন কখনই মেলাতে পারে না, লেখক নিজে ওই জীবন বুঝে লিখে নি, পাঠক কি করে মেলাবে? চরিত্রগুলো তাই বড় দূরের থেকে যায়, কাঁচের ওপাশে, ধরা ছোঁয়ার বাইরে। অমিত আহমেদের লেখায় সেই ভাবটা ছিল না, প্রচন্ড সাবলীলতা, আন্তরিকতা আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি লিখে গিয়েছেন ওই প্রজন্মের কথা। আমি মধ্যবিত্তের ঘরের মেয়ে হয়েও বই শেষে ছেলেমেয়েগুলোর প্রতি গাঢ় মমতা বাগিয়ে বসলাম। ওরা ড্রিংক করে, পার্টিতে নেচে, নারী পুরুষ নিয়ে আমার চেয়ে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দর্শন পোষণ করে, ধর্মের ধার ধরে না, ড্রাগ নেই... তবু, তবু লেখকের কৃতিত্তে ওদের কেবলই মানুষ মনে হয়। ভালোবাসা যায়, এমন মানুষ, আপন মানুষ।

বইয়ের ভাষা একেবারে সাম্প্রতিক সময়ের তারুণ্যের ভাষা। ‘জোস তো!’, ‘তাফালিং করিস না’, 'চামে আছে', কিংবা কথার মাঝে হুট হাট ইংরেজি শব্দ, ‘আস্ক আউট’, ‘ডিসাইড’, ‘জাস্ট ফ্রেন্ডস’। গালাগালির ব্যাপারেও লেখক কোন সুচিবায়ুতা দেখান নি, যা বইয়ের অথেনটিসিটি বাড়িয়ে দিয়েছে। পড়ে চরিত্রগুলোকে পুরোপুরি চেনা যায়! লেখনী সাবলীল, গদ্য দারুণ রকমের ভালো।

গন্দমের কিছু অংশ কোলকাতায় আর কিছু অংশ ঢাকায় ঘটে। কোলকাতার অংশটুকুতে লেখক অমিত আহমেদ যেন হাত বদলে ফেলেন ছু মন্তরে। দিব্যি ‘আর্ধেক, মাইরি, পূজো’ মার্কা ওপার বাংলার বানানে বলে যান সেখানের গল্প। প্রথম বার ব্যাপারটা খেয়াল করে খুব মজা লাগে।

লেখককে একটা ভীষণ ভালো কাজের জন্য অভিনন্দন দিতে চাই। লেখক আমাদের মিথ্যা পৃথিবী দেখাতে চান নি। লেখক আমাদের, পাঠকদের বুদ্ধিমত্তাকে শ্রদ্ধা করেছেন। পাঠকদের নিজের লেভেলে বসিয়ে কথা বলেছেন, বাচ্চাদের মত সরলীকরন করে দেন নি কিছু। কি বলতে চাইছি বুঝাতে হুমায়ূনের উদাহরন ব্যবহার করি। হুমায়ূন আহমেদের মত লেখকের লেখা পড়ে একটা ঘোরে চলে যেতে হয়। হুমায়ূন একটা আলাদা, অবাস্তব মায়া জগত তৈরি করেন, যেখানে সত্যি জীবনের সত্যিকারের দমবন্ধ করা ঝামেলারা নেই, এক জায়গায় গিয়ে হুট করেই পথ শেষ হয়ে যায় না। সেখানে বড় বেশি বুদ্ধিমতী আর মায়াবতী নারীরা দুমদাম হাবা হাবা ছেলেদের তীব্র প্রেমে পড়ে গিয়ে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। হিমু র‌্যাবের মুখো মুখি হয়ে এমন কথা বলে ছাড়া পেয়ে যায়, যা সবার বলতে বড় ইচ্ছা করে, কিন্তু কেউ বলতে পারে না। বই পড়ে পৃথিবীর কঠিন সমস্যাগুলোকে তুচ্ছ মনে হয়। এটা লেখক কেন করেন আমি জানি না। লেখক মনে হয় ‘সবার’ জন্য লিখতে চান। নিজের বুদ্ধিমত্তার সাথে পাঠক কুলিয়ে উঠবে কিনা সন্দেহ করেন, তাই কঠিন বিষয়গুলো দূরে ঠেলে রাখেন। পাঠক এটা টের পেলে মেজাজ খারাপ করবে না?

অমিত আহমেদ সেটা করে নি। তীক্ষ্ম চোখে দেখে, ছোটখাট বিবরনে মানুষের সাইকোলজি বুঝিয়ে দেন আমাদের। আমরা, খুব আটপৌরে সাধারন মানুষেরা ডক্টর ইউনুসকে নিয়ে তুমুল তর্ক করতে করতে যেভাবে অর্থহীন উত্তেজনায় মেতে উঠি, মাইক্রোইকোনমি, বিশ্ব অর্থনীতি আর নোবেল প্রাইজ, নন্দীগ্রামের মত সব ব্যাপার একেবারে প্রতিদিনের আড্ডায় নিয়ে আসি, অমিত আহমেদের চরিত্রেরাও তাই করে, একদম আমাদের মত করে, আমাদের ভাষায়। তক্ক তুমুলে উঠলে একজন তুড়ি মেরে তক্ক থামিয়ে দেয়, ‘তোরা থামবি?’ আড্ডার অংশ হয়ে যাওয়া পাঠকেরা হঠাৎ ধাক্কা খায়, হঠাৎই যেন আড্ডাটা ভেঙে দিল কেউ, বুকের ভিতরের তার্কিক সত্ত্বাটা উসখুশ করে আরও কিছু বলার জন্য, আরও কিছু শোনার জন্য!

সব বাস্তব, কিন্তু এর মধ্যেই সব হিসাব ভুল করা প্রেমরা চলে আসে, বাস্তবতার মতই। সজীব ঈশিতা কিংবা রাজীব ঋতু। চরিত্রগুলো দিয়ে অমিত আহমেদ কোন স্টেইটমেন্ট দিতে চেয়েছিলেন কি না আমি জানি না, কিন্তু আমি যেন শুনতে পেলাম... সমাজের যে কোন পর্যায়ে একজন ভালো মানুষ তৈরি করার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান তার পরিবার। মেয়ে ঘেষা প্লে বয় রাজীবের মাঝেও তাই এক সময় চলে আসে বিশ্বস্ততা, কমিটমেন্ট, আটপৌরে কিছুতে সুখ খোঁজা, শান্তি খোঁজার আকুতি। তার বাহ্যিক ড্যামকেয়ার, হিসাবী ভাবের আড়ালের ভালো মানুষটা হুট হাট বেরিয়ে পড়ে যখন তখন।

রানা মধ্যবিত্তের ছেলে, নওরীন মধ্যবিত্তের মেয়ে, ওদের প্রতি বিন্দুমাত্র মমতা জন্মে না পাঠকের। কিন্তু মধ্যবিত্ত ঈশিতা আর ঋতুকে পাঠকেরা খুব ভালোবেসে ফেলে। রানা, নওরীনেরা মধ্যবিত্তের চক্রে আটকে পড়া মানুষেরা, ঈশিতা, ঋতু সাহসী। হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখতে জানা মানুষেরা।

গন্দম পড়ে মনে হয়, লেখকের দেখার চোখ আছে। যা দেখেন, তা লিখার হাত আছে। বই শেষে কিছু অতৃপ্তি থেকে যায়, নিপুণ-দীপার গল্প শুরু হয়েও শেষ হয় নি। ওই ঘটনার সূত্রপাতের কারণ বোঝা যায় না, রানার চিন্তিত দৃষ্টি খুঁতখুঁতি রেখে যায়। এসব অভাববোধ ভুলতে সময় লাগে না, কারণ আগা গোড়া ভিন্নধর্মী এই বইয়ের স্ট্রং পয়েন্ট অনেক। আমি একজন খাঁটি পাঠক এবং ব্লগার, তবু দু:সাহস নিয়ে ভালো লেগে যাওয়া গন্দম নিয়ে একেবারে নিজের মত করে একটা রিভিউ লিখে ফেললাম। কিছু ভালো লেগে গেলে আমি সবাইকে তার স্বাদ দিতে চাই। ইতিমধ্যে একজন পাঠক বাড়িয়েছি, আরেকজন বাড়ছে আগামীকাল <img src=" style="border:0;" />।

অমিত আহমেদের পথ চলা কখনও থেমে না যাক... গন্দম হোক তাঁর যাত্রাপথের শুরু। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28783356 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28783356 2008-03-29 05:08:21
স্বাধীনতা দিবসের আড্ডা পোস্ট
শিপু আপু দেশ থেকে ফিরার পরে অধীর আগ্রহে দেশের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। ও দেশের বাইরেই বড় হয়েছে। তাই ওর দৃষ্টিকে মোটামোটি একজন বিদেশির দৃষ্টি বলা যায়। ও ৭ বছর পরে দেশে গিয়ে এরকম একটা লিস্ট দিল--
১. ঢাকায় এখন এত্ত গাড়ি! আগে কখনও এত গাড়ি ছিল না!
২. ইশশ এত্ত সুন্দর সুন্দর স্যালওয়ার কামিজ। চারুকলার পাশে একটা নতুন দোকান করসে, ওখানে আর্টকলেজের ছেলেমেয়েরা সব ডিজাইন করে, খুব চীপ। ৭০০ টাকায় অনেক সুন্দর সুন্দর।
৩. ভ্যালেন্টাইন্স ডে'র দিন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে গেলাম। সবাই ফুল টুল নিয়ে অবস্থা শেষ। খালি কাপল আর কাপল।
৪. জ্যাম... জ্যামের কথা আর বলো না। কোথাও যাওয়ার মুডটাই থাকে না।
৫. তাও ভালো সময়ে গেসি। আব্বু দুই বছর আগে গেসে, তখন তো সারা সপ্তাহেই হরতাল। এখানে গাড়ি পুড়ে, ওখানে গাড়ি পুড়ে।

মোটামোটি ঢাকা কেন্দ্রিক আলোচনা।

আমি দেশ থেকে এসেছি সেই ২ বছর আগে। ল্যান্ড করার পরের দিন থেকে আমার ভয়াবহ ডিপ্রেশন শুরু হয়েছিল। ইচ্ছা করছিল ছুটে কোথাও চলে যাই, আমার বাড়ির বাতাস এতটা গুমোট হতে পারে না। তখন চারিদিকে জেএমবি'র বোমাবাজি চলছে। টিভি ছাড়তেই শুনি বোমায় মারা যাওয়া এক লোকের ছোট্ট ছেলে খুব কাঁদতে কাঁদতে বলছে, 'আমার বাবা কোথায়? আমার বাবা কোথায়?'

গ্রামে যাওয়ার পরে দু'টো পরিবর্তন দেখলাম--
দাদুবাড়ি নানুবাড়ি, দুই জায়গারই নদীর তীর ঘেষে বড় বড় ইন্ডাস্ট্রী হচ্ছে। সেই নিয়ে গ্রামের মানুষদের চাপা অসন্তোষ। বাইরে থেকে শ্রমিক এসেছে। ওরা কাজ করে, সারা রাত লাইট জালিয়ে তাস পেটায়। গ্রামের মেয়েরা আগে সন্ধ্যার আগে নদীর দিকে যেত, ঘুরতে। এখন নদীর তীরে পরিবেশ ভালো না। রাতের বেলা কারেন্ট চলে গেলে সবাই মিলে নদীর তীরের রাস্তা ধরে হাঁটতাম। মাথার উপর শুধু এক থালা চাঁদ। চারিদিক নিস্থবদ্ধ। এবার কারেন্ট গেলেও সেরকম সুযোগ আসলো না। জেনারেটরের দুষিত আলো আর কারখানা থেকে চিল্লাচিল্লি।

বাসে চড়ে যেবার যাচ্ছিলাম, সেবার মাঝ পথে গিয়ে বাস আর যাবে না। সামনে ভাংচুড় হচ্ছে। নেমে, অনেক ঝামেলা করে গিয়েছিলাম তবে।

গ্রামে গিয়ে আরেকটা ব্যাপার জেনে হতভম্ব হয়েছিলাম। এখনও সম্পত্তি শুধু ছেলেরাই পায়। শরীয়ার আইন অনুযায়ী সম্পত্তি ভাগ হলেও মেয়েরা বাবার বাড়ির সব সম্পত্তির দাবী ছেড়ে দিবে, সেটাই সবাই আশা করে। বাপের বাড়ি থেকে সম্পত্তি নিল তো সে মেয়ে বাপের বাড়ির সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দিয়ে এলো। কি উদ্ভট! 'কোন দাবি নেই' বলার পরেও মেয়ের জামাইয়ের কাছে মুখ রক্ষার জন্য ঘর বোঝাই করে ফার্নিচার দিতে হয়।

বড় হচ্ছি আমি, সাথে সাথে আমার চেনা বাংলাদেশ বদলে যাচ্ছে। যখন ব্লগ পড়ি, পত্রিকা পড়ি, বড় আলোচনা পড়ি, তখন মাঝে মাঝে মনে হয় বোধ হয় বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক, মানসিক আর সামাজিক মুক্তির আর দেরি নেই মোটেই।

কিন্তু পরক্ষনেই এমন কিছু দেখি, যার জন্য দুম করে মন খারাপ হয়ে যায়। এই আমার বাংলাদেশ?

স্বাধীনতা দিবসের আড্ডা পোস্টে আপনাকে আমন্ত্রন জানাচ্ছি। বাংলাদেশ নিয়ে আপনার বিচ্ছিন্ন কিংবা একীভূত আশা আকাঙ্খা, ভালোবাসা, নিরব কান্না, স্বপ্ন, উদ্বেগ, সংগ্রাম, সব কিছু নিয়ে আড্ডায় আসুন। জানান আমাদের। স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীন বাংলাদেশের গর্বিত প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর প্রতিটা প্রান্ত থেকে এক আড্ডায় এক করি আমাদের কণ্ঠস্বর। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28782595 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28782595 2008-03-26 10:27:18
ছুটিময় একশ নয় দিন
পরীক্ষা শেষের পোস্ট দিয়েছিলাম নভেম্বরের ২২ তারিখে। ছুটি চললো এবার সাড়ে তিন মাস। ১০৯ দিন। বিশাল ছুটি। ইউনি ইয়ার শেষের ছুটি, তাই কোন পড়াশোনা নেই। ছুটি শুরু হওয়ার আগে মনে হয়েছিল... মা গো কি বিশাল ছুটি! অফুরন্ত ছুটি! কখখনও শেষ হবে না! এখন ছুটির এ প্রান্তে এসে আমি নিজেই হতভম্ব। আমার জীবনে আর কয়টা এতটা নিশ্চিন্ত, গায়ে হাওয়া খাওয়ানো ছুটি আসবে জানি না। কেন যেন মনে হচ্ছে, আর কখনও আসবে না। ভীষণ নিশ্চিন্ত এই ছুটিটা কি করে কেটে গেল!

-১০৯ দিনে পোস্ট করেছি ২৫ টা। গড়ে প্রতি চার দিনে একটা পোস্ট।

- বই কিনেছি ১১টা। কতগুলো পড়েছি নাম মনে করতে গিয়ে ছাব্বিশে গিয়ে ঠেকলাম। আরও পড়েছি হয়তো, নাম মনে পড়ছে না। বই হাতে বিছানায় যাওয়ার অভ্যাসটা মরতে বসেছিল। বই পড়তে পড়তে রাত পার করার অভ্যাসটা মরে গিয়েছিল। প্রচন্ড ক্লান্তি নিয়ে বাসায় ফিরে, শাওয়ার করে, টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে বই হাতে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়ার বিলাসিতা ভুলতে বসেছিলাম। সব ফিরে আসল।

- চাকরি শুরু করেলাম। গত সেমিস্টারে একটা চাকরির অভাব খুব বোধ করছিলাম। এপ্লাই করা শুরু করলাম পরীক্ষার মাঝখানেই। এপ্লাই করার পরের দিনই কল পেলাম একটা। কল সেন্টারের চাকরি। ফোন করে করে সবাইকে একটা চ্যারিটি সংগঠনে টাকা দান করার জন্য ত্যাক্ত করতে হবে। এপ্লাই সিরিয়াসলি করি নি, চাকরি পাওয়ার মত কি না যাচাই করতে করেছিলাম। একবার ডাক পরার পরে ভাবলাম, ছুটিতে, খারাপ কি? হাতে কিছু টাকা তো জমবে! কিন্তু কাজ শুরু করতে হবে পরীক্ষার মাঝখানেই। শুরু করে দিলাম। প্রথম দিন চার ঘন্টা থাকার কথা ছিল।

আমি চেয়ারে বসে বসে ফোন করছি, যন্ত্রের মত কথা বলছি, বেশির ভাগ সময়ই আনসারিং মেশিন, ফোন রেখে দিচ্ছি। দু'ঘন্টার মাথায় নিজেকে সত্যিই যন্ত্রের চেয়েও নিকৃষ্ট মনে হচ্ছিল। ঘুমে ঢলে পড়ে যাচ্ছিলাম। এত্ত ভীষণ বিরক্তিকর, আনপ্রডাক্টিভ কাজ মানুষ কি করে করে? আমি আর তিষ্টোতে না পেরে বলেই বসলাম, 'আমি আজ চলে গেলে অনেক অসুবিধা হবে?'

ভদ্রমহিলা কিছুটা বিষ্মিত হলেন, কিন্তু, বললেন,' আচ্ছা যাও। কিন্তু পরের মঙ্গলবার যখন আসবে, তখন কিছু কাগজ পত্র সাইন করে আজকের দু'ঘন্টার টাকা নিয়ে যেও।'

আমি আর ও পথ মাড়াই নি। টাকা নিতেও না।

তবে এর পরে দু'সপ্তাহের মাথাতেই দারুণ একটা কাজ পেয়ে গেলাম। দুই দুই দফায় ইন্টারভিউ হলো। ক্লাস রুমে এইচ এস সি স্টুডেন্টদের কেমিস্ট্রি পড়ানোর কাজ! আমার ভীষণ ভালো লাগার কাজ। সপ্তাহে চার দিন চাকরি করতে করতে ছুটির দিনগুলো বেশ কেটে গেল!

- সেলাই করলাম। ছোটবেলা সেলাই, রান্না এগুলো সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা ছিল না। এগুলো "মেয়েদের" কাজ। আমি "মেয়েদের কাজ" করতে চাইতাম না। মেয়েদের কাজ বলেই সমাজ আমাদের ভাবানো শেখায়, এগুলো কঠিন না মোটেই। 'ব্যপার না'। "মেয়েদের কাজ", ফালতু কাজ, তাই যে কেউ চাইলেই পারে।

অথচ রান্না ধরে বুঝেছি রান্না একটা আর্ট। কেমিস্ট্রি। অভিজ্ঞতা যেখানে ভীষণ প্রয়োজনীয় বিদ্যা। সেলাই ও কি সেরকম হবে? জামা কাপড়ের ব্যাপারে আমার খুব নিজেস্ব রুচি আছে। আমি স্রোতে চলা মানুষ নই, আবার অরুচিশীল কিছু পরেও স্রোতের বিপরীতে যেতে চাই না! নিজেস্ব রুচি অনুযায়ী জামা কাপড় কিনতে হলে প্রচুর সময় লাগে, অনেক দেখাদেখি লাগে, টাকাও লাগে। ভাবলাম, একটু সেলাই করেই দেখি না! শুরু করেছিলাম কামিজ দিয়ে। সব চাইতে সহজ সেলাই নাকি! ৭/৮টা কামিজ, এক খানা স্কার্ট আর দুই দুইটা সামার কোট (যার একটা দেখে কেউ বুঝতে পারছে না উহা বানানো!) বানিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম-- প্রত্যেকের জীবনে অন্তত: একবার হলেও জামা কাপড় সেলাই করার চেষ্টা করা উচিত!!! সেলাই অত্যন্ত জটিল এক খানা বিদ্যা, ইহাতে হিসাব কিতাব (কতখানি কাপড়ে কত কি হইবে? ঠিক কোন কোণে কাপড় কাটিলে কাপড়ের ছাট দেখিতে মনোরম হইবে?), প্ল্যানিঙ (হাতাটা কোথা হতে কাটা যায়? ছোট হইয়া যাইবে না তো?), কল্পনা শক্তি (ইহা সম্পূর্ণ হইলে ঠিক কি রকম হইবে?) আর প্র-চু-র পরিমানে ধৈর্য্য লাগে!!! নতুন সেলাই শিখলে যা হয়, এক বার সেলাই করে দশ বার সেলাই খোলা! ঘন্টার পর ঘন্টা নিবিষ্ট মনে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে নিয়ে এগুনো! কাউকে লক্ষ্য অর্জনে ট্রেনিং দিতে হলে সেলাই দিয়ে শুরু করা যায়!

- রান্না বান্না হয়েছে মোটামোটি। সেমিস্টারের মাঝ খানে মাকে সাহায্য করতে না পারার অপরাধ বোধ থেকে একটু একটু চেষ্টা করেছি পুষিয়ে দিতে। পুষিয়ে কি দেয়া যায়? তবু কিছু করেছি! নিজের উপর অখুশি নই! (বাসায় থাকার সময়টুকুতে পড়াশোনা ছিল না, পুরোদস্তুর গিন্নী হয়ে গিয়েছিলাম)।

- অংকনও চলিয়াছে। বহু, বহু দিন পরে ড্রয়িঙ করতে পেনসিল হাতে নিয়েছি। উপলক্ষ এক খানা ইউনি সামার কোর্স। ও নিয়ে নিয়েছে দুই সপ্তাহ।

- কোর্স করেছি তিনটা। একটা ড্রয়িং কোর্স। একটা বাহ্যিক পবিত্রতার কোর্স , আর আরেকখানা আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি। মাথা পুরোপুরি খালি ছিল না!

- ঘুরা ঘুরি চলেছে অনেক। বাসার সবার সাথে কায়ামাতে দুই দিনের ছোট্ট হলি ডে। মারুবরা বীচ। বন্ধুদের সাথে ওয়াটসন বে, গ্যাপ, বোটানিকেল গার্ডেনে ছোট খান পিকনিক... কারণে অকারণে দেখা করা, ঘুরাঘুরু... সবাই এক সাথে রাতে থাকা হয়েছে অনেক! ছবিটা গত পরশু তোলা। বন্ধুদের সাথে গিয়েছিলাম জায়গাটায়।


এভাবেই কেটে গেল একশত নয় খানা আস্ত দিন!
খুব পরিচিত, প্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরে যাচ্ছি আবার... গত বাঁধা জীবনের শুরুতে... আরও চার মাসের জন্য!

(পরবর্তী ছুটির অপেক্ষায়... <img src=" style="border:0;" />)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28777671 http://www.somewhereinblog.net/blog/shondhabatiblog/28777671 2008-03-09 12:02:47