২০০৭ সালের ২১শে নভেম্বর। স্থানীয সময় সকাল আটটা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি ৩৫/এ নম্বরের বাস ধরার জন্য। ওই বাসে কলকাতার সল্টলেকে অবস্থিত এ্যাপোলো হাসপাতালে যাব। এদিন আমার মেডিকেল চেকআপের রিপোর্ট দেবার কথা। বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। রিপোর্ট হাতে পেয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আসতে পারলে হয়তো পরের দিনই নিজ দেশে ফিরতে পারব। এমনই ভাবতে ভাবতে অকস্মাৎ কি হলো! মুহূর্তেই পরিবেশ গেল পাল্টে। কোত্থেকে ৮/১০ জনের একদল তরুণ মোটর সাইকেলে চেপে এসে শুরু করে গাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ। দমাদম চলতে থাকে তা। অনেক গাড়ি তার চাকা ঘোরা বন্ধ করে দিয়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তায়। মানুষ প্রাণভয়ে ছুটতে থাকে যে যার মতো। কয়েক মিনিটের মধ্যে রাস্তা ফাঁকা। এখানে ওখানে জ্বলতে থাকে টায়ার। কালো ধোয়ায় ভরে যায় চারপাশ। পটকা ফুটতে থাকে। কিন্তু কেন? জিজ্ঞাসা করি। কিন্তু কোন জবাব নেই। বাংলাদেশ হলে অনেকেই মুখ খুলতেন। সোৎসাহে বলতেন ঘটনার বিস্তারিত। কিন্তু কলকাতায় দেখলাম ভিন্নতা। কেউ কোন কথা বললেন না। তার পরও নিউ মার্কেট এলাকা থেকে পায়ে হেঁটে এগিয়ে যাই পার্ক স্ট্রিটের দিকে। অনেকেই পথ চিনে নিতে সাহায্য করলেন। ভেবেছিলাম পার্ক স্ট্রিট থেকে একটা উপায় পেয়ে যাব। সেখানে যেয়ে দেখি আরও করুণ অবস্থা। রাস্তায় একটির সঙ্গে একটি গাড়ি লেগে আছে। বাইপাসগুলো নেতাদের দখলে। কোন সাইকেল পর্যন্ত যেতে দেয়া হচ্ছে না। সে দৃশ্য ধারণ করতে সেখানে হাজির টাইমস নাও টেলিভিশন চ্যানেলের সরাসরি সংবাদ সম্প্রচারকারী দল। এক নারী সাংবাদিক স্যাটেলাইট সম্প্রচার যন্ত্র বসানো গাড়ির পিছনে দাঁড়িয়ে সরাসরি সংবাদ দিচ্ছে। অনেকক্ষণ দেখলাম ফটোসাংবাদিকদের দৌড়ঝাঁপ। তার পর পার্ক স্ট্রিট ধরে হাঁটা শুরু করলাম। যদি পৌছতে পারি সল্টলেকে, এ্যাপোলো হাসপাতালে তাহলে একদিনের হোটেল ভাড়া , খাওয়া খরচ বাঁচে। ডন বসকো মোড়ে হাজির হয়ে দেখি একই পরিস্থিতি। তারপরও লোকজন বলে, সামনে হেঁটে গেলেই সায়েন্স সিটি। সেখান থেকে একটা ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারে। এমন সময় কলকাতার সাংবাদিক পরিতোষ পালের ফোন- তুমি কোথায়?
বললাম- ডন বসকো মোড়ে।
শিগগির হোটেলে চলে যাও।
কেন দাদা?
আরে আর্মি নামছে রাজপথে। দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ভয়ে থর থর কাঁপতে থাকি। এখন উপায়!
দাদাকে ফোন দিই। বলি-দাদা এখন উপায় কি? কিভাবে হোটেলে ফিরব?
তিনিই কোনাকুনি মহল্লার ভিতর দিয়ে একটি পথ বাতলে দিলেন। বললেন- ওটা মহল্লার ভিতর দিয়ে গেছে। সোজা গেলে তোমার হোটেলের সামনে উঠেছ।
তার কথামতো হাঁটা শুরু করি। হাঁটতে হাঁটতে ফের ফোন করি দাদাকে। বলি- দাদা কিসের জন্য এই আন্দোলন? কি হয়েছে?
আরে বলোনা! তোমাদের তসলিমা নাসরিন। তাকে নিয়ে আন্দোলন। তিনি মুসলমানদের নিয়ে কি সব মন্তব্য করেছেন তাই নিয়ে উত্তেজিত স্থানীয় মুসলমানরা। তারাই আন্দোলন করছে।
ফিরে যাই হোটেলে।
টেলিভিশনে সারাক্ষণ দেখতে থাকি ঘটনা। রহস্য পরিষ্কার হয়ে আসে।
পরের দিন সকাল। মাত্র দুই রুপি আড়াই রুপিতে দৈনিক পত্রিকাগুলো পাওয়া যায়। কিনে ফেলি বাংলা, ইংরেজি মিলে মোট ৬টি পত্রিকা। তাতে দেখা যায় তপসে, পার্ক স্ট্রিট সহ কলকাতা জ্বলনের ছবি। তার মাঝে তসলিমা নাসরিনের ছবি। অনেক রকম খবর। কেউ বলেন, তসলিমাকে কলকাতা থেকে তাড়াতে হবে। আন্দোলনে উত্তাল কলকাতা। অবাক হয়ে গেলাম। বাংলাদেশের ভূত কলকাতার মানুষের ঘাড়েও!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


