somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উভয় সংকট!! নৈতিকতা নাকি সহানুভুতি.....?

২৯ শে জুন, ২০০৯ রাত ৯:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছয় মাস আগের কথা । তখন আমার গুলশানে একটা টিউশনি ছিল। প্রতিদিন প্রেসক্লাব থেকে মধুমতি বাসে করে যেতাম।মধুমতির কাউন্টার ম্যান রোগা-পাতলা ধরনের । বয়স ৩০/৩৫ এর মত হবে।চেহেরায় দারিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট বোঝা যায়। প্রতিদিনই একটা চেক হাফ হাতা শার্ট পরে আসতো যার নিচের অংশ অনেকটা কুচকে উপরের দিকে উঠে গেছে। ঘামের ছোট ছোট দাগ (তিতি) সারা শার্টে ভর্তি।মুখের শুকনো হাসির ভিতরের অন্র্তজ্বালাটা একটু খেয়াল করলেই ধরা যেত।
কয়েকদিন যাবার পর একদিন আমাকে জিঙ্গেস করল,
মামা, আপনাকে দেখি প্রতিদিনই একই টাইমে আসেন, কই যান? কি করেন?

আমি বললাম "জি মামা, আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, আমাকে সপ্তাহে চারদিন গুলশান যেতে হয় টিউশনিতে।আমিও তো এই সময়ে আপনাকেই দেখি....."
"জ্বি মামা, আমি দুপুর বারটার দিকে আসি এবং শেষ পর্য়ন্ত থাকি", তিনি বললেন।
ও আচ্ছা। আপনার নাম কি মামা?
"রনি, আমার বাসা মিরপুরে........" লোকটি কথা বলার সময় মাঝে মাঝেই রাস্তা বরাবর পল্টন অভিমূখে তাকাচ্ছিল।
এবার কথা শেষ না করেই উচ্চস্বরে ডাকতে লাগল.
এ.........ই....গুলশান...মহা.....খালি......নাবিস্কো...নাবিস্কো.....

সেইদিন আর কথা হলোনা, আমি টিকিট নিয়ে উঠে গেলাম বাসে।

একদিন পর কাউন্টারে যেতেই লোকটি শুকনো মুখে একগাল হাসি দিয়ে আমার কুশলাদি জিঙ্গেস করল। আমিও প্রতিত্তুরে একটা মুচকি হাসি দিলাম। বাস আসতে আজ একটু বেশি সময় নিল। সেই ফাকে জেনে নিলাম অনেক কিছু।
লোকটি থাকে মিরপুরে, তিন ছেলেমেয়ে, বৃদ্বা মা সহ ফ্যামিলিতে এরা ছয় জন। বাবা নেই, মারা গেছে দশ বছর হল। দুই বোন ছিল ওর বড়, বাবাই ওদের বিয়ে দিয়ে গেছেন। বোঝা গেল এখন পাঁচজনের এই পরিবারটিতে উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি একমাত্র সেইই।
বাস চলে আসল, টিকিট কাটার জন্য ষোল টাকা হাতে নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম । আমার হাতে টিকেট ধরিয়ে দিয়ে আমাকে বলল-

" মামা টিকিট টা রেখে দিয়েন, পরবর্তী দিন টিকটটা আমাকে দিয়েন"

আমি অবাক হলাম। এমন কথাতো কোনদিন শুনেনি! ছেড়া টিকিট দিয়ে লোকটা করবে কী?

"ছেড়া টিকিট দিয়ে আপনি কি করবেন"? আমি জিঙ্গেস করলাম,

সে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল-
"নিয়ে আইসেন তারপর বলব"

বাস চলে যাবে কথা বাড়ানোর সময় নেই, আর কোন কথা না বলে বাসে উঠে গেলাম।
আমার মনের ভিতর বারবার ব্যাপারটা ঘোরপাক খেতে লাগল, কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না এ ছেড়া টিকিট দিয়ে ব্যাটা কি করবে। টিকিটটা উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখলাম। অন্যদিনের টিকিটের সাথে এর যেয়ে অমিলটা পেলাম তা হল এটাতে কোন তারিখ লেখা নেই। কিছুটা আঁচ করতে পারলাম লোকটি কি করতে চাইছে। টিকিটটা রেখে দিলাম আমার মানি ব্যাগে।

তৃতীয়দিন যেতেই আবার একগাল শুকনো হাসি দিয়ে আমার কুশলাদি জিঙ্গেস করল। তারপর বেশ কিছুক্ষন আমার বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তার অনেক কৌতুহল, ভয় ও নেগেটিভ ধারনা গুলো বলল।বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের তিনি ভয় পান, মেয়ে ছেলেদের অবাধ মেলামেশা তিনি পছন্দ করেননা.......ইত্যাদি ইত্যাদি।
তারপর আমাকে জিঙ্গেস করল আমি টিকটটা এনেছি কীনা।
আমি বললাম-
"না মামা, আমি টিকিটটা হারিয়ে ফেলেছি,
আচ্ছা ঠিক আছে আমি আজকের টিকিটটা রেখে দিব কিন্তু আপনি পুরাতন টিকিট দিয়ে করবেনটা কি?।" (আমি ইচ্ছা করেই একাজটি করেছি, সিন্দান্ত নিয়েছিলাম আগে ওর উদ্যেশ্যটা জানব)

তখন লোকটি বলল-
"মামা মালিক আমাকে মাসে ২৫০০ টাকা দেয় যা দিয়ে বর্তমানে ঢাকার শহরে আমার একার পক্ষেই চলা কঠিন। কীভাবে এই টাকা দিয়ে আমি আমার পুরো ফ্যামেলি চালাবো ? আমার ছেলে-মেয়ে গুলো কে কিইবা খাওয়াবো? আমার বড় ছেলেটি স্কুলে যায়, ওর তো বই খাতা স্কুল বেতন লাগে কোথা থেকে ম্যানেজ করব? তাই নিরূপায় হয়ে আপনার মত যারা নিয়মিত যাত্রী তাদের কাছ থেকে পুরাতন টিকিট রেখে দেই, পরবর্তীতে এগুলো অন্য যাত্রীদের দেই। হেলপার সাথে কথা বলা থাকে। এভাবে যে কয় টাকা আসে তা আমরা ভাগ করে নেই।"

লোকটি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে আবার বলল-

"মামা ! মালিকদের অনেক টাকা, কিন্তু ওরা আমাদের দিকে খেয়াল করেনা, আমাদের যদি আর কিছু টাকা বাড়িয়ে দিত হয়ত আমাদের অনেক উপকার হত, ওদের খুব বেশী ক্ষতি হতনা। কিন্তু ওরা তা করবেনা। গরিবকে শোসন করতেই যেন ওরা বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করে।আর দেখেন যত ঝড়ঝাপটা, পাবলিকের গালিগালাজ,চড় থাপ্পর আমাদের সইতে হয়, কি করুম কন? আমরা গরিব, আমরা অসহায়। কিন্তু আমাদের বেঁচেও থাকতে হয়।
লোকটির চেহেরার মধ্যে অসহায়ত্বের ছাপটা আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম।
আমি কিছু বললাম না। টিকিটটা নিয়ে চলে গেলাম। কি করবো বুঝতে পারছিলামনা। যদি ছেড়া টিকিটটা ওকে দেই একটা অনৈতিক কাজ হবে, একটা অপরাধ করা হবে, একজন মালিককে ঠকানো হবে আবার এতে একটি বাচ্চার মুখে হাসিও ফুটবে। বৃদ্বা মা দুবেলা একটু ভাল করে খেতে পারবে। লোকটির মুখের এই শুকনো হাসিটা কিছুটা হলেও হয়ত দুর হবে।

কিছু বুঝতে না পারলেও আমি ছেড়া টিকিটটা প্রতিদিন লোকটিকে দিতাম, এবং যতদিন গুলশান গিয়েছি ততদিন টিকিট সংরক্ষন করেছি এবং লোকটিকে দিয়েছি। কেন জানি ইচ্ছে হয়নি ন্যায় অন্যায় বিশ্লেষণ করতে। ....


ইদানিং প্রায়ই আমাকে এধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষ করে সন্ধার পরে, যখন টিকেট কাটতে কাউন্টারে যাই তখন প্রায়ই হেলপার এসে বলে, "মামা টিকেট লাগবেনা, উঠে পড়েন"।

আমি পড়ি উভয় সংকটে, কি করব বুঝতে পারিনা। কখনও না কেটেই উঠে পড়ি কখনও জোর করেই টিকেট কেটে নেই।.........

সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০০৯ বিকাল ৩:৩০
৯টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×